প্রবন্ধ

দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়রে দেবতা

দেবলীনা সুর | 2 Jan , 2018  

tagore“দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়রে দেবতা”- রবীন্দ্রনাথ যিনি দূরকে নিকট করেছেন,দেবতাকে প্রিয় করেছেন। বিশালের সাথে তুচ্ছের যোগ ঘটিয়েছেন। ছোটকে বড়র কাছে বড়কে ছোটর কাছে নিয়ে গেছেন। সীমাকে অসীমের কাছে অসীমকে সীমার মধ্যে একটা বিন্দুতে মিলিয়েছেন, পৃথিবীর সব রূপ-রস-গন্ধ-আলো-বাতাস-জল-স্থল-পাহাড়-প্রকৃতি-অরণ্য-পাখির ডাক-সাগরের গর্জন-মানুষের চিরদিনের কামনা বাসনা, প্রেম-দুঃখবেদনা-আবেগ সব কিছুকে একটি পরিবারের বাঁধনে বেঁধেছেন। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখতে গেলে দিশাহারা হতে হয়। দিশাহারা হই শুধু তার রচনা সম্ভারের বিশালতায় নয়, তার বৈভবে-বৈচিত্রে। তিনি যেন পৃথিবী জুড়ে একটা শিল্পের মেলা বসিয়ে রেখেছেন। সে মেলার কোলাহল কান-মনকে আকুল করে। কি নেই সেই মেলায়! খুব ছোট করে তাকে বলা বড় কষ্টসাধ্য তবু এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় জলে স্থলে আকাশে নক্ষত্রে অন্ধকার গুহা মাটির স্তর ভেদ করে কোথায় ফেলেননি তার মন্থন রজ্জু? সেখান থেকে কুড়িয়ে অজস্র মনিমুক্তা যা দিয়ে গেঁথেছেন মনিহার। সে মনিহার বাংলাসাহিত্য সম্ভারকে অপরূপ করে তুলেছে।

ছেলেবেলার রবি ঠাকুর মেঘের কোলে রোদের মত মিষ্টি স্নিগ্ধতা। কিশোর বেলার রবীন্দ্রনাথ সূর্যের আলোর মত উজ্জ্বল। সেখানে অন্যের কাছে জেনে অন্ধের মত লাঠি ঠুকে ঠুকে রবীন্দ্রনাথকে চিনতে হয় না। তার ভেতরের স্পন্দন নাড়ি টিপে জীবন প্রবাহ বোঝার মতই বোঝা যায়। কিশোরবেলায় রবি ঠাকুরের লেখা পড়তে পড়তে পাখির ডাক শুনতে শিখেছি, সূর্যের আলো মেখে শুদ্ধ হতে শিখেছি, ফুলের জেগে ওঠা দেখে নিজেকে জাগিয়ে তোলার প্রেরণা খুঁজে পেয়েছি। মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে, মলিনতা দীনতাকে ধুয়ে মুছে দেবার প্রেরণা তিনিই। মাঠ প্রান্তর বনের পাখির মত মনের আনন্দে ডানা মেলেছি। নিবিড় ঘন আঁধারে ধ্রুবতারা ধৈর্য্যশীল থাকার প্রেরণা বরাবর দিয়েছেন আমায় রবীন্দ্রনাথ ।
মনে প্রশ্ন জাগে কী এমন শক্তি আছে তার যে শক্তিকে চলার পথে প্রতিনিয়ত স্মরণ করতেই হয় আমাদের।?যিনি রবীন্দ্রনাথকে মানেন না ভালোবাসেন না তিনিও তার নিজের অজান্তেই প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথের ভেতর থেকে চলার প্রেরণা সংগ্রহ করেন। তাহলে তার সে শক্তিটি কী? উত্তর খুঁজতে অনত্র যাবার দরকার নেই। তার উত্তরও তিনি দিয়েছেন। তবে সেই বিস্তৃত বিশাল সাগর থেকে আমার পক্ষে উত্তর সঠিকভাবে খুঁজে এনে দাঁড় করানো রাঙ্গাটুনীর সাগর সেচার মতই দুঃসাধ্য।
রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সাহিত্যেরই নয়, বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। স্বদেশ প্রেমে উজ্জ্বীবিত করেছেন তিনি। আমার বাংলার মাটি বাংলার জলের প্রতি গভীর ভালবাসাতো রবীন্দ্রনাথের দান তেমনি প্রকৃতি প্রেম জীবনের ওঠা পড়া আনন্দ-বেদনা সে তো তাঁর কাছ থেকেই উপলব্দি করতে শিখেছি। জীবনের কঠিন কঠোর পথে একলা চলার যেমন ডাক শুনেছি তেমনি দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনায় মনের সাহস যুগিয়েছে তার অবিনাশী গান। বুকে আশার আলো জ্বেলেছে সেই গান।
“আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া” ক্ষুদ্রতা থেকে মন প্রসারিত করার ডাক পেয়েছি সে গানে। তখনি বিশ্বসাথের যোগের-আবেদনে নিজের বেড়ি নিজে ভাঙ্গতে চেষ্টা করছি মুক্তির পথে যাবার আশায়। সে পথ তেমন জানিনা তবে সে পথে আলো আছে। সে আলোয় স্নান করতে এসে নিজেকে বিলাতে না পারলে বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসা শান্তির পারাবার ভাসাবার কর্ণধারের অাহ্বান ব্যর্থ হবে।
Flag Counter


1 Response

  1. ফাতেমা says:

    গায়িকার চোখে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার অবশ্যই অন্যরকম। অন্তর থেকে গান উপলব্ধি না করে ভাল গাওয়া সম্ভব নয়। লেখায় গায়িকার অন্তরের ভাবনাগুলি উঠে এসেছে। লেখাটি পড়ে আনন্দ পেয়েছি এবং একাত্মতা প্রকাশ করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.