টি এম আহমেদ কায়সারের দশটি কবিতা

টি এম আহমেদ কায়সার | ৮ জানুয়ারি ২০১৮ ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন


স্মৃতি

শীতকাল আসছে
ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে
সেদিন সুইন্সটি লেকে খড়ের আগুন পোহাতে পোহাতে কেউ একজন বলল –
এবার ডিসেম্বরে নাকি ভারি ঠান্ডা পড়বে
এন্টার্কটিকার আয়তন হু হু করে বাড়ছে
জগতের কোথায় কোথায় নাকি জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে
কোথায় কোথায় কী সব যেন হচ্ছে …
লোকটা খড়ের আগুন পোহাতে পোহাতে বলেছে,
এমন শীত আসছে যে মানুষের মুখ সহসা কুঁকড়ে যেতে পারে
হাঁটু জমে যেতে পারে
জিভ অবশ হয়ে যেতে পারে

আমার ভয় নেই
শীতবস্ত্র ছাড়াই দিব্যি আমার শীতকাল কেটে যায়
আর তাতে বিস্মিত হন পাড়া প্রতিবেশিরা

ডিসেম্বর আসুক
শীত আরো ঘন হয়ে পড়তে শুরু করলে
আমিও ধীরে ধীরে গোপন সিন্ধুক থেকে বের করবো
আমাদের ধ্বংসোন্মুখ, প্রলয়োন্মুখ, প্রজননোন্মুখ গুঢ় চুম্বনের স্মৃতি!!

রহস্য

ভুবনের সব মেঘ
আরশে মুয়াল্লায় মিলিয়ে যাবার পর
স্নোডন পাহাড়ের গুহায় আজ নিশিবেলা কী কী হতে যাচ্ছে
আমি ছাড়া নিশ্চয়ই আরো কেউ না কেউ জানে

গোঁ

শুঁড়িখানার সঙ্গী, সুরা, পানপাত্র সব ফেলে এসেছি
এখন খুব তুষারপাত হোক
মাঝে মাঝে তুমুল বজ্রপাতও; কে না কে মারা গেল,- তাতে আমার কী
একটু একটু করে না হয় অন্ধকারও নামুক

আমি ব্রীজের ওপারে রূপকুমারী নদী পার হয়ে
একটা উইলো গাছের নীচে বসে জিরোবো
ক্ষয়িষ্ণু দালানের ছাদ থেকে কে না কে হাতছানি দিয়ে ডাকছে
তাতে আমার বয়েই গেলো !

কাম

কেউ একজন চিৎকার করে জানিয়ে দিক যে আমার স্নানের সময় হয়েছে ! উত্তাল জলরাশি নিয়ে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমের সমুদ্রগুলো এখন আমার উপর আছড়ে পড়ুক !

আহবান

যীশু নই, ত্রাতা নই, -জগতের শেষ প্রেমিক কবি বলছি, শোনো, যদি তোমাদের মাঝে আমার পরেও আর কোনো প্রেমিক কবি অবতীর্ণ হত, সে হত নিঃসন্দেহে ঐ তীরবিদ্ধ হরিণ শাবক, নিষ্ঠুর ব্যাধ এসে যার জনক জননীকে হত্যা করেছে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, দৌড়ে পালাতে গিয়েও যে রেহাই পায়নি, উরু আর বক্ষ ভেদ করে গেছে পাষান্ড ব্যাধের অব্যর্থ তীর। খোঁড়াতে খোঁড়াতে জীবনের মায়ায় বিভোর ঐ হরিণ শাবকখানা, ভাবো, রাগ ভীমপালশ্রীতে গাইছে জীবনের শেষ স্বরচিত আর্ত-গাঁথা; শেষ মাতম, অস্তায়মান রৌদ্রের শেষ ব্যালাড!

