সাক্ষাৎকার

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

রাজু আলাউদ্দিন | 4 Mar , 2018  


এ এম হারুন-অর-রশিদ বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে, পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হন।
অধ্যাপক ড. এ এম হারুন অর রশীদ ১৯৩৩ সালের ১লা মে বরিশাল জেলার নলছিটি উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

ছয় বছর বয়সে নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর রামবঙ্ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে ড. রশীদ তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন৷ সেখানে কয়েক বছর পড়ার পর তাঁর বাবা তাঁকে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল-এ পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন৷ স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্যে বা ক্লাসে ভালো উপস্থিতির জন্যে প্রতিবারই তিনি বিভিন্ন বই পুরস্কার পেয়েছেন৷ দশম শ্রেণি পর্যন্ত ড. রশীদ কৃষ্ণনগরের ঐ স্কুলেই লেখাপড়া করেছেন৷ ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগ হলে তাঁর বাবাকে বদলি করে ঢাকা পাঠানো হলো৷ ঢাকা এসে বাবা ঢাকা কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন৷ ঢাকা এসে তাঁর বাবা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে৷ তখন তাঁর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার মাত্র তিন মাস বাকি ছিল৷ তিনি ১৯৪৮ সালে তত্‍কালীন East Bengal Secondary Education Board-এর অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে স্টারমার্কসসহ তিনটি বিষয়ে লেটার মার্কস (শতকরা ৮০ নম্বর এবং তার উপরে) পেয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন এবং এই ফলাফলের জন্যে একটি প্রথম গ্রেড সরকারি বৃত্তি লাভ করেন৷ তিনি ১৯৫০ সালে ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স পরীক্ষায় স্টারমার্কস সহ চারটি প্রধান বিষয়ের সবগুলিতে (ইংরেজী, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান ও গণিত) লেটার মার্কস পেয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন এবং এই ফলাফলের জন্যেও একটি প্রথম গ্রেড সরকারি বৃত্তি লাভ করেন৷ তাঁর ইংরেজিতে লেটার মার্কস পাওয়াটা ছিল তখনকার সময়ে একটা বিরল ঘটনা৷ তাঁর স্কুল ও কলেজের কোনো পরীক্ষায় কখনো দ্বিতীয় হননি। এরপর তিনি এসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে৷ তিনি ১৯৫৩ সালে এই বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বি.এস.সি. সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন৷ ১৯৫৪ সালে তিনি ঐ বছর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সব স্নাতকের মধ্যে সমন্বিতভাবে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজা কালীনারায়ণ বৃত্তি লাভ করেন৷ তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পুনরায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসীস বৃত্তি (Overseas Scholarship) নিয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Glasgow, UK) যান৷ গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি প্রফেসর আর. জি. মুরহাউজ এবং প্রফেসর বি. এইচ. ব্রান্সডেনের (Professor R.G. Moorhouse and Professor B.H. Bransden) তত্ত্বাবধানে ক্ষেত্র তত্ত্বে টাম-ডানকফ আসন্ন মান (Tamm-Dancoff Approximation in Field Theory) ব্যবহার করে কে-মেসন নিউক্লিয়ন-এর একটি সমস্যার উপর কাজ করে ১৯৬০ সালে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন৷ তিনি দুই দফায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে নোবেল পুরস্কার কমিটির প্রস্তাব ছিলেন। সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালামের মনোনয়ন বিষয়ক অন্যতম প্রস্তাব ছিলেন।
তার এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি গৃহিত হয়েছিল ২০১৩ সালে তার ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন। সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিখন করেছেন তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ।

রাজু আলাউদ্দিন: আগামী বছর আপনি আশি বছরে পড়বেন বা আশি বছর পূর্ণ হবে আপনার।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: যদি বেঁচে থাকি।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ নিশ্চয়। আমরা আশা করি আপনি আরো অনেক দিন বেঁচে থাকবেন। কারণ, আপনি আমাদের বিশিষ্ট বিজ্ঞান-লেখক, বিজ্ঞানী এবং আপনার তূল্য বিজ্ঞান-লেখক খুব কম। শুধু বাংলাদেশে না, গোটা বাংলাভাষাতেই। আমার এখনো মনে আছে, আপনার ‘পদার্থ বিজ্ঞানে বিপ্লব’, এরপর আব্দুস সালামের ‘আদর্শ ও বাস্তবতা’ বইটার অনুবাদের কথা আমার মনে আছে। আমি থিউরিটিক্যাল ফিজিক্স ডিটেলস বুঝি না। কিন্তু আপনি যখন লেখেন, সেই বিষয়ের যে ধারণা, সেই ধারণাকে অসম্ভব রকমের সহজবোধ্য ভাষায় প্রকাশ করার স্বচ্ছতা এবং এর সাথে সাহিত্যিক গুণসম্পন্ন ভাষায় সেটাকে প্রকাশ করার যে ক্ষমতা, সেটা আমাকে খুবই আকৃষ্ট করেছে বহু আগে থেকেই।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: শুনে খুশি হলাম। কিন্তু আমার বন্ধুবান্ধবরা বলে যে, আপনার বাংলা শক্ত, কিছু বুঝি না। আমি তখন বলি, বুঝতে হলে তো আগে কিছু পড়তে হবে। আপনারা তো বাংলা পড়েন না। বেশি বেশি ইংরেজি পড়ে আপনারা খুশি হন। কিন্তু আমার সবসময় ইচ্ছা ছিল, বাংলায় কিছু চর্চা করার। বিজ্ঞান-চর্চা করার। কারণ, যে কোনো দেশের বিজ্ঞান-চর্চা একদিনে হয় না। বহুদিন লাগে। আমাদের বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে সে রকমভাবে বিজ্ঞান চর্চা হয় নাই। নানা কারণে হয় নাই। আমরা আর্থিকভাবে অতটা স্বচ্ছল ছিলাম না। আমরা শিক্ষা গ্রহণ করা শুরু করেছি অনেক পরে। হিন্দু সমাজের তুলনায় আমরা অনেক পরে শুরু করেছি। তারপরে আমাদের বেশিরভাগই গ্রামের মানুষ। শহরবাসী হয়েছি ধরেন গত ৫০ বছর। কাজেই নানা অসুবিধার মধ্যে আমাদের সমাজটা গড়ে উঠেছে। তবু আমি বলব যে, আমরা খুব বেশি খারাপ করি নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: সময়ের তুলনায়।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: সময়ের তুলনায়। যেটা আপনি উল্লেখ করলেন, আমি অহঙ্কার করছি তা না, আপনার কথা প্রসঙ্গে বলছি, দুই বাংলার মধ্যে বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি আমি খারাপ করিনি। আমি চেষ্টা করেছি, পদার্থ বিজ্ঞানের ধ্যানধারণা তরুণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে। যাতে তারা বাংলার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানের চর্চা এখন সারা পৃথিবীব্যাপী। আপনি ইউরোপিয়ান যে কোনো দেশে যান, দেখবেন, সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানের ভাষায় অনেক কিছু বলছে। তারা তো শিখছে। তাদের সমাজই বিজ্ঞান দিয়ে তৈরি। কাজেই তাদের সেটা শিখতে অসুবিধা হয় না। আমাদের সেই পরিস্থিতি কখনো ছিল না। আমরা শুরু করেছি পরে। এখন কিছু হচ্ছে। মাঝে বিজ্ঞান চর্চাটা ভালোই হয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: মাঝে বলতে আপনি কোন সময়টাকে বোঝাচ্ছেন?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মোটামুটি ভালোই বিজ্ঞানের চর্চা হয়েছে। এই সময় বিজ্ঞানবিষয়ক বইটই লেখা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি, আব্দুল্লাহ আল মুতী, আলী আসগর…
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: কিছু তো আমাদের হয়েছে। এটা হয়েছে বেশিরভাগই ৬০ সালের পর থেকে। সেই হিসেবে আমি বলব না, আমরা খুব খারাপ করিনি। হয়ত আরো ভালো করা উচিত ছিল। আমাদের আল মুতীর কথা বললেন। সে তো অনেক সুন্দর বাংলা লিখত। বাংলা বলতেও পারত সুন্দর। আমার এই ঘরে একদিন আসছে। এত সুন্দর বাংলা বলে! আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, বাংলায় কীভাবে কথা বলতে হয় শোনো আগে। আমি অহঙ্কার করতাম– আমার বন্ধু এত সুন্দর বাংলায় লেখে! এত সুন্দর বাংলায় কথা বলে!

