জার্নাল

ভাষা, অর্থ এবং অনুভবশক্তি

hasnat_a_hye | 15 Jun , 2008  

আমরা সাধারণতঃ মনে করে থাকি যে প্রতিটি ভাষার অন্তর্গত শব্দ এবং বাক্যের নির্দিষ্ট অর্থ আছে যা তার ব্যবহারকারীরা জানে এবং সেই ধারণার ভিত্তিতে ব্যবহার করে থাকে। এটা সত্য কেবল ভাষার সেই ব্যবহারকারীদের hasnat-a-h2.jpg…….
হাসনাত আবদুল হাই (জন্ম. ১৯৩৯)
……
ক্ষেত্রে যাদের মাতৃভাষা আর লিখিত বা মুখের ব্যবহৃত ভাষা এক। তাদের কাছে একটি শব্দের কেবল নির্দিষ্ট অর্থই থাকে, অন্য কিছু নয়। কিন্তু সেই ভাষার ব্যবহারকারীর মাতৃভাষা যদি হয় অন্য ভাষা তাহলে একই শব্দ তার কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে, অন্ততঃ কিছু ক্ষেত্রে। এমন হতে পারে যে একটি শব্দ বাক্য গঠনে ব্যবহৃত হয়ে এই ব্যবহারকারীর কাছে ভিন্ন অর্থের প্রতিনিধিত্ব করে। মাতৃভাষা আর ব্যবহৃত ভাষা এক না হলে এমন দ্ব্যর্থবোধকতা এসে যেতে পারে, সব শব্দের ক্ষেত্রে না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে বিদেশী ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে অর্থের অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা এসে যেতে পারে তার একটা নির্দেশিকা হতে পারে অনুভবের শক্তি ও তার ব্যবহারে পরম্পরা। প্রত্যেক ব্যক্তি বা ভাষা-ভিত্তিক গোষ্ঠী অনুভব প্রকাশের ক্ষেত্রে তার/তাদের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এবং দৈনন্দিন জীবনে ভাবের আদান-প্রদানের পদ্ধতি ও উপকরণের উপর নির্ভরশীল। কোন ভাষা-ভিত্তিক গোষ্ঠীর অনুভব করার ক্ষমতা (সেনসিবিলিটি) তার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের (বৃহৎ অর্থে) পটভূমি নিরপেক্ষ নয়। তার সংস্কৃতিই বলে দিচ্ছে প্রতিটি শব্দের অর্থ কী হতে পারে এবং সেই ভাষাভাষি ব্যক্তি যখন শব্দগুলি ব্যবহার করে তাদের কাছে সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট এই অর্থই প্রধান এবং কার্যকর হয়। এতে কোনো সমস্যা হয় না, কেননা ব্যবহারের পরম্পরায় একটি ভাষা-ভিত্তিক গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রতিটি শব্দের অর্থ সম্বন্ধে নিশ্চিত থাকে যেহেতু তার সঙ্গে তাদের অনুভবের/উপলব্ধির প্রক্রিয়া জড়িত। সমস্যা দেখা দেয় যখন মাতৃভাষা ছেড়ে ভিন্ন ভাষায় কেউ কথা বলতে বা লিখতে যায়। সেখানে শব্দ চয়নে মাঝে মাঝে ইতস্ততঃ ভাব এসে যায় যখন বিদেশী কোনো শব্দের অনুবাদে যে অর্থ মাতৃভাষায় তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। অর্থাৎ অনুভব/উপলব্ধির অভ্যাসের ভিত্তিতে মাতৃভাষায় যে শব্দ ব্যবহার অনুপযোগী মনে হয় সেই বিদেশী শব্দ বিদেশী ভাষাতে লিখতে গিয়েও ইতস্ততঃ করতে হয় অথবা তা প্রত্যাখ্যানই করতে হয়। এর কারণ অনুভব/উপলব্ধি, যা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে লালিত ও নির্ধারিত, তার সঙ্গে বিদেশী শব্দের অনুদিত অর্থটি সঠিক ধারণা বহন করে না। এখানে অনুভব বা উপলব্ধির শক্তিই প্রাধান্য পায় আর এর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে একটি জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির। একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পটভূমিতে অবস্থানরত (বসবাসকারী) কারো পক্ষে বিদেশী ভাষা হুবহু ব্যবহার করা সম্ভব হয় না যদি না সেই কথোপকথন বা লেখার উদ্দীষ্ট শ্রোতা বা পাঠক বিদেশী ভাষা-ভাষী হয়।

ওপরের সমস্যাটা মনে এলো ছোট দু’টো ঘটনা থেকে; ঘটনা না বলে অভিজ্ঞতা বলাই ভালো। আমার আত্ম-জীবনী এইড মেমোয়ারের ভূমিকা লেখার জন্য রবীন্দ্র-গবেষক উইলিয়াম রাদিচিকে অনুরোধ জানানোর পর তিনি লন্ডন থেকে ই-মেইলে ছোট একটা ভূমিকা লিখে পাঠান। লেখার এক অংশে ছিল “I suspect when the writer completes his other two volumes we will say ….” আমি তাঁকে suspect শব্দটির পরিবর্তে can well imagine কথাটি ব্যবহার করতে বলি। কারণ হিসেবে জানাই যে ইংরেজ ভাষা-ভাষীরা যে অর্থে ও প্রেক্ষিতে suspect কথাটি ব্যবহার করে বাংলা ভাষা-ভাষী ইংরেজী লেখক-পাঠক হয়তো সেই অর্থে নেবে না। তারা ইংরেজী এই শব্দটির ব্যবহার প্রণালী (ইউসেজ) মনে না রেখে এর আক্ষরিক অনুবাদ করে suspect এর অর্থ বার করবেন ‘সন্দেহ করা’, যার ফলে রাদিচি যা বলতে চেয়েছেন তার শুধু ভাষান্তর নয়, ভাবান্তরও হয়ে যেতে পারে। বাংলা ভাষাভাষী suspect কথাটির বঙ্গানুবাদ করে ‘সন্দেহ করি’ ব্যবহার করবেন এবং ভাববেন রাদিচি মন্দ অর্থেই ‘সন্দেহ’ করছেন যে আমি আরো দু’টি ভল্যুম লেখার পর পাঠকরা একটি উপসংহারে আসবেন। অর্থাৎ রাদিচি শুধু সাহিত্যিক ভাষায় ভাল অর্থে (মুখের ভাষাতেও হতে পারে) suspect শব্দটি ব্যবহার করলেও বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে সেটি মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে যাবার সম্ভাবনা। অবশ্য যারা শুদ্ধ ইংরেজীতে শব্দটির ব্যবহার-প্রথা (ইউসেজ) জানেন তারা হয়তো এই ভুলটি করবেন না। রাদিচি সমস্যাটি বুঝে ভূমিকায় I suspect না বলে I can imagine কথাটি ব্যবহার করেন। এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে কিছু চিন্তা করেছেন কিনা জানি না কিন্তু একজন অনুবাদক হিসাবে শব্দের এই সব সূক্ষ্ম ম্যারপ্যাচ (নুয়ান্স?) সম্বন্ধে তার অবহিত হওয়ার কথা।

রাদিচির সঙ্গেই ঢাকায় কিছুদিন পর ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রধানের বাসায় এক নৈশভোজে মিলিত হই এবং যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করি যে তিনি গ্রীষ্মে লন্ডনে থাকবেন কিনা তখন তিনি এই বলে উত্তর দেন, I cannot promise. কথাটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে রূঢ় মনে হয় এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাকে সহাস্যে বলি, you don’t have to promise. আমার মাতৃভাষা ইংরেজী হলে আমি কখনই I cannot promise কথাটিকে রূঢ় বা অসৌজন্যমূলক মনে করতাম না। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমার যে অমন মনে হয়েছিল তার কারণ বাংলাভাষায় ‘আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না’ এই কথাটি বেশ লৌকিক এবং দায়বদ্ধতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ইংরেজী মাতৃভাষা-ভাষীদের কাছে I cannot promise এর অর্থ I am not sure জাতীয় বক্তব্য যার নেতিবাচক বা প্রভাবশালী কিছু অর্থ নেই। এটি বেশ নিরপেক্ষ।

দু’টি সংক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতা আমাকে ভাবিত করে এবং আমি এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করি। কারণটা এত সোজা যে এর জন্য গবেষণা তো নয়ই, বিশেষ ভাবনারও প্রয়োজন পড়ে না। রাদিচি ইংরেজ ভাষাভাষী হয়ে কোনো ইংরেজী শব্দ বা শব্দবন্ধের যে অর্থ করেন বা ধরে নেন তার সঙ্গে তাঁর অনুভব বা উপলব্ধির প্রক্রিয়া জডিত। আর এই উপলব্ধি বা অনুভবের উৎস রয়েছে যে সংস্কৃতিতে তিনি মানুষ হয়েছেন, সেখানে। আমি ইংরেজী যতই পড়ি বা লিখি না কেন বাংলা আমার মাতৃভাষা হওয়ায় এবং এই ভাষাতেই দৈনন্দিনের যোগাযোগ সম্পন্ন হওয়ার কারণে আমার অনুভব শক্তি বাংলাভাষার ব্যবহার এবং বাঙালীর সংস্কৃতি অর্থাৎ জীবন-যাপনের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। আমি ইংরেজী অথবা কোনো বিদেশী শব্দের অনুদিত বাংলা অর্থকে বাঙালী হিসেবে আমার অনুভবের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে প্রচলিত ইংরেজীর তুলনায় ভিন্ন অর্থ এনে দাঁড় করাই।

বিদেশী (ইংরেজী) ভাষা ব্যবহারে এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে আমরা কেমনভাবে বিদেশী ভাষা ব্যবহার করবো এই প্রশ্ন এসে যায়। ইংরেজী এখানে দৃষ্টান্ত মাত্র, একই সমস্যা অন্য ভাষার ক্ষেত্রেও দেখা দেবে। প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমরা যখন ইংরেজী ভাষাভাষীর জন্য ইংরেজী লিখবো তখন তার মত করেই লিখতে পারি। অর্থাৎ তিনি শব্দের যে অর্থ করেন সেটা না পরিবর্তন করে হুবহু ব্যবহার করলে অসুবিধা হবে না, বরং সুবিধাই বেশি। কিন্তু যখন দেশী পাঠকদের জন্য লিখবো তখন মনে রাখতে হবে যে কোনো ইংরেজী শব্দের বঙ্গানুবাদ ভিন্ন অর্থের দ্যোতক হতে পারে কেননা বাংলা ভাষাভাষী লেখকের বা (কথকের) অনুভব শক্তি ভিন্ন, কারণ তিনি ইংরেজী যার মাতৃভাষা তার মত একই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠেননি।

অনেকেই কিন্তু এখন ইংরেজী লিখতে গিয়ে নিজেদের ভাষা, তার অর্থ এবং অনুভবশক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ইংরেজী লিখছেন। সালমান রুশদি এদের পুরোধা। তিনি ভারতীয় ভাষার সংমিশ্রণে এক নতুন ইংরেজী ভাষার সৃষ্টি করেছেন যা শুধু ভারতীয় পাঠক নয়, ইংরেজ ভাষাভাষী পাঠকদের জন্যও লেখা। একে কেউ উত্তর-ঔপনিবেশিক জনপদের মানুষের (শেক্সপিয়ারের চরিত্র ক্যালিবানের দৃষ্টান্ত দিতে দিতে এরা ক্লান্ত!) প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। এই সঙ্কর ভাষার উৎস রুশদীর মত লেখকদের অনুভব শক্তির ভিন্নতায়। ভারতে জন্ম না নিয়ে বিদেশে জন্মগ্রহণ করে লিখতে শুরু করলে সালমান রুশদি অবশ্যই ইংরেজ লেখকদের মত লিখতেন, তাকে শব্দের অর্থ নিয়ে অথবা তার যথার্থতা বা উপযোগিতা নিয়ে ভাবতে হতো না যেমন হয়েছে ভি এস নইপলের ক্ষেত্রে। রুশদী কিংবা অরুন্ধতী রায় যে ভারতীয়করণের মাধ্যমে ইংরেজী লেখেন তার কারণ তাদের অনুভবশক্তি (সেনসিবিলিটি) ইংরেজী যাদের মাতৃভাষা তাদের চেয়ে ভিন্ন, কেননা এই অনুভবশক্তির সঙ্গে তাদের দেশের ইতিহাস, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সম্পর্ক রয়েছে।

ভারতের মত বাংলাদেশেও এক সময়ে ইংরেজী গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী লেখা বিস্তৃত হবে। সেই সব লেখকের আদর্শ দৃষ্টান্ত হতে পারে রুশদী যার বিপরীতে রয়েছেন ভি এস নইপল। এর সঙ্গে উত্তর-ঔপনিবেশিকতার তেমন সম্পর্ক নেই এবং ক্যালিবান বেচারাকে নিয়েও টানা হেচড়া করতে হবে না। রুশদী যদি পরাধীন ভারতেও লেখা শুরু করতেন তাহলেও তার পক্ষে নিজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা অনুভব শক্তির ভিত্তিতে মিশ্র ইংরেজী লেখা স্বাভাবিক হতো। অবশ্য তখন প্রকাশকরা বা পাঠকরা এখন যেমন বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বজনীন মানসিকতা সম্পন্ন তেমন না থাকার কারণে সে ধরনের লেখা সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করতেন না। ঔপনিবেশিক ভারতে কিংস্ ইংলিশই প্রমিত ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হত প্রচলিত অভ্যাস এবং একাডেমিক নিয়ম কানুনের কারণে। ক্যালিবান প্রভুর ভাষা দিয়েই প্রভুকে সমালোচনা করতে পারতো সেই ভাষাকে আত্তীকরণ করার প্রয়োজন হতো না।

জুন ২০০৮

hasnatah@bdcom.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:


4 Responses

  1. Anwar Shahadat says:

    হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখাটি খুব জরুরী, বাংলার অনুবাদ সাহিত্যের জন্য। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। যেখানে উদাহরন সংশ্লিষ্ট ইংরেজী ভাষী লেখক ও তার কাজ পাঠকের জানা। এবং লেখক মি. হাই সারা জীবনই ‘হাই প্রোফাইল’ এবং ইংরেজী ভাষা ও ভাষী লোক সম্পর্কে জানতেন (শিক্ষাগত দক্ষতা তো থাকছেই) বা তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করেছেন, তারপরও রাদিচির ভাব প্রকাশের একটি জায়গায় (আই ক্যান্ট প্রমিস ইউ —) তিনি দ্বিধায় পড়েছেন। উদাহরণ দুটো এত মজা লেগেছে কারণ এর মর্ম অনুভব আমার পক্ষে সম্ভব।

    অনুবাদকদের এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তার প্রধান কারণ হাই যা বলেছেন সেটি। তিনি ভাষার ইডিয়ম সম্পর্কিত যা বলেছেন তার সঙ্গে চর্চা ও তথ্য বিশ্লেষণের বিষয় যুক্ত। ভাষান্তরের ক্ষেত্রে বিষয়ের সংস্কৃতির সঙ্গে যদি অনুবাদকের পরিচয় না থাকে তবে তা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ধরা যাক বাবা মেয়ের জন্মদিনে ওয়াইন গিফট করেছে ও মেয়ের সঙ্গে নেচেছে বা মেয়ে সেই ঘটনা তার বন্ধুকে বলছে যে বাবা আমার ডেট। বাঙালী অনুবাদকের জন্য এটা অনুবাদ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

    দেখে ভাল লাগলো, লেখক লিখতে দ্বিধা করেননি যে তিনি রাদিচিকে বলেছেন, ‘ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু প্রমিস’! ধন্যবাদ, অভিনন্দন।

    আনোয়ার শাহাদাত

  2. Afifa Anwar Khanam says:

    হাসনাত আবদুল হাই যা বলতে চাইছেন তার সারাংশ করলে দাঁড়ায় পৃথিবীর যেকোনো ভাষার প্রায় প্রতিটি শব্দের একটির বেশি অর্থ রয়েছে যাকে ইংরেজিতে synonym বলা হয় এবং শুধুমাত্র নেটিভ স্পিকার বা ঐ ভাষাভাষীরাই তা সঠিক ব্যবহার করতে পারেন। আমি তার কথাকে এক্সটেন্ড করে বলছি যে একটি শব্দ একটি অর্থই প্রকাশ করে না মূলত সেই শব্দটি তার ব্যবহারকারীর ভাব প্রকাশ করে। একজন স্পিকার যখন একটি বাক্যে বিভিন্ন ভাবে শব্দ প্রয়োগ করে অথবা উচ্চারণের সময় ধ্বনিতে স্ট্রেচের উপরেও ভিত্তি করে ঐ নির্দিষ্ট বাক্যের অর্থের পরিবর্তন হয়।

    সাধারণত একজন সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ স্পিকার বেশি অসুবিধায় পরে idiom নিয়ে। কারণ idiom-এর ক্ষেত্রে ভাষার যে স্ট্যন্ডার্ডা রুল আছে তা খাটে না। যেমন ইংরেজিতে bite your tongue বলতে বোঝায় মনের ভাব প্রকাশ না করে চুপ থাকো…কিংবা cut it out বলতে বোঝায় বাদ দাও। idiom হচ্ছে কয়েকটি নির্দিষ্ট শব্দের সমন্বয় যা একসঙ্গে মিলে একটি ভাবের প্রকাশ করে, কিন্তু আলাদাভাবে ওই শব্দগুলোর যে প্রচলিত অর্থ আছে তা প্রকাশ করে না। তাছাড়া যেকোনো ভাষার ক্ষেত্রে সেই ভাষীদের প্রাত্যহিক জীবনাচার বা কালচারাল অ্যাসপেক্টও একটা বিরাট ফ্যাক্টর। শেষে বলতে চাই হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখাটি এনলাইটিনিং।

    আফিফা আনোয়ার খানাম

  3. গীতা দাস says:

    হাসনাত আবদুল হাই-এর লেখা ‘ভাষা, অর্থ এবং অনুভবশক্তি’ পড়ে মনে হয়েছে একেই বলে ‘এক দেশের গালি আর আরেক দেশের বুলি’। একটু সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে শুধু ভিন্ন ভাষায় নয়, একই ভাষায় গ্রাম এবং শহরের মধ্যেও কিছু কিছু শব্দের অর্থের ভিন্নতা রয়েছে। শব্দের বা বাক্যের তাৎপর্যগত পার্থক্য রয়েছে পরিবার থেকে পরিবারে। আমার পরিবারে যে বাক্যটি স্বাভাবিকভআবে ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়, অন্য পরিবারে তা নেয়া হয় না। তবে এ নিয়ে শ্রদ্ধেয় হাসনাত আবদুল হাই যে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন তা ধরে কয়েকজন উদাহরণসহ লিখলে একটি গবেষণা হয়ে যাবে। ধন্যবাদ হাসনাত আবদুল হাইকে বরাবরের মত আরেকটি চমৎকার লেখা উপহার দেয়ার জন্য।

    গীতা দাস

  4. আদনান সৈয়দ says:

    গত বছর বাংলাদেশের এক নাম করা লেখক(নাম টা বলছি না) নিউইয়র্কে এলেন। সাধারণত যা হয় তাঁকে নিয়ে তাঁর পাঠক ভক্তদের টানা-হ্যাচরা শুরু হয়ে যায়। সপ্তাহান্তের কোনো এক শনিবার জ্যাকসন হাইটস-এর এক রেস্তোরাঁয় লেখক মহাশয় প্রচুর ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বলতে শুরু করলেন এই ভাবে, “আমেরিকার অমুক লেখক-এর সাথে আমার বেশ ইন্টিমেসি (intimacy) আছে এবং এখনো উনি আমার একজন বোসম ফ্রেন্ড (bosom friend)। প্রশ্ন হল, এই লেখক তাঁর বক্তব্যে ইংরেজি শব্দ চয়নে ভুল-ভাল কিছু বলেছিলেন? উত্তর হল, না। কিন্তু কথা হল আমেরিকানরা এই বাংলার এই অন্তরঙ্গতা শব্দটিকে প্রকাশ করতে যেয়ে ইন্টিমেসি বা বোসম ফ্রেন্ড শব্দ ব্যবহার করবেন কি? তার উত্তর কিন্তু সেই না-ই। তাহলে যে কথাটা বলা প্রয়োজন তা হল ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার নিজস্ব যে একটা চলমান শক্তি আছে যা বিদেশি ভাষা আথৎ অনূদিত ভাষাতে নেই সম্ভবতঃ সে কারণেই অনূদিত সাহিত্যের মান নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলে থাকেন। ধরা যাক লোরকার কবিতা ইংরেজিতে যখন অনুবাদ হয় তখন সন্দেহ নেই এর মূল সুর থেকে অনুদিত অংশটি সামান্য হলেও বিচ্যূত হয়ে যায়। এবার ভাবুন ইংরেজি থেকে যখন সেই বিচ্যুত কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ হয় তখন কবিতাটির আসল চেহারার অনেকটুকুই পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ চাল বার বার ধুলে এর ভিটামিন নষ্ট হতে বাধ্য। সে কারণেই বলছিলাম যে ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে মূল ভাষার আধিপত্য সবসময়ই থাকতে বাধ্য।

    আমাদের যাদের মাতৃভাষা বাংলা আমরা যখন ইংরেজিতে কথা বলি তখন মনে মনে বাংলায় শব্দটা গুছিয়ে নেই তারপর সেই শব্দগুলো ইংরেজি কলের ভেতর ঢুকিয়ে ইংরেজিতে প্রকাশ করি। তাতে যা হয় ইংরেজিটা আমাদের সেই বাংলার মতই হয়ে যায়। ভাষার কাজটা কী? ভাষার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল যোগাযোগ রক্ষা করা। কিন্তু মাতৃভাষার পাশাপাশি সেই আশ্রিত ভীন দেশি ভাষাটি কতটুকু মসৃন, কোমল তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর মাতৃভাষা উর্দু। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পড়তে যেয়ে শিখে ফেলেন বাংলা। শুধু বাংলা শেখা কেন তিনি বাংলা ভাষার আন্যতম পণ্ডিত হয়ে ওঠেন। অবাক হই যখন দেখি এই উর্দুভাষী ইংরেজি থেকে বাংলায় প্রচুর প্রতিশব্দ তৈরি করেন। কিন্তু প্রথম দিকে বাংলা না জানার জন্য বন্ধুদের সাথে সঠিকভাবে যোগাযোগ করেতে পারতেন না তিনি। তাঁর নিজের জবানে এই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন এইভাবে, “লক্ষ করলাম যে নতুন সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে আমার কথাবার্তা সহজ মসৃণ গতিতে এগোচ্ছে না, চলছে এবড়ো-খেবড়ো পথ দিয়ে, বার বার বিঘ্নিত হচ্ছে। কলেজের ছেলেরা যতোখানি ইংরেজি মেশায় তার চেয়ে একটু বেশি পরিমাণে — আমার কাছে তাদের বক্তব্যটি বোধগম্য করবার জন্য। এই আস্বাভাবিক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে আমি স্থির করলাম যে আমাকে কথোপকথনের উপযুক্ত বাঙলা শিখতে হবে।:” (পথের শেষ কোথায়)

    এবার বোঝেন বাংলা ভাষার পণ্ডিত আবু সয়ীদ আইয়ুবকে বাংলা শিখতে হয়েছিল শুধুমাত্র ভালো যোগাযোগ রক্ষা করার জন্যই।

    হাসনাত আবদুল হাই নাইপল, রুশদী সহ অনেক ভারতীয় ইংরেজ লেখকদের কথা বললেন। মানলাম তাঁর কথা। কিন্তু লক্ষ করবেন যে পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির ইংরেজী প্রচলিত আছে। আমেরিকান ইংরেজি, বৃটিশ ইংরেজি, ভারতীয় ইংরেজি, আফ্রিকার ইংরেজি ইত্যাদি ইত্যাদি। লক্ষ করলে দেখা যাবে সবকটা ইংরেজি শব্দ সেই দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাবগুলো নিজেদের ভেতর প্রচণ্ডভাবে ধারণ করে আছে। আর সে কারণেই হয়ত নীরদ সি চৌধুরী বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে “আমি একাধারে বাঙালি এবং ইংরেজ।”

    সব শেষে অবাক হব না যদি দেখি বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত কেউ আমেরিকায় এসে ঢেড়স দেখে লাফিয়ে উঠেন এই বলে যে, “Oh my God!! what a tender lady’s finger???”

    আদনান সৈয়দ
    নুইয়র্ক

Leave a Reply to Afifa Anwar Khanam Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.