স্মৃতি

বকুলের নাইওর

মীর ওয়ালীউজ্জামান | 22 Jun , 2008  

শিমুলের মা বকুল। কাজী হুসনেআরা বেগম। ১৯৪৬ সালে আঠারো বছর বয়সে বকুলের বিয়ে হয় কোলকাতাবাসী বাটা স্যু কোম্পানির চাকুরে মীর আমজাদ আলীর সঙ্গে। কোলকাতায় বছর দুই সংসার করে ভারতভাগের পর গর্ভবতী বকুল বাপের বাড়ি যশোরের মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার চৌগাছি গ্রামে ফেরেন। পরের বছর বড় ছেলে শিমুলের জন্ম ওখানেই। আর কোলকাতা ফেরা হয় না বকুলের। আমজাদ আলী বদলি হয়ে কোলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫০ থেকে ওদের ঢাকায় বসবাস।

ভাড়াবাড়িতে সংসারযাত্রা। সেকালের ঢাকা অর্থাৎ পুরনো ঢাকা নামে এখন যে এলাকা পরিচিত, মোটামুটি জনপদ ছিল। রাস্তাঘাটে তেমন ভিড় ছিল না। পিচঢালা রাস্তায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত এঞ্জিনের ওপর বডি বসানো বাস দু’একটা বিস্তর শব্দ করে চলত গুলিস্তান-সদরঘাট-পাটুয়াটুলি- চকবাজার-পলাশি-আজিমপুর-নিউমার্কেট রুটে। ভাড়া ছিল এক আনা, দু’আনা। ষোল আনায় একটি টাকা হত। এক টাকায় তখন বত্রিশটা বিশুদ্ধ বরফের কাঠি বেঁধানো আইসক্রিম পাওয়া যেত। দু’আনা খরচ করলে অত্যন্ত সুস্বাদু ক্রিম, পেস্তাবাদাম গাঁথা বেবি, ম্যাংগোলিয়া কোম্পানির আইসক্রিম খাওয়া যেত। এক আনার অর্ধেক দু’পয়সায় ঝালমুড়ি পাওয়া যেত, একই পয়সায় চিনেবাদাম কিনে শর্টসের পকেটে পুরে, ঘুরে ঘুরে, ভেঙে ভেঙে খাওয়া চলত বেশ কিছুক্ষণ। দু’আনায় একশিক কাবাব আর দু’আনায় দু’টো পরটা কিনলে তোফা পেটপুজো সারা যেত একবেলার মত।

ওহ্, কেবল খাবার-দাবারের কথাই হচ্ছে। ফেরা যাক্ বকুলের নাইওর করার গল্পে। শ্বশুরবাড়ি পাবনা যাবার সুযোগ তেমন না ঘটলেও বকুলের ফি’বছর বাপের বাড়ি যাওয়াটা কেমন-কেমন করে যেন ঘটে যেত। নানান কাজে ঢাকায় আসা মামা-খালু-নানা, কারো না কারো সঙ্গে বকুল ঠিকই বাপের বাড়ি যেতেন, বছরে অন্ততঃ একবার তো হতই। শিমুলদের তখন পোয়াবারো। চৌগাছি যাওয়া মানেই তো দিনরাত অফুরান আনন্দ — শিমুল, রবু, বোন নাজু, মামাতো ভাইবোন মতি আর জাহানা, পাশের বাড়ির যুঁথি, জিনুদের সঙ্গে সকাল-বিকেল ছুটে বেড়ানো, প্রজাপতি-ফড়িং ধরার জন্য কাঁটামান্দার গাছের আঠালো কষ পাটখড়ির মাথায় লাগিয়ে একলক্ষ প্রজাপতির পেছনে দৌড়ে বেড়ানো, তল্লাটের শেষে সিংদের ভিটেয় আলো-আঁধারিতে পিলে চমকানো অনুসন্ধানী অভিযান, উদ্ধার — বড়দের সঙ্গে নৌকো চেপে এবাড়ি-ওবাড়ি, এপাড়া-সেপাড়া, কুঠি চৌগাছি ডাকঘরে চিঠিপত্র ডাকবাক্সে ফেলতে, মায়ের নামে ঢাকা থেকে আসা মানি অর্ডারের টাকা আনতে যাওয়া — আরও কত কি আয়োজন! পুরো একটা বছর হুল্লোড়ে মেতে কাটানো, স্কুলে না যাওয়া — আজকের বাচ্চাদের জন্য ওরকমটা ঘটবার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই হয়। কিন্তু পঞ্চাশ বছর আগে, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এধরনের ঘটনা যে কোনো পরিবারেই ঘটতে পারত। নানাবাড়ি-দাদাবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক শহরবাসী নাতিপুতিদের ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, টান ছিল অদম্য, অকৃত্রিম। নাড়ির টান যাকে বলে, সেই টানে শিমুলের মা বকুল যেন বাপের বাড়ি যাবার সম্ভাবনা তৈরি হবার অপেক্ষাতেই থাকতেন।

মেজমামাই সেবার চৌগাছি থেকে ওদের নিতে এসেছিলেন। মেজমামা টুকুর সঙ্গে মা বকুলের সম্পর্ক যেন একটু বেশিই হৃদ্য — শিমুলের মনে হত, ওই বয়সেই। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ার সুবাদে শিমুলের বাবা ট্যাক্সিতে ওদের নারায়ণগঞ্জ স্টিমারঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। শিমুল-রবু-নাজু, ওদের মা-বাবা আর মেজমামা — সবাই মিলে-মিশে সেকালের বিশাল পেটমোটা হলুদ-কালো শেভ্রলের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছিল। ওই রকম লম্বা-চওড়া শেভ্রলে, ওল্ডসমোবিল, ফোর্ড গাড়িগুলো বহুদিন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করে, পরে একসময় হারিয়ে যায়। গাড়ির ট্রাঙ্কে মায়ের দু’দুটো বড় মেজো স্টিলের ট্রাঙ্ক, বিশাল হোল্ড অল, গোটা দুই টিফিন ক্যারিয়ার, বেতের বাস্কেটে গ্লাস, প্লেট, চায়ের কাপ, পাঁউরুটি, বিস্কুট আর ফলমূল। ভরা বর্ষায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের দু’দিকে বুড়িগঙ্গা এবং বিলঝিলের টইটম্বুর জলরাশি থৈথৈ নাচছে। পাগলা, চাষাড়া পেরিয়ে, পুকুর আর গেঞ্জি কারখানার খটাখট শব্দ শুনতে শুনতে ওরা স্টিমারঘাটে পৌঁছে গিয়েছিল।

পরনে লাল শার্ট, খাকি শর্টস্, মাথায় লাল কাপড়ের পাগড়ি বিড়ের মতো বাঁধা যাতে পাগড়িও হয়, আবার আরামসে বোঝাও বওয়া চলে আর পেতলের বাজুবন্ধে কুলি নং লেখা। শক্তপোক্ত দেখে দু’জন কুলির সঙ্গে দরদাম চুকিয়ে মেজমামা পকেট থেকে নোটবই বের করে ওদের নম্বর অর্থাৎ পরিচিতি টুকে নিলেন। তারপর মালপত্র ওদের মাথায় চাপালেন, দুই হাতে, কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন। এক একজন দেখতে গন্ধমাদন পর্বতপ্রায় হয়ে দাঁড়াল। ‘আস্তে আস্তে যাবে, দৌড়বে না একেবারে, বুঝেছ, সামঝা ?’ মামা গলাখাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে-টরে একটি মিহিন হাঁক দিলেন। ‘ঠিক হ্যায় বাবু, বাচ্চারা আছে তো, সামাঝ্ লিয়া’ বলে অত্যন্ত বুঝমানের মত মাথা দুলিয়ে, সামাল-সামাল বলতে বলতেই ছুট্ দিল প্রায়। মেজমামা চোখের ইশারা করতে শিমুল ওদের পারিবারিক শোভাযাত্রার আগে-আগে ছুটন্ত কুলিটার ময়লা চিট্চিটে কাল্চে লাল জামার খুঁট চেপে ধরে ছুটতে ছুটতে সঙ্গ নিল। পন্টূনে উঠল, গড়ানে দৌড়ল, স্টিমারে উঠে কুলির পেছনে পেছনে ছুটে দোতলায় উঠে, ফাঁকা দেখে ডেকের একধারে কুলির হোল্ডল-ট্রাঙ্ক নামিয়ে, হোল্ডল খুলে বিছানা পাতা দেখতে লাগল।