…………………………………………

সম্মাননা
অর রশিদ তার কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজা কালিনারায়ণ বৃত্তি লাভ করেন।
১৯৯১ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৯৩ সালে তিন বত্‍সরের জন্য ড. রশীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোস অধ্যাপক নিযুক্ত হন৷
২০০৬ সালে ইউ.জি.সি. ( U.G.C.- University Grants Commission) প্রফেসর নিযুক্ত হন৷
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে “বিজ্ঞান গ্রন্থবর্ষ ২০০৫” উপলক্ষে ভৌতবিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমী প্রদত্ত ‘ভৌতবিজ্ঞান শাখা’য় বিজ্ঞান লেখক পদক হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন৷

…………………………………………

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার ভাষাও খুব সুন্দর। আমার ধারণা, আপনি যদি বিজ্ঞান নিয়ে না লিখতেন এবং লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিতেন, আমার মনে হয় আপনি ভালো সাহিত্যিক হতে পারতেন। ওই গুণটা আপনার ভাষার মধ্যে আছে। ‘পদার্থ বিজ্ঞানে বিপ্লব’ এই বইটাতে মনে হয় একদম কবির দৃষ্টি দিয়ে বিজ্ঞানের জগতকে দেখছেন।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এটা বলতে পারেন আপনি। মোটামুটি বলা যায়। আমি চেষ্টা করেছি। আমার যে কোনো লেখায় দেখবেন, রবীন্দ্রনাথ থেকে উদ্ধৃতি দিতে চেষ্টা করি। তার কারণ দুইটা। একটা হলো, উনার ভাষা অপূর্ব ভাষা। দ্বিতীয় কারণ হলো, উনি বিজ্ঞান নিয়ে মোটামুটি চর্চা করতেন। খুব বলব না, মোটামুটি চর্চা করতেন। এমনকি বইও লিখেছেন। সে জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার আদর্শ। তো আপনি যেটা বললেন, আমি চেষ্টা করি ভাষা সুন্দর করতে। আমি বলব, এর পেছনে রবীন্দ্রনাথ দায়ী। তার মতো সুন্দর ভাষা বাংলায় কেউ আর লেখেনি। লিখবেও না হয়ত। আমার মনে হয়, তরুণ তরুণী যারা আছে, তাদের এটা শেখা উচিত। চেষ্টা করা উচিত। আপনি বিজ্ঞানের যে বিষয়েরই চর্চা করেন না কেন, মানুষের তো ওই বিষয়টা নিয়ে কৌতূহল হয়। ছাত্রছাত্রীরা ওই বিষয়টা সম্পর্কে জানতে চায়। সেগুলো যদি সুন্দর ভাষায় লিখতে পারেন, রবীন্দ্রনাথের মতো ভাষা হয়ত হবে না, কিন্তু তার মতো তার কাছাকাছি ভাষায় যদি লিখতে পারেন, তাহলে তো আপনার ছাত্রীছাত্রীরা উপকৃত হবে। দ্বিতীয়ত, তারা আরো বেশি চেষ্টা করবে। বিজ্ঞানের প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হবে। তো আমি যখন বিজ্ঞান-চর্চা শুরু করি, তখন এটা আমার প্রথম এবং প্রধান ইচ্ছা ছিল। আমার মামাও খুব ভালো বাংলা লিখতে জানতেন।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার মামা কে?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: শামসুদ্দীন আবুল কালাম।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি আপনার মামা হন! উনি তো খুব ভালো সাহিত্যিক।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমি তো মনে করি, বাংলাভাষায় মুসলমানদের মধ্যে যে-কজন সাহিত্যিক প্রথম দিকে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন, উনি তার মধ্যে অগ্রগণ্য।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি আপনার আপন মামা?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আপন মামা। আমার মায়ের ছয় ভাই। তাদের মধ্যে উনি একজন। উনি আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন। আমাকে কিছু লিখতে দেখলে খুব উৎসাহ দিতেন। বলতে পারেন, আমি আমার মামার ছায়ায় কিছুটা চেষ্টা করেছি। হয়ত আরো বেশি চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের সমাজে তো নানা রকম অসুবিধা। আমরা তো কৃষ্ণনগরে থাকতাম। পশ্চিমবঙ্গে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার জন্মও ওইখানে?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমার জন্ম বরিশালে। কিন্তু বরিশালে আমি খুব বেশিদিন থাকিনি। প্রাক্টিক্যালি ওখানে থাকিইনি। আমার আব্বা কৃষ্ণনগর কলেজের প্রফেসর ছিলেন। মাঝে মাঝে গ্রীষ্মের ছুটিতে আব্বা তার পরিবার নিয়ে এখানে আসতেন। ওই সময় দু একদিন বরিশালে থাকা হতো। তাছাড়া বরিশালে খুব বেশি থাকতে পারিনি। কিন্তু আমি মনে করি, আমার জন্মস্থান যদিও কৃষ্ণনগর না, কিন্তু আসলে কৃষ্ণনগর।
