অনুবাদ কবিতা

ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি ও আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কির দুটি কবিতা

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | 20 Jun , 2008  

অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

majakovskijface.jpg
ভ­াদিমির মায়াকভস্কি (জন্ম. বাঘদাতি, জর্জিয়া ১৯/৭/১৮৯৩ — ১৪/৫/১৯৩০)

১.

ভিন্নরুচির্হিঃ লোকাঃ

ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি

ঘোড়াটি
দেখে উটটিকে
নিজস্ব কর্কশ অট্টহাস্যে লুটোপুটি
ফেটে প’ড়ে বলে, “মন,
চেয়ে দ্যাখ্,
ঘোড়াত্বের কী-সাঙ্ঘাতিক এ-
অতিরঞ্জন!”

বিরক্ত উটটি তখন:
“তুই — ঘোড়া!
নাহ্!
তুই তো অপরিণত এক
উটই।”

শুধু বিধাতাই,
সর্বজ্ঞ যে-জন,
জানত, ওরা
স্তন্যপায়ী
দু’টি
ভিন্ন ঘরানার।

২.

নাক

আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কি

নাক নাকি বাড়ে মানুষের আজীবন
(বৈজ্ঞানিকের গবেষণা অনুযায়ী)।

এই গতকাল বললেন ডাক্তার:
‘মাথায় তোমার যত বুদ্ধিই থাক্,
নাসাটা তোমার পুরো জ’মে গেছে, ভাই।’
তবে ঠাণ্ডায় বাইরে যাস্ নে আর,
নাক!

আমার উপরে, তোমার উপরে, আর ঐ কাপুচিন
মঠবাসীদের ’পরে
চিকিৎসা-বিদ্যার কিছু জানা সূত্রের নির্ভরে,
ঘড়ির মতন নাগাড়ে, বিরতিহীন
সোল্লাসে বাড়ে নাসাতরু দিনদিন।

রাতারাতি তারা বেড়ে চলে অনুখন
প্রতি নাগরিকে, বিশেষ বা সাধারণ,
সান্ত্রির তথা মন্ত্রীর ’পরে, ধনী তথা গরিবের,
প্যাঁচার মতন নিশি-ডাক ছেড়ে ছেড়ে,
ঠাণ্ডা এবং প্রায়-নিষ্ক্রিয়, মেরে
ফাটিয়ে দিয়েছে মুষ্টিযোদ্ধা যাকে,
অথবা থেঁৎলে গিয়েছে যা দরোজায়,
আর আমাদের স্ত্রী-জাতি পড়োশিদের
সেগুলি যে, আহা, তুরপুন হয়ে ঢোকে
কত দুয়ারের চাবির ছিদ্রে, হায়!

গোগল-মরমি, ঝঞ্ঝেটে আত্মাটি
ধ্যানে জেনেছিল ইহাদের খুঁটিনাটি।

আমার ইয়ার বুগিন্্স্, মদের ঘোরে
স্বপ্ন দেখল, যেন গির্জার চূড়ার মতন চোখা
হয়ে, ঝাড়বাতি-বালতি-গামলা টুটে,
জাগিয়ে এবং বিঁধে ফেলে যত অবাক্ সিলিং, পরে
গেঁথে মেঝেগুলি-খোঁটে
রিসিট যেমন গেঁথে রাখা হয়-তারপর একরোখা
উঠে গেল নির্বাক্
উপরে, আরও উপরে
তার আপনার নাক।

‘এর মানেটা কী?’ পরদিন প্রাতে আমাকেই শুধাল সে।
‘হুশিয়ারি কেয়ামতের: হয়তো,’ আমি বলি, ‘তোর বই-
পত্রের হ’তে পারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শীঘ্রই।’
তিরিশ তারিখে বন্ধু-বেচারা ঢুকে গেল কারাগারে।

কেন, হে প্রধান নাক-বিধায়ক, কেন
বাড়ে আমাদের নাকগুলি, আর কমে আয়ু আমাদের?
কেন এই ছোট মাংসপিণ্ড রাতের অন্ধকারে
আমাদের শুষে ভ্যাম্পায়ার বা সাক্শন-পাম্প্-হেন
খালি করে একেবারে?

