গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

রাজু আলাউদ্দিন | ১৭ december ২০১৭ ১০:৪৯ অপরাহ্ন

Murshid-8লন্ডন-প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, গবেষক, সংবাদ-উপস্থাপক এবং আভিধানিক। জন্ম ১৯৪০, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। পি এইচ ডি-ঐতিহাসিক ডেভিড কফের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিষয়, উনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’দশক ধরে অধ্যাপনা। মাঝখানে দু’বছর কেটেছে মেলবোর্নে, শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণাকর্মে। ১৯৮৪ সাল থেকে লন্ডন-প্রবাসী। বেতার-সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার অবসরে প্রধানত আঠারো শতকের বাংলা গদ্য এবং মাইকেল-জীবন নিয়ে গবেষণা। প্রধান নেশা গবেষণার-অতীতকে আবিষ্কারের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ: রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা (১৯৮১)। পিএইচডি, অভিসন্দর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৫)। মহিলাদের নিয়ে লেখা, ‘Reluctant Debutante: Response of Bengali Women to Modernization (১৯৮৩) (বাংলা অনুবাদ : সংকোচের বিহুলতা।[১৯৮৫]) এবং রাসাসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর (১৯৯৩)। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থ: কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), যখন পলাতক (১৯৯৩) এবং বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদি-পর্ব (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দান (১৯৯১-৯২)। ছদ্মনাম : হাসান মুরশিদ। এই নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।
গত নভেম্বরের ২৪ তারিখে তার ধানমন্ডিস্থ বাসবভবনে তার সঙ্গে কবি প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের যে-দীর্ঘ
আলাপচারিতা হয় তারই শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার মূল খ্যাতি প্রধানত জীবনী-লেখক এবং গবেষক হিসেবে। এই দুই ধরনের লেখাতেই নতুন নতুন তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে আপনার ভূমিকা অনন্য। বাংলাভাষায় এই ধরনের কাজ এখন তো প্রায় বিরলই বলা যায়। নিষ্ঠা, শ্রম ও পাণ্ডিত্যের সমন্বয়ে আজকাল এই ধরনের কাজ খুব একটা দেখা যায় না। তো এ ধরনের কাজে আপনার আদর্শ হিসেবে কারা ছিলেন, যদি থেকে থাকেন?
গোলাম মুরশিদ: জীবনীর ক্ষেত্রে আদর্শ কেউ নেই। আমি যে-জীবনী লিখেছি, তা নতুন ধরনের জীবনী। আমি এই জীবনী লেখার জন্যে ইংরেজি বহু জীবনী পড়েছি। বাংলায় জীবনীসাহিত্য খুব দুর্বল। বাংলায় জীবনী সাহিত্যের সন-তারখি দেয়া আছে। সন-তারিখ এবং ঘটনার ঘনঘটা। কিন্তু এইসব ঘটনাগুলো একজন ব্যক্তিকে নির্মাণ করে। এই ব্যক্তিটি সম্পর্কে বোঝা যায় না শত ঘটনা থেকেও। মনে হয় ঘটনার তালিকা। মধুসূদনের জীবনী লেখার জন্যে আমি একটা বই পড়ি ইংরেজিতে, প্রিন্সিপিকা বায়োগ্রাফিকা। অর্থাৎ প্রিন্সিপালস অব বায়োগ্রাফি রাইটিং। সেখানে আদর্শ জীবনী কী করে লিখতে হয় তার একটা ধারণা পেয়েছিলাম। জীবনী হচ্ছে কতগুলো ঘটনার মধ্যদিয়ে একটা লোককে তুলে ধরা চোখের সামনে। তাকে, তার বৈশিষ্ট্যসহ জীবন্ত লোকটাকে তুলে ধরা। যেমন ধরুন, গোলাম মোস্তফা নজরুলের একটা জীবনী লিখেছেন। ‘কাজী নজরুল ইসলাম/বাসায় একদিন গিসলাম/ভায়া লাফ দেয় তিনহাত/ হেসে গান গায় দিনরাত।’–এইটাকে আমি একটা জীবনী বলি। তার কারণ, এর মধ্যদিয়ে নজরুলের ব্যক্তিত্বটা যে রকম দেখা যায়, অনেক জীবনীর মধ্যে সে রকম দেখা যায় না। ব্যক্তিত্বটা ফুটে ওঠে। সেই অর্থে এই ছ’লাইনের কবিতাটাকে আমি একটা জীবনী বলি। কিন্তু ছয়শ’ পৃষ্ঠার বইকে আমি হয়ত জীবনী বলব না। আর এখন আমি জীবনী লেখক হয়ে গেলাম, যেহেতু আমি দ্বিতীয়বার একটা জীবনী লিখলাম। মধুসূদনের পরে এবারে লিখলাম নজরুল ইসলামকে নিয়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: বেরিয়ে গেছে বইটা?
