গল্প

বট থানের উপকথা

prokash_biswas | 30 Oct , 2018  


১.
আমাদের গাও গ্রামে হেমন্তদিনে খুব ভোরে ব্রাহ্ম মূহূর্তে রাতের শেষ ঘুম ভেঙ্গে যেত একজন বোষ্টমের গানে। বিশেষত হেমন্তের শিশির যখন টিনের চালে টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়তো তার খঞ্জনীর ঝঙ্কারের সঙ্গে সচী রানী, গৌর নিতাইয়ের লীলাকীর্তি বিষয়ে তার দরাজ গলার সুর চুইয়ে আসতো বন্ধ জানালা বেয়ে। ঘরের পাশের শেফালী আর গাঁদা ফুলের ঘ্রাণে সে সুরের দ্রবণ আমাদের অন্তরে অন্তরে দাগ কেটে দিত। আর বাড়ির পালান পৈঠায় হেলেঞ্চা, সেঞ্চি আরো জলজ ফুলের রংয়ের রসায়নে আমাদের হৃদয়তন্ত্রী সুধাময় হয়ে উঠতো। গান করে চাল ডাল সিধা, দক্ষিণা নিতেন তিনি। সে সময় নাটাই আর বাস্তু ঠাকুরের পূজার আসরেও দেখা মিলতো তার। আখড়া ছিল তার পাশের গাঁয়ে। আমরা স্কুলে পড়তাম সেই গাঁয়ে। স্কুল ঘর থেকে এক মাইলটাক দূর তো হবেই তার পরিস্কার মাটির ঘর আর গোবরলেপা পরিস্কার আঙ্গিনা। আমরা একবার তার বাড়িতে গিয়ে স্থল-পদ্মের বাড়ন্ত গাছ দেখে অভিভূত হয়ে পড়ি।
তার মনটা ছিল নরম। আর গলা ছিল ভীষণ রকমের মধুর। কিন্তু গলা মিষ্টি হলে কি হবে খুব বিষন্ন দেখাতো তাকে। সব সময় কি যেন ভাবতেন তিনি। যে বিষয় আমাদের চোখ এড়াতো না। আমি স্কুলে আবৃত্তি আর গান করতাম বিভিন্ন মহাপুরুষ, মহাকবির জন্ম জয়ন্তীতে। আমার এ বিষয়টি জানতো বলে ভীষন আদর করতেন আমাকে ঐ বোষ্টম। তিনি আমাদের কৃষ্ণলীলা, রাস পূর্ণিমা, এমনকি মার্গীয় গীতগোবিন্দের পয়ার পড়াতেন আর শোনাতেন। সে সবের বেশিরভাগ আমরা বুঝতাম না। কিন্তু তার সুর আমাদের বেশ টানতো। আমাদের মধ্যে অন্তত আমি বড় হয়ে তার চাইতে বড় বোষ্টম হবো ভাবতাম। কিন্তু তার ঘর ছিল খালি, অর্থাৎ কিনা তার ঘরে গোটাকয়েক ভক্ত, গোয়োলে গোটাকয়েক গরু, বাছুর আর বেড়াল ছাড়া অর্থাৎ কিনা তার নিজের পরিবারের অন্য কাউকে অর্থাৎ তার স্ত্রী বা কোন সন্তানাদি দেখতে পেতাম না। তার স্ত্রীকে অর্থাৎ বোস্টমীকে আমরা দেখতে চাইতাম মনে মনে। কেমন তিনি? তিনি কি আদতে বোষ্টমী না সাধারণ কোন গৃহিনী সেটাও জানতে পারতাম না। কৌতূহল নিবৃত্ত করতে অতএব আমরা অনুসন্ধানে নেমে পড়লাম।