রাজু আলাউদ্দিন: মানস-গঠন ইত্যাদি সবকিছু গড়ে উঠেছে ওখানে।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: সবকিছু। সবকিছু কৃষ্ণনগরে। আমার ভাষাতেও দেখবেন ওই অঞ্চলের টান আছে। আগে তো বেশি ছিল, এখন অনেক কমে গেছে। কিন্তু আগে তো ওই ভাষায়ই কথা বলতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার জন্মস্থান বরিশাল। আমাদের বাংলাভাষার বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশও বরিশালের।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমার মামার বাসার ঠিক কাছেই ছিল জীবনানন্দের বাসা। আমি খুব ছোটবেলায় মামার কাছে আসতাম, তো একদিন বললেন, চল, জীবনানন্দের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসি। তো মামার সাথে তার বাসায় গিয়েছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কত সালে?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: সাল-টাল তো অত মনে নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: জীবনানন্দ তখন বেঁচে আছেন?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: হ্যাঁ। আমি তখন একবারে ছোট। স্কুলে পড়ি। ক্লাশ টু থ্রি হবে। জীবনানন্দ দাশ আমার খুব প্রিয় কবি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কখনো লক্ষ করেছেন কি–উনার দুটো লাইন আছে– হয়ত লক্ষ করেছেন। একটা লাইনে এটমের যে গঠন, সেটার কথা ওখানে আছে, “ইলেক্ট্রনেরা নিজ দোষগুণে বলয়িত হ’য়ে রবে”( লোকেন বোসের জার্নাল)
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এটা তো আমি পড়ি নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা আছে। কবিতার শুরুটা এরকম: “সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি-/ এখনো কি ভালোবাসি?/ সেটা অবসরে ভাববার কথা,/ অবসর তবু নেই;/ তবু কোনদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে;/” কবিতার শেষদিকে উনি বলছেন, “ইলেক্ট্রনেরা নিজ দোষগুণে বলয়িত হ’য়ে রবে।” আমার অবাক লাগে এটা ভেবে যে উনি তো ছিলেন সাহিত্যের ছাত্র। সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বিজ্ঞান সম্পর্কেও খোঁজ রাখতেন। এটা তো প্রাথমিক না, বরং বিজ্ঞানের আরো গভীরে গেলেই এটমের স্ট্রাকচার সম্পর্কে জানতে পারা সম্ভব। এইটা উনি এতভালো জানতেন, অবাক লাগে। এবং আরেকটা জিনিস দেখে আমি অভিভূত হইছি। রবীন্দ্রনাথের সাথে উনার একবার তর্ক হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ বলছিলেন, মহৎ সাহিত্যে এক ধরনের Serenity থাকে। জীবনানন্দ দাশ বললেন যে, সবার ক্ষেত্রেই যে সেটা ছিল তা না। উদাহরণ হিসেবে উনি বিঠোফেনের সিম্ফনির কথা বলছিলেন। তার মানে ওই পশ্চিমা সঙ্গীত সম্পর্কেও উনি ভালো জানতেন।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: উনি খুব সংস্কৃতিবান লোক ছিলেন আমার ধারণা। কারণ, উনার কবিতাগুলি যারা বোঝে, তারা স্বীকার করবে, উনি যেভাবে বাংলাকে ভালোবাসতেন এক রবি ঠাকুর ছাড়া আর কেউ অমন ছিলেন না। আমার চোখে পড়ে না। হয়ত আছে, এটা আপনারা ভালো বলতে পারবেন। এ জন্য আমি খুব অহঙ্কারবোধ করি। জীবনানন্দের বাসার কাছেই আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। এ জন্য বলতে পারেন, এর কিছুটা প্রভাব আমার মধ্যে পড়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাভাষায় আপনার আগে যারা বিজ্ঞানচর্চা করেছেন, তাদের মধ্যে জগদীশ বসুর বাংলা খুবই ভালো।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: একটা তো আমাদের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাঠ্য ছিল। অব্যক্ত বোধহয় নাম। ওটা খুবই সুন্দর। এমন আরো অনেকেই আছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যতটা হওয়ার দরকার ছিল ততটা হয় নাই। আমি আশা করেছিলাম বিজ্ঞানভিত্তিক বাংলা চর্চাটা আরো বেশি হবে। সেটা হয় নাই।

……………………………………………..

কর্মজীবন
প্রভাষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৫-১৯৬২[২]
জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, ১৯৬২-১৯৬৭
অধ্যাপক, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৭-১৯৭১
পরিচালক, পদার্থবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট, ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৭-১৯৭১
ভিজিটিং বিজ্ঞানী, দি আব্দুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬-জুলাই ১৯৬৬, জানুয়ারি ১৯৬৮-অগাস্ট ১৯৬৮, জানুয়ারি ১৯৭৪-জুন ১৯৭৪
ভিজিটিং বিজ্ঞানী, ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজী, অক্টোবর ১৯৭১-সেপ্টেম্বর ১৯৭২,
পরিদর্শক, দি আব্দুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৯৩
ভিজিটিং অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন, ডিসেম্বর ১৯৭৫
ভিজিটিং অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলস, ১৯৯১
প্রতিষ্ঠাতা, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
চেয়ারম্যান, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৫-১৯৭৯
পরিচালক, বোস সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ ইন ন্যাচারাল সায়েন্স,
চেয়ারম্যান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৯-১৯৮১
পরিচালক, কম্পিউটার সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮৫-১৯৮৮

……………………………………………..

