চিত্রকলা

শিশিরের সমাজ

রনি আহম্মেদ | 16 Jun , 2008  

ঢাকার উত্তরার গ্যালারি কায়ায় (বাড়ি ২০, রাস্তা ১৬, সেকটর ৪) শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যের চিত্রকলা প্রদর্শনী ‌”লাইনস এন্ড লিরিকস” শুরু হয়েছে জুনের ৬ তারিখে। চলবে ২০ তারিখ পর্যন্ত। এ প্রদর্শনীর ছবি ও শিশিরের অন্যান্য কাজের ভিত্তিতে লিখেছেন শিল্পী রনি আহম্মেদ।

the-picture-2-f.jpg
দি পিকচার ২, ক্যানভাসে তেল ও অ্যাক্রেলিক, ২০০৮

শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যের ছবি বাস্তবের সমালোচনা ও বাস্তবের আবহ পরিবর্তন সাপেক্ষে তৈরি হয়। তাঁর ছবির আবহ ফ্যান্টাসির কিন্তু সেটা বাস্তবমুখী, অর্থাৎ সরাসরি সমাজ বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি
shishi-protrat-1.jpg……
শিশির ভট্টাচার্য্য
…….
সমাজের নানা অগ্রগতি নিয়ে চিন্তিত এবং বাস্তবতার নন্দন নৈতিকতা ও রাজনৈতিক ফলাফল তাঁকে বিব্রত করে। তাঁর ছবিতে মানুষ কমেডির উপকরণ এবং এই কমেডি প্রাত্যহিক জীবনের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তিনি তাঁর চিত্রজগতে রাজনৈতিক দর্শন অপেক্ষা রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেন, যে বাস্তবতা উপরিতলে ঘটে চলেছে বিশ্বব্যাপী। সেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে কিছু কিছু আন্তর্জাতিক অনুসঙ্গ দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী সামরিক শক্তির যে দাপট সেটার সমালোচনায় তিনি প্রতীকী খেলনা ট্যাংক, সৈন্য ব্যবহার করেছেন। বাংলা মূলধারা চলচ্চিত্রের নানা চরিত্র বাস্তব প্রতিকৃতি নিয়েই তাঁর ছবিতে উপস্থিত। মান্না, পূর্ণিমাসহ আরো অনেকে এক প্রকার ভায়োলেন্স, কমেডি ও বায়বীয় চরিত্র নিয়ে তাঁর ছবিতে প্রতিস্থাপিত হয়। বাংলা মূলধারা ছবির কাল্পনিক জগৎ থেকে শিল্পী শিশির নিজের জগৎকে পরিপুষ্ট করেছেন এক প্রকার সমালোচনামূলক প্রহসন দিয়ে। সেখানে ভিলেন, নায়ক আর নায়িকা একই অর্থহীন ক্রিয়ায় রত, যার the-picture-2002.jpg…….
দি পিকচার, ক্যানভাসে মিশ্র মাধ্যম, ১৩৫ x ১৩৫ সেমি, ২০০২
…….
মূল ভাষ্য বিকৃতি ও রুচিহীনতা — মধ্যবিত্তের রুচির জন্য যা হুমকিস্বরূপ এবং অরুচিকর। সে ক্ষেত্রে শিল্পী মধ্যবিত্ত প্রতিবাদী গোষ্ঠির একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। সে কারণে অবাধ যৌনাচার ও ভোগবিলাসের সমালোচনা প্রথম থেকেই তাঁর ছবিতে দেখা যায়। তাঁর ছবি অনৈতিক যৌনতার বিরোধিতা করে। প্রতিনিয়ত সমাজ ব্যবস্থার দুর্নীতি, জটিলতা, কপটতা, ছলচাতুরী এই সকল পতন তাঁর চরিত্রগুলোর মুখাবয়বে, দেহভঙ্গিমায় এবং কার্যকলাপে ফুটে ওঠে। ক্ষমতার দম্ভ এবং অক্ষমতার আস্ফালন যুগপৎ তাঁর ছবির দ্বৈতস্বর।

নারী ও পুরুষ চরিত্রগুলো সমানভাবে খল ও পতনশীল তাঁর ছবিতে এবং সকলেই একপ্রকার নব্য অর্থনীতির ভোগবিলাসে বিকৃত আচরণসর্বস্ব। যেখানে শরীরের সাথে মননের সম্পর্ক ঘোলাটে ও দুর্বল। রুচির পতন ও নৈতিকতার পতনই শিল্পী শিশিরের রাজনৈতিক দর্শন। যে কারণে তাঁর ফিগার ও ফর্মের কম্পজিশনেও দেখা যায় একপ্রকার বিশৃংখলার সচেতন ব্যবহার। এই বিশৃংখলা একটা সমাজের খাপছাড়া যুক্তিবিহীন প্রতিবেশকেই নির্দেশ করে এবং একপ্রকার কর্কশা যন্ত্রণামূলক সমাজকে, যেখানে সবাই এক ছেলেখেলায় মত্ত এবং এর ফলাফল এই পরিস্থিতিরই পুনারাবৃত্তি।

the-picture-b-2007.jpg
দি পিকচার (বি), কাগজে কালি, ৭০ x ৭০ সেমি, ২০০৭

বাংলাদেশ চলে লজিকে নয় ম্যাজিকে, শিল্পী শিশির সেটা জানেন একজন অতি সফল কার্টুনিস্ট হিসাবেও। রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এই দেশ যত না গণতান্ত্রিক তার চেয়ে সামন্তীয় এবং নৈরাজ্যপূর্ণ, যার চূড়ান্ত ও প্রাথমিক প্রেশার নিম্নবিত্তের ঘাড়েই এসে পড়ে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখানে ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীর দাস ও এখানে সর্ব পরিস্থিতিতেই কিছু নকল বৈভবের সৃষ্টি হয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। সব সরকারের আমলেই এটা প্রযোজ্য। এছাড়াও আমাদের জাতীয় চরিত্র উদ্ভট ও হাস্যকর। অনেকটা নিজেদের জন্যই আমরা ঠাণ্ডা মাথায় বিপদ তৈরির নীল নকশা প্রণয়ন করি। যে কারণে এই দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা কতটা বজায় রয়েছে সেটাই প্রশ্নের সম্মুখীন। আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতি পরনির্ভরশীল। ইন্দো-আমেরিকান পলিসি আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত তাই নির্ধারণ করছে। আমাদের পলিসি মেকাররা শিল্পী শিশিরের ছবির মতই বাংলা মূলধারা চলচ্চিত্রের ক্রীড়ণক ভিলেন ও নায়িকার ভূমিকায় জনগণের সামনে খেলা দেখিয়ে যাচ্ছে। অপরিপুষ্ট বুর্জোয়া শাসিত এই দেশে ক্ষমতা এখন বাংলা ছবির ফ্যান্টাসির মতই মাতাল ও হাস্যকর, একই সঙ্গে বিনোদনের বিষয়ও বটে। শিশিরের ছবিতে যে খল চরিত্র তার উদ্দেশ্য যেমন পরিষ্কার নয় তেমনি আমাদের ক্ষমতা কাঠামোর চরিত্রও পরিষ্কার নয়। শিল্পী শিশির ক্ষমতাকে দেখেন দাপট ও অপব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকে। যে কারণে দেখা যায় এই দুইয়ের সম্মিলনে তাঁর ছবির জগৎ একটা কমিক্যাল বিকৃতায়নের মধ্য দিয়ে রচিত। এই বিকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় চার্লি চ্যাপলিনের সামাজিক সমালোচনাকে, আবার কখনও দোন কিহোতের অসম্ভব যাত্রাকে, যেখানে উইন্ডমিলই প্রধান শক্র।

untitled-ink-on-papers-200.jpg…….
শিরোনামহীন, কাগজে কালি, ২০০৮
……..
শিশিরের ছবিতে অ্যাবসার্ড লজিক আছে তবে আবহ নেই। শিশিরের আবহ রিয়ালিস্টিক। শেষ পর্যন্ত তিনি সামাজিক রিয়ালিজম তৈরি করেন। তবে এবারের প্রদর্শনীতে তাঁর কাজে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনে দেখা যায় একটি সিরিজ যেখানে তিনি প্রকৃতি নির্ভর কাব্যিক দৃশ্যপট রচনা করেছেন। সেগুলোতেও যে তার স্বভাবসুলভ ব্যাঙ্গাত্মক পরিস্থিতিগুলো নেই তা নয়। তবে পরাচিন্তার ব্যাপক প্রভাব এই সাদা ও কালোতে করা ড্রয়িংগুলোতে লক্ষ্য করা যায়। কাব্যচিন্তা ও পরাচিন্তার মিলনে তৈরি করা ছবিগুলো কিছুটা স্বপ্ননির্ভর এবং প্রতিবাদী সমালোচনা থেকে দূরের। এটা শিল্পী শিশিরের আরেক মনন ও প্রতিভার পরিচয়। সেখানে দেখা যায় প্রায়শঃ একটি উপাদান আরেকটি উপাদানের বিষয়বস্তু নিয়ে উপস্থিত। বৃক্ষ, ফল এসবের টেকশ্চারের আদান-প্রদান তাঁর ছবিতে নিয়তই দেখা যায়। যেমন মানুষের ফিগারে কুমরা বা শশার টেক্শ্চার বা গাত্রাবরণ। মানুষের হাতে কাঁঠালচাপা গাছের টেকশ্চার। তেমনই মুখোশের বেলাও প্রযোজ্য, যে এক প্রাণীর মুখোশ অন্য প্রাণী লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় বা চরিত্র লুকায়। চরিত্রে ছদ্মাবরণ তৈরির কৌশল হিসাবে তিনি মুখোস ও প্রাণীজগতের শংকরায়ণকে কাজে লাগিয়েছেন। যেখানে দেখা যায় মাছ ও পাখির মিশ্রণ, বিড়াল ও মানুষের মিশ্রণ — এই ধরনের নানা সংযুক্তিকরণ তার ছবির যত্রতত্র। untitled-3-2008.jpg
শিরোনামহীন, কাগজে কালি, ৬৫ x ৪৪ সেমি, ২০০৮

প্রাণীগুলোও মূলতঃ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে সেখানে এবং এক অর্থে সেগুলো মানুষেরই ক্যারিকেচার। এসব সাদা কালো ড্রয়িং-এ অরিয়েন্টাল ড্রয়িং-এর রেখা ও রিদম ব্যবহার করা হয়েছে।

শিল্পী শিশির অতি ধৈর্য্যরে সঙ্গে তাঁর জগৎ নির্মাণ করেন। অনেকটা সাধনার মত করে তাঁর ক্রাফটসম্যানশিপ চিত্রপটে উঠে আসে। ক্রাফটসম্যানশিপের খেলা তাঁর ছবির আরেক ভাষ্য। কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে তিনি অনিয়মতান্ত্রিক এক প্রকার ভারসাম্যহীনতাকে প্রাধান্য দেন। তবে পূর্বের তুলনায় সেটা এখন ভারসাম্যের দিকে যাচ্ছে এবং চিত্রভাষায় তাঁর পূর্বের ছবিতে যে নিষ্ঠুরতা এবং ক্রোধ লক্ষ্য করা যেত সেটা অনেকটা প্রশমিত। তবে রঙ-এর ক্ষেত্রে নানা প্রকার পরীক্ষা-নীরিক্ষা লক্ষণীয়। রুপালি, হাওয়াই মিঠাই, বেগুনি, কটকটে হলুদ বা লাল ব্যবহার করে তিনি এক প্রকার ‘পপিস’ (pop art) আবহ তৈরি করেন যা বেশ মিউজিক্যাল এবং ব্যাঙ্গাত্মক। যেন পুরো সমাজটাই কয়েকটা রঙ্গিন বাব্ল, অথবা জ্বরের ঘোরে দেখা বিরক্তিকর কোনো চলচ্চিত্র যে চলচ্চিত্র ব্যক্তিমানুষকে বাস্তবতার কামড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

untitled-2-2008.jpg
শিরোনামহীন, কাগজে কালি, ৬৫ x ৪৪ সেমি, ২০০৮

শিল্পী শিশিরের নন্দনতত্ত্ব বেশ লালিত্যময় যদিও তাঁর বিষয়বস্তু প্রায়শই যথেষ্ট কর্কশ ও রুচিশীল মননে পীড়াদায়ক বলে মনে হতে পারে, যা কিনা মধ্যবিত্ত মননের জন্য বা ভদ্রলোকি কালচারের জন্য হুমকি হতে পারে। কিন্তু ছবি তৈরি করার যত্ন ও একগ্রতা রুচিশীল মননের পক্ষের। তবে সেটাও কখনো সমালোচনার আঙ্গিকে উঠে আসে। যেমন নারীদের পণ্য করে তোলা বা বিউটিফাইড অবজেক্ট করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি যে ভাবে নারীচরিত্রগুলোর অভিব্যক্তি ও দেহভঙ্গিমা রচনা করেন তাতে করে ক্রাফট্সম্যানশিপের ক্ষমতায় পণ্যের বিরুদ্ধেই একটা সমালোচনা চলে আসে। শিশুদের খেলনা, পুতুল, এই সব খেলনা সামগ্রীর রঙ ও ফর্ম তাঁর ছবির ফ্যান্টাসি নির্মাণে সহায়ক। এই ফ্যান্টাসি কনজিউমারিজম, স্ট্যাবলিশমেন্ট, পাওয়ার এসবের সমালোচনার সঙ্গে শিল্পীর নিজের বা আত্মসমালোচনাও করে থাকে। কারণ তিনি নিজেও এই সবের ভোক্তা ও অংশগ্রহণকারী। যে কারণে তার নিজস্ব প্রতিকৃতি একটা খেলনা কাঠের পুতুলের আঙ্গিক নিয়ে নিজেকে জানান দিচ্ছে। যেন এই যজ্ঞের একজন নিরুপায় মধ্যবিত্ত শিকার তিনি নিজেও। আশির দশকের সমাজ বাস্তবতার আঙ্গিকে সময় শিল্পী গোষ্ঠিরই একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য। shishi-protrat.jpg
শিশির ভট্টাচার্য্য

সময় গোষ্ঠির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কমিটমেন্ট তাঁর ছবিতে চিন্তার যোগান দেয়। বামবাদী চিন্তার ও নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার অভীপ্সা নিয়ে যে সময় গোষ্ঠি রচিত হয়েছিল তারা অনেক পূর্বেই আলাদা হয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন। শিল্পী শিশির প্রতিভাবলে চিত্রকলা ও রাজনৈতিক কার্টুনে নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন প্রবলভাবে, যার ফলে সমাজের ভেঙে যাওয়া আয়নার প্রতিচ্ছবি তাঁর বেদনার্ত ক্যানভাসের আয়নায় প্রতিফলিত হয়, বব ডিলানের একটা গানের কলি আমরা যেন শুনতে পাই: We live in a political world/Where love don’t have any place/We’re living in times where men commit crimes/And crime don’t have a face…।

ঢাকা, ১৫ জুন ২০০৮

ronni_ahmed@yahoo.com

————————————————-

প্রদর্শনীর ছবি (মোট ২৩টি)
ছবি বড় সাইজে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন।


4 Responses

  1. Mizan Mallik says:

    ভালো লেগেছে। বাংলাদেশ চলে লজিকে নয় ম্যাজিকে! রনি আহম্মেদের লেখাও একটা ম্যাজিকের মতো লাগলো। এক নিঃশ্বাসে পড়া গেল। জটিল সব কথা সহজ ভাষায় বলেছেন তিনি। শিশির ভট্টাচার্য্যের কার্টুন এমনিতেই আমার বিশেষ পছন্দ। কবিতার মতো লাগে।

    মিজান মল্লিক

  2. Arafat says:

    লেখা ভালো লেগেছে। পজেটিভ সাইড থেকে লেখা। ছবিগুলো একদম অন্য স্বাদের। আকর্ষণীয় হলেও অনুভবের ভিন্ন ব্যাকরণ এখানে আরোপ করা হয়েছে। শিল্পীর ভাব-এ অনেকেই নাও পৌঁছাতে পারে।

    Arafat

  3. Farouk Iqbal says:

    শিশির সমাজ সচেতন মানবতাবাদী শিল্পী। সমাজের বিভিন্ন ঘটনা, স্থানকালপাত্রাতীত ভাবে দেখার দৃষ্টিসম্পন্ন একজন শিল্পী আমাদের সমাজে যুগ-যুগান্তর নক্ষত্রের মত বেঁচে থাকুক।

    Farouk Iqbal

  4. মানস চৌধুরী says:

    রনি আহম্মেদকে ধন্যবাদ জানাই এরকম একটা পঠনের জন্য। সকলের প্রতি ক্যাটেগরিক্যাল শ্রদ্ধা রেখেই বলা সম্ভব বাংলাদেশে ছবির পঠন ক্লিষ্ট একটা চর্চাই থেকে গেছে। এর মধ্যে প্রগাঢ়ভাবে ঢুকবার চেষ্টা জরুরি। রনি নিজে ছবির মানুষ, এই তৎপরতার তাগিদ নিশ্চিতভাবেই জানেন।

    আমি ছবি বুঝবার ক্ষেত্রে চেষ্টা করেও নাদান পর্যায়েরই থেকে গেছি। তবে সঙ্গত কারণেই শিশিরের ছবি নিয়ে আলাদা করে আগ্রহী হয়ে থেকেছি। সেটা তিনি বাংলাদেশের কার্টুনকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বলে নয়, কিংবা প্রথম আলোতে প্রকাশিত হতে হতে তিনি একজন সেলিব্রিটি বলেও নয়। বরং দু’দশক আগে বাংলাদেশের শ্রেণীবাস্তবতার ঘোরতর রঙ্গসিরিজ ‘খেলা দেখে যান বাবু’ আমার অপ্রশিক্ষিত চোখে পড়ে গেছিল বলে।

    এটা বলা জরুরি, শিশির সেই সময়কার রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকে সরেছেন। এমনকি বৈশ্বিক সামরিকতন্ত্র নিয়ে তাঁর উপলব্ধির ছাপ সত্ত্বেও ‘খেলোয়াড়’ (মানে কারক, মানে অ্যাক্টর)-দের পঠন ও তদন্ত করতে বর্তমান সিরিজের তাকে অনীহ মনে হয়। এই মনে হওয়াটা আরও প্রগাঢ় হয় ঢাকাই চলচ্চিত্রকে তাঁর বিষয়বস্তু বানানোর মধ্য দিয়ে। আমি ভাবার চেষ্টা করেছি ঢাকাই চলচ্চিত্র কিংবা এর লক্ষণাগুলো শিশিরের উদ্দিষ্ট নাকি উছিলা। আমি বোধহয় মনে মনে ভাবতে চাইছিলাম যে শিশির সেগুলো উছিলা হিসেবে নিয়েছেন। তাঁর উদ্দিষ্ট সমাজের কারকগণ/ক্যারেক্টারগণ। কিন্তু রংসমেত যেখানে কাজ করেছেন সেখানে মান্না বা পূর্ণিমারাই আছেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভক্ত হওয়া নিশ্চয়ই কঠিন, আরও বেশি হয়তো নিষ্প্রয়োজনীয়। কিন্তু ঢাকাই চলচ্চিত্রকে পেটাই করাই বা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কী অবস্থান ব্যক্ত করে। অভিব্যক্তি তো সততই শর্তসাপেক্ষিক। এগুলো দেখতে গিয়ে কি আমাদের মনে পড়ে না যে টেলিভিশন-পরিবেশন শিশির ‘উদ্দিষ্ট’ করেন নি?

    বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় কী প্রসঙ্গে যেন বলেছিলেন মৃত সর্পের উপর আরো দু’ঘা লাগালে কর্তব্যপালন হয় বটে; কিন্তু সর্পের মৃত্যুতে বিশেষ কাজে লাগে না। বা এইরকম কিছু একটা। স্বাধীনতার চার দশকের মধ্যে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতার একটা সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রি গভীরভাবে দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে — এই বাস্তবতা ‘রুচি’র সংকটের থেকে ঢের গুরুত্বপূর্ণ। শিশির সেই এজেন্ডাটা নিলেন না। নিলেন চলচ্চিত্র নিয়ে ভাসা-ভাসা মধ্যবিত্তীয় অস্বস্তিটাকে।

    তার কাব্যলালিত্যময় অন্য ছবিগুলোও এই প্রশ্নটাকে বুদ্বুদ আকারে আমার পেটে দানা বাঁধতে দিয়েছে। শিশির কি সামাজিক-রাষ্ট্রিক কারকদের কম দেখতে পান এখন? কিন্তু খেলা তো ভালই দেখা যাচ্ছিল!

    মানস চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.