গোলাম মুরশিদ: বইটা ছাপার কাজ শুরু হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কারা বের করছেন?
গোলাম মুরশিদ: এটা বের করছে প্রথমা। তো এখানেই নজরুল সম্পূর্ণ নতুন রূপে দেখা দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
রাজু আলাউদ্দিন: কী অর্থে নতুন? যেমন নতুন তথ্য বা নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ?
গোলাম মুরশিদ: নতুন তথ্যও আছে। আর নজরুলকে বিশ্লেষণ করে খাঁটি নজরুলকে তুলে ধরা। এক নম্বর হচ্ছে, কিংবদন্তিগুলোকে বাদ দেয়া। দুই নম্বর হচ্ছে, যেগুলো সত্যিকারের ঘটনা, সেই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি নজরুলকে তুলে ধরা। যেমন আমি একটা বক্তৃতা করলাম পরশু দিন, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, রিডিং ক্লাবের নিমন্ত্রণে। বক্তৃতাটার নাম ছিল নানারূপে নজরুল। নজরুল সম্পর্কে আমাদের দেশের যে ধারণাটা, সেই ধারণাটা হচ্ছে, নজরুল অপরিবর্তনীয় চরিত্র। বিদ্রোহী। এর থেকে মিথ্যা কথা নজরুল সম্পর্কে আর নেই। তার কারণ, নজরুল বিদ্রোহের কবিতা লিখেছেন সবমিলে ৩০/৪০ টা। আর বাকিগুলো তো প্রেমের কবিতা। অথচ প্রেমিক নজরুল বলে পরিচিত নন তিনি। পরিচিত বিদ্রোহী কবি হিসেবে। নজরুল ইসলামি গান লিখেছেন। সো হোয়াট! নজরুল শ্যামা সঙ্গীতও লিখেছেন। নজরুল কীর্তনও লিখেছেন। তাহলে কি সবই ফরমায়েশ! নাকি এই বিচিত্ররূপের মধ্যদিয়ে একত্রে গাথার কোনো সূত্র আছে? তাকে আমরা দেখি কখনো গরিব, কখনো ধনী। তিনি গাড়ি কিনলেন। নেপালি দারোয়ান রাখলেন বাড়িতে। ফার্স্টক্লাশ রিজার্ভ করে হাওয়া খেতে যান পশ্চিমে। কাজেই নজরুল তো এক রকম নন। বহুরূপী নজরুল। আমি সেই দিকগুলো ধরার চেষ্টা করেছি। সর্বোপরি তার ব্যক্তিত্বটাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সুতরাং এটাও একটা নতুন ধরনের জীবনী হবে বলে আমার ধারণা।
Murshid-1
রাজু আলাউদ্দিন: আগের জীবনীগুলো থেকে আপনার পার্থক্য হচ্ছে একটি ব্যক্তিত্বকে সঠিকভাবে নির্মাণ করা। এবং সেটাকে পূর্ণাঙ্গ একটি ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেখানো। তাই তো?
গোলাম মুরশিদ: যদ্দূর সম্ভব।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা হলো আপনার লক্ষ্য। কিন্তু পদ্ধতি হিসেবে আপনার ইয়েটা কী? মানে এমন কোনো পদ্ধতি কি আপনি এই জীবনীগুলোর মধ্যে প্রবর্তন করেছেন যেগুলো আগে বাংলাভাষার জীবনীতে ছিল না?