২.
খোঁজ নিতেই জানা গেল তার স্ত্রী নাকি তার দর্শন আর জীবনযানাচারেই অভ্যস্থ ছিলেন আগে। আর তার গলা ছিল বোষ্টমের চেয়েও অনেকটা ভালো। তিনি এখন এ লাইনে নাই। দেশ স্বাধীনের সময যুদ্ধে কয়েকজন পাকবাহিনীর দালালের হাতে পড়েন তিনি। তখন এই বোষ্টম সে ঘটনা বাধা না দিয়ে ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন ইন্ডিয়ায়। সে কারণে বোষ্টমী এ লাইন ছেড়ে দিয়ে আরো বাউলের বাউল আরো সংসার বিবাগী হয়ে বেশ কয়েকটি গ্রামের পরে এ থানা এলাকার সবচে বড় হাটের আসা যাওয়ার পথে। যেখান থেকে চারপাশের গ্রামগুলো দূরে দূরে ছিল। রোদ আকাশে গাছপালা নীলাভ ছোট দেখাতো, দিগন্ত যেখানে প্রায় রেখা হিসাবেই থাকতো, সেখানে নির্জন ও প্রায় জনমানবশূন্য এক প্রকান্ড বটগাছের তলায় থান বানিয়ে বাস করেন। যেখানে পাঠা বলি হয়। তেল সিদুঁর পড়ে প্রতিদিন বটগাছটির গোড়ায় যেখানে। ফাল্গুন চৈত্রে সেখানে শীতলা দেবী, আর শিবের পূজাও হতো। লোকজন মানত করে পায়রা কবুতর ছেড়ে দিত সেখানে আর মাটির তৈরি ছোট ছোট খেলনা ঘোড়া অর্ঘ্য হিসাবে জমা রাখতো গাছের ঝুড়ির তলায়। এ জায়গাটিতে মানুষ অশরীরি, অতিপ্রাকৃতের ভয় পেত। বোষ্টম বৌয়ের এ খবরে আমাদের জানায় আমাদের মধ্যে সবচাইতে ডানপিটে, দুষ্ট, কুচুটে যে আমাদের মতো ভদ্র ছেলেদের তেমন সহ্য করতে পারতো না, স্কুল কামাই দিতো আর পরীক্ষায় যে সব বিষয়েই প্রতিবছর ফেল মারতো, সেই বন্ধুটি।
বন্ধুটি আরো জানায় যে এই বোষ্টম বঊকে জ্যোস্না পূর্নিমা, শনিবার মঙ্গলবার, তিথি বিশেষে শিব বা কালী ভর করতো তার মধ্যে। তাকে হিঙটিং ছট, উচাটন, বাণ মারার বিদ্যা, বশীকরণ, সন্মোহণ প্রয়োগও জানতেন তিনি। সেখানে বটতলার থানে একা একা চুপি চুপি আমাদের কাউকে না জানিয়ে গিয়ে আমাদের বন্ধুটি মাঝেমধ্যেই সে ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। এমনকি একবার আমাদের গ্রুপের এক প্রতিদ্বন্দী, যে ফুটবলে আমাদের দলের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে আমাদের প্রায়ই হারিয়ে দেয়, অন্য একটি স্কুলে পড়া সেই ছেলেটিকে বশীকরণের জন্য সে বোষ্টম বউয়ের কাছে গিয়েছিল বলে তথ্য দেয়। বন্ধুটি বোষ্টম বউ সম্পর্কে আরো অবাক ও বিস্ময়কর একটি তথ্য দেয় এরকম যে তিনি নাকি ভাত, রুটি কিছুই আহার করেন না, ভক্তদের দান দক্ষিণার সিধা তিনি দরিদ্র ভক্তদের বিলিয়ে দেন। তিনি সেবন করেন বেল পাতা, কচি ফুল আর ফুলের পোকামাকড়। বাদ বাকীটা তিনি বাযুভূখ।

