এবাদুর রহমান এবং তাঁর দাস ক্যাপিটাল

সিউতি সবুর | ২৫ জুন ২০০৮ ১১:৩২ অপরাহ্ন

এবাদুর রহমানের লেখা প্রথম পড়ি কাউন্টার ফটো পত্রিকায়, বন্ধু মানস চৌধুরীর উছিলায়। পরবর্তীতে ওঁর উপন্যাস দাস ক্যাপিটাল-এর কথা বন্ধু মানস এবং সুমন রহমান জানান গত বছরের শেষ দিকে। বইটি প্রকাশ das-c.jpg…….
এবাদুর রহমান প্রণীত দাস ক্যাপিটাল । প্রকাশক: অস্ট্রিক আর্যু, বাঙলায়ন, রুমি মার্কেট ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ১০০০, ই মেইল: banglayan@ yahoo.com । প্রথম প্রকাশ: ফাল্গুন ১৪১২, ফেব্রুয়ারি ২০০৬। স্বত্ব: বেরেনিস গাজ্যে । প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: এবাদুর রহমান । বহি পরিকল্পনা: মুসতাইন জহির । মূল্য: ২৯০ টাকা ।
…….
করেছে বাঙলায়ন। বই হাতে পেয়ে পড়তে পড়তে বছর গড়ায়। এবং পড়া মাত্র বইটি নিয়ে লিখবার তাগিদ অনুভব করি। তাগিদটা খানিক এসেছে ওঁর দুর্দান্ত ভাষা ব্যবহার দেখে — সেই ভাষার ছত্রে ছত্রে ওর ‘নিজ’-বিনির্মাণ প্রক্রিয়া দেখে। প্রক্রিয়াটার কামিয়াবি বা নাকামিয়াবি বিচার করা আমার লক্ষ্য নয়। এমনকি আমার ইরাদা এবাদের কাজের সাহিত্যগুণ বিচার করাও নয়। বরং আমার বাসনা বইটি যে সামাজিক-ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে সেটা নিয়ে দু’চার কথা বলা। এবাদ-ভাষা রাজ্যে প্রবেশ করা। আরো খোলাসা করে বললে, আমার আগ্রহ বইটা যে আলোচনায় পাঠককে শামিল করতে চেয়েছে তার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করা।

ebadur-r2.jpg…….
এবাদুর রহমান
…….
এবাদের উপন্যাসের বিন্যাস ভীষণরকম কৌতূহলোদ্দীপক। বঙ্গভাষা মানচিত্রে ওঁর কাবিল অবস্থানকে ওঁ স্পষ্ট করেন বঙ্গভাষী বিখ্যাত লেখকদের তাঁর সম্পর্কে লেখা প্রশংসানামা বিজ্ঞপ্তি আকারে পাঠক-মেহফিলে পেশ করে। এবাদ পাঠককে উপন্যাসটি পড়বার সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিফ করান। এবাদ ভূমিকাতে ওঁর সময়ে, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ‘নিজ’-এর অবস্থিতি স্পষ্ট করেন — সচেতন ভাবে নিজ অবয়ব নির্মাণ করেন। ওঁর বসতি, গোত্র পরিচয়, ওঁর বেড়ে ওঠা, যাপন পদ্ধতি, রাষ্ট্র নিয়ে বোঝাপড়া প্রতিটা ব্যক্তিক অনুভূতিকে ভাষিক রাজনীতির উপাচারে রূপান্তরিত করতে সচেষ্ট হন। ভূমিকাটি মূলত ওঁর উপন্যাসে আপাত বিচ্ছিন্ন গদ্য, প্রবন্ধ এবং সাক্ষাৎকারগুলোর মূল সুর নির্ধারণ করেছে।

এবাদের উপন্যাসের মূল আখ্যানগুলো রচিত হয়েছে ঢাকাই এলিট কওমের নেটওয়ার্ক, এদের অস্তিত্বের সংকট এবং এদের যৌন সংলাপ নিয়ে। এই কওমের সম্পর্কের প্রত্নতত্ত্ব, বংশগতি পরতে পরতে উন্মোচন করতে করতে এবাদ এক নয়া সময়ের মেনিফেস্টো রচনা করেছেন। উপন্যাসের শুরুটা কোনো বিন্যাস মেনে হয়নি। ফলে ঘটনার পারম্পর্য নেই কোনো, নেই কোনো রৈখিক বিবরণী। কিছু গল্প, আত্মকথন, প্রবন্ধ, চিঠি মিলে দাস বাবু-বিবিদের খণ্ডিত এক মহাবয়ান রচনা করতে চেয়েছেন এবাদ। এই বয়ানের শুরুয়াত হয় ওঁর আত্মকথন দিয়ে। ও পাঠককে ওঁর শৈশবে নিয়ে যায়। ওঁর প্রথম ইওরোপ যাত্রা, পারিবারিক সংকট, ওর দাদুভাইর ত্রাতা হিসেবে নাযেল হওয়া, ওঁর জেঠু মনির আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে সম্পর্ক আবিষ্কারের মতো ঘটনাগুলো ক্রমাগত ঘটতে থাকে। সেকালের মনোভঙ্গি ওঁর পরবর্তী জীবনপ্রবাহের ইঙ্গিত বহন করে। এই অংশে এসে এবাদ পাঠককে উপন্যাসের পাত্রী হিসেবে প্রোথিত করতে সচেষ্ট হন। পুরো বই জুড়ে পাঠকের সঙ্গে কথোপকথনের ঢঙে একটা সিনেম্যাটিক রিয়েলিটি রচনা করতে চান লেখক।

‘দ্রুত মোশন পিকচার কার্মা’য় মূল চরিত্র নূর। নূরের পারিবারিক সংকট — বাবা-মার বিচ্ছেদ, বাবার নতুন সংসার পাতা, মায়ের পুরুষ বন্ধু ও তাদের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক নিয়ে ঘটনা ঘনীভূত হয়। নূরের বয়োসন্ধিতে যৌন অস্তিত্ব নিয়ে সংকট এবং বন্ধু নেটওয়ার্ক ঘিরে এই আখ্যানের বিস্তৃতি ঘটে। এবাদ এই আখ্যানের অংশ হিসেবে নূরের মায়ের বন্ধু তাসনিম মুর্তজার ঠিকুজি পেশ করেন। লেখক মুর্তজা সাহেবের বাবার দেশী-বিদেশী নেটওয়ার্কের গুণে মুসলিম লীগ আমলে ব্যবসায়ে ব্যাপক সুবিধা ভোগ করেছেন বলে পাঠককে জানান। পরবর্তীতে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হওয়া, সরকারি তহবিল তসরুফ করে কোটি টাকার সাম্রাজ্য স্থাপন করা ছিল সময়োচিত পদক্ষেপ। তাসনিম মুর্তজা এই সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী মাত্র। একই ভাবে এবাদ নূর ও তার বন্ধু বুশরার রাষ্ট্র্রদূত বাবা আর প্রভাবশালী মায়ের কুকীর্তির খতিয়ান পেশ করে। সমান্তরালে আমরা নূর বা ফিনির চরিত্রটাকে বেড়ে উঠতে দেখি। নিজ যৌনতা নিয়ে বিভ্রম থেকে নার্ভাস ব্রেকডাউন, মনোসমীক্ষকের চিকিৎসাধীন থাকা, নয়া সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনে নিজেকে অভ্যস্ত করা এবং পরিশেষে নূরের ফিনি হিসেবে, একজন কিশোরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ — এই অংশকে টানটান করে রেখেছে।