গোলাম মুরশিদ: আমি তো মনে করি মধুসূদনে সেটা আমি করেছি। জীবনীর মধ্যে যে ঘটনার বিশ্লেষণ থাকে, এবং একটা ঘটনার সঙ্গে আরেকটা ঘটনার যোগসূত্র থাকে, এই জিনিসটা তো আমি ইন্ট্রোডিউস করি। এটা আমার আগে কোনো জীবনীতে ছিল বলে আমার মনে হয় না। সেই অর্থে বাংলার জীবনী সাহিত্য খুব দুর্বল।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যে-পদ্ধতিতে লিখলেন, বাইরে তো এর নজির আছে।
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, নজির আছে। আমি আরো একটা জিনিস করি। সন-তারিখ একটু কম রেখে ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে যার জীবনী, তাকে ফুটানোর চেষ্টা করি। সন-তারিখ আমার কাছে অত ইমপর্ট্যান্ট নয়, যতটা ইমপর্ট্যান্ট তার কিছু ঘটনা। অনেক ঘটনা আছে বিক্ষিপ্ত। এমনিতে আপনি মদ্যপান করেন না। আজকে আপনি মদ্যপান করে রাস্তা দিয়ে মাতালের মতো হাঁটলেন। আপনার বদনাম ছড়িয়ে গেল যে আপনি একজন মদ্যপ। কিন্তু ইট ওয়াজ অ্যান এক্সেপশন, রাদার দেন জেনারেল। তো যেইটা জেনারেলের মধ্যে পড়ে, সেগুলো দিয়ে জীবনী তৈরি করা। নাইনটিন সেঞ্চুরির তিনটে চারটে জীবনী নিয়ে একটা বিখ্যাত বই আছে স্ট্রাচের। নামটা আমি ভুলে গেলাম। এত সহজে আজকাল আমি ভুলে যাই। আমার মেমোরি লস হতে শুরু করেছে। পরশু রাত্তিরে বুমেরাং শব্দটা মনে করতে পারছিলাম না। শেষে আমি ডিসক্রাইব করে আমার স্ত্রীকে বললাম যে এটাকে যেন কী বলে? তো ও বলল বুমেরাং। তো এরকম আমি ভুলে যাচ্ছি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু গবেষক হিসেবে কাজ করতে গেলে তো বিপুল স্মৃতিধরও হতে হয়। সেটা তো আপনার আছে। না হলে এইসব বহু তথ্যের ভাণ্ডার….
গোলাম মুরশিদ: যে-জিনিসটা নিয়ে কাজ করি সে সম্পর্কে মনে থাকে। কিন্তু গত বছরখানেক ধরে লক্ষ করছি যে ভুলে যাচ্ছি খুব।

রাজু আলাউদ্দিন: তবে ভুলে যাওয়ার আবার কতগুলো ইতিবাচক দিকও আছে। যদি এমন হতো যে, সারা জীবনের যত স্মৃতি আছে এগুলো সবসময় যদি জাগ্রত থাকত তাহলে কিন্তু আপনি আবার পাগল হয়ে যেতেন।
গোলাম মুরশিদ: সেটা ভুললে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু আমি যে এখন আসল ঘটনাই ভুলে যাচ্ছি, সেইটা হচ্ছে আমার জন্যে চিন্তার ব্যাপার। নিজের গবেষণার বিষয় ভুলে যাচ্ছি। একটা কথা বলতে গিয়ে অন্য একটা কথা ভুলে যাই। এই জাতীয় জিনিস হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেক ধরনের জীবনীও তো পশ্চিমে আছে। যেগুলোকে বলে লিটারেরি বায়োগ্রাফি।
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, আমার বায়োগ্রাফিটাকে লিটারেরি বায়োগ্রাফিই বলা যায়। তার কারণ, মধুসূদনের জীবনী ধরা যাক, মধুসূদন শর্মিষ্ঠা লিখেছিলেন। আমি দেখালাম যে শর্মিষ্ঠা আসলে তারই জীবনী। আপনি যদি বইটা পড়েন তাহলে আপনি লক্ষ করবেন যে, এটাকে আমি বলেছি তার নিজের জীবনী। অথবা বীরাঙ্গনা কাব্য। আমি বলেছি এ তার নিজেরই কথা। অথচ এইগুলো সম্পর্কে আমরা যখন পড়েছিলাম, তখন ভুল ধারণা দেয়া হয়েছিল। তখন বলা হতো তিনি খুব অবজেক্টিভ কবি। বা তিনি সাব্জেক্টিভ কবি নন। তার মধ্যে নিজেকে দেখা যায় না। কিন্তু আমি সেই ধারণাটা ভুল প্রমাণিত করলাম, যখন আমি আসল মধুসূদনকে খুঁজে পেলাম। আসল মধুসূদনকে আমি যখন আবিষ্কার করলাম, তখন দেখা গেল যে মধুসূদনের সাথে ঘটনাগুলো মিলে যাচ্ছে। কাজেই সেই অর্থে লিটারেরি বায়োগ্রাফি।
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুলেরটাও তাই?