রাজু আলাউদ্দিন: সেটা হলো না বা এখনো হচ্ছে না, এর জন্য কোন জিনিসগুলো আপনার দায়ী মনে হয়?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: প্রথম কথা আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়ে গেছে। বাবা চান, ছেলে এদেশে কিছু লেখাপড়া করে আমেরিকা চলে যাক। এটা তো আপনি বোঝেনই। আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত বাপমারা চায়– যাও, বিদেশে চলে যাও। তো সব থেকে ভালো ছেলেগুলো, যারা ভালো কিছু লিখতে টিখতে পারত, তারা বিদেশে চলে যায়। এটা একটা কারণ। দ্বিতীয় কারণ, লিখে ছাপাবে কোথায়! সেরকম কোনো জায়গা আমার চোখে পড়ে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আর ছাপা হলেও সেটার যে পারিশ্রমিক পাবে, সেটা খুবই নগন্য।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এটার কথা বাদই দিলাম। নিজের মন থেকেও তো লিখতে ইচ্ছা করে– সেরকমও আমার চোখে পড়ে না। দু’একটা ম্যাগাজিন এখনো দেখি। কিন্তু আমার কাছে খুব বেশি উচ্চমানের মনে হয় না। আমি আশা করেছিলাম আরো বেশি ভালো হবে। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে যে ইতিহাস আছে, যেমন আমরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলাম। সেই জায়গা থেকে আমি আশা করেছিলাম আরো বেশি ভালো হবে।

রাজু আলাউদ্দিন: সেটাই তো হওয়া উচিত ছিল। সেটা কি এই জন্য যে আমরা গরিব দেশ? আপনি যেটা বললেন, বিদেশে চলে যায়, হয়ত গরিব বলেই ছেলেরা বিদেশে চলে যায়।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: ওটা তো আছেই। কিন্তু ওটাই তো একমাত্র কারণ হতে পারে না। দারিদ্র্রই আসল কারণ না। কারণ, মুসলমান সমাজ আমরা স্বচ্ছল কখনোই খুব বেশি ছিলাম না। বিত্তবান ছিলাম না। কিন্তু এদের মধ্য থেকেই তো সাহিত্যিক হয়েছে। অনেকে বিজ্ঞানীও হয়েছে। কিন্তু এখন আর বিজ্ঞানী চোখে পড়ে না।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কেন চোখে পড়ে না?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: একটা তো বললাম ভালো ছেলেগুলো বিদেশে চলে যায়। দেশের প্রতি তাদের যে ভালোবাসা, সেটার প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পায় না। এরপরে আমাদের ছেলেমেয়েদের যে উৎসাহ দেব, শিক্ষক হিসেবে সেটা আমার পারি না। আমি তো সারা জীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করে গেলাম। দু একটা ছাত্র তো আমি তৈরি করতে পারতাম। একেবারে যে হয়নি তা নয়। বলতে পারেন ফারসীম একমাত্র ছাত্র। আরেকটা ছাত্র আছে আমার, ও লেখে না তবে বিজ্ঞানী হিসেবে ভালো। তারপরে আলী আজগর, সেও আমার ছাত্র। প্রথম দিককার ছাত্র। ও তো ভালোই লেখে। তো আমার ধারণা ছিল আরো বেশি হবে বাংলাদেশে। কিন্তু হয় নাই। বিশেষ করে মেয়েদের মধ্য থেকে সেরকম কেউ হয় নাই। সারা জীবন যেখানে পড়ালাম, সেখানে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু কারোর যে নাম বলব, সেরকম কেউ আমার চোখে পড়ে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি বললেন, আপনার লেখালেখির পেছনে আপনার মামা পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন বা উৎসাহ দিতেন…
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমার আব্বাও।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার আব্বাও। এরপরে রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে আপনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু বিজ্ঞান-চর্চা করবেন, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করবেন, বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করবেন বা বিজ্ঞানী হয়ে উঠবেন, ছোটবেলা থেকে কি এটা আপনার আকাঙ্ক্ষা ছিল? নাকি এটা ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: মোটেই ঘটনাক্রমে ঘটেনি। আমি যখন ক্লাশ টেনের ছাত্র ছিলাম, তখনই আমি চিন্তা করি যে কোনদিকে যাব? তখন আমি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার আব্বা যেহেতু ফিজিক্সের টিচার, আমি আব্বার মতো হব। বলতে পারেন বাবার আদর্শে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ, আমি দেখলাম, প্রাক্টিক্যালি মুসলমানদের ভেতর ফিজিক্সের টিচার ছিলই না। অল বেঙ্গলে মুসলমানদের মধ্যে ফিজিক্সের টিচার ছিল হাতেগোণা।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার আব্বা তো একদম প্রথম দিকের মুসলিম বিজ্ঞানশিক্ষক।

এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: একদম প্রথমের। আমার আব্বা এসএসসি পাশ করলেন বরিশালের বিএম কলেজ থেকে। তারপর কলকাতায় গেলেন। সে সময় তিনি ঠিক করলেন যে, তিনি অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স পড়বেন। আমি অবাক হয়ে যাই। তখন মাত্রই অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স শুরু হয়েছে। পরে কৃষ্ণনগর কলেজের ফিজিক্সের বড় বড় সব শিক্ষক, সবাই আমাদের বাসায় এসেছেন। আমার আব্বা এবং আমার মা তাদেরকে আপ্যায়ন করলেন। তখনই আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই যে আমিও ফিজিক্স পড়ব। আমি সৌভাগ্যবান যে আমার আব্বা ওখানকার ফিজিক্সের শিক্ষক ছিলেন। দ্বিতীয়ত আমি ওরকম একটা আবহাওয়াতে বড় হয়েছি। কৃষ্ণনগর কলেজটা ছিল ভালো। খুব বড় কলেজ। তারপরে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজের আবহাওয়াটাও খুব ভালো ছিল বলব। এখন হয়ত ততটা নেই। কিন্তু এক সময় খুব ভালো ছিল। শিক্ষকরা খুব ভালো ছিল। তারপরে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমি যখন আসলাম, তখন যেসব শিক্ষক পেয়েছিলাম, তাদের মতো শিক্ষক আজকাল আর হয় না।
রাজু আলাউদ্দিন: সত্যেন বসুকে তো আপনি পাননি, তাই না?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: চলে গেছিলেন। আমি যখন ছাত্র হিসেবে ঢুকলাম, সেই বছরের আগের বছর তিনি চলে যান। আমার জন্য খুব দুঃখের স্মৃতি, আমি যখন এখানকার শিক্ষক, সত্যেন বসু তখন কলকাতায়। আমি শিক্ষক হয়ে প্রথমে ঠিক করলাম, সত্যেন বসুকে ঢাকায় নিয়ে আসব বেড়াতে। আমরা তাকে লিখলাম যে, আপনাকে এখানকার ছাত্রছাত্রীরা দেখতে চায়। আপনি যদি রাজি হন তাহলে আপনাকে আনার ব্যবস্থা করব। উনি খুব খুশি হলেন। বললেন, ঠিক আছে, ব্যবস্থা করো। আমরা ঠিক করেছিলাম যে, আমরা ঢাকা থেকে একটা গাড়ি নিয়ে বর্ডারে যাব। আর সত্যেন বসু কলকাতা থেকে গাড়ি করে ওই বর্ডারে আসবেন। আমার এইভাবে তাকে নিয়ে আসব আবার এইভাবে তাকে রেখে আসব। সবকিছু ঠিকঠাক, হঠাৎ একদিন খবর পেলাম সত্যেন বসু মারা গেছেন। আমার এত কষ্ট হলো। সবকিছুই ঠিকঠাক। দুইদিন পরেই উনি আসবেন ঢাকায়। হলো না। এটা বড় দুঃখ আমার। আমাকে উনি খুব ভালোবাসতেন। উনার আশি বছর বয়সে ওখানে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল সেখানে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিল। আমি গিয়েছিলাম। কলকাতার গভমেন্ট হাউজ, ওটাকে রাজভবনই তো বলে, ওখানে আমাকে পাশে বাসিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ গল্প করেছিলাম। এটা আমার লেখায় আছে। সত্যেন বসুর সাথে আমার আলাপচারিতা।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি শুধু বাঙালি বিজ্ঞানীদের সঙ্গই না, পৃথিবীর আরো বড় বড় বিজ্ঞানীদের সাথে আপনার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাদের সাথে আপনার মেলামেশার সুযোগ হয়েছে। এঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আব্দুস সালাম। আপনার বন্ধু ছিলেন। একসঙ্গে বোধহয় কাজও করেছেন। আরেকজন আছে হিগস(নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী)। এঁদের সাথে অনেক সময় কাটিয়েছেন
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: সময় বেশি কাটাইনি। তবে কয়েকবার বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকার সুযোগ হয়েছিল। অনেকেই মনে করবে যে আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছি। বিশ্বাস করেন, আমি কোনো কিছুই বানিয়ে বানিয়ে বলছি না। হিগস তখনো এত নাম করা হয় নাই। কিন্তু উনার কাজ আমি জানতাম। আমি মাঝে মাঝে ত্রিয়েস্টে যেতাম। হিগস ওখানে মাঝে মাঝে আসত। একবার অক্সফোর্ডে ছিলাম। আমি গবেষণা করতাম। সেখানে দেখা হয়েছে। কাজেই মোটামুটি ভালোই পরিচয় ছিল। আমার সাথে পরিচয় খুব বেশি নয়। ওই কনফারেন্সে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: বর্তমানে বিজ্ঞানবিমুখতা বেড়ে গেছে। অথচ উল্টোটা হওয়া উচিত ছিল। বিমুখতা বাড়ার পেছনে মানুষের ধর্মমুখিতা, আচারনিষ্ঠতা এটা কি প্রধান কারণ মনে হয় আপনার?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: প্রধান বলব না এই জন্য যে এটা তো সব সময়ই ছিল। এটা তো নতুন কিছু না। আপনি যার কথা বললেন, আচারনিষ্ঠতা, এটা তো সব সময় ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আচারসর্বস্বতা কি সবসময় ছিল?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এটা আগে কখনো ছিল না। বাঙালি মুসলমান আমরা কখনো আচারনিষ্ঠ ছিলাম না। তখন মুসলমানরা ধর্মপ্রাণ ছিল কিন্তু একই সাথে বিজ্ঞান স্টাডি করতে চাইত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখেন। সেখানে যারা শিক্ষকতা করেছেন, ফিজিক্সে, কেমিস্ট্রিতে, বায়োলজিতে, বোটানিতে, বেশ কিছু ভালো কাজ এখানে হয়েছে। একটা দুটো না, অনেকগুলো ভালো কাজ হয়েছে। ফিজিক্সে যারা শিক্ষক ছিল, তারা অত্যন্ত ডেডিকেটেড ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, হয়ত তাদের মধ্যে বেশিরভাগই হিন্দু ছিল, কিন্তু মুসলমানও তো কিছু ছিল। আমার শিক্ষক আব্দুল মতিন চৌধুরী সাহেব এবং আরো অনেকে। তারা তো কিছু করার চেষ্টা করেছেন। এবং করেছেনও। সেরকম এখন আর হচ্ছে না। সেটার কারণ হলো, আমরা টাকা পয়সার প্রতি লোভী হয়ে উঠেছি। এটাই আসল কারণ। এটা বোধহয় সব দেশেই হয়েছে। আমার মনে হয় আমাদের দেশে বেশি হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমারও তাই মনে হয়। পশ্চিমে, সেখানেও মানবিক বিভাগের যেসব বিষয়, ধরা যাক শিল্প-সাহিত্য, এগুলোর চেয়ে মানুষের উৎসাহ চলে গেছে ওইসব বিষয়ের দিকে, যেগুলো পড়লে সাথে সাথে উচ্চ বেতনের চাকরি পাওয়া যাবে। সেই একই কারণে বিজ্ঞানবিমুখতা তৈরি হচ্ছে। আমাদের সরকার তো ডিজিটাল সরকার। মানে ঘোষণায় ডিজিটাল সরকার। আপনার সর্বশেষ বই, আপনি প্রধানমন্ত্রীকে উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গ পাতায় আপনি ডিজিটালের কথা উল্লেখ করেছেন।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমি উনাকে এই বইটা দিইনি।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই নাকি! এটা তো ২০০৯ সালে বেরিয়েছে।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: কারণ, উনি এত রাজনীতিমুখী হয়ে গেছেন…
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো তার না হয়ে উপায় নেই।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: সেটা অবশ্য বলতে পারেন। কিন্তু এটা যখন আমি লিখেছি, তখন উনি এতটা ছিলেন না। এখন আমার মনে হয়েছে, এটা যদি উনাকে দিতে যাই, সবাই ভাববে সুবিধা পাওয়ার জন্য এটা করছি। আমি এটা কখনো চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার মনে হয় আপনি এটা দিতে পারেন।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপরও আমার মনে হয়, এটা আপনার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আপনি দিতে পারেন। তিনি আপনাকে রান্না করে খাইয়েছেন।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: খাইয়েছেন তার কারণ, ওয়াজেদ আমার ছাত্র।
রাজু আলাউদ্দিন: উনার হাসবেন্ড আপনার ছাত্র!
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: হ্যাঁ। ওই সময় সে ত্রিয়েস্তে ছিল। আমাকে তার বাসায় নেমনতন্ন করেছিল। সেই সময় আমাকে খাইয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আমার মনে হয় স্যার, আপনার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আপনার মর্যাদার সঙ্গে যায় না, এমন অপ্রীতিকর কোনো মন্তব্য আমি কারো কাছ থেকে শুনিনি। ফলে আপনি যদি তাকে দিতে যান, আমার মনে হয় না এতে খারাপ কিছু হবে।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: বললাম তো, উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন দেব।


রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কি তাহলে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান না?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমি তাকে শেখ মুজিবের মেয়ে হিসেবে দেখতে চাই। শেখ মুজিব আমাকে খুব ভালোবাসতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: শেখ মুজিবের সঙ্গে আপনার স্মৃতি আছে?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: উনার সাথে দুইদিন দেখা হয়েছে। একদিন হলো, আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির কাছে থাকতাম, আমি বাসা থেকে বেরিয়ে ইউনিভার্সিটির দিকে যাচ্ছিলাম, দেখি রিকশা করে শেখ মুজিব যাচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কত সাল হবে ওটা?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমার তো সাল টাল মনে থাকে না।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশ হওয়ার আগে?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: তখন বাংলাদেশ পাচ্ছেন কোথায়! তার বহু আগে। বললাম না শেখ মুজিব রিকশা করে যাচ্ছেন। আমি দেখে হাত তুললাম। উনি রিকশায়, আমি হাত তুললাম। উনি আমাকে চিনতেন। দ্বিতীয় আরেক দিন হলো, সেটা আরো অনেক পরে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনাকে চিনবার কারণ কী ছিল?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: কারণটা বলতে পারব না। এর অনেক দিন পরে, তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন উনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ যে বাড়ি ছিল সেখানে থাকতেন। ওখানে আমাদের নেমনতন্ন করেছিলেন। কী কারণ তা মনে নেই। সেখানে আমিও ছিলাম। তখন দেখা হয়েছিল। খুব লম্বা। এ রকম বাঙালি আমার চোখে পড়ে না। খুব হ্যান্ডসাম। লম্বা-চওড়া। এরপরও কোথায় যেন দেখা হয়েছিল আমার মনে পড়ছে না।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আমরা যেটা বলছিলাম, ডিজিটাল বাংলাদেশ, এটা এই সরকারের একটা স্লোগান। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ হলেও বিজ্ঞান-চর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। এর জন্য আপনার কোনো পরামর্শ আছে? এই সরকারের কী করা উচিত? কী করলে মানুষ বিজ্ঞান-চর্চার দিকে উদ্বুদ্ধ হবে? আপনার কি মনে হয় পাঠ্যক্রমের মধ্যে বড় রকমের কোনো পরিবর্তন আনা দরকার?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমার তা মনে হয় না। এটা পাঠ্যক্রমের ব্যাপার না। আপনাকে স্কুল পর্যায় থেকে ভালো ছেলেমেয়েদেরকে পিকআপ করতে হবে। যারা বিজ্ঞান পড়তে চায়, পড়ার আগ্রহ আছে এবং বিজ্ঞানকে যারা সারা জীবনের কাজ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। এই রকম ছাত্রছাত্রী পিকআপ করতে হবে। এটা করতে হবে শিক্ষকদের। এটা শেখ মুজিবও পারবে না। শেখ হাসিনাও পারবে না। এটা অন্য কারো কাজ না। এটা শিক্ষকদের কাজ। সেরকম শিক্ষক আমাদের নেই। আমার দুএকজন ছাত্রর কথা বললাম, ওদেরকে আমি একেবারে প্রথম থেকেই গড়ে তুলেছিলাম। হাসান মাহমুদের কথা বললাম, ও তো ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তখন ও আমার কাছে আসত। সেই থেকে ওকে আমি খুব স্নেহ করি। এটা সরকারের উদ্যোগে হয় না। তো সত্যি কথা হলো, ওরকম শিক্ষক এখন নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: এ বছর যে বিষয়ে বিজ্ঞানের শাখায় নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো, আপনি এটা নিয়ে আর্টিকেলও লিখেছেন, সেখান থেকে আমরা জানতে পেরেছি, এই আবিষ্কারের দ্বারা কম্পিউটারকে অসম্ভব গতি দেয়া যাবে। কম্পিউটারের আয়তন অনেক ছোট করে অসম্ভব গতিশীল করে তোলা যাবে।

…………………………………………….

বই
অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদের বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা বইগুলোর নাম, প্রকাশকাল ও প্রকাশনা সংস্থার নাম উল্লেখ করা হলো:

Nuclear Structure (এ. হোসেন এবং এম. ইসলামের সাথে যৌথভাবে); ১৯৬৭; উত্তর হল্যান্ড, আমস্টার্ডাম
আইনস্টাইন ও আপেক্ষিক তত্ত্ব; ১৯৮৪ বাংলা একাডেমী
বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান (বাংলা একাডেমী বক্তৃতা); ১৯৮৫; বাংলা একাডেমী
পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব; ১৯৮৭; বাংলা একাডেমী
Quantum Mechanics; ১৯৮৮; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কম্পিউটারের কাহিনী; ১৯৮৮; আহমেদ পাবলিকেশন
চিরায়ত বলবিজ্ঞান; ১৯৯০; বাংলা একাডেমী
বিজ্ঞান ও দর্শন; ১৯৯১; বাংলা একাডেমী
গ্ল্যাসো-সলাম-ভাইনবার্গ তত্ত্ব; ১৯৯২; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
চিরায়ত বিদ্যুত বলবিজ্ঞান; ১৯৯২; বাংলা একাডেমী
উপমহাদেশের কয়েকজন বিজ্ঞানী; ১৯৯২; জিজ্ঞাসা
বস্তুর সাধারণ ধর্ম; ১৯৯৩; বাংলা একাডেমী
Satyen Bose in Dhaka; ১৯৯৪; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কয়েকজন স্রষ্টা; ১৯৯৫; বাংলা একাডেমী
সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব ও বিশ্বসৃষ্টি; ১৯৯৬; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জগদীশ চন্দ্রের পত্রাবলী; ১৯৯৮; বাংলা একাডেমী
Complex Variable and Special Functions of Mathematical Physics; ১৯৯৯; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Geometrical Methods in Physics; ২০০০; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঘুরে ফিরে দেখা আমাদের মহাবিশ্ব; সাহিত্য পাবলিকেশন
মৌলিক কণা; বাংলা একাডেমী
পরিসংখ্যান বলবিজ্ঞান; বাংলা একাডেমী
গ্রুপ তত্ত্ব ও পরিসংখ্যানে এর প্রয়োগ; ২০০২; বাংলা একাডেমী
বিদ্যুত্‍ ও চুম্বক তত্ত্ব
আধুনিক নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান; ২০০৩; বাংলা একাডেমী
Bangladesh Vision-2021; Bangladesh Academy of Sciences (ed.)
Second National Symposium on Science and Technologies (ed.); Bangladesh Academy of Sciences (ed.)
Introduction to Particle Physics (এরশাদ মোমেন-এর সাথে যৌথভাবে)
Quantum Field Theory (এরশাদ মোমেন-এর সাথে যৌথভাবে)
আকাশ-ভরা সূর্য-তারা; ১৯৮৮; আহমেদ পাবলিকেশন
Our Alma Mater, From Bose-Einstein to Salam- Weinberg & Beyond, ২০০৬
Quantum Field Theory
অপূর্ব এই মহাবিশ্ব
Our physics heritage and the new millennium
Proceedings of the Second National Symposium on Science and Technology: Bangladesh Vision 2002
Bangladesh Vision 2021: Proceedings of the National Symposium on Science and Technology
নতুন শতাব্দীর নতুন দিগন্ত
Collected Papers on Development of Science and Technology in Bangladesh
নোবেল বিজয়ী আব্দুস সালামঃ আদর্শ ও বাস্তবতা
Introduction to Practical Physics

…………………………………………….

এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এটা আপনি শুনবেন? ফিজিক্সের ধারণা না থাকলে বোঝা মুশকিল হবে। লেজার পদ্ধতি তো জানেন। লেজার দিয়ে যে চিকিৎসা করা হয়। এটা কী জিনিস? এটা হলো, একটা টিউব থেকে অনেক লাইট বের হয়। তাদের মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা থাকে না। বিশৃঙ্খল হিসেবে আসে। এতে অবশ্য আমাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আপনি যদি সবগুলাকে একটা শৃঙ্খলের মধ্যে আনতে পারেন, তখন ওটা লেজার এবং তখন ওটার শক্তি অনেক বেড়ে যায়। কারণ তখন একই দিকে ঘুরছে। একই তাল, লয়ে, ছন্দে চলছে। আপনি বাংলা বোঝেন ভালো। সব তরঙ্গগুলো যদি একই ছন্দে নিতে পারেন, তাহলে যেখানে গিয়ে পড়বে, অত্যন্ত জোরালোভাবে পড়বে। অনেক বেশি শক্তি নিয়ে পড়বে। এবং এর দ্বারা আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন। এ হলো লেজার। লেজারের প্রিন্সিপল। এখন যেটা এবছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছে, তারা যে কাজটা করেছে, সেটা হলো, ওই লাইটটি অন্য পার্টিকেল দিয়ে… পার্টিকেলগুলো যদি ওইভাবে এ্যাকুরাম করতে পারেন, এ্যাকুরামের বাংলা হলো সংশত্ত। তাহলে যে লেজার এবং আলো দিয়ে করেছে, একই জিনিস আপনি এ্যাকুরাম দিয়ে করতে পারবেন। তার ফলে অনেক বেশি শক্তি হবে। এটা আপনি কম্পিউটারে ব্যবহার করতে পারবেন। শুধু একটাই পার্থক্য। আমাদের কম্পিউটার জিরো অথবা ওয়ান– এই দুইটা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আপনি যদি অন্য পার্টিকেল দিয়ে করতে পারেন তাহলে আরো বেশি গতিতে আমরা ব্যবহার করতে পারব। তারপরে কোয়ান্টাম কম্পিউটার আমরা তৈরি করতে পারব। এটা হলো এই আবিষ্কারের সম্ভাবনা। আশা করা যায় এটা একদিন হবে।

রাজু আলাউদ্দিন: প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান-ভাবনা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: ভারতীয়দের অবদান তো সবাই স্বীকার করে। গণিতের এই যে জিরো বা শূন্য– এটা তো ভারতীয়রা আবিষ্কার করেছে। এটা সবাই স্বীকার করে। এই শূন্যটা আবিষ্কার করায় কত যে লাভ হয়েছে! আপনি সহজে যোগ বিয়োগ করতে পারছেন শূন্যের মাধ্যমে। শূন্য না থাকলে সম্ভত হতো না।
রাজু আলাউদ্দিন: মুসলিমবিশ্বের দিকে তাকালে মনেই হয় না যে এক সময় মুসলমানরা বিজ্ঞানের রাজত্ব করেছিলেন দীর্ঘ সময়ব্যাপী। স্পেনের সেই স্বর্ণযুগ! যে সময়টায় ইহুদি, খৃস্টান এবং মুসলমানরা একসাথে বিজ্ঞানের চর্চা করেছে। সেই চর্চাটা এমনই ছিল, ইউরোপের দর্শনকে ইউরোপের হাতে ফিরিয়ে দিলেন মুসলমানরাই। সেই মুসলমানরা এমনভাবে বিজ্ঞান-বিমুখ হয়ে গেল, এটা অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার।

এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এটা তো ঐতিহাসিক ব্যাপার। এক সময় বিজ্ঞানের চর্চা যা কিছু হতো, সব মুসলমানরাই করত। হারুন আর রশীদের সময়। আব্বাস উদ্দীনের আমলে এমন কিছু হয়েছে, ইউরোপের লোকেরা তা জানত না। হারুন আর রশীদের সময়ে তারা যা কিছু চর্চা করত, সব লিখে রাখত। সেই লেখাগুলো ইউরোপে গেল। ইউরোপের যারা বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখত তারা ওগুলো নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে। সেখান থেকে ইউরোপিয়ান সিভিলাইজেশন শুরু হয়। এটা তো ওরাই স্বীকার করে। আমাদের বানিয়ে বলার তো কথা না। ওরাই স্বীকার করে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার অবাক লাগে, সেই ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি। সেই চর্চা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ:যে কোনো কারণেই হোক, আমরা খুব বেশি ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেছি। এই বিমুখতার রাজনৈতিক কারণও আছে। এক সময় মুসলমানদের যুদ্ধ করে বাঁচতে হতো। এটাই আমার মূল কারণ মনে হয়। সেই জন্যই বিজ্ঞানের কাজ তারা করতে পারে নাই। আমি এইভাবে দেখি।
রাজু আলাউদ্দিন: বর্তমানে জীবিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্টিফেন হকিং লিজেন্ড। উনার সর্বশেষ আবিষ্কারগুলো সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: স্টিফেন হকিংয়ের নিজের লেখা থেকে পড়েছিলাম, তিনি লিখেছেন, অনেক আগে আমেরিকায় ব্ল্যাক হোল নিয়ে কিছু কাজ করতাম। সেইটা লিখে আমার যা কিছু নাম, সব ব্লাক হোল থেকেই হয়েছে। এছাড়া তো তার নামকরা কাজ আমার চোখে পড়ে না।
রাজু আলাউদ্দিন: যেগুলো আছে, সেগুলো বোধহয় আবিস্কার নয় ততটা, যতটা ইতিহাস, যেমন আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম– এই ধরনের বই।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: হ্যাঁ এটা ভালো বই। আমার কাছে আছে। মাঝে মাঝে পড়ি। লেখাটা খুব সুন্দর।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কম্পিউটার কোয়ান্টাম নিয়ে আগে আমাদের এখানে লেখালেখি করেছিলেন এবং বইও বেরিয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে। এইসব কাজ করেই পশ্চিমে অনেকে পুরস্কার পাচ্ছে। পশ্চিমে বিজ্ঞান চর্চার একটা সুবিধা আছে। আমাদের এখানে সেটা নেই। আপনার কি মনে হয়, কাজের তুলনায় আপনি যথেষ্ট পরিচিতি এবং স্বীকৃতি পাননি?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: না। কখনোই এসব চিন্তা করি না। আমার ভালো লেগেছে কাজ করেছি। স্বীকৃতি দিয়ে কী করব!
রাজু আলাউদ্দিন: পশ্চিম বিজ্ঞান চর্চায় আমাদের থেকে এগিয়ে আছে।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: গবেষণায় আমাদের থেকে এগিয়ে আছে কিছুটা। ওদের কিছু জার্নালে লেখাটেখা দেখি, তাতে মনে হয় কিছু লোক ওদের তৈরি হয়েছে। ইয়াং ছেলেদের লেখা। গবেষণা তো সব সময় ইয়াঙদের কাজ। সেটা আমাদের দেশে হলো না।
রাজু আলাউদ্দিন: বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখালেখির বাইরে আপনি নানান রকম পড়াশোনা করেন। সাহিত্য-বিষয়ক পড়াশোনা। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আপনার আর কোনো প্রিয় লেখক আছেন বাংলাভাষায়?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: জীবনানন্দ।
রাজু আলাউদ্দিন: উপন্যাস বা গল্পে?

এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। আমার মামা বলতেন, আমিও বলি, বিভূতিভূষণ নোবেল প্রাইজ পাওয়ার উপযুক্ত ছিল। কথা ঠিকই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পেলেন না। আসলে মানুষের কপালও বড় ফ্যাক্টর। তার যে লেখা, অপুর সংসার, পথের পাঁচালী ইত্যাদি, এর উপর তো নোবেল দেয়া উচিত ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: ভারতবর্ষের বর্তমান বিজ্ঞান-চর্চার অবস্থা জানতে চাই।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: আমি এখন বলতে পারব না। আমি তো এখন আর অত খোঁজ-খবর রাখতে পারি না। আধুনিক জার্নাল এখন আর পাইও না, পড়তেও পারি না। ইয়াং ছেলে, যারা খোঁজ-খবর রাখে, তাদের কাছে শুনলে জানতে পারবেন। তবে আছে। অনেকেই কাজ করছেন। কলকাতায় হয়ত অতবেশি নেই। কিন্তু বোম্বেতে আছে। মাদ্রাজে আছে। হয়ত নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো নেই। কিন্তু ভালো পর্যায়ের কিছু আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশের লেখকদের লেখা পড়েন আপনি? গল্প-উপন্যাস-কবিতা?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: খুব কম। দু একটা পড়ার চেষ্টা করেছি। ভাল্লাগে নাই। তারাশঙ্কর বিভূতিভূষণ এরা আমাদের যে রুচি বানিয়ে দিয়ে গেছে, সেই রুচির সাথে আধুনিক লেখা ঠিক খাপ খায় না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি আত্মজীবনী লেখার কথা ভেবেছেন কখনো?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: না না। এটা আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: কেন?
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এতে কার কী লাভ হবে?
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আমরা তো কখনো কখনো কারো আত্মজীবনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হই। শৈশবে আমাদের স্বপ্নগুলোকে উস্কে দিতে সহযোগিতা করে। আপনার আত্মজীবনী হয়ত আমাদেরকে সেভাবে সহযোগিতা করবে।
এ. এম. হারুন-অর-রশিদ: এগুলো আমার ভালো লাগে না।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

Flag Counter


4 Responses

  1. একরাম আলি says:

    এমন একটা সাক্ষাৎকার পড়লাম, যেটা পরিচ্ছন্ন মনের এক মানুষের কাছে আমাকে পৌঁছে দিল। এঁদের মনন গড়ে উঠেছে উনিশ শতকের আলোকরশ্মি থেকে। এইসব মানুষ, যাঁরা ক্রমশ বিরল হয়ে যাচ্ছেন বাঙালি সমাজ থেকে, তাঁদের যথোপযুক্ত ভাবে সামনে আনার জন্যে ধন্যবাদ।
    এত দিনের অচেনা এক বিজ্ঞানীকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা।

  2. তাইরান আবাবিল says:

    ভালো কথামালা!

  3. “একটা তো বললাম ভালো ছেলেগুলো বিদেশে চলে যায়। দেশের প্রতি তাদের যে ভালোবাসা, সেটার প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পায় না।” 100% true.

  4. এমন একজন বিজ্ঞানীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য
    লেখক রাজু আলাউদ্দিনকে অনেক ধন্যবাদ। ড.রশিদের লেখা যদি কোন ব্লগে বা অনলাইনে পাওয়া যেত তাহলে খুব ভাল হতো। বই কিনে সব সময় পড়া হয় না। দেশের বাইরে বাইরে যারা থাকে, তাদের তো আরও না। বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার অভাব অনেক দিনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.