স্মরণ

আশির স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠ মিজান রহমান

পুলক হাসান | 21 Dec , 2017  

mizanপাখি নেই পাখির প্রতীক্ষায়
পাখির প্রতীক্ষায় উন্মুখ আকাশ

তবে কী মানব এ জীবন পাখির মতন? মর্ত্যের খাঁচা ছেড়ে তাকে উড়ে যেতেই হয় আকাশের ঠিকানায়? পৃথিবীর বন্ধন মুক্ত হওয়ার আগে উপরোক্ত দুই লাইনের ছোট্ট ‘পাখি নেই’ কবিতায় এ কথাই যেন জানিয়ে দিয়ে গেলেন কবি মিজান রহমান যে, আকাশই ছিল তার প্রতীক্ষায় উন্মুখ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটায় ঢাকার দোহার থানার হাতুরপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। তার এই হঠাৎ বিদায় আমার জন্য একই সঙ্গে বিস্ময় ও বেদনাদায়ক। কারণ, মাত্র দুইদিন আগে তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তাকে কুরিয়ার করার জন্য আমাকে তার গ্রামের ঠিকানাটা দেয় এবং বলেছিল, কন্টিনেন্টাল-এ যেন পাঠাই। এখন তাকে আমি কোন ঠিকানায় কুরিয়ার করব?
বয়সে সে আমাদের চেয়ে বছর তিনেকের বড় কিন্তু সমসাময়িক। তার জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮। কবি সরকার মাসুদ সূত্রে অনেকটা বিলম্বে পরিচয় হলেও কবিতাকেন্দ্রিক অকৃত্রিম সম্পর্কটা গড়িয়েছিল অনেক দূর। তার কবিতাই সে-সম্পর্ক গভীর করে তুলেছিল। মৃত্যুর খবরটাও দিয়েছিল সরকার মাসুদই, সুদূর কুড়িগ্রাম থেকে। ওর সঙ্গেই সম্পর্কটা ছিল গভীর এবং নিবিড়। তাই মিজানের আকস্মিক বিদায়ের খবরটা জানাতে কণ্ঠ ভিজে উঠেছিল ওর। আমারও খারাপ লেগেছে বৈকি। কিন্তু সবারই তো যেতে হবে ও-পথে। মিজান একটু আগে এই হিংস্র উন্মত্ত পৃথিবী ও মেকি সামাজিক বন্ধন থেকে দূরে চিরশান্তির দেশে গিয়ে হয়তো ভালোই আছে এবং আমাদেরকে তারুণ্য ও সাম্যের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সেই বিখ্যাত গানের চরণ শুনিয়ে জীবনের চরম সত্য মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে : ‘ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’।

তবে কী প্রকৃতিই শেষ কথা কী সৃষ্টি চেতনায় কী মৃত্যু পিপাসায়? এই প্রকৃতি ও সামাজিক বন্ধনে মত্ত ছিল সে সৃষ্টির তারুণ্যে, জীবনের জয়গানে। ফলে বেরিয়ে এসেছে তার কলম থেকে অমল এই পংক্তি : ‘পাথরের গভীরে জেগেছে বীজের উল্লাস’। আবার বিপরীত ছবিটিও এঁকেছে : ‘স্তব্ধ সন্ধ্যা সূর্য গুটিয়ে নিয়েছে তার পেলব পেখম/দৃশ্যের গভীরে জেগেছে অদৃশ্যের স্পন্দন/ প্রোজ্জ্বল প্রতিবিম্ব কখন গিয়েছে নিভে/ জানে না তা আত্মমুগ্ধ নার্সিসাস (নার্সিসাস)
হয়ত প্রকৃতির এই সাজ বদলে ভয়াল সময়ের আগমনী বার্তাই টের পেয়েছিল সে। তার অনেক কবিতার মধ্যেই মৃত্যুচিন্তা ও শূন্যতাবোধের ছায়া আছে। তবে শেষ দিকে লেখা ‘পাখি নেই’, ‘করাঘাত’ ও ‘অসমাপ্ত কবিতা’ তিনটিতে গভীরভাবে ছায়া ফেলেছে তার মৃত্যুভয় ও আশংকা।

১. পাখি নেই পাখির প্রতীক্ষায়/ পাখির প্রতীক্ষায় উন্মুখ আকাশ (পাখি নেই)

২. ঠক-ঠক-ঠক/ কার করাঘাত কপাটে আমার/ প্রতি রোমকূপ সন্ত্রস্ত পাখির পাখসাট/ হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় দ্রুত/ ধমনীর রক্তপ্রবাহ থমকে পড়ে হঠাৎ/ দুই চোখে উড়ে আসে টেরাডোটাকাশ ভয়/ উৎকণ্ঠিত প্রহর নির্ঘুম কাটে রাত/ রুদ্ধদ্বারে কার করাঘাত/ কে তোলে আওয়াজ/ ঠক-ঠক-ঠক (করাঘাত)

৩. আমার অসমাপ্ত কবিতাগুলি/ ক্ষিপ্র বেগে ধাবমান/ অশ্বক্ষুরে উড়ে যাওয়া ধুলি
(অসমাপ্ত কবিতা)

মিজান খুব কম লিখেছেন। চার দশকের কবিতা চর্চায় তার একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থও বের হয়নি। তবু জীবনদর্শন ও নির্ণয় ক্ষমতায় পরিণত এবং ব্যতিক্রমিতায় প্রতিষ্ঠিত। ব্যতিক্রমী সে আরও একটি কারণে, কবিতায় সে অত্যন্ত মিতবাক কিন্তু তার মধ্যেই স্পষ্ট তার জীবনবোধ ও চিন্তার স্বাতন্ত্র্য।
নমিত এবং পরিমিত তার কাব্যভাষা। ফলে স্থূল রগড় নেই তার কবিতায়, নেই অহেতু ভাবোচ্ছ্বাসের রঙধনু বরং তার কবিতা জীবনদর্শনে এক গূঢ় এষণা।

সকল বন্ধনী মুক্ত করে দিতেই
প্রকাশ্য হয়ে ওঠে গোপন স্বপ্ন
বিস্মৃত স্মৃতি
অপার রহস্যে ঢেকে থাকা গূঢ় এষণা
প্রতিফলিত হয় শিশিরে শূন্যে
(বন্ধনী মুক্ত কবিতা)

এ ধরণের জাপানি হাইকুর মতো ছোট মিজানের প্রতিটি কবিতার মধ্যেই মিলবে তার জীবনবোধের স্বচ্ছ এক নির্ণয়। আত্মানুসন্ধানে যেমন নৈঃসঙ্গতাড়িত তেমনি জীবনানুসন্ধানে স্বপ্ন ও আশাবাদের কবি তিনি।
অন্তর্মুখী মিজান খুঁজেছিলেন বিনয় মজুমদারের মতো নিভৃতি, জীবনযাপনও ছিল অনেকটা তাঁরই মতো।
শহর থেকে দূরে গ্রামীণজীবনে ছোট্ট একটি খামারের পাশে নিভৃতবাস গভীর করে তুলেছিল তার চিন্তার আকাশ। স্বপ্নের ভুবনটাও ছিল একেবারে নিজের মতো। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক ধারণা। ফলে আশির দশকের কবিতায় যে কয়জন কবি আলাদাভাবে চিহ্নিত ও স্বমহিমায় উজ্জ্বল কবি মিজান রহমান তাদেরই একজন।
এছাড়া আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, প্রকৃতিই সৃষ্টি ও সৃষ্টিশীলতার উৎস। একজন কবি কবিতায় শুধু তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের উন্মোচন করেন।
মিজান রহমান কবিতায় আঁকতে চেয়েছিলেন প্রকৃতির ভিতর জীবনেরই প্রতিকৃতি। ৯০ দশকের মাঝামাঝি মাত্র দুই ফর্মার একমাত্র প্রকাশিত চটি বই ‘প্রকৃতি আত্মপ্রতিকৃতি’ গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আমাদের জানান দিয়েছিলেন তিনি আদপে প্রকৃতি চেতনার কবি। জীবনের স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার আকাশ ও কষ্ট বেদনার সুর খুঁজেছিলেন প্রকৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডারে। সেখানেই থামল তার স্বপ্ন যাত্রা, জীবন সুরের ভেলা।
একটি পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি প্রকাশের প্রস্তুতি নিতে নিতেই ডাক এসে গেল। এ ডাক সে ফিরিয়ে দিতে পারেনি, কেউ তা পারে না। কেননা সেখানে কেউ ‘অনাহুত আগন্তুক’ নয়। মিজান তাই আমাদের শুনিয়ে যায় :

ও বিলীয়মান চাঁদ পতনোম্মুখ শিশির কণা
বিদ্যুৎ বিভায় প্রোজ্জ্বল আকাশ
তুমুল বৃষ্টিপাত
বলো কোন উপেক্ষায় আমাকে ফেরাবে আজ।

মিজানুর রহমানের কবিতাগুচ্ছ্

নার্সিসাস

স্তব্ধ সন্ধ্যা সূর্য গুটিয়ে নিয়েছে তার পেলব পেখম
দৃশ্যের গভীরে জেগেছে অদৃশ্যের স্পন্দন
প্রোজ্জ্বল প্রতিবিম্ব কখন গিয়েছে নিভে
জানে না তা আত্মমুগ্ধ নার্সিসাস

শূন্যের প্রতিরূপ

আমার আয়নায় দেখি অন্যের মুখ
প্রোজ্জ্বল দৃষ্টিশিখা
শানিত হাসি তির্যক ভ্রু-ভঙ্গিমা

অন্যের আর্শিতে আমার বিভিন্ন রূপ
যা ভেঙে
গড়ে তুলি শূন্যের প্রতিরূপ

পাথর

পাথরে রুদ্ধ হয়েছে গতি
পাথর ফুঁড়েই উচ্ছ্রিত হয় নির্ঝর
পাথর ঘর্ষণে জ্বলে অগ্নি
পাথরের গভীরে জেগেছে
বীজের উল্লাস

পাথর প্রেমিক আমি
পাথরেই রাখি এই হাত

বন্ধনীমুক্ত কবিতা

সকল বন্ধনী মুক্ত করে দিতেই
প্রকাশ্য হয়ে ওঠে গোপন স্বপ্ন
বিস্মৃত স্মৃতি
অপার রহস্যে ঢেকে থাকা গূঢ় এষনা
প্রতিফলিত হয় শিশিরে শূন্যে

পাথরে পাথরে ঝাপিয়ে
পড়ে
তুমুল নির্ঝর

আর মেঘ মেয়েরা গেয়ে উঠে
আকাশের স্তবগান

উদ্ধৃত

উদ্ধৃত করি মেঘ সজ্জিত একাকী আকাশ
বিলীয়মান রৌদ্রছায়া দিন
নক্ষত্র স্পন্দিত রাত
বীজের অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা
দুরন্ত সবুজ

আরও উদ্ধৃত করি
আয়নার কাঁচে তরঙ্গ তুলে বয়ে যাওয়া নদী
আর কান্নাভেজা তোমার দুচোখ

অসমাপ্ত কবিতা

আমার অসমাপ্ত কবিতাগুলি
ক্ষিপ্র বেগে ধাবমান
অশ্বক্ষুরে উড়ে যাওয়া ধুলি
করাঘাত

ঠক – ঠক – ঠক
কার করাঘাত কপাটে আমার
প্রতি রোমকূপ সন্ত্রস্ত পাখির পাখসাট
হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় দ্রুত
ধমনীর রক্তপ্রবাহ থমকে পড়ে হঠাৎ

দুই চোখে উড়ে আসে টেরাডোকটাকাশ ভয়
উৎকণ্ঠিত প্রহর নির্ঘুম কাটে রাত

রুদ্ধদ্বারে কার করাঘাত
কে তোলে আওয়াজ
ঠক – ঠক – ঠক

পাখি নেই

পাখি নেই পাখির প্রতীক্ষায়
পাখির প্রতীক্ষায় উন্মুখ আকাশ

অনাহুত আগন্তুক

অপ্রেরিত পুরুষ আমি
অনাহুত আগন্তুক
মৃত্তিকায় রেখেছি দৃঢ় পা

ও বিলীয়মান চাঁদ পতনোন্মুখ শিশির কণা
বিদ্যুৎ বিভায় প্রোজ্জ্বল আকাশ
তুমুল বৃষ্টিপাত

বলো কোন উপেক্ষায় আমাকে ফেরাবে আজ
আমি নই অন্য কেউ

আমি নই অন্য কেউ কথা বলে
রুমাল পরিমাপ জায়গায় বসে থাকি
তাকিয়ে দিগন্ত দেখি চুপ

উড়িয়ে নক্ষত্রের ধূলি প্রকম্পিত করে মহাশূন্য
চলাফেরা করে অন্যকেউ

আমার সত্তার গহিনে তার
ছায়া পড়ে আকাশ সমান

বৃষ্টি পতন ধ্বনি

বৃষ্টি পতনের নিবিড় ধ্বনি স্তব্ধ হলে
প্রলম্বিত হয় আকাশ
মাটি ফুঁড়ে জ্বলে ওঠে সবুজ শিখা

মুগ্ধ দৃষ্টি পাখি হয়ে মেলে দেয় ডানা
তার পালকের রন্ধ্র থেকে উৎসারিত হয়
অসংখ্য ছায়াপথ
বৃষ্টি পতনের ধ্বনি স্তব্ধ হলে
নেচে ওঠে নদী-নিসর্গ

উন্মিলন

এক ক্রুদ্ধবাজের চিৎকারে ধ্বসে পড়ে
সমূহ শুন্যতা
তীক্ষ্ণ নখরাচঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে
ব্যাপক আকাশ
আতঙ্কে কেঁপে ওঠে দুপুরের রোদ
অস্থির ডানার ঝাপটে
খসে পড়ছে পালক
পালকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘটে
সান্ধ্য নক্ষত্রের উন্মিলন

বোধ

স্তব্ধ রাত। জমাট আঁধারে স্নায়ুর তাড়িত উপস্থাপনার
অবিন্যস্ত রেখাসম্পাত
এবং বোধের জটিল জালে আটকে আছে মেঘ
কয়েক পলক মাত্র (অঝোরে ঝরিছে বরষন আজ)
অতঃপর পেখম মেলে নেচে ওঠে
রংধনু ময়ূর
আর স্বপ্ন স্মৃতির আলেখ্য রচনা করে
নক্ষত্রখচিত নগ্ন আকাশ

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.