Murshid- 4
গোলাম মুরশিদ: নজরুলেরটাও অ্যাকজাক্টলি তাই। নজরুলের জীবনীর সঙ্গে আমি মিলিয়েছি তার সৃষ্টিকে। যারা বই লিখেছেন ‘নজরুল জীবনী ও সৃষ্টিকর্ম’ হেনতেন এই জাতীয়– তারা মিলাতে পারেননি। তারা জীবনীটাকে একপাশে রেখেছেন, আরেক দিকে রেখেছেন সৃষ্টিকর্মটাকে। কিন্তু এই দুটোর মধ্যে যে মিল আছে, সেটা দেখাতে পারেননি। যেমন আমি একটা দৃষ্টান্ত দিই। কলকাতায় ফিরলেন নজরুল। যে-নজরুল গল্পলেখক। যে-নজরুল মুসলমান ক্যারেক্টার নিয়ে গল্প লেখে। যে-নজরুল মুসলমানি ভাষায় গল্প লেখে। পল্টন থেকে কলকাতায় এলেন এই রূপে। কলকাতায় এসে কবি হয়ে গেলেন। এবং এক বছর ন’মাসের মাথায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটা লিখলেন। এই কবিতার মধ্যে হিন্দু দেবদেবীতে ভরা। এর আগে পর্যন্ত তার লেখার মধ্যে এগুলো আমরা পাই না। কী করে সম্ভভ হলো! আমি তার বিবর্তন দেখিয়েছি। বিবর্তন দেখিয়ে আমি বলেছি যে, তিনি ধীরে ধীরে কীভাবে হিন্দু দেবদেবীদের কথা বলতে শুরু করলেন। একটা কবিতায় গিয়ে আমরা পাচ্ছি, যেখানটায় তিনি দেবদেবীর কথা বলছেন এবং সেই কবিতার সবশেষে বলছেন: চাই না সুর চাই না অসুর, চাই মানব। দেবদেবীদের সঙ্গে মানবকে মেলালেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ও অ্যাকজাক্টলি তাই পাচ্ছি। সবশেষে তিনি মানুষের কথা বললেন: উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না। এই ‘বিদ্রোহী’ কিভাবে লিখতে পারা সম্ভব হলো তার পক্ষে? বা এই বিবর্তনের মধ্যদিয়ে কিভাবে তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখলেন? এটা কেউ দেখাননি। এই যে মিলন ঘটানো, সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে জীবনের, এটা হচ্ছে লিটারেরি বায়োগ্রাফির একটা ধরন, প্রধান বৈশিষ্ট্য।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার অনুসন্ধান এবং গবেষণার আরেকটা বড় এলাকা হচ্ছে বাঙালি এবং বাংলা সংস্কৃতি। আপনি নিঃসন্দেহে জানেন যে, বাংলা সংস্কৃতির বিবর্তন হচ্ছে। এবং এটাই স্বাভাবিক। তো এই বিবর্তন কি ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে নাকি নেতিবাচক দিকে যাচ্ছে?
