স্মরণ

মিজান রহমান ও তাঁর কবিতা

সরকার মাসুদ | 22 Dec , 2017  

mizanঊনষাট বছর বয়সে কবি মিজান রহমান (১৭ ফের্রুয়ারি , ১৯৫৮) প্রয়াত হলেন গত ৩০ সেপ্টেম্বর। আশির প্রজন্মের প্রথম সারির কবি ছিলেন মিজান। ৪৪/৪৫ বছর পর্যন্ত তিনি শুধুই লিটল ম্যাগাজিনে লিখেছেন। তারপর নিজেকে বিস্তৃত করেন দৈনিকের সাহিত্যপাতা পর্যন্ত। তার অনেক কবিতাপ্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ, সমকাল এবং যায় যায় দিন- এর সাহিত্য সাময়িকীতে।
মিজান রহমান জীবনের শেষ ১৭/১৮ বছর কাটিয়েছেন ঢাকা জেলার দোহার থানাস্থ হাতুরপাড়া গ্রামে। ঠিক এ ধরনের পল্লীকেই কবি আবুবকর সিদ্দিক বলেছেন ‘কবিতাসর্বস্ব মফস্বল।’ তো এরকম নির্ভৃত গ্রামে বসে মিজান লিখে গেছেন ভাবমগ্ন, দর্শনদীপিত ছোট ছোট কবিতা। মিজান যখন ঢাকায় থাকতেন, ধানমন্ডি ১৫ নং- এর ভেতরে একটা টিনশেড ছিল তার বাসা, তখনো তার কবিতা আরও ছোট ছিল, ভাবসমৃদ্ধ ছিল। উত্তরকালে সেই তন্ময়তা এবং ভাবাতুরতা একটা বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ-বলয় তৈরি করতে পেরেছিল, আমার এমনই ধারণা। কেননা, হাতুরপাড়ার পৈত্রিক ভিটেয় থিতু হওয়ার পর তিনি কবিতা নিয়ে ভাবার অবসর পেয়েছিলেন অনেক বেশি।
ব্যক্তি মিজানের মতো তারঁ কবিতাও অন্তর্মুখি। ব্যক্তির মনের একান্ত নিবিড় অনুভব ও গভীরাশ্রয়ী জীবনভাবনা তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মিজানের কবিতায় অন্ধকার, সূর্য, নক্ষত্র, ছায়াপথ, শিশির, সরিসৃপ প্রভৃতি শব্দের পৌনপুনিক ব্যবহার মনে করিয়ে দেয় জীবনানন্দ দাশের কথা। কিন্তু এইসব মিলে যে মুখোস তৈরি হয় তার পেছনেই আছে কবি মিজানের আসল মুখটি। প্রথমত, তিনি জীবনানন্দের মতো পয়ারের আশ্রয় নেননি। প্রথানুগ অন্য কোন ছন্দও ব্যবহার করেননি। দ্বিতীয়ত, ‘সূর্য মনি-কর্নিয়ার প্রতিবিম্ব হয়ে’ প্রখর রশ্মি ছড়াচ্ছে এমন কবিকল্পনা কিংবা ‘বিশালতা গ্রাস করে কুঁকড়ে যায় ঘাস’ এ জাতীয় কল্পছবি মিজানকে আলাদা করেছে জীবনানন্দ থেকে।

Mizan and Sarkerএই কবির লেখা অভিনিবেশ দাবি করে। মনোসংযোগ বিঘ্নিত হলে পাঠকের কাছে কবির মুখের চেয়ে মুখোস বেশি লক্ষযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যকার গূঢ় সম্পর্ক আভাসিত হয়েছে মিজানের কাব্যে, বার বার। এটা তার কবিতার এক উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু তার কবিতা নিসর্গপ্রধান নয়। প্রকৃতির ডিটেল তার কবিতায় অনুপস্থিত বলা চলে। নিসর্গ বরং প্রতীকে উন্নীত হয়েছে। আবার, দেখা যায়, একটি গোটা কবিতা অনন্য এক চিত্রকল্পের মর্যাদা পেয়েছে। এরকম হয়েছে অনেকবার। দৃষ্টান্ত হিসেবে পুরো একটি কবিতাই তুলে দিচ্ছি-‘ইতস্তত মেঘের ক্ষয়/সুদূরের দ্বীপ হয়ে ভেসে ওঠে চাঁদ/ত্রস্ত পাখির আর্তনাদে/ভেঙ্গে ছত্রখান ঘন অন্ধকার/সারা রাত জেগে থাকি/ আমি আর রাত।’ (আমি আর রাত)। মাঝে মাঝে ভিন্ন ধরনের বিষয়বস্তুকেও উপজীব্য করেছেন তিনি। ‘যেমন দিনলিপি কবিতায় দিন যাপনের একঘেয়েমি মূর্ত হয়ে উঠেছে এভাবে- দিন ক্ষয়/রাত ক্ষয়/স্বপ্ন ক্ষয়/ ডিপ ফ্রিজের মাংসখন্ড থেকে চুইয়ে/পড়া/রক্তবিন্দু আমাদের প্রাত্যহিকতা’।
প্রকৃতিলগ্ন হওয়ার ফলে মিজানের ব্যক্তি-অনুভব অনেক ক্ষেত্রেই নৈর্ব্যক্তিক স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে। তেমন একটি কবিতার নাম‘আমাকে ব্যথিত করে/শেষ ঔজ্জ্বল্যে জ্বলে ওঠে চাঁদ/ নিভু নিভু রাত/শূন্য ডালের একাকিত্ব, তার অস্থির ছায়াপাত।’
কবিতার ভাষা মূলত দুরকম। একটি স্বতঃস্ফূর্ত, অন্যটি অনুশীলনলব্ধ। স্বভাবকবিসুলভ ভাব এবং চিত্রকল্পপ্রেমী আধুনিক কবির মন এই দুয়ের সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায় মিজান রহমানের মধ্যে। তার কবিতা সমস্ত শক্তি ও দুর্বলতা নিয়েই স্বতঃস্ফূর্ত স্বাতন্ত্র্যের মানসম্মত উদাহরণ হয়ে থাকলো।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.