দূরে আলো নিভে যাচ্ছে, পশ্চিম সমুদ্রে ঝাঁপ তালে টানা আছড়ে পড়ছে অপার্থিব রক্ত-তরঙ্গ …

তুষার

পাশে, অবশ্য ঠিক পাশে নয়, বেশ খানিকটা দূরে বসেও নেহায়েত কী করি, কেন করি জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বেজায় নাক ঘামতে শুরু করেছে দেখে, গালে টোল-পড়া যে মেয়েটা গমগম করে হেসে উঠেছিলো এক চৈত্র-সন্ধ্যায়; , এই শূণ্য রাতে, কেন যে তার কথা ভেবে ভেবেও খুব মন কেমন করছে, হায়, – বড় নিষ্ঠুর এই তুষার প্রবাহ!

শীত
সোয়েটার বিক্রির অভিনব কিছু অভিসন্ধির অংশ হিসাবে
জগতের তাবৎ পুজিপতিরা মিলে
সমস্ত বরফ সমুদ্র সেচে সযত্নে ডেকে নিয়ে এসেছে এই শীত
এই স্নো এই হাড় কনকন হাওয়া …..

আমি দেখতে পাচ্ছি একখানা হ্যান্সন সোয়েটার পরে তুমি কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরছো কাজ শেষে ..
.
রাত্রি আরো গভীর হোক, জানু
আমি শরীর থেকে খুলে ফেলবো আমার চামড়া
আর কাল সকালেই পরিয়ে দিয়ে আসবো তোমার দেহে …

কী অর্থ এই দেহের, এই উষ্ণ দেহাবরণের, যার প্রেয়সী কিনা শীতে দাত কিড়মিড় করে বাড়ি ফিরছে!!

রক্ত

আলো সরোবর থেকে তুমি ছুঁড়ে দিয়েছো এইসব কনকনে শীত-ফুল আর তুষার প্রবাহ

হৃৎপিণ্ড গলতে শুরু করেছে …

ভোরে সারা শহর ভরে যাবে আমার ছোপ ছোপ রক্তে ..

প্রবঞ্চনা

এই সব প্রবঞ্চনা
দিনদিন জীপ টেনে পুরে রাখতাম এক লাল থলের ভেতর
রাত্রি গভীর হলে আজকাল
থলে থেকে বের হয়ে আসে এক দীর্ঘ বিষধর নাগ
হাঁসফাঁস করে দিগ্বিদিক

শুনেছি, সাপের দংশনে যারা মারা যায়
বেনো জলে নাকি তাদের লাশ ভেসে বেড়ায়
এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে বেওয়ারিশ!

চুম্বন

জ্যোতিষি বলেছে
হাসপাতালে রোগ যন্ত্রণায় নয়
আমার মৃত্যু বরং হবে সাঁড়শি চুম্বনে; নেশাতুর ওষ্ঠ-অভিসারে

এক জমকালো সন্ধ্যায় আমাদের দেখা হবে
অর্থাৎ
আমি ও আমার যম – চতুর্দিকে নিস্তব্ধ নগরী

প্রতিটি চুম্বনের আগেই তাই সযত্নে গ্রহণ করি মৃত্যু প্রস্তুতি
ও সুবল রে …
এরে কি চুম্বন বলে, ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যু যেথা যথা উহ্য নাহি?

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — জানুয়ারি ৮, ২০১৮ @ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

      ভিন্ন স্বাদের কিছু কবিতা পড়লাম। আগে পড়া হয়নি এই কবির কবিতা। কবির ভাষা ব্যবহার কিছু জায়গায় আমাকে চমৎকৃত করেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈয়দ আফসার — জানুয়ারি ১০, ২০১৮ @ ৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

      কায়সার ভাই,
      ইংল্যান্ডের স্নো আর হাড়কাঁপা শীতানুভব পাশে রেখে কবিতা পড়লাম। দীর্ঘ বিরতির পর আপনি কবিতায় ফিরছেন।
      সাধুবাদ আপনাকে। ভালো থাকুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Minhaj — জানুয়ারি ১০, ২০১৮ @ ৫:৩৯ অপরাহ্ন

      Kobita aro shohoj hote parto. tobe Chomboon, Tuser ar shit kobita ta khub valo legese…….
      “কী অর্থ এই দেহের, এই উষ্ণ দেহাবরণের, যার প্রেয়সী কিনা শীতে দাত কিড়মিড় করে বাড়ি ফিরছে!!” Ei kotha ta khub valo legese…….

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com