ভ্রমণ

আলপস্‌ রজনীর তুষারপাতে

ikhtiar_chowdhury | 25 Jan , 2018  

১৯৯০।
ট্রেনটি ঘণ্টায় প্রায় দু’শ সত্তর কিলোমিটার বেগে শ্যামল প্রান্তর ছুঁয়ে প্যারিস থেকে লিওর দিকে ছুটছে। ফরাসিরা বলে তে জে ভে-থ্রা আ গ্রন্দ্ ভিতেজ। প্রচণ্ড গতির ট্রেন। জানালা দরজা বন্ধ। বিশাল একটি কামরা আমাদের দখলে। পুরো বহর যাচ্ছি মাঠ পর্যায়ে তুলনামূলক প্রশাসন বিষয়ে ধারণা নিতে। সংখ্যা সব মিলিয়ে আশির কাছাকাছি। আমাদের বর্তমান ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে ইয়াপে, তার সকল প্রশিক্ষণার্থীই সেই যাত্রায় শামিল। ঘনিষ্ঠদের মধ্যে আসেনি মেধা গাডগিল আইএএস। ভিশিতে ক্যাভিলমে ফরাসি ভাষা শেখার সময় আমরা ছিলাম একই এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে। ওঁর ঘর ছিল নিচে, আমি থাকতাম তিনতলায়। মেধার শ্বশুর ভারতে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। কংগ্রেস দলের মুখপাত্র। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন এক সময়। ভিশির মতো প্যারিসেও মায়ের সাথে থাকছে মেধা।
লিও প্যারিস থেকে উত্তর পূর্বে। দূরত্ব পাঁচশ কিলোমিটারের বেশি। ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী । অবশ্য অনেকে বলে মার্শেই হচ্ছে দুনম্বরে। ইইসি’র বারোটি দেশ পরিকল্পনামতো যদি ১৯৯৭ সাল নাগাদ পুঁজি, পণ্য, কাজের জন্য নাগরিকদের দেশান্তর গমন ও পরিবহন অবাধ করতে পারে তবে অবস্থানগত কারণে লিওর গুরুত্ব বেড়ে যাবে।

লিও থেকে আমরা যাব আলপসের আলভার্ট ভিল। পাহাড়ের মাঝে ছোট্ট শহর। ফেব্রুয়ারিতে আলভার্ট ভিলসহ আলপসের আরও বারোটি জায়গায় বসবে ষোলোতম শীত অলিম্পিকের আসর। পৃথিবীর সাতান্নটি দেশ থেকে প্রায় তিন হাজার ক্রীড়াবিদ জড়ো হবে ওখানটায়। ততদিনে তুষারে বরফে সাদা হয়ে যাবে আলপসের উপত্যকা। সমতল থেকে বহু উঁচুতে সেই তুষার ছাওয়া ভূমিতে জমে উঠবে প্রতিযোগিতা। এখন সবে অক্টোবর। এখনও তুষারপাত শুরু হয়নি। তবুও এ যাত্রায় আমাদের প্রধান আকর্ষণ আলপস। গেল ফেব্রুয়ারি মাসে তুষারপাত দেখেছি ভিশিতে। বাড়ি ঘরের মাটির টাইলের খাড়া ছাদ, রাস্তা, পার্ক বরফে একাকার। নরম তুষার স্তুপ হয়েছিল সবখানে। পার্ক হয়ে গেছিল ধবল প্রান্তর আর তার মাঝে ইতস্তত দাঁড়িয়ে ছিল পত্রহীন মাপেল ট্রি। ক্যাভিলমে, ফরাসিতে যাকে বলে সনথ অডিও ভিস্যুয়েল পু লা লাঙ্গ মডার্ন, ক্লাসে যেতে ঘরের দরজা থেকে বরফ ভাঙতাম আমরা। সন্ধ্যায় শরীর গরম করতে মহল্লার সুইস অথবা ক্যাভিলমের পাশের সিরানো বারে মৃদু হল্লা করে পান করতো সবাই। ভিশিবাসী আমাদের বলত গেল অর্ধ যুগে এমন তুষারপাত দেখেনি তারা। অবিরাম ঝরছে তো ঝরছেই। সূর্য যে কোথায় লুকিয়েছে জানে না কেউ। সারা বছরে অন্তত দুশ দিন রোদের দেখা মেলে না। লিও যাত্রায় আমাদের আরেক আকর্ষণ পাশ্চাত্যের দ্রুতগামী ট্রেন টিজিভি’তে ভ্রমণ। জাপানের বিদ্যুত ট্রেনের পর এটি সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় দ্রুতগামী ট্রেন। বিশ্বে কে কীসে প্রথম নিয়ে কথা উঠলেই আমার এক সময়ের ক্লাস টিচার মাদমোয়াজেল কোলেথ প্রায়শ জাপানি সহপাঠিনী কুমিকোর সাথে মজা করতো। সে জিগ্যেস করত, আচ্ছা মাদমোয়াজেল কুমিকো আপনাদের টিজিভির গতি কত।
কুমিকো বরাবরই কৃত্রিম গাম্ভীর্যে পাঁচশ কিলোমিটারের উপর একটি সংখ্যা বলত আর কোলেথ বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফুলিয়ে ফেলত গাল। কুমিকো খুব মজার ও সপ্রতিভ মেয়ে। টোকিওতে ওর বাবার ঐতিহ্যবাহী জাপানি পোশাকের দোকান। ক্যাভিলমে আমাদের ক্লাসে একদিন বুকখোলা জ্যাকেট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে ছেলেদের ছাটের চুলে এল সুন্দরী এক মেয়ে। কোলেথ বলল, বলতে পার কোত্থেকে এসেছে ও?
আমরা একে একে অনুমানে বললাম দেশের নাম। শিরিন, টেলিকম্যুনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার, এসেছে তেহরান থেকে। ১৯৭৯-তে এক নায়ক শাসক রেজা শাহ পাহলবির ইরানে ঘটেছে ইসলামী বিপ্লব। মৌলবাদীরা প্রচণ্ড দাপটে এখনও শাসন ক্ষমতায়। সেখানকার মেয়ের বেশভূষায় দেশ অনুমান সত্যিই কঠিন। তো শিরিনকে মধ্যাহ্ন ভোজে মিউনিসিপ্যাল রেস্তোরাঁ চেনানোর দায়িত্ব নিল কুমিকো। ভর্তুকি থাকায় কম পয়সায় ওখানে ভালো খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু মধ্যাহ্নের পর ওরা ফিরল না। বিকেলে আমাদের ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্তও না। দুজনেই হাওয়া। পরদিন জানা গেল ভিশির মতো ছোট্ট শহরে যেখানে কেউ পথ হারায় না সেখানে পথ প্রদর্শক কুমিকো পথ হারিয়েছিল।
শিরিন ছাড়াও আমাদের ক্লাসে ছিল ওর স্বদেশী ইরাজ। পেশায় প্রাক্তন বিচারক। আইনশাস্ত্র পড়তে ফ্রান্সে আসা। ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরানের খাঁটি যুবক সে। খুব রক্ষণশীল। খাতায় মদ শব্দটি লেখায়ও তার প্রবল অনাগ্রহ। একদিন পুরো ক্লাস ফ্রান্সের সুচিত্রা সেন ক্যাথরিন দনিয়ুভের ‘লা রেইন ব্লশ’ (ধবল রানি) দেখতে যাবার আগে কোলেথ তুরস্কের নাসরিনকে জিগ্যেস করল, তুমিতো ছবিটা দেখেছ এখন বল ইরাজ যেতে পারবে কিনা।
নাসরিনের জবাবের আগেই বাক্যক্ষেপ করল সাঈদ, পাকিস্তানী কূটনীতিবিদ, কেন নয়। ওতো প্রায় বিকেলেই সুইমিং পুলে সময় কাটায়।

যে খাতায় লেখে না মদ শব্দটি সে যায় সুইমিং পুলে এই তথ্য আমাদের জানা ছিল না। কোলেথ নিজেও সংগোপনে ইরাজের রক্ষণশীলতায় কিছুটা ক্ষুব্ধ। সাঈদের কথায় পনেরো জনের ক্লাস দারুণ মজায় ইরাজের পানে মুখ ঘোরায়। ফ্রান্সে সুইমিং পুল হচ্ছে জব্বর জায়গা। যেখানে নারী পুরুষ এক পানিতে ডুব সাঁতার খেলে। ইরাজ সিনেমায় গেল না। তিনদিন নিখোঁজ থাকল। চতুর্থ দিন ক্লাসে বলে, ‘খুবই ব্যস্ত ছিলাম, তেহরান থেকে হঠাৎ বউ এসেছে বাচ্চা নিয়ে। বাসা ঠিক করতে ঝামেলা গেল।’ কিন্তু সাঈদের কাছে আমরা অন্য তথ্য পাই। আমাদের ইরাজ শরীয়ত অনুযায়ী মোথা বিয়ের ধান্ধায় থাকায় বউ দেশ ছেড়েছে।
লিওর দুঘণ্টার পথ কীভাবে ফুরিয়ে যায় আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু এরপর সময় কীভাবে কাটবে তা নিয়ে সবাই শঙ্কিত। অনুষ্ঠান সূচি যেভাবে আছে তাতে ১৯৮১ থেকে ফ্রান্সে প্রচলিত প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়ে লাগাতার ভাষণ হতে রক্ষে নেই। অনুমান করছি এর সাথে যোগ হবে আফ্রিকানদের লোক দেখানো বিরক্তিকর প্রশ্নমালা।
