সাক্ষাৎকার

শিল্পী মুর্তজা বশীর: বাংলাদেশে কেউ শহীদুল্লাহকে নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি

রাজু আলাউদ্দিন | 24 May , 2018  

শিল্পী মুর্তজা বশীরের এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরে তার বাসায়। এই সাক্ষাৎকারে আলোচনার প্রধান বিষয় ছিলেন তার পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন। অডিও সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ। বি.স.
Shahidulla n Murtaja
রাজু আলাউদ্দিন: ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু ধারণা অথবা ভুল ধারণা আছে। সেটা হলো, তার আচরিক জীবনে এমন কিছু ছিল যেগুলো পশ্চাৎপদতা বলে অনেকে মনে করেন। কিংবা প্রগতিশীল ধারণার অনুকূল না–এ রকম মনে করা হয়। যেমন ধরেন, ছবি আঁকা পছন্দ করতেন না। গান শুনতে উনি পছন্দ করতেন না। বা গানকে উৎসাহিত করতেন না। ছবি আঁকাকে উৎসাহিত করতেন না। আরো এমন সাংস্কৃতিক দিক আছে, যেগুলো সম্পর্কে উনার ভূমিকা নেতিবাচক বলে ধারণা করা হয়। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই। কারণ, আপনি উনার অন্যতম সন্তান। আপনি নিজে ছবি আঁকেন। আপনি তাকে পিতা হিসেবে দেখেছেন।

মুর্তজা বশীর: আমার বড়বোনের লেখার মাধ্যমে গানবাজনা সম্পর্কে আমার পিতার কথা যেটা আমি জেনেছি সেটা এরকম: আমার বোন নাকি হারমোনিয়াম দিয়ে গান গাচ্ছিলেন, আমার বাবা হারমোনিয়াম ভেঙে ফেলেছেন। অন্যান্যদের কাছে শুনেছি, কোনো সভা-সমিতিতে যখন গান হতো, তিনি কানে আঙুল দিয়ে থাকতেন। আবার ঢাকার জগন্নাথ হলের এক প্রাক্তন ছাত্র, সুকুমার রায়ের এক লেখায় পড়েছি( বাসন্তিকা, হিরকজয়ন্তী সংখ্যা), সে লিখছে, সে একটু গানবাজনা করত, শহীদুল্লাহ তাকে ধরে নিয়ে প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরির মালিক আবদুর রশীদ সাহেবের বাড়িতে নিয়ে গেলেন, এবং সেখানে শহীদুল্লাহ তাঁর বগলদাবা থেকে তাঁর অনুবাদ হাফিজের লেখা গান বের করলেন এবং বললেন যে, তুমি এটার সুর করো। Daily Star পত্রিকায় একটি ছবি দেখেছি সুরকার আবদুল আহাদ পিয়ানোয় সুর তোলা অবস্থায় শহীদুল্লাহর দিকে তাকিয়ে আছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে তিনি গান পছন্দ করছেন না এটা ঠিক সত্য না। আর ছবি আঁকার ব্যাপারটা আমি ভালো বলতে পারব এই জন্য, যেহেতু আমি তার সন্তান হিসেবে ছবি এঁকেছি। তবে আমার আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার পেছনে, এটা সত্যি যে তার আগ্রহ বা অনাগ্রহ কোনোটাই ছিল না। আমি কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে ওখানে ভর্তি হই। আমার নিজেরও কোনো ছবি আাঁকার ইচ্ছে ছিল না। এবং আমি ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকতাম না। এবং স্কুল লাইফে ক্লাশে যে ড্রইং হতো, সেই ড্রইংয়ে আমি সব সময় শূন্য পেতাম।

কিন্তু পার্টি আমাকে বলল, আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে হবে, পার্টি অরগানাইজড করতে হবে। সেই সময় ছাত্ররা, শিল্পীরা, তাদের দেখে মনে হতো তারা ভিন্ন জগতের মানুষ। বড় বড় চুল, আধো আধো কথা, পরিষ্কার কথা না, কেমন জানি একটা ভাব নিয়ে থাকত। সেখানে কমিউনিস্টর পার্টি সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা এগুলো প্রচার করার জন্য আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে হয়। সেই সময় ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে আমি যখন আমার বাবাকে আর্টস্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা বলি প্রথম, তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এটাকে লোকে ভিন্ন ব্যাখ্যা করেছে– তিনি ধর্মীয় কারণে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু আমার একটা লেখা, তার মৃত্যুর সাতদিন পরে দৈনিক পাকিস্তানে বেরিয়েছিল, সেখানে কিন্তু আসল কারণটা বলেছি। তিনি বলেছিলেন, তুমি ছবি আঁকতে চাও, আমি প্যারিসে ছিলাম, সেখানে আর্টিস্টদের দেখেছি খুব অভাব, অনটন। তুমি আমার ছেলে, তুমি অভাব, অনটনে পড় এটা আমি চাই না। অতএব তুমি বি.এ. পাস করো, তারপর তুমি ছবি আঁক। যখন তিনি দেখলেন আমি আর্টস্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য খুব উতলা, তখন তিনি বললেন, তুমি আলীগড়ে চলে যাও। যখন দেখলেন, আমি ঢাকাতেই পড়তে চাচ্ছি, তখন তিনি বললেন, ঠিক আছে তুমি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠানে পড়ো। তিনি রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা শেষে তাঁকে কার্যনির্বাহী পর্ষদের সদস্য নিযুক্ত পত্র লিখেছিলেন। কিন্তু আমার তো উদ্দেশ্য আর্ট পড়া না। আমার উদ্দেশ্য হলো এখানে থেকে আন্দোলনের সাথে সক্রিয় কর্মী হিসেবে যুক্ত থাকা। যখন আমি খুব এডামেন্ট, তিনি দুদিন আমার সাথে কথা বললেন না। আমার বয়স তখন সতেরো। তিনি তারপরে যেটা করলেন, আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। প্যারিস থেকে তিনি যখন ফিরে আসেন, তখন ভারতীয় ছাত্র এসোসিয়েশন তাঁকে দুই খন্ড লুভর মিউজিয়ামের ছবির রঙিন রিপ্রোডাকশনের এলবাম প্রেজেন্ট করেছিল। তিনি যদি আর্ট লাভার না হন, তাহলে তাকে ওটা কেন দেবে! তাকে কলম দিতে পারত। চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করতে গেছেন সেইটা দিতে পারত। এবং ওই এলবামের মধ্যে বহু নগ্ন নারীর ছবি ছিল। এই বইটা উনি তার একটা ছোট্ট মেহগনি কালারের আলমারি ছিল, সেখানে তার মূল্যবান বইপত্র থাকত এবং সেটা তালা মারা থাকত। কিন্তু তিনি করলেন কী! তিনি আমাকে লাইব্রেরিতে নিয়ে সেই তালা খুললেন, খুলে বইদুটো বের করলেন এবং আমার হাতে দিয়ে বললেন, এই দুটো এতদিন আমার কাছে ছিল, আজ থেকে তোমার। এটা আমি লিখেছিলাম। সে জেনেশুনে, যেখানে অনেক নগ্ন নারীর ছবি আছে, তার অন্যান্য ছেলে, যারা যৌবনপ্রাপ্ত বা বিবাহিত, তাদের কিন্তু দেননি। কারণ হলো, তিনি এইটুকু বুঝেছিলেন ডিফারেন্ট বিটুইন ন্যুড এন্ড ন্যাকেড। তাদের কাছে এগুলো ন্যাকেড পিকচার। যেখানে কাম ভাব থাকবে। আর এই ছেলে, যে শিল্পচর্চার জন্য যাচ্ছে, তার কাছে ইট ইজ এ ন্যুড পেইন্টিং। অর্থাৎ সৌন্দর্য। তাতে বোঝা যায় আর্টের প্রতি তার একটা ভালোবাসা ছিল। দ্বিতীয় হলো, আমি কিন্তু স্কলারশিপে পড়িনি, আমি যখন ইতালিতে যাই, আমার বাবা কিন্তু আমাকে ইতালিতে পড়ার পয়সা দিয়েছেন। আমি কিন্তু স্কলারশিপে পড়িনি। আমি ছাপ্পান্ন থেকে আটান্ন সাল পর্যন্ত ফ্লোরেন্সে ছিলাম, সেই টাকাটা আমার পিতা বহন করেছেন। ফ্লোরেন্সে থাকাকালীন ওয়াশিংটন ডিসিতে নাইন পাকিস্তানি আর্টিস্ট বলে একটা একজিবিশন হয়েছিল। সেই একজিবিশনে পাকিস্তানের অবজার্ভার পত্রিকায় যাদের যাদের ছবি প্রশংসিত হয়েছে সেখানে আমার নাম ছিল। কিন্তু আমার নাম ভুল মুদ্রিত হয়েছিল। ওখানে মুর্তজা রশীদ লেখা হয়েছিল। তিনি অবজার্ভার পত্রিকার লেটার এডিটরে রিজয়েন্ডার দেন। সেখানে তিনি বলছেন যে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন যে আমার ছেলের ছবি প্রশংসিত হয়েছে। তবে তার নাম এখানে মুদ্রণ বিভ্রাট হয়েছে। তার নাম মুর্তজা রশীদ না, মুর্তজা বশীর। তবে তার আসল নাম এ. কে. এম বশীরুল্লাহ অর্থাৎ আবুল খয়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ। আবুল খয়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ এই নামটি তিনি বারবার ইনসিস্ট করতেন এবং আমি এই নামটাকে বাদ দিয়েছিলাম, কারণ আমি দেখেছিলাম, আমি সমাজে যা কিছুই করি না কেন, শহীদুল্লাহর ছেলে বলে আমাকে কেউ কিছু বলে না। আমি অত্যন্ত দুর্বিনীত, অত্যন্তু একরোখা ছিলাম। আমার মনে আছে আমি যখন ঢাকায় নবকুমার হাই স্কুলে ক্লাশ সেভেনে পড়ি, বৃটিশ আমলে, আমি বার্ষিক পরীক্ষায় সামনের বেঞ্চের এক ছেলের খাতা দেখছিলাম। তখন শিক্ষক আমাকে বললেন যে, তুমি খাতা দেখছ কেন খোকা? আমি বললাম, দেখলে কী হয়! বললেন, দেখলে কী হয় মানে! আমি খাতা তাকে দিয়ে দিলাম। কারণ, আমি জানতাম উনি আমাকে ফেল করাতে পারবেন না। কারণ আমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে। পরে দেখলাম, আমি অনেক কিছু অন্যায় করেছি। পার্টিশানের পরপর বগুড়াতে করোনেশন ইসস্টিট্যুটে আমি যখন পড়ি, তখন মুকুল ফৌজ মেয়েদের একটা মিছিল যাচ্ছিল। আমার বন্ধুরা বলল, তুমি সাইকেল দিয়ে মারতে পারবে? আমি মেরে দিলাম, একটা মেয়ে পড়ে গেল। সেখানে এক সবারেজিস্টারের বাড়ি ছিল, তিনি ঘটনাটি দেখে বললেন, খোকা, তুমি যা করলে অন্য কেউ হলে তোমাকে মারত। তোমাকে মারল না, তুমি শহীদুল্লাহর ছেলে। তোমাকে কে চেনে! লোকে বলবে, শহীদুল্লাহর ছেলেকে ধরে মারল। তো তোমার বাবা চিরদিন তো বেঁচে থাকবেন না, তখন তোমাকে কেউ রেহাই দেবে না। তখন শহীদুল্লাহকে আমার মনে হলো, সিন্দাবাদের ভূতের মতো, যে ঘাড়ের উপর বসে থাকে। আমি ভাবলাম, তাকে না ফেললে আমি দাঁড়াতে পারব না। আমরা ১৯৪৯ সালে ঢাকায় এসে পড়লাম। তো বাবার লাইব্রেরিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় ডাকপিয়ন অনেকগুলো চিঠি দিয়ে গেল, আমার বাবা ওগুলো দেখে একটা চিঠি ফেরত দিয়ে দিলেন। বললেন যে, এই নামে কেউ থাকে না। আমি বললাম, দেখি। বললাম, এটা আমার চিঠি। আমার বাবা অবাক হয়ে গেলেন। তোমার চিঠি! এ তো মুর্তজা বশীরের চিঠি! তুমি মুর্তজা বশীর কবে থেকে হলে! আমি বললাম, আমি আপনার নামে পরিচিত হতে চাই না। আমি আমার নামে পরিচিত হতে চাই। আমার বাবা শুনলেন। চুপ করে থাকলেন। এবং তখন পর্যন্ত আমার নামের বানান ম দীর্ঘ-উ কার ত রেফ জ আ কার লিখতাম (মূর্তজা)। উনি তখন বললেন, দেখ, মূর্খের বানান হয় ম দীর্ঘ-উ কার। কিন্তু তুমি তো বুদ্ধিমান। তুমি ম হ্রস-উ কার লিখবে(মুর্তজা)। তারপর থেকে ম হ্রস-উ কার লিখি। তারপর ধরো, পরবর্তীকালে যখন ষাট সালে লাহোর থেকে করাচিতে গেছি, আমার বাবা তখন করাচিতে উর্দু ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের চিফ এডিটর। তখন আমি তাকে বলেছি, আমার জন্য রঙ নিয়ে আসবেন। তিনি আমার জন্য রঙ নিয়ে আসলেন। যখন দেশের বাড়ি চব্বিশ পরগণায় গেছেন, ফিফটি ফাইভে, আমি তাকে চিঠি লিখেছি, আসার সময় কলকাতার চৌরঙ্গিতে জে,সি. লাহার দোকান থেকে আমার জন্য রঙ নিয়ে আসবেন। তিনি এনেছেনও।

রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে এই ধারণা আসলে খুবই ভুল যে, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চিত্রকলা পছন্দ করতেন না বা বিপক্ষে ছিলেন। আরেকটা যেটা শোনা যায়, সেটা হলো, নৃত্যকলার বিরুদ্ধেও কি উনার কোনো আপত্তি ছিল?
মুর্তজা বশীর: এইটা আমি বলতে পারব না। তবে এইসব ধারণার কারণ হলো তাঁর দাড়ি, তিনি নামাজ পড়তেন। এইটেই হলো তার মূল কারণ। আমি হায়াৎ মামুদকে বলেছিলাম, তুমি একটা চিঠি আমাকে দেখাও, যেখানে শহীদুল্লাহ উপরে লিখেছে– ‘এলাহী ভরসা’, ‘আল্লাহ ভরসা,’‘৭৮৬’– তুমি একটা চিঠি আমাকে দেখাও। কিন্তু আমি তোমাকে ভুরিভুরি চিঠি দেখাব রবীন্দ্রনাথের, যার উপরে ‘ওঁম’ লেখা। শুধু তাই না, শহীদুল্লাহ যখন প্যারিস থেকে ফিরে আসল, তার প্রথম কন্যার বিবাহ আটাশ সালে, সেই কার্ডের উপরে লেখা– ‘আল্লাহ জয়তু’। যেখানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’, ‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে’, কিংবা ‘এলাহী ভরসা’, সেখানে শহীদুল্লাহ লিখেছেন– ‘আল্লাহ্ জয়তু’। অনেকে তখন মনে করেছে, যেহেতু তিনি সদ্য প্যারিস-প্রত্যাগত, অতএব একটু আধুনিকতা। কিন্তু দেখা গেছে ১৯৩৭ অথবা ১৯৩৯ সালে আমার ছোটবোনের যখন বিয়ে হলো, তার কার্ডের উপরে লেখা ছিল ‘এক’। মানে আল্লাহ্ এক, রসুল এক। তখন তিনি ফুরফুরা পীর সাহেবের গর্দিনসিন খলিফা। ১৯৬২ সালে আমার বিয়ের কার্ডের উপরেও লেখা ছিল ‘এক’। তখন তো তিনি রীতিমত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। আমার ছেলের ও আমার মেয়ের বিয়ের কার্ডেও আমি ব্যবহার করেছি ‘এক’। লোকে আছে শুধু বাহ্যিক আচরণ নিয়ে। যেমন, একজন মুসলমান যদি দাড়ি রাখে, সে মৌলবাদী, একজন হিন্দু যদি দাড়ি রাখে, কেউ কিন্তু তাকে কন্ডেম করছে না। সবচে মজা হলো, বিদেশে দাড়ি রাখলে সে হচ্ছে ইন্টালেকচুয়াল। আর্টিস্ট টার্টিস্ট—ওদের বেশির ভাগেরই তো দাড়ি আছে। আমি যদি আমার পাড়ার মিলাদ মাহফিলের কোনো কমিটির সদস্য হই, তাহলে মৌলবাদী হয়ে গেলাম। কিন্তু একজন হিন্দু যদি পূজা কমিটির সদস্য হয়, তাকে কিন্তু আপনি কন্ডেম করছেন না। এই যে মানসিকতা, এটা খুব খারাপ। যেমন, আমি যখন কালেমা তাইয়েবা অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহর ছবি আঁকলাম ২০০২ সালে, আমাকে সবাই সমালোচনা করল। আমার বন্ধু কবি শামসুর রাহমান বললো, এনিয়ে সমালোচনা হবে। তিনি মিথ্যা কথা বলেননি, হয়েছেও তাই। ২০০৪-এ বইমেলায় হুমায়ুন আজাদের সাথে দেখা, আমাকে প্রথমেই বলল, আপনার মাথার টুপিটা কোথায়? আমি বললাম, টুপি কেন! বলে, অক্ষর টক্ষর দিয়ে আপনি কী একটা না করছেন! আমি বললাম, তাই! সে হাসে। এখন কথা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মধ্যে যে অক্ষরগুলো আছে, এগুলো তো ফর্ম। আমি সেই ফর্মগুলোকে সন্নিবেশিত করেছি। শুধু তাই নয়, আমি যেটা করেছি, আমাদের ট্রাডিশন বলতে যা বলি, আমাদের যে ঐতিহ্য, আমরা পাল যুগের চিত্রকলাকে নিচ্ছি, আমরা অজন্তার চিত্রকলা থেকে নিচ্ছি, আমরা মহাস্থান, ময়নামতী, বাসুবিহার ও মন্দিরের টেরাকোটা থেকে ও কালিঘাটের চিত্রকলা থেকে ফর্ম নিচ্ছি। কিন্তু দুইশ বছর যে এখানে বাংলার স্বাধীন সুলতানরা রাজত্ব করেছে, তাদের শিলালিপি এবং মুদ্রায় যে অক্ষরগুলো এসেছিল সেগুলো কিন্তু বাংলার মাটি থেকে উৎসারিত। তো সেটাকে আমি আমার ক্যানভাসে হুবহু নিয়েছি। কাইয়ুম চৌধুরী যেমন অক্ষর নতুন সৃষ্টি করেছে, আমি কিন্তু তা করিনি। আমি এই মুদ্রা এবং শিলালিপিতে যে অক্ষরগুলো, সেগুলোকেই আমি সন্নিবেশিত করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: ফলে এর মধ্যে ধর্মটর্ম খুঁজে পাওয়ার কোনো বিষয় নেই।
মুর্তজা বশীর: কিন্তু যেহেতু ধর্মীয় বিষয়, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ আমি লিখেছি, অতএব এটা কন্ডেম করে ফেলল। সবাই কন্ডেম করে ফেলল।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহর ব্যাপারে আরো বলা হচ্ছে তিনি মিলাদ পড়াতেন। মিলাদ হয়ত পড়াতেন। কিন্তু তার দ্বারা তো মৌলবাদ বোঝায় না। সেটা ধর্মীয় মানুষের পরিচয় বহন করে কিন্তু…
মুর্তজা বশীর: শোনো, আমি বলি, রবীন্দ্রনাথের যখন সত্তর বছর বয়স হলো, প্রবাসী পত্রিকায় ডিটেল এসেছিল, রবীন্দ্রনাথ তপস্বীর মতো বসে আছেন, এবং বৈদিক মন্ত্র পড়া হচ্ছে ও ধূপ, দীপ, শঙ্খ, দুর্ব্বাদল, চন্দন দিয়ে অর্ঘ্য দেয়া হয়। এই অর্ঘ্যসম্ভারপূর্ণ থালাগুলো কয়েকজন বালিকা তার নিকট নিয়ে গেলে তিনি স্মিত হাসি যোগে হাত দিয়ে সেগুলো স্পর্শ করেন। শহীদুল্লাহ যদি ধর্মকর্ম করেন তাতে আপত্তির কী আছে! কই, রবীন্দ্রনাথকে তুমি কন্ডেম করো না কেন! রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার ধারণা কিন্তু অন্য রকম। আমার ধারণা হলো, উনি হিন্দুদের লেখক। মুসলমানদের না।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই!!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ। আমি যুক্তি দিয়ে বলছি। উনি পাবনায় শাহজাদপুরে থাকতেন। তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে যেটা বলা হয় যে, তিনি মুসলমানদের সমাজ সম্পর্কে জানতেন না! সে জন্য তার লেখায় মুসলমান সমাজ আসেনি। কিন্তু আমার মত হলো, তিনি পাবনায় শাহজাদপুরে ছিলেন, তিনি শিলাইদহতে ছিলেন, তিনি পতিসরে ছিলেন এবং জমিদার হিসেবে তিনি দরিদ্র মুসলমানদের কাছ থেকে খাজনা নিচ্ছেন। তিনি তো নিজের চোখে দেখছেন মুসলমানদের দীনতা, অভাব-অনটন। এগুলো কি তার মনে কোনো রকম আলোড়ন তোলেনি!
রাজু আলাউদ্দিন: করেছে তো। সেই সময়ে তিনি যে ক্ষুদ্র ঋণ প্রবর্তন করলেন সেটা তো দরিদ্রদের দেখেই…..
মুর্তজা বশীর: কিন্তু তার লেখার মধ্যে সেটা কোথায়! সমাজের জিরো জিরো ওয়ান পার্সেন্ট, একটা জারজ সন্তান, গোরাকে নিয়ে তিনি বিরাট এক উপন্যাস লিখে ফেলছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি তো এই কথাও বলেছেন, আবুল ফজলকে লেখা চিঠিতে, মুসলমানের ঘরের খবর আমি তো জানি না, জানি না বলেই আমি লিখলে সেটা ঠিকমতো হবে না।
মুর্তজা বশীর: জানেন না মানে কী! আমার মনে হয় তাঁর এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি জানার আগ্রহ ছিল না। তাই এদের ব্যাপারে তিনি চুপ ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো ঘরের খবর না। মুসলমানের রান্নাঘরের খবর তো তিনি নিতে পারেননি।
মুর্তজা বশীর: তিনি কি গোরার রান্নাঘরে ঢুকেছিলেন? একটা বাস্টার্ড চাইল্ড, তার সম্পর্কে তিনি এতকিছু জানে কী করে! যেহেতু তার ইন্টারেস্ট গ্রো করেছিল, ইন্টারেস্ট গ্রো করার কারণেই তিনি জেনেছেন। তার কি কখনো ইন্টারেস্ট গ্রো করেছিল মুসলমারা এত দরিদ্র কেন!

রাজু আলাউদ্দিন: করেছিল তো। সে জন্যই তো তিনি ক্ষুদ্রঋণ প্রণয়ন করেন। তারপরে মুসলমান সাহিত্যিকদেরকে উনি উৎসাহ দিলেন যে তোমরা লেখ, লিখলে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে।
মুর্তজা বশীর: শোনো, আমি আরেকটা কথা বলতে চাই। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি ছিলেন না, তিনি হিন্দু ছিলেন। কী করে আমি বলি। ১৯১৭ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দ্বিতীয় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে বলছেন … “ হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাঙালী জাতি গড়িয়া তুলিতে বহু অন্তরায় আছে। বাঙালী হিন্দু বাঙালী মুসলমান ব্যতীত চলিতে পারিবে না। বাঙালী মুসলমান বাঙালী হিন্দু ব্যতীত চলিতে পারিবে না। চিরকাল কি এভাবেই যাইবে? জগতের ইতিহাস পৃষ্টে কি হিন্দু-মুসলমান মিলিত বাঙালী জাতি, ফরাসী, ইংরাজ, ইতালিয়ান, জর্মন, জাপানী প্রমুখ জাতির ন্যায় নাম রাখিতে পারিবে না? আশা কানে কানে গুঞ্জন করিয়া বলে পারিবে।” এটা তো রবীন্দ্রনাথের বলার কথা। এটা তো বিজ্ঞানী জগদীশ বসু আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বলার কথা। শহীদুল্লাহর এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো ৫৪ বছর পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান মিলে বাঙালি জাতির একটি ভূখন্ড স্বাধীন হওয়ার মাধ্যমে। শহীদুল্লাহ মুসলমান বলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি সংস্কৃত নিয়ে এম.এ. পড়তে পারেননি। তিনি মুসলমান বলে রামতনু লাহিড়ী অধ্যাপক পদে আসীন হতে পারেননি। শ্রীদীনেশচন্দ্র সেনের একটা চিঠিতে শহীদুল্লাহকে তিনি লিখেছেন যে শহীদুল্লাহ মুসলমান বলে তার চাকুরী হয়নি। একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন শ্রী সুকুমার সেন তার এক সাক্ষাৎকারে। এই বিভেদ ও বৈষম্য দূর করার জন্য তাই শহীদুল্লাহ চেয়েছিলেন বাঙ্গালী হিন্দু মুসলমান সরকারী ও বেসরকারী কোন জায়গায় ধর্মীয় না শ্রেণি বা গোত্র লিখতে পারবে না। তবে পারিবারিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় নাম ব্যবহার করা যেতে পারে। তাঁর এই প্রস্তাবনা পড়ে কাজী আবদুল ওদুদ মন্তব্য করেছিলেন তা হলে শহীদুল্লাহর নাম হওয়া উচিত পণ্ডিত বলিনারায়ণ। শহীদুল্লাহ বুঝতে পেরেছেন মুসলমানগন সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাদীক্ষায় অনেক পিছিয়ে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর সমকক্ষ হতে হলে তিনি ১৯১৮ সালে চট্টগ্রাম মুসলমান ছাত্র-সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে বলেন, “…কিন্তু কবে সেদিন হইবে, যেদিন আমাদের শিক্ষিত যুবকগণ আইন কলেজের ন্যায় মেডিকেল কলেজ, ইনজিনিয়ারিং কলেজ, এগ্রিকালচারাল কলেজ, আর্ট স্কুল, কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট, মাইনিং ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল স্কুল, ট্রেনিং কলেজ, ট্রেনিং স্কুল দলে দলে ভর্তী হইবে?” কেননা তিনি মনে করতেন “সমাজের জন্য ব্যারিষ্টার, উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, শিক্ষক, গ্রন্থগার, চিত্রকর, ইঞ্জিনীয়ার, ওভারসিয়ার, কৃষি, শিল্পী, বণিক–সকলেরই প্রয়োজন।” তাই তিনি গ্রামে গঞ্জে নৌকায় ও পালকিতে চড়িয়া শিক্ষার প্রয়োজনীতার উপর একজন ক্রিশ্চিয়ান মিশনারীর মত চষে বেরিয়েছেন। তাই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ম্যাগনাম ওপুস ODBL-এর মতো গ্রন্থ রচনার করতে পারেননি ঠিকই তবে সুনীতিবাবুর গ্রন্থের বহু পূর্বে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল অব দ্য ডিপার্টমেন্ট অব লেটার্স-এ ১৯২০ সালে শহীদুল্লাহ প্রকাশ করেন Outlines of the Historical Grammar of Bengali Language । তাঁর সম্পর্কে অনেকেই অভিযোগ করেন তিনি সুনীতিবাবুর মতো তেমন কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি, এমনকি সমাজে বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর যে-জ্ঞান ছিল তা তিনি পরিপূর্ণভাবে দান করেন নি। সেখানে তারা শহীদুল্লাহর ধর্মনিষ্ঠতাকে ইঙ্গিত করেছেন। তারা মনে করেন তিনি ধর্মকর্মে বেশি সময় দিয়েছেন । শহীদুল্লাহর একটা লেখায় আছে, তিনি বলছেন, স্কুলে একজন মুসলমান ছাত্র সে যখন পড়ে রাম ভালো ছেলে কিন্তু রহিম কেমন তা জানতে পারে না। সেই ছাত্রের মধ্যে হীনমন্যতা জন্মে। তাই শহীদুল্লাহ এই বৈষম্য ও হীনমন্যতা ঘোচাবার জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। এগুতে তাঁকে সময় দিতে হয়েছে। একটি জাতির সুসম গঠনে তিনি এই কাজগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। যদি গুরুত্বপূর্ণই না হবে তাহলে রবীন্দ্রনাথই বা কেন পাঠ্যপুস্তকের মতো শিশুকিশোরদের জন্য বহু বই লিখতে গেলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি কয়েকদিন আগেই ড. শহীদুল্লাহর একটা উক্তি স্ট্যাটাস হিসেবে দিলাম:” বৌদ্ধ, হিন্দু, খৃস্টান এবং মুসলমানদের মিলনভূমি হবে এই বাংলাদেশ”– এই জাতীয়।
মুর্তজা বশীর: এটা তো আটচল্লিশ সালের বক্তৃতা। পূর্ব-পাকিস্তান সাহিত্য-সম্মেলনের মূল সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে তা মালা-তিলক-টিকে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।…” । মজার কথা হলো এঁরা বাঙালি মুসলমানকে বাঙালি মনে করতেন না। শহীদুল্লাহ তখন ছাত্র। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে একটি লেখা পড়লেন ‘হেমচন্দ্রের দেশি নাম-মালা’। এটার কপি আমি এখনো পাইনি। বাকিগুলো সব জোগাড় করেছি। এটা কোথাও মুদ্রিত হয়নি বোধহয়। সেই সাহিত্য সভার সভাপতিত্ব করছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তো সমালোচনা হলো। কে একজন বলল, এগুলো চর্বিত চর্বণ। এমন কিছু নয়। তখন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলছেন, ‘লেখক একজন মুসলমান। এই সকল ভাষাতত্ত্বের আলোচনা তাঁহার পক্ষে শ্লাঘার বিষয়।… আমরা তাঁহার উদ্যোমে আ্নন্দিত… তাঁহাকে উৎসাহিত করা উচিত।
রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে মুসলমান হলে নিম্নমানের হলেও অসুবিধা নাই। মানে এমন লেখা কোনো মুসলমান লিখিতে পারে এটা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়।
মুর্তজা বশীর: শহীদুল্লাহর জীবনের প্রথম লেখা যখন রবীন্দ্রনাথের বোনের পত্রিকা ভারতীতে ৩৩শ বর্ষ, অষ্টম সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয় তখন সম্পাদিকা স্বর্ণকুমারী দেবী লেখেন… নিম্ন লিখিত ক্ষুদ্র প্রবন্ধটি একজন মুসলমানের লেখা।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, ‘মদনভস্ম’নামে একটি লেখা লিখেছিলেন। তারা দেখছে যে, একজন মুসলমান এত সুন্দর বাংলা লিখতে পারে, হিন্দুদের বিষয় নিয়ে তার দখল আছে, তাই অভিভূত হয়ে উনি লিখছেন।
মুর্তজা বশীর: কিন্তু তিনি প্রথমত বাঙালি, তারপরে তো মুসলমান! কিন্তু পবিত্র সরকার শহীদুল্লাহ প্রসঙ্গে এক আলোচনায় আমার ছবি আঁকার ঘটনাকে ইঙ্গিত দিয়ে দেখান যে যেহেতু তিনি ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান ছিলেন তাই আমার ছবি আঁকাকে সমর্থন করতে পারেননি। আমার সাথে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে তার সাথে দেখা হলে এই প্রসঙ্গের সূত্র এবং উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। তার এই চিন্তার প্রতিফলন দেখি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত সুনন্দন কুমার সেন রচিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জীবনীগ্রন্থেও, ওই ভুল ধারণারই প্রতিধ্বনি দেখতে পাই এতে। সেখানে উল্লেথিত হয়েছে তাঁর ধর্মীয় গোড়ামির জন্য আমাকে চিত্রশিল্পচর্চায় সম্মতি দিতে পারেননি। তাঁর অনড় ধর্মবিশ্বাসকে এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা রূপে চিত্রিত করা হয়েছে যা শহীদুল্লাহ-চরিত্রে কালিমা লেপন ছাড়া আর কিছু নয়।

এহসানুল কবির: এটা হলো হিস্ট্র্রি অব দ্য কনস্ট্রাকশন অব আইডেন্টিটি। আইডেন্টিটি নিয়ে পলিটিক্স।
মুর্তজা বশীর: বাংলাদেশ যখন হলো, আমি তো তখন ফ্রান্সে। বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান সম্মিলিত সবার জন্যে। আমি খুব দুঃখ পেলাম, একটা শিশু, যে হামাগুড়ি দিচ্ছে, কিংবা স্কুল গোয়িং যে শিশু, আমাদের দেশে এখনো প্রচলিত আছে, কোথাও গিয়ে কারো বাড়ি খুঁজতে গেলে বলে, ওই হিন্দুবাড়িটার পরে। বা ওই মুসলমান বাড়িটার পরে তার বাড়ি। আমি তখন বলেছিলাম, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান এই শব্দগুলো নিচের ক্লাশের বই থেকে মুছে দেযা দরকার। আজকে মুসলমানদের পবিত্র ঈদ। আমি তো জানিই কাদের পবিত্র ঈদ। আজকে হিন্দুদের দূর্গাপূজা। হিন্দু মুসলমান শব্দ বাদ দিয়ে দাও। আমি আরও বলেছিলাম, উনি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, এতে যে ছেলেটা গরিব এবং সম্ভ্রান্ত না, তার মধ্যে একটা হীনম্মন্যতা আসে। কিন্তু বইয়ে যদি লেখা থাকত, সে একটা গরিব কৃষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে, যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান বলত যে আমি খুব গরীব ছিলাম। এতে একটা গরিব ছেলে উদ্বুদ্ধ হয়। এইভাবে দেশকে গড়ার জন্য আইকিউ থাকার দরকার ছিল। সব থেকে দুঃখ লেগেছে যেটা, তেহাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু তখন জীবিত, পত্রিকায় ছবি আসল, বঙ্গবন্ধু স্যালুট নিচ্ছে, দুইদিকে সৈন্য, ওদের মধ্যে হিন্দু আছে, বৌদ্ধ আছে, চাকমা আছে, কুচকাওয়াজ হচ্ছে, অ্যারাবিয়ান ড্রেসে আলখাল্লা পরা এক হুজুর কোরআন শরিফ নিয়ে যাচ্ছে। কেন! হোয়াই! ছোটবেলায় ক্লাশ থ্রিতে স্কাউট হয়েছিলাম। আমি বয়েজ স্কাউট ছিলাম এবং আমার স্বপ্ন ছিল কিং স্কাউট হব। কিং স্কাউটের ব্যাজটা ছিল এমব্রয়েডারি করা রাজার মুকুট। তখন তো বৃটিশ আমল। আমি যখন কিং স্কাউটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, সে সময় দেশভাগ হয়ে গেল। পাকিস্তানে ওই কিং স্কাউটের নাম পাল্টে গেল। তখন আমি রাজনীতিতে ঢুকেছি। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য। আমরা বলছি ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়, সাচ্চা আজাদি লেনা হায়। এ আজাদি ঝুটা হায় লাখোকা ইনসান ভুখা হায়। যেহেতু পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ নিয়ে আমাকে দাঁড়াতে হবে, আমার ছোটবেলার যে স্বপ্ন সেই কিং স্কাউটে আমি পরীক্ষাই দিলাম না।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সাহেব ধার্মিক ছিলেন কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। অনেকেই তাকে ধর্মান্ধ হিসেবে প্রতিপন্ন করছে।
মুর্তজা বশীর: আমি তোমাকে আরেকটা কথা বলি। ১৯৫৮/৫৯ সালে আমি যখন করাচিতে আমার একজিবিশন করছি, আমার বাবা সেই একজিবিশনে আসছেন। তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন বগুড়ার হবিবুর রহমান। উনি ওপেন করেছেন। অ্যামেরিকান ফ্রেন্ড অব দ্য মিডিলিস্ট, আমেরিকার একটা অর্গানাইজেশন, ওটার ডাইরেক্টর ছিল মিস্টার ওয়াটসন। সেখানে কিন্তু ককটেল সার্ভ হচ্ছে। মদ সার্ভ হচ্ছে। শহীদুল্লাহ সেখানে দাঁড়িয়ে। এবং মজাটা হলো, উনি একজিবিশনে ঢুকলেন, পকেটে তার কাপড়ের জায়নামাজ থাকত, চারিদিকে পেইন্টিং নারীমূর্তি ইত্যাদি। তিনি দেখলেন এক জায়গায় একটি ছবি স্টিললাইফ যেখানে কোনো নারী কিংবা জীবজন্তুর ছবি নেই। উনি ওখানে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাপড়ের জায়নামাজটা বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। আমার লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেছে। লোকে কী ভাববে যে আমি একটা গোড়া মুসলমানের ছেলে! আমি তো আধুনিক। ইতালি থেকে আসছি। তিনি যদি ধর্মান্ধ হবেন তাহলে আমার একজিবিশনে গেলেন কেন!

রবীন্দ্রনাথ বাঙালি ছিলেন না, তিনি হিন্দু ছিলেন

রাজু আলাউদ্দিন: তিনি যদি চিত্রকলার বিরোধীই হতেন তাহলে সেখানে গেলেন কেন!
মুর্তজা বশীর: তিনি আমার একজিবিশনে গেলেন কেন! তিনি আমার জন্য রঙটঙ এনে দেন কেন! এবং পত্রিকায় যদি আমার কথা বেরোয়, উনি কেন এটা পড়েন! ১৯৬৯ সালে উনি যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন ডক্টর এনামুল হক..
রাজু আলাউদ্দিন: লেখক ডক্টর এনামুল হক? যিনি সুফি দর্শন নিয়ে লিখছেন? তারপর আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য নিয়ে লিখছেন?
মুর্জতা বশীর: হ্যাঁ হ্যাঁ। সে তাকে হসপিটালে দেখতে গেছে। হি ওয়াজ ইন এ ডেড বেড। তো আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে– এনাকে চেনেন? মুর্তজা বশীর। হি ইজ এ ফেমাস আর্টিস্ট। আমাকে চিঠিপত্র লিখেছে, মুর্তজা বশীর আর্টিস্ট। তার পরিচয়ে আমি কখনো সম্মানিত বোধ করতাম না। কিন্তু উনি মারা যাওয়ার সাতদিন পরে দৈনিক পাকিস্তানে আমার একটা আর্টিকেল বেরুলো, আমার বাবা ও আমি। শামসুর রাহমান আমাকে বলল, দেখেন, আপনার বাবাকে সবাই খন্ডিতভাবে দেখেছে। কেউ ধর্মের দিক থেকে। কেউ সাহিত্যের দিক থেকে। আপনি তো আপনার বাবাকে দেখেছেন। আপনি লেখেন। তো প্রথম লাইন যেটা, অনেকেই ভেবেছে এত ঔদ্ধত্য কেন! প্রথম লাইন ছিল: লোকে আমাকে বলুক আমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র মুর্তজা বশীর, আমি কখনো চাইনি। লোকে বলুক মুর্তজা বশীরের পিতা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এবং এই আর্টিকেলে আমার মদ্যপানের কথা আমি লিখেছি। সবই লিখেছি। তবে লাস্টের লাইন পড়ে অনেকের চোখে পানি এসে গিয়েছিল। “আজ আমি যতই চিৎকার করে বলি না কেন আমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লার পুত্র মুর্তজা বশীর, তিনি এখন শুনতে পারবেন না।”
রাজু আলাউদ্দিন: ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যখন প্যারিসে গবেষণা করছিলেন, তার তখনকার জীবন সম্পর্কে জানেন কিছু? উনি কিছু বলেছেন?
মুর্তজা বশীর: না। তবে লেখালেখিতে পড়েছি, এটা সমালোচনার জন্য লেখা, তিনি কিশোর নিয়ে যেতেন। তার এই কিশোর নিয়ে চলাফেরা করার প্রতি অনেকে খারাপ ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমি অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটা লেখায় পড়েছি, তিনি প্যারিসে গিয়ে শহীদুল্লাহকে বললেন, শহীদুল্লাহ সাহেব, স্বরাজ তো আসছে! তখন শহীদুল্লাহ সাহেব বললেন, কৃষকদের কী হবে! মানে ওদের স্বরাজ হবে কি না।
রাজু আলাউদ্দিন: সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীরা শহীদুল্লাহ সাহেবের ধর্মাচার নিয়ে কী ধারণা পোষন করতেন?
মুর্তজা বশীর: তিনি যে ধর্মকর্ম করতেন এটার জন্য তিনি অপ্রগতিশীল হিসাবে পরিচিত ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কি মনে হয় এখানকার লেখক এবং বুদ্ধিজীবীরা এই ভুল ধারণা নিয়েই আছেন?
মুর্তজা বশীর: আমার মনে হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?
মুর্তজা বশীর: তুমি দেখ, বাংলাদেশে কেউ শহীদুল্লাহকে নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি আমার জানা মতে। কিংবা করছে না। তবে পশ্চিমবঙ্গের দুইজন শহীদুল্লাহ সম্পর্কে গবেষণা করছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কে কে? নাম বলবেন?
মুর্তজা বশীর: আকিকুল ইসলাম এবং অনিরুদ্ধ আলি আক্তার।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশে তাকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি?
মুর্তজা বশীর: আমার জানা মতে হয়নি। হতেও পারে। আমার জানা নেই। শহীদুল্লাহর কাজের উপর কোনো গবেষণা, পিএইচডি আমার জানা মতে কেউ করেনি। এরা দুজন করছে, একজন করছে শহীদুল্লাহর ধর্মীয় দিকটা। আরেকজন করছে বাংলা সাহিত্য নিয়ে। দুজনই আমার দেশের বাড়ি ২৪ পরগনার চন্দ্রকেতুগড় শহীদুল্লাহ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা ব্যাপার, এটা অথেনটিক কি না আমি জেনে নিচ্ছি, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটা নামাজে ইমামতি করেছিলেন, যেই নামাজে নারীরা সমবেত হয়েছিল।
মুর্তজা বশীর: এই নামাজটা হয়েছিল কার্জন হলে। বেগম সারা তৈয়ফুরের লেখায় আছে, কেউ মেয়েদের জামাতের ইমামতি করতে চায় নি। তখন শহীদুল্লাহ নিজে গিয়ে বললেন, আমি ইমামতি করব। উনি যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন তার পেছনে লম্বা পর্দা ছিল যাতে দেখা না যায়। উনি ইমামতি করেন এবং সারিবদ্ধভাবে ছিল মহিলারা।
রাজু আলাউদ্দিন: এ তো একটা রেভ্যুলেশন।
মুর্তজা বশীর: যেখানে বলা হচ্ছিল, মুরব্বিরা বলছিল, মেয়েদের জামাতে ইমামতি করা যাবে না, সেখানে শহীদুল্লাহ বলল, আমি করাব। তিনি একটা পর্দা টাঙিয়ে দিলেন যাতে মহিলাদের দেখা না যায়। উনি নামাজ পড়ালেন। আামার বিয়ে তিনি পড়িয়েছেন। আরবিতে খুতবা পড়ে তারপর বললেন, তোমাকে কী পড়ালাম এটা তো তোমার বোঝা উচিত। কী দায়িত্ব দেয়া হলো। অতএব তিনি আবার পুরা বাংলায় তরজমা করলেন। যে কারণে আমার স্ত্রীর চিকিৎসা চলাকালে বারডেম হসপিটালের লোকজন বলত, অ্যাপোলোতে বলত, আপনি আপনার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসেন তাই না? আমি বলতাম, না, আমি আমার কর্তব্য পালন করছি। এটা আমার দায়িত্ব। তার অসুখ, তার চিকিৎসা করা আমার দায়িত্ব। এখন আমি সমস্যায় পড়ে গেছি। যেহেতু আমি ধর্মে বিশ্বাসী, তাই বলছি, সে কখনো দেনমোহর মাফ করে নাই বা এই বিষয়ে কিছু বলে নাই। আমিও কিছু বলিনি যে আমাকে মাফ করে দাও। নয়ত আমি তাকে বদলি হজ করালাম প্রায় চার লাখ টাকা দিয়ে, তখন কিন্তু আমি বলতে পারতাম, আমি তোমার দেনমোহরের টাকা দিয়ে করালাম। এখন আমি বহু সমস্যায় পড়ে গেছি। এই দেনমোহর কিন্তু কখনো মাফ হয় না। এবং যদি ডিভোর্সও হয়, তবু মাফ হয় না। তার প্রাপ্য। আমি দেব কিভাবে! সে তো মারা গেছে। এখন সমস্যায় পড়েছি, আমার সময় দেনমোহর ছিল দশ হাজার টাকা।

রাজু আলাউদ্দিন: তবে আপনার কি এটা মনে হয় না যে আপনি যদি তাকে দুঃখ দিয়ে না থাকেন, মৃত্যুর আগে এই যে সেবাযত্ন করলেন, এখন পরকালে আল্লাহ তায়ালা যদি জিজ্ঞেস করেন, উনি কি দেখবেন না যে আপনি স্বামী হিসেবে যে কর্তব্য পালন করেছেন সেটা দেনমোহরের অধিক।
মুর্তজা বশীর: না। দেন মোহর মাফ হয় না। আমার স্ত্রীর যদি আমার থেকে ডিভোর্স হয়ে যেত তবু তাকে দেন মোহর দিতে হতো। তার প্রাপ্য। এটা তখনো মাফ হবে না। তো আমার সময় তো দশহাজার ছিল। তখন সোনার ভরি আশি টাকা। আমার বাবার বিয়েও কিন্তু দশ হাজারে হয়েছে। ১৯১০ সালে। তখন তো দশ হাজার মানে অনেক টাকা। আমার ভাইদেরও দশ হাজার। এই জন্য যে আমার বাবার যেহেতু দশ হাজার তাই আমাদেরও দশ হাজার। আমি টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম যে, দশ হাজারকে যদি সোনা দিয়ে হিসাব করতে হয় তবে এই সময়ে প্রায় চল্লিশ/পঞ্চাশ লাখ টাকা দিতে হবে। তো আমি এক হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম। এক হুজুর বলল, আপনি যা পারেন দেন। আরেকজন কিন্তু সুন্দর কথা বলছে। ওই দশ হাজারই আপনাকে দিতে হবে। তবে আপনার ওয়ারিশকে দান করতে হবে। আপনার এক ছেলে দুই মেয়েকে দান করতে হবে। তারা যদি ফকির টকির খাওয়ায় সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু আপনি ওই পয়সা দিয়ে কিছু করতে পারবেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সাহেব তো ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা, ধর্মের বহিরাঙ্গিক চর্চা– এই রিচুয়ালকে উনি তো সাঙ্ঘাতিক রকমের সমালোচনাও করেছেন। বহু সমালোচনা করেছেন। অনেক জায়গায় উনি বলেছেন যে, এই যে তসবি পড়া হচ্ছে, ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে, এগুলো করার চেয়ে মানুষের সেবা করা, সৃষ্টির সেবা করাটা অনেক বেশি উত্তম।
মুর্তজা বশীর: এটা আছে। সে বলেছে, “আজকাল ওয়াজ মাহফিলের ধুম পড়ে গেছে।” ধুম শব্দটা আছে। বলেছেন, “এখানে এই যে এত গরিব– এটাই তো হাবিয়া দোজখ।” হি ওয়াজ এ ভেরি মডার্ন ম্যান। নাউ আই ফিল প্রাউড যে আমি তার পুত্র। আগে কিন্তু ফিল করতাম না।
রাজু আলাউদ্দিন: রবীন্দ্রনাথের সাথে তো শহীদুল্লাহ সাহেবের দেখা হয়েছিল..
মুর্তজা বশীর: রবীন্দ্রনাথের চিঠি আছে তাকে লেখা।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, চিঠি তো আছেই। এবং কাজী নজরুল ইসলামকে বোধহয় রবীন্দ্রনাথের সাথে উনি পরিচয় করিয়ে দেন। সাথে করে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের খুবই অনুরাগী ছিলেন তিনি।
মুর্তজা বশীর: শহীদুল্লাহ রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। ছোটবেলায়, আমার মনে আছে, আমি যখন সিক্স সেভেনে পড়ি, রবীন্দ্রনাথের ছবি ছিল আমাদের বাড়িতে। আমার মা বলতেন, এটা কার ছবি বল তো? দেখে মনে হতো আমার বাবার মতোই, বাবড়ি চুল, দাড়ি। আমি বলতাম, কেন, এটা তো বাবু। বলতেন, না না। এটা রবি ঠাকুর। আমরা বাবাকে বাবু বলতাম। উনি যখন বগুড়ায় আযিযুল কলেজের অধ্যক্ষ তখন তাঁর কাছে আসা ছাত্ররা, অধ্যাপকরা তাঁর কথা জিজ্ঞেস করলে বলতাম, বাবু। তারা ভাবতেন আমি বাসার চাকর। উনি রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। এবং সবচে’ মজা হলো, শান্তিনিকেতন যখন গঠিত হলো, রবীন্দ্রনাথ আমার বাবাকে চিঠি লিখেছেন “আমি শান্তিনিকেতন গঠন করছি, তো কার্যনির্বাহী পরিষদে আপনাকে সদস্য করেছি।” এটা অনেকেই জানেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: ডক্টর মুহম্মাদ শহীদুল্লাহর প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনেক শ্রদ্ধা ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মুর্তজা বশীর: রবীন্দ্রনাথ চারটে চিঠি তাঁকে লিখেছিলেন। আমার সংগ্রহে আছে সেই চিঠিগুলো।
রাজু আলাউদ্দিন: ড. শহীদুল্লাহ সংস্কৃতির নানা শাখায় যে এতসব কাজ করেছেন, আপনার কি মনে হয় মানুষ এসব মনে রেখেছে? বর্তমান পরিস্থিতিতে শহীদুল্লাহকে মানুষ মনে রাখবে বলে কি আপনি মনে করেন?

মুর্তজা বশীর: ১৯৬৯ সালে তার মৃত্যুর একদিন কি দুদিন আগে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার শেষের পাতায় হেদায়েত হোসেন মোর্শেদের একটি লেখা বেরিয়েছিল। লেখাটা ছিল শহীদুল্লাহর সাথে দেখা করার অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। সেখানে শহীদুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি জাতির উদ্দেশ্যে কিছু কি বলবেন। তিনি অকুণ্ঠচিত্ত যে-কথাটি বলেছিলেন তা তার আজীবনের সাধনা বাংলা ভাষায় নয়, ইংরেজিতে: “I will be forgotten very soon.”

বি.দ্র. সাক্ষাৎকারটি শিল্পী কর্তৃক ইষৎ পরিমার্জিত রূপটি ২৮ মে ২০০১৮ সালে রাত ৮:৩০ মিনিটে আপলোড করা হয়েছে।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে

Flag Counter


10 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    অসামান্য আলাপ, জরুরী আলাপ। অভিনন্দন রাজু ভাই।

  2. সাক্ষাৎকারটি পড়ে যে খুব সমৃদ্ধ হলাম, তেমন একটা মামুলি কথা বলতে চাই না৷ বরং বলব, মনে অনেক রকমের বিচ্ছুরণ ঘটল৷ সেটা যে ঠিক রঙের তা নয়, বলা উচিত আলোর৷ অর্থাৎ ভাবনার আলোর বিচিত্র বিকিরণ ঘটল মনের মধ্যে৷ আসলে ইসলামী সমাজের সঙ্গে তো আমাদের কোনও নিবিড় যোগাযোগই নেই৷ তাই আমাদের চিন্তাগুলি বড় একপেশে৷ দুটি ধর্মের লোক একই ভাষায় কথা বলছে, কিন্তু তাদের সমাজ আলাদা আলাদাই রয়ে গেল এটা হঠাৎ অনুভব করলাম৷ ভাবিনি এর আগে এই কথা৷ ভাবাল তো বটেই৷ এই যে বিপরীত ভাবনার স্রোত, এর কোনও চিহ্ন দেখলেই বেশ চনমনে লাগে, মনকে যা ভাবায় সেই দিকেই তো মন ধাবিত হয়! বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিগূঢ় কথা নিয়ে কিছু জানা হল না, বোঝা হল না, এটা একটা খুব খেদ রয়ে গেল৷আর সেটা অনুভব করলাম এই সাক্ষাৎকারটি পড়ে৷

  3. Nurita says:

    ভালো লাগলো কি না তা বলা মুশকিল। ভালো লাগানো খুব সহজ কাজও নয়। সবকিছু ভালোও লাগে না আবার সব ভালো লাগাও ভালো লাগায় থেমে থাকে না। কোনো কোনো ভালো লাগা চিন্তার খোঁড়াক বৃদ্ধি করে নিজেকে ছাড়িয়ে চলে যায় সমৃদ্ধির পথে। তখন তা আর ভালো লাগায় থাকে না, আনন্দ হয়ে যায়।

    আনন্দের কাজ হচ্ছে, মগজে ভাবনার দানা বুদবুদ সৃষ্টি করে অন্যের যুক্তিভাবনাকে গ্রাহ্য অগ্রাহ্য করার শক্তি প্রদান করা। আর এই শক্তি উৎপাদিত হয় মগজিয় যজ্ঞের মাধ্যমে। তখন ভাবনার সব ইন্দ্রনগর আনন্দযজ্ঞে নিমজ্জিত থাকে। এই সাক্ষাতকারটি তা সহজে সৃষ্টি করেছে। গৃহিতা এবং প্রদানকারী উভয়ের প্রতি আমার আদিগন্ত শ্রদ্ধা, প্রণতি।

    এমন একটি কপাল খাওয়া আত্মঘাতী জাতিকাল আমরা অতিক্রম করছি সেখানে এই সাক্ষাৎকারটির প্রকাশ খুবই গুরুত্ববহ। আমরা এক পতাকা, এক মানচিত্র, এক ভাষী হলেও আমাদের সমাজমানস এক নয়। বিভাজিত হয়ে আছি ধর্মীয় খণ্ডে। টুকরো টুকরো হয়ে আছি দৃষ্টি ও জ্ঞানের অগভীরতায়। তেমন সমাজে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ নিয়ে গবেষণা কে করে! কেন করবে! তাঁকে নিয়ে ঘাটলেই তো হয় মুসলমান, না হয় বাঙালি হয়ে যেতে হবে ! কিন্তু আমরা কোনোটাই প্রকৃত অর্থে নই বলে দুটো বিষয় নিয়েই আমাদের আস্ফালন বেশি। ঠিক যেমন, ‘অল্প পানির পুঁটির দ্যাও / পুঁটি না বোঝে বাই আর স্যাঁও’ (গভীর জলের বৃহৎ মাছের চেয়ে অগভীর জলের ক্ষুদ্র মাছ ফড়ফড় করে বেশি) অর্থাৎ ফাকা কলস বাজে বেশি। জন্মকালের আগেই আমরা শিশুর নাম রাখতে ব্যস্ত থাকি ধর্ম অক্ষুন্ন রেখে। সেখানে বেঙ্গলিজম দূর কি বাত, ভূমিষ্ঠ মাত্রই অবুঝ শিশুর কানে বলে রাখি তোমার ঈশ্বর অমুক। শিশু চিনুক না চিনুক, বুঝুক না বুঝুক ধরিয়ে দেই ধর্মবিশ্বাস। তো কোথায় সে পাবে বাঙালি হওয়ার সংস্কৃতি! খাদ্যে? ভাষায়? পোশাকে? মননে? -কোনোটাও কি আর বাকি আছে কনভার্টেড হতে! এখনকার শিশুরা কি চেনে কোনটা খুদ, কোনটা ছাতু, কোনটা মুড়কি? কিন্তু একই উপাদানে তৈরী অথচ খাদ্যগুণে কম পরিস বলুন ওটস বলুন, নুডুলস বলুন, পাস্তা বলুন সেসব স্যাটাস্যাট ঘ্যাটাঘ্যাট বলে দিবে চোখ বুঁজে। ভাষা তো এখন জরুরী, সেটাই যা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নতি করতে শেখায়। এর জন্যেও তো ‘ইশকুল খুইলাছে রে মওলায়…’। পোশাক তো এখন রঙে বাহারে দিবস উদযাপন করলেও আলমারিতে ঝিমায়, দুইদিনের বাঙালি পহেলা বৈশাখে পান্তা খায়। মননে আর বাঙালি হবে কিভাবে যে দেশের ঘরে ঘরে টিভিতে চলে ভিনদিশি সিনেমা, নাটক, খেলা! তাছাড়া মননে বাঙালিগিরি করার টাইমও নাই। খোকা ঘুমালো, বড়ও হলো, বিদেশে গেলো চলে।

    এই দেশে শহীদুল্লাহ্ নিয়ে গবেষণা করার কোনো সুযোগ কি রাখা হয়েছে! ছোটবেলায় এক দাদুকে দেখতাম। তিনি ভারত থেকে আসতেন, সাথে প্রতিবার কোনো না কোনো কিশোর থাকতো। পথে ঘাটে দাদুর অজুর পানি, গামছা ধোয়া, পোশাক-তেল-পানি এগিয়ে দেওয়াই ছিলো কিশোরের কাজ। তাছাড়া দীর্ঘ ভ্রমণ আর রাস্তায় তো সহযোগী সঙ্গীও লাগে। তো এটা তো এক সময়ের বৃদ্ধরা করতোই। সেখানে যার যার লিঙ্গ নিম্নমানের কাজ করে অভ্যস্ত তারাই হোমোজাতের চিন্তা আনতে পারে মাথায়। যার মনে যা ফাল দি ওঠে তা। যেমন বর্তমানে কলকাতার এক বেস্ট সেলার তকমাধারী লেখক রবিবাবুর কর্মের চেয়ে রবি-লিঙ্গের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে আর সহকারী থেকে শুরু করে বৌ, বৌদি সবাইকেই নিয়ে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের কল্পনার গরুকে আকাশে ঘাস খাওয়াচ্ছেন। এসব কারা প্রকাশ করে? পার্ভার্টেডরা করে। যাদের যৌনতায় কোনো এথিকস নেই, ব্যক্তিত্ব নেই এবং পরিমিতি বোধ নেই। শহীদুল্লাহর মতো জাতির ঐতিহ্য রত্ন নিয়েও তারা ওসব বিকৃতি ছড়াতে পারে আমাদের সমাজে। কারণ, আমরা না বাঙালি না হিন্দু না মুসলমান। কোনোটাই প্রকৃত নই। প্রকৃত বাঙালি হলে আমাদের মাঝে গুরুভক্তির চর্চা মননে থাকতো।

    আর এতসব কারণেই রবিবাবু গোড়া লিখে আমাদের আত্মপরিচয়ের গোড়াকেই মজবুত করার প্রয়োজনীয়তাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। জারজ দিয়ে কাহিনী বানিয়ে তিনি নিশ্চয়ই ভুল করেন নি। কোনো লেখাই তিনি হিন্দুর জন্য লেখেননি, মুসলমানের জন্যও না। কারণ, তিনি তো স্পষ্টই বলেছেন, ‘…রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি’। রবিবাবুকে বাঙালির ঈশ্বর ভেবে সব বিষয়ে তাঁর লেখা নাজিল আশা করাটাও কিন্তু পুঁটি না বোঝে বাই আর স্যাঁও। কেন তিনি লিখলেন না এমন প্রশ্ন রাখাটাও খুবই মর্মান্তিক। সৃষ্টিশীল মানুষকে কখনই এমন প্রশ্ন করা সমীচীন কি? মুর্তজা সাহেব নিজে যেসব বিষয়ে ছবি আঁকেননি তাঁকে যদি বলা হত কেন তিনি অমুক বিষয়ে ছবি আঁকলেন না, কেন ভাবলেন না, কেন জানলেন না -তাহলে উত্তরটা কেমন হতো!

    রবি ঠাকুরকে নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কোণঠাসা-বিভাজন করাটাও এক ধরনে মুরুব্বী গুস্তাফি বা গুরু অভক্তির লক্ষন।
    রবি ঠাকুরই যদি সব লিখবেন তাহলে আর লেখক না জন্মালেই পারতো! কিন্তু তিনি তো ‘অচল আয়তন’, ‘তাসের দেশ’-এরও লেখক। নয় কি! তাই দয়া করে এ জাতীয় কথা প্রকাশের আগে সমাজ-মানস ভেবে দেখবেন।

  4. একটি দরকারি সাক্ষাৎকার!
    এই সাক্ষাতকারের পিঠে বাঙালি ও বাঙালি মুসলমানদের নৃতত্ত্ব নিয়ে শহীদুল্লাহর সুনির্দিষ্ট মন্তব্যটি যুক্ত করছি :

    “এ দেশের অধিংকাশ মুসলমান যে পূর্বে হিন্দু বা বৌদ্ধ ছিল, তাহা নিশ্চিত।” [শহীদুল্লাহ, বাংলা সাহিত্যের কথা, প্রথম খণ্ড, প্রাচীন যুগ, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৩, মাওলা ব্রাদার্স সংস্করণ ২০০৬, পৃ. ১৯]

    এছাড়া, বাংলা সংস্কৃতির পারস্য বিস্তার সম্পর্কে তাঁর উক্তিটিও সাংঘাতিক। তিনি বলেছেন :
    “বৌদ্ধগানগুলিই [চর্যাপদ] পরবর্তী কালের বৈষ্ণব মহাজন পদাবলী ও মুসলমানি মারফতী গানের পূর্বরূপ (proto-type)। এক সময়ের নাথগণের চর্যাগীতিসমস্ত ভারতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। পারস্য গজলগীতিরও পূর্বরূপএই চর্যাগীতি। [প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮]

  5. Sorry for writing in Bangla as my device does not permit me at the moment. Enjoy it!

  6. আব্দুল কুদ্দুছ says:

    শহীদুল্লাহকে নিয়ে গবেষণা করার সদিচ্ছা, পরিশ্রম ও যোগ্যতা বাঙ্গালী মুসলমানের নাই; উনারা গবেষণা করবেন ববিতা, রাজ্জাক, রাম, শ্যাম, যদু, মধুদের নিয়া!

  7. মানিক বৈরাগী says:

    এই সাক্ষাতকারটি আমার জন্য খুব জরুরি ছিল।জ্ঞ্যানতাপস সম্পর্কে আমার জানার পরিধি খুব নগন্য।
    রাজু ভাইকে অনেক ধন্যবাদ।
    আর শিল্পীকে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

  8. Nasser says:

    The interview has been taken by someone unlike other intellectuals, many of whom are blindfolded and don’t want to see the truth. With thanks

  9. সাফিনাজ says:

    লেখাটা মিশ্র লাগল। ভাল লাগল ড. শহীদুল্লাহ সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানলাম আবার পড়ার পর থেকে একটা প্রশ্নই শুধু মাথায় ঘুরছে ‘হিন্দুদের জীবন নিয়ে কোন মুসলমান লেখক কি তেমন কিছু লিখেছেন?”

  10. Nazir Khan says:

    Very glad , many things that we wouldidn’t know. Research must have to be done what is being done in west Bengal, India, though he was born there. He was a good Muslim but not communal at all.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.