সাক্ষাৎকার

মোহাম্মদ রফিক: আমার কাছে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অসম্পূর্ণ উপন্যাস মনে হয়

রাজু আলাউদ্দিন | 23 Oct , 2018  


বাংলাদেশের অগ্রগন্য কবি মোহাম্মদ রফিকের এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল ২০১৫ সালে তার উত্তরার বাসায়। ১৯৪৩ সালে বাগেরহাটে জন্ম নেয়া কবি মোহাম্মদ রফিকের আত্মপ্রকাশ ১৯৬০-এর দশকে। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন ও কবিতায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে ২০০৯-এ অবসর নিয়েছেন । ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: বৈশাখী পূর্ণিমা (১৯৭০), ধুলোর সংসারে এই মাটি (১৯৭৬), কীর্তিনাশা (১৯৭৯), খোলা কবিতা (১৯৮৩), কপিলা (১৯৮৩), গাওদিয়া (১৯৮৬), স্বদেশী নিশ্বাস তুমিময় (১৯৮৮),মেঘে ও কাদায় (১৯৯১)
এবং নির্বাচিত কবিতা (১৯৯৩)। উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের বই: স্মৃতি বিস্মৃতি অন্তরাল (২০০২), ভালবাসার জীবনানন্দ (২০০৩), দূরের দেশ নয় আয়ওয়া (২০০৩), খুচরো গদ্য ছেঁড়া কথা (২০০৭) এবং আত্মরক্ষার প্রতিবেদন (২০১৫)।
কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে কবি মোহাম্মদ রফিকের এই ভিডিও আলাপচারিতার শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহসান। ইতিপূর্বে অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের মাধ্যমে কবিকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। বি. স.

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন : বহুদিন পর আপনার একটা প্রবন্ধের বই বেরুল।
মোহাম্মদ রফিক : প্রবন্ধ ঠিক বলা যাবে না। এটা গদ্যের বই।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এ এটাকে গদ্যের বই বলা উচিৎ। সাধারণত আমাদের এখানে একটা থিমেটিক ইউনিটি বজায় রেখে সেইগুলোকে একসঙ্গে করে, তারপরে একটা প্রবন্ধের বই বের করে। আপনার এই বই তো সেইরকম না, এটা একদম আলাদা। এটা একেবারে একটা ক্রনোলজিক্যাল ইতিহাস, তার সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট–এইগুলো মিলিয়ে আপনি এই বইটা তৈরি করেছেন। এই রকমভাবে তৈরি করার প্রয়োজন মনে করলেন কেন? আপনি তো ঠিক এই ধরনের লেখা আগে কখনো লেখেননি। সবসময় দেখা গেছে যে, বিভিন্ন সময় টুকরো-টাকরা লেখা কিংবা কোনো বিদেশি কবির সম্পর্কে, দেশ সম্পর্কে…।
মোহাম্মদ রফিক : না, তুমি মনে হয় জানো না, তুমি যখন বিদেশে ছিলে আত্মরক্ষার প্রতিবেদন হিসেবে আরেকটা বই বেরিয়েছে। তখন আমি বিংশ শতাব্দীর ইস্ট ইউরোপিয়ান কবিদের নিয়ে আলোচনা করেছি সেখানে। আমার ইচ্ছে ছিল, সারা পৃথিবীর কবিতার অবস্থা কি সেটা তুলে আনা। যাই হোক, সময় বা সুযোগের কারণে আমি সেটা পারিনি। কিন্তু ল্যাটিন অ্যামেরিকার প্রতি আমার একটা ভালোবাসা প্রায় বিশ বছর আগে থেকেই এসেছিল।

রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এটা তো আমাদের লেখালেখির জীবনের শুরু থেকে এই বিষয়টা আমরা জানতাম।
মোহাম্মদ রফিক : ইতিহাস, সমাজ এ বিষয়ক তত্ত্বগুলো আমি পড়েছি। আমি জানতে চেষ্টা করেছি, আসলে ল্যাটিন অ্যামেরিকা সাংস্কৃতিক সত্যটা কী? এবং আত্মাটা কোথা থেকে বিকশিত হয়েছে? আমাকে অনেক খুঁজতে হয়েছে এবং পরে আমি যখন আইওয়াতে গেলাম ওইখানে আমার অনেক সুবিধা হয়েছে, আমি অনেক বইয়ের খোঁজ পেয়েছি এবং সেগুলো যোগাড় করতে পেরেছি। যেমন ধরো, এখান থেকে তো আমি হোসে মার্তির কবিতার বই যোগাড় করতে পারতাম না। কিন্তু আমি আইওয়াতে গিয়ে পেয়েছি। এই রকম আরকি! তারপরে আমি ভাবলাম যে ব্যাপারটা এইভাবে দেখা যাক। তারপরে আমি ধর সোর হুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুস। তার খবর আমি আগে থেকেই জানতাম। (অক্তাবিও পাসের তো একটা বড় কাজ আছে সোর হুয়ানার ওপরে—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, সেই বইটাও আমি পড়েছি। আবার আইওয়াতে একটা মেয়ের সাথে, মেহিকান মেয়ের সাথে আলাপ হয়, তার নাম ছিল রোসালভা। সে পিএইচডি করছিল সোর হুয়ানার ওপর। আমি যখন বললাম সোর হুয়ানার নাম, সে খুব অবাক হয়ে গেল যে, বাংলাদেশের একজন লোক সোর হুয়ানার নাম জানে! তারপরে তার সঙ্গে আমার একধরনের বন্ধুত্ব হয় এবং তার কাছ থেকে আমি অনেক খবরাখবর পেয়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন : সোর হুয়ানা কিন্তু অনেক পপুলার, জানেন তো? লাতিন আমেরিকাতে পপুলার এবং এমনকি ওর কিছু কিছু কবিতার অংশ এতটাই পপুলার যে যারা এই কবিতাগুলো জানে বা উচ্চারণ করে তারা হয়তো জানেন না এটা তারই লেখা। যেমন একটা লেখা আছে—‘Hombres necios que acusai a la mujer…’, মানে “গোঁয়াড় যে-পুরুষের নারীদের অভিযুক্ত করে…, এই রকমভাবে শুরু হয়েছে আরকি। অনেক মেক্সিকান সাধারণ মানুষে জানে কবিতাটার কথা কিন্তু জানে না এটা কার লেখা, এই রকম লোক আছে।
মোহাম্মদ রফিক : তো সেই রোসালভা, আমি আসার সময় তার চয়েস মতো ল্যাতিন অ্যামেরিকান সংগীতের একটা কালেকশন করে দিয়েছিল, সেটা আমার হারিয়ে গেছে কালের পরিক্রমায়। পাসের বইটাও আমায় সাহায্য করেছে, অন্যান্য বই পড়েছি। যাই হোক, এইভাবে আস্তে আস্তে ধরো আর্জেন্টিনার অবস্থটা কী, জানার চেষ্টা করেছি। এইভাবে ঢুকেছি ব্যাপারটার মধ্যে। আমি মনে করি যে একটা ভূমিকা জাতীয় বই হল এটা। এরপরে কেউ যদি কাজ করতে চায় সে আরো বিশদভাবে কাজ করতে পারবে।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, এটাকে যদি ওই রকম ভূমিকা হিসেবে ধরা হয় আমি বলবো যে এটা খুব ভালো একটা ভূমিকা। এইভাবে আমরা তো দেখি না আসলে। আমরা কখনো কখনো শুধুমাত্র দেখি টুকরো টুকরো প্রবন্ধ, বিছিন্নভাবে একটা জিনিস হয়তো হাতের কাছে পেলাম সেটিকে শুধু জানলাম। কিন্তু গোটা প্রেক্ষাপট ধরে জানা এবং তার ক্রমবিকাশটাকে দেখা–এভাবে, এই চোখে দেখার কোন ইতিহাস আগে ছিল না, আপনার এই বইটাতে সেটা আছে।
মোহাম্মদ রফিক : আমার মনে হয় যে, এটা শুরু হওয়া উচিৎ।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, শুরু হওয়া উচিৎ, কারণ হচ্ছে যে আমরা যদি এটা না বুঝি তাহলে আমরা বুঝতে পারবো না আমাদের কী করা উচিৎ, তাই না? আমরা আজকে, ধরা যাক, নিকানোর পাররা’র এন্টিপোয়েট্রি, যেহেতু ওর মধ্যে অনেক চটকদার জিনিসও আছে, ফলে আমরা আকৃষ্ট হই, আকৃষ্ট হয়ে আমরা ঐরকম ভাবে শুধু কবিতা লিখতে জানি বা চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আসলে তো নিকানোর পাররা শুধু নিকারনো পাররাই না। কারণ নিকানোর পাররা কোত্থেকে এসেছে, নিকানোর পাররার বাবা কে? তার বাবা যে বিসেন্তে উইদোব্রো, তারও যে আবার দাদা আছে, এই গোটা ইতিহাসটা যদি আপনার হাতে না আসে তাহলে আমরা বুঝতে পারবে না যে, আমরা কী করতে চাচ্ছি বা কী করতে পারি।
মোহাম্মদ রফিক : আর ওইভাবে চেষ্টা করে লাভও নেই।
রাজু আলাউদ্দিন : ওইভাবে চেষ্টা করে লাভ নেই, কারণ আমাদের এখানে আসলে খুঁটিয়ে দেখে না। শেষ পর্যন্ত যেটা হয় সেটা হল ইমিটেটর হয়। সাহিত্যে ইমিটেটর হয়ে তো লাভ নেই।