গোলাম মুরশিদ: এটা এক কথায় বলা যাবে না। আমি গতকালই এই বিষয়ে একটা বক্তৃতা করেছিলাম জাতীয় জাদুঘরে। তো সেখানটায় আমার বেশ সমালোচনা করলেন দুজন। বললেন যে, আমি নেতিবাচক দিকগুলোর কথা বলেছি। কিন্তু আমি নেতিবাচক দিকের কথা শুধু বলিনি। ইতিবাচক যে বিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে, সেগুলোর কথা যেমন বলেছি, নেতিবাচক কথাও বলেছি। ইতিবাচক যেমন হচ্ছে শিক্ষার হার বেড়েছে। বইপত্র অনেক বেশি প্রকাশিত হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হচ্ছে। আবার মানুষের মূল্যবোধ ধ্বসে যাচ্ছে। এখন একটা পাঁচ বছরের মেয়েকে পেলেও রেপ করে। এটাও আমি বলেছি। কাজেই নেতিবাচক বা ইতিবাচক বলে কোনো কথা নেই। সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটে; তার কিছু নেতিবাচক থাকে, কিছু ইতিবাচক থাকে।
রাজু আলাউদ্দিন: নেতিবাচক দিকগুলো কী কী? আপনি কিছুদিন পর পর দেশে ফেরেন। ফলে আপনার দেখাটার একটা অবজেক্টিভিটি থাকে।
গোলাম মুরশিদ: ক্রাইম। এটা একটা নেতিবাচক দিক। এরকম ভয়ানক ক্রাইম আগের যুগে ছিল না। আগের যুগে মানুষ মারত একজন। খুন হতো একজন। দশজন একত্রে খুন হতো না। প্রতিপত্তির জন্য দুই দলের মধ্যে মারামারি হয়ে খুন হয়ে যাওয়া– এটা আগে হতো না। এখন এটা হয়। আগে জমির জন্য খুন হতো একজন। একজন খুন হলেই সব ভয় পেয়ে পালিয়ে যেত। কিন্তু এখন ক্ষমতার লড়াইতে বন্দুক হাতে নেমে পড়ে। একই দলের লোক তারা। তারা জানে যে আমি যদি কর্তৃত্বের দায়িত্ব না পাই তাহলে আমি বেশি টাকা মারতে পারব না। সুতরাং প্রতিপক্ষকে খুন করতে হবে। ডু ওর ডাই একটা সিচুয়েশন। এটা একটা নেকিতবাচক দিক। রেপের কথা বলছিলাম। আমাদের এখানে দেবতাদের সমাজ ছিল না। এই সমাজটার মধ্যে চিরকালই হয়ত রেপ হতো। কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়েকে রেপ করার কথা কল্পনাও করতে পারিনি। শুনিওনি জীবনে। ধরা যাক অসহিষ্ণুতা। অসিহষ্ণুতাকে এই রকম পর্যায়ে যেতে দেখিনি। আমরা গণতান্ত্রিক সমাজ গড়বো বলে কথা বলি। অথচ আমি নিজের সংসারের মধ্যেই অন্যের মতামতকে গ্রহণ করি না। এটা কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ব্যাপার নয়। এই জাতীয় পরিবর্তন হচ্ছে। এখন টাকার প্রতি মানুষের ভয়ানক লোভ। আগে লোকে দান করত। কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে প্রায় এক হাজার ইনডাওমেন্ট আছে। ঢাকায় ইনডাওমেন্ট সাম্প্রতিক সময়ে দু একটা করে হতে শুরু করেছে। কলকাতায় একটা ইনডাওমেন্ট আছে পিআরএস। গত ঊনিশ শতকের ঘটনা। পিআরএস এতবড় নাম করা স্কলারশিপ ছিল যে, এটাকে একটা ডিগ্রির মতো দেখত। প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার। তারপর রবীন্দ্রনাথের বংশেরই একজন লোক– প্রসন্নকুমার ঠাকুর। প্রসন্নকুমার ঠাকুর ১৮৬৮ সালে যখন মারা যান, আড়াই লাখ টাকা কলকাতা ইউনিভার্সিটিকে দিয়েছেন। সেই যুগের আড়াই লাখ টাকা। এখনকার পঁচিশ কোটি টাকা থেকেও অনেক বেশি। হয়ত দুইশ কোটি টাকার সমান– দিয়ে গেছেন সেই সময়ে। নিজের ছেলেকে কিচ্ছু দেননি। কাজেই এই যে টাকার লোভ, এই যে প্রতিযোগিতা, গলা টিপে ধরে ওকে মেরে আমি বড় হব, ওর বাড়িতে জন্মদিন পালন হয়, আমার বাড়িতেও জন্মদিন পালন করতে হবে। লাগলে চুরি করে আমি