দেখতে দেখতে পরিবারের সবাই এসে গেল। বেশ বড়সড় জায়গা জুড়ে বিছানা পেতে দিয়ে ট্রাঙ্ক-স্যুটকেস নিরাপদ জায়গায় সাজিয়ে দিয়ে কুলিরা পয়সার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। শিমুল ভাবছিল, বড়রা এরকম কেন? মানুষ দু’টোর গাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে নামছে। আরামের শয্যা পাতা হয়েছে, দেখে মা খুব খুশি, চটি খুলে পাশে রেখে বসলেন। ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটি টাকা বের করে মেজমামার হাতে দিলেন। মামা বয়স্ক কুলিটিকে টাকা দিয়ে বললেন, ‘আট আনা ফেরত দাও। তোমরা এক সিকি করে দুজনে আট আনা রাখ।’ বয়স্ক কুুলি যথারীতি তার দেশোয়ালির সঙ্গে বাংলার মিশেলে যা বলল, তা এ’রকম, ‘বহোত ভারি সামান থা সাব, রেট তো চার আনা হ্যায়, মাগার হাম এক-এক আদমি তো দো আদমি কা সামান উঠায়া। ইনসাফ কিজিয়ে, মাইজি।’ বলে সে মায়ের দিকে কাতর মুখে তাকিয়ে রইল। মা যেহেতু পান সাজতে ব্যস্ত, ওদের বাবা এগিয়ে এসে পকেট থেকে একটি সিকি বের করে কুলির হাতে দিলেন, ‘ওই আট আনা তোমাদের মজুরি আর এই চার আনা দু’জনে ভাগ করে নাও গে’। গেঁজে খুলে টাকা রেখে, একটি আধুলি বের করে, মামার প্রসারিত হাতের তালুতে রেখে হৃষ্টমুখে দু’জনে সেলাম বাজিয়ে চলে যাবার আগে বড়কুলি বলল, ‘হাঁ, বড়াসাব হামারা তক্লিফ সামাঝ্ লিয়া, শুক্রিয়া সাব।’

শিমুল, রবু, নাজু — সবাই বিছানার ধারে বসে জুতোমোজা খুলে সেগুলো পায়ের কাছে মধ্যম শ্রেণীর কম্পার্টমেন্টের পার্টিশন দেয়াল ঘেঁষে যত্ন করে সাজিয়ে রাখল। ওদের বাবা আমজাদ সায়েব মানুষ, বুট খুলতে রাজি নন, ঢাকায় ফিরে গিয়েই বাটা কোম্পানির সেবায় নিয়োজিত হবেন ঘণ্টা খানেক পরে — এটা নিশ্চিত। ভাইবোনেরা উঠে দাঁড়াল, আব্বা সবার মাথায় হাত রাখলেন, চুল এলোমেলো করে দিয়ে আদর করলেন। ‘শিমুল, তুমি প্রতি সপ্তাহে আমাকে চিঠি লিখবে ইংরেজিতে, শিরোনাম হবে — দিচ্ছি আমি — ’দ্য পাস্ট উইক’। তোমার সাপ্তাহিক চিঠি পড়ে আমি ঢাকায় বসে যেন জানতে পারি, তোমরা কে, কী করেছ আগের সাতদিনে,’ আমজাদ শিমুলের সঙ্গে হাত ঝাঁকুনি খেলতে খেলতে আরো বললেন, ‘তোমার চিঠি আমি শুদ্ধ করে ফেরতডাকে পাঠিয়ে দেব, যাতে তুমি একই ভুল বারবার না কর, কেমন?’ শিমুল বোকার মত অকারণে হাসিমুখে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল। আমজাদ বাঁ হাত ট্রাউজার্সের পকেটে ঢুকিয়ে, ডান হাত ওপরে তুললেন, ওয়েভ করলেন, বললেন, ‘আর, তাড়াতাড়ি চলে এসো, নইলে শিমুলের ব্রাদাররা স্কুলের খাতা থেকে ওর নাম কেটে দেবেন নির্ঘাত।’

মেজমামার সঙ্গে হ্যান্ডশেক হল, তারপর বাবা কাঁচুমাচু হয়ে মায়ের দিকে তাকালেন। ‘তো সব ঠিক আছে তাহলে, আমি এবার যাই। কাজে লেগে পড়ি গিয়ে, কেমন?’ বলে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে, ধীর পদক্ষেপে ইতোমধ্যে গুছিয়ে বসা সংসারী ডেকযাত্রীদের বিছানাপত্র বাঁচিয়ে, মাঝের পায়ে চলার পথ বেয়ে হেঁটে গেলেন। ওরা করুণমুখে বাবার চলে যাওয়া দেখল। মায়ের সঙ্গে শিমুলরা তিন ভাইবোনে সেই যে কত-কত আত্মীয়বাড়ি বেড়াতে যেত, ওদের বাবা কিন্তু কখনো দূরে কোথাও যেতেন না। পাবনার বাড়ি, মাগুরায় নানার বাড়ি, কুষ্টিয়ায় বড়খালার বাড়ি, কুটিখালার বিয়ের পর থেকে ছোটখালু যত জায়গায় বদলি হয়েছেন — বগুড়ার সুকানপুকুর, যশোরের কোটচাঁদপুর, পাবনার সাঁথিয়া, সুজানগর ইত্যাদি কত জায়গায় ওরা লম্বা ছুটিতে বেড়াতে গেছে, আব্বা যাননি। কোনো না কোনো জরুরি দাপ্তরিক কাজের অজুহাতে একা চাকরবাকর নিয়ে ঢাকার বাসায় থেকে যেতেন। কেবল ঢাকা শহরের ভেতরে এদিক-ওদিকে, তাও ছুটির দিন হলে, কখনো-সখনো আমজাদ পরিবারের সঙ্গী হয়েছেন।

বেলা দু’টোয় ভোঁ বাজিয়ে, সিঁড়ি তুলে নিয়ে স্টিমার নারায়ণগঞ্জ ঘাট ছাড়ল। স্টিমারের গায়ে ভেড়ানো হকারদের কলা-মিষ্টি-মাদুরের পশরা বোঝাই ডিঙিগুলো সরে সরে যেতে লাগল। রাজহংসীর মত মসৃণভাবে জল কেটে, ছোট ছোট ঢেউ তুলে, স্টিমার শীতলক্ষ্যার বুক চিরে এগোল। মেজমামা চা-ওয়ালা ছেলেটিকে ডেকে চা দিতে বললেন। শিমুল নিরুদ্বিগ্ন মনে কাত হয়ে শুয়ে মা-মামার চা-পানের দৃশ্য দেখল কিছুক্ষণ। তারপর ওর বইখাতা বোঝাই ছোট্ট স্যুটকেস খুলে গল্পের বই বের করে পড়ায় মন দিল। রবু, নাজু ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চিন্তে, বাড়িতে যেমন ঘুমোয় দুপুরে। শিমুলেরই কেবল ঘুম পায় না — ঠিক দুপ্পুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা।

ওদের বিছানার একধারে বারোয়ারি যাত্রীদের পায়ে চলার পথ, অন্যদিকে ডেকের প্রান্ত, রেলিংঘেরা। মেজমামা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত দিলেন, ‘রাতে ঘুমোনোর সময় রেলিংঘেরা ওদিকটায় পা মেলে দেবে সবাই।’ শিমুল ততক্ষণে বই বন্ধ করে রেখে, বালিশ ঘুরিয়ে নিয়ে তার ওপর থুতনি রেখে, নদীতীরের সবুজ গাঁ, ঘাটে নাইতে নামা মানুষ, দু’চারটে ডিঙির চলে যাওয়া দেখতে লাগল। ইচ্ছেমতো একপাতা-দু’পাতা পড়তে পড়তে বিকেল ঘনিয়ে এল। রবু, নাজু উঠে পড়েছে। স্টিমার এরি মাঝে মুন্সিগঞ্জ ঘাটে ভিড়ল। আবার হকারের হাঁকডাক, যাত্রী ওঠা, কুলিদের দৌড়ঝাঁপ দেখা হল। মেজমামা একছড়া প্রকাণ্ড সাইজের সাগরকলা কিনলেন। মা টিফিন ক্যারিয়ার খুলে নাশতা পরিবেশন করলেন — লুচি, আলুভাজা — সঙ্গে যোগ হল পাকা কলা। অনেক সময় নিয়ে ওরা আরাম্সে নাশতা সারল। শিমুল ফাঁকে ফাঁকে বইয়ের পাতা ওল্টাল।

সন্ধে না হতেই বাতি জ্বলেছে স্টিমারে। রেলিং-এ আটকানো লাইফবয়গুলো সাদা রঙের, তাতে লাল জ্বলজ্বলে অক্ষরে লেখা স্টিমারের নাম — পিআরএস কিউই। জিজ্ঞেস করতে মেজমামা বললেন, পাকিস্তান রিভার স্টিমার্স কোম্পানির নাম আর কিউই পাখির নামে স্টিমারের নাম। মামা আরো বললেন, ‘ঝড়-সাইক্লোনে কখনো যদি জাহাজ ডোবে, তাহলে ঐযে দেখছো জলিবোট ঝুলছে, যাত্রীরা ঐসব নৌকায় উঠে প্রাণে বাঁচে আর অন্যরা ঐ লাইফবয় বা জীবনতরী ধরে ভেসে থাকতে পারবে। আমরা ছোটবেলা যখন স্টিমারে কোলকাতায় পড়তে গেছি, তখন যেমন-যেমন ব্যবস্থা দেখেছি, এখনো মোটামুটি তাই চলছে।’ শিমুল মন দিয়ে মামার কথা শুনছিল, গল্পের গন্ধ পেয়ে উস্কে দিল মেজমামাকে, ‘মেজমামা, আপনি যখন কোলকাতায় পড়তেন — সে তো আমার জন্মের আগে — তখনকার কথা আব্বার কাছে কিছু কিছু শুনেছি, আপনি কিছু বলবেন?’ রবু, নাজু উঠে পায়ের কাছে ঝোলানো বয়াগুলোর গায়ে হাত বোলায়, টেপে, তারপর নাজু জাপানি পুতুলের মত নির্লিপ্তমুখে গূঢ় সংশয় প্রকাশ করে, ‘এই বয়াগুলো কি শক্ত আর ভারি, মামা, এগুলো ধরে মানুষ কীভাবে ভাসে?”

