কবিতা

মজনু শাহ: ‘বাল্মীকির কুটির’ থেকে একগুচ্ছ কবিতা

maznu_sha | 5 Feb , 2018  

গহন

এই মহী মণ্ডল, তোমার দেহরূপ,
এক আদি ঘুম-চকলেট।
তোমাকে গিলে খায় যা-কিছু চিরন্তন।
তোমাকে অতিক্রম করে বিশাল কোনো দস্যু মেঘ।
তখন সব কিছু তিমির বলে মনে হয়,
শিউলি গন্ধ-মাখা মাটি ফিরে পাব আর!
পুঁতে চলেছ আতঙ্কের বীজ। তোমার স্বপ্নে ঢুকে
তবু ঘুরে বেড়াবার কাল না ফুরায়,
না ফুরায় হিম, শিশির পতন।

শরের জঙ্গল

যেতে হবে আরেক উদয়ে।
কামীনিগাছের নিজস্ব ভূত চলে গেছে যেভাবে।
মধুর তোমার অন্ত না পেয়ে পৌঁছলাম শরের জঙ্গলে।
আবার রাত হলে, প্যাঁদাবে তিমির! শূন্য থেকে উঠে আসে
একটি মূর্চ্ছনা। হোরেসিও, এসো আমার সঙ্গে,
দেখো, রাত্রির ভ্রমণক্লান্ত মেঘ
কিভাবে ছিঁড়ে ফালাফালা হয় আর
শূন্যে মিলায়।

মৌরিফুল

রাত্রিবেলা, একেকটা মৌরিফুল, একজনের স্বপ্ন আরেকজনের কাছে
নিঃশব্দে বিক্রি করে দেয়।
উল্কাঝড় শুরু হলে এই কাণ্ড আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
একেকটা মৌরিফুল, কী হারামি, একবার ভাবো!

দাস

আমি নেমে এসেছি দাস-ভর্তি জাহাজ থেকে।
তপ্ত দোলবিছানা থেকে। এখন সমুদ্রের কুহক বইবে
আমার মধ্যে। এখনই এসে পড়বে ড্রপসিন।
ফানা ও বাকার মধ্যে সেই শ্যামলবরণ শিশুটিকে
দেখতে পাচ্ছি, যার হাতে দাস বেঁধে রাখার শেকল,
তারও গন্তব্য শূন্যের মর্মার্থের দিকে।

শিখা ও শ্যামা

এখানে, খুব নির্জনতা। খুব গাছ। দক্ষ প্রজাপতি কিছু আগে
তার সাতাশটি মেয়েকে নিয়ে গেছে চন্দ্রদেবের কাছে।
আশ্চর্য তারানা শুনে তুমিও খুব পাঙ্খা। এখন বজ্রমুকুট পরে
দূরে উপবিষ্টা। জানি সারারাত তুমি একবার শিখা হবে,
একবার শ্যামা। খুব যৌনতাও একবার। তারপর পেখম গুটিয়ে
ঘুমের ভিতর। অন্য কোনো তরুমর্মরের ভিতর।

একটি বিভাস

তুমি কি দেখেছ ছিট-কুকুর কিভাবে দৌড়ায়?
সিংহদুয়ারে বসে থাকা নগ্ন কোনো সন্ত?
বিস্তীর্ণ শরবন?

একটি বিভাস তবু শুনতে পার উন্মাদ গায়কের কাছে।
রেকাবীর সব ফল তোমার জন্যে নয়। হয়ত একদিন
খুঁজে পাবে মদের ফোয়ারা, বা কোনো রেশম-বণিকের
মুঠোয় লুকানো চন্দ্রবিন্দু।

পথ

বোঝা যায় কি যায় না এমন একটা পথ ঢেকে আছে বাঁশপাতায়।
এত মৃত বাঁশপাতা! ওদিকের জঙ্গলে, বনমোরগের আস্তানা। গুম খুন
হয়ে যাওয়া যুবকের দেহ এখানে খুঁজে চলেছে তার ছোট ভাই।
কোথাও বিপুল হ্রেষা শোনা গেল। আরেকটু অনুসরণ করি তাকে।
বাঁশপাতা ঢাকা পথ সহসা ফুরায়। এখানে আরও গভীর প্রচ্ছায়া।

পান্না-কোকিল

কী চাও এখানে, পান্না-কোকিল?

এই বিধ্বংসী নীরবতায় ঘুম শুষে নিচ্ছে রাবার গাছেরা।
ঘুমোচ্ছে ব্যান্ডবাদকের ছোট বউ, জাগিও না তাকে। যে-জগত
গানের, বিপুল অন্তর্ধানের, সেইদিকে তাকিয়ে মাথা আর দুলিও না।
এইবার সভ্যতার সবখানে বসে থাকা প্রেত হও একটু বরং।

বাদামপাতা

একটি লাল বাদামপাতা কতদূর আর উড়ে যেতে পারে!
আমি সেইরূপ। নিকটে ঘুরে যায় ভ্রমরকাহিনি। এইখানে
জ্যোতির্ময় উপহার হয়ে বসে থাকে একটি লক্ষ্মীপেঁচা। লৌহদুর্গে বন্দিনী
আজ আমার মুক্তকুন্তলাকে একবার অন্তত দেখব দূর থেকে
—এমন আকাঙ্ক্ষা চাবুকের তলে চাপা পড়া চাঁদের মতো নাকি?

খর কৌতুকে, মিছে আয়োজনে ক্ষয় করি কাল, তবু
আরেকবার কী ভেবে দাঁড়াই লেবুফুল ঝরে থাকা অন্ধকারে,
অস্ফুট উচ্চারণ করে কেউ, মা নিষাদ! মূর্চ্ছিত নর্তকের পাশে
এও এক ফোয়ারা। নিখিল সেই উড়ে চলা লাল বাদামপাতা
তাকে জানে, পরাক্রান্ত ঝড় তুলে নেবে একদিন সৃজনের ছদ্মবেশে,
আদিম প্রশ্নেরা তাকে জানে।

Flag Counter


3 Responses

  1. Santosh Majumder says:

    After along time I see you & your poem……..Very nice Thanks. oh.. I Lost your S.. number in order to problem of mobile.

  2. হানযালা হান says:

    কবিতাগুলো ভাল লাগল। বিশেষ করে, ‘শরের জঙ্গল’, ‘মৌরি ফুল’, ‘দাস’, ‘পান্না কোকিল’ ও ‘বাদামপাতা’ চমৎকার।

    ‘ফানা ও বাকার মধ্যে সেই শ্যামলবরণ শিশুটিকে/ দেখতে পাচ্ছি, যার হাতে দাস বেঁধে রাখার শেকল,/ তারও গন্তব্য শূন্যের মর্মার্থের দিকে।’ এই কথাগুলো দ্রষ্টব্য।

  3. মোঃ মেজবাহ উদ্দিন says:

    লেখাগুলোর গভীরতায় মুগ্ধ হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.