‘পুং-কান্নার কাফে’-তে নূর আর ফিনি আবার ফিরে আসে। নূরের খণ্ডকালীন ঢাকাই জীবন নিয়ে রচিত হয়েছে এই আখ্যান। এই কাহিনীর শুরুতে নূর আর তার বোন আমেরিকা থেকে দেশে ফেরে বাবা ও দ্বিতীয় মায়ের ঘরে। নূর আর ফিনির পরিবারের সঙ্গে, ঢাকাই বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন তথা খোদ ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের গল্পের সাথে পাঠক সম্পৃক্ত হন। নূরের প্রগাঢ় অনুভূতিমালা নিয়ে পৌরুষের এক অদ্ভুত যাত্রাপথ রচনা করেছেন এবাদ। পরিবার বা বন্ধুত্ব নিয়ে সে যেমন উদাসীন, ঠিক ততটাই ত্রস্ত এবং স্থানবিশেষে ভঙ্গুর প্রেমানুভূতি নিয়ে, ছোটমায়ের প্রতি মমত্ব নিয়ে। কাহিনীর কাল এগিয়ে যায় কয়েক বছর। নূরের দ্বিতীয় মার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ ভীষণ বিষণ্ন আবহ তৈরি করে। নিজের এবং পরিজনদের নানা ঘটনায় উদ্ভূত অনুভূতিমালা সামাল দিতে দিতে নূরের কান্নাগুলো জমে এক গাঢ় নৈর্লিপ্তির জন্ম দেয়।

ন্যান গোল্ডিনকে নিয়ে এবাদের প্রবন্ধটি ছাপা হয় প্রথমে কাউন্টার ফটো পত্রিকায়। প্রবন্ধটি এক কথায় অনবদ্য। রচনাটিতে ন্যানের আলোকচিত্রী সত্তাকে উন্মোচন করতে গিয়ে ওঁর বেড়ে ওঠা, ওঁর যাপিত জীবন, ওঁর সংগ্রাম, বিশ্ববীক্ষার খতিয়ান পেশ করেন এবাদ। দেরিতে হলেও ফটোগ্রাফি নিয়ে বাংলাদেশে লেখালেখি শুরু হয়েছে। এবাদের ন্যানকে নিয়ে লেখাটা রিপ্রেজেন্টেশনের যে চলমান রাজনীতি এবং ধারাগুলো প্রচলিত আছে তার একটি শক্ত উদাহরণ। ন্যানের সংবেদী জীবন আর ওঁর ছবিতে কোনো ফাঁক ছিল না কোনো কালে। ওঁর জটিল পারিবারিক জীবন, সমকামী-ড্র্যাগকুইন-ট্রান্সভেস্টাইট-ক্রসড্রেসার-মাদকসেবী প্রমুখ সাবকালচারে নিজেকে সমর্পণ, ‘সত্য কমিউনিটি স্কুল’ আশ্রয়, বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, আন্ডারগ্রাউন্ডে জীবন্ত-কিংবদন্তী হয়ে ওঠা সকলই ওঁর অবস্থিতির অংশ। ওঁর ছবিয়াল জীবনের অনুষঙ্গ। ন্যান স্রেফ নিকটজনের সঙ্গে ওর দৈনন্দিন উদ্যাপনের কালগুলো ছবিতে ধরে রাখতে চেয়েছেন। ওঁর সমকামী, ড্র্যাগকুইন, ট্রান্সভেস্টাইট সঙ্গীকুলকেই ন্যান তার পরিবার জেনে এসেছেন। যারা সামাজিক পরিভাষায় সুস্থ নন। ফলতঃ রিপ্রেজেন্টশনের প্রচলিত ভাষাভঙ্গিকে নিজ প্রয়োজনে বদলাতেই হয়েছে ন্যানের। সমাজ, রাষ্ট্র প্রণীত সকল নিয়ম বা প্রচলিত বোধগম্য সকল সীমারেখা লঙ্ঘন করে প্রতিইতিহাস রচনা করেছেন তিনি। ন্যানের ছবিকে উছিলা করে এবাদ নয়া বিপ্লবের পাল্টা আধিপত্যের ভাষা খুঁজতে সচেষ্ট হয়েছেন মিশেল ফুকো, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, র‌্যলা বার্থ, সুস্যান সনট্যাগ এবং বদ্রিলার্ডের তত্ত্বে। এবং নিজের পর্নোগ্রাফি নিয়ে এ্যনার্কো-লিবার্টাইন অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

‘ডেজা-লু’ নানা ঘটনার কোলাজ। এবাদের বন্ধু এবং সম্পর্কিতদের ডায়েরি, চিঠি থেকে এই আখ্যান রচিত। মূলতঃ বয়ঃসন্ধিকালের তাদের নিয়ত পরিবর্তিত মনোজগতের, দৈনন্দিন কারনামা। তাদের সম্পর্ক ভাবনা, টানা বিষণ্নতা আর ইফ্ফাতের ‘মোরা মোরা টাউনশিপে’র নানা পার্টির গল্প। এর পরের অংশে এবাদের বড়বেলার সাহিত্য-বন্ধু, ওঁর বাবা, সোহা, মুনা প্রমুখের সঙ্গে চিঠি যোগাযোগগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এই যোগাযোগগুলোতে এবাদ পাঠককে খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে তার লেখালেখি নিয়ে মনোভাবের হদিস দেন। নানা যোগাযোগের মধ্যে কর্নেল শওকত মোমিন খান মজলিশ এবং তার প্রতিবন্ধী পুত্রের নার্স মিনতি গোমেজের সঙ্গে যোগাযোগ তুলে ধরা হয়। এ যোগাযোগে কর্নেল শওকতের নার্স মিনতির প্রতি নির্ভরতা, তার বৈচিত্র্যময় যৌন প্রবণতাসমূহ মূর্ত হয়। এমনকি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নৈকট্য এবং নেপথ্যে রাষ্ট্র্রের গুপ্তচর হিসেবে দায়িত্ব পালনের মত গূঢ় তথ্য এই চিঠিগুলো থেকে বেরিয়ে আসে।

পুস্তক সমালোচনা ‘ক্যাবারে ভলটেয়ার’-এ ইতোপূর্বে প্রকাশিত ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদের আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের যাত্রা বইটির সমালোচনা করেছেন এবাদ। বইটা যে অহেতু মিডিয়ার সুনজর লাভ করেছে এবাদ সেটা তার আলোচনায় নিশ্চিত করেছেন। এবং নির্মমভাবে বইটির পোস্টমর্টেম করেছেন। বইটি আর যাই হোক এবাদের ভাষ্য অনুসারে বাংলা সাহিত্যে নতুন কিছু সংযোজনে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই বিবেচনার পরে ডাডা আন্দোলনের পূণ্যভূমি ক্যাবারে ভলটেয়ার নামে এই পুস্তক সমালোচনার নামকরণের শানেনযুল বোধগম্য হয় না।

গল্প ‘হো নীল ঘোড়েকা আসোয়ার’ দৈনিক প্রথম আলোতে ছাপা হয়। এই গল্পের মূল চরিত্র সোহা হাদিদ এবং তার বৈচিত্র্যময় যৌনভাবনা। এবাদের অন্যান্য গল্পের চরিত্রগুলোর মতো সোহার বেড়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কে পাঠক ওয়াকিফ হন। ওর যৌনতার মেনিফেস্টো, প্রগাঢ় কামনা-রাজ্যে সম্রাজ্ঞীর মতো অধিষ্ঠান, প্রত্যাখ্যান-লাঞ্ছনার অভিজ্ঞতা এই স্পর্শকাতর আখ্যানের উৎস। সোহার আটপৌরে জীবনের সঙ্গে সংযুক্তি-বিযুক্তি এবং কামনার টানে সেই নিপীড়নকারীর কাছেই ফিরে যাবার জটিল আবর্তন এবাদের ভাবনায় নয়া মোড় দেয়। এবাদ যোনি-শিশ্ন ইতিহাস নিয়ে বরাবর মনোযোগী। সকল দুবিধা ত্যাগ করে যখন মানব দ্বৈরথে লিপ্ত হয়, সেই স্ফূরণের আভায় জগৎকে দেখতে চেয়েছেন লেখক। ফলে সোহার যাপন পদ্ধতির প্রতি লেখকের আস্থা অটুট থাকে।