শিমুল বই রেখে মেজমামার হাঁটুর ওপর মাথা রেখে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। ‘বুঝতে পেরেছি। বকুল, তোমার ছেলে আমাকে বকিয়েই ছাড়বে। আমাকে পান দাও তো একখিলি।’ বকুল সযত্নে পান সেজে দেন ভাইকে, নিজের জন্য একটা সেজে পানছেঁচনি এগিয়ে দেন ছেলেকে। শিমুল শুয়ে শুয়ে অল্প অল্প পান ছেঁচে, কান খাড়া থাকে মেজমামার কথামালা শোনার অপেক্ষায়। ‘জানিস, আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবর আমাদের সঙ্গে পড়তেন। ক্যালকাটা মাদ্রাসায়। সেই ’৪৭-এর ভারতভাগের আগেই। তখন থেকেই মুজিব খুব পরিশ্রমী রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। আমাদের পরীক্ষায় সব প্রশ্ন হত ইংরেজিতে, লিখতে হত ইংরেজিতে। শেখ মুজিব কিন্তু সেই ছাত্রজীবনেই বাংলাভাষা আরো ব্যাপকভাবে চালু করার পক্ষে ছিলেন।’

‘আচ্ছা মেজমামা, আপনারা হিন্দু-মুসলমান রায়ট দেখেননি? আব্বার কাছে শুনেছি, হিন্দু বন্ধুরা তাঁকে বহুদিন রক্ষা করেছেন বিপদ থেকে।’ শিমুলের প্রশ্ন শুনে মেজমামা হাসেন, একটু ভাবেন আপন মনে, বোধহয় স্মৃতিচারণ করেন, তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণ করেন, ‘ওরা না বাঁচালে তোমার বাবা, মামারা কেউই বেঁচে থাকতেন না, দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ফিরতেও পারতেন না।’

শিমুলদের বিছানার ওপরেই সিলিং-এ ফিক্সড স্টিলের তারজালের ঘেরাটোপে একটি জোরালো আলো জ্বলছে। তারই আলোয় চলছে ওর পড়া। পড়তে পড়তে শিমুল আনমনে হেসে ফেলে। মা জিজ্ঞেস করেন, ‘কীরে বাবা, একা-একা হাসছিস যে?’ ‘মা, আমার স্কুলের বন্ধুগুলো যা ডেঁপো, আমরা বড়দের বলা অনেক কথা না বুঝেই নিজেরা বলাবলি করি, শুধু মজা করার জন্য — ।’ ওকে থামিয়ে দিয়ে বকুল সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী ধরনের কথা তোর সহপাঠিরা বলে শুনি? কী এত মজা তাতে একটু বুঝি তো?’ ছেলে সঙ্কুচিতভাবে বলে, ‘এই তো কল্তাবাজারের সর্দারবাড়ির ছেলে অনু সেদিন বলছিল, ওদের পুরনো প্রকাণ্ড ফোর্ড গাড়ির সঙ্গে অলিম্পিয়া বেকারির মালিকের ছেলে খায়েরদের নতুন কিন্তু ছোট্ট মোটরগাড়ি মরিস মাইনরের তুলনা করে আর কি…।’ ‘আরে কথাটা কী, বলবি তো?’ মা অসহিষ্ণু প্রশ্ন করেন। শিমুল ভয়ে ভয়ে বলে, ‘কীসে আর কীসে, কই আগরতলা আর কই চকির তলা; কই মহারানি আর কই … ’ থেমে গিয়ে সে আস্তে উচ্চারণ করে, ‘যেটা বল্লাম না, ওই কথাটা বলে ঢাকাইয়ারা একজন আরেকজনকে গালাগাল দেয়।’ ‘বুঝেছি, ওই অসভ্য কথাটা ভেবেই তুমি হাসছিলে আর কখনো এসব কাউকে বলবে না। চৌগাছি পৌঁছবার আগেই ভুলে যাবে, ঠিক আছে?’ রবু, নাজু যাত্রীদের আনাগোনা, খাওয়াদাওয়া, গল্প-আড্ডায় সময় কাটানো দেখছে অপলক। মেজমামা অন্যদিকে তাকিয়ে, কিন্তু কানখাড়া করে আছেন গুডবয় ভাগ্নেটির বক্তব্য শোনার জন্য। বকুল অবশ্য কথা ঘুরিয়ে কাজী শামসুল আলম ওরফে টুকুকে বলেন, ‘মেজভাই, তোমাদের বাড়ি যেতে যা হ্যাঁপা বাপু, ধরো গিয়ে তোমার ট্যাক্সিতে শুরু, তারপর স্টিমার, মেলট্রেন, লোকাল ট্রেন, পাল্কি, নৌকো, শেষ হয় ঘোড়াগাড়ি চেপে। বাবাহ্, এই নাহলে বাপের বাড়ি যাওয়া? নাইওরের সখ আমার মিটে যায় প্রতিবার এই তিন-চারদিনের সফরে।’ ‘সে তো তুমি ঘাটে-ঘাটে তোমার মাসি-মামীদের এখানে-ওখানে বেড়িয়ে যাও বলেই, নইলে একটানা গেলে তো দু’দিনের ব্যাপার,’ বলে মেজমামা বোনের এগিয়ে দেয়া পানের খিলি নিয়ে মুখে পোরেন। ‘হ্যাঁ, ভাই, তোমার কথামত আমি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাতবিরেতে নৌকোয় উঠি আর ডাকাত ডেকে আনি আর কি। ওসব হবে না, জানের ওপর জুলুম করে বেড়াতে পারব না বাপু, এরকম হাত-পা ছড়িয়ে আরামে বিশ্রাম করে-টরে বেড়ানোই ভালো, নাকি বল? আর খালা-মামীরাও তো পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর ভাবেন, এবার বোধহয় বকুলটা আর বাপের বাড়ি আসতে পারছে না। এপথ দিয়ে গেলে তো একবার দেখা না করে যাবার মেয়ে ও নয়। না, মেজভাই, এদের সঙ্গে প্রতিবছর দেখা করি, সালাম করি, ওরাও দোয়া করেন, তাড়াহুড়ো করে এটা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’ মেজমামা নিচের ঠোঁট উলটে অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাকান এবং বালিশ নিয়ে কাত হন।

‘মেজভাই, খাবারদাবারের খোঁজ নিয়ে রাতের খাবার অর্ডার করেছ তো ঠিকমত?’ বকুলের প্রশ্ন শুনে টুকু হাসেন, ‘হ্যাঁ, বলেছি দু’তিনজনের ডিনার তৈরি করতে। আমি তোর ঐ বড় টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি ঘি-চপচপে পরোটা, রোস্ট, পুডিং এনেছিস, তাই খাব।’ শিমুল বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে, এমন সময় দেখা গেল, স্টিমারের মাল্লারা ডেকের চারদিক ঘেরা মোটা ওয়াটারপ্রুফ ক্যানভাসের ঢাকা নামিয়ে দড়ি দিয়ে আংটার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধছে আর মুখে বলছে, ‘সারেং সাবে কইছে, ঝড়বিষ্টি অইতে পারে।’ ‘মা, আমি নিচে থেকে ঘুরে আসি?’ শিমুলের প্রশ্ন শুনে বকুল বলেন, ‘হ্যাঁ, সাবধানে যেও, রবু, নাজুকেও নিয়ে যাও। ওদের ধরে-ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামাবে, ওঠাবে, কেমন?’ মাথা হেলিয়ে সায় দিয়ে শিমুল ছোট দু’ভাইবোনকে আগলে নিয়ে স্টিমার পরিভ্রমণে চলল। দোতলা পুরোটা চক্কর দিয়ে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওরা নিচে নামল। নিচের যাত্রীরা দেখা গেল, অনেকেই সঙ্গে আনা খাবার খেতে ব্যস্ত, কেউ কেউ স্টিমারের ক্যান্টিনে খাচ্ছেন। ওদের টেবিলের পাশ দিয়ে বয়লার রুমের দিকে যেতে যেতে ওরা ভোজনরত যাত্রীদের ধোঁয়াওঠা গরম ভাতে ট্যাল্টেলে ইলিশের ঝোল মেখে খেতে দেখল। গরম খাবারের সুগন্ধে শিমুলের হঠাৎ খিদে পেয়ে গেল। দু’হাতে রবু আর নাজুকে শ্যাপেরোন করে নিয়ে সে বয়লার রুমের সামনে পৌঁছে গেল।