একদিন স্কুলে এক দেশবিদেশের নানা রকমের জ্ঞানধারী, ভূতপ্রেত দৈবে অবিশ্বাসী বন্ধুসুলভ এক শিক্ষককে তার কথা বলতে শিক্ষক জানান, বোষ্টম বউ রকমফেরে আসলে পাগলী। এই পাগলামির কারণ নাকি মিলিটারী ক্যাম্পে আটকে রাখার পর তাকে কেউ আর গ্রহণ করতে না পেরে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া। কেউ তাকে আশ্রয় না দিলে তিনি একজন গুরু ধরেন যিনি সরাসরি কামরুপ কামাক্ষা থেকে ডাকিনীবিদ্যা আয়ত্ত্ব করে এ দেশে চলে এসেছিলেন।
তো এই পাগলীর খবর আমরা লোকজনের মুখে বেশ শুনতে শুরু করলাম ক্রমান্বয়ে তার প্রসিদ্ধির কারণে। কিন্তু তার এই প্রসিদ্ধি ছিল সাময়িক।
৩.
এর অনেকদিন পর আমরা বড় হয়ে যাই। আমাদের কেউ ব্যবসায় নেমে পড়ে, কেউ ছোট খাটো চাকুরি, কেউ কলেজের পর পড়াশুনা করতে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে যাই। সেই বোষ্টম আর তার বউয়ের কথা আমাদের মনে চাপা পড়ে যায়। সময় আমাদের বিস্তৃতির চড়ায় আটকে দেয়। আমরা সেই বোষ্টম বউ বা পাগলীর কথা আপাতত ভুলে যাই।
কিন্তু বোষ্টম বোষ্টমীর জীবনচক্রের ঘটনা ক্রম উত্থান-পতন এতটাই বিচিত্র যে কৌতূহলী আমি তাদের ভুলতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত ভুলতে পারি না। এর মধ্যে ইন্ডিয়ায় বাবরী মসজিদ রাম মন্দির গন্ডগোলের প্রতিক্রিয়ায় বোষ্টমের আখড়া টোলটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। বোষ্টমের ওপর আক্রমন হলে তিনি পালিয়ে যান। পালিয়ে যাওয়ার পর তার আর কোন খোঁজ আর কেউ পায়না।
এরও বেশ কয়েক বছর পর শহরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রামে ফেরার পথে মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয় ঐ লক্ষীছাড়া বন্ধুটির সঙ্গে। আমার পড়াশুনা, দেশের রাজনীতির হালফিল খবর নেয়ার পর আলাপচারিতার এক ফাঁকে ঐ পাগলীর প্রসঙ্গ ঢুকে পড়ে। এখন পাগলী নাকি খুব বেশি করে সব ফুলের কুড়ি, ফোটা ফুল আর ফুলের পোকা মাকড় চিবিয়ে খাওয়া শুরু করেছে। আর যে সব নিঃসন্তান দম্পতি, বাজা লোকজন সন্তান মানত করে পেয়ে যেত, সংসারে শান্তির জন্য যারা মাদুলি নিত ঐ পাগলীর কাছে থেকে শুনে শুনে তাদের দেখাদেখি অন্য যারা আসতে শুরু করেছে তাদের ঐ পাগলীর টোটকা আর্শীবাদ কাজে লাগছে অন্যভাবে। সন্তান কেউ পেটে থাকতেই মারা যাচ্ছে। আর কোন সন্তান পেট থেকে বের হচ্ছে অন্ধ কানা, হাতের এক মুঠোতে পাাঁচ আঙ্গুলের জায়গায় নয় আঙ্গুল, অথবা হাবা নালাভোলা হয়ে। আর পাগলীর কাছে মানতের জন্য, বশীকরণ করার জন্য কেউ আসছে না। আর তাছাড়া তার বয়সও হয়ে যাচ্ছে। তিনি নাকি এখন প্রায়ই চিৎকার করে বলছেন যে “সব একই কাহিনী রে… ভুল, নোংরা, ময়লা । ”

৪.
এর মধ্যে আমাদের গ্রামের পাশের কালীগঙ্গা আর ইছামতী নদীতে অনেক জল গড়িয়ে যায়। সারা দেশের ইলেকশনে একটি রাজনৈতিক দল বিজয়ী হয়ে সনাতনধর্মাবলম্বী ও পরাজিত রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের ওপর নির্বিচারে হামলা করতে থাকে। বিশেষত সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজনের ওপর ধর্ষন, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটায় বিজয়ীরা। এ সময় বটতলার থানেও আক্রমন হয়। প্রৌঢ়া ঐ বোষ্টম বউ, পাগলীও তাদের হাত থেকে নিস্তার পায় না।