‘ভ্যানিলা কৌমের স্মৃতি’তে নূর চরিত্রটি আবার ফিরে আসে। গল্পটা নূর, নূরের সখী ফাইজুন ও তার পার্টনার মুনাব্বরকে নিয়ে শুরু হয়। এটি নূরের প্রতি ফাইজুন প্রগাঢ় কামনার আখ্যান, যা মুনাব্বরকে ছাড়া পূর্ণ হয় না। নূরের সঙ্গে ফাইজুনের শেষ সাক্ষাৎ দিয়ে গল্প শুরু, সেখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ফাইজুনের মৃত্যুর পরে মুনাব্বার এবং নূরের অদ্ভুত এক যৌথতা শুরু হয়। মুনাব্বারের গাড়িতে ওদের এ্যাকসিডেন্টটা ঘটে। ফ্ল্যাশব্যাকে পাঠক নূরের ডারিয়ার প্রতি আকর্ষণ, ওর প্রস্তাবে ন্যুড মডেল হওয়া, S&M যজ্ঞে মুনাব্বার সমেত নিজেকে সমর্পণের মতন সুর‌্যরিয়াল কাহিনীর অংশ হয়ে ওঠে। ফাইজুনের মৃত্যুর পরে নূরের লন্ডন ভ্রমনের টিকেট প্রাপ্তি, সাস-ফিতে ডারিয়ার সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতা ও প্রস্তুতি, ফোনে নূরের নিজ এ্যাকসিডেন্টের সংবাদ জানার মতো ঘটনাবলীর মাধ্যমে এবাদ স্থান এবং কালের একরৈখিকতা ভেঙে অদ্ভুত অনুভব-বাস্তবতা রচনা করেছেন। একদম আচমকা ফিনির কিছু ডায়েরির পাতা এই কাহিনীতে জুড়ে দেয়া হয়েছে, যা কাহিনীর গতিকে ব্যাহত করেছে।

অদিতি ফাল্গুনীর লেখা নিয়ে উচ্ছ্বসিত রিভিউ করেছেন এবাদ। এডওয়ার্ড সাঈদ এবং ইকবাল আহমেদের উপরে একটি প্রবন্ধ এতে সংযোজিত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে ভারতী মুখার্জি, পি জোনস্রে সঙ্গে এবাদের সাক্ষাৎকার। অদিতি ফাল্গুনীর নেয়া এবাদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা: নাখোজাবাদের নোম্যাডোলজি বা যাযাবর-তত্ত্ব’ নিয়ে খানিক না বললেই নয়। এই সাক্ষাৎকারে এবাদ নতুন ভাষা-ভূগোল-দর্শন হাজির করেছেন। পুরাতন ভাষা যা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত/নির্র্দেশিত তা ভেঙে বেরিয়ে নয়া বাস্তবতা রচনার খোয়াব দেখেছেন এবাদ। নতুন ভাবধারার রচয়িতাগণ নতুন ভাষায় যাপনের রাজনীতিকে মূর্ত করবেন এবং মতাদর্শিক নেতৃত্ব দেবেন –এই এবাদের কাঙ্ক্ষা। এই কাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এবাদ বিপ্লবীদের মাঝে নিরন্তর সঙ্গী খুঁজেছেন। পূর্ব বাঙলার ভাষা জগতের সম্ভাব্য সঙ্গীদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাগুলোকে তিনি সংকলিত করেছেন।

এপিলোগে এবাদ তাঁর সকল প্রিয়পাত্রদের পুনরায় হাজির করেছেন। আখ্যানের শুরুয়াত হয় এবাদ এবং বেরেনিসের বিয়ের দিন থেকে। ক্রমে কাহিনী জট পাকাতে শুরু করে। পাঠক ফ্ল্যাশব্যাকে বেরেনিসের সঙ্গে এবাদের জাপানে বসতকাল, তারও আগে আটলান্টিকের তীরে নূর, তনুকা, শফি, বেরেনিস সমেত কাটানো কাল, তারো আগে এবাদের বুশরার সাথে প্রথম দ্বৈরথের স্মৃতি রোমন্থন করতে দেখে। এবাদের মায়ের অসুস্থতা, মধুচন্দ্রিমায় বালিতে এবাদকে ফেলে বেরেনিসের একা প্যারিস যাত্রা বায়োস্কোপের মত ঘটতে থাকে। প্যারিসে এয়ারপোর্টে বোমা বিস্ফোরণ ডেজা-ভুর মতো ফিরে ফিরে আসে। বেরেনিসকে প্রথম চুম্বন এঁকে দিয়ে এবাদ এপিলোগ শেষ করেন।

এবাদের উপন্যাসের চরিত্রগুলো ম্যরাল শাসিত নয় বলেই এদের আমরা বেড়ে উঠতে দেখি মুক্ত বাতাবরণে। এদের বেড়ে ওঠার কাহিনীগুলোর অবধারিত অংশ হয়ে আসে আপাতঃ অপ্রয়োজনীয় স্কুলের গল্প, পার্টির গল্প। একদম হালকা চালে চরিত্রগুলোর বুননের পরতে পরতে উঠে আসে যৌন অস্তিত্ব নিয়ে তীব্র সংকট, সংসারে ভাঙন, শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌনতা উদ্যাপনের মতো জটিল প্রসঙ্গসমূহ। জীবন যাপনের উচ্ছ্বাস আর প্রগাঢ়তাকে ছুঁতে গিয়ে এবাদ পাঠককে দাঁড় করান এক অপ্রিয় রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতায়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবাদ পাঠককে তাঁর কওমের পূর্বসূরীদের এবং সমসাময়িকদের সঙ্গে মুলাকাতের বন্দোবস্ত করেন। এদের সম্পদ, সম্পত্তি, সম্পর্কের নেটওয়ার্ক আর মিথোজীবিতার খতিয়ান নাঙ্গা করেন — রাজনীতিতে এদের গতায়াত স্পষ্ট করেন।

আমার আগ্রহের জায়গা মূলত এবাদ-বর্ণিত গোত্রের খতিয়ান এবং এদের কসমোপলিটান অস্তিত্ব। গত তিরিশ বছরে ঢাকাই সম্পন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ, এলিটিকরণ প্রক্রিয়া, দেশে-বিদেশে এদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ, যাপনে কসমোপলিটান কাক্সক্ষা এবাদ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। বলা বাহুল্য নয় যে ক্ষেত্রবিশেষে লেখকের আগ্রহ যাপনের অনুষঙ্গগুলোর অনুপুঙ্খ বিবরণী তৈরি করা। দাস ক্যাপিটালে দাসবাবু-বিবিদের ব্র্যান্ড দাসত্ব জাহির করা। উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের রিপ্রেজেন্টশনে কসমোপলিটান গুণপনা সমুন্নত রাখা এই উপন্যাসে লেখকের অন্যতম শক্তির জায়গা। সম্ভবতঃ একারণেই চরিত্রগুলোকে বড় অপ্রোথিত লাগে। বাঙ্গাল পাঠকের জন্য হার্মেসের স্কার্ফ, মালোনো ব্লাহনিক হিল, প্রাদা স্যুট এক নয়া ভোগজগতের ইত্তেলা দেয় যা বঙ্গদেশে শুধু অধরাই নয়, অসম্ভবই বটে। এই জবানি একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববীক্ষার (আমি যাকে কসমোপলিটান বীক্ষা বলছি) গ্রাহক হলেই কেবল বোধগম্য হওয়া সম্ভব। স্থানবিশেষে কিছু বিবরণী ভীষণ পৌনঃপুনিক লাগে এবং তাতে, অবাক নয় যে, বইয়ের বপুও অহেতু বিশাল মনে হয় (৩৭৬ পৃষ্ঠা)।