লিওতে আমরা থাকছি শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ি অঞ্চলে। প্রায় জনবিরল ওই এলাকায় ছুটি কাটাতে আসা পরিবারগুলোর জন্যে পাহাড়ের খাঁজে বৃক্ষশ্রেণির ছায়ায় চমৎকার সব বাংলো রয়েছে। এগুলোকে বলে ‘ফোয়ে দ্য ফ্যামি’। সবই ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং প্রয়োজনীয় উপকরণে সয়ংসম্পূর্ণ। শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস নিয়ে উপস্থিত হলে আর অসুবিধে নেই। মায়ানমারের কূটনীতিক চো, নাসির আর আমি উঠেছি একই বাংলোয়। সীমাহীন নির্জনতায় বলতে গেলে শুধুমাত্র একজন মহিলা এসব দেখাশোনা করছে। আমাদের প্রাতঃরাশের আয়োজন মহিলার হাতে, দুপুরের খাবার লিওতে আর নৈশভোজ আবাস থেকে সাত-আট কিলোমিটার দূরের এক রেস্তোরাঁয়। চলাচলের জন্যে রয়েছে দুটো ডিলাক্স কোচ।
লিওতে আমরা থাকব তিনদিন। এর মধ্যে একদিন যাব রেজিও রোন-আলপস। সমগ্র ফ্রান্সে এ রকম অঞ্চলের সংখ্যা বাইশ। প্রশাসনিক ধাপগুলো হচ্ছে কমিউন, ক্যানটন, এরোনডিসমো, দেপাকতমো ও রেজিও। আমাদের চেয়ে কয়েক গুণ বড় এই দেশটির লোক সংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ কোটি। নগরী হিসেবে প্যারিসের পরেই লিও মতান্তরে মার্শেই কিন্তু অধিবাসীর সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের বেশি হবে না। লিওতে আমাদের থাকার জায়গা আসলেই সুন্দর। অনুচ্চ পাহাড় ঘিরে সবুজ বনভূমি। বনভূমির মাঝে বাংলো। এত নিরিবিলি যে একটি পাখির ডাককেও কখনও কখনও তীব্র মনে হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুত সেই সাথে যোগাযোগের পথটি সুগম হলে তা শহরের চেয়েও আরামপ্রদ। এখানকার গ্রামে অবকাঠামোগত সুবিধে ষোলোআনা। শুধুমাত্র একটি বাড়ির জন্যেই হয়তো আধ কিলোমিটার পাকা রাস্তা টেনে নেওয়া হয়েছে এমন দৃশ্য সবখানেই দেখা যায়।
গেলবার গ্রীষ্মে আমরা কোলেথদের গ্রামে গিয়েছিলাম পিকনিকে। সারা ক্লাস। আর ছিল প্যালেস্টাইনী ডাক্তার গাজার মাহমুদ ও ওমানী আইনজ্ঞ তারেকদের স্ত্রীরা ও আমার বউ লীনা। বিয়ের আট মাসের মাথায় বিচ্ছেদের পর লীনা তখন ফ্রান্সে। গ্রামটি ভিশি থেকে বারো-চোদ্দ কিলোমিটার দূরে। কোলেথের বান্ধবী ডানিয়েলের গাড়িতে আমরা সেখানে গেলাম। আরও দুটি বাহন ছিল। তারেকের লাল টয়োটা আর কোলেথের ক্রিম কালার রেনো। গ্রামটি ছোটো-বড়ো টিলার উপর। গাছপালা প্রচুর। বনের মতো। বিরাট বিরাট ঘাসের মাঠ। সেখানে বাঁধনছাড়া স্বাস্থ্যবান ষাড় ও গাভি। তাদের কেউ কেউ এমনভাবে ঘাসের দিকে তাকিয়ে যেন খাবারে অভক্তি ধরে গেছে। কোলেথের বাড়ি বড় রাস্তার লাগোয়া। ফাঁকা। আশপাশে কোনো প্রতিবেশী নেই। সেখানে ও প্রায় শত বছরের দোতলা একটি ইট কাঠের দালানে একা থাকে। নিচতলায় লিভিংরুম ও সুসজ্জিত রান্নার স্থান। দোতলার দুটো ঘরের একটিতে কোলেথের শয্যা। বাড়িতে বিশাল একটি গোলা। সম্পন্ন কৃষক পরিবারের যেমন থাকে। পাশে জিনিসপত্র রাখার আরও একটি ঘর, যার সামনে আমাদের রান্না ও খাবার আয়োজন শুরু হবে। ইরাজ ও মাহমুদের জন্যে অপেক্ষা করছি আমরা। ওরা গেছে হালাল মাটন কিনতে। ভিশিতে বেশকিছু আলজেরীয় ও তিউনিশিয়ানের বাস। হালাল মাংসের দোকান ওদেরই।
কোলেথের বাড়িটি প্রপিতামহের সময়কার। কাঁটাতারে ঘেরা। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আলাদা বাড়ি করেছে। সেখান থেকে ওর ভাইয়ের ছেলে ও মেয়ে এল আমাদের সাথে যোগ দিতে। এই বিশাল বাড়িতে শুধুমাত্র কোলেথ আর ওঁর কুকুর ফিফি। বাংলাদেশে একজন অবিবাহিতা মেয়ের এভাবে থাকার মতো সামাজিক অবস্থা কতদিনে সৃষ্ট হবে ভাবতে চাইলাম। তবে ষাটের দশকের শুরুতেও ফরাসি সমাজেও অনেক রক্ষণশীলতা ছিল। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় বিয়েরবেলায় মেয়েদের মতামত পর্যন্ত নেওয়া হতো না।
হালাল মাটন পাওয়া যায়নি বলে ইরাজ আসেনি। মাহমুদও ধর্মভীরু। সারা রমজান রোজা ও নিয়মিত নামাজ করে। কিন্তু ইরাজের গোঁড়ামী ও সমর্থন করল না। গোলায় কয়লা ও শুকনো কাঠ ছিল। খোলা প্রাঙ্গনে চুলো কেটে মেশিনে স্লাইজ মাটন ঝলসে নিলাম আমরা। কোলেথ করল সালাদ। লেটুশ পাতা, সসা, টমেটো আর ক্যাপসিকামে। ক্যাপসিকাম ছোট ছোট পেঁপের আকারের। ঝাল নেই। ফরাসিরা খায় তরকারি হিসেবে। এর সাথে রুটি, ক্যানড ভুট্টা সেদ্ধ, লাল মদ আর প্রচুর ফলমূলে টেবিল সাজালো রামাল্লার খ্রিস্টান যুবক রায়েদ ও কোলেথের ভাইঝি। সারাটা দিন চমৎকার কাটল আমাদের। গ্রামটির বসতী খুব কম। সারা দিনে এমন কী বিকেলে যখন সবাই হাঁটতে বেরুলাম তখনও রাস্তায় কোনো গ্রামবাসীর দর্শন মিলল না। রাস্তাগুলো সংকীর্ণ কিন্তু পিচঢালা। প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুত। গাড়িও দেখলাম অনেকের। গ্রাম প্রশাসন চালাবার জন্যে নির্বাচন হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দপ্তরকে বলে মেইরি।
আলভার্ট ভিল রওনা হবার আগের রাতটা লিওতে আমরা খুব উপভোগ করি। বিকেল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সবিরাম বৃষ্টি। আমরা যখন ডিলাক্স কোচে নৈশভোজে বেরুলাম তখনও ছিল গুড়িগুড়ি। কিন্তু সাত-আট কিলোমিটার দূরের রেস্তোরাঁয় আসতেই বৃষ্টি ছেড়ে আকাশে ফুটল অজস্র তারা। আবছা আঁধারেও প্রকৃতিকে লাগছে ঝকমকে। আবহাওয়া এত রমনীয় হয়ে উঠবে ভাবেনি কেউ। নির্মেঘ আকাশ আর শীতল ছোঁয়ালাগা হাওয়া নিয়ে এল নৈশভোজের আমেজ। গেল দুদিন ধরে আমরা এখানেই খাচ্ছি। জায়গাটি গ্রাম না শহর বলা মুশকিল। কারণ এখানে বসতী একটু ঘন হলেই শহর ও গ্রামের বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা করা যায় না। রেস্তোরাঁটি চালায় মা ও তার তরুণী মেয়ে। উপরতলায় ওদের বাসগৃহ। নিচে বিশেষ আয়োজনে ওরা দুশ জন পর্যন্ত বসাতে পারে। আমরা বসলাম ভেতরের প্রাঙ্গনে। এটি আসলে প্যাটিও। উপরে ছাউনি আর ঘেরটি খাঁচার মতো । টবে নানা জাতের ফুল। ছাউনির থামে আর খাঁচার গায়ে বিচিত্র সব অর্কিড ঝাড়।
গতরাতে সুবেদী ও চো নানা রকম ফরমায়েশে তরুণীটিকে প্রাণান্ত করেছে। আশিজন মানুষকে সামাল দিতে কষ্ট হচ্ছিল মা ও তরুণীটির। তাই তারা নতুন একটি মেয়েকে এনেছে সাহায্যকারী হিসেবে। ত্রিশোর্ধ বয়স। নতুন মেয়েটির সাথে তরুণীটির চেহারার সাদৃশ্য বলছে ওরা দুবোন। সেই থেকে সুবেদী একটি সম্পর্ক ধরে চো’কে খোঁচাচ্ছে, ‘তোমার জ্যাঠাস, কালকের মতো ডাকাডাকি করো না।’ আমরা বসেছি একটি বড় সেন্টার টেবিলে। মিসরীয় কূটনীতিক তারেক ও শাহীনাজ ঢুকে গেছে আমাদের দলে। ইয়াপেতে প্রশিক্ষণরতদের অধিকাংশই বয়সে নবীন। সদ্য ঢুকেছে চাকরিতে। এখনও গায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ধ। আমাদের ধারণা ওদের ভেতর চলছে। সুবেদী তাই ডাকছে মেহবুব-মেহবুবা।
তারেক কূটনৈতিক পরিবারের ছেলে। ওর বাবা তিউনিশিয়ায় মিসরের রাষ্ট্রদূত। বড়োভাইও পররাষ্ট্র সার্ভিসের কর্মকর্তা। শাহীনাজের তুলনায় ওর সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বেশি। ভিশির তিনমাস ও আমাদের সঙ্গী হয়েছিল।
বাঁশের ঝুড়ি থেকে বাগেতের (রুটি) টুকরো অল্পবিস্তর মুখে পুরছি আমরা। সুবেদী বোতলের ছিপি খুলতে শুরু করল। সবার সামনে জল আর ওয়াইনের গ্লাস। তারেক ওয়াইনের গ্লাসটি একটু দূরে সরিয়ে রাখায় সুবেদী বলল,
কাম অন মাই বয়, আমাদের লেভেলে না আসলে আসর জমবে কী করে।
এ কথায় গম্ভীর হয়ে শাহীনাজ তারেকের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে। তারেক পানে অনিহা জানিয়ে টেবিলে মেলে রাখে লাজুক চোখ।
এই লেভেলে আসা না আসা নিয়ে একটি গল্প আছে। সেটি সুবেদী আর তারেকের মধ্যে। আমরা তখন ভিশিতে। ভিশির ছোট্ট নদী লালিয়ের পাড় আমাদের আড্ডা, বেড়ানো এবং বিষন্নতা ভুলে থাকার চমৎকার জায়গা। নদীটির প্রবাহ শীতে মরে যায়। তখন তা হয়ে ওঠে একটি নালার মতো। আমাদের সময় শীত বেশী পড়ায় জল জমে কয়েকদিনের জন্য লালিয়ে নিথর হয়ে ছিল। গ্রীষ্মে তা হয়ে ওঠে বেগবান। তখন পর্যটকেরা আসে ইউরোপের নানা প্রান্ত থেকে। লালিয়ের পাড়ে সপরিবার কিংবা সবান্ধব ক্যাম্পিং করে তারা। নদীতে তখন স্কি নটিক, প্যাডেল বোট চালনা অথবা নির্ভেজাল সাঁতার ও বর্শিতে মাছ ধরা প্রাত্যহিকতার দৃশ্য। নদী কিনারের আধা উন্মুক্ত পানশালা, রেস্তোরাঁ, ছোটো ছোটো গলফ কোর্ট, টেবিল টেনিস, শিশু পার্কসহ একশ’ এক রকম আয়োজন। সান বাঁধানো স্থানও আছে যেখানে হতে পারে শনিবার রাতের নাচের আসর। ফাঁদে পড়ার কিছু নেই। এ সবই বিনোদনপ্রিয় মানুষের এক ধরনের খাদ্য। সেখানে নদীতে মাঝারি আকারের জাহাজে ভাসমান পানশালায় এক সন্ধ্যায় সুবেদী আর তারেক মুখোমুখী হলো। সুবেদী সবে পা রাখছিল। তারেক ভাজা সার্ডিন ফিশ ও সাদা সুরায় আগে থেকেই ছিল তুঙ্গে। নেশায় কপালের এক পাশটা কোচকানো। সুবেদীকে জিগ্যেস করল, তুমি কি তৃষ্ণার্ত?
কিসের কথা বলছ তুমি?
সুবেদীর বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল পানীয় না পানির কথা বলছে সে।
হোপলেস। জেন্টলম্যান, ইউ আর নট আপ টু মাই লেভেল। আমার লেভেলে আসো পরে কথা হবে।
শাহীনাজের কাছে তারেক আসলে লুকোতে চায় তার পানাসক্তি। সুবেদী তা বুঝেও ভিশির দিনটি তাকে মনে করিয়ে দিল। তারেক একটু বিব্রত হলেও গ্লাস স্পর্শ করল না।
আজ শেষ দিন তাই তিন কোর্সের নৈশভোজ। পানাহারের সাথে রাত বেড়ে চলে। প্রতিটি টেবিলে বেড়ে যায় আলাপচারিতার মাত্রা। সবাই কম বেশি গোলাপি ঘোরে। ইয়াপেতে আমাদের পাঠ্যক্রমের দ্বিতীয় ব্যক্তি মসিয়্যু আলবার্তি খোলামেলা মানুষ। বিশাল তাঁর দেহখানি। গালে ক্ষুর দেওয়া দাড়ি। তিনি গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন যা বিসদৃশ্য লাগে। তাঁর যে শরীর তাতে ভাড়ে মুখ লাগালে মানাত। গ্লাস মানায় কোর্স পরিচালক মসিয়্যু রাটের হাতে। গলার স্বর চিকন মোটার মাঝামাঝি। অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। কিন্তু আঁতলেমী করে বড় কঠিন ভাষায় ইয়াপের সাপ্তাহিক প্রকাশনা ‘লা নুভেল অবজারভেতয়া’র সম্পাদকীয় লেখেন। আমরা তো নই-ই আমাদের ভাষা শিক্ষক পঞ্চাশোর্ধ মাদমোয়াজেল সেনো পর্যন্ত তা বুঝতে পারেন না।
ডেজার্ট নিতে নিতে প্রথমে কোরাস শুরু করল লাতিনো গ্রুপ। সংখ্যায় ওরা দশজনের বেশি। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে এলেও ওদের সবার ভাষাই স্প্যানিস তাই কোরাসে কোনো অসুবিধে নেই। লাতিনোদের গান যেন খুলে দিল সবার হৃদয়ের রুদ্ধ দুয়ার।
আমাদের মাঝে ভিয়েতনামী দলটিও বড়। নারী ও পুরুষ মিলিয়ে সংখ্যায় তারা সাতজন। যার মধ্যে আছে মসিয়্যু থানের মতো কট্টর কম্যুনিস্ট। আনন্দ মেলা জমাতে তারাই বা বাদ যাবে কেন। অতএব তাদের গলায়ও গান এল। ফরাসি জমিনে ভিয়েতনামীদের সরব উপস্থিতি। ১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফু’র যুদ্ধে জেনারেল গিয়াপের নেতৃত্বে তারা ফরাসি বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করেছিল। গিয়াপ পেশাদার সৈনিক নন। এক সময় তিনি ছিলেন নিতান্তই একজন স্কুল শিক্ষক। বর্তমানে ভিয়েতনাম ও ফ্রান্সের মাঝে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটেছে। প্রচুর সংখ্যক ভিয়েতনামী ছেলেমেয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়তে আসছে ফ্রান্সে।
আমাদের টেবিলে শাহীনাজ, তারেক, সুবেদী ছাড়া আরও আছে নাসির, কীর্তিদা, সৌমিত্র ও চো। সার্কভুক্ত চারটি দেশ থেকে পাঁচজন। সুবেদী বলে, ‘সার্ক স্পিরিট থেকে হয়ে যাক একটা। এত এতিম হয়ে থাকার কী আছে।’ এই সার্ক চেতনা থেকে ভিশিতে আমরা একসাথে বিস্তর চলাফেরা করেছি। তখন আমাদের মাঝে ছিলেন কেরালার নেটিভ খ্রিস্টান শ্রী সাবাসতিন ও উড়িষ্যার ডাক্তার মিশ্র। আরও একজন নেপালি মেয়েকে পেয়েছিলাম আমরা। কুমারী সুরিয়া মানন্দকর। নেপালের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে কাজ করে সে। এ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্যে ফ্রান্স হচ্ছে উপযুক্ত জায়গা। তাই তিনি এক বছরের জন্যে পাড়ি জমিয়েছেন শিল্পকলার দেশে। ভিশির পর বাকি সময় থাকবেন প্যারিসে।
নাসিরের সূত্রে ভিশিতে দুজন পাকিস্তানিরও সাক্ষাৎ পাই আমরা। ওরা হলেন আখতার ও আসলাম। আখতারের রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা। রেল স্টেশনের অদূরে তাঁর রেস্তোরাঁ তাজমহল। সেখানে আসলামের চাকরি। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সাতবছর হলো লুকিয়ে চুরিয়ে চলতে হচ্ছে ওঁকে। তাজমহলের খবর পাবার চার-পাঁচ দিনের মাথায় প্রথম সেখানে ডিনারে যাই। সৌমিত্র, সুবেদী ও আমি। পরে এ অভিযানে যোগ দেয় সাবাসতিন ও সুরিয়া। পরিচিত অনেক খাবারই আছে আখতারের তাজমহলে। তবে আমাদের প্রিয় ছিল আটার রুটি ও বোম্বে মাশাল্লা (মুরগির ঝাল ফ্রাই)। ফরাসি খদ্দেরদের বিবেচনায় রেখে মেনু করা হয়েছে অন্যভাবে। যেমন এপিটাইজার দিয়ে শুরু করে এর সাথে সালাদ, সবজি ও ডেজার্ট যোগ করা হয়েছে। ঝাল অবশ্যই কম-খুব কম। আমাদের জন্যে অবশ্য বাড়তি ঝালের ব্যবস্থা ছিল। খুব বেশি আমরা যেতে পারিনি তাজমহলে। কারণ সেখানে ১০০ ফ্রাঙ্ক বা ৭০০ টাকার নিচে কোনো মেনু নেই। প্যারিস থেকে রোম যাবার পথে ট্রেনে এক ইতালীয় যুবক, ভারতবর্ষ সম্পর্কে যার রয়েছে প্রচুর পড়াশোনা, বলেছিল, ‘বিদেশে খাবারদাবারই প্রধান সমস্যা। নিজস্ব খাবারের বাইরে আমিতো ভাবতেই পারি না।’ তার সাথে পুরো একমত না হয়েও বলা যায় এ কথায় অনেকখানি সত্যতা আছে। প্রবাসে রুচি অনুযায়ী খাবার পাওয়া খুবই কষ্টের। ওই কষ্ট অতিক্রম যখন সম্ভব হতো না তখন আমরা দল করে ছুটতাম তাজমহলে। আখতারের সাথে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। ওঁদের রেস্তোরাঁয় দুএকবার বিনে পয়সায় ডিনার ছাড়াও লালিয়ের পাড়ে সেমি ওপেন বারে তাঁরা বিয়ার, লেমনে আমাদের আপ্যায়িত করেছে।
চল্লিশোর্ধ সাবাসতিনের চাকরি জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ইথিওপিয়ায়। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক কমিশনে কাজ করে সে। ওর মুখে অনর্গল কথা এবং কিছু আটকায় না। যাদের মুখ সব সময়ই চালু তাদের কথায় একটু রঞ্জন থাকে। শ্রী সাবাসতিনও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি প্রায়ই এইডসের প্রসঙ্গে বলতেন। ফ্রান্সে আসার আগে ওঁর স্ত্রী বলেছেন,
সারা জীবন তো ইথিওপিয়ার ভিক্ষুকদের সাথে কাটালে এবার পাশ্চাত্যের নারীদের দিয়ে পুষিয়ে নিও। তবে সাবধান এইডস নিয়ে ফেরা চলবে না।
সাবাসতিন কতটুকু পুষিয়ে নিয়েছিলেন তা আমরা জানতে যাইনি। তবে তিনি যে সজ্জন ও বন্ধুবৎসল ছিলেন এটুকুই শুধু জানা গেছে তাঁর আচরণে। লোকটিকে কখনও কখনও মনে হতো অতি সরল। অতি সরল অবশ্য নির্বোধের নামান্তর কিন্তু সাবাসতিন সম্পর্কে আমরা তা বলব না। খুব বেশি বললে তাকে একটু আবেগী বলা চলে। সে রাতে আমরা ট্রোকাডেরতে। ট্রোকাডের লালিয়ের পাড় থেকে একটু দূরে বার কাম রেস্তোরাঁ। ক্যাভিলমের ছাত্রছাত্রিদের জন্যে সপ্তাহান্তে নাচের আসর সেখানেই। মেঝেটাকে আমরা স্টেজ বানাই। এর সাথে ট্রোকাডেরর মরোক্কান ব্যবস্থাপক যোগ করে উন্মাতাল বাদন ও বাহারি আলোক সম্পাত। সেই বাদন ও বিচ্ছুরিত আলোকমালা স্নায়ু ও শরীরে নিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত নেচে চলে ঘর ছাড়া একপাল তরুণ তরুণী। ওইরাতে সাবাসতিন নাচছিলেন ফিনল্যান্ডের এক মহিলার সাথে। আসরে যাবার আগে বিকেলেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাজ্য জয়ের। তিনি অবশ্যই জয়ী তবে মালখানি সরেস ছিল না। দুটোর দিকে সুবেদী বাইরে নিয়ে আসে সাবাসতিনকে। সুবেদী আসলে যাচ্ছিল নামিবিয়ার পাপার আস্তানায় ওদের প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনে। পাপার আসল নাম কারও জানা নেই। সে অবিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক হবার সুবাদে এইভাবে অভিষিক্ত। ওদের আফ্রিকান সমাজে এভাবে জনক হওয়া সমালোচনার বিষয় নয়। তখন সাবাসতিন সুবেদীতে ভুল বোঝাবুঝি হয়। সাবাসতিন ভেবেছিলেন ওকে সঙ্গী করার জন্য ডাকা হচ্ছে আর সুবেদী মনে করেছিল ওঁর ফেরার সময় হয়েছে। ক্ষুব্ধ সাবাসতিন আমাকে ভিশির কেন্দ্রস্থিত পার্কের কোণের শুঁড়িখানায় নিয়ে আসে। শুঁড়িখানাটি চালায় এক দম্পতি। প্রতি উইক এন্ডেই আমরা ট্রোকাডের থেকে ফিরে তাদের রাত প্রায় তিনটে পর্যন্ত তা খোলা রাখতে বাধ্য করি। বিয়ার ফরমায়েশ করে সাবাসতিন, সুবেদী নয় ডিপ্লোম্যাটদের গালিগালাজ শুরু করে এবং চুমুকের সাথে তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। আমিও এই পেশার একজন হওয়ায় সে প্রথমে একবার শুধু ক্ষমা চেয়ে বড় নির্দয়ভাবে খিস্তি চালায়। ও মাতাল আর আমিও দ্রব্যগুণে উদার হওয়ায় ঈশ্বরের ওয়াস্তে সাবাসতিনকে মাফ করে দিই। মালিক মহিলাতো সাবাসতিনের প্রতি সব সময়ই ক্ষমাশীল। সেখানকার একটি টিভি চ্যানেলের হাসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ‘সাবাসতিন ছে ফু’ অর্থাৎ সাবাসতিন সে তো পাগল। আমাদের যেদিন মহিলার সাথে পরিচয় হলো সেদিনই তিনি অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে সাবাসতিনকে বলেছিলেন।
ডা. মিশ্র এসেছেন উড়িষ্যা হতে। ক্যাভিলমে ডিস্ট্রিবিউটর থেকে কফি নিতে নিতে পরিচয়। আমি ইংরেজিতে শুরু করলে মিশ্র বললেন তিনি বাংলা শুধু বোঝা নয় বলতেও পারেন। আমার তখন খুব ভালো লাগে আর বারে বারে মনে হতে থাকে এক সময় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এক দেশ ছিল। মিশ্র শিশু রোগের ওপর পড়াশোনা করবেন। কয়েকদিন পর বন্ধু হয়ে গেলাম আমরা। শুধু আমার নয় সবার সাথে মাখামাখি হয়ে গেল তার।
সৌমিত্র ও সুবেদী এক বিকেলে ওকে নির্জলা কোনাক পান করালে মিশ্র তার হৃদয়ের উথাল পাথাল ডা. নিবেদিতার আঁখি ও কেশের প্রশংসা করলেন আট মিনিট ধরে। তিনিও শ্রী সাবাসতিনের মতো সরল। একদিন ওর একটি টাই আমার দৃষ্টি কাড়ে। সে কথা বলতেই তিনি বলেন, ‘তাওতো এটি পুরনো হয়ে গেছে। তুমি কি অনুমান করতে পার কত বয়স হবে টাইটির?’
আমি অপারগতা জানাই।
ছাব্বিশ বছর। বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। এখনও গ্লেজ মেরে যাচ্ছে।
আমার বাক রহিত হয়ে যায়।
ফরাসিদের আচরণ নিয়ে মিশ্রের প্রশ্ন ছিল। একবার সুপার মার্কেট সে জুতোর ব্রাশ কিনেছিল। কয়েকদিন পর সেখানেই মিশ্র কোটের ব্রাশ খোঁজ করলে তাকে একই জিনিস দেওয়া হয়। মিশ্রের কাছে এখনও পরিষ্কার নয় জুতো আর কোটের ব্রাশ এক হয় কী করে। এক দেশের মানুষ হলেও উড়িষ্যার মিশ্রের সাথে কেরালার সাবাসতিনের বাকযুদ্ধ হতো প্রায়শ। অবশ্য সেক্ষেত্রে সাবাসতিনের ভূমিকা ছিল সব সময়ই আক্রমণাত্মক। আমরা জানি না কেন তিনি উত্তর ভারতীয়দের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিলেন। প্রিজুনিক শপিং মলে একবার তার আর মিশ্রের কলহ প্রকাশ্যে চলে আসে। দুজন একসাথে গিয়েছিল কেনাকাটায়। মিশ্র নিরামিষভোজী। ভারতে প্রায় ৪০/৫০ ভাগ মানুষ আমিষ নেয় না। সে খোঁজ করছিল সবজি স্যুপ। পাচ্ছিল না। সাবাসতিন তখন একটি মন্তব্য করে, ‘আধুনিক মানুষ খাবার নিয়ে এত বাছবিচার করে না।’ কথা চালাচালির শুরু নিচু গলায় হলেও কয়েক মুহূর্তেই তা সুপার মার্কেটের প্রায় পুরো ফ্লোর ছাপিয়ে উঠল। ঘটনাটি ওই পর্যন্তই। দেশে প্রত্যাবর্তনের আগে সাবাসতিন আমাকে যে ঠিকানা দিয়েছিলেন তাতে দেশের নামের জায়গায় লিখেছিলেন সাউথ ইন্ডিয়া। এসব কোনোকিছুই আমাদের কখনও খারাপ লাগেনি। বরং এশিয়া মহাদেশের বাইরে বসে এক পরিবারের সদস্যদের মতো আমরা উপমহাদেশের মানুষেরা তা উপভোগ করেছি। ইয়াপে প্রথম দিকে তৎপর ছিল যাতে ভিন্ন মহাদেশের ভবিষ্যত নীতি-নির্ধারকদের মিথষ্ক্রিয়া নিবিড় হয়। এজন্যে তারা এক দেশের দুজনকে পাশাপাশি বসতে নিরুৎসাহিত করতেন। দিন বদলের পালায় দেখা যাচ্ছে ঘুরে ফিরে সবাই ওঠা-বসা করছে কাছের মানুষদের নিয়েই। সার্ক দেশের আমরা তো আছিই, আমাদের পড়াশোনা ও আড্ডার প্রতিদিনের সঙ্গী হয়েছে কাছের দেশ মায়ানমারের চো, দক্ষিণ কোরিয়ার মি. লি হামবুর্গ আর লাওসের কুসাকুন।
এ রকম একটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আঞ্চলিকতার বিষয়টি বেশ প্রকট। সে হিসেবে সার্ক চেতনায় একটি গান সমবেতভাবে আমরা ধরতেই পারি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কোনো কমন গান আমাদের জানা নেই। তখন সুবেদীই প্রস্তাব করে, ‘এই টেবিলে বাঙালিরাই যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ তখন মাইক্রোফোন তোমাদের হাতেই দিলাম।’ পশ্চিমবঙ্গের কীর্তি সাহা আইএএস সঙ্গীত রসিক। চমৎকার বেহালা বাজান। কিন্তু গান না। সেই অর্থে আমরা কেউই গায়ক নই। নৈশভোজের এই ঢিলেঢালা আসরে আমাদের অংশগ্রহণ কীভাবে প্রাণবন্ত করা যায় সে সম্পর্কে একটি তাৎক্ষণিক ধারণা মাথায় আসে আমার। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ‘উই শ্যাল ওভারকাম সাম ডে, শুরু করি আমরা। সঙ্গীতটির রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি এবং অনেকেরই তা জানা। সবাই যখন আমাদের সাথে গলা মেলায় তখন ওই ধারণার সত্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেঘের গম্ভীর ডাকের মতো রাতের নির্জনতায় শব্দ তুলে আমরা গেয়ে যাই। রাট ও আলবার্তি বিপুল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। উন্নয়নশীল দেশের সত্তর জনের বেশি নবীন কর্ণধার প্রচণ্ড সোল্লাসে গাচ্ছে কমিউনিস্ট সঙ্গীত। অথচ সমাজতান্ত্রিক সমাজ ভেঙে পড়ছে পূর্ব ইউরোপে এবং ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে সমাজতন্ত্রের জননী সোভিয়েত ইউনিয়নেও। তারা কি ভাবছেন সমাজ ভাঙলেও আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্র মানুষের হৃদয়ে চির জাগরিত।
আলভার্ট ভিলে পৌঁছুতে সাতঘণ্টা থাকতে আমরা মধ্যাহ্ন ভোজের জন্যে যাত্রা বিরতি করলাম। বেলা একটার বেশি। আকাশ মেঘলা। সকাল আটটায় লিও থেকে যাত্রা করেছি। স্থানীয় প্রশাসন আমাদের খাবারের আয়োজন করেছে। রেস্তোরাঁয়। রেস্তোরাঁটি বিশাল এবং ভিড়ও প্রচণ্ড। ফরাসিরা তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে নৈশাহার করে। মধ্যাহ্নে অবশ্য অত সময় নেয় না এই যা ভরসা। কিন্তু সে ভরসায় কাজ হচ্ছে না। প্রায় আশিজন মানুষের একসাথে আসন সংকুলান আসলেই দুরূহ। কতকটা ব্যুফের মতো ব্যবস্থা হলো আমাদের। একটি টেবিলে খাবার রাখা আছে। নিজ নিজ আসন থেকে তা সংগ্রহ করতে হবে। বেশ গাজাগাজি করে বসলাম আমরা। খাবার আনতে জটলা লেগে গেল।
বড্ড নীচুমানের খাবার দেয়া হয়েছে। ভা দ্য তাবও (টেবিলে সাধারণত যে রেড ওয়াইন দেয়া হয়) অত্যন্ত বাজে। সেখানকার পানীয়ের লেবেলে মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত যে সনদ থাকে তা পর্যন্ত নেই। ফরাসিরা হচ্ছে পনির পাগল জাতি। এদের দোকানে, সুপার মার্কেটে তা থরে থরে সাজানো। সদ্য প্রস্তুত থেকে শুরু করে বহু বছরের পুরনো পর্যন্ত। গন্ধে আমার ভেতর থেকে অনেক কিছুই উগরে আসতে চায় অথচ সেই পনির ফরাসিরা গভীর আগ্রহে ভক্ষণ করে। পনিরযুক্ত হরেক খাবার করে তারা। আবার ডেজার্টে স্লাইস চিজও তাদের খুবই উপভোগ্য। আমার পাশে বসেছে জয়শ্রী ওয়াতাল আইএএস। অন্ধ্রের মেয়ে। মাছ, মাংস খায় না। চিজে মাছের গন্ধ পাচ্ছে বলে ঠেলে রাখল। মুখটি আমার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অনুচ্চ স্বরে বলল, আমার ভালো লাগে না।
ধারে কাছে চোখ বুলিয়ে এরপর যোগ করে,
এ্যাকচুয়ালি আই হেট দিস থিং। কেন যে ফ্রেঞ্চ পিপল পনির খায় আমি বুঝতে পারি না।
জয়শ্রী ভদ্র ও মিশুক মেয়ে। তাঁর রয়েছে সবার সাথে মানিয়ে নেয়ার সহজাত গুণ।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাঝেও আমরা আলভার্ট ভিলের দিকে এগুতে থাকি। নিঃশব্দ অথচ খুব দ্রুত দৌড়ুচ্ছে ডিলাক্স কোচ। আমাদের কেউ কেউ ঘুরে ঘুরে বাসের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছে। কেউ দেখছে রাস্তার দুধার। গড়ানো বিকেল থেকে পার্বত্য এলাকার ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করল বাস। পাহাড় শ্রেণি নিচু এবং তার পাদদেশ প্রায় সমতল। প্রায়শ কিছু না কিছু ঘরবাড়ি নজরে আসছে। সেখানে লোকজন আছে ঠিকই তবে তা লোকালয় বলতে আমরা যা বুঝি সেরকম কিছু নয়। দুচারটে বাসগৃহ, রেস্তোরাঁ, পেট্রোলপাম্প কখনও সখনও গ্যারেজ, গোলা বিভিন্ন ব্যবধানে চলার পথ জুড়েই দেখতে পাচ্ছি। প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়া স্বত্বেও ভৌত কাঠামোগত রাস্তা, বিদ্যুত, গ্যাসের সুবিধে যথারীতি সেখানেও বিদ্যমান। ফ্রান্সে বিদ্যুতের শতকরা আশি ভাগ আসে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র থেকে। রাশিয়ায় চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর এই ধরনের কেন্দ্রের ব্যবহার কমিয়ে দেবার প্রস্তাব অনেকেই করেছেন কিন্তু তা করা হলে ফ্রান্স অচল হয়ে যাবে। দীর্ঘ তেরো মাসে আমি এ পর্যন্ত বিদ্যুত বিভ্রাট পাইনি সেখানে। বাসটি এখন ছুটছে হরৎ বনভূমির প্রান্ত ছুঁয়ে। যথেষ্ট বনাঞ্চল রয়েছে সমগ্র ফ্রান্সে। আমার জানা মতে বনাঞ্চল দেশটির পঁয়ত্রিশ ভাগের কম নয়। দেশ বিশাল হওয়ায় প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের কমতি নেই এখানে। সাগর, পাহাড়, অরণ্য, সমভূমি, অসমতল প্রান্তরের বৈচিত্র্যে ভরা ফ্রান্সের ভূগোল। আরও আছে ভূমধ্য সাগর এবং অতলান্তিক সাগরের নিবিড় বেষ্টন। একটি জাতির সংগ্রামশীলতা ভৌগলিক পরিবেশের কাছে ঋণী। ফ্রান্স সেদিক হতে ভাগ্যবতী। আমাদের ভূখণ্ডও কম বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ভাগ। এই অঞ্চলেই রয়েছে পাঁচ হাজার বর্গ মাইলের চির হরিৎ অরণ্য এবং দক্ষিণ থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত দীর্ঘ উপকূল রেখা। এই অরণ্য ফরাসি মুল্লুকের বনভূমির মতো সমৃদ্ধ নয়। সংখ্যা ও বয়সের বিচারে আমাদের বনে সে মাত্রায় বৃক্ষ নেই। পঞ্চাশ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী গাছও বর্তমানে বিরল।
এঁকেবেঁকে এগুচ্ছি আমরা। বরং বলা ভালো এ হচ্ছে পেচিয়ে পেচিয়ে চলা। বাস দৌড়ুচ্ছে মন্থর গতিতে। পাহাড়ের গা বেয়ে। পাহাড়ি পথে চলাচল বিপজ্জনক। এই অভিজ্ঞতা আমার প্রথম হয় জম্মু-কাশ্মির বাস ভ্রমণে। এখনকার অবস্থাও মোটামুটি তাই। কারণ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত কেওক্রাডং-এর চেয়ে বেশী উচ্চতায় বাসটি ইতোমধ্যেই উঠে পড়েছে। আমি কেওক্রাডং-এর ধূসর রূপ দেখেছিলাম চিম্বুক পাহাড় থেকে। সেবার আমরা পনেরজন টেকনাফ হতে বান্দরবন যাই। সঙ্গে ফরেন এ্যাফেয়ার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে আমাদের শিক্ষিকা ড. পেনজলিন। আন্তর্জাতিক আইন পড়ান। খাঁটি জার্মান ইহুদি। আইনত অবিবাহিতা। টেকনাফ, বান্দরবানে ওটি ছিল আমার দ্বিতীয় ভ্রমণ। টেকনাফে নাফ নদীর কোলের ভেতর সড়ক ও জনপথ বিভাগের রেস্ট হাউজে উঠেছিলাম আমরা। দেড়শ দুশ গজের দূরত্বে বন বিভাগের বাংলো। প্রথম ভ্রমণে আবাস ছিল ওটিই আর খুব চমৎকার কেটেছিল দিনগুলো। কক্সবাজারের চেয়ে টেকনাফ বেলাভূমি আমার মনোমুগ্ধকর লাগে। দুচারটে নৌকো এবং সৈকতে নেমে আসা সি গ্যলের অস্ফুট কোলাহল স্বত্বেও তা কেমন যেন নির্জন। বেলাভূমি জলের নিচে প্রশস্থ নয়। কিছু দূর গেলেই গভীরতা দ্রুত বেড়ে যায়। সন্ধ্যের আগ মুহূর্তটি ভয়ংকর সুন্দর। জন মনিষ্যিহীন নিরালা সাগর পাড়ে মরা আলোয় মাখামাখি বিশাল জলরাশির সামনে নিজেকে লাগে দিক চিহ্নহীন বিবাগীর মতো। ওই যাত্রায় রাতটি ছিল বেশি উপভোগ্য। ফরেস্ট বাংলোর সিঁড়ি ছুঁয়ে চলে গেছে আরাকান সড়ক। গা ঘেঁষে নাফ নদী। আকাশে পূর্ণ চাঁদ। তার আলো স্বর্ণলতার মতো ঝুলে পড়ছে উদ্ভিন্ন যৌবনা নাফের শরীরে। নদীতে জোয়ার। টানে জল ফুলে আরাকান সড়ক ছুঁই ছুঁই করছে। ওপারে মায়ানমারের অন্ধকার। মাঝে মাঝে নৈঃশব্দকে টুকরো করে মূল ভূখণ্ডের পানে ধেয়ে যাচ্ছে আর্তনাদরত ট্রাক। বাংলোর পেছনে পাহাড়। তাতে ঘন বৃক্ষরাজি-জঙ্গল। পাহাড়, নদী, বনভূমির মাদকতা আমায় ঘুমোতে দেয় না। নাফে জলের ঘূর্ণন আর চাঁদের বিচ্ছুরণে চোখ রেখে আমি বারান্দায় কাটিয়ে দেই রাতের প্রায় তিন প্রহর।
দ্বিতীয় ভ্রমণে টেকনাফে আমাদের অবস্থান ছিল সংক্ষিপ্ত। সেখানে এক দুপুর কাটিয়ে কক্সবাজার হয়ে পরদিন আমরা একটি রিজার্ভড কোস্টারে বান্দরবান যাই। সহভ্রমণকারী সহিদ পাশে উপবিষ্ট পেনজলিনকে গান শোনাচ্ছিল। পাঁচ মিশেলী। পেনজলিন সব পরিবেশে খাপ খাওয়াতে ওস্তাদ। পশ্চিমে ভ্রমণকালে ওইসত্য আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। জার্মানির প্রাচুর্যময় জীবন ভোগকারী তরুণীর বাংলাদেশের দারিদ্রক্লিষ্ট পরিবেশ মোকাবিলা কম কঠিন নয়। এ প্রসঙ্গে আমার দুটো ঘটনা মনে পড়ছে। চট্টগ্রামে আমরা সে রাতে কাস্টমস রেস্ট হাউজে। রমজান চলছে। রাজনৈতিক ফায়দালোভী রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তে সারা দেশে হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ। বাবুর্চিকে বললাম নাস্তা লাগাতে। কিছু পাওয়া যাচ্ছে না ধারে কাছে। সে নিয়ে এল চা, ব্রেড আর ডিম পোচ। তিনজনের জন্যে মাত্র একটি ডিম। পেনজলিন আমাদের অতিথি সে কথাটা ওকে স্মরণ করিয়ে দিলাম। কিন্তু তবুও সে ডিমটি তিন ভাগ করে ওর অংশটুকু শুধু খেল। দুপুরে বহু কষ্টে আমরা একটি নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করি। ঘুপচি গলির ভেতর পর্দা দিয়ে বসার বেঞ্চকে শুধু আড়াল করা হয়েছে। খাবার পাওয়া যাচ্ছে এক পদের। ইলিশ এবং ইরি চালের ভাত। স্বচ্ছন্দে নয় তবে পেনজলিন খেল নির্বিকার মুখে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো পেনজলিনের জীবন অনেকটা বোহেমিয়ান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি’র যে অপরিসর ঘরটাতে ও থাকত তা ছিল ছেলেদের ঘরের মতো অগোছাল। সারা মেঝেয় ইতস্তত ছড়ানো বইপত্র। বিছানায় পর্যন্ত বইয়ের স্তুপ। সেই স্তুপের ফাঁকা জায়গায় ড. পেনজলিনের শয্যা। ঢাকা ছেড়ে রেঙ্গুন যাবার আগে এই আপাত অগোছাল তরুণীটি আমাদের জন্যে ঢাকা ক্লাবে যে ককটেল কাম ডিনার দেয় তা ছিল অত্যন্ত সুচারু। পেনজলিন নিজেও অল্পবয়সী। নবীন সিভিল সার্ভেন্টদের সঙ্গ স্বভাবতই তার প্রিয় ছিল।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে বান্দরবান রোডে পড়ার মুখে কেরানীহাটে একটি ক্ষুদ্র পুলিশদল থামায় আমাদের। বলল, ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশে এসকর্ট হিসেবে এসেছে তারা। ভ্রমণ আনুষ্ঠানিক হলে তার আকর্ষণ মরে যায়। কিন্তু জেলা প্রশাসকের এছাড়া কিছু করারও নেই। পার্বত্য জেলার পরিস্থিতির কারণে আমাদের পনের জনের নিরাপত্তায় এই ব্যবস্থা। গতানুগতিকতার বাইরে বেড়ানো যে বেশি উপভোগ্য তা সব ভ্রামনিকেরই জানা। প্রথমবার বান্দরবান যাই মুড়ির টিন বাসে। কত কিছিমের মানুষ যে আছে বাংলাদেশে আর কত রকমের স্বভাব যে তাদের তার ধকল নিতে হলে এই ধরনের বাসে দুতিন ঘণ্টার যাত্রাই যথেষ্ট। সারা রাস্তাই বাস স্টপেজ। নেমে পড়তে চান বডিতে দুটো চাটি মারুন। উঠবেন পছন্দ মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে হেলাফেলায় হাত তুলুন। গাড়ি থেমে যাবে। পয়সা বলে কথা। তো সেই মুড়ির টিন বাসের পাদানীতে পা দিয়েই সঙ্গীর হাতে ছাতা ধরিয়ে দিয়ে বললো একজন, আব্বাস তুই ধর আমার মনে থাকে না।
এর মানে লোকটি ছাতা নিয়ে নামতে ভুলে যায়। খানিকবাদে গাড়ির ঝাঁকুনি ও ঝিমুনিতে ছাতাটি আব্বাসের হস্তচ্যুত হয়। তাতেই ক্ষেপে যায় লোকটি,
সুমুন্দির পুত, একটো ছাতির বালও রাইখপার পার না।
এ জাতির অধৈর্য বড় প্রবল। নিজে যা পারে না তা না পারার জন্যে অন্যকে অভিযুক্ত করে প্রচণ্ডভাবে।
একজন যাত্রী ও কন্ডাক্টরে ঝগড়া চলছিল মারমুখী। সদ্য ওঠা যাত্রীটিকে আশ্বাস দিয়ে টেনে তোলার পর আসনতো দেওয়াই হয়নি উপরন্তু বেআক্কেল বলেছে কন্ডাক্টর। বাসভরতি বস্তাসম মানুষ। দরজায়, প্যাসেজে ঠাসাঠাসি দাঁড়ানো। কন্ডাক্টর হাসছে আর বলছে, আপনেরাই কন বসার যে জায়গা নাই তাতো পরিষ্কার। আমি কলিই বিশ্বাস কইরতে অইব। নিজের আক্কেল নাই।
লোকটির রসিকতা নির্দয় হলেও আমি ভেতরে ভেতরে হেসে উঠি। এর এক ঘণ্টা পর প্রথম দেখায়ই বান্দরবান আমার ভালো লেগে যায়। শহর কেন্দ্রটি একটি প্রাকৃতিক স্টেডিয়ামের মতো। চারপাশের পাহাড় শ্রেণি গ্যালারির নেয় ঘিরে রেখেছে সমতলের বাজার, ডিসি অফিসসহ অন্যান্য দপ্তর। বাজারের ধার ঘেঁষে সাংগু নদীর গতি পথ। সারা বিকেল ভালো কাটার পর উত্তীর্ণ সন্ধ্যা আরও ভালোলাগা নিয়ে আসে। সদ্য পরিচিত এক ভদ্রলোক পাহাড়ি তরুণ অরুণদের বাসায় নিয়ে যায় আমায়। অরুণ গায়ক, সাংস্কৃতিক সংগঠক। ওর বোন মাথিন কয়েক বছর আগে ছিমছাম বাংলা ছবি ‘মেঘের অনেক রঙ’য়ে নায়িকার চরিত্রে ছিলেন। সম্পূর্ণ অজানা হলে কী হবে অরুণ আমাকে উষ্ণতায় গ্রহণ করে। ওদের পাড়াটি নির্জন। বেশির ভাগ ঘরের ছাউনি খড়ের এবং বেড়া বাঁশের। বসবাসকারী লোকদের অধিকাংশই উপজাতীয়। ও নিয়ে আসে বালিতে ভাজা বুট, বেগুন দিয়ে রান্না ঝাল শুঁটকি আর এক বোতল পাহাড়ি । আমাদের সান্ধ্য আসরে যোগ দেয় আরও দুজন পাহাড়ি যুবক। যুবক দুজন আগে শান্তি বাহিনীতে ছিল। এদের একজনের ভাই সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। দুজনই বর্তমানে সংঘর্ষ পরিহার করে চাকরি করছেন স্থানীয় প্রশাসনে। অপরিচয়ের প্রাথমিক দূরত্ব কাটার পর আলোচনা জমে উঠলে জিজ্ঞাসা করি,
শান্তি বাহিনী সম্পর্কে পাহাড়ি জনগণের মনোভাব কী?
ওরা আমার এ প্রশ্নের জবাব দেয় একটু ঘুরিয়ে। কিন্তু খোলাখুলিভাবে,কুমিরের বাচ্চা সাঁতার শিখবে না তাতো হয় না।
এরপর আমাদের কথা আরও বহুদূর গড়ায়। আমার খুব ভালো লাগে কারণ পাহাড়ি মানুষদের সাথে ওটিই ছিল আমার প্রথম আড্ডা।
কেরানীহাট থেকে এসকর্ট আমাদের বান্দরবান নিয়ে আসে দুপুরের আগে। বিকেলে আমরা প্রায় পনের মাইল দূরে চিম্বুক যাই। বান্দরবান-চিম্বুক সড়ক যোগাযোগ তড়বড়ে। অনেক স্থানেই রাস্তায় ইট বিছানো। রাস্তার ধারে অনুচ্চ পাহাড়ে ঘন জঙ্গল, বুনো কলার ঝাড়। কোথাও কোথাও আনারস বাগান। বনভূমিতে প্রাচীন গাছপালা তেমন নেই। পাহাড়ি লোকজনের দুচারটে বিচ্ছিন্ন বাসগৃহ ছাড়া অন্য কোনো উপজাতি পল্লী আমাদের চোখে পড়ে না। এমনকি বান্দরবান শহরেও আমরা খুব বেশি পাহাড়ি মানুষ দেখিনি। বাঙালিদের তুলনায় এদের উপস্থিতি কমই নজরে এসেছে। পাক খেতে খেতে পাহাড়ের গা দিয়ে আমাদের বাহন ছাব্বিশ আসনের কোস্টারটি ক্রমশ উপরের দিকে এগিয়ে যায়। ঝলমল করছে রোদ। আমরা সমভূমি থেকে উঁচুতে থাকায় তা লাগে আরো দীপ্ত। চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত বসতি ও যথেষ্ট সবুজ না থাকায় ওই রোদে সবকিছু কেমন জানি বিরান লাগে। মরা বিকেলে আমরা চিম্বুক পৌঁছি। চিম্বুকে প্রকৃতির ছায়াময় কোল এবং উদাস ও নির্জন পার্বত্য প্রান্তর ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। লোকজন বলতে একটি টেলিকম্যুনিকেশন স্থাপনা পাহারায় নিয়োজিত সীমান্ত রক্ষীদের ছোট্ট একটি দল। সপ্তাহে একদিন বা দুদিন রেশন আসে তাদের। কাঠের বাংলোতে তাঁরা আমাদের চায়ের সাথে গ্লুকোজ বিস্কিটে আপ্যায়ন করে। চিম্বুকে আর আছে ছোট্ট একটি হেলিপ্যাড। সেখানে দাঁড়ালে শ্যাওলাভরা পার্বত্য জলাভূমি চোখে পড়ে। আমার কাছে জলাভূমিই মনে হয়। মনে হয় পাহাড়ি প্রান্তরের অনেকখানিই বদ্ধ জলাশয়। সেখানে কোনোদিন হয়তো আসবে না ফসলের দিন। চিম্বুকে টেলিকম্যুনিকেশন স্থাপনাটি সম্ভবত সবচে উঁচুতে এবং তাকে পেছনে ফেলেই আমরা দেখি সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্ঘ কেওক্রাডংয়ের ধূসর রূপ। অস্পষ্ট। ছাই রঙা।
কেওক্রাডং-এর তুলনায় আমাদের গন্তব্য আলভার্ট ভিলের জননী আলপস পর্বত অনেক সবুজ। পাদদেশের ঘাস লালচে। আস্তে আস্তে উঠছি আমরা। সমতল দেশের যারা তারা গভীর কৌতুহলে প্রায় সারা পথই জানালায় চোখ রেখে চলেছি। দূর থেকে উঁচুতে পাহাড়ের কিনারঘেঁষা একটু খাড়া মতো রাস্তায় পিঁপড়ের মতো বিড়বিড় করে চলা বাসগুলোকে দেখতে ভয়ংকর লাগে। মনে হয় সামান্য অন্যমনস্কতায় স্টিয়ারিংয়ের একটু এদিক-সেদিকে কপালে জুটে যেতে পারে খাদ গড়ানো মরণ। প্রায় এক দশক আগে জম্মু-কাশ্মির পাহাড়ি পথে প্রথম বাস ভ্রমণে বুক কতবার যে কেঁপেছিল তা এখনও অনুভবে আছে। তবে ওই পথের তুলনায় আলপসের সড়ক চওড়া ও মসৃণ। গাড়ির অবস্থা অনেক ভালো। ওই যাত্রায় উনত্রিশ আসনের একটি বাস একজন শিখ ড্রাইভার দক্ষতার সাথে জম্মু থেকে শ্রীনগর নিয়ে আসে।
আকাশে মেঘ থাকায় সন্ধ্যে লেগে গেল আগেই। মেঘের আড়ালে সূর্য কোথায় যে লুকিয়েছে খুঁজতে যাওয়া বৃথা। ঘনায়মান সন্ধ্যায় শুরু হলো অল্প অল্প বৃষ্টি। বাইরে যা শীতের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ভেতরে হিটার চালু থাকায় আমরা একদম নিরাপদ। সুবেদী প্রতিক্রিয়াহীন বসে। পাহাড়ের রহস্যে ওর কোনো কৌতুহল নেই। বিশ্বের সবচে উঁচু পাহাড় চুড়ো মাউন্ট এভারেস্টের দেশের মানুষকে আলপস দেখে বিচলিত কিংবা উচ্ছসিত হতে নেই তার অবয়ব সে অভিব্যক্তিই ধরে রেখেছে।
বৃষ্টি ক্রমশ বেগবান হচ্ছে। গাড়ির হেড লাইটের আলোয় তার ঋজু ফলা দেখা যাচ্ছে স্পষ্টই। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফিট উপরে একটি হোটেলের সামনে খানিকবাদে বাসটি দাঁড়ালে আমরা দৌড়ে সেখানে ঢুকলাম। হোটেলে আমার জায়গা পড়েনি। এতগুলো লোকের আবাসন একসাথে সব সময় সম্ভবও নয়। আর জনবিরল বলে হোটেলটি বড় করেও করা হয়নি। আমার জায়গা হয়েছে কাছের একটি দোতলা বাংলোর উপর তলায়। সঙ্গী নাইজেরীয় আবু বকর। নিচতলায় ভিয়েতনামের মসিয়্যু পুং আর তাঁর স্বদেশী। রুমের চাবি হাতে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়েছে অবিরল ধারায়। জনমানবহীন প্রান্তরে বৃষ্টির গান নিয়ে আসে এক অন্য ধরনের নির্জনতা। কেউ কোথাও নেই। হোটেল লবিতে শুধু আমরা সত্তর-আশি জন। দৃশ্যমান লাইট পোস্টের হলুদ আলো ছাড়া এখন বাইরের পুরোটাই অন্ধকারে নিমজ্জিত। হোটেলের কাচের দেয়াল ও শার্সিতে লেগে থাকা বিন্দু বিন্দু জলের মধ্য দিয়ে নিষ্প্রভ আলোয় তাকালে চারপাশের আঁধার আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অন্ধকার ও বৃষ্টিপাত, হিমাংকের নিচে চলে যাওয়া তাপমাত্রা, সুতীব্র শীতের থাবা উপেক্ষা করে আছে কী কোনো প্রাণী ডেরার বাইরে। আলপসে এ বছর এখনও তুষারপাত শুরু হয়নি। আমাদের সামনেই অল্প অল্প বরফ পড়া শুরু হলো আর বেড়ে চলল বৃষ্টি। রুদ্র প্রকৃতির রোষে পড়া আলপসে আজ অন্যরকম রাত। মাটি থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফিট উঁচুতে পাথুরে মাটিতে এখন আদিকালের বন্য নিশি।
বাসে করেই আমরা বাংলোতে এলাম। নির্দিষ্ট বাংলোর সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে সবাইকে। খোওয়া ওঠা ভাঙা রাস্তা। কয়েক গজ হাঁটতেই ঢাকা থেকে কেনা অক্সফোর্ড জুতো কাদায় একাকার হয়ে গেল। পোশাক ছেড়ে ধোওয়ামোছা শেষে আবার আমরা ফিরব হোটেলে। আলপস রজনীর নৈশভোজ সেখানেই।
আমাদের রুমটি আধা উষ্ণ। বিছানা পরিপাটি। হিটারের মাত্রা চড়িয়ে দিলাম। এই পর্বতশৃঙ্গে বভূমির শ্যামলিমায় ঢাকা বাংলোয় কাঠ কয়লার চুল্লির আগুনে দেহ গরম রাখাটা হতো বেশি মানানসই কিন্তু পৃথিবী এত এগিয়ে গেছে যে সেখানে এখন বৈদ্যুতিক হিটার। আবু বকর এর মধ্যেই কাপড় ছেড়ে শুধুমাত্র সটর্স পরে। ওর দেহ ঘরখানি ঘন কালো। মুখে ব্রণের দাগ কালোর মাঝে অস্পষ্ট। লাজুক চাহনি। নাইজেরীয় অর্থ মন্ত্রকে কাজ করে সে। আবু বকর স্নানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাকে বলে,বাথরুমে গরম পানি আছে গোসল সেরে নাও। চমৎকার লাগবে।
আমার নিজের ইচ্ছেও তাই। ভ্রমণ শেষে স্নানে ফুরফুরে ভাব আসে। ছোট্ট সাইড ব্যাগের জিসিপত্র বের করে ফেলি। জার্নিতে চিরকাল আমার সম্ভাব্য কম জিনিস বহনের অভ্যেস। সেদিকে তাকিয়ে বকর দেখল আমার সাবানটি কৃষাকার ধারণ করেছে। বলল,
সাবান লাগলে নিতে পার।
এবং জবাবের প্রতীক্ষা না করেই নিয়ে এল সাবানের বাক্সটি। নাইজেরীয়ানদের সম্পর্কে আমার ধারণা ভালোই তবে আফ্রিকানদের নিয়ে এইডস ভীতি বিস্তর। আফ্রিকার অনেক দেশেই বর্তমানে প্রতি সাতজনের একজন এই রোগে আক্রান্ত। বকরের ব্যবহৃত সাবানটি লক্ষ করে তাই আমি না, না করে উঠলাম। ও কিছু মনে না করে নিরীহ বালকের মতো কক্ষ ত্যাগ করল।
প্রথম যে নাইজেরীয় ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় হয় তিনি ছিলেন পিকিং ও ঢাকায় তাঁর দেশের রাষ্ট্রদূত। কার্যপোলক্ষে ঢাকায় আসতেন। একবার তাঁর প্রটোকল করার সময় ভিআইপি সড়কে সিগন্যালে থেমে ছিলাম আমরা। ছুটে এল দুজন ভিক্ষুক এবং পেছনের জানালায় প্রসারিত করল হাত। রাষ্ট্রদূত আমার পাশে। চাপা স্বরে বিরত করতে চাইলাম তাদের। কিন্তু গ্যাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তারা। এটি আমার স্মৃতিতে স্মরণীয় বিব্রতকর ঘটনাগুলোর একটি।
রাষ্ট্রদূত খুব বিবেচক মানুষ। খোলাখুলি বললেন, তোমার বিব্রত হবার কিছু নেই, নাইজেরিয়ায় এ দৃশ্য অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।
আমার দেখা দ্বিতীয় নাইজেরীয় মেজো ফ্রাঙ্কো-ব্রিটানিকে আমার ফ্লোরমেট। কিচেনে রান্না করতে করতে আমাদের যেটুকু গল্প। মেয়েটির মার্কিন ধাচের সাবলীল ইংরেজি বুঝতে শ্রবণকে প্রায়শ তীক্ষ্ণ না করলে চলে না। স্টেটসে শৈশব কেটেছে। ওর বাবা ধনকুবের। এক সময় পাকিস্তানে নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন। রান্নায় প্রায়ই খাবার নষ্ট করে মেয়েটি। চুলোর টাইমার ও তাপ ঠিক করে তাতে রান্না তুলে রুমে পড়তে শুরু করে সে। আর এদিকে খাবারটি হয় উথলে ওঠে না হয় পুড়ে কালো হয়ে যায়। দৌড়ে এসে সে তখন বলতে থাকে, ‘মা এরকমই বলে দিয়েছিল কিন্তু সময় ও তাপ কোনোটাই মিলছে না।’
পরিচ্ছন্ন হয়ে আমরা যখন হোটেলে এলাম তখন বৃষ্টির বিরতি চলছে। আলপস পার্বত্য ভূমিতে গাঢ় কালো রাত। আকাশে কোনো তারা নেই। নিঃসাড় মেরে আছে প্রকৃতি। দোতলার খাবার ঘরটি বিরাট। হলরুমের মতো। টেবিল সাজানো হয়েছে এর মধ্যেই। আবু বকরকে নিয়ে বসি। আমাদের সাথে যোগ দেয় সুবেদী, কীর্তিদা, নাসির আর মৌরিতানিয়ার এক সুবেশ যুবক। পরনে কালো স্যুট। টাইয়ের নটটি নিখুঁত। পানপাত্রে সুরা ঢেলে দেয় এক সোনালি কেশের তরুণী। টেবিলে আমাদের দেখভালের দায়িত্ব তার। লোকালয় থেকে দূরে, নিভৃতে এই রমণী বহুকাল ধরে হয়তো আমাদেরই প্রতীক্ষায় ছিল। কখন শুরু হবে বেড়ানোর মওসুম। সে মওসুমে হৃদয়ে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে পর্যটকদের কেউ আসবে একা কিংবা দল বেঁধে। আর পর্বত শিখরে এই অরণ্যাচারী নারীরা জানাবে তাদের স্বাগত।
আবু বকর পানপাত্রটি সরিয়ে রাখে। শান্ত স্বভাবের অধ্যবসায়ী নামাজি সে। আমি স্বর্ণকেশীকে এক প্যাকেট গোলওয়াজ দিতে বলি। এটি হচ্ছে ফরাসিদের পপুলার ব্রান্ড। তাবা (tabac) ছাড়া এখানে সিগারেট পাওয়া যায় না। কিন্তু অবস্থান লোকালয় থেকে দূরে পার্বত্য অঞ্চলে হওয়ায় হোটেলটিতে অল্প সিগারেট রাখা হয়। যথারীতি সিগারেট এল এবং দুঘন্টায়ই ধোঁয়া হয়ে গেল অথচ রাতের এখনও শুরুই হয়নি বলা চলে। ঘড়ির কাটা কেবল দশটা পেরিয়েছে।
প্লেটে চামচ ছুরির কাটাকাটি কমে আসছে ক্রমশ কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে কথাবার্তা। সবখানেই পানাহার আরম্ভ হয় নীরবে কিন্তু শেষ প্রহরে আসর কোলাহলময় হয়ে ওঠে। আমাদের নৈশ সমাবেশটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ডেজার্টে ফলাহার এবং শেষ পর্বে নাচ এখনও বাকি কিন্তু এর মধ্যেই এলেবেলে ভাব এসে গেছে অনেকেরই।
সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও ফ্রান্সের বিশাল এলাকা নিয়ে আলপস পর্বতমালা। সেই আলপসের আলভার্ট ভিলে আজ মওসুমের প্রথম তুষারপাত। কাচের কুঁচির মতো, বাতাসে শিমুল তুলোর ওড়াউড়ির মতো বাইরে ঝরছে বরফ দানা। পানপাত্র তাই খালি যাচ্ছে না। দুর্গম পর্বতে যেন শুরু হয়েছে তুষারপাত বরণ উৎসব। একটি বিরাট সেন্টার টেবিলে ফলমূলের স্তুপ। সেটিকে ঘিরে নাচছে তিন মহাদেশের আটজন। একটি হাফ প্লেটে সেখান থেকে শুধুমাত্র একগুচ্ছ আঙুর নিয়ে আসি আমি। নাচের দলটির কলেবর বাড়তে থাকে। তারা একে অপরের কোমরে হাত রেখে শেকলের মতো হয়ে এবার খাবার টেবিলগুলোর মাঝে এঁকেবেঁকে নাচতে থাকে। যারা বসে তারা তাতে তালি কিংবা টেবিলে মৃদু চাপড়ে ওদের উচছাসে উৎসাহ জুগিয়ে যায়।
আমার রুমমেট আবু বকর ‘জে ছুই দেজলে’ (আমি দুঃখিত) বলে চেয়ার ছেড়ে দেয়। তার ঘুম পেয়েছে আর এসব ভালোও লাগছে না। অধিকন্তু কাল ভোরেই যেতে হবে শীতকালীন অলিম্পিকের নির্মাণ কাজ দেখতে। অর্থাৎ প্রায় দুপুর অবধি টানা দর্শন ও শ্রবণের ধাক্কা। আবু বকরের শয্যা যাত্রাকে অনুসরণ করে নাসির। বয়সজনিত কারণে নাসির একটু বিশ্রাম প্রিয়। ওরা উঠলে শূন্যস্থান দুটো দখল করে লিথুয়ানার রুতা ও ওর স্বদেশীয় ভিওলেত। এর মধ্যে বাজনার তালে কয়েক দফা নেচে ক্লান্ত ওরা। রুতা ভিওলেতের তুলনায় অনেক কম বয়সী। মাত্র বাইশ-তেইশের তরুণী। জেনেভায় পড়াশোনার কারণে ওর ফরাসি উচ্চারণ চমৎকার। ভাষায় দখলও ভালো। জেনেভার প্রায় আধাআধি অধিবাসীর মধ্যে ফরাসির প্রচলন।
রুতার বিশ্রাম হয় না। মিসরের প্রগ্রেসিভ খালেদ দ্বৈত নাচের জন্যে ওকে টেনে তোলে। এক ধরনের মৃদু গর্বে রুতা উঠে দাঁড়ায়। পাশ্চাত্যে নাচের জন্যে যুবকের আহবান অবশ্যই নারীর জন্যে আনন্দের। প্রাচ্য রমণীর দ্বৈত নৃত্যে পারদর্শিতা খুব কম। আড়ষ্টতা ততোধিক। কিন্তু মেক্সিকান আলবার্তোর পীড়াপীড়িতে জয়শ্রী ওর সাথে ফ্লোর নিল। নৃত্যসংক্রামক কিনা জানি না তবে এসবে উদ্দীপ্ত হয়ে এক ভিয়েতনামি ভদ্রলোক ভিওলেতকে অনবরত ঈশারা করে চললেন। ভদ্রলোক নেশায় প্রায় চূড়। ভিওলেতের জন্যে এ এক কঠিন মুহূর্ত। নাচতে তার আপত্তি নেই কিন্তু মাতালের সাথে সে কম্ম ওর নয়। অতএব ভিওলেতের আর নাচা হলো না।
রাত বেড়ে চলে। আলপস্‌ রজনীর তুষারপাতের মতো অব্যাহত থাকে নাচ। আমি সেসব দেখি আর ভাবি। হৃদয়ে পাহাড় এবং অরণ্যের কথকথা লেখা হয়ে যায়।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.