অনুবাদ

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চোখে সালভাদোর আইয়েন্দের মৃত্যু

এনামুল হাবীব | 14 Dec , 2017  

মূল: গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

অনুবাদ: এনামুল হাবীব

Allendeচিলির সান্তিয়াগোর লা মনেদা প্রাসাদে চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আইয়েন্দের মৃত্যুর ৪৫ বছর গত হয়েছে, যে প্রাসাদে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে আইয়েন্দে ফিদেল কাস্ত্রোর উপহার দেয়া AK-47 রাইফেল দিয়ে নিজেকে প্রতিরোধের শেষ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সালভাদর আইয়েন্দের মৃত্যুর (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩) পর নিউ স্টেটম্যান্ট জার্নালে ১৯৭৪ সালের মার্চে নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস চিলিতে আইয়েন্দের উত্থান, তার বামপন্থী পপুলার ইউনিটি পার্টির রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরের বুর্জোয়া দল ও সামরিক বাহিনীর একাংশের সাথে আইয়েন্দেকে উৎখাতে সিআইয়ের গোপন আঁতাত আর রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একনায়ক সামরিক জেনারেল আগাস্তো পিনোচেট-এর ক্ষমতা দখল নিয়ে যে ইতিহাসভিত্তিক সাড়া জাগানো প্রবন্ধ লিখেন তারই নাম – The Death of Salvador Allende। বি.স.

১৯৬৯ সালের শেষের দিকের ঘটনা। পেন্টগনের তিনজন জেনারেল ওয়াশিংটনের কোনো এক শহরতলীতে চিলির পাঁচজন মিলিটারি অফিসারের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত। আমন্ত্রিত এই পাঁচজন অতিথির মধ্যে অন্যতম ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্ণেল হেরার্দো লোপেস (আমেরিকায় চিলির সামরিক মিশনের সহকারী বিমান এটাশে)। অন্যান্য অতিথিরা লোপেসেরই সহকর্মী। মধ্যাহ্নভোজটি যার সম্মানে আয়োজন করা হয়েছে তিনি চিলির বিমান একাডেমীর পরিচালক জেনারেল কার্লোস তরো মাসোতে, মাত্র একদিন আগে আমেরিকায় এক শিক্ষা সফরে মেসোত হাজির হয়েছিলেন। আটজন অফিসার অধিকাংশ কথাবার্তাই বলছিলেন ইংরেজিতে। আলোচনা মূলত কেন্দ্রীভূত ছিলো একটি মাত্র বিষয়ে: চিলিতে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ভোজসভার শেষের দিকে পেন্টাগনের একজন জেনারেল প্রশ্ন করলেন, বামপন্থীদের মনোনীত কোনো প্রার্থী, ধরা যাক সালভাদোর আইয়েন্দে, নির্বাচনে জয়ী হলে সেনাবাহিনী কী ভূমিকা নেবে। জেনারেল মাসোতে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, আমরা আধ ঘন্টার মধ্যে মনেদা প্রাসাদ দখল করে নেবো। এজন্য যদি ঐ প্রাসাদ জ্বালিয়ে দিতে হয়,তবু।

আমন্ত্রিত ঐ অফিসারদের মধ্যে একজন ছিলেন জেনারেল এর্নেন্তো বায়েসা যিনি পরে চিলির জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালক ছিলেন। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে যে ক্যু হয় তার অন্যতম নির্দেশদাতা ছিলেন এই বায়েসা। তার অধস্তন যে দুজন লোক ঐ সময়ে বিশেষভাবে আলোচিত হন, তারা হলেন জেনারেল আগাস্তো পিনোচেট আর জেনারেল হাভিয়ের পালাসিও। ঐ মধ্যাহ্নভোজে আরো ছিলেন এয়ারফোর্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সের্হিও ফিগেরোয়া গুতিয়েররেস আর এয়ারফোর্স জেনারেল গুস্তাবো লেই। এই গুস্তাভো লেই মানেদা প্রাসাদের উপর রকেট হামলার নির্দেশ দেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের শেষজন ছিলেন এডমিরাল আর্তুরো ত্রোঙ্কোসো, যিনি নৌবাহিনীর মধ্য থেকে সমস্ত প্রগতিশীল অফিসারদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। ১১ সেপ্টেম্বরের সামরিক অভ্যুথানের অন্যতম নায়ক ছিলেন এই আর্তুরো ত্রোঙ্কোসো।

পেন্টাগন আর চিলির সামরিক বাহিনীর পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যকার এই মধ্যাহ্নভোজটি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন আর সান্তিয়াগোর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলোতে এই বিষয়ে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে, যদি সালভাদোর আইয়েন্দের নেতৃত্বাধীন পপুলার ইউনিটি পার্টি নির্বাচনে জয়ী হয় তাহলে মনে প্রাণে আমেরিকার ঘনিষ্ট মিত্র অফিসারই ক্ষমতা অধিগ্রহণ করবে। পরিকল্পনাটি নেয়া হয়েছিলো অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায়। এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো বিশ্ব রাজনীতি। ঐ সময়েই প্রেসিডেন্ট হেনরী কিসিঞ্জার কয়েকজন চিলিয়ানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি বিশ্বের দক্ষিণাংশ সম্পর্কে যেমন বিশেষ কিছু জানিনা, তেমনি জানতেও আগ্রহী নই।” কিন্তু অভ্যুথান পরিকল্পনা যখন ক্ষুদ্র আকারে সংগঠিত করা হচ্ছে,তখন এটি বিশ্বাস করা অত্যন্ত কষ্টকর যে প্রেসিডেন্ট কিসিঞ্জার এই বিষয়ে বিশেষ কিছু জানতেন না।

চিলি একটি ছোট্র দেশ, ১০ মিলিয়ন প্রাণবন্ত মানুষ যার অন্যতম সম্পদ। এই ১০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৮ মিলিয়নই বসবাস করে রাজধানী সান্তিয়াগো ও তার আশপাশের এলাকায়। তামা উৎপাদনের জন্য চিলি পৃথিবী বিখ্যাত। ভালো ওয়াইন উৎপাদনেও চিলির সুনাম আছে। যদিও তা খুব একটা রপ্তানী করা হয়না। লাতিন আমেরিকার মধ্যে চিলির মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশী। ১৯৩২ সালে আমেরিকার মধ্যে চিলিই প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়। শ্রমিকদের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে সরকার কপার ও কয়েল জাতীয়করণ করতে শুরু করে। অবশ্য এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্থায়ী হয়েছিলো মাত্র ১৩ দিন।

গড়ে প্রতি দু’দিনে চিলিতে একদিন ভূকম্পন অনুভুত হয়। আর প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বছর চিলিতে হয় ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প। কোনো কোনো ভূতাত্ত্বিক মনে করেন, চিলি আসলে মূল ভূমির অংশ নয়। তারা আরো মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতে চিলি ভয়াবহ এক মহাপ্লাবনে বিশ্বের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। চিলিবাসীদের চরিত্র অনেকটাই দেশটির ভৌগোলিক মানচিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিলিবাসীরা বেঁচে থাকতে যেমন পছন্দ করে, তেমনি জানে কিভাবে বেঁচে থাকতে হয়। কিন্তু ভবিষ্যতবাণী করার মতো এক মারাত্মক প্রবণতা দেশটির জনগণের মধ্যে বিদ্যমান। একজন চিলিয়ান এক সোমবার আমাকে বলেছিল, কোন চিলিয়ান বিশ্বাস করে না, আগামীকাল মঙ্গলবার। কিন্তু এই গভীরাশ্রয়ী অবিশ্বাস সত্ত্বেও চিলিয়ানরা জাতীয় সভ্যতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিপক্কতা আর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে এগিয়ে গিয়েছিলো অনেকখানি। লাতিন আমেরিকা যে তিনটি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে,তার মধ্যে দুটোই গেছে চিলিতে। চিলির নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পাবলো নেরুদা এই শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।

হেনরী কিসিঞ্জার সম্ভবত এই ব্যাপারগুলো জানতেন। তবে যে কোনোভাবেই হোক না কেন, আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ দেশটি সম্পর্কে জানতো আরো অনেক বেশি। ১৯৬৫ সালে চিলি রাজনৈতিক ও সামাজিক গোয়েন্দাগিরির একটি কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। এই সময়ে যে গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করা হয় তার নাম ছিল প্রজেক্ট কেমিলট। প্রজেক্ট কেমিল্ট ছিলো এক গোপন গোয়েন্দা তৎপরতা। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে চিলি ছাড়াও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের বিভিন্ন স্তরের সামাজিক, পেশাজীবি, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের কাছে একটি প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়েছিলো। প্রশ্নপত্রের উদ্দেশ্য ছিলো বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিভিন্ন সামাজিক দলের রাজনৈতিক পরিপক্কতা আর সামাজিক প্রবণতা যাচাই করা। সামরিক ব্যক্তিবর্গের জন্য যে প্রশ্নপত্র তৈরী করা হয়েছিলো তা ছিলো ওয়াশিংটনে পূর্বোল্লেখিত পেন্টগন কর্মকর্তাদের প্রশ্নের অনুরূপ: তাদের অবস্থান কি হবে যদি কম্যুনিজম ক্ষমতায় চলে আসে? এটি ছিলো একটি কুশলী অনুসন্ধান।

বহুদিন ধরেই উত্তর আমেরিকার সামাজবিজ্ঞানীদের জন্যে একটি অন্যতম অনুসন্ধান ক্ষেত্র ছিলো চিলি। চিলির গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতা, নেতৃবৃন্দের অনমনীয়তা আর বিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান দেশটির ভবিষ্যত সম্পর্কে সামাজবিজ্ঞানীদের ধারণা গঠনে সমর্থ করে তুলেছিলো। যে কোনো সচেতন, সামাজবিজ্ঞানী বুঝতে পারছিলেন যে লাতিন আমেরিকায় কিউবার পরেই দ্বিতীয় সমাজতান্ত্রিক দেশ হবে চিলি। আর তাই শুধুমাত্র তার অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে রক্ষা করার জন্যেই আমেরিকা সালভাদোর আইয়েন্দের ক্ষমতা দখলকে প্রতিরোধ করেনি, আমেরিকার মূল উদ্দেশ্য ছিলো আরো গভীর, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে সাম্রাজ্যবাদী চক্র যে সফল অপারেশন চালিয়েছিলো চিলিতে তার পুনরাবৃত্তি ঘটানো।

অভ্যুত্থান স্থগিত

৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সাল, আগে যেমনটা ধারণা করা গিয়েছিলো, সমাজতান্ত্রিক ও চিকিৎসক সালভাদোর আইয়েন্দে চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। কিন্তু আকস্মিক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে যাবার পর যে কথা চারিদিকে শোনা যাচ্ছিলো, তার কিছুই ঘটলো না। আর আকস্মিকভাবে কিছু না ঘটার যে ব্যাখ্যা সর্বত্র প্রচারিত হয়েছিলো, তার যুক্তিটিও ছিলো বেশ হাস্যকর: পেন্টাগনের কোন এক কর্মকর্তা নাকি ভুল করে নৌবাহিনীর একটি নর্তক দলকে ২০০ ভিসা দিয়ে গিয়েছিলেন। এই ভিসাগুলো আসলে দেবার কথা ছিলো সরকারকে উড়িয়ে দিতে পারে এমন একদল বিশেষজ্ঞকে। এই ভুলটিই নাকি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু আসল ঘটনা হলো, অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিলো আরো গভীরভাবে। সিআইএ আর চিলিতে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বুঝতে পেরেছিলেন বর্তমান অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নিছক একটি সামরিক অভিযান ছাড়া অন্য কিছু নয়। আর এই পরিকল্পনা বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় আনেনি। আসলে আমেরিকান ইন্টিলিজেন্স এজেন্সী যেমনটা ভেবেছিলো পপুলার ইউনিট যেভাবে কোনো সামাজিক নৈরাজ্য বয়ে আনেনি। বরং নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ অবস্থান এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থির সংকল্প একটি সামাজিক উদ্যমের আবহ গড়ে তোলে।

তামা শিল্পসমুহ জাতীয়করন

ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় ৪৭ টি শিল্প কারখানা জাতীয়করণ করে নেয় পপুলার ইউনিট পার্টি। কৃষিক্ষেত্রে প্রায় ৬ মিলিয়ন একর জমি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। এইসব জমির মালিক ছিলো বড়ো ভূস্বামীরা। মুদ্রাস্ফীতি কমে আসছিলো ক্রমাগত। সরকার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়েছিলো চাকরির। মজুরীর পরিমাণও শতকরা ৩০ ভাগ বেড়ে গিয়েছিলো। আগের সরকার, অর্থাৎ ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বাধীন এদুয়ার্দো ফ্রেইও তামা শিল্পকে জীতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছিলো, যদিও তিনি এই প্রক্রিয়াকে জাতীয়করণ না বলে বলতেন চিলীয়করণ। পপুলার ইউনিটি সরকার, কংগ্রেস অন্যান্য দলের সহায়তায় আমেরিকার অর্থানুকুল্যে পরিচালিত এনাকোনদা ও কেনেকত কোম্পানীতে নিয়োজিত সমস্ত মজুদ তামা অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার হিসাব করে দেখেছিলো এই দুই কোম্পানী গত ৫০ বছরে ৮০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মুনাফা অর্জন করেছে।

পাতিবুর্জোয়া আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা ঐ সময়ে যে কোনো সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন দেবে বলে মনে করা হয়েছিলো, তারা অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করা শুরু করে। সবক্ষেত্রে যেমনটা দেখা যায়, অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণীর উপর ভিত্তি করে তারা এই সুযোগ সুবিধা ভোগ করে, এ ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায়নি। বরং তারা এই সুবিধা পেয়েছিলো আর্থিক গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা আর বৈদেশিক মুদ্রার জোরে। সামরিক বাহিনীরও একটি সামাজিক শত্তি হিসেবে মধবিত্ত শ্রেণীর মতো একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ছিল। তাই তাদেরও কোনো রকম ইচ্ছে ছিলো না অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারী ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিত হবার। আর এই বাস্তবতার কারণে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রিটিক পার্টিও কোন অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকে সমর্থন করতে চায়নি। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো আলাদা, যে কোনো উপায়ে সরকারের শক্তিশালী অবস্থানকে দুর্বল করা, যাতে তারা ১৯৭৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য কংগেস নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসন পেতে পারে। কারণ এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতাবলে তারা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টকে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার অর্জন করতে পারবে।

ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি একটি বিশাল রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণীতে যার সমর্থকরা ছিলো যেমন আধুনিক শিল্প সর্বহারা, ক্ষুদ্র আর মাঝারি গ্রামীণ ভূমি মালিক শ্রেণী, আর শহরের পাতিবুর্জোয়া ও মধ্যবিত্ত শ্রেনী। পপুলার ইউনিট পার্টির প্রতিও বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবি শ্রেণীর সমর্থন ছিলো যেমন সর্বহারা শ্রেণী, ক্ষেতমজুর আর শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি আর উগ্র ডানপন্থী সংগঠন ন্যাশনাল পার্টির আধিপত্য ছিলো কংগ্রেসে আর বিচার সভায়। পপুলার ইউনিটের আধিপত্য ছিলো নির্বাহীদের ওপর। এই দুটো প্রধান দলের আলাদা আলাদা অবস্থান ও ক্ষমতা মূলত দেশটির রাজনৈতিক বিভক্তিকরণকে স্পষ্ট করে তোলে। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির এদুয়ার্দো ফেই নিজেই বিদ্যমান সরকারকে বির্পযস্ত করা আর অর্থনৈতিক ও নৈতিক ধ্বংসের অতল গহবরে নিয়ে যাবার উদ্যোগ নেন। আর আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধই (তাদের সম্পত্তি সামন্যতম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বাজেয়াপ্ত করায়) বাদবাকী কাজগুলো সম্পন্ন করে। অটোমোবাইল থেকে শুরু করে টুথপেষ্ট পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যই চিলি উৎপাদন করে। কিন্তু এই শিল্পগত ভিত্তি দাঁড়িয়েছিলো একটি ভুয়া পরিচিতির উপর। ১৬০টি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠানে পুঁজির ৬০ ভাগ ছিলো বিদেশী, আর ৮০ ভাগ প্রাথমিক কাঁচামাল আসতো বিদেশ থেকে। এছাড়া ভোগ্যপণ্য আর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্যে চিলির প্রতিবছর প্রয়োজন হতো যথাক্রমে ৩০০ মিলিয়ন ও ১০০ মিলিয়ন ডলার। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর অব্যাহত সাহায্য সহযোগিতা পপুলার ইউনিটি পার্টির সরকারকে এইসব সমস্যা মোকাবেলায় তেমন একটা সহায়তা করতে পারেনি। কারণ শিল্প, কৃষি আর পরিবহনের ক্ষেত্রে আমেরিকান যন্ত্রপাতির ওপর চিলি ছিলো খুব বেশী নির্ভরশীল। সোভিয়েত ইউনিয়ন অস্ট্রেলিয়া থেকে গম আমদানি করেছিলো চিলিতে পাঠানোর জন্যে, কারণ তার নিজের দেশে গম উৎপন্ন হয়না। তাছাড়া প্যারিসে অবস্থিত উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচুর ডলার আর নগদ টাকা দিয়ে চিলিকে সাহায্য করেছিলো। কিন্তু জরুরী প্রয়োজন ছিলো আরো অনেক গুণ বেশী। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে গরীব মানুষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বুর্জোয়া শ্রেণীর সুখী মহিলারা খালি হাঁড়ি আর পাত্র নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ দেখানো শুরু করে। কিন্তু এই বিক্ষোভ প্রদর্শনের মূল কারণ ছিলো অন্যত্র: খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি ব্যাপার হলো, এই সুখী মহিলারা, যাদের মাথায় থাকতো ফুলের টুপি আর গায়ে রঙীন পোষাক, তারা এমন সময় বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন যেদিন ফিদেল কাস্ত্রো চিলিতে তার ১৩ দিনের সফর শেষ করে ফিরে যাচ্ছিলেন নিজ দেশে। তবে কাস্ত্রোর এই সফর পপুলার ইউনিটির সমর্থকদের জন্যে ছিলো প্রচন্ড উদ্দীপনাময়।

ধ্বংসের বীজ বোপন

প্রেসিডেন্ট আইয়েন্দে বুঝতে পারছিলেন জনগণ সরকার গঠন করেছে ঠিকই, কিন্তু আসল ক্ষমতা তাদের কাছে নেই। অবস্থা ছিলো প্রকৃতপক্ষে আরো বেশী খারাপ আর আইয়েন্দে তাঁর নিজের মধ্যেই ধারণ করছিলেন বৈধতার জীবাণু যা তার ধ্বংস ডেকে আনে। আইয়েন্দে এমন একজন মানুষ যিনি আজীবন আইনের জন্যে যুদ্ধ করে গেছেন। তিনি অবশ্যই মাথা উচু করে মনেদা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসতেন, যদি কংগ্রেস তাকে সাংবিধানিক উদ্যোগে অপসারিত করতো। ঐ সময়েই ইতালীর সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ রোমানা রোসান্দা আইয়েন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। হলুদ সুতী কাপড়ের ঢাকা চেয়ারে বসে তার সঙ্গে কথা বলার সময় আইয়েন্দেকে মনে হচ্ছিলো ভীষন বয়স্ক, উদ্বিগ্ন আর বিষন্ন। এই চেয়ারেই, মাত্র সাত মাস পর, বুলেটে ঝাঝরা আইয়েন্দের শরীর পড়েছিলো। রাইফেলের বাটের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো তাঁর চেহারা।

১৯৭৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের বিষয়ে আইয়েন্দে ছিলেন খুবই চিন্তিত। এই নির্বাচনে তার পপুলার ইউনিট পার্টির জন্যে প্রয়োজন ৩৬ ভাগ ভোট। সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐ অস্থিরতার সময়ে, অর্থাৎ ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি, কঠিন রেশন ব্যবস্থা আর উচ্চবিত্ত শ্রেনীর মহিলাদের খালি হাড়ি আর পাত্র নিয়ে ক্রমাগত বিক্ষোভ মিছিলের মধ্যেই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আইয়েন্দে পেলেন ৪৪ শতাংশ ভোট। নির্বাচনের এই ফলাফল আইয়েন্দের জন্যে এমনই অভাবনীয় ছিলো যে, তিনি তার অফিস কক্ষেই ঘনিষ্ঠ মিত্র আর সাংবাদিক অগাস্তো অলিবারের সামনে নাচতে শুরু করেছিলেন উদ্বাহু।
ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির কাছে এই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে পপুলার ইউনিট পার্টি সামাজিক ন্যায় বিচারের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তাকে আইনসম্মতভাবে বন্ধ করার কোন উপায় নেই। অন্যদিকে এই নির্বাচন আমেরিকার জন্যে ছিলো চরম বিপদ সংকেত। অভ্যন্তরীণ আর বাহ্যিক সমস্ত শক্তি এ সময়ে একটি পরিপূর্ণ অবরোধের পরিকল্পনা নেয়।

অন্যদিকে পপুলার ইউনিটি মার্চের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়। একদল জনসাধারণকে আরো বেশী রেডিক্যাল করার ওপর যেমন গুরুত্ব দেয়, তেমনই সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উল্লস্ফনের উপর জোর দেয় আরো বেশী। অন্যদিকে মধ্যপন্থীরা দেশে যারা গৃহযুদ্ধের আশংকা করছিলেন, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটদের সঙ্গে তারা চুক্তি স্বাক্ষরের উপর গুরুত্ব দেয়।

সিআইএ-র অর্থায়নে শেষ আঘাত

এমনই এক অবস্থায় চিলির ট্রাক মালিক সমিতি দেয় ধর্মঘটের ডাক। চিলির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্যে তার অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভর করতো পরিবহনের দয়ার উপর। ট্রাক ধর্মঘটের অর্থ সমগ্র দেশকে অর্থনৈতিকভাবে অচল করে দেয়া। বিরোধী দলের পক্ষে ট্রাক ধর্মঘট পরিচালনা করা ছিলো বেশ সহজ। কারণ খুচরো মার্কিন যন্ত্রাংশ আমদানী বন্ধ থাকায় ট্রাক মালিকরা খুব ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিলো। অন্যদিকে দেশের দক্ষিণাংশে ক্ষুদ্র মাত্রায় সরকার নিয়ন্ত্রিত ট্রাক ব্যবস্থা প্রচলনের ফলেও সন্ত্রস্ত আর ক্ষুব্দ হয়ে উঠছিলো তারা। আর এই ধর্মঘট কোনো প্রকার বিরতি ছাড়াই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কারণ এই ধর্মঘটে বাইরের টাকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিআইএ ট্রাক মালিকদের সাহায্য করে দেশটিকে ডলারের বন্যায় ডুবিয়ে দিয়েছিলো, আর এই বৈদেশিক পুঁজি জন্ম দিয়েছিল একটি বিস্তৃত কালো বাজারের। পাবলো নেরুদা ইয়োরোপে তাঁর এক বন্ধুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন একথা। অভ্যুথানের এক সপ্তাহ আগে তেল, দুধ আর রুটি বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়।

পপুলার ইউনিট পার্টির ক্ষমতার শেষের দিকে অর্থনীতির এমন বিপর্যস্ত অবস্থা আর দেশে গৃহযুদ্ধের আশংকার মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের অনেকে এই আশায় থাকলো যে, সামরিক বাহিনীতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন হয়তো তাদের পক্ষে আসবে। অভ্যুত্থানের ৪৮ ঘন্টা আগে বিরোধীরা সালভাদোর আইয়েন্দের প্রতি অনুগত সব অফিসারকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং তাদের জায়গায় একের পর এক সেসব অফিসারদের পদোন্নতি দিয়ে নিয়ে আসে যারা হাজির ছিলো ওয়াশিংটনের সেদিনকার নৈশভোজে। আর সেই মুহূর্তেই রাজনীতির দাবা তার খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়।

আইয়েন্দে জানতেন, দেশের এই সংকটজনক অবস্থায় কোনো সামরিক অভ্যুত্থানই রক্তপাতহীন হতে পারে না। আগুন নিয়ে কেউ খেলতে পারে না, আইয়েন্দে বলছিলেন রোমানা রোসান্দকে, যদি কেউ মনে করে যে আমেরিকা অন্যান্য দেশের মতো চিলিতেও একই ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান হবে, তাহলে অবশ্যই সে ভুল চিন্তা করছে। যদি চিলিতে সামরিক বাহিনী বৈধতা কিংবা আইনের সীমা লংঘন করে তবে এখানে অবশ্যই রক্তপাত হবে। চিলি পরিণত হবে আরেকটি ইন্দোনেশিয়ায়। আইয়েন্দের এ ধরনের নিশ্চিত ভবিষ্যতবাণীর একটি ঐতিহাসিক ভিত্তিও ছিলো।

চিলির সামরিক বাহিনী যখনই দেখেছে যে তাদের শ্রেণীস্বার্থ হুমকির মুখোমুখি তখনই তারা হস্তক্ষেপ করেছে রাজনীতিতে। আর প্রতিবারই তারা এই কাজটা করেছে অমানুষিক দমনমুলক পন্থায়। গত দুশো বছরে চিলি যে দুটো সংবিধান পেয়েছে, তাও সামরিক বাহিনীর জোর করে চাপিয়ে দেয়া। বিগত পঞ্চাশ বছরে চিলিতে ঘটে গেছে পাঁচ পাঁচটি সামরিক অভ্যুত্থান।

চিলির সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতার ইতিহাস

রক্ত নিয়ে হোলি খেলার এই অধিকার যেন চিলির সামরিক বাহিনীর জন্মগত। এই সামরিক বাহিনীরই একজন পূর্বসূরি ১৬২০ সালে নিজ হাতে দুহাজার মানুষকে খুন করেছিল। হোয়াকিন এদুয়ার্দো রেলো নামে একজন কাহিনীকার তার এক উপাখ্যানে উল্লেখ করেছিলেন একবার যখন মহামারী আকারে চিলিতে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিলো, সেসময়ে চিলির সেনাবাহিনী বাড়ি বাড়ি তল্লাসী চালিয়ে অসুস্থ লোকদের ঘর থেকে বের করে এনে জোর করে ঠেলে দিয়েছিলো মৃত্যুর দিকে। ১৮৯১ সালে সাত মাস স্থায়ী গৃহযুদ্ধে মারা গিয়েছিলো প্রায় ১০ হাজার লোক।

একইভাবে চিলিতে সমস্ত গণআন্দোলনই সামরিক বাহিনী দমন করেছে বর্বর পন্থায়। এই শতাব্দীর শুরুতে চিলির ইকুইকিকে বিক্ষোভকারীরা যখন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের রাস্তা থেকে জিম্মি করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলো তখন বিক্ষুদ্ধ জনতার উপর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালালে মারা পড়ে প্রায় দুই হাজার লোক। ১৯৫৭ সালের ২ এপ্রিল সামরিক বাহিনীর সান্তিয়াগোর কেন্দ্রস্থলে একটি বিক্ষোভ মিছিল দমন করা হয় চরমভাবে। ঐ অপারেশনে কতজন লোক মারা গেছে তা সঠিকভাবে জানা যায়নি, কারণ প্রতিটি লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিলো। প্রেসিডেন্ট এদুয়ার্দো ফেইর শাসনামলে এল সালভাদোরের খনি ধর্মঘটের সমর্থনে চিলিতে বেশ কিছু বিক্ষোভ মিছিল হয়। এমনি এক বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করে। এই ছয়জনের মধ্যে কয়েকজন ছিলো শিশু, আর একজন ছিল গর্ভবতী মহিলা। এই হত্যাকাণ্ডের মূল নেতৃত্বাদানকারী ছিলেন ৫২ বছর বয়সী একজন জেনারেল, পাঁচ সন্তানের বাবা এবং সামরিক বিষয়ক বেশ কিছু বইয়ের লেখক: অগাস্তো পিনোচেত।

সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে ব্যারাকের ভেতরে যে গোপন যুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেটা অনেকেরই জানা। যে অফিসাররা অভ্যুত্থানে অংশ নিতে চাননি আর যারা দমন পীড়ন চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাদের কোন প্রকার ক্ষমা প্রদর্শন ছাড়াই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনও হয়েছে যে, সান্তিয়াগো ও অন্যান্য অনেক প্রদেশে সমস্ত রেজিমেন্টকেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে অভ্যুত্থানে সহায়তা না করার অভিযোগ। ভিনাভেল সারে আমর্ড ইউনিটের কমান্ডেন্ট কর্ণেল সান্তাউয়ারিসকে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঝরা করে ফেলা হয়েছে। অনেক অনেক বছরই গড়িয়ে যাবে, কিন্তু প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা জানা যাবে না, কারণ যারা অভ্যুত্থানের আগে ও পরে নিহত হয়েছে, অত্যন্ত গোপনে মাটিচাপা দিয়ে দেয়া হয়েছে তাদেরকে। সবশেষে, মাত্র ৫০ জন উর্ধ্বতন সামরিক অফিসার পাওয়া গিয়েছিলো এই অভ্যুত্থানের প্রতি ছিলো যারা সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত।

বিদেশী সংস্থাগুলোর ভূমিকা

প্রচুর বিদেশী এজেন্টও এই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বস্ত সূত্রগুলো আমাদের বলেছে, মনেদা প্রাসাদের ওপর বোমাবর্ষনের মূল দায়িত্ব ছিল একদল মার্কিনীর। ১৮ সেপ্টেম্বর, চিলির স্বাধীনতা দিবসে যে ফ্লাইং সারকাস অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিলো ওরা এসেছিলো তাতে অংশগ্রহণের নাম করে। এরিয়াল এক্রোব্যাট হিসাবে পরিচয় দিলেও এরা মূলত ছিলো অপারেশন ইউনিটের বিদেশী সদস্য। এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, অসংখ্য গোপন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য পাশের দেশগুলো থেকে ঢুকে পড়েছিলো চিলিতে। এরা অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত লুকিয়ে ছিলো গোপনে। বলিভিয়াতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র জাকিয়ে বসেছিলো মাত্র দুই বছর আগে, যার ফলে চিলির জন্যে কোনো প্রকার সাহায্য সহযোগিতা ছিলো অসম্ভব। এই প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বরং চিলির সামরিক অভ্যুত্থানকেই সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলো। অন্যদিকে আমেরিকা ব্রাজিলকে যে আর্থিক সাহায্য দিয়েছিলো তার অংশবিশেষ পাঠানো হয়েছিলো বলিভিয়ায়। উদ্দেশ্য একটি, চিলির নাশকতামূলক তৎপরতায় সহায়তা করা।

সবশেষে, ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে অপারেশন ইউনিটটা নামে যে অভিযান সংঘটিত হতে যাচ্ছিলো যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ওয়াশিংটনের ঐ ভোজসভায় তা কেবলমাত্র একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ব্যারাক অভ্যুত্থান ছিলো না, বরং ছিলো একটি পরিপূর্ণ যুদ্ধ প্রস্তুতি। এই অপারেশনের উদ্দেশ্য কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং এই অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিলো সন্ত্রাস, নির্যাতন আর ধ্বংসের মধ্যে চিলিতে পপুলার ইউনিটি পার্টি যে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলো তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

দেশের এই অবস্থায় সালভাদোর আইয়েন্দে তখনও আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিলেন। আইয়েন্দের জীবনের সবচেয়ে বড়ো বৈপরীত্য ছিলো এই যে, তিনি একই সঙ্গে ছিলেন সন্ত্রাসের সহজাত শক্র, আবার নিরব বিপ্লবী। তাঁর বিশ্বাস ছিলো তিনি বিরোধের মিমাংসা করেছেন। তার সিদ্ধান্ত ছিলো অনেকটা এরকম, চিলিতে বুর্জোয়া আইনের মধ্যে থেকেই সমাজতন্ত্রের পথে শান্তিপূর্ণ বিবর্তন সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো এই, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আইয়েন্দে যখন বুঝতে পারলেন, ক্ষমতা ছাড়া কোনো একটি ব্যবস্থা শুধুমাত্র সরকার পরিচালনার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, ততোদিন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আইয়েন্দে যখন তার বিশ্বাসের বৈপরীত্য সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে সজাগ হলেন, তখন প্রতিরোধের প্রচেষ্টা তিনি নিয়েছিলেন। ফিদেল কাস্ত্রো তাঁকে যে মেশিনগানটি উপহার দিয়েছিলেন সেটা নিয়ে মনেদা প্রাসাদ রক্ষার জন্যে তিনি যুুদ্ধ করেছেন দীর্ঘ ছয় ঘন্টা। আইয়েন্দে তাঁর জীবনে সেদিনই প্রথম অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। বিকেল চারটায়, মেজর জেনারেল হাভিয়ের পালাসিওস তাঁর অন্যতম সহকারী ক্যাপ্টেন হেরার্দো আর অন্যান্য অফিসারদের নিয়ে মনেদা প্রাসাদের প্রথম তলায় আরোহণ করতে সক্ষম হন। ওখানেই সালভাদোর আইয়েন্দে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। তার পরনে ছিলো কোট ছাড়া একটি সাধারণ শার্ট, মাথায় খনি শ্রমিকদের হ্যামলেট। তার বেশভূষায় লেগেছিলো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। আইয়েন্দে তখনও মেশিনগানটি ধরেছিলেন হাতে, যদিও তার গুলি ফুরিয়ে আসছিলো।

আইয়েন্দে জেনারেল পালাসিওসকে অত্যন্ত ভালোভাবেই চিনতেন। মাত্র কিছু দিন আগে সাংবাদিক অগাস্তো অলিভারকে এই জেনারেল সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, এই লোকটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। অলিভারকে তিনি আরো বলেছিলেন, মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে এই জেনারেলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আইয়েন্দে জেনারেল পালাসিওসকে দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাসঘাতক বলে চিৎকার করে উঠে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।

শেষ পর্যন্ত আলেন্দের লড়াই

একজন প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি আমার কাছে তাঁর নিজের নাম গোপন রেখেছেন, বলেছেন আইয়েন্দে এই দলের সাথে গুলি বিনিময়ের সময় নিহত হন। ঐ দলের সবাই একত্রে আইয়েন্দের দেহ লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তারপর একজন নন কমিশনড অফিসার রাইফেলের বাটের আঘাতে তার মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এই ঘটনার একটি আলোকচিত্র পরবর্তী সময়ে পাওয়া গেছে। এল মেরকুরিও পত্রিকার সাংবাদিক হুয়ান লিরা ছবিটি তুলেছিলেন। তিনিই একমাত্র লোক যাকে আইয়েন্দের মৃতদেহের ছবি তুলতে অনুমতি দেয়া হয়।

আইয়েন্দে ছিলেন সত্যিকারের সিংহ, নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্থির ও অনমনীয়। তার একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, আইয়েন্দে কি ভাবতেন সেটা জানতেন শুধু নিজেই। আইয়েন্দে জীবনকে ভালবাসতেন, ভালোবাসতেন ফুল, পশু পাখি। আর সবার ওপরে ছিলেন সাহসী। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক আর ব্যতিক্রমী ব্যাপার হলো, মৃত্যুর সময় তিনি অস্ত্র হাতে রুখে দাড়িয়েছিলেন সেই বুর্জোয়া আইনের নৈরাজ্যমূলক দেহ আর বিচারের সর্বোচ্চ সংস্থা সুপ্রীম কোর্টকে রক্ষার জন্যে যে বুর্জোয়া আইন আর সুপ্রীম কোর্ট তাকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করেনি, বরং তাঁর হত্যাকারীদের দিয়েছিলো আইনগত বৈধতা। আইয়েন্দে সেসব বিরোধী দলের স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্যে জীবন বিলিয়ে দিলেন যারা তাদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছিলো ফ্যাসিবাদের কাছে। এই নিষ্ঠুর নাটকটি সংঘটিত হয়েছিলো চিলিতে, চিলিবাসীদের বিশাল বিপর্যয়ের মধ্যে, কিন্তু এই ঘটনা আজ ইতিহাসের অন্তর্গত, যেন তা সংঘটিত হয়েছে আমাদের প্রত্যেকের জন্যে। আইয়েন্দের মৃত্যুর ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং আমাদের প্রত্যেকের মনে অম্লান থাকবে চিরকাল।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.