এবাদ উপন্যাসে শরীর, যৌনতা নিয়ে নানা মত হাজির করেছেন। লেখক নিজ কওমের বর্ণিল একই সঙ্গে ভীষণ ভারি যৌন প্রবণতাগুলো উন্মোচনে ব্রতী হয়েছেন। ক্ষমতার নয়া ভরকেন্দ্র খুঁজতে বারবার এবাদ শরীরী অনুভবে সওয়ার হয়েছেন। ওঁর ভাষায় “সুরম্য ও হিংস্র যাপন ও সেই যাপন থেইকা উইঠা আসা মণীষা”য় ওর ‘পক্ষপাত’, ‘আকর্ষণ’ এবং ‘প্রেম’ আছে (এবাদ ২০০৬: পৃ ২১০ দেখুন)। কিন্তু নিজ কওমের কাঠামোতে সীমাহীন যৌন নিপীড়নের যে ইতিহাস সেটা ওঁর উদযাপনের ভাষার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। লেখক নয়া সমাজের যে খোয়াব দেখেন সেখানে যেন ধরেই নেয়া হয় প্রতিটা বাসিন্দার এজেন্সি আছে এবং তাদের ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আছে। শরীরী প্রজ্ঞার ভাষা তাদের অধিগত। কেবল এই ভাষাকে বিপ্লবের ভাষায় এরা অনুদিত করলেই কেল্লা ফতেহ্ হবে।

ওঁর বিবরণী ভীষণ সাবজেক্টিভ, ফলতঃ স্বশ্রেণী ইতিহাস রচনায় ওঁর উপন্যাস বঙ্গভাষা-ভূগোলে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এটুকু বলা জরুরি ওর জবানিতে যে মেনিফেস্টো এবাদ রচনা করেছেন তাতে পাঠকের ভুল বোঝাবুঝির অজস্র পকেট রয়েছে। ভাষা বাস্তবতা নির্মাণের রসদ তা নিয়ে আমার এবাদের সঙ্গে কোনো বিবাদ নেই। সমাজ বদলের জন্য ভাষা বদল জরুরি — এ কথা আমার মতো আনাড়িও বোঝে। ভাষার সয়ম্ভূ কোনো সত্তা বা সজ্ঞা নাই, ফলে নয়া যাপনের ভাষাই যে সমাজ বদলের ভাষা হবে সেটাও বোধগম্য। কিন্তু এসকল কথায় যা বোধগম্য হয় না তা হলো এবাদ কাদের যাপন নিয়ে বলছেন। আমজনতার যাপন নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নাই সেটা নিশ্চিত। যদি এবাদ বর্ণিত ‘যাপন’ খাস জনতার হয় তাহলে ওর মনজিল এবং ইরাদা দুই পাক্কা। এবাদ তাহলে সুনির্দিষ্ট রুচিসম্পন্ন নিজ কওম-বাসিন্দাদের জীবন যাপন পদ্ধতি বদলের কথা বলছেন। আমার সীমিত জ্ঞানে সেটা বেশ ভয়ঙ্কর প্রপঞ্চ। এবাদের আমজনতা এড়িয়ে ভাবনা নয়া রুচিহীন বা খ্যাত ‘অন্য’ সৃষ্টি করবে। যারা হাই-এন্ড ব্র্যান্ড নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয় বরং ব্রেড এবং বাটার ইস্যুতে আটকে গেছেন। এই ‘অন্য’রা নয়া যাপনের ভাষায় নয়া ‘সিম্বলিক ভায়োলেন্সে’র গন্ধ পেতেই পারেন (বোর্দ্যুর সরল পাঠ করলে বলা যায় ‘সিম্বলিক ভায়োলেন্স’ হলো অক্ষম শ্রেণীর প্রতি ক্ষমতাধিকারী শ্রেণীর নানা প্রকার আনদেখা নির্যাতন যা কোনো বলপ্রয়োগ ব্যাতিরেকে কায়েম থাকে — যা অদৃশ্য, অনোপলব্ধ, স্বনির্বাচিত। যা বিশ্বাস, আনুগত্য, সঙ্ঘ ভাবনা, কর্তব্য পালনের মতো কাজগুলোর মধ্য দিয়ে ব্যক্তির অভ্যাসে পরিণত হয়। বিস্তারিত জানতে পিয়ের বোর্দ্যু দি লজিক অফ প্র্যাকটিস বইটি দেখতে পাঠককে অনুরোধ জানাই)।

এবাদের যাপনের রাজনীতিতে নয়া নিপীড়নের রাস্তা উন্মুক্ত হবার আশঙ্কা আছে। ফলে নব্য রুচিবানরা, যারা মতাদর্শিক নেতৃত্বের পুরোভাগে থাকবেন তারা নতুন ধরনের অসমতা সৃষ্টির সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখছেন। সেক্ষেত্রে নয়া বিপ্লব অন্তঃশ্রেণী বিপ্লবে পরিণত হওয়াটাই কি এবাদের কাম্য?

ঢাকা, ১/১২/২০০৭

seuty@hotmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (19) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরজু — জুন ২৮, ২০০৮ @ ১২:৫৫ অপরাহ্ন

      ভালো তো! আপনাদের লেখায় এক অন্যরকম বাংলাভাষার সন্ধান পাই। ‘কওম’, ‘মনজিল’ এবং ‘ইরাদা’ রা আবার ফিরে আসছে।

      আরজু

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sayeed jubari — জুন ২৯, ২০০৮ @ ২:০৪ অপরাহ্ন

      এবাদের বিপ্লবে আমার কোনো আস্থা ছিলো না তবে লেখকের এই মন্তব্যের শেষের প্রশ্নটিকে গুরুত্বের সাথে নিতে হচ্ছে — “এবাদের যাপনের রাজনীতিতে নয়া নিপীড়নের রাস্তা উন্মুক্ত হবার আশঙ্কা আছে। ফলে নব্য রুচিবানরা, যারা মতাদর্শিক নেতৃত্বের পুরোভাগে থাকবেন তারা নতুন ধরনের অসমতা সৃষ্টির সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখছেন। সেক্ষেত্রে নয়া বিপ্লব অন্তঃশ্রেণী বিপ্লবে পরিণত হওয়াটাই কি এবাদের কাম্য?”

      বিপ্লবের চাইতে এবাদের এনার্কি তৈরির সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে হয়।

      বইটি নিয়ে যখনই যার সাথে কথা বলতে গেছি প্রায় সকলেই সবকিছু ছাপিয়ে তার ভাষাভঙ্গি নিয়ে বলেছেন এবং কেঁদেছেন বেশি। আমার অবশ্য মজাই লাগতেছিল যতক্ষণ না অতিরিক্ত “চাপ” পড়ছিল। তার এই বই বাংলাদেশে রচিত উপন্যাসের ভাষার বিশৃঙ্খলার এক নমুনা হিসাবে আমি প্রায়ই স্মরণ করি।

      sayeed jubari

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুজিব মেহদী — জুন ৩০, ২০০৮ @ ৩:৪১ অপরাহ্ন

      খিচুড়ি খাদ্য হিসেবে অনেকের কাছেই উপাদেয়, আমার কাছেও। কিন্তু প্রতিদিন খিচুড়ি খেতে হলে আমি নারাজিই প্রকাশ করব, অথচ ভাত আমি প্রতিদিনই খাই। দাস ক্যাপিটাল-এ এবাদের সমস্ত দাপট ওই খিচুড়ির আকারেই প্রকাশ পেয়েছে। মাঝে মাঝে এরকম রান্না আমি সমর্থন করি। বলতেই হবে, খিচুড়ির পরিবেশনটা মজাদার হয়েছিল, চমৎকার হয়েছে সিউতি সবুরকৃত খিচুড়িকৃতির এই মূল্যায়নপ্রয়াসও।

      ‘সমাজ বদলের জন্য ভাষা বদল জরুরি’ — কথাটা বেশ শুনি। এই লেখায়ও শুনলাম, কিন্তু এতবার শুনেও কথাটি আমার বিশেষভাবে বোধগম্য হয় না। ভাষা বদলের ভিতর দিয়ে সমাজের বদল ঘটেছে, পৃথিবীতে এরকম উদাহরণ লভ্য কি আসলে? আমার তো বরং উলটোটাকেই বাস্তব ও সত্য বলে মনে হয়, যে, সমাজই ভাষাকে তার বিকাশের অনুকূলে সাইজ করে নেয়, বদলায়। আর তাই সমাজকে বদলাবার জন্য কোনো একটি ভাষার বিশেষায়িত রূপ পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টাকে আমার কাছে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি বলে মনে হয়। বাংলাদেশ জন্ম নেবারও প্রায় তিন যুগ পর এবাদের পূর্ববঙ্গের ভাষার প্রকাশ সম্ভবত সেই দূরভিসন্ধিরই একটি প্রাক নমুনা ছিল।

      মুজিব মেহদী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানস চৌধুরী — জুলাই ১, ২০০৮ @ ২:১৩ অপরাহ্ন

      মন্তব্যগুলো আগ্রহ নিয়ে পড়লাম, লেখাটাও। এবাদুরের উপন্যাসটা আগ্রহ নিয়ে পড়া হয়নি। সেটা আমার মনোসংযোগের সমস্যা হিসেবে দেখাই ভাল।

      আরজু’র মন্তব্যে সর্বনামের ব্যবহার কৌতূহলোদ্দীপক। ‘আপনাদের’ — অনুমান করা যায় এবাদুর, সিউতি সমেত একটা বর্গ তিনি পেয়েছেন। নিশ্চয়ই আরো আছেন। এদের যদি সমবর্গ ধরে নেয়া যায় তাহলে আরজু’র অসন্তোষটাও টের পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে, মুজিব মেহদী’র অবস্থান তর্কমুখী, এবং অসন্তুষ্ট নয়। তর্কটা নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ। সাঈদ জুবেরী’র মন্তব্যের শেষভাগ থেকে মনে হলো তিনি সাহিত্য বিষয়ে শৃঙ্খলাপন্থী। মানে পিউরিটান?! এবাদুরের উপন্যাস নিয়ে হাজার কথা চলতে পারে কিন্তু তাঁর ভাষা যে নর্মশাসিত না এইটাই প্রথমে গবেষণা ছাড়াই আবিষ্কার করা যায়। কিন্তু নর্মরাজি মানতে হবে কেন?

      মুজিব মেহদী, আমার বিবেচনায়, তর্কটা যেভাবে হাজির করতে চেয়েছেন তাতে তাঁর অবস্থান ‘সাহিত্য/ভাষা সমাজের দর্পণ’ অবস্থানের সমধর্মীপ্রায়। সমাজ ও [মুদ্রণ-পুজিবাদী] ভাষার সম্পর্ককে সম্ভবত ডায়ালেক্টিক্যাল বা বিপ্রতীপতার হিসেবে দেখা জরুরি। কথ্যভাষা, এর হরেকরকম শ্রেণীবিন্যস্ততা সমেত, আবার আরেক প্রপঞ্চ।

      আমার জন্য এটা পরিতাপের থেকে গেছে যে, এবাদুর রহমান সম্পাদিত পূর্ববঙ্গের ভাষা গ্রন্থখানি, সমালোচিত হবার কালে, প্রায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই দুরভিসন্ধিতার অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। গ্রন্থখানির পদ্ধতিগত দুর্বলতার অভিযোগ পাবার কথা ছিল। স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের রাজনীতির প্রতিপক্ষতা তৈরি করতে গিয়ে গ্রন্থটি নিজে যে খোদ মানদণ্ড আরোপের উত্তেজনায় নিপতিত হয়েছে সেই মূল্যায়ন জরুরি ছিল। কল্পিত পূর্ববঙ্গ যে ভূ-রাজনৈতিক বা ভাষা-রাজনৈতিকভাবে ‘আত্ম’কে আবিষ্কার করে নাই এই উপলব্ধির পলিটিক্যাল ইকনমি যথেষ্ট তদন্ত হয় নাই এই গ্রন্থে — এই বিশ্লেষণটা কাম্য ছিল। পরিশেষে, ভূরাজনৈতিক মানচিত্রের থেকেও [লেখ্য]-ভাষার প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কার যে মুদ্রণ-পুজিবাদের মেট্রোপলিটান [ধরা যাক কোলকাতা, এবং তদীয় কয়েকটি গোষ্ঠী] শনাক্ত করার মাধ্যমে হতে হবে এই থিসিস আবশ্যক ছিল। এবাদুরের সম্পাদিত গ্রন্থটির প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রায়শ রিপালসিভ/পূর্বপ্রণোদিত বলে মনে হয় আমার।

      কিন্তু এই আলাপে সিউতি সবুর-এর গ্রন্থালোচনা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। তীক্ষ্ণ একটা পঠন পাওয়া গেল। আশা করি তিনি এধরনের পাঠ ছেড়ে দেবেন না।

      একান্ত
      মানস চৌধুরী
      >manoshchowdhury@yahoo.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সরকার আমিন — জুলাই ১, ২০০৮ @ ৭:০০ অপরাহ্ন

      আমি বইটি পড়েছি। অন্যরকম বই। মজা পেয়েছি। সাহিত্য যে কত প্রকার!

      সরকার আমিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আহসান হাবিব — জুলাই ১, ২০০৮ @ ৭:২৭ অপরাহ্ন

      এই উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে এর আগে বিস্তর লেখা হয়েছে কী দেশে, কী বিদেশে — উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, চলচ্চিত্র। অনেকের ভাবনায় শিল্প-সাহিত্যের তীর্থভূমি সেই ফরাসীদেশে চিত্রপরিচালক লুই বুনুয়েল একই ধরনের কাহিনী নিয়ে বহুকাল আগে বানিয়ে গেছেন Le Charme discret de la bourgeoisie (The Discreet Charm of the Bourgeoisie)। সেই বুনুয়েল কবেই মরে ভূত!

      আর ভাষার কথা বলছেন, আজকের দিনের লেখায় নতুনত্ব (সারবস্তু) তেমন কিছু না থাকলে লোকে একটা কথাই বলে ভাষার বিনির্মাণ। একটু প্রচলিত ভাষা থেকে অন্যরকম করে লিখলেই, কিছু আলাদা শব্দরাজি ব্যবহার করলেই সেইটা হয় নতুন ভাষার ব্যবহার, প্রচলিত ভাষারীতিকে ভেঙে ফেলা — আর কত কী!

      আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি, তাঁর গ্রন্থের নামকরণ নিয়ে। এই গ্রন্থের নামকরণ কেন ‌‌’দাস ক্যাপিটাল’ (আমি বুঝি নাই) হলো এবং এত নাম থাকতে তিনি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত গ্রন্থের নাম চুরি (আমি দুঃখিত) করলেন কেন? এইটা কি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের আরেকটি উপায়! প্রসঙ্গক্রমে আমি আগ্রহী হয়েছিলাম বইয়ের নামটি দেখেই।

      আহসান হাবিব

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sayeed jubari — জুলাই ৩, ২০০৮ @ ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন

      মানস চৌধুরী,

      এবাদুর রহমানের বই নিয়ে সিউতি সবুরের আলোচনার প্রেক্ষিতে আমি কিছু কথা তাৎক্ষণিক ভাবে বলেছিলাম, যার শেষ দিকে ছিলো : “তার এই বই বাংলাদেশে রচিত উপন্যাসের ভাষার বিশৃঙ্খলার এক নমুনা হিসাবে আমি প্রায়ই স্মরণ করি।”

      আপনার প্রতিক্রিয়ায় আমার মন্তব্যের জের টেনেছেন যেভাবে, “সাঈদ জুবেরী’র মন্তব্যের শেষভাগ থেকে মনে হলো তিনি সাহিত্য বিষয়ে শৃঙ্খলাপন্থী। মানে পিউরিটান?!” এর পর একটা প্রশ্নও রেখেছেন: (প্রশ্নটা অবশ্য আমাকে না বোধহয়) এবাদুরের উপন্যাস নিয়ে হাজার কথা চলতে পারে কিন্তু তাঁর ভাষা যে নর্মশাসিত না এইটাই প্রথমে গবেষণা ছাড়াই আবিষ্কার করা যায়। কিন্তু নর্মরাজি মানতে হবে কেন?

      এখন আমি কিন্তু কোথাও এবাদুরকে শৃঙ্খলা মানতে বলিনি বা বলতে পারিও না। আমি বাংলাদেশে রচিত (এবাদুর বা সিউতি বা আপনি একে পূবর্বাংলা ধরে এগোতে পারেন) উপন্যাসের মধ্যে ‘দাস ক্যাপিটাল’ ভাষা বিচারে যে একটি বিশেষ অবস্থানে আমার কাছে স্মরণীয় তাই বলতে চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে পিউরিটান বললেন কেন তা বুঝতে পারছি না।

      শুভেচ্ছা জানবেন,
      সাঈদ জুবেরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানস চৌধুরী — জুলাই ৩, ২০০৮ @ ৪:০২ অপরাহ্ন

      সাঈদ জুবেরী,

      আমার ভুল উপলব্ধি হয়ে থাকলে মার্জনা করবেন। শব্দপ্রয়োগে শব্দভোগের দিকনির্দেশনা তৈরি হয়। আমার বিবেচনায় শৃঙ্খলা-বিরোধী এবং বিশৃঙ্খল দুটো দুই ব্যঞ্জনার শব্দ। আপনার এবারের পত্র পড়ে মনে হচ্ছে আপনি প্রথমোক্ত অর্থে বলেছিলেন। তা হয়ে থাকলে পিউরিটান ভাবাটা আমার পক্ষে বাহুল্য হয়েছে। আমি দুঃখিত।

      একান্ত,
      মানস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস — জুলাই ৪, ২০০৮ @ ৯:০৫ অপরাহ্ন

      বইটা আমি পড়েছি…এবং আমার মনে হয়েছে এবাদুরের উপন্যাস নিয়ে হাজার কথা চলতে পারে কিন্তু তাঁর ভাষা যে কৃত্রিম উদ্দেশ্যমূলক কোষ্ঠ্যকাঠিন্যগ্রস্ত ও নর্মশাসিত এইটা প্রথমে গবেষণা ছাড়াই আবিষ্কার করা যায়…।

      কোনো কারণে যদি কারো মনে হয় যে, এবাদুরের উপন্যাস নিয়ে হাজার কথা চলতে পারে কিন্তু তাঁর ভাষা যে নর্মশাসিত না এইটাই প্রথমে গবেষণা ছাড়াই আবিষ্কার করা যায়…তাহলে ধরে নিতে হবে যে দেশের বাকি তেরো কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শো নিরানব্বই জন মানুষ (যদি দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ধরে নিই) নর্ম মেনে ব্যাকরণ মাথায় রেখে কথা বলে…কারণ আজ পর্যন্ত আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় কাউকে আলোচ্য গ্রন্থ প্রবর্তিত কৃত্রিম উদ্দেশ্যমূলক কোষ্ঠ্যকাঠিন্যগ্রস্ত ভাষায় কথা বলতে শুনিনি…

      ইন্টেলেকচ্যুয়াল রিফ্যুজি বলে একটা শব্দ আজকাল বাজারে বেশ চলছে…।

      আব্দুল কুদ্দুস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানস চৌধুরী — জুলাই ৮, ২০০৮ @ ১:৪২ অপরাহ্ন

      জনাব আব্দুল কুদ্দুস,

      সালাম নিবেন। আপনার সম্বোধনবিহীন পত্র গায়ে মাখলাম। খোলা চিঠির এই সুবিধা।

      আমার বলবার নাই কিছু। তবে অপেক্ষার আছে। আপনার বা আপনার এন্টি-কোষ্ঠকাঠিন্যপন্থী কারো কাছ থেকে “বাকি তেরো কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শো নিরানব্বই জন মানুষ” যে ভাষায় কথা কহেন (নাকি লেখেন?!) সেই ভাষায় একখানি সাহিত্যকর্ম আশা করি বরং।

      আর নাহলে সাহিত্য-ভাষা যে পরিবেশনমূলক/রেপ্রিজেন্টেশনাল এই সাধারণ তথ্যটি মানিয়া লউন/ঠাহর করুন।

      একান্ত
      মানস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — জুলাই ৯, ২০০৮ @ ১২:৫২ পূর্বাহ্ন

      এবাদুর রহমানের দাস ক্যাপিটাল ছাড়া ছাড়া ভাবে পড়া। “দাস ক্যাপিটাল” নামের এইই সুবিধা, পঠিত হবার অপেক্ষা না করেই সঞ্চারিত হতে শুরু করে, সে কার্ল মার্ক্সই হোক, বা এবাদুর রহমানই হোক! মার্ক্সের “দাস ক্যাপিটাল” এর মত এবাদের “দাস ক্যাপিটাল”ও আমাদের পাঠগম্যতা কিংবা অগম্যতার ভেতর ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়ে গেছে। বা যাচ্ছে।

      এই অগম্যতার বা নিষ্ঠাহীন পাঠের আরেকটা কারণও আছে, সেটা এবাদ হয়ত মানবেন। এই উপন্যাসটি (?) আদিতে নানান গল্প, প্রবন্ধ কিংবা রিভিউ/ইন্টারভ্যু আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। বলা যায়, এটি আসলে একটি এবাদ রচনাসমগ্র (পুস্তকটি প্রকাশের আগ পর্যন্ত এবাদ যা লিখেছেন)। এই সংকলনের লেখক ও সম্পাদক এবাদ নিজেই। এই সমুদয় লেখাকে তিনি যে একই থালায় পরিবেশন করলেন, তার পেছনে নিশ্চয়ই তাঁর নিজের গুরুতর ভাবনা আছে। এবাদের পাঠক হিসেবে আমি এই ধরনের পরিবেশনার যাথার্থ্য পাই: তাঁর সব লেখাই আসলে একটি লেখা, একটিই পটভূমি, চরিত্রগুলোর একই রকমের বিকাশ, থেমে যাওয়া। ফলে, এই সব টুকরো গল্পগুলোকে একটি বড় ন্যারেটিভ হিসেবে দেখার চেষ্টা করে এবাদ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, সন্দেহ নাই।

      বড় ন্যারেটিভের একটা বড় রকমের চাহিদা থাকে। তার ডাকে সাড়া দিতে গিয়েই এবাদকে “পুং কান্নার কাফে” থেকে বের হয়ে বাংলাদেশী এলিট শ্রেণীর বিকাশের সামাজিক ইতিহাস রচনার দায়িত্ব নিতে হয়। আর এখানেই একটি প্যারাডক্স ঘটে: এবাদ যখন এলিট শ্রেণীর চরিত্রগুলোর বিপন্নতা তুলে ধরেন তখন তাঁর বিবৃতিতে আমরা যে নিষ্ঠা ও নির্মমতা পাই, সেই এবাদই যখন সেই এলিট বলয়ে আমাদের জাতীয় সংগ্রামের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের হাজির করেন, সেখানে তিনি যেন এলিট শ্রেণীর অভিলাষ ও আত্মাভিমানের বশংবদ হয়ে থাকেন। এলিট শ্রেণীর ড্রয়িংরুম থেকেই যেন যাবতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূচনা, এমনটা মনে হতে থাকে। তখন তাঁকে বেশ এলিটিস্ট লাগে।

      সিউতি সবুর-এর রিভিউ সুন্দর ও চিন্তাশীল। ধন্যবাদ তাঁকে।

      সুমন রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Seuty Sabur — জুলাই ৯, ২০০৮ @ ১২:০৫ অপরাহ্ন

      রচনাকারী হিসেবে আমার উপর মন্তব্যের দায়িত্ব বর্তেছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমার এই সামান্য লেখাটা এবাদুর রহমানের প্রতি নানান জনের অভিব্যক্তি প্রকাশের উছিলা হয়েছে। এই অভিব্যক্তি নিয়ে আমার আর কীইবা বলার থাকতে পারে! আমার লেখা নিয়ে আমি সামান্যই প্রতিক্রিয়া পেয়েছি বলে আমার ধারণা।

      তাছাড়া এবাদুর রহমানের গ্রন্থখানাকে আমি কীভাবে দেখি সেটা নিয়ে তো আবার বলার মানে হয় না।

      তবে দুটো বিষয়ে আমার বলবার আছে। প্রথমটা হলো জনাব মুজিব মেহদী উত্থাপিত ভাষা/সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক বিষয়ে জিজ্ঞাসা। মানস ইতোমধ্যেই এদের সম্পর্ককে ডায়ালেক্টিকভাবে দেখবার প্রস্তাব করেছেন। দ্বন্দ্বমূলকভাবে দেখলে বিষয়টা আর এরকম সরল শর্তেরও থাকে না। বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করি, এ বিষয়ে আলাপ কিংবা লেখালেখি জারি থাকলে আমার নিজের উপকার হবে।

      দ্বিতীয়টি হচ্ছে জনাব আহসান হাবিব-এর মন্তব্য নিয়ে। এবাদুর রহমানের লেখা নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন যাই হোক কথা হচ্ছে একটা ধাঁচের সুলভতা নিয়ে। ইউরোপে কিংবা অন্যত্র স্বশ্রেণী/ঊর্ধ্বতন-সংস্কৃতি নিয়ে তদন্তমূলক যাই কাজ (কাহিনী বা কাহিনীচিত্র) হয়ে থাকুক না কেন, “দেশে” এরকম কাজ যে অনেক হয়েছে সেই বার্তা আমার অভিজ্ঞতা অনুমোদন করে না। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে জনাব হাবিব যা বলছেন তাকে আমার নিছকই একটা ভঙ্গি মনে হয়েছে। ‘আজকের দিন’, ‘প্রচলিত ভাষা’, ‘অন্যরকম করে লেখা’, ‘কিছু আলাদা শব্দরাজি’ — এসব কথা থেকে বড়জোর বোঝা যায় যে এবাদুর রহমানের ‘গৌণ’ কাজটাকে আমি খামকাই মনোযোগ দিয়েছি। আমার বলবার আছে এটুকুই যে কারো ভঙ্গি সামাল দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি বড়জোর এবাদুরের বইটা পাঠ করেছি এবং আমার পঠন হাজির করার চেষ্টা করেছি। কারো যদি মনে হয় তাঁর বাক্যবিন্যাস এবং অভিব্যক্তি গড়পরতা ধরনের তাহলে সেটা নিয়ে তর্ক করার ফায়দা নেই। যে কোনো সাংস্কৃতিক উৎপাদকেই আমি বড়জোর রাজনৈতিকভাবে দেখতে আগ্রহী — পক্ষের মনে করলেও, বিপক্ষের মনে করলেও। বইটার নামকরণ নিয়েও আমার কোনো সমস্যা নেই। চুরি কথাটা একটু বাহুল্য মনে হয়। আমার ধারণা এসবের থেকে আরও জরুরি বিষয়বস্তু আমি আবিষ্কার করেছি বইটা নিয়ে।

      সবাইকে ধন্যবাদ।

      সিউতি সবুর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস — জুলাই ৯, ২০০৮ @ ৪:০৫ অপরাহ্ন

      শ্রদ্ধেয় মানস চৌধুরী,

      ১।
      সূর্য যে পশ্চিম দিকে ওঠে না, এটা নতুন করে প্রমাণের কিছু নাই…বা আরেকবার পরীক্ষা হোক ভেবে কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করারও কিছু নেই…আর তাই, যদি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে অতীতের দিকে তাকাই, তাহলে, সাম্প্রতিককালের চিলেকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামা বাদেও আরো অনেক স্বাভাবিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যরহিত সাহিত্যের উদাহরণ আমরা পাবো…।

      ২।
      “সাহিত্য-ভাষা পরিবেশনমূলক/রেপ্রিজেন্টেশনাল”

      ধন্যবাদ। আমিও তাই মনে করি। চিলেকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামা বাদেও আরো অনেক স্বাভাবিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যরহিত সাহিত্য রচনার সময়ও বিষয়টাকে মাথায় রাখা হয়েছিলো বলে আমার ধারণা…।

      বিনীত শুভকামনাসহ
      মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানস চৌধুরী — জুলাই ১০, ২০০৮ @ ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

      জনাব মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস,

      চিলেকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামা উপন্যাসদ্বয় (কিংবা আরো কিছু) গুরুত্ব না দিতে পারার আমার পক্ষে কোনো কারণ নেই। কিন্তু এখানে প্রসঙ্গ আসলে ভিন্ন জায়গায় গেছে। এবাদুরের বইটিকে আপনি বা আমি যে স্থানেই রাখতে চাই না কেন, সেই শর্ত নিরপেক্ষভাবেই, এখানে অন্তত দুটো জিজ্ঞাসার জায়গা আমি দেখতে পাই। এক, উত্তরকালে যে উচ্ছ্বাস নিয়েই এই উপন্যাস দুটোর দিকে মনোপাত করা হোক না কেন, সমকালে এদুটো, বিশেষত চিলেকোঠার সেপাই-এর ভাষা বিশেষ আদৃত প্রকাশভঙ্গি ছিল না। দুই, সত্য বটে যে কথিত কোষ্ঠকাঠিন্যময়তা আর অনাদৃত হওয়া এক কথা নয়। কিন্তু প্রশ্নটাকে আপনি নিয়ে গেছিলেন মানুষজন ওই ভাষায় কথা বলে কিনা সেখানে। কিসসাকাহিনীতে মানুষজনের “বাস্তব” ভাষা হিসেবে যা পরিবেশিত হয় তা কি আসলে বাস্তব, নাকি হবার প্রয়োজন আছে? সংলাপের বাস্তবমুখীনতার আকাঙ্ক্ষা, আমার বিবেচনায়, খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তেমনি ‘কোষ্ঠকাঠিন্যের’ অভিযোগও এমন এক অভিযোগ যা কাল থেকে কালে অনায়াসে সকল ক্ষেত্রে সংবহিত হয় না।

      আমি মনে করি যে কোনো রচনারই ভাষাভঙ্গি/স্বর/মেজাজ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে; কিন্তু যখন তা সারবস্তুর সঙ্গে সংমিশ্রিত না-হয়ে ঘটে, তখন পরিশেষে ক্ষতিটা লেখকের থেকে পাঠকের একটুও কম হয় না।

      শুভেচ্ছা জানবেন।

      মানস চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস — জুলাই ১০, ২০০৮ @ ৫:৫৫ পূর্বাহ্ন

      শ্রদ্ধেয় মানস চৌধুরী,

      “কিন্তু যখন তা সারবস্তুর সঙ্গে সংমিশ্রিত না-হয়ে ঘটে, তখন পরিশেষে ক্ষতিটা লেখকের থেকে পাঠকের একটুও কম হয় না।”

      ধন্যবাদ। আমিও তাই মনে করি। “বাংলা ভাষা খতনাকরণ প্রকল্প” ৫০র দশকেই নাকামিয়াবি…আর এটা তো ২০০৮…।

      বিনীত শুভকামনাসহ
      মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানস চৌধুরী — জুলাই ১০, ২০০৮ @ ৯:৪১ অপরাহ্ন

      জনাব মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস,

      অভিযোগ তাইলে ‘কোষ্ঠকাঠিন্যে’র থাকল, নাকি ‘খৎনাকরণে’র এসে ঠেকল? …৫০ দশক ধরে বলায় আমি খানিক বুঝতে পারছি। শব্দভাণ্ডার ভাষার সচল জীবনের একটা সাধারণ দিক মাত্র। কিছু পারসিক, আরবীয় শব্দে এত অনুভূতিপ্রবণ হয়ে পড়বার কিছু নেই।

      শুভেচ্ছান্তে –
      মানস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস — জুলাই ১১, ২০০৮ @ ৩:৪১ অপরাহ্ন

      শ্রদ্ধেয় মানস চৌধুরী,
      …তাই বলে বহুকাল আগেই মীমাংসীত/পরিত্যক্ত শব্দসমূহ যদি পুনরায় কবর থেকে দেশী-বিদেশী মুরুব্বিপরিবেষ্টিত হয়ে দল বেধে প্রসঙ্গ-বহির্ভূতবভাবে উঠে এসে করমর্দনের জন্য সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দ্যায়; তাতে ঘাবড়ে না যাওয়ার জন্য যতটা স্মার্ট হতে হয়, ততটা স্মার্ট আমি না…এ সীমাবদ্ধতাটুকুকে ক্ষমা-সুন্দর চোখে দেখবেন বলে বিশ্বাস রাখি…

      গুনমুগ্ধ
      মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ — জুলাই ১৮, ২০০৮ @ ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

      সিউতি সবুরের গ্রন্থালোচনা পড়লাম আর মুগ্ধ হইলাম।এ নিয়া আমার বলবার তেমন কিছু নাই।

      শুধু, মনে হয় তিনি তাঁর যেসকল মত ব্যক্ত করছেন লেখাটায়, তাদের আরেকটু খোলসা করতে পারতেন, আর এবাদের গল্পগুলির কাহিনির সারসংক্ষেপও এড়াইতে পারতেন।

      একেবারে শেষে উনি এবাদরে কিছু প্রশ্ন করছেন, যেদ্দূর বুঝছি তাতে মনে হইছে প্রশ্নগুলা গুরুত্বপূর্ণ আর এবাদ চাইলে তাদের জবাব দিতে পারেন। পুরাদূর অবশ্য বুঝি নাই, আমার ভাষাজ্ঞানের অভাববশত। তবে আমি অবাক হইলাম এই রচনা বিষয়ে নানা মুনির নানা অমত দেইখা। কেউ সিউতির লেখা নিয়া কিছু না বইলা এবাদরে নিয়াই কইল কেবল
      তাইলে সিউতির এত বড় লেখা লেখনের দরকারটা কী আছিল? উনি তো ধরেন এক লাইনে লিখতে পারতেন “আপনেরা এবাদের দাস ক্যাপিটাল নিয়া যত জ্ঞান আর চিন্তা আছে ঝাড়েন”।

      আমার মনে আছে এবাদের বইটার একটা আলোচনা সাজ্জাদ শরিফ করছিলেন প্রথম আলোয়, ঐ লেখাটা একটা অবশ্যপশ্য লেখা। তাতে আমার নিজের, এই বই বাবদে যা বলবার তার অধিকাংশ বলা হইয়া যাওয়াতে আমি আর কিছুই কই নাই। তবে এবাদ প্রিয় লেখক, প্রিয় মানুষ, তার বিষয়ে শুনতে ভালো লাগে, বলতে না লাগলেও।

      সাহিত্যে স্টান্ট কোনো দোষ না, যদি স্টান্টম্যান পোক্ত হয়, এবাদ বেশ পোক্ত স্টান্ট, তয় মাঝেমাঝে আত্মবিস্মৃত হয় বইলা মনে লাগে, কোথা থিকা কোথায় লাফ দিতেছে ভুইলা যায় এমন লাগে।

      তার নিজের সমাজের শেষতক সমালোচনা করল নাকি তারে সমালোচনার ছলে একটা গৌরবের আসনই দিবার চেষ্টা করল তা এবাদরে খোদ না জিগাইয়া আমার বোঝার উপায় নাই। অলঙ্কার শাস্ত্রে ব্যাজস্তুতি বইলা একটা জিনিস আছে। তয় বাংলা সাহিত্যে জমিদারবাদ মারা গিয়া বাংলা গপ্প উপন্যাস মধ্যিবত্তগোর একচ্ছত্র কান্দনকাননের কর্দমাক্ত প্রান্তর হইয়া যে গেছিল তার প্রতি বিরপ্ত এবাদুর আমাদের আবার উচ্চবিত্তের কাহিনি শুনাইয়া বাঁচানের চেষ্টা করছেন, সাধু এই চেষ্টা, এবং স্বাদু।

      তাঁর ভাষা আমার প্রিয়, তার বড়লোক বর্ণনা, তার বিদেশ বর্ণনা, তার সমাজ ভাবনা, বিপ্লব ভাবনা, চায়ের কাপে সিডর, সকলই আমার প্রিয়।

      এবাদ না লিখলে আমার এইসব দেখা হইত না, এই-ভাবে ভাবা জানা হইত না, এইরূপে বলা, চলা, ঢলাঢলি, এমন তুখোড় আত্মপরনির্বিশেষরতি (ইয়াম ইয়াম), এই সব।

      তবে এবাদের লেখা শিল্পপদবাচ্য কীনা, বা কতখানি তা, তা আমি নির্ধারণ করতে পারি নাই, এবং, এবাদ, কষ্ট নিয়েন না, নিজের লেখার ক্ষেত্রেও এতদবধি একই অপারগতা আমার।

      বিনীত
      সুব্রত

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com