শিল্পী রফিকুন নবী: ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম

রাজু আলাউদ্দিন | ৩ আগস্ট ২০১৮ ১:২৭ অপরাহ্ন



কাগজ এবং ক্যানভাস–দুয়েই তার স্বাচ্ছন্দ্য । কাগজে তিনি আঁকেন তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে এমন এক ভাষায় যা চিত্রল গুণে ঋদ্ধ। অন্যদিকে ক্যানভাসে তিনি তুলে ধরেন রংয়ের সেই বর্ণময় সম্ভার যা কথার অমরাবতী হয়ে উঠেছে। বর্ণ ও বর্ণমালা অভিন্ন মর্যাদায় রফিকুননবীর কাছে উদ্ভাসিত, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে না গিয়ে শিল্পী রফিকুন নবীকে অনন্য করে তুলেছে। চিত্রশিল্পী, কার্টুনিষ্ট, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, শিল্পসমালোচ এবং চিত্রকলার শিক্ষক এখন পরিচয়ের ব্যাপ্তির কারণে কেবলই ‘রনবী’ নামে সুপরিচিত, যিনি অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছেন টোকাই নামক এক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখক-শিল্পীর জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়৷ পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় স্থায়ী হন তাঁরা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর৷ ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি৷ পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন৷ এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসানসহ দেশের খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন৷
পড়াশোনা শেষ করে রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম কাল পেঁচার ডায়েরীতে৷১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন৷ আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অন্যান্য শিল্পীদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ৷ পড়াশোনা করেছেন ছাপচিত্র বা প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর৷ ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন৷ শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস-এর ড্রইঙ ও পেইন্টিং বিভাগে প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ইন্সটিটিউটের পরিচালক। ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রথম নির্বাচিত ডিন হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
রফিকুন নবী পেয়েছেন একুশে পদক, চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক-কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার৷২০০৮ সালে তাঁর আঁকা খরা শীর্ষক ছবির জন্য ৮০টি দেশের ৩০০ জন চিত্রশিল্পীর মধ্যে ‘এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে মনোনীত হন।
লেখক-শিল্পী রনবীর দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল গত বছর তার বাসায়।
কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রনবী তার শিল্পী ও লেখক জীবনের নানাদিক তুলে ধরেন। অডিওতে ধারণকৃত এই সাক্ষাৎকারের লিখিত রূপটি তৈরি করেছেন গল্পকার সাব্বির জাদিদ। বি. স.


রাজু আলাউদ্দিন:
আপনি বলছিলেন, গ্রিসের বিখ্যাত মিউজিশিয়ান মিকিস থিওডোরাকিসের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল। সেটা কিভাবে হলো?
রফিকুন নবী: তখন তো গ্রিসে তুমুল আন্দোলন চলছে। সামরিক জান্তা পাপাদো পোলাস, তাকে সরানোর আন্দোলন চলছে। আর্মিকে সরাবার আন্দোলন চলছে। সেই সময়ে কমিউনিস্ট লিডারস এন্ড কমিউনিস্ট ফলোয়ারস, যারা দেশ থেকে পলাতক ছিল, নির্বাসিত ছিল, তারা সব ফিরে এল। মিকিস থিওডোরাকিস ছিলেন তাদেরই একজন। তিনি তখন এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ভীষণ সম্মান তার। ওই সময় একাডেমির সামনে মিছিল রেডি হচ্ছে, তখন আমার প্রফেসর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তার সাথে। হি ইজ ফ্রম বাংলাদেশ, নতুন দেশ বাংলাদেশ। তখন তার সাথে আলাপ হয়েছে। পাশে ম্যালিনা মারকারি ছিল। ম্যালিনা মারকারি তো পরে মিনিস্টার হলো। তার সাথে আলাপ হয়েছে। ইরিনা নামে এক অভিনেত্রী, তার সাথে আলাপ হয়নি, কিন্তু তিনি সেখানে ছিলেন। কিন্তু সবচাইতে বড় বিষয় ছিল ম্যাকারিওস, ম্যাকারিও পাপাস, সাইপ্রাসের ন্যাশনাল লিডার। উনি আমাদের চারুকলা ভিজিট করতে আসলেন। সবাই লাইন দিয়ে আমরা দাঁড়ালাম। তখন আমি একা বাংলাদেশি ছিলাম। এথেন্স বলি, গ্রিস বলি, অন্য কোনো বাংলাদেশি কেউ নাই। তো প্রফেসরদের পরেই বিদেশি আমরা দাঁড়িয়েছি। একজন একজন করে হ্যান্ডশেক করছেন। আমার কাছে যখন আসলেন, সঙ্গে আমাদের প্রফেসর ছিলেন, তিনি ছিলেন তখনকার ডিন, তিনি বললেন যে, ও বাংলাদেশের ছেলে। উনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন– আ বাংলাদেশ! শেখ মুজিবুর রহমান, হি ওয়াজ গ্রেট। তখনো কিন্তু বঙ্গবন্ধু মারা যাননি। সেভেনটি ফাইভের প্রথম দিকের ঘটনা এটা। ততদিনেই আউসট্যাড হয়ে গেছেন পাপাডো। উনি অনেকক্ষণ আমার সাথে কথা বললেন। এট লিস্ট পাঁচ ছয় মিনিট হবে। একজনের জন্য পাঁচ ছয় মিনিট দেয়াটা কিন্তু কম কথা না। তিনি তো আবার ওদের ধর্মীয় নেতা, ওদের ভাষায় পাপাস বলে। ক্রিশ্চিয়ান। তার সাথে আলাপ হলো। বর্ষীয়াণ মানুষ। তো এইগুলা আমার একটা এক্সপেরিয়েন্স। আমি যে একা ছিলাম, তা না। অন্যান্য গ্রিক ছাত্ররা ছিল। ওরা তো সব আন্দোলনে ব্যস্ত। আমি আন্দোলনে ঢুকতে পারিনি। এমনিতে ওরা বলত, তুমি এসে এখানে যুদ্ধ-টুদ্ধ আন্দোলন ইত্যাদি লাগায়ে দিলা। রসিকতা করে বলত। কারণ, বাংলাদেশ তখন স্বাধীন হয়ে গেছে। প্রথম ছাত্র আমি। ওরা ঠাট্টা করত আর কি। তখন আমি বলতাম, দেখ, আমি আসছি বলে তোমরা সাকসেসফুলি মিলিটারি সরাতে পারছ।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা ভালো বলেছেন। তো গ্রিসে আপনার অবস্থানটা নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
রফিকুন নবী: ওখানে আমি উডকাটের উপর লেখাপড়া করছিলাম। উডকাটে আমাদের প্রফেসরের পুরো ইউরোপে খুব নাম ছিল। তার আন্ডারে কাজ করছিলাম। সেইটা, প্লাস ওদের রাজনীতিটা দেখছি। প্লাস আমি যখন ওইখানে তখন দেশে বিশাল গোলমাল। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে আমাদের চার নেতার হত্যাকাণ্ড ঘটল। আমি বাইরে, কিন্তু ওই সময়টাতেই সবকিছু চলছে। ওখানে বসে একটা অশান্তি বোধ করছিলাম। কী যে হচ্ছে দেশে! তখন তো আর মোবাইল নাই। আর টেলিফোনে পাওয়া খুবই কঠিন। টেলিফোন কাকে করব! আমার বাড়িতে তো টেলিফোন নাই। এই রকম দমবন্ধ একটা অবস্থা। কিছু বুঝতে পারি না। বিবিসি একমাত্র ভরসা। বাংলা বিবিসিটা আবার ওখানে ধরা যেত। অনেক কষ্টে ধরতাম। এই রকম একটা অবস্থার মধ্যদিয়ে ওখানে থাকা। এটা আমার জীবনে একটা এক্সপেরিয়েন্স। খারাপ দিক আছে, ভালো দিক আছে। তারপরে ওখানে তো আমি চাকরি পেয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম যে আর যাবই না দেশে। এটা নিশ্চয় পাকিস্তান হয়ে যাবে। ওসবের ভেতর আর নাই। থেকে যাই এখানে। চাকরি বাকরি করি। ভালো পয়সার একটা চাকরি পেয়ে গেছিলাম। বুক ইলাস্ট্রেশন করতাম। বড় একটা পাবলিশার্স পেয়েছিলাম। সে আবার শিল্পকলা সংগ্রাহক। উনি আমাকে খুব পছন্দ করত, আমার ছবি কিনত। মোটামুটি বেশ ভালো ছিলাম অর্থনৈতিকভাবে। কিন্তু মানসিক বিপর্যস্ততা ছিলই। এক ছিল যে বিদেশ ইজ বিদেশ। ওরা যথেষ্ট কর্ডিয়াল ছিল। মানুষজন খুব ভালো ছিল তখন। রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতরেও জিনিসপত্রের দাম কম, স্কলারশিপ থেকে যে টাকা-পয়সা পেতাম তাই দিয়েই চলে যেত। তার মধ্যে আমার এক্সট্রা ইনকামও ছিল, মোটামুটি ভালো অবস্থার মধ্যে ছিলাম। তখন যে মানসিক অবস্থা, সেভেনটি ফাইভের ওই দুর্ঘটনার পর আমি ভাবলাম যে আর দেশে যাওয়া যাবে না। নিশ্চয় এটা রসাতলে যাবে। চাকরি একটা পেয়ে গেলাম। ওটা একটা কলেজ। বেশ ভালো ছিলাম। তারপরে তো ধীরে ধীরে সময় চেঞ্জ হলো। সেভেনটি সিক্স এসে গেল, আমার স্কলারশিপ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন হয় থাকব, নাহয় চলে আসতে হবে। প্রফেসর বললেন, আরে থেকে যাও। পরিবার তো আমার সাথে। আমার ছোট বাচ্চা আর বউ। আমার সাথেই ছিল। থাকতে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু বাড়ি ফেরার তারিখ যত কাছে আসতে লাগল, বাড়ি ফেরার উদগ্র বাসনা তৈরি হতে লাগল। আপাতত যেয়েই দেখি না কী হয়! তারপরে দেখা যাবে। এখানের সবকিছু তো জানাশোনাই থাকল। তো সেভেনটি সিক্সের শেষের দিকে চলে আসলাম। আসার পর গ্রিসের আশেপাশের সব দেশে গেলাম। বুলগেরিয়া টুলগেরিয়া সবখানেই গেছি কিন্তু গ্রিসে আর যাওয়া হয়নি। এমনি বেড়াতে তো যাওয়াই যায়। বুলগেরিয়া গেছি, যুগশ্লাভিয়া গেছি– এগুলো সব পাশাপাশি দেশ। ইতালি গেছি, টার্কি গেছি কিন্তু গ্রিসে ঢুকি নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: কারণটা কী?
রফিকুন নবী: তেমন কোনো কারণ নাই। প্রথম কথা হলো যে, গেলে আমার একটা নস্টালজিয়া পেয়ে যাবে। তিন বছর ছিলাম। এত বন্ধুবান্ধব! কালচারালি মিশে গেছি। সবমিলিয়ে আমার মনে হয়েছিল যে, ওইখানে একবার ফিরলে আমার থেকে যাওয়ার বাসনা তৈরি হবে। সেটাও একটা আছে। যদিও সেটা হবে না জানি। তারপরে হলো, ইদানীং যখন যাই, তখন মনে হয় কে কোথায় আছে, এখন তো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পরিচিত তাদের সঙ্গে দেখা হলে দেখব যে বৃদ্ধ একজন বা বৃদ্ধা একজন। বেটার নট টু গো। এটা আমি কখনো কাউকে বলি নাই। আজকে প্রথম কেন জানি বলে ফেললাম। এটা একটা ব্যাপার আছে। তারপরে বহুকাল তো এইখানে ভিসা নেয়ার ব্যাপার ছিল না। এখন নাকি কনস্যুলেট আছে। কিন্তু বহুকাল এইখানে কিছু ছিল না। অতএব গেলে বাইরে থেকে নিতে হবে, এইসব ঝামেলার কারণে যাওয়া হয়নি। তবে যাব একবার।

রাজু আলাউদ্দিন: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কি আপনার কখনো দেখা হয়েছে?
রফিকুন নবী: দেখা হয়েছে। এটা হয়েছিল সেভেনটি টু-তে। মিট বাংলাদেশ নামে একটা বই বেরিয়েছিল। লিবারেশন ওয়ার, বাংলাদেশের সৌন্দর্য, বাংলাদেশের যাবতীয় উন্নয়ন ইত্যাদি কী হবে না হবে এই নিয়ে খুব সুন্দর বড় একটা বই বেরিয়েছিল। নাম মিট বাংলাদেশ। তখন মিজানুর রহমান চৌধুরী ছিলেন তথ্যমন্ত্রী। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে এটা বেরিয়েছিল। ওই বইটার অলংকরণ ও সজ্জার পেছনে আমরা একটা শিল্পী গ্রুপ ছিলাম। কামরুল হাসান ছিলেন। কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন। আমি ছিলাম। কালাম মাহমুদ ছিলেন বোধহয়। কালাম মাহমুদ মারা গেছে। কামরুল ভাইও মারা গেছেন। কাইয়ুম ভাইও মারা গেছেন। যাহোক, ওই মিট বাংলাদেশ বইয়ের আমি ছিলাম ওয়ান অব দ্য আর্টিস্ট। বইটা যেদিন বের হলো, বইটা বঙ্গবন্ধুর হাতে দেয়ার জন্যে আমরা গিয়েছিলাম। এডিটরস যারা ছিলেন, আব্দুল গাফফার চৌধুরীসহ আরো কে কে যেন ছিলেন। সবাই মিলে আমরা বইটা প্রেজেন্ট করতে গেলাম। প্রায় পনেরো জনের মতো হবে। ফয়েজ ভাই ছিলেন। ফয়েজ আহমেদ। মুসা ভাই ছিলেন। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। তখন তো তিনি বিশাল এক ব্যক্তিত্ব। ভাবাই যায় না। উনি ঝকঝকা সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা পরে উপর থেকে নেমে আসলেন। তখন এটা ছিল রমনা পার্কের পাশের বিল্ডিং, এখন মনে হয় ফরেন মিনিস্ট্রি ওটাকে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বানিয়েছে। রানী এলিজাবেথ যখন আসছিলেন, তখন ওই বাড়িতে ছিলেন। বেইলী রোডের ডানদিকের কর্নারটায়। ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম। মিনিস্টার মিজানুর রহমান চৌধুরী, উনি বইটা দিলেন। আমরা সব লাইন দিয়ে বসে আছি। উনি একজন একজন করে সবার সাথে হাত মেলালেন।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি এসে হাত মেলালেন?
রফিকুন নবী: হ্যাঁ, উনি এসে সবার সাথে হাত মেলালেন। কাউকে বাদ দেননি। জিজ্ঞেস করলেন, কী অবস্থা, সবাই ভালো তো? বইটা ভালো হয়েছে তো– এই জাতীয় কথাবার্তা বললেন। এছাড়া সবার জন্য তার একটাই কথা ছিল– দেশটাকে তো গড়তে হবে, নাকি! আবার কাউরে গাল টিপে দিলেন। যেমন গাফফার চৌধুরীর থুতনিতে হাত দিলেন। মিজানুর রহমান চৌধুরী সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। দ্যট ওয়াজ দ্য লাস্ট। আর তো দেখা হয়নি। এ ছাড়া দূরের থেকে তো দেখেছি। সামনা-সামনি যাওয়া, এটা হয়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনার ইম্প্রেশন… উনি বিরাট ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষ..
রফিকুন নবী: এটা ভাবা যায় না। ইয়া লম্বা একজন মানুষ। আসলেন। হাসি-ঠাট্টা করলেন সবার সাথে। এতবড় একজন নেতা এবং একটা দেশ তৈরি করে ফেলেছেন, এটা কিন্তু না দেখলে বোঝা যায় না। দূরের থেকে সবাই তো নানান কথা বলতে পারে। ভাবুন, তার সাথে যারা কাজ করত রেগুলার, তাদের ফিলিঙটা কেমন ছিল! আবার এটাও ভাবি মাঝে মাঝে যে, কাছের মানুষগুলাই তাকে আবার হত্যা করল। এটাও ঠিক। কী নৃশংসতা!
রাজু আলাউদ্দিন: যেমন খোন্দকার মোশতাক তো তার অসম্ভব রকমের কাছের মানুষ ছিল। অন্য যে কোনো নেতার চেয়ে..
রফিকুন নবী: একটা জিনিস আমি সব সময় বলি, মুজিবনগর সরকারের একটা অফিশিয়াল ছবি আছে। প্রত্যেকেই দাঁড়ানো। সবার গায়ে মুজিব-কোট। ও কিন্তু কোনোদিনই মুজিব কোট পরে নাই। ওর কোটটা ছিল গ্রে রঙের। আর অদ্ভুত ধরনের একটা টুপি। সো তাকে সহজেই, সুদূর ওয়াশিংটন থেকে চিনতে পারবে যে হি ইজ আওয়ার ম্যান। এটা আমার খুবই পার্সোনাল একটা অবজার্ভেশন।

রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, ছবিটা আমিও দেখেছি।
রফিকুন নবী: কোনোদিনও তাকে আমি মুজিবকোট পরা দেখিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: লেখালেখির সূত্রে, আঁকাআঁকির সূত্রে বয়োজ্যেষ্ঠ অনেক লেখকের সাথে আপনার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে।
রফিকুন নবী: বলতে গেলে সবার সাথেই হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: সিকান্দার আবু জাফরের পত্রিকাতে তো আপনি কাজই করেছেন। তো সিকান্দার আবু জাফর সম্পর্কে আপনি কেমন জানেন?
রফিকুন নবী: জাফর ভাই তো খুব প্রাণখোলা একজন মানুষ ছিলেন। তার এমন ব্যক্তিত্ব, আমি অবশ্য ভয় পেতাম। খুবই ব্যক্তিত্ববান ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: বঙ্গবন্ধুর বোধহয় বাল্যবেলার স্কুলবন্ধুও ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর।
রফিকুন নবী: এটা আমি জানতাম না।
রাজু আলাউদ্দিন: তাদের সম্বোধন নাকি তুই তোকারি ছিল।
রফিকুন নবী: হতে পারে। তখন জাফর ভাইয়ের সমকাল পত্রিকা তো সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। শিল্প-সাহিত্য সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটা ছিল। ওইটার প্রচ্ছদে শিল্পীরা চান্স পাবে, এটা ছিল বিরাট ব্যাপার। একদম লাস্ট মুভমেন্টে আমি যখন চান্স পাব পাব অবস্থা, তখন সমকাল বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল।
রাজু আলাউদ্দিন: সেভেনটি ওয়ানের কথা বলছেন?
রফিকুন নবী: সেভেনটি ওয়ান। তো সেটা আর হয় নাই। সবচে’ বড় যে ব্যাপার, জাফর ভাইয়ের ছোটভাই ছিল শিল্পী। সৈয়দ জাহাঙ্গীর। দুজনের গলা প্রায় এক রকম। কণ্ঠস্বর। আর খুব মুডি লোক ছিলেন জাফর ভাই। উনি সেই সময়ে ঢাকা ক্লাবের মেম্বার। সেই পাকিস্তান আমলে ওইখানে তিনি পয়লা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে দিলেন। আমরা তখন ছাত্র অথবা মাত্রই মাস্টারিতে যোগ দিয়েছি। তিনি আমাদেরকে নিয়ে গেলেন, পয়লা বৈশাখের স্টেজের পেছনে কিছু আঁকাআঁকি করার জন্য। আমার গিয়েছিলাম। জীবনে প্রথম ঢাকা ক্লাবে ঢুকছি। খুব একটা অনুসন্ধিৎসু মন। চিপাচাপার মধ্যে তাকিয়ে দেখি যে ব্যাপারটা কী! সমাজের বড় বড় মানুষ। সেখানে জাফর ভাই এই অনুষ্ঠান করেছিলেন। তবে সবচাইতে বড় জিনিস ছিল, জাফর ভাই একটা নাটক লিখেছিলেন। এটা কিন্তু গণসঙ্গীতের জন্য লেখা। কিংবা পরবর্তীতে গণসঙ্গীত হিসাবে বিখ্যাত হয়ে গেল। সেটা হলো ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। উনি আরো একটা নাটক লিখেছিলেন ‘সিরাজ উদ দৌলা’। এই সিরাজ উদ দৌলা কিন্তু সেইটা না। গিরীশবাবুর সিরাজ উদ দৌলা না। উনি উনার মতো করে লিখেছিলেন। চরিত্র প্রায় সবই ঠিক ছিল। কিন্তু উনি উনার মতো করে লিখেছিলেন দেশাত্মবোধের চেতনাকে আরো উজ্জীবিত করে। ওই নাটকটার মঞ্চ করেছিলাম আমি। জীবনে কখনো নাটকের মঞ্চ করতে হবে এটা ভাবিওনি। কিন্তু করেছিলাম। সেইটা করতে গিয়ে আমার মনে আছে, বৃটিশ কাউন্সিল থেকে বলে বলে ওদের বইপুস্তক নিয়ে, কিভাবে মঞ্চ নাটক করতে হয়, সেকেন্ডের মধ্যে একটা অঙ্ক শেষ হয়ে গেলে সেকেন্ডের মধ্যে অন্য একটা দৃশ্যের মঞ্চায়নে যেন লেট না হয়– এগুলো স্টাডি করতে বসেছিলাম। এটা জাস্ট ইন্টারেস্ট। তখন জাফর ভাইয়ের সাথে খুব ক্লোজড হয়ে গেছিলাম। রিহার্সেলগুলাতে থাকতে হতো। রিহার্সেল দেখতাম। উনি আসতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আব্দুল মান্নান সৈয়দ তার কথা খুব বলতেন।

রফিকুন নবী: মান্নান সৈয়দ তো ওখানে বসে থাকতেন। আমার মনে হয় মান্নান সৈয়দ ওখানে কাজও করতেন অনেক সময়। মান্নান সৈয়দের সমকালে ছাপানো কবিতাসহ আরো কিছু কবিতা নিয়ে প্রথম যে বইটা বের হয়, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ— সেইটার প্রচ্ছদ আমি করেছিলাম। দ্যট ওয়াজ দ্য ফার্স্ট।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই নাকি! এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা।
রফিকুন নবী: এরপরে জ্বলো চিতাবাঘ, হুমায়ুন আজাদের, এটাও আমি করেছিলাম। দুজনেই কমপ্লিকেডেট কিন্তু। ড্যাঞ্জারাস। তাদের প্রচ্ছদ করা.. অথচ প্রথমটাই পছন্দ হয়েছিল তাদের। এরা তো আমাদের কাছাকাছি সময়ের। আমাদের একটু সিনিয়র।
রাজু আলাউদ্দিন: মান্নান ভাই তো মনে হয় আপনার থেকে বয়সে একটু ছোট ছিলেন!
রফিকুন নবী: না। আমার থেকে বড় ছিলেন। প্রায় সমসাময়িক। তারপরে হুমায়ুন আজাদ আমাদের সমসাময়িক। একটু ছোটও হতে পারে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার মনে হয় আপনার থেকে একটু ছোট হবে।
রফিকুন নবী: এদের তো অনেক কাজ করেছি। হুমায়ুন আজাদের অনেক বই করে দিয়েছি। মান্নান সৈয়দের ওইটেই করেছি। কিন্তু আমাদের যোগাযোগটা খুব ভালো ছিল। তখন শিল্পী, সাহিত্যিক, সঙ্গীতের মানুষ, নাচের মানুষ, সবার সাথে সবার সম্পর্ক ছিল। হৃদ্যতা ছিল। একসাথে ওঠাবসা। এক লাইনে কাজ করে যাচ্ছি। আন্দোলন-টান্দোলন হচ্ছে। তারমধ্যে এই যুক্ততা। আর বয়েসী যারা ছিলেন, সরদার জয়েন উদ্দীন থেকে শুরু করে, যারাই ছিলেন, প্রত্যেকের সাথে কিন্তু আমাদের ওঠাবসা ছিল। সাংবাদিকদের সাথে তো বটেই। কারণ, সংবাদপত্র দিয়েই আমার চাকরি শুরু করেছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: সাংবাদিকতার কথা যেহেতু বললেন, জহুর হোসেন চৌধুরীর সাথে কি আপনার দেখা হয়েছে?
রফিকুন নবী: দেখা হয়েছে। কিন্তু তারা তো অনেক সিনিয়র। সংবাদে গেলেই দেখা হতো।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি নাকি খুব রসিক মানুষ ছিলেন।
রফিকুন নবী: আমি অবশ্য এটা শুনিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: জহুর হোসেন চৌধুরী সম্পর্কে ইন্টারেস্টিং কিছু শুনেছেন?
রফিকুন নবী: অনেক কথাই শুনেছি। সেগুলো তো এখন মনেও নাই আমার। মানিক মিয়া ছিলেন আমাদের পাড়ার। তার ছেলে মঞ্জু ও আমার বন্ধু। ওর বড়ভাই মঈনুল, আমাদের সিনিয়র বলে বন্ধু নয়, কিন্তু চিনতাম। বাড়িও চিনতাম। তাদের বাড়িতে যাতায়াত করেছি আমরা। মঞ্জুদের সাথে, একসাথে আমরা সংগঠন করতাম। আবেদ খান, তার বড়ভাই মন্টু খান, তারপরে তোহা খান, উনি বাওয়ালিদের নিয়ে বই লিখেছেন। মন্টু খানেরও বই আছে। খুব নামকরা বই আছে। নামটা আমি ভুলে গেছি। প্রচ্ছদও আমার করা।
রাজু আলাউদ্দিন: শামসুর রাহমানের সাথেও তো আপনার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। যেহেতু একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।
রফিকুন নবী: প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সম্পর্ক ছিল। রাহমান ভাই, হাসান ভাই, হাসান হাফিজুর রহমান, সবার সাথেই। হক ভাই তো ছিলেনই। সৈয়দ শামসুল হক। আমরা একসাথে চিত্রালী পূর্বদেশে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। আর পাড়ার কথা বলছিলাম, আবেদ খানের বাবা হাকিম সাহেব ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ম্যানেজিং এডিটর বা এই জাতীয় কিছু। ওইখানে ছিলেন সওগাতের নাসিরুদ্দিন সাহেব। তার জামাতা রোকনুজ্জামান দাদা ভাই ছিলেন। নূরজাহান আপা, নাসির সাহেবের কন্যা, তিনি ছিলেন। সওগাত ইত্যাদিতে আমার যাতায়াত ছিল। বেগম পত্রিকাতে আমাদের ইলাস্ট্রেশন যেত। আল মুতী শরফুদ্দীন আমার বাসার উল্টাদিকে থাকতেন। এরা সবাই তখনকার খুব পাওয়ারফুল লোকজন। বেশিরভাগই সাংবাদিক।

রাজু আলাউদ্দিন: শহীদ কাদরীর সাথে তো আপনার আড্ডা হতো?
রফিকুন নবী: অবশ্যই হতো।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি কেমন ছিলেন?
রফিকুন নবী: উনি তো খুবই আড্ডাবাজ ছিলেন। গাজী ভাইয়ের কথাকলি প্রিন্টার্সে আড্ডা হতো। আমরা ছিলাম জুনিয়র। এই যে মেলামেশা, এই যে তাদের স্নেহ পাওয়া, এগুলো বড় ব্যাপার ছিল। এবং তাদের সবার বইপত্র আমি করেছি। কভার করেছি, ইলাস্ট্রেশন করেছি। তাদের সান্নিধ্যটা হেল্পড মি এ লট। নিজেকে তৈরির ব্যাপারে একটা ভূমিকা রাখে।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদ কাদরীর রসিকতার কোনো স্মৃতি কি মনে আছে আপনার?
রফিকুন নবী: আমার অত মনে নেই। ওই যে বললাম, আমি জুনিয়র ছিলাম। থাকতাম, বসতাম, কথাও হতো, ভালোও বাসতেন। কিন্তু জুনিয়র বলে আড্ডার খুব বেশি ভেতরে ঢুকতে পারতাম না। নিউ ইয়র্কে গেলাম, সেখানে কাদরী ভাই দাওয়াত দিলেন। তখনো তিনি অসুস্থ। কাদরী ভাই বিয়ে করলেন। সেই মেয়েকেও আমরা চিনতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: পিয়ারী বেগম।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ, পিয়ারী। তাকেও চিনতাম। তখন তো ঢাকা ছোট, মানুষগুলা অনেক বড়।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা ভালো বলেছেন।
রফিকুন নবী: যারাই বড়, তারাই প্রধান। তাদের কাছেই আমাদের যাতায়াত করতে হয়েছে। তাদের সাথে ইনভল্বড হত হয়েছে। এবং এই ইনভল্বমেন্টের মধ্যদিয়ে কাজও হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আবুল হাসানকে তো আপনি দেখছেন?
রফিকুন নবী: হ্যাঁ, দেখেছি। আবুল হাসান। গুণের বন্ধু। ওরা ছিল মানিকজোড়। একে অপরের পরিপূরক। খুবই ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ওরা ছিল জুনিয়র। গুণ তো আমার জুনিয়র। কিন্তু আমরা বন্ধুর মতোই। হুমায়ুন আজাদ আমার সমসাময়িক। হুমায়ূন আহমেদ তো আরো কনিষ্ঠ। তার সাথে আমার যুক্ততা হলো বইয়ের প্রচ্ছদ দিয়ে। তারপরে লেখালেখি নিয়ে আলোচনা পরে শুরু হলো। আমার মনে আছে, হুমায়ূনের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল বিচিত্রায় কিংবা দৈনিক বাংলায়। অফিস থেকে বেরিয়ে আমি লিফটে উঠলাম, তখন হুমায়ূন ঢুকল। শীতের দিন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কত সাল?
রফিকুন নবী: ১৯৭৮ হবে। আমি তখন বিদেশ থেকে মাত্র ফিরে এসেছি। ইতোমধ্যে ওর কিন্তু উপন্যাস টুপন্যাস বেরিয়েছে। বেশ নাম হয়েছে। শঙ্খনীল কারগারনন্দিত নরকে। যাইহোক, লিফটে দেখা। আমি লিফটে উঠলাম তখন ও দৈনিক বাংলা থেকে নেমে আসছে। আগেও দেখা হয়েছে কিন্তু কথা হয়নি। কিন্তু আজ দুজনেই লিফটে উঠেছি, কথা না বলে উপায় নেই। আমি বললাম, লেখালেখি কেমন চলছে? আমার বলার মধ্যে একটু বড়ভাই বড়ভাই ভাব। ও খুব কাচুমাচু। বিনয়ী। বলে, এই তো ভালো হচ্ছে। বলল, নবীভাই একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না। আমি বললাম, হ্যাঁ বলো। এটা ১৯৭৯ অথবা ১৯৮০ হবে। কারণ, তখন কিন্তু রনবী এবং টোকাই বেশ নাম করেছে। বলল, আপনি জনপ্রিয়তা খুব এনজয় করেন, না? আমি বললাম, সে কী কথা! আমি এটা ভাবি নাই কখনো। সেই হুমায়ূন জনপ্রিয়তা কাকে বলে… অচিন্তনীয় একটা ব্যাপার। এবং এমনি এমনি জনপ্রিয় হওয়া না। একেবারে সলিড জিনিস নিয়ে তার ভেতর থেকে উঠে আসছে। না হলে ওকে সবাই এত ভালোবাসবে কেন!
রাজু আলাউদ্দিন: কোনো সন্দেহ নেই।

রফিকুন নবী: ও যে অসুস্থ হলো, তার কয়েকদিন আগে আমার সাথে দেখা। ফাইনালি যখন আমেরিকা চলে গেল তার কিছুদিন আগে। সাত মসজিদ রোডের একটা দোকানে ওষুধ কিনছিলাম আমি। ও রাস্তার ওইপারে ছিল। কী একটা কাজে এসছিল। ওখান থেকে চিৎকার–আরে নবী ভাই! বলে চলে আসল। মাঝখানে কিন্তু বহুদিন যোগাযোগ ছিল না। একটু মাইন্ডও করেছিল। ও তখন নুহাশ পল্লী বানিয়েছে। সবাইকে নিয়ে গেছে। আমি যাব যাব করে প্ল্যান করেও যাইনি। এরপরে আরেকদিন দেখা। বলে, নবী ভাই, একটা ওয়াটার কালার দিতে হবে। এন্ড আই গেভ হিম ওয়ান। ওটা সে খুব পছন্দ করেছিল। সে খুব খুশি। তো লাস্টে যখন ও অসুস্থ হলো, আমি জানিও না ও অসুস্থ। শুধু জানতাম ও আমেরিকা যাবে। এই রকম একটা সময়ে এইপারে আমি কী একটা ওষুধ কিনছিলাম, ও ওইপার থেকে দেখে চলে আসল। তখন ও ধানমন্ডিতে থাকত।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, আমি গেছি ওই বাসায়। একবার না দুবার যেন।
রফিকুন নবী: সিগারেট ধরাল। গপ্পটপ্প করল। তারপরে প্রতিজ্ঞা করলাম যে, যাব যাব। তারপরে তো আর যাওয়া হয় নাই। আর দেখাই হয় নাই। ওটা লাস্ট দেখা ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: কাজের সূত্রে তো আহসান হাবীবকে পেয়েছেন?
রফিকুন নবী: উনি সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। একই বিল্ডিঙে থাকতেন। উনি তিনতলায় আমি দোতলায়। অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। তার বই করেছি আমি।

রাজু আলাউদ্দিন: উনি খুব শান্ত, স্নিগ্ধ, নিশ্চুপ মানুষ ছিলেন।
রফিকুন নবী: বর্ষীয়াণ মানুষ তো, সবাই খুব ভক্তি করত।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি একবার অথবা দুবার তাকে দেখেছি। একবারই হয়ত। ছোট্ট একটা রুমের মধ্যে বসতেন, তাই না?
রফিকুন নবী: খুবই ছোট রুম।

রাজু আলাউদ্দিন: খুবই ছোট। আমার মনে আছে। উনার মুখোমুখি বসতেন মাফরুহা চৌধুরী। গল্পলেখক।

রফিকুন নবী: উনি সাবেরের বাবা। সাবেরও কিন্তু ওই স্বভাবেরই হয়েছে। মঈনুল আহসান সাবের।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি ছিলেন একটু গ্লুমি ধরনের।
রফিকুন নবী: খুব নামি সাহিত্য সম্পাদক। তার হাত দিয়ে এটা ওটা ছেপে যাবে– সম্ভব ছিল না। সেজন্য তরুণ প্রজন্ম তার প্রতি সশ্রদ্ধ ছিল এবং ভয়ও পেত। আবার কটূক্তিও ছিল– আমার লেখাটা দিল বাদ কইরা হাবীব ভাই– এই রকম।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে ক্ষোভ ছিল?
রফিকুন নবী: ক্ষোভ না। তার হাত দিয়ে কিছু ছাপা হওয়া মানে সে দাঁড়িয়ে গেল।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনি উনার পাতায় তো বাচ্চাদের জন্য লিখেছেন, তাই না?
রফিকুন নবী: উনার পাতায় লিখেছি। পাকিস্তান আমলেও তো ওই ডিপার্টমেন্টে উনি ছিলেন। দৈনিক পাকিস্তানের সময়। তারপর দৈনিক বাংলা হলো যখন, তখন সেমি স্ট্রিপ বের করতাম। স্টোরি। শাহাদাৎ চৌধুরী স্টোরি লিখত আর আমি আঁকতাম।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr.Debabrata Chakrabarti — আগস্ট ৩, ২০১৮ @ ৩:৩৭ অপরাহ্ন

      বেশ লাগল রাজু ভাই৷ বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত সংস্কৃতির জগতে যাঁরা বিরাট ভুমিকা পালন করেছেন তাদের সকলকে আপনি একটি ছাতার নিচে এনে ফেলেছেন৷ এই জগৎটা সম্পর্কে তো কিছু জানি না৷বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দিগন্তটা কেমন তা আমার জানা ছিল না৷ এই সবে জানছি, শিখছি আরও বেশী …

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — আগস্ট ৪, ২০১৮ @ ১:৪০ পূর্বাহ্ন

      আরেকটা অসামান্য আর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার, অভিনন্দন রাজু ভাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com