জন্মদিন পালন করব আমার সন্তানের। চুরি করে মানে অসৎ উপায়ে টাকা উপার্জন করে। এই যে জিনিসটা, এগুলো ছিল না কখনো। কিন্তু ইতিবাচক দিক, যেমন মেয়েরা এগিয়ে গেছে আমাদের সময়ে। মেয়েরা এখন লেখাপড়ায় এগিয়ে গেছে। চাকরি বাকরিতে এগিয়ে গেছে। মেয়েরা এখন নিজের পরিবারের আয়তন সম্পর্কে একটা বক্তব্য রাখতে পারছে। নিজেরা পরিবারের ডিসিশান মেকিংয়ে ভয়েস দিতে পারছে। এটা একটা দারুণ পরিবর্তন হয়েছে। উন্নতির দিকে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি আরেকটা জিনিস যেটা ইতিবাচক হিসেবে বললেন, যেমন শিক্ষার হার বেড়েছে; কিন্তু আবার শিক্ষার মানও তো অনেক নেমে গেছে।
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, শিক্ষার মান নেমে গেছে। এটা একটা নেতিবাচক দিক। আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম প্রথম আলোতে, কয়েক বছর আগে ‘বিশ্ববিদ্যা লয়’; তো সত্যি সত্যি লয়প্রাপ্ত হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, আমার মনে আছে ওইটা। পরে আরেকজন ওইটার বিরোধিতা করে কিছু একটা লিখেছিলেন।
Murshid-3.jpg
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, অশ্রুকুমার না কী একজন লিখেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: না, তার নাম হলো সৌরভ শিকদার।
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, সৌরভ শিকদার। অশ্রুকুমার শিকদার বলে একজন আছেন তো তাই উনার নামটা মনে পড়ল। শিকদার থেকে ওই নামটা মনে পড়ল।
রাজু আলাউদ্দিন: আর এখন তো ধরেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়া– এটা কমন একটা ব্যাপার হয়ে গেছে।
গোলাম মুরশিদ: শিক্ষার মান নেমে গেছে। অসাধুতা ঢুকেছে। অসাধুতা কতটা ঢুকেছে সেটা আপনাকে একটা প্রতিতুলনা দিয়ে বলতে পারি। যেমন ধরুন, আমার বাবা ছিলেন একজন হেডমাস্টার। এখনো আমার মনে পড়ে, আমাকে বললেন যে, আজকে ইংরেজি পরীক্ষা। প্রশ্নগুলো (স্কুলে) নিয়ে আসিস। আমিও একজন ছাত্র। অথচ আমাকে বললেন যে প্রশ্নগুলো নিয়ে আসিস স্কুলে। আমি তখন ছোট। কাজেই আমি চেয়ারের উপরে উঠে তাকের মধ্যে দেখে দেখে ইংরেজির প্রশ্নগুলো একসাথে করে বোগলে করে নিয়ে গিয়ে অফিসে গিয়ে বাবার হাতে প্রশ্নগুলো দিলাম। তারপরে আমি পরীক্ষার হলে চলে গেলাম। ওর মধ্যে আমার প্রশ্নও আছে। কিন্তু আমার কোনোদিন মাথায়ই আসেনি যে প্রশ্নগুলো দেখি। এই যে সততার শিক্ষাটা ছিল, এই শিক্ষাটা এ যুগে নেই। এ যুগে টাকা দিয়ে মানুষ নকল করে এবং এ যুগে যেহেতু ডিগ্রির দাম বেশি, ডিগ্রি না হলে উন্নতি করা যাবে না, সে জন্য বোধহয় এ রকম অসাধুতার আশ্রয় নেয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস বলতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানবিক বিভাগে সাহিত্য, দর্শন– এগুলোতে ছাত্রদের আগ্রহ অনেক কমে গেছে। ছাত্রসংখ্যা কমে গেছে। অন্যান্য যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে, সেখানে এরকম আলাদা কোনো ডিপার্টমেন্টই নাই। হয়ত অন্য বিষয়ের সাথে কিছু কিছু পড়ানো হয়, কিন্তু আলাদা কোনো ডিপার্টমেন্ট নাই। মানবিক মূল্যবোধের বিস্তার ঘটাবার জন্য সাহিত্যের তো একটা ভূমিকা থাকে। আপনার কি মনে হয় না সাহিত্য-বিমুখতা, দর্শন-বিমুখতