স্মরণ

এ দেশে তুমি মূল্যহীন

সুমন সাহা | 19 Dec , 2017  

Kanu Bhuson Saha 2017বাবা, এ দেশে তুমি মূল্যহীন! কারণ তুমি সনদবিহীন মুক্তিযোদ্ধা। তুমি দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধ করেছিলে ১৯৭১ সালে আর এখন ২০১৭ সাল। ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। আমি প্রায়ই বলতাম তোমার সনদের কথা। তুমি তখন বলতে- ‘দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, সনদ দিয়ে কী হবে?’ ১৯৯৬ সালে একবার ভাবলাম তোমার সনদের জন্য আবেদন করবো। ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে আবেদনপত্র নিয়ে এলাম নিজেই। আবেদনপত্রটা তোমাকে দেওয়ার পর তুমি বললে, ‘কার কাছ থেকে সার্টিফিকেট নেবো?’ আমি চুপ হয়ে গেলাম। তা-ও তো ২০ বছর হয়ে গেলো। তোমার কী নিয়ে অভিমান ছিলো জানি না। তোমার মুখে কোনোদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুনিনি। যেটুকু শুনেছি, যাদের কাছ থেকে শুনেছি, তারা হলেন তোমার মা-বাবা, আমার ঠাম্মা (ঠাকুরমা) ও দাদু আর পাশের বাসার খগেন (খগেন বষাক) জেঠার কাছে (তাদের কেউ এখন আর বেঁচে নেই)। তুমি যুদ্ধে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা (জুলাই ১৯৭১)। বাড়িতে এসে কয়েকজন দাদুকে বলে গেলো, রেল সেতুর কাছে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ পড়ে আছে। তার মধ্যে তোমার লাশও আছে!

দাদু অনেকটা সময় নিজের মধ্যে ব্যাপারটা চেপে রেখে একসময় লোকজন জোগাড় করেছিলেন তোমার লাশ আনার জন্য। লোকের বলাবলিতে বাড়ির সবাই ঘটনা জেনে যায়। আর ঠাম্মার কান্না কেউ থামাতে পারছিলো না। এর মধ্যে শুরু হয় বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যে আমার জেঠামনিসহ আরও দু’জন সিদ্ধান্ত নেন রাতে বৃষ্টি থামলে তারা সেই সেতুর সামনে যাবেন। বৃষ্টি তো কমে না! রাত শেষে ভোর হয়, তবু বৃষ্টি ঝরছে…ভোরের কোনো একসময় তুমি নাকি রাস্তা থেকে ‘মা, মা’ ডাকতে ডাকতে বাড়ি এলে। তখন তোমার খালি গা, ছেড়া একটা গামছা কাছা দিয়ে পরা আর হাতে বন্দুক। বৃষ্টিতে ভিজে তুমি কাঁপছো। ঠাম্মা তোমাকে দেখে নাকি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। তোমাদের পরের গ্রুপের তিনজন সেদিন সেই রেল সেতুর সম্মুখে শহীদ হয়েছিলেন। সেদিন সারাদিন বাড়িতে থেকে সন্ধ্যার পর আবার চলে গিয়েছিলে বিজয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধে। ফিরলে একেবারে যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে। ততোদিনে কিন্তু তোমাদের বাড়ি দখল করে নিয়েছিলো প্রথমে বিহারিরা। তারপর হাত বদলে প্রভাবশালীরা। খগেন জেঠার কাছে আরেকটা ঘটনা শুনেছি। যুদ্ধ শেষে যখন তোমরা ফিরলে, তিনি নাকি ঠাট্টা করে তোমাকে বলেছিলেন- ‘কি রে কানু, তোর বন্দুক দিয়ে কি গুলি বের হয়? নাকি এমনি নিয়ে ঘুরেছিস?’ তুমি তখন বেশ কয়েকটি ফাঁকা গুলি করে তাকে দেখিয়ে দিলে গুলি বের হয়। তুমি মুক্তিযুদ্ধ করেছো এই অপরাধে(!) তোমাদের বাড়িটা হারাতে হয়েছে এ কথা এখন আমরা ভুলেই গিয়েছি। সেখানে এখন বহুতল ভবন। থাক অতীতের কথা আর অতীত কেউ মনে করতে চাই না। সে বাড়ির প্রতিও আমাদের আগ্রহ নেই। এখন এদেশে মুক্তিযোদ্ধার অভাব হয় না বাবা। এবার বিজয়ের মাস ডিসেম্বর উপলক্ষে টিভিতে প্রায় ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার দেখেছি। তারা সবাই সনদপ্রাপ্ত, এর মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ-তাদের সহযোদ্ধাদের অনেকেই সনদ পাননি আর অনেক অমুক্তিযোদ্ধারা সনদ পেয়েছেন। যাদের আজ অনেক মূল্য। বাবা, তোমাদের মতো সনদ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা মূল্যহীন। তোমাদের নিয়ে লিখতে-বলতে এ প্রজন্ম সঙ্কোচ বোধ করে। কানু ভূষণ সাহা (সনদবিহীন মুক্তিযোদ্ধা)। সেক্টর-১১ (মেঘালয়) কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক তারা।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.