দু’জন খালাসি ঐ সময় এসে বয়লার রুমের ইস্পাতের চাদরে তৈরি দরজাটা ঘটাং শব্দে খুলে দিল। ওদের হাতের ইশারায় সরতে বলে খালাসিরা বেল্চা বোঝাই কয়লা ছুঁড়ে ছুঁড়ে বয়লারের গনগনে আগুন-লাল গহবরে ফেলতে লাগল। পাশেই ডাঁই করে রাখা পাথুরে কয়লার পাহাড়। শিমুলরা তিন ভাইবোন লেলিহান আগুনের খেলা দেখল দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ। এদিকে নদীর হাওয়া খেয়ে শিমুলের খিদে যেন আরও চাগিয়ে উঠেছে। রবু, নাজু মুগ্ধ হয়ে অপলক খালাসিদের কয়লা ছোঁড়া দেখছে, ওদের কালো গেঞ্জিপরা শরীরে পেশিগুলো কিলবিল করে ওঠানামা করছে। ‘চল, চল, শীতের দিন হলে কথা ছিল, একটুক্ষণ বেশি দাঁড়ালে বরং আরামই হত। এখন চল, মা খেতে দেবেন,’ বলে শিমুল ওদের ফিরিয়ে নিয়ে চলল। শীতকালে যখন ওরা নানাবাড়ি গিয়ে থাকে, তখনকার স্টিমারের চেহারা এবং যাত্রীরা অন্যরকম হয়। শীতে স্টিমারে ভ্রমণ আরো আনন্দদায়ক, ঐ বালক বয়সেই শিমুলের মনে হত। দুপুরে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টিমার ছাড়তেই ওরা ভাইবোনেরা স্টিমারের একতলা, দোতলা এবং ছাদে সারেং সাহেবের ক্যাবিন পর্যন্ত দুড়দাড় দাপিয়ে বেড়াত। ওই ঘোরাঘুরি আর নদীবাহিত হাওয়া খেয়েই বোধহয় সবারই ঘন ঘন খিদে পেয়ে যেত। শিমুলের মা সঙ্গে নেয়া খাবার পরিপাটি করে ওদের এবং এসকর্টিং মুরুব্বি বড় খালু, মেজমামা অথবা বড়খালার ছেলে নান্নুভাইকে পরিবেশন করতেন। শিমুল মায়ের কাছে বসে কিস্মিস্ গোঁজা সুস্বাদু পুডিং চামচে কেটে মুখে তুলতে তুলতে বলত, ‘মা, জানেন, নিচের যাত্রীরা অনেকেই শীতবাতাসে কুঁকড়ে মুকড়ে গিয়ে ইঞ্জিনঘরের ওমে শরীর সেঁকে নিচ্ছে। ওদের অনেকেরই লেপকম্বল নেই! ঐ দ্যাখেন, ওই বুড়ো মানুষটা জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে কাঁপছে, কিন্তু ঘুমোতে পারছে না ! আমি ওখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, লোকটার বোঁজা চোখের কোল বেয়ে পানি ঝরছে। লোকটার চেহারা না মা, অনেকটা নানার মত।’ শিমুলের গলা বুঁজে আসত, কণ্ঠে স্বর ফুটত না। ‘আচ্ছা তুমি লেপের ভেতর পা ঢোকাও তো,’ মা নরম গলায় বলতেন, ‘বুড়ো হলে সবাইকে দেখতে নানানানীর মতো লাগে।’

একটুক্ষণ চুপচাপ মায়ের গা ঘেঁষে লেপের ওম নিয়ে ধাতস্থ হয়ে সে চুপিচুপি আবার বলত, ‘মা, আপনার বড় ট্রাঙ্কে তো অনেক গরম কাপড় নিয়ে যাচ্ছেন চৌগাছির গরীব মানুষদের জন্য, ওখান থেকে একটা কিছু লোকটাকে দেয়া যায় না?’ সেবারের এসকর্ট বড়খালু আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন, শুনছিলেন ছেলের কথা। উঠে বসে হাসতে হাসতে শ্যালিকাকে বলেন, ‘বকুল, আমাকে একটা পান দে, তোর ছেলের বক্বকানিতে ঝিমুনি কেটে গেছে।’ শিমুল অপরাধীর গলায় বলল, ‘কই খালু, আমি তো আস্তে আস্তে মাকে … ’ খালু হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন। পান মুখে পুরে, চোখ বুঁজে চিবিয়ে রসস্থ হয়ে আবার বলে উঠলেন, ‘দে রে বকুল, একটা কিছু গরম কাপড় বা চাদর-টাদর কিছু দে তোর ছেলেকে, নইলে ওর ঘুম হবে না। ভোরে উঠেই তো গোয়ালন্দে নেমে যাব আমরা।’

মা আঁচল থেকে চাবির গোছা বেছে ঠিক চাবিটা নিয়ে তাঁর পায়ের কাছে রাখা বড় ট্রাঙ্কের তালা খুলে, ডালা তুলে ওপর থেকেই একটা ওভারকোট বের করে দিলেন। শিমুল খুশিতে বাগ্ বাগ্ হয়ে লাফিয়ে লেপের তলা থেকে বেরিয়ে, মাথার কাছে রাখা চটি পায়ে গলাল।

কোটটা নিয়ে বুড়ো মানুষটার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসল, ওর শীতার্ত তন্দ্রা ভাঙিয়ে কথা বলল। বুড়ো মানুষটা ধড়মড় করে উঠে বসতে, শিমুল লম্বা ওভারকোট দিয়ে ওর গলা থেকে পা ঢেকে দিল। টিস্টলের বয়টা তাকিয়ে দেখছিল ব্যাপারটা। চেঁচিয়ে বলল, ‘চাচা, তোমার বাইগ্য বালো আইজকা। আমি তোমারে এককাপ গরম চা খাওয়ামু, খাইবা?’ বুড়োর দু’চোখ খুশিতে, কৃতজ্ঞতায় জলভরা, টলমলে। শিমুল খুশিমনে এসে লেপের তলায় আশ্রয় নিল।

ভোরে ঘুম ভাঙতে বোঝা গেল, গোয়ালন্দের স্টিমারে রাতে ঘুমিয়ে আরেক স্টিমারযাত্রাই সে স্বপ্নে দেখেছে। গোয়ালন্দ ঘাটে ভোরবেলায় দু’দুটো মেল ট্রেন — ঢাকা মেল আর শিলিগুড়ি মেল দাঁড়িয়ে। যাত্রীরা স্টিমার থেকে নেমে, ধীরেসুস্থে প্রায় আধমাইলটাক হেঁটে যে যার ট্রেনে উঠছে। আসাম আর পূর্ববঙ্গের যত যাত্রী শিমুলদের সঙ্গে স্টিমারে এসেছেন, তাদের সবাই গোয়ালন্দে নেমে উত্তরবঙ্গ অর্থাৎ পাবনা, নাটোর, শান্তাহার হয়ে লালমনিরহাট দিয়ে শিলিগুড়িগামী শিলিগুড়ি মেল অথবা কোলকাতাগামী ঢাকা মেলে উঠবেন। ঘাটে দেখা গেল, পিআরএস কোম্পানির ‘মাসুদ’ স্টিমারটি নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওই দু’টো মেলট্রেন ছাড়াও একটা লোকাল প্যাসেঞ্জার ট্রেনও দাঁড়িয়ে থাকত। শিমুলদের ভাবতে ভাল লাগত, যারা নেহাত-ই লোকাল, যাদের দূরবর্তী কোনো গন্তব্যই নেই, তারাই কেবল ঐ লোকাল ট্রেনে ওঠে। শিমুলরা বরাবরই ঢাকা মেলে উঠতো বা উঠতে চাইত। অবচেতনে বোধহয় রহস্য নগরী কোলকাতার হাতছানি কাজ করত। মেরুন রঙের ওই দুর্দান্তগতি মেলট্রেন গোয়ালন্দ থেকে ছেড়ে দর্শনা সীমান্ত পেরিয়ে ছুটতে ছুটতে কোলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে দাঁড়াত। আবার পূর্বদেশের যাত্রী পেটে ভরে নিয়ে এক ছুট্টে গোয়ালন্দ — কোলকাতা থেকে বহু যাত্রী ঢাকা আসতেন তখন, তাই নাম ঢাকা মেল।

ভোরবেলায় টয়লেট সেরে, হাতমুখ ধুয়ে স্টিমার থেকে নেমে ওরা ঢাকা মেলে উঠত। ব্রেকফাস্টের অর্ডার নিয়ে যেত মাথায় পাগড়িবাঁধা খানসামা। ট্রেন ছেড়ে দিলে সকালের তাজা, মিষ্টি বাতাসে ফুসফুস ভরে উঠত, খিদে পেত জোর। বুফে কার থেকে যথাসময়ে পটভর্তি গরম চা-কফি, মুচমুচে লালচে টোস্ট, মাখন, মার্মালেড বা জ্যাম জেলি, ওমলেট আর কলা বা কমলা সঙ্গে ঢাকা থেকে আনা ফল আর শুকনো খাবারগুলোরও সদ্ব্যবহার হত। তখনকার বুফে কারের খাবার-দাবারের মান মোটামুটি ভাল ছিল। তার পাশাপাশি একালের আন্তঃনগর ট্রেনের গলাকাটা দামে পরিবেশিত খাবারকে অখাদ্য বলাই ভাল।

ঢাকা মেলের কয়লা চালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিনের হুইস্লের শব্দও ছিল অন্যরকম। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান গার্ড সাহেবের নিশান ওড়ানো, বাঁশি বাজানো শেষ হতেই বেশির ভাগ বেইস এবং খানিকটা ট্রেবলের তীক্ষ্মতা মিশিয়ে ঢাকা মেলের বাঁশি একটানা লম্বা বেজে উঠত গম্ভীর। হইস্ল শেষ হবার আগেই ঢাকা মেলের ওজনদার অজগর শরীর নড়ে উঠত মসৃণভাবে, কোনো ঝাঁকুনি লাগত না। ছোট স্টেশনে থামত না। একটানা ছুটে থামত কালুখালি জংশনে। শিমুলরা নানাবাড়ি যেতে হলে কালুখালি জংশনে নেমে ভাটিয়াপাড়ার ট্রেনে উঠে রামাদিয়া, মধুখালি হয়ে কামারখালি স্টেশনে নামত। আবার, গন্তব্য বড়খালা অর্থাৎ বকুলের বড়বোন টগরের বাড়ি কুষ্টিয়া হলে ঢাকা মেলে ভ্রমণ ওদের দীর্ঘতর হত। রেল গাড়িতে চেপে একজায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়া সেসময় সত্যিই খুব আনন্দদায়ক ছিল। তখনকার স্টিম ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি বাস্তবিকই ঝমাঝম্ করে চলত। দূরের মাঠে তাল-খেজুর গাছ, ন্যাংটো, গায়ে কাদামাখা শিশুদের রেলসড়কের পাশের জলভর্তি খাদে চুনোমাছ ধরার হুটোপাটি দেখতে-দেখতে, অবিরাম শট্ শট্ শব্দে টেলিগ্রাফের খুঁটিগুলো পেরিয়ে ছুটে চলা।

সুয়োরানি ঢাকা মেল থেকে নেমে দুয়োরানি কামারখালি লাইনের ট্রেনে চড়লে দেখা যেত, ট্রেনের চেহারা, ভ্রমণস্বস্তি, যাত্রীদের আচরণ — সবই পাল্টে গেছে। নড়বড়ে, রঙচটা বগি। ভেতরে আলো জ্বলত না, পাখা চলত না, টয়লেট — ব্যবহারের অযোগ্য। আর ফেরিওয়ালাদের অবিরাম আনাগোনা। কালুখালি স্টেশনে অনেক সময় নানাবাড়ি চৌগাছি থেকে কেউ না কেউ এসে অপেক্ষায় থাকত। এখন গাড়ি চালিয়ে কালুখালি থেকে চৌগাছি পৌঁছতে শিমুল যেখানে তিন-চার ঘণ্টা সময় নেয়, সেখানে সেকালে প্রায় চব্বিশ-ছাব্বিশ ঘণ্টা লেগে যেত। মাঝে অবশ্য কামারখালির আড়পাড়ায় ডাক্তার নানার বাড়িতে রাত্রিবাস বাধ্যতামূলক ছিল।

ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে ভাটিয়াপাড়া লোকাল কামারখালি ঘাটে পৌঁছত সেই বিকেলবেলা, শীতকালে সন্ধে নেমে যেত। স্টেশন থেকে আড়পাড়া ডাক্তার নানার বাড়ি যাওয়া হত পাল্কি চেপে অথবা হেঁটে। শিমুল বেশ ক’বার মায়ের সঙ্গে পালকিতে চেপে দুলতে দুলতে আশাখালা-নিশা খালাদের বাড়ি গেছে। একটু বড় হতে আর পালকিতে ওঠেনি, কারণ পালকির দরজা বন্ধ থাকত, ভেতরটা শ্বাসরোধী, অন্ধকার, গরমকালে বেশ গরম। এখন কারো সখ চাপলেও পাল্কি পাওয়া যাবে না চাপাবার মতো।

ঢাকার কুটুমদের ঘিরে ডাক্তার নানার বাড়িতে বেশ উৎসবের পরিবেশ তৈরি হত। আশা, নিশা, লাবু, মায়া — আক্তার ডাক্তারের মেয়েরা সবাই ঢাকায় স্বামীর ঘরকরা ফুপাতো বোন বকুলকে ঘিরে বসে কত যে প্রশ্ন করতেন, ওদের কত কীই যে জানতে ইচ্ছে হত। বকুল অবশ্য তখন কোলকাতার পর ঢাকাবাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শহুরে গিন্নিই এক — অতএব দু’পক্ষেরই অনেক ভাব ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ছিল। আড়পাড়ার বাড়িতে পৌঁছলেই শিমুলরা ছুটত ডাক্তার নানার আস্তাবলে। দু’দুটো ঘোড়া ওখানে টগ্‌বগ্ করতে থাকত। নানার পালকি আর বজরাও ছিল একটা বাড়ির সঙ্গেই বিলের কিনারায় ঘাটে বাঁধা। রোগীর বাড়ির অবস্থান বুঝে যানবাহন যখন যেটা দরকার, নানা ব্যবহার করতেন। তবে পালকি, বজরা বা ঘোড়া — যাতেই চাপুন না কেন, ডাক্তার নানার পরনে গরমকালে ঢোলা শর্টস্, বুশ শার্ট আর মাথায় শোলার খাকি হ্যাট শোভা পেত। শীতকালে বেশিরভাগ ভিজিটে ঘোড়ায় চেপে খাকি ব্রিচেস, গরম কোট, ওয়েলিংটন বুট আর ওই হ্যাট পরে যেতেন। গড়াইয়ের এপারে বিস্তীর্ণ এলাকা — সেই ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত আর নদীর ওপারে মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর, মোহাম্মদপুর, শালিখা এলাকার সব গ্রামে আক্তার ডাক্তারের একচ্ছত্র পশার এবং নামডাক ছিল। ‘সফদার ডাক্তার’ ছড়া পড়ার পর থেকে ডাক্তারের দুষ্টু নাতিনাতনিরা আড়ালে আবডালে নিজেদের জটলায় ফিসফিসিয়ে আবৃত্তি করত — ‘আক্তার ডাক্তার, মাথা ভরা টাক্ তার, খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে, …।’ নানার মেয়ে আশা খালা শিমুলকে ওই ছড়া আবৃত্তি করতে শুনে আর দেখে কান মুলে লাল করে দিয়েছিল।

চৌগাছির নানাবাড়ি যাবার পথে ডাক্তার নানার বাড়ি ছিল শিমুলের অত্যন্ত পছন্দের হল্ট। আশা খালার সঙ্গে মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো, ঘাটে বজরা না থাকলে দা’ দিয়ে কলাগাছ কেটে দড়ি দিয়ে পাশাপাশি বেঁধে ভেলা ভাসানো হত। আশা খালা ছিলেন শিমুলদের দস্যিপনার যত অভিযানের কাপ্তান। একবার জ্যোৎস্না রাতে তিনচার জন মিলে ভেলা বেয়ে বিলের মধ্যে অনেকদূর গিয়ে গড়াই গাঙের চোরাস্রোতে পড়ে দুর্নিবার ভেসে যেতে থাকলে আশাখালার চিৎকার আর লাফালাফি দেখে কে! ওরাও ভয় পেয়েছিল বেশ। অবশেষে নেহাৎ ভাগ্যক্রমে নানার বজরার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াতে, মাল্লারা ঝাঁপিয়ে পড়ে, কাছি টাছি দিয়ে ভেলা বেঁধে টেনে আনাতে রক্ষা হয়েছিল। নইলে কী যে হত। সেটা অবশ্য শিমুলরা কেউই ভাবেনি। তখন বয়সটাই ওইরকম যে! একেবারে কেয়ারফ্রি মস্তি যাকে বলে।

সেদিন নানা বাড়িতে ছিলেন। বিস্তারিত কুশল বিনিময় হল আর ফাঁকে ফাঁকে জলযোগ, চা-ওভ্যালটিনের পালা শেষ হতে নৈশভোজের আয়োজন শুরু হল। চওড়া বারান্দায় মাদুর পাতা হল, তার ওপরে দস্তরখান — তাতে কত সব নক্সা। বাড়ির মেয়েদের পুরনো শাড়ির চওড়া-চওড়া পাড় জুড়ে তৈরি সেসব দস্তরখানের ওপর মোটা ভারী সেকেলে খাস বিলিতি চিনেমাটির প্লেট দিয়ে গেল পরিচারিকা একজন। আরেকজন ছোট ছোট কাচের বাটিতে লেবু-লবণ-কাঁচালঙ্কা রেখে গেল। ডাক্তার নানা তাঁর প্রিয় ভাগ্নী বকুলকে পাশে বসালেন আদর করে। ‘বকুল, তুই আমার পাশে বোস। আর তোর ছেলে শিমুল, ওকে আমার সামনে এসে বসতে বল। ওকে একটু ভাল করে দেখি,’ বলে ডা: কাজী আক্তার উল আলম বড় গামলায় সাবান মেখে দু’হাত ধোন, নানী জগ উঁচু করে পানি ঢেলে দেন সযত্নে। মায়ের ইশারায় শিমুল গিয়ে নানীর পাশে বসে। ডাক্তার নানী আদর করে ওর মাথায় চুমু খান অকারণেই। শিমুল ভাবে, কর্তার পছন্দের নাতিকে প্রকাশ্যে আদর করলে উনি নানীকে আরও বেশি কদরদান করবেন। লাল-লাল ভাতের প্লেট থেকে ধোঁয়া ওড়ে। তার ওপর পড়ে তেতো উচ্ছেভাজা আর চিনেমাটির বৈয়ম থেকে চামচে করে বাড়িতে তৈরি সরবাটা ঘি।

নানা খাচ্ছেন আর তাকিয়ে সবাইকে দেখছেন শিমুল সার্চলাইটের ফোকাসে থাকলে যেমন বেচাল কিছুই করা যায় না, তেমনি নানা দেখছেন ভেবে সোনামুখ করে উচ্ছেভাজা আর গরম ভাত ঘি মেখে খেয়ে নিল। মুখ তুলে দেখল, নানার চোখমুখ হাসছে, ভাসছে স্নেহে। এবাড়িতে নিয়ম হল, একসঙ্গে খেতে বসলে সবাইকে সব পদ খেতে হবে — চচ্চড়ি, মাছ-মাংসের ঝোল রকমারী আচার সহযোগে খাওয়া হত। শেষপাতে কাঁথার মত মোটা সরওলা দুধ আর পাকা ফল। ডাক্তার নানা যেমন চারহাতে রোজগার করতেন, তেমনি হাতখুলে খরচ করতেন। আর ঐ খরচের অধিকাংশ ছিল খাওয়া-দাওয়াকেন্দ্রিক। শিমুলদের মত আত্মীয়স্বজন ছাড়াও এবেলা-ওবেলা অন্তত গোটা পঞ্চাশেক পাত পড়ত বাড়িতে।

পরদিন সকালে উঠে পেটপুরে নাশতা খেয়ে, সেই পাল্কি শোভাযাত্রা করে আবার কামারখালি ঘাটে পৌঁছনো গেল। বর্ষাকালে গড়াই নদীর স্রোতের তোড় দেখলে সেকালে হৃৎকম্প হত। শীতকালে আবার উচুঁ পাড় ভেঙে ভেঙে ঝপাঝপ্ নদীতে পড়ত, উল্টোবাঁকে চর জেগে উঠত। কামারখালি ঘাট থেকে বড় পান্সি নৌকায় গঙ্গারামখালি ঘাট পর্যন্ত যাওয়া হত। সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়ি চেপে মামাবাড়ির বাইরে কাছারির উঠোনে। অর্থাৎ, দুপুর নাগাদ চৌগাছি পৌঁছতে পারলে ঢাকা থেকে ৪৮ ঘণ্টার সফর হত। কিন্তু শিমুলের মা বকুলের নাইওর যাত্রা কেবল বাপের বাড়ি চৌগাছি গেলেই সম্পন্ন হত না মোটেই, আরও কতকগুলো আত্মীয়বন্ধুর বাড়িতে সপরিবারে বাৎসরিক অথবা দ্বিবাৎসরিক বেড়ানো এবং দেখাসাক্ষাৎ আলাপ বিস্তারিতভাবে হবার পরই তা মোটামুটি নিয়মমাফিক হয়েছে মনে করা হত।

সেবার বকুলের নাইওর একটু দীর্ঘস্থায়ী হয়ে নিয়েছিল বৈবাহিক ঘটনা চক্রে — শিমুলের মেজমামা অর্থাৎ পরিবারের মেজমেয়ে বকুলের প্রিয় মেজভাই কাজী সামশুল আলমের বিয়ের দাওয়াতে অংশগ্রহণ করতে যাওয়া যেহেতু — সেই বিয়ের ধার্য দিন কেবলই পিছিয়ে যেতে লাগল অনিবার্যভাবে আর বকুলের নাইওর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকল। সেই অবসরে বকুল তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি চৌগাছির ধারে কাছের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া-আসা নিমন্ত্রণ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

চৌগাছি গ্রাম পঞ্চাশ বছর আগে ছিল বিস্তীর্ণ বিল এলাকার অন্তর্গত। এপাড়া থেকে ওপাড়া যেতে বছরের ন’মাসকালই নৌকা বাইতে হত। প্রায় সব বাড়ির ছেলেরাই নৌকা, ডিঙি, তালের ডোঙা বাইতে জানত। নানার বড় পান্সিতে সওয়ার হয়ে বকুল, শিমুল, রবু আর নাজু বরিষাট বেড়াতে গেল। বরিষাটে শিমুলের মোহন ভাই, সোকন ভাই — দুই মামাতো ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। কোন ভাবির সঙ্গে তাদের বাপের বাড়ি যাওয়া হয়েছিল, আজ আর মনে নেই। তবে বেশ মনে আছে, হানু গাঙ বেয়ে পানসি মধুমতিতে পড়ে প্রচণ্ড স্রোতের টানে পড়েছিল, মাঝি মাল্লারা অভিজ্ঞতার বলে সেযাত্রা সামলেছিল। বড় মাঝি গায়েন মামা বরিষাটের ঘাটে পানশি বেঁধে হাঁপ ছেড়ে বলেছিল, ‘কপাল ভালো বুলে আজ জানে বাইচে আইছি, নালি আর বড়কাজীর কাছে মুক দ্যাকানোর জো থাইকতো না!’ ঘাট থেকে ঘোড়ার গাড়ি চেপে মোহনভাবিদের বাপের বাড়ি যাওয়া হয়েছিল। মস্ত বাড়ি, একতলা পুরনো দালান, কিন্তু প্রকাণ্ড চওড়া বারান্দা তার একটানা। বাড়িটা ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের আকারে তৈরি করা হয়েছিল। ‘ইউ’য়ের পেটের ভেতরে ভেতরবাড়ির উঠোন, কলঘর, রান্নাঘর, ঢেঁকিঘর, আঁতুড়ঘর ইত্যাদি।

মোহনভাবি বকুলকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি দেখাচ্ছেন, শিমুল অপার বিস্ময়ে হাঁ করে উনবিংশ শতাব্দীর ভারি স্থাপত্য কর্ম, নকশা, ঘরের ভেতরে কুলুঙ্গি, বেদি ইত্যাদি দেখছিল আর মনে মনে তুলনা করে ভাবছিল, বড়কাজী নানার বাড়িঘর কত সাদাসিধে — টিন, কাঠের তক্তা আর মাটি দিয়ে তৈরি প্রায় একমানুষ উঁচু ডোয়া বা ভিতের ওপর ঘরগুলো ওদের জন্য কী স্বস্তিকর আশ্রয়। এখন ক’দিনের জন্য এই স্যাঁতসেঁতে প্রায়ান্ধকার ঘরবাড়িতে লোবানের গন্ধের সঙ্গে বসবাস করতে হবে। তাই সই।

ঘরে ঘরে বাড়ির মেয়েদের হাতের সেলাইশিল্পের নমুনা দেয়ালে ঝোলানো। সেইসব পরিচিত বাণী — ‘যেজন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি,’ ‘সোনার হরিণ, কোন্ বনে থাক,’ ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ ইত্যাদি ইত্যাদি যা তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, শহরেও মধ্যবিত্তদের ঘরদোরে শোভা পেত। বরিষাটে সেবার পরিচয় হল দুই ভাবির একমাত্র ভাই তুফান ভাইয়ের সঙ্গে। তুফান ভাই যেমন রূপবান, তেমনি কেতাদুরস্ত ছিলেন। ফিনফিনে কাপড়ের শার্ট-পাঞ্জাবি পরতেন, মূল্যবান বিদেশি সুগন্ধি মাখতেন, চকলেট রঙ্গের সুগন্ধ ‘আবদুল্লাহ্’ সিগারেট খেতেন। এরপর ঢাকায় গেলে অবশ্যই শিমুলদের বাসায় উঠবেন, এরকম ভরসা ফুফুকে দিতে ব্যস্ত হলেও বকুল তুফানকে তেমন পাত্তা দিতে নারাজ ছিলেন। কারণটা তখন না বুঝলেও বড় হয়ে বুঝেছে, তুফান ভাই-এর চালচলন, ফোতো কাপ্তেনি মা পছন্দ করতেন না। বরিষাটের স্মৃতি বলতে তেমন আর কিছু নেই। তুফান ভাইয়ের বাবা বৃটিশ সরকারের চাকুরি করতেন। খুব বড় রাজকর্মচারী নাকি ছিলেন, অন্তঃত গ্রামবাসী পাড়াপড়শি আত্মীয়স্বজনদের সেই রকমই ধারণা ছিল। তারা বলত, উনি নাকি নামজাদা ‘সবরেস্টার’ অর্থাৎ সাবরেজিস্ট্রার ছিলেন, লালমুখো সায়েবরা নাকি বরিষাট পর্যন্ত ধাওয়া করে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যেতেন। এককাপ চা এবং দু’টি একটি বিলিতি বিস্কুট ছাড়া সায়েবরা যদিও কোনদিন কিছু মুখে তোলেননি — তবুও ওই সায়েবদের খাতিরযত্ন করার জন্যই ওই আলমারিতে রাখা ভারি ভারি ডিনারসেট, টিসেট, রুপোর ছুরি-কাঁটা কেনা হয়েছিল সেই কবে কোন্কালে — এরকম শুনে শুনে ঘন ঘন রোমাঞ্চ হলে শিমুল দৌড়ে গিয়ে খিড়কি পুকুরে দু’টি ডুব দিয়ে আসত। বকুল বকুনি দিতে গাফিলতি করতেন না অবশ্যি।

চৌগাছি ফেরার সময় নদী শান্ত ছিল। নৌকাভ্রমণ আনন্দেরই হয়েছিল। ফিরে এসে মা-নানীআম্মার কথা শুনে শিমুল বুঝতে পারল, মেজমামার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে আবার। যাক, এবার ডেঁড়েমুষে গ্রামের বিয়ে দেখা যাবে। ঢাকায় গিয়ে বন্ধুদের আসরে রং-রূপ-গন্ধ-স্পর্শশুদ্ধ বর্ণনা দিতে হবে না! চৌগাছির দৈনন্দিন জীবন যাপনেও বহু রং-রূপ-নাটক ছিল। ভোরে ঘুম ভাঙতে শিমুল শুনতে পেত নানার কণ্ঠ, কাজলমামাকে ডাকছেন। ‘ও কাজল, তুই এখনো গেলিনে জাল নিয়ে। তোর ফুপুর ঘুম ভাঙলেই তো গরম ভাত চাই, আর ভাল করেই তো জান যে, শোল মাছের পোনা চচ্চড়ি ছাড়া সকালে সে আর কিছু খাবে না!’ ‘যাই বাপজান, এই গরু কয়ডারে জাব দিয়ে যাই,’ বলে কাজল ত্রস্তে কাঁধে জাল ফেলে গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে বিলের দিকে নেমে যায়। শিমুল ততক্ষণে চোখ মুছতে মুছতে মেছোর পিছু নিয়েছে। সুটু খালা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল, শিমুলকে পিছন থেকে ডাকল, ‘ও বাবু, তুমি যাও কনে, হাতমুখ ধুয়ে আইসো, গুড়মুড়ি দিবানে।’ শিমুল এক দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে কাজলের হাত ধরেছে। ‘কী গো মামা, তুমারউ কি কানা নানীর হাতের এক লুক্মা খাওয়া লাগবি? চলো আইজকে তুমার হাত ছুয়ায়ে জাল ফ্যালবো’ বলে কাজল দু’হাতে জাল মেলে ধরে শিমুলকে ছুঁয়ে দিতে বলে।

কাজল মিটিমিটি হেসে বিলের ধারে হাঁটুপানিতে নেমে জাল ছোঁড়ে। ও আগে থেকে লাল পোনার ঝাঁক দেখেই জাল ফেলেছে। ঝাঁকটা বেশ বড় ছিল। তিন পোয়ার মত পোনা উঠেছে। শিমুল খলখল করে হাসে, হেসেই চলে। কাজল বলে, ‘দ্যাখছো মনি, তুমি ক্যাবল ছুয়ে দিলে আর কত মাছ, চল, ইবার বাড়ি যাই।’ বাড়ি পৌঁছে শিমুল মায়ের হাত থেকে টুথব্রাশ পেস্ট নিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে করতে আবার বারবাড়ির উঠোনে যায়। ইঁদারার পানি তুলে দেবে কেউ না কেউ। বকুল পেছন থেকে বলেন, ‘শিমুল, তাড়াতাড়ি আসবি। নানি নারকেল কুরিয়ে রেখেছেন, মুড়ি আর গুড় দিয়ে খাবে তোমরা।’ নারকেল-মুড়ি ওর প্রিয় নাশতা, তার সঙ্গে গুড়ের সিরাপ যোগ হলে বোধহয় অমৃতের মতো স্বাদ হবে, ভাবতে-ভাবতে শিমুল ইঁদারার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কাজীপাড়ার মেয়ে বউরা খাবার পানি তুলছে। ইঁদারাটা প্রকাণ্ড, বাঁধানো, পুরোটাই একটা গোলাকার ভারি সবুজ রঙ-করা রানি মার্কা টিন আর কাঠের ফ্রেমে ঢাকা। একপাশে কপিকলের সাহায্যে বালতি নামানো ওঠানোর ব্যবস্থা।

কাজলমামা বাইরে এল হাতপা ধুতে। মেয়েরা কলসি ভরে কাঁখে তুলে নিয়ে চলে গেলে কাজল পানি তুলে আস্তে আস্তে ঢেলে দিল। শিমুল ব্রাশ ধুয়ে, কুলকুচো করে, চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়। ‘এই ন্যাও তুমার গামছা, বকুবু দিয়ে দ্যাল,’ বলে কাজল ওকে গামছা এগিয়ে দেয় হাতমুখ মোছার জন্য। কাজল কাজীবাড়ির প্রধান হলধর। বাড়ি নোয়াখালি। সেই কোনকালে বাপ-চাচার সঙ্গে এদিগরে এসেছিল ধান কাটতে, বাপচাচারা ওলাওঠায় মারা গেলে শিশু কাজল বড়কাজীর আশ্রয়ে থেকে যায়। এখন সে পুরোপুরি জোয়ান। বাড়ির চাষবাসের চব্বিশ ঘণ্টা তদারকির দায়িত্ব কাজলের ওপর ন্যস্ত। নানাকে ‘বাপ’ ডাকে, নানী ওর ‘মা’, তাই শিমুলের ও কাজলমামা।

নানীর মস্ত রান্নাবাড়ির দাওয়ায় মোড়া, টুল, পিঁড়ি আর মাদুর পাতা। শিমুল মোড়া টেনে বসলে সুটু খালা ওর হাতে কাঁসার বাটি ভর্তি মুড়ি, গুড় আর কোরা নারকেল তুলে দিল। চামচ দিয়ে একটু নেড়ে চেড়ে নিয়ে শিমুল খেতে শুরু করল। কাজল এসে মাদুরে বসেছে। সুটুখালা ওকে খেতে দিল বড় গামলায় লালচালের গরম ভাত, দু’তিনরকম ভর্তা, ডাল, কাসুন্দি, আচার আর শোল মাছের পোনা চচ্চড়ি। ভর্তা, আচার, ঘন ডাল দিয়ে ভাত মেখে মুখে গ্রাস তুলে কাজল চোখ বুঁজে চিবিয়ে খেয়ে শিমুলের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘বাপু বুইজলে, খাটাখাটনি কল্লি ভাত খাতিউ মজা লাগে।’ ‘কাজলমামা, তুমি মুড়ি খাবে একগাল?’ শিমুলের প্রশ্ন শুনে কাজল পোনা চচ্চড়ি ভাতে মাখতে মাখতে মুখ হা করে বলল, ‘দ্যাও একগাল, খাই।’ শিমুল উঠে গিয়ে কাজলের বেশ বড় হা-করা মুখে দু’তিন চামচ মুড়ি চালান করে দিল। নানী বড় ঘরের দাওয়া থেকে নেমে উঠোন পেরিয়ে আসতে আসতে সব দেখলেন, এবারান্দায় উঠে বললেন, ‘কাজল বাপ, আইজকে তুই বিকেলে মাঠেততে আইস্যে মুড়ি-গুড়-নারকেল খাবি, ঠিক আছে?’

কাজল লজ্জা পেল। ওর বড় বড় লাল্চে চোখ নামিয়ে মিয়োনো কণ্ঠে বলল, ‘না মা, শিমুল বাপ দেলে, তাই খালাম। আমি কি কোনো দোষ করিছি?’ ‘মোটেও না,’ নানী ওকে আশ্বস্ত করেন। ছেলেটা বাড়ির ছেলেদের চেয়েও বেশি আপন হয়ে গেছে। ভুলেও ওর মনে দুঃখ দিতে নানী চান না। এরিমধ্যে পাশের ঘরে সোনা নানী ওরফে কানা নানী অর্থাৎ নানার বোন ঘুম থেকে উঠেছেন। সুটুখালার সহায়তায় তার প্রাতঃকৃত্য সারা হয়েছে। তিনি শোলমাছের পোনা চচ্চড়ি দিয়ে গরমভাত মেখে গোল গোল লোক্মা তৈরি করে নাতিপুতিদের অপেক্ষায় রয়েছেন, জানালেন। নানী শিমুলকে বলেন, ‘তাড়াতাড়ি ওঘরে গিয়ে তোমার সোনা নানীর ভাতমাখা খেয়ে এস গিয়ে।’

শিমুল মুড়ির বাটি শূন্য করে নানীর হাতে দিয়ে উঠল। ওদিক থেকে বকুল, রবু-নাজু, বড়মামার ছেলে মোতিকে নিয়ে আসছেন সোনা নানীর ঘরের দিকে। লাফিয়ে নানীর ঘরে ঢুকতেই ওর চোখ যেন ঝলসে উঠল। সোনা নানীর মাখনের মত গায়ের রঙ, ওদিকের জানালা দিয়ে আসা সকালের সোনারঙ রোদ্দুর আর হাস্যোজ্জ্বল বয়স্কা স্বাস্থ্যল মহিলাটির খাটের ওপর রাজেন্দ্রাণীর ঢঙে টান্টান বসার ভঙ্গি — সব মিলিয়ে এক সুন্দর স্বর্ণালী সকাল দেখার অভিজ্ঞতা ‘নানী, এই যে হাঁ করেছি,’ বলে শিমুল সোনানানীর ভাতের বলসুদ্ধ হাত ধরে নিজের মুখে ছুঁইয়ে, মাখা ভাতের বল নিজের হাতে নিয়ে, একটু-একটু করে ভেঙে খেতে খেতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কাজলমামা দু’টি বলদ আর মই-লাঙল নিয়ে মাঠে নেমে যাচ্ছে। আজ মই দেবে। জমি তৈরি হচ্ছে ধান ছেটানোর আগে আগে। বিলের মাঠে কাজীপাড়ার অনেককেই দেখা যাচ্ছে — ঠান্ডু, গুড়লে, সাজ্জাদে, দুলাভাই — সবাই। চৌগাছির কোন কোন মানুষের নামের উচ্চারণ বেশ অন্যরকম — শিমুলের কানে অদ্ভুত শোনাত। ওর পাবনা নিবাসী খোকাকাকা — যার নিয়মিত যাতায়াত ছিল খালার বাড়ি চৌগাছিতে — যেহেতু কাকার মা এবং শিমুলদের নানী — কাজী শামসুন্নাহার ও কাজী নুরুন্নাহার বেগম সহোদরা ছিলেন — শিমুলের মা বকুলকে খ্যাপানোর জন্য বলতেন, ‘বু, আপনাদের গ্রামের লোকগুলোর কেমন আজব সব নাম — ঠানঠু, গরিলা, কুইন্টে জোয়ারদার ইত্যাদি বকুল তখন দেবর-কাম-খালাতো ভাইকে তেড়ে মারতে উঠতেন। তালপাতার পাখা হাতে। বড়খালু তাঁর প্রকাণ্ড ভুঁড়ির ওপর লুঙি গিঁট দিয়ে হাতে তালপাতার পাখা নিয়ে বারান্দায় হেঁটে বেড়াতেন, নিজেকে বাতাস করতেন আর মজার মজার মন্তব্য করতেন। যেমন, বড় খালুর ‘এই নীলার মা’টা কে?’ মন্তব্যটি শিমুলের এই পঞ্চাশ বছর পড়েও মনে পড়ে হাসি পায়। নানী বড়জামাইয়ের কথা শুনে রেগে উঠে বলতেন, ‘ওই নীলার মা হচ্ছে আপনার দুলার মা — ঐ বাড়ির।’

মায়ের দীর্ঘ নাইওর বেড়ানোর কারণে সেবার শিমুলের বড় পাওনা হয়েছিল গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়। বর্ষায় তখন বিল এলাকার মানুষের কাজকর্ম তেমন থাকতো না। কাজেই মানুষ মাছ ধরে, গান গেয়ে, গল্পগুজব করে, যাত্রাপালা দেখে সময় কাটাত। একবার কাজল মামার সঙ্গে ছাঁচিলাপুর বাজারে হাট সেরে লাইলি-মজনুর পালাগান দেখে, শুনে অনেক রাতে বাড়ি ফিরে শিমুলের ভাগ্যে মায়ের হাতের জোর পিটুনি জুটেছিল। বড়কাজীর মৌন অনুমোদন কিন্তু অপূর্ব সেই ঝিঁঝিডাকা ঝুঁঝকো আধাঁর রাতে, কর্নেট থামলেই ব্যাঙের ডাক শুরু হওয়া রাতে সাদাসিধে গ্রামীণ হাটুরেদের সঙ্গে মাটির ওপর মাদুর পেতে বসে ‘নৈটানা’ চুষতে চুষতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিবিষ্টমনে আর্য্য অপেরার নীল-গোলাপি রঙ মাখা শ্যামলিম মানুষগুলোর নিবেদন উপভোগ করা — শৈশবের ওরকম অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিণত বয়সের কিছুই মেলে না। বর্তমান তো জাবর কেটেই চলে যাচ্ছে।

বড়কাজীর নৌকা চেপে কাজীপাড়ার সবাই অর্থাৎ বাড়ির কর্তারা সপ্তাহে দু’বার হাটে যেতেন। শিমুল নানার পাঞ্জাবির খুঁট ধরে মাঝেমাঝে ঐ রোমাঞ্চকর হাটযাত্রায় শরিক হয়েছে। বিলের পর কুঠিবাড়ির পাশের খাল বরাবর নৌকা বেয়ে সোজা গিয়ে হানুগাঙে পড়তেই ডানে ছাঁচিলাপুর বাজার বা হাট — যার যেমন ইচ্ছে, বলে। নানা শিমুলকে তাঁর বশংবদ মস্ত ব্যবসায়ী সাপুর দোকানে বসিয়ে রেখে হাট করতে যেতেন। শিমুলের ইচ্ছে হত, পাট অর্থাৎ কোষ্টার বাজারে গিয়ে বেচাকেনা দেখবে। কিন্তু তা হবার নয়। বড়কাজীর নাতিছেলে ঐ বাজারে যাবে কেন? বড়কাজীর কোস্টা তো মহাজনরা — ডানকান ব্রাদার্স, ইস্পাহানি ইত্যাদি কোম্পানির এজেন্টরা চৌগাছি গ্রামে গিয়ে বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে কিনে আনত। ছেলেবেলা থেকেই শিমুলের পাটকাটা, পাট ‘জাগ’ দেয়া অর্থাৎ পচানোর জন্য পানিতে চুবিয়ে রাখা, পাট ছাড়ানো, শুকানো — পুরো প্রক্রিয়া দেখতে এবং পাটের সোঁদা গন্ধ শুঁকতে ভাল লাগত। এখনো চেষ্টা করলে চোখ খুলেই ও নাকে পচনশীল পাটের কোস্টার কাঁচা গন্ধ পায়, শুকনো, লম্বা বেণীর মত সোনালি পাটের রঙ দেখতে পায়।

হাটের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মদন কটকটি অথবা চিনির মুরলি কিনে খাওয়া। আর ভাল লাগতো শীতের দিনে দু’হাতে কাজলমামা দুই বড় বড় ইলিশ ঝুলিয়ে যাচ্ছে, পথিক-পরিচিত, অপরিচিত সবাই দাম জিজ্ঞেস করছে, কাজল মামা ডাঁটের সঙ্গে সামনে তাকিয়ে বলছে, বড়কাজীর বাড়ি কুটুম আইছে, দামটাম জাইনে কী হবি কও? শীতির দিন বড়লোকের ইলিশ খাওয়া, তা দাম হবিনে? এই দু’ডো চৈদ্দ্য সিকি নিলো।’ হাটে আসাযাওয়ার পথে ‘বাবুগের বাড়ি’ অর্থাৎ নীলকুঠি সংলগ্ন প্রাক্তন জমিদার বাড়ির অমূল্যচরণ মুনশির কাছারিঘরে প্রতিষ্ঠিত ডাকঘরে একবার উঁকি দেয়া হত — তা ওই শীতকালেই। চিঠিপত্র, মানি অর্ডার কাজলমামা অথবা সঙ্গী বড়রা সংগ্রহ করে সাবধানে বুকপকেটে, টাকা হলে শার্টের ঘড়ি পকেটে ঢোকাতেন। টাকার মূল্য ছিল এখনকার তুলনায় শত শত গুণ বেশি।

অবশেষে মেজমামার বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। বড় কাজী, বড় মামা, কুটি মামা, বড় খালু আর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আরও ক’জন চৌগাছি থেকে বর মেজমামাকে নিয়ে রাজবাড়ির কাজী কান্দায় গিয়ে বিয়ে সেরে নতুন বৌ নিয়ে, দু’দিন পরে ফিরে এলেন। ওহ, বলতে ভুল হয়েছে, কাজলমামাও গিয়েছিল। শিমুল মেজমামার ঘরে গিয়ে নতুন মামীকে সালাম করল, ওর দেখাদেখি রবু, মোতিও সালামের মত একটু কিছু করল। মেজমামী ওকে কোলের কাছে টেনে নিলেন, খসখসে লাল চোখ ধাঁধানো বেনারসি, আতর-এসেন্স, আলতা, ইভনিং ইন প্যারিস, আরো কীসের সব সুগন্ধ মিলেমিশে ওর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। ও ছুটে বারান্দায় গিয়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে সুস্থবোধ করল।

কদিন খুব ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া হল। এবাড়ি-ওবাড়ি, এপাড়া-ওপাড়া বেড়ানো হল। এবার ফেরার পালা। বাড়ির সবাই ওদের দিকে যেন কেমনভাবে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কল্জের ধন বুক খালি করে, স্বার্থপরের মত, স্বেচ্ছাচারীর মত চলে যাচ্ছে। বড় শহরের অসংবেদী মানুষ যেন শিমুল, বকুল। রবু, নাজুর অবশ্য তেমন হেলদোল নেই। দেখতে দেখতে একদিন বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে বিছানাপত্তর বেঁধেছেঁদে বকুল তাঁর ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘোড়ারগাড়িতে উঠলেন। এবারে সঙ্গী বড়খালু। ঢাকায় ওর বিশেষ কাজ রয়েছে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ খাল খনন প্রকল্প অর্থাৎ জি-কে প্রজেক্টে বড়খালু বড় ঠিকেদারির কাজ পেয়েছেন। সেই উপলক্ষে উনি প্রজেক্টের বড় কর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে চলেছেন। জি-কে প্রজেক্টে বড় খালুর ঠিকেদারি আর ঘন ঘন শ্বশুরবাড়ি চৌগাছি বেড়াতে আসার গল্প পরে বলা হবে।

mir.waliuzzaman@bdnews24.com


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.