ঘটনাটির পর পর একদিন সূর্য ডুবে যাওয়া প্রদোষকালে সাইকেলে করে থানা সদরে যাওয়ার পথে আমাদের পরিচিত এক লোক দেখতে পায় বটের ঝুড়িতে ঝুলন্ত একটি নারীর শরীরকে। সে বুঝতে পারে ঝুলন্ত ঐ দেহটি কার। লোকজন এ ঘটনাটির বিষয়ে বলতে থাকে যে একাত্তরের নির্যাতনের পরও যে আত্মহননে যায়নি এখন সে এই কাজ করলো?

তারও বেশ কিছু দিন পরে আমি খবর পাই যে ঐ বটগাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। গাছের শেকর বাকড় তুলে পরিপাটি সমান করে দেয়া হয়েছে ঐ থানটিকে। সেখানে নাকি কারখানা স্থাপনা তৈরী হবে। বিশাল ধূ ধূ ক্ষেত আর প্রান্তর সেখানে নেই, বসত বাড়ি হয়েছে বেশ কয়েকটি। পাকা রাস্তা তৈরি হয়েছে।
এর বেশ কিছু দিন পরে এই নতুন পাকা রাস্তা ধরে শহর থেকে গ্রামে আসছিলাম। আমি সেখানে সেই থানটির পরিবর্তে এল সাইজের একটি টিনের ঘর দেখতে পাই। সেখানে একটি পুকুর কাটা হয়েছে। পুকুরের পাড়ে সারি সারি বদনা রাখা রয়েছে। আমি পুকুরের ঘাটে সাদা টুপি আর পাঞ্জাবি পড়া ছোট ছোট বালকদের খুনসুটি করতে দেখি।
আমার কিন্তু আর বোষ্টম হওয়া হয়নি।

Flag Counter


5 Responses

  1. Palash says:

    যন্ত্রণাকাতর হৃদয়ের ক্ষতস্থানগুলি জুড়ে শুধুই তীব্র বিষের জ্বালা, প্রচন্ড দাবদাহে পুড়তে থাকে মস্তিষ্কের কোষগুলো। বুকফাটা আর্তনাদ অনুচ্চারিত শব্দের গাঁথামালা হয়ে ঝরে পড়ে জীবনের পাতায়। এ কেমন জীবন?

  2. Tarik Hossain says:

    বর্ণনায় আসা যেকোন রং, স্বাভাবিক কোন জীবন, উপন্যাস বা গল্পে আঁকা অস্বাভাবিক মর্মান্তিক কোন চরিত্রের বাইরে বোস্টম এক অতি বাস্তব, নাম না দেওয়া একটা রং, একটা জীবন, একটা চরিত্র। দাদা, না-বলার, না-লেখার আর না-শোনার গল্প দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

  3. Rumy says:

    গল্পের বিষয়বস্তু সমকালীন। ‘ধর্মীয় চেতনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দ্বারা সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন’ খুব ভালভাবেই লেখক লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে লেখায় যতি চিন্হের ব্যবহারে আরেকটু যত্নবান হলে ভাল লাগত। বাউল সম্প্রদায় অন্যধর্মের মত বাণমারা, তাবিজ কবচ বিশ্বাস করে বলে শুনিনি কখনও ! আর মানসিকভাবে অসুস্থ লোকের পক্ষে ( যে পোকামাকড় খায়) তাবিজ দেয়া বোধহয় সম্ভব না। কিছু বর্ণনা বাদ দেয়া যেত, কিছুটা dialogue form এ লিখলে আরো সুখপাঠ্য হত বলে আমার মনে হয়েছে।

    • prokash says:

      বাণ, তাবিজ কবজের অনেক আগেই তিনি
      বৈষ্ণব ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন।

  4. Shamsul Alam Chanchal says:

    কাহিনীর গাঁথুনী ভাল লাগল। পড়া শেষে বেদনার্ত হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.