এস্কিমো জাতি, এরকম শোনা যায়,
মুখের বদলে নাক দিয়ে চুমু খায়।

আমাদের মাঝে এখন অবধি চলন হয় নি এর।

(ডব্ল্যু এইচ অডেনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে)

vozleaningontree.jpg
আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কি (জন্ম. মস্কো, ১২/৫/১৯৩৩)

AG210022@ncr.com


9 Responses

  1. kajal shaahnewaz says:

    সুব্রত’র অনুবাদের মজা হলো, এতে মূল কবিতার আনন্দ তো থাকেই, সাথে থাকে নিজস্ব কবিতার রস। থাকে ওর বাংলা ভাষা, সংস্কৃত পাঠ আর নানা রকম অন্যমনষ্কতা। আর ইদানিং এর সাথে যোগ হয়েছে মুখের ভাষা চলন। সব মিলিয়ে জমজমাট অবস্থা। সুব্রত, ব্লেকের অনুবাদগুলিও আমি মজা করে পড়েছি।

    কা.শা

  2. Subrata Augustine Gomes says:

    কাজল,

    প্রিয় কবি, প্রিয় লেখকের কাছ থেকে প্রশংসা পাবার সৌভাগ্য হ’ল আমার… আহ! পাব-এ যেতেই হচ্ছে, বৌ যা পারে করুক!

    সুব্রত

  3. jewel mazhar says:

    সুব্রতর অনুবাদ পড়া সব সময়ই আমার কাছে তৃপ্তিকর অভিজ্ঞতা। অনুবাদ পড়তে গিয়ে যদি মনে হয় অনুবাদ পড়ছি তাহলে পড়া সেখানেই ক্ষান্ত দিই। সুব্রতর অনুবাদ পড়তে গিয়ে এমনটা কখেনাই হয়নি্‌। দুটো ভিন্ন ভাষার ভিন্নতা ঘুচিয়ে দেবার ঘটকালি সুব্রতর মতো কারো মধ্যে দেখিনি আমি — অন্তত আমার চেনা বলয়ের কারো মধ্যে। বোধ করি, বিপুল বিস্তৃত পাঠবিশ্ব, অসম্ভব কল্পনাপ্রতিভা আর সৃজন-ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যাখ্যার অতীত কোনো ব্যাপার আছে ওর। প্রথম অনুবাদকমর্টি আমার অনেক আগেই পড়া। দ্বিতীয়টি পড়লাম এবারই প্রথম। অনুবাদে কতো যে মজা করা যায় সুব্রত সেটা দেখিয়ে চলেছে নিরন্তর। এমন অনেক কবিতা আছে যেগুলো অনুবাদ করতে গিয়ে আমি কঠিন পাথরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছি। পরে সুব্রতর অনুবাদে সেগুলো পড়ে মনে হয়েছে: অনুবাদ তাহলে এত্তো সহজ ব্যাপার!…কেমনে ব্যাটা পেরেছে সেটা জানতে!
    জয়তু সুব্রত। যুগ যুগ জিয়ে…!!!

    জুয়েল মাজহার

  4. মাসুদ খান says:

    সুব্রত-র অনুবাদ (ইংরেজি থেকে বাংলা, বাংলা থেকে ইংরেজি উভয়তই) সুখপাঠ্য ও স্বাদু। যতবার আস্বাদ, ততবারই স্বাদ!

    প্রথমত সুব্রত কবি, তার উপর বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই রয়েছে তাঁর অনায়াস দক্ষতা, মুন্সিয়ানা। তা ছাড়া তিনি আরো কী কী ভাষা যেন জানেন মনে হয়! ফরাসি-টরাসি তো আছেই…কী কী যেন সন্ধ্যাভাষা, গুহ্যমন্ত্রও জানেন বোধ হয়। তাঁর মূল লেখালিখি, অনুবাদকৃতি সব জায়গাতেই ওইসব সন্ধ্যাভাষা-গুহ্যমন্ত্রের ছায়া দেখা যায়। এখানে এর আগে তাঁর যেসব অনুবাদকর্ম প্রকাশিত হয়েছে, সবগুলিই ভালো লেগেছে। ছন্দোময়, স্বচ্ছন্দ, সাবলীল…।

    জয় হোক সুব্রত-র!

    মাসুদ খান

  5. audity falguni says:

    সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কবিতা ও অনুবাদ দুইয়েরই ভক্ত আমি অনেক দিনকার। আজো সামনা-সামনি না দেখা ও সামনা-সামনি পরিচয় না হওয়া এই কবি ফেব্রুয়ারি ২০০৪-এ স্রোতচিহ্নে আমার একটিমাত্র কবিতা পড়ে নব্বই দশকের কবিতার একটি আলোচনায় নব্বইয়ের কবিতা (নারদ! নারদ!), স্রোতচিহ্ন ফেব্রুয়ারি ২০০৫-এ আমাকে নিয়ে দু/তিন লাইন লেখার যে অসীম ঔদার্য প্রদর্শন করেছিলেন, তাতে কিঞ্চিৎ হতবিহ্বল আমি ই-মেইল ঠিকানায় প্রায় সতেরোটি কবিতা পাঠিয়েছিলাম। যার সব ক’টির ছন্দই তিনি পরিমার্জ্জনা করে দেন এবং আমাকে কবিতার বই প্রকাশ করতে বলেন। এই দেনা আমার কোনোদিন কোনোভাবেই শুধবার নয়! মাসুদ খান অবশ্য স্বল্পভাষী মানুষ। তাঁর কবিতা ‘বৈশ্যদের কাল’ এতটাই টেনেছে আমাকে যে গোপনে একটি সিরিজ গল্প লিখছি এই নামে। যার একটি মাত্র প্রকাশিত হয়েছে দাহপত্র ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সংখ্যায়। যেখানে অবশ্য ব্রাত্য রাইসুও একটি চরিত্র। অবশ্য মাসুদ খানের সব কবিতাই ঠিক এতটা মনোযোগ টানে নি আমার। আর, সবার শেষে জুয়েল মাজহারকে বলি আপনি যে এত অসাধারণ অনুবাদ করেন (সাম্প্রতিক সময়ের লোরকা অনুবাদ), তা’ এতদিন কেন জানতাম না?

    অদিতি ফাল্গুনী

  6. Subrata Augustine Gomes says:

    প্রিয় কবি ও বন্ধু মাসুদ খান আর জুয়েল মাজহার, আপনাদের ধন্যবাদ কী দেব, আমি ধন্য হয়ে গেলাম…

    সুব্রত

  7. kamal raahman says:

    ঠিক থাক, আমাদের নাক, সুব্রত, পুরোটা যেন না ডোবে, পাবে!

    kamal raahman

  8. Subrata Augustine Gomes says:

    যথার্থ আজ্ঞা করেছেন কামাল ভাই, কাজল, জুয়েল আর মাসুদ ভাইয়ের সৌজন্যে কোনোমতে নাক ভাসিয়ে ছিলাম, এবার অদিতি এসে একেবারে ডুবিয়ে দিল ওস্তাদের মার।
    অদিতি আমার বিশেষ প্রিয় লেখক এবং আমার অখাদ্য রচনা নিয়ে একধিকবার লিখে আমাকে কৃতার্থ আর অবাক্ ক’রে দিয়েছেন। আবারো ঋণী করলেন, ঋণখেলাপিও।

    সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

  9. jewel mazhar says:

    সাধু!সাধু!
    ঋণী এবং আলবৎ ঋণখেলাপি — পরস্পর আমরা সকলে!

    অদিতির কল্যাণে এক্ষণে এই অধমও সনাক মজ্জমান ঋণে। এমন ঋণ শোধ করার দুর্মতি যেন কস্মিনকালে না হয় আমার (আমাদের)!

    অদিতি, প্রিয় ভগিনী আমার, এই মহানুভবতাটুকু মাথায় তুলে রাখি।

    মন্তেব্যর ঘরটাতে দেখি অনেক চেরাগ জ্বলছে বেশুমার। তাতেও খাসা হয়ে বিরাজিছেন ভায়া সৃব্রত। এবং অতি অবশ্যই তিনি, যিনি লেখেন:`ঠিক থাক, আমাদের নাক, সুব্রত, পুরোটা যেন না ডোবে, পাবে!’

    সুব্রতকে বলি, এইবার মহান কোলরিজকে চাই, চাই তার `কুবলা খান’কে এইখানে, এই আন্তর্জালে — বিডির পাতায়। অন্যথায় স্মারকলিপি প্রস্তুত (আমরা রাজনীতি করা ছেলে! দাবি আদায়ের কায়দাকানুন আমরা ঢের জানি)!!!

    জুয়েল মাজহার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.