রাজু আলাউদ্দিন: আমার মনে আছে, আপনি একসময় মানে শুরুর দিকে, সম্ভবত ‘কণ্ঠস্বর’-এ আপনার কয়েকটি গদ্য আমি পড়েছিলাম। সম্ভবত ক্লাসিক…
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, ক্লাসিক চর্চা।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, আমাদের এখানে লেখকদের এই চর্চাগুলো দরকার। —সেটা শুধু এই জন্যে না যে ওই সব বিদেশি লেখকদের পরিচিত করাতে হবে। দরকার আসলে নিজের আত্ম-আবিষ্কারের জন্য। সেই জিনিসগুলো এখন তো খুব একটা দেখা যায় না। আপনার কী মনে হয়? আপনার কি মনে হয়, আমরা আসলে যেভাবে এগুচ্ছি, যেভাবে চর্চা করে যাচ্ছি এইগুলো কী আসলে বিশ্বসাহিত্যে জায়গা তৈরির জন্য যথেষ্ট?
মোহাম্মদ রফিক: একটা জিনিস কি, ধরো একজন ইউরোপিয়ান বা একজন লাতিন আমেরিকান সে আমার কবিতা পড়বে কেন? সে যদি দেখে আমি তারই অনুকরণে কবিতা লিখছি সে তো আমার কবিতা পড়বে না, সে পড়বে তখনই যখন সে আমার কবিতা পড়ে আমার সংস্কৃতি, আমার পরিবেশ, আমার অবস্থান, আমার মানুষের অবস্থান, আমার পশুপাখির অবস্থান এইগুলি সে কিছুটা আঁচ করতে পারছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে সর্ব পৃথিবীর, সর্ব মানুষের একটা যোগাযোগ তৈরি করতে পারছে। এবং আমি আয়ওয়াতে একটা বক্তৃতায় বলেছিলাম, আমাদের করতে হবে যেটা সেটা হচ্ছে যে পদ্মার সাথে আর্হেন্তিনার নদীর সংযোগ তৈরি করা। এটা না করলে তো সাহিত্য হবে না।
রাজু আলাউদ্দিন: এই সূত্র ধরে আমি একটা জিনিসের কৌতূহল থেকে জানতে চাই সেটা হল যে, আপনার কবিতার মাধ্যমে আপনার অঞ্চল, আপনার এলাকার স্বাদ গন্ধ যদি না পায় তাহলে এটা তাকে কৌতূহলী করবে না। কিন্তু এইটা কী আবার একধরনের অঞ্চলিকতাবাদের দিকে নিয়ে যায় না?
মোহাম্মদ রফিক: না, যায় না। সেটাই তোমাকে বলছি, কারণ হচ্ছে যে তুমি যদি সেটাকে সর্ব মানুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিয়ে যেতে পার, যোগসূত্র তৈরি করতে পার।
রাজু আলাউদ্দিন: অন্তরটাকে সর্বজনীন করতে হবে, যদি না করা যায় তাহলে সাধারণ একটা আঞ্চলিক ব্যাপার হবে। হোসে মারিয়া আর্গেদাসের উপন্যাস তো আপনি পড়েছেন। তারপরে আপনি ধরেন ওদের ওখানকার যারা তীব্রভাবে অঞ্চলের উপর জোর দিয়েছে, কিন্তু সেগুলো দ্বারা আপনি কেন উদ্বুদ্ধ বা আপনি কেন মুগ্ধ হন?
মোহাম্মদ রফিক: কারণ সেখানে, যেমন ধর আর্গেদাসের ডিপ রিভার্স-এ আরনেস্ট যে চরিত্রটা—দুটো সভ্যতার দ্বন্দ্বের শিকার, এই অবস্থানটা তো আমারও এবং এই মিলটা আমি সেখানে খুঁজে পাই, সুতরাং আরনেস্টর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে বাধ্য। কিংবা ধর ইয়াওয়ার ফিয়েস্তা, সেখানে যে আদিবাসী চরিত্র তুলে এনেছে, আমার দেশেও তো আদিবাসী আছে। তাদের সংস্কৃতিকে তো আমরা এভাবে বুঝার চেষ্টা করিনি যেভাবে আর্গেদাস তার আদিবাসী সংস্কৃতিকে বুঝার চেষ্টা করেছে। এই ব্যাপারগুলো তো শিক্ষণীয় এবং এই ব্যাপারগুলো আমাকে আকর্ষণ করে।
রাজু আলাউদ্দিন: হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি আপনার কাছে কী ধরনের অর্থ বহন করে?
মোহাম্মদ রফিক: হুয়ান কার্লোস, সত্য কথা বলেতে, আমি একটা বই পড়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: ব্রিফ লাইফ?
মোহাম্মদ রফিক: না, ওটার ইংরেজি নাম হচ্ছে Body Snatcher। বইটা আমার খুব ভাল লেগেছে, সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু ওইভাবে আমি তো বলতে পারবো না, কারণ তার আরো লেখা পড়া উচিৎ। যেহেতু তা পাইনি, পড়তেও পারিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ফিকশানে শুধু মাত্র ওদের কথা না আরও যারা আছে, ধরুন, মেক্সিকান ফিকশন।
মোহাম্মদ রফিক: মেক্সিকান ফিকশন কিছু কিছু পড়েছি, হুয়ান রুলফোর সব বই পড়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: রুলফো আপনার কেমন লাগে?
মোহাম্মদ রফিক: দারুণ।
রাজু আলাউদ্দিন: তার মধ্যে কোন বিষয়টা আপনাকে টানে?
মোহাম্মদ রফিক: যেমন পেদ্র পারামো, ছোট্ট বই কিন্তু কারো যদি দান্তে পড়া থাকে, কমপক্ষে ইনফার্ন পড়া থাকে, সে বুঝতে পারবে কী করে ইউরোপিয়ান ট্রেডিশন থেকে বেরিয়ে এসে মেক্সিকোতে এই ভাবে একটা সমাজহীন জগৎ তৈরি করল। ইনফার্নর না পড়া থাকলে পেদ্র পারামো বুঝবে না।
রাজু আলাউদ্দিন: কী সব কাণ্ড করছে সে ওই ছোট্ বইটাতে! সময়ের ধারণাকে সে একদম ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে ফেলছে। আগে পিছে, ভবিষ্যৎ, অতীত বলে কোন সীমারেখা থাকছে না।
মোহাম্মদ রফিক: মজার গল্প বলি তোমাকে, পেদ্র পারামো, আমি যখন আইওয়াতে ছিলাম তখন ওইখানকার একটা নাম করা বইয়ের দোকান আছে পেরি লাইভস, এবং এটা তৈরি করেছে কবিরা। যেই সব আমেরিকান কবি আয়ওয়াতে গেছে তারা মিলে এটা তৈরি করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি বইয়ের দোকান নাকি?
মোহাম্মদ রফিক: বইয়ের দোকান। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন ওইখানে খুব সস্তায় পেদ্র পারামো’র একটা এডিশন বিক্রয় হচ্ছিল। এক ডলার কি দেড় ডলারে। আমার সাথে যে সমস্ত বন্ধু-বান্ধবী ছিল সবাইকে আমি পেদ্র পারমোর একটা কপি উপহার দিয়েছি। তারা তো পড়ে বিস্মিত। তার মধ্যে আফ্রিকান আছে, ইস্ট ইউরোপিয়ান আছে, তারা এর আগে কখনো পড়েনি এবং বিস্মিত যে, এই এতটুকু বইয়ের মধ্যে কী কাণ্ড করেছে! শুধু তাই না, মেক্সিকোর লেখকদের আরো কিছু লেখা আমি পড়েছি, এদের মধ্যে আসুয়েলা বলে একজন ঔপন্যাসিক, তারও একটা ছোট উপন্যাস আছে। ওদের ওই বিপ্লবের পটভূমিতে লেখা। (ওহ, মারিয়ানো আসুয়েলা—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, মারিয়ানো আসুয়েলার উপন্যাসটি আমার দারুণ লেগেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি হচ্ছেন মেক্সিকান বিপ্লবের উপরে বোধ হয় শ্রেষ্ঠতম লেখক। বিপ্লবের ওই সময় নিয়ে উপন্যাসটা হলো ‘আনডার ডগ’, ওইটার স্প্যানিস নাম হল ‘লস দে আবাহো’।
মোহাম্মদ রফিক: দারুন লেখা। আমাদের দেশের লোকেরা শুধু নাম জানে কার্লোস ফুয়েন্তেস। আমার কাছে খুব অবাক লাগে। এ কী! তুমি কার্লোস ফুয়েন্তেস পড়ছো অথচ তুমি আগের কিছুই জানছ না, এর তো কোন অর্থ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা নিয়ে আমি যেটা বলি যে, সাহিত্য হচ্ছে একটা পরম্পরা। এই পরম্পরা ধরে যদি না এগুতে পারেন, তাহলে আপনি বুঝবেন না জিনিসটা কী আসলে। যেমন লাতিন আমেরিকায় ডিকটেটরদের (স্বৈরাচার) উপরে যে উপন্যাস গড়ে উঠল, সেটা কেন গড়ে উঠল…।
মোহাম্মদ রফিক: ওফ্…! লোকেরা শুধু অটাম অব দা প্যাট্রিয়াকটা পড়ে, আমার কাছে যারা আসে আমি তাদেরকে বলি—তোমরা অন্য উপন্যাসগুলো পড়। (আউগুস্তো রোয়া বাস্তোস-এর ‘আই দা সুপ্রিম’, মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস-এর ‘মি. প্রেসিডেন্ট’—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, এগুলো পড়। পড়লে বুঝতে পারবে কোথা থেকে এসেছে, এটার মূল কোথায়।
রাজু আলাউদ্দিন: এরা তো এসেছে স্পেনের এক বিখ্যাত লেখক ছিলেন, ওনার নাম হল ভাইয়ে ইনক্লান। ভাইয়ে ইনক্লানে একটা উপন্যাস আছে। আমি জানি না, এটার ইংরেজী তর্জমা আছে কিনা। বইটার নাম হচ্ছে—‘তিরানো বান্দেরা’। বইটা হচ্ছে এক ডিকটেটরের উপরে। বলা হয় যে, লাতিন আমেরিকায় ডিকটেটরদের উপরে যে উপন্যাসগুলো গড়ে উঠেছে এই সমস্তগুলোর দাদা হচ্ছে ওই বইটি।

তুমি শুধু গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস পড়বে, আর মনে করবে যে, আমি লাতিন আমেরিকার উপন্যাস জেনে ফেলেছি, এটা তো হাস্যকর।

মোহাম্মদ রফিক: ইনক্লান।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, ভাইয়ে ইনক্লান। এখানে শুধু কার্লোস ফুয়েন্তেসকে চিনে কিন্তু অন্য আর কাউকে চেনে না বা জানে না। তো সেই অর্থে কিন্তু ফুয়েন্তেসকেও চেনা হয় না, শুধু নামটাই জানা হয়। আমি বলছিলাম যে রফিক ভাই, পরম্পরাগুলো না বুঝলে ঠিকভাবে জানা হয় না। কবিতার ক্ষেত্রেও আমাদের ওই রকম পাঠ এবং অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে।
মোহাম্মদ রফিক: আমার যদি ক্ষমতা থাকতো এখন তাহলে লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের উপর ওই রকম একটা বই লেখতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: লেখা উচিৎ।
মোহাম্মদ রফিক: হু…, কিন্তু এখন আমার শরীর আর স্বাস্থ্য সেই অবস্থায় আর নেই। তুমি শুধু গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস পড়বে, আর মনে করবে যে, আমি লাতিন আমেরিকার উপন্যাস জেনে ফেলেছি, এটা তো হাস্যকর।
রাজু আলাউদ্দিন: একদম ঠিক ধরেছেন, মার্কেস কোথা থেকে আসছে, তার উৎস, এই সমস্ত না জানলে হয় না। আমি দেখেছি এই যে যারা হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিউচুড পড়েছে বলছে, ওটার সত্যিকারের কাজ কোন জায়গায় সেগুলো আদৌ পরিষ্কার বোঝে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
মোহাম্মদ রফিক: এমনকি আস্তুরিয়াসও পড়েনি।
রাজু আলাউদ্দিন: না, আস্তুরিয়াসের কথা কেউ জানে কিনা সন্দেহ।
মোহাম্মদ রফিক: আস্তুরিয়াসের মূলটা যারা বের করেছিল, তাদের পাবলিকেশন্সটা আর নেই। তো এক আমেরিকানের কাছে একটা পুরান বই ছিল, সে কয় যে ষাট ডলারের নিচে আমি এটা বেচবো না। আমি শেষ পর্যন্ত তাকে পঞ্চাশ ডলারে রাজি করালাম। পঞ্চাশ ডলারে কিনলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা রেয়ার এডিশন, না?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ। আর ইংরেজিতে একটা মুসকিল কি, ইংরেজিতে একবার ওরা প্রকাশ করলে দ্বিতীয় বার আর করতে চায় না।

নেরুদার থেকে সেসার ভাইয়্যেহো আমার বেশি প্রিয় এবং সেসার ভাইয়্যেহোর ভেতরে আমি যে জগৎকে পাই সেটা, মানে কী বলব তোমাকে আমি, একজন প্রকৃত কবি বলতে আমি সেসার ভাইয়্যেহোকে বুঝি।

রাজু আলাউদ্দিন: ওইটা কী বাংলা একাডেমির মত, পুরান অনেক বই এখন আর এখানে পাওয়া যায় না। এগুলোর কোন দ্বিতীয় সংস্করণও করে না।
মোহাম্মদ রফিক: আমি জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন: ওরা হয়তো শুধু মাত্র টাইটেল বানায়, কিন্তু রিপ্রিন্টে যায় না।
মোহাম্মদ রফিক: টাইটেল বানায় তো….
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, সেসার ভাইয়্যেহো সম্পর্কে বলতে ছিলেন।
মোহাম্মদ রফিক: সেসার ভাইয়্যেহো আমার খুব প্রিয় কবি। এটা আমি বিভিন্ন জায়গায় লিখেছি। খুব প্রিয়। এমনকি এদের মধ্যে যারা (পাবলো) নেরুদা নেরুদা করে, নেরুদার থেকে সেসার ভাইয়্যেহো আমার বেশি প্রিয় এবং সেসার ভাইয়্যেহোর ভেতরে আমি যে জগৎকে পাই সেটা, মানে কী বলব তোমাকে আমি, একজন প্রকৃত কবি বলতে আমি সেসার ভাইয়্যেহোকে বুঝি। এবং আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছি ‘ও মোর ভালোবাসার ধন’, সেখানে জীবনানন্দ দাশ ও সেসার ভাইয়্যেহোর তুলনা, মোটামুটি কাছাকাছি এক সম্পর্ক আঁকার চেষ্টা করেছে আরকি।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কোথায়, কোন বইয়ে আছে আপনার?
মোহাম্মদ রফিক: এটা মনে হয় ‘জীবনানন্দ’ বইয়ে আছে, ‘ও মোর ভালবাসার ধন’।। তো আমাদের দেশে সেসার ভাইয়্যেহোকে কেউ পড়ে না। নেরুদা পড়ে, আর কিছু কিছু নিকোনোর পাররা পড়ে। কিন্তু নিকোনোর পারারা ব্যাপারটা কী? জানে না। যেমন নিকোনোর পরারার বোন একজন খুব বিখ্যাত গায়িকা ছিল—ভিক্টোরিয়া পারারা; সে মনে হয় ফোক সিঙ্গার ছিল, চিলির খুব নাম করা এবং পরবর্তী কালে সে সুইসাইড করে। এরা তো পাররা-টাররা সম্পর্কে ভাল করে জানে না, খুব বেশি পড়েও না। দুই-একটা কবিতা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে, অনুপ্রাণিতও বলব না, কী বলব এটাকে? মনে করে, এটা দিয়ে এক ধান্দা তৈরি করা যাবে। নতুন কারিশমা।
রাজু আলাউদ্দিন: পরের জেনারেশনের মধ্যে ওরকম কবিত্ব শক্তি কারো মধ্যে পেয়েছেন?
মোহাম্মদ রফিক: সত্যি কথা বলতে কি, এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না কেউ বাঁধ ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসতে পারবে। তবে কেউ কেউ মোটামুটি ভালো লিখছে। কিন্তু মনে হয় না একটা জগৎ তৈরি করে বেরিয়ে আসতে পারবে। সেটা কেউ তৈরি করতে পারছে না। তুমি যদি তোমার মাটিতে প্রোথিত না হও তাহলে এই ঘর তো তুমি তৈরি করতে পারবে না। যেমন আমি তোমাকে একটা গল্প বলি : ষাটের দশকে আমরা যখন লিখতে শুরু করলাম তখন আমরা মনে করলাম যে ইউরোপিয়ানদের অনুকরণ করাই, ইউরোপিয়ানদেরও বলব না, বলব যে ইংরেজ যেভাবে ইউরোপকে সামনে এনেছে সেটাকে অনুকরণ করাই হচ্ছে আমাদের সবকিছু, আমাদের মুক্তি। কিন্তু আমি তখন লেখা পড়ছি। তারপর আমি খালি একটা জিনিস ভাবলাম—ধরো জার্মানি এবং ফ্রান্স কাছাকাছি, তাই না? কিন্তু (রাইনার মারিয়া) রিলকে-কে তুমি ভ্যালেরির সাথে মিলাতে পারবে?
রাজু আলাউদ্দিন: না, না।
মোহাম্মদ রফিক: মাদ্রিদ থেকে প্যারিসে ট্রেনে আসতে কয় ঘন্টা সময় লাগে? ৬ থেকে ৭ ঘন্টা। বুঝতে পারলাম আমাকে আমার কবিতা লিখতে হবে। কাউকে অনুকরণ করলে চলবে না। আমার কবিতা লিখতে হলে কী করতে হবে আমাকে?
রাজু আলাউদ্দিন: প্রভাবিতও হতে হয়।
মোহাম্মদ রফিক: সেটা তো আলাদা ব্যাপার, প্রভাবিত অন্যভাবে হবে। যেমন আমি হোমার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি, ওদের না পড়লে তো আমার এই ধারণা আসতো না। কিন্তু আমি তখন ভাবলাম যে আমাকে আমার কবিতা লিখতে গেলে আমার সংস্কৃতি বুঝতে হবে, আমার মানুষকে বুঝতে হবে, আমার জনজীবন বুঝতে হবে, আমার প্রকৃতি বুঝতে হবে। আমি জানি না, এখন আমার মনে হয় কী জানো? মনে হয়, আমার আরো তিনটা বই বেরুলে বুঝা যাবে আমি আসলে কী করতে চেয়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: তিনটা কি কবিতার বই?
মোহাম্মদ রফিক: হু…তিনটা বই, কবিতার বই। এবং মনে হয় মোটামুটি একটা ঐক্য সূত্র গাঁথতে পেরেছি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়, বেরুক।
রাজু আলাউদ্দিন: রফিক ভাই, আপনার অতীতের দিকে যাই। অতীতের দিকটা হল যে, আপনারা যখন লেখালিখি শুরু করলেন, আবুল হাসান আপনাদের একটু পরে, না?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, একটু পরে।
রাজু আলাউদ্দিন: সময় কাটিয়েছেন তার সাথে।
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, প্রথমে এসে তো আমার সাথে ঘুরতো। ও ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিল না, আমি তখন ইংরজি বিভাগের ফাইনাল ইয়ারে আর ও তখন ফাস্ট ইয়ারে। আর ও থাকতো গেন্ডারিয়ায়, ওর মামার বাসায় না কার বাসায়। আর আমি থাকতাম পুরান ঢাকায়। ও এসে আমার বাড়িতে সকালবেলা আড্ডা মেরে দুইজন এক সাথে ইউনিভার্সিটি আসতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনারা মাতাল সময় কাটিয়েছেন।
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, এক সময়, ধরো প্রায় বছরখানেক।

তবে মদ্য পান করাটা কিন্তু আমাকে প্রকৃতভাবে শিখিয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধ। কারণ আমি স্বাধীনতা যুদ্ধে যখন এক নাম্বার সেক্টরে ছিলাম।

রাজু আলাউদ্দিন: সেই সময় কি রকম? মানে কোথায় বসে কাটাতেন, কোথায় কোথায় যেতেন?
মোহাম্মদ রফিক: তখন ওই যে টিপু সুলতান রোডে যেটাকে বলে, এখন এটার নাম কি হয়েছে আমি জানি না। সেখানে একটা রেস্তরাঁ ছিল বেশ মজার। সেখানে গিয়ে বসতাম চা-টা খেতাম, এই সব আরকি ।
রাজু আলাউদ্দিন: শুধু চা খেতেন, আর কিছু খেতেন না?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, শুধু চা-ই খেতাম। না, ওইখানে কিছু পাওয়া যায় না চা ছাড়া।
রাজু আলাউদ্দিন: আর কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াতেন আপনারা?
মোহাম্মদ রফিক: ওই পুরনো ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়, ওলি-গলিতে।
রাজু আলাউদ্দিন: অলিতে-গলিতে? কী ধরনের অলি-গলি, বলেন না, অসুবিধা কি? মদ্য পান করতেন না?
মোহাম্মদ রফিক: না, আমার বলতে কোন অসুবিধা নাই। কোথায় যে পেতাম, তবে মদ্য পান করাটা কিন্তু আমাকে প্রকৃতভাবে শিখিয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধ। কারণ আমি স্বাধীনতা যুদ্ধে যখন এক নাম্বার সেক্টরে ছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি এক নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন?
মোহাম্মদ রফিক: যুদ্ধ করিনি, কিন্তু ওদের সাথে কাজ করেছি। তখন, সত্যি অর্থে মদের প্রতি আকর্ষিত হতে হয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: কিভাবে সেটা?
মোহাম্মদ রফিক: সেটা এখন আর আমার অতো বেশি খেয়াল নেই, মনে পড়ছে কিছুটা। তার আগেই, আমি তখন চিটাগংয়ে, এটা মনে হয় ১৪ই মার্চ বা আরো পরে, ২২ মার্চ হবে। আমরা সবাই একটা জায়গা করে ছিলাম, ওইখানে বসতাম, বিভিন্ন জায়গায় স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে বেড়াতাম। সেখানে সৈয়দ আলী আহসান আসলো। এসে বলছে: তোমরা এইসব চেষ্টা-ফেষ্টা করে কি করছ, আমি ঢাকা গিয়েছিলাম, শুনে আসলাম শেখ মজিবুরের সাথে আইয়ুব খানের বোঝাপড়া হয়ে গেছে। ২৫শে মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর করা হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কোন এলাকায় তখন?
মোহাম্মদ রফিক: আমি তখন চিটাগাং। এই কথা শুনার পরে আমাদের মন এত খারাপ হয়ে গেল। আমি, দেবদাস চক্রবর্তী, রশিদ চৌধুরী আর কে কে যেন আমরা—রেলওয়ের স্টেশনের দুতলায় একটা জায়গায় তখন মদ বিক্রয় হতো—সেখানে গিয়ে বসলাম। সেই আমার প্রথম মদ্য পান।
রাজু আলাউদ্দিন: মনের দুঃখে গিয়ে বসলেন ওখানে।
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ বসলাম, সে হচ্ছে প্রথম শুরু। তারপরে তো আস্তে আস্তে তো ই হয়ে গেলাম। কিন্তু ওই আবুল হাসান-টাসানদের সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ ছিল, তখন কিন্তু আমি এইভাবে মদ্য পান করতাম না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি নিষিদ্ধ পাড়াগুলোতে যেতেন না। গুণ দা’রা যেটা অনেস্টলি স্বীকারও করেন, নিষিদ্ধ এলাকায় যেতেন, সেখানে যেতেন না?
মোহাম্মদ রফিক: না। ওইটা আমার ইন্টারভিউতে আছে। আমার এখন মনে নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: ইন্টারভিউ বইয়ে?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, ইন্টারভিউ বই প্রকাশিত হয়েছে সেখানে আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এখানে বলেন একটু, শুনি।
মোহাম্মদ রফিক: না, এখানে বাদ দাও। ইন্টারভিউতে বলেছি ওইসব ব্যাপারে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার সঙ্গে সময় কাটিয়েছে কি না জানি না, গোলাম সাবদার সিদ্দিকীকে চিনতেন আপনি?
মোহাম্মদ রফিক: পরে, মুক্তিযুদ্ধের পরে চিনতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: মুক্তিযুদ্ধে তিনি কখন অংশগ্রহণ করেছিলেন?
মোহাম্মদ রফিক: সেটা আমি ঠিক জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন: কলকাতা থেকে সম্ভবত উনি পত্রিকাও বের করতেন।
মোহাম্মদ রফিক: আমার সঙ্গে ওর প্রথম দেখা হয় কলকাতায়।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কত সালে?
মোহাম্মদ রফিক: একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে। আর পরে সেক্টর-১ থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারের সাথে যুক্ত হয়ে কলকাতায় চলে যাই। তখন ওর সাথে আমার দেখা, তখন ওকে আমি প্রথম দেখি কফিহাউজে।
রাজু আলাউদ্দিন: গোলাম সাবদার সিদ্দিকীর কথা কেউ বলে না এখন আর।
মোহাম্মদ রফিক: আমি জানি না। আমার অবশ্য ওর লেখা সম্পর্কে খুব একটা উৎসাহ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: ওনার লেখা আপনার ভালো লাগেনি কখনো?
মোহাম্মদ রফিক: না, আমি কখনো কোন উৎসাহ বোধ করিনি। কারণ আমি মনে করি যে কবিতা চর্চা শুধু উন্মাদনা না, উন্মাদনার সঙ্গে সচেতনাও থাকতে হয়। ওর মধ্যে উন্মাদনাটা ছিল কিন্তু সচেতনাটা ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা হয়তো জীবন আচরণে ছিল না, কিন্তু কবিতায় কি ছিল না বলতে চান?
মোহাম্মদ রফিক: ও জীবন আচরণকেই কাব্যিক করতে চেয়ে ছিল। ঠিক কবিতায় মনোনিবেশ করতে চায়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা আপনার মনে হয়েছে। আমাদের এখানে অনেকেই লিখছেন, আপনার এরকম মনে হয় কিনা যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথাসাহিত্যিক যার প্রতি সেভাবে মনযোগ দেওয়া হয়নি– এইরকম আছে কেউ?
মোহাম্মদ রফিক: তুমিই বল সে রকম কে আছেন?
রাজু আলাউদ্দিন: না, আমি আপনার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছি—লিখছে তো অনেকেই, মনযোগ নেই অথচ গুরুত্বপূর্ণ।
মোহাম্মদ রফিক: আমার যেটা মনে হয় যে, আমাদের এখনো ওইভাবে ফুলে-ফলে শোভিত হয়ে ওঠা যেটাকে বলে, সেটা যেন কেন হচ্ছে না। মানে কর্মযজ্ঞ যেটাকে বলে, আমাদের কোথাও কর্মযজ্ঞ সৃষ্টি হচ্ছে না। খণ্ড খণ্ড কর্ম হচ্ছে, কেউ কেউ কাজ করছে, কিন্তু সব মিলিয়ে যে কর্মযজ্ঞ যেটা, সেটা হচ্ছে না।
রাজু আলাউদ্দিন: যেটা রবীন্দ্রনাথ করতেন?
মোহাম্মদ রফিক: যেটা একসময় ছিল বাঙালিদের মধ্যে। খালি রবীন্দ্রনাথ না, পরেও ছিল। কিন্তু এখন যেন কেন মনে হয় সেটাতে ভাটা পরেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন বাংলাদেশ যে অবস্থায় আছে এতে কি আপনি সুখী? মানে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক যে আবহ, ধরা যাক, এই যে কিছুদিন আগে মেরে ফেললো অভিজিৎ রায়কে। তার আগে হুমায়ুন আজাদকে মেরে ফেললো। আপনার কি মনে হচ্ছে, আমরা সাংস্কৃতিকভাবে পেছনের দিকে চলে যাচ্ছি?
মোহাম্মদ রফিক: শোনো, একটা জিনিস কি, আমি নিজে সবসময় আশাবাদী থাকতে চাই। আমি নিজে মানুষের সাথে থাকতে চাই। আমি মনে করি মানুষ এগিয়েছে। তুমি যদি ইতিহাস পড়-সমাজ ইতিহাস দেখ, দেখবে যে, পৃথিবীতে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু তার ভেতরও মানুষের কোথায় যেন একটা শক্তি আছে; মানুষ কিন্তু পিছিয়ে পরেনি বা উধাও হয়ে যায়নি। আমার ধারণা, আমার দেশের মানুষের কোথাও একটা শক্তি আছে এবং যে শক্তি তাকে এগিয়ে দেবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এটা কি রফিক ভাই এমন না যে, প্রতেকটা জাতির মধ্যে সেই শক্তি আছে তাই না?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, খালি আমাদের মধ্যে না সবার মধ্যে আছে, সারা পৃথিবীর মধ্যেই আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: যদি তাই হয় আমাদেরটা আলাদা করে উল্লেখ করার প্রয়োজনটা কোথায়? এটা আমার প্রশ্ন। সবার মধ্যে যেটা আছে সেটা তো আছেই।
মোহাম্মদ রফিক: যাই হোক এটা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হবে। তুমি চিন্তা করো যে, একাত্তরের আগে আমরা যেখানে ছিলাম, আমরা যেখানে শিল্প-সাহিত্য শুরু করেছি, লেখাপড়া করেছি এবং আজকে যখন দেখি; যতই পিছুটানের ব্যাপারটা-পিছিয়ে পরার ব্যাপারটা থাক, একটা অগ্রগতি কিন্তু আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু অগ্রগতিটা কী? যেমন ধরেন শেখ মুজিবকে কোনদিন কোথাও বলতে হয়নি বা তাকে কেউ প্রশ্নও করে নাই নামাজ পরতেন কিনা; আর একটা জিনিস—শেখ মুজিব কত বছর বয়সে মারা গেছে?
মোহাম্মদ রফিক: ৫৪-৫৫ বছর বয়সে মারা গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটু বেশি হবে। তিনি কি হজ্জ করেছিলেন? আমার মনে হয় না।
মোহাম্মদ রফিক: না।
রাজু আলাউদ্দিন: ঠিক তাই। হজ না করেই বা তিনি নামাজ পড়তেন কি পড়তেন না ওইগুলো না জেনেই—ধরা যাক পড়তেন না বা পড়লেও আমরা জানতাম না—তার মানে এটা জানানোর মতো কোন বিষয় বলে ধরা হতো না। তারপরও কিন্তু বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় নেতা যদি বলেন আপনি, তিনি তাই ছিল। তাই সমস্ত মানুষকে উনি প্রভাবিত করতে পেরেছেন, তাই না? তো এখন আমাদের রাজনীতি নেতাদের এইসব পরিচয় দরকার হয়। এখন আমাদের রাজনীতিকদের হজে গেলেন কিনা, কতবার গেলেন, নামাজ পড়েন কিনা এই সব পরিচয়গুলো অনেক বেশি জানানোর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোহাম্মদ রফিক: কিন্তু না, আমার ধারণা অন্য কথা বলে। এক একটা সময় আসে, এক একটা পিছুটান আসে, তারপর সেটার আবার সামনের দিকে যাওয়ার ব্যাপার হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে এখন আমরা যে মুহূর্তে আছি সেই মুহূর্তটা হল পশ্চাৎপদতার মুহূর্ত?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, এটা আজকে না, আশির দশক থেকে শুরু হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আমরা অনেক দিন যাবৎ আছি এখানে, ত্রিশ বছর হয়ে গেল। আমাদের এই ত্রিশ বছরের পশ্চাৎপদতা আমরা অতিক্রম করতে পারবো খুব শীঘ্রই?
মোহাম্মদ রফিক: খুব শীঘ্রই পারব কিনা জানি না, কিন্তু অতিক্রম করব।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা আপনি তো আশাবাদির কথা বললেন। কিন্তু কথা হল যে, সেরকম লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না?
মোহাম্মদ রফিক: এখনো যে খুব স্পষ্টভাবে হচ্ছে তা না, আবার একেবারে যে হচ্ছে না তাও না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কি মনে করেন যে লেখকদের—আপনার তো লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের প্রতি গভীর মুগ্ধতা আছে—সেই সব লেখকদের, তারা যে এত মৌলিকতা সত্বেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতেন অনেক সময়, যেটাকে পাবলো নেরুদা বলতেন যে—আমাদের ইতিহাসের একটা বোঝা বহন করতে হয়। আপনার কি মনে হয়, আমাদের এখানকার লেখকরা সেই বোঝাটাকে বহন করছেন?
মোহাম্মদ রফিক: না। তবে বোঝাটা বহন করতে হবে, তা না হলে সে লেখক নয়।
রাজু আলাউদ্দিন: জীবনানন্দ দাশ কি বহন করতেন কখনো? করেছিলেন?
মোহাম্মদ রফিক: জীবনানন্দ দাশ এক ধরনে করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কী রকম?
মোহাম্মদ রফিক: এই সব আলাপ করতে গেলে সময় লাগবে, বুঝতে পারছো।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের লেখালেখি শুরুর সময়ে আপনার একটা কবিতা গ্রন্থ ছিল ‘খোলা কবিতা’, যেটা ওই সময়ে বেশ সারা জাগিয়ে ছিল। সম্ভবত আপনাকে এরশাদের বাহিনী ধরেও নিয়ে গিয়েছিল ইন্টারগেশনের জন্য। সেই স্মৃতি সম্পর্ককে কিছু বলেন। কবিতাটা কিভাবে লিখলেন? ওইটার শুরুটা ছিল—“সব শালা কবি হবে”। বলেন তো, ওই কবিতার প্রথম অংশটুকু আপনার কণ্ঠে শুনি।
মোহাম্মদ রফিক: ‘সব শালা কবি হবে/পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই/বন থেকে দাঁতাল শুয়োর/রাজ আসনে বসবেই।’ আমাকে একটা ইন্টারগেশন করা হয়েছিল, সেখানে আমি কি বলেছিলাম পুরো মনে নেই। তারা আমাকে বলল যে, আপনি সামরিক আইনের বিরুদ্ধে লিখেছেন। আমি বললাম যে, আপনারা বলেন তো আপনারাই কী এই দেশে প্রথম সামরিক আইন জারি করলেন। বলে—না। আমি বলাম যে, শুনেন আমি যখন ম্যাট্রিক পাশ করলাম ১৯৫৮ তে অর্থাৎ নিজের কথা বলার মত ক্ষমতা যখন আমার অর্জিত হল, তখনই আমি দেখি আমার মাথার উপর একটা বুট এবং এই সামরিক আইনের বেড়াজালে আমরা পিষ্ট হতে হতে আজকে এখানে এসে পৌঁছেছি।
ওই কবিতাটা লেখার পেছনে ঘটনাটা হচ্ছে যে, এরশাদ যেদিন ক্ষমতায় আসে ওইদিন আমি খুলনায় ছিলাম। তো সকালবেলা আমি বাসে আসছি, দেখি আর্মির মুভমেন্ট, তখনো আমি কিছু জানি না। বাসটা এসে যখন ফরিদপুরে থামল, তারপর আমি চা খেতে নামলাম। (তখন আমার অনেক বড় বড় চুল ছিল।) একটা লোক এসে আমায় বলছে যে, আপনার চুল কিন্তু কেটে নেবে। আমি বললাম—কেটে নেবে মানে? কারা! ‘আপনি জানেন না সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এসছে। ওই আরিচা ঘাটে সবার চুল কেটে দিচ্ছে।’ সে বলল, ‘শুনেন আপনি একটা কাজ করেন।’ আমি বললাম—কী কাজ? ‘আপনি ওরা ধরলে বলবেন, ওমুক হুজুরের শিষ্য। (সেই ভদ্রলোক আমাকে এক হুজুরের নাম বলল।) এই হুজুরের শিষ্য আপনি?’ যা হোক, আমার চুল কাটা হয় নি। কিন্তু ঘটনাটা আমাকে এমন মর্মাহত করল! আমি ফিরে আসলাম জাহাঙ্গীরনগর। তার কয়েকদিন পরে দেখি যে, এরশাদের কবিতা প্রধান শিরোনাম হিসেবে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে। সেই সামরিক বাহিনী আমাকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করল আমি তখন বললাম—আচ্ছা আপনি যদি একটা কবিতা লিখেন, ধরেন আপনি একটা কবিতা লিখে যদি পত্রিকায় পাঠাই, সেটা কি শিরোনাম হিসেবে ছাপানো হবে? যত ভাল কবিতাই হোক। বলে—না। আমি বলি—তাহলে আপনাদের প্রধানেরটা কেন ছাপা হলো? বাঙালির গর্বের জায়গা তার কবিতা, সেইটাকে এইভাবে পদদলিত করা, একজন অকবির কবিতা শিরোনামে ছাপা হল এটা তুমি কি মনে কর সহনীয়? তখন সামরিক অফিসার কেউ কোন কথা বলে না, চুপ করে থাকল। তো, এই সমস্ত ঘটনা আমাকে প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত করে এবং আমি কবিতা লিখতে বসে পরি। এবং তোমার মনে আছে কিনা জানি না, এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসে, আমাদের কোন রাজনৈতিক দল সেই অর্থে তার কোনো বিরোধিতা করেনি, কেউ একটা কথাও বলেনি। এবং ওই কবিতাটা শুধু সামরিক বাহিনী এরশাদ-বিরোধী না, ওখানে আরো বহুত কিছু আছে। মধ্যবিত্তের ভূমিকা, আমাদের রাজনীতিবিদের ভূমিকা সবকিছু ওই কবিতার মধ্যে আছে। সুতরাং আমি মনে করি, কতটুকু কবিতা আমি জানি না কিন্তু ওটা একটা সামাজিক দলিল। এবং আমি যখন আইওয়াতে ছিলাম তখন ওরা কবিতাটা অনুবাদ করে এবং ওদের পত্রিকাগুলোতে ছাপে।
রাজু আলাউদ্দিন: পুরো কবিতাটাই?
মোহাম্মদ রফিক: হু, পুরো কবিতাটা। এবং পরে আমেরিকার একটা স্কুলের ছেলেরা ওটা বিলি করে। ওরা বইটা আমাকে পাঠিয়ে ছিল কিন্তু আমার কাছে এখন নেই। এই হচ্ছে ব্যাপার, বুঝতে পেরেছো। মোটামুটি অল্পে বলতে গেলে এটা বলতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার আরেক ভাল কাজ আমি মনে করি—‘কপিলা’। এই রকম একটি নামকে থিম করে এইযে কবিতা লেখার ধারণা, এর আগে তো এইভাবে আগে কেউ লেখেনি আরকি। এটা একটা লিটারেরি প্রোটাগনিস্ট, তাই না? এবং লিটারেরি প্রোটাগনিস্টকে আপনার সবগুলো কবিতার থিম করে নিলেন।
মোহাম্মদ রফিক: এবং এটার দুটো কারণ, আমি মনে করি যে, তখন আমি খুব বিপ্লবে বিশ্বাস করতাম। এখন যে করি না তা কিন্তু না। এখন মানুষের জাগরণে বিশ্বাস করি।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন কি করেন? এখন তো আর বিপ্লবে বিশ্বাস করেন না, মানুষের জাগরণে বিশ্বাস করেন। কিন্তু ধরেন এইযে হেফাজত বা এদের যে জাগরণ হচ্ছে?
মোহাম্মদ রফিক: না, এদের জাগরণ না। আমি গণমানুষের জাগরণে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি মানুষের জাগরণ ততদিন হবে না, যতদিন না নারী জাতির জাগরণ হবে। সুতরাং আমি কপিলাকে সেই জাগরণের একটা মুখ্য চরিত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছি। যে নারী জাগরণের প্রধান ভূমিকা পালন করবে তারই একটা প্রতীক বা প্রতিভূ হিসাবে আমি কপিলাকে উপস্থাপন করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি একটা মেটাফোর তৈরি করলেন, মানে মেটাফোর নতুন করে আবার তৈরি করলেন।
মোহাম্মদ রফিক: আর একটা জিনিস আমি মনে করি, যেমন ধরো গ্রিকদের একটা নিজস্ব মিথ আছে। একেবারে একটা কমপ্লিট মিথ আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: জীবনের নানান দিক ব্যাখ্যা করে বা নানান দিক তুলে ধরে এ রকম কমপ্লিট মিথিক্যাল একটা জগত আছে।
মোহাম্মদ রফিক: ইউরোপীয়ানরা সেই মিথগুলোকে গ্রহণ করেছে। আমাদের বাঙালিদের কোন মিথ নেই, সেইভাবে। কিন্তু বাঙালিকে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয় তাহলে মিথ তৈরি করতে হবে। তাকে ওই মহাভারতের মিথের উপরে নির্ভর করলে চলবে না। আমরা এটা কিভাবে তৈরি করতে পারি? আমরা করতে পারি একটা হচ্ছে আমাদের শিল্প সাহিত্যের আশ্রয়ে। আমাদের যে লোককাহিনী আছে, তাদের ওপর যে উপন্যাস আছে সেখানে প্রধান যে চরিত্রগুলি, যেমন—মহুয়া, কপিলা, বেহুলা; এবং তুমি দেখবে এইগুলিকে আমার কবিতায় বার বার ব্যবহার করেছি। আমি মনে করি আমাদেরকে মিথিক কিছু দাঁড় করতে হবে এবং একটা মিথিক সিস্টেম তৈরি করতে হবে। আমাদের বাস্তব জীবনে না হোক, শিল্প-সাহিত্যে করতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু ধরুন, আমাদের তো আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য আছে, মানে বাঙালি মুসলমান, বাংলাদেশে যেটা আলোচনা হচ্ছে।
মোহাম্মদ রফিক: সেটিও করেছি, যেমন ধরো সকিনা চরিত্র ব্যবহার করেছি। এই রকম চরিত্র যে-গুলো আছে সে-গুলো আমি ব্যবহার করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আলাদা একটা জগৎ তৈরি করার জন্য? মানে মিথিক্যাল একটা জগৎ…?
মোহাম্মদ রফিক: এটা অসম্প্রদায়িক, সব ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে এই জগৎ আমাদের তৈরি করতে হবে। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজস্ব শিল্প সাহিত্যের আশ্রয়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, কপিলা তো আসছে মানিক (বন্দ্যোপাধ্যায়) থেকে, তাই না?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, মানিকের ওই জায়গাগুলো আপনাকে কোন রকম সংঘর্ষের মধ্যে ফেলে দেয় কি না যে, কপিলা চলে যাচ্ছে কুবেরের হাত ধরে, চলে যাচ্ছে ময়না দ্বীপে এবং যার সঙ্গে যাচ্ছে সে তার শালী। তার বোনের কী অবস্থা হবে, তার বোনের বাচ্চাগুলোর কী অবস্থা হবে? ওই নৈতিকবোধ…
মোহাম্মদ রফিক: ওইগুলো নয়, আমি তাকে মানিক থেকে তুলে এনেছি, এইটুকুই।
রাজু আলাউদ্দিন: খালি ওইটার (পদ্মানদীর মাঝি-উপন্যাসের) একটা অংশ শুধু নিচ্ছেন। একটা সাইড, তাই না?
মোহাম্মদ রফিক: ভালোবাসার সাইড।
রাজু আলাউদ্দিন: ভালোবাসার ওই অংশটা ঠিক আছে। আমি আপনাকে ওটা নিয়ে প্রশ্ন করছি না। এখন আমি প্রশ্ন করছি যে, ওই চরিত্রের নৈতিক জায়গায় এসে লেখক হিসাবে আপনাকে স্ট্রাইক করে কিনা? যেমন আমার মধ্যে এই প্রশ্নটা তৈরি হয়েছে।
মোহাম্মদ রফিক: না, আমার কাছে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অসম্পূর্ণ উপন্যাস মনে হয়। কারণ হঠাৎ করে ময়না দ্বীপের আবির্ভাবে শেষ পর্যন্ত কিন্তু কোন গভীরকা তৈরি করে না। তুমি একটু ভেবে দেখো—ময়না দ্বীপটা কিসের প্রতিনিধিত্ব করছে। সুতরাং এটা আমার কাছে সবসময় একটা অসম্পূর্ণ উপন্যাস মনে হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: হতে পারে আপনি যেভাবে দেখতে চেয়েছেন সেই দিক থেকে অসম্পূর্ণ; কিন্তু আবার ধরেন হুয়ান কার্লোস ওনেত্তির ‘সান্তা মারিয়া’, ইমাজিনারি একটা জায়গা। যেমন (গাব্রিয়েল গার্সিয়া) মার্কেজের ‘মাকোন্দ’, কিংবা ধরেন পেদ্র পারামোর ‘মেদিয়া লুনা’। ওই রকম আপনি যদি কাল্পনিক ভূখণ্ডের কথা চিন্তা করেন তাহলে বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে এনেছেন। এবং এটার পেছনে সভ্যতার বিবর্তনের ফলাফলগুলো কিন্তু আছে। ওই যে হোসেন মিয়া চরিত্রটা, আমার কাছে তাকে মনে হয় ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড’-এর হোসে আর্কাদিও বুয়েনদিয়া বা মেলকিয়াদিস প্রায় একই রকম, যারা নতুন নতুন জিনিস ইন্ট্রোডিউস করছে। মেলকিয়াদিস কী করছে? মাকন্দোতে নতুন নতুন জিনিস নিয়ে আসছে। ওই ব্যাপারগুলো কিন্তু আছে। আমার মনে হচ্ছিল যে, এর (পদ্মানদীর মাঝি) সঙ্গে ওয়ান হান্ড্রেট ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড অনেকটা প্যারালাল টেক্স হিসেবে বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে যায়। তবে অবশ্যই এটা ‘ওয়ান হান্ড্রেট ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড’-এর যে উচ্চতা সেই উচ্চায় সেটা যেতে পারেনি। কারণ ওইটা অনেক অনেক বড় কাজ। এখানে একটা প্রশ্ন করতে চাই, সেটা হলো আপনি যেহেতু একটু বাম ঘরানার এবং এই পরিচয়টা আপনার আছে, সেটা আপনি বিশ্বাস করেন। বিষ্ণু দে কেন জীবনানন্দ দাশের মত জনপ্রিয় হতে পারলেন না?
মোহাম্মদ রফিক: সেটা তো আমি একটা প্রবন্ধেই লিখেছি। সেটার কারণ হচ্ছে কি—বিচ্ছিন্নতা। বিষ্ণু দে’র মধ্যে কিন্তু—আমি মনে করি যে—উনি বাম ছিলেন ঠিকই কিন্তু বৃহৎ মানুষ, সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কী আপনি মনে করেন জীবনানন্দ দাশেরই ছিল? তারও তো ছিল না।
মোহাম্মদ রফিক: কলকাতাকেন্দ্রিক একটা ব্যাপার ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা হয়তো হতে পারে। তবে যোগাযোগ থাকা না-থাকা আসলেই কি কোন গুরুত্ব বহন করে কবিদের জন্য?
মোহাম্মদ রফিক: কিন্তু ভাষার মধ্যে কবিতা শেষ পর্যন্ত কোথায় যেন বলে দেয় তুমি মানুষের পাশাপাশি আছো কি না। মানুষের সাথে কথা বললে চলবে না, তোমার কবিতাকে বেড়ে উঠতে হবে মানুষের সাথে পায়ে পায়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন ধরেন আপনি লুইস ক্যারল, ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ পড়ে মুগ্ধ হন কিনা। এটা আপনাকে তো মুগ্ধ করে। এটার সঙ্গে তো মানুষের থাকা না-থাকার কোন সম্পর্ক নাই।
মোহাম্মদ রফিক: সেটা আবার অন্য ব্যাপার। সেটা মানুষের কল্পনার জগতকে আলোড়িত করে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, তাই। ধরেন সুধীন দত্ত, তিনি কী আপনার অপছন্দ?
মোহাম্মদ রফিক: একটা সীমা পর্যন্ত পছন্দ।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু জীবনানন্দ দাশকে যে কারণে আপনি পছন্দ করেন সেইভাবে তাতে পছন্দের না।
মোহাম্মদ রফিক: না, কিন্তু আমার জীবনানন্দ দাশের পছন্দ নিয়েও আমার একটা প্রশ্ন আছে। সেটা হচ্ছে যে—জীবনানন্দ দাশকে যারা পছন্দ করে বা জীবনানন্দ দাশ দ্বারা মুগ্ধ তারা কতটুকু জীবনানন্দ দাশ পড়ে বা গভীরে গেছে সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। তারা কিছু ‘বনলতা সেন’, কিছু অন্য কবিতা—এসব দিয়ে আলোড়িত। জীবনানন্দ দাশের সমস্ত সীমা-পরিসীমা বুঝে যে তারা আলোড়িত আমার তা মনে হয় না।
রাজু আলাউদ্দিন: এমনকি বনলতা সেন নিয়েও অনেকে বলে যে, এর উপরে এডগ্যার এ্যালন পো’র প্রভাব আছে। নিশ্চয় আছে, ডেফিনেটলি আছে সেটা তো থাকবেই, তাই না? কিন্তু ‘অডেসি’ পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে ইউলিসিস চরিত্রটা কিন্তু কোথাও না কোথাও দুরবর্তী একটা ছায়া ফেলে গেছে, তাই না? ইউলিসিস কী করল—দশ বছর পর্যন্ত সেই ইথাকায় ফেরার অভিযান করলো, তাই না? আমার মনে হয়, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনের মধ্যে অকথিত যে নায়ক, সেই নায়ক হাজার বছর ধরে হাঁটিতেছে পৃথিবীর পথে; এবং সে কি করতেছে, সিংহল সমুদ্র থেকে…, মানে প্রায় একই রকম, ইউলিসিসের একটা অকথিত আবহাওয়া আছে এর মধ্যে, তাই না। ফলে আপনি যেটা বলেন—বুঝে পড়া, এমনকি এই জনপ্রিয় কবিতাগুলো আরো বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মানে সাহিত্যের বিরাট প্রেক্ষাপটে দেখে বুঝা পড়াটা আমাদের মধ্যে খুব কমে গেছে আরকি। পড়তে গিয়ে আপনারও মনে হয়েছে এরকম?
মোহাম্মদ রফিক: হু।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি রিসেন্টলি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা পড়ছি। অনেকে জীবনানন্দের সঙ্গে ফস্টের মিলের কথা বলে, এই রকম আরো অনেকে বলে। আমার মনে হয়েছে স্প্যানিশ সাহিত্যে তার কাছাকাছি লেখক বা কবি আছেন। আপনার মনে পড়বে আন্তোনিও মাচাদোর কথা।
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, মাচাদো আমার খুব প্রিয় কবি।
রাজু আলাউদ্দিন: মাচাদোর সঙ্গে অনেক জায়গায় মিলে যায়, প্রায় কাছাকাছি চলে যায় কোনো কোনো কবিতা, কোনো কোনো অনুভূতির দিক থেকে। এমনকি তার অলংকার ব্যবহারের যে-পদ্ধতি তাতেও অনেক সময় মনে হয় দুইজন প্রায় সমান্তরাল, তাই না? তো রফিক ভাই, আপনার পরবর্তী কবিতা সম্পর্কে বলেন, কি কি ভাবছেন কবিতা নিয়ে? আপনে তো মূলত কবিতাই লিখেন।
মোহাম্মদ রফিক: শোনো, মার্সেল প্রুস্ত যখন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইন সার্চ অফ টাইম লস্ট’ বারো খণ্ডের শেষ পংক্তিটা যখন লিখল, লিখে সে যে কাতে ছিল অন্য কাতে গেল এবং মরে গেল। তাকে ইনজেকশন দেয়ার চেষ্টা করা হল, ইয়ে করা হল, তখন সে বলল যে—না, আমি আর বাঁচতে চাই না, I have finished my life work. আমার ইদানীং মনে হয় যে—I have also finished– in a sense– my life work. আমি আজকে রাতেও যদি মারা যাই এরপরেও আমার তিনটা কবিতার বই বের হবে এবং ওই তিনটে বই বেরুলেই—আমার ধারণা—একটা সামগ্রিকতা আসবে।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে বৃত্তটা পুরণ হবে
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, বৃত্তটা পুরণ হবে এবং আমি তিনটে বই লিখেছি জাস্ট দু’মাসে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, ওগুলো কি আপনার অপ্রকাশিত কবিতা?
মোহাম্মদ রফিক: হ্যাঁ, অপ্রকাশিত। এটা আমার কাছে নেই, এটা প্রশান্ত মৃধার কাছে আছে। তুমি প্রশান্ত মৃধার কাছে চাইলে পাবা। হাসপাতালে আমি তো প্রায় মৃত্যু শয্যায় ছিলাম। আমি যাওয়ার আগে সব প্রশান্তর কাছে হাউলা করে দিয়েছি যে: তোমার দায়িত্বে থাকল এইগুলো বের করার।
রাজু আলাউদ্দিন: আর এখন একটু রাজনৈতিক প্রসঙ্গে আসি।
মোহাম্মদ রফিক: না। এই ব্যাপারে আমার কোন উৎসাহ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

“হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে
শিল্পী রফিকুন নবী: ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম

শামসুজ্জামান খান: নিজের দলের কোনো সমালোচনা করব না, অন্যদের করব– তাহলে তো সে পার্সিয়াল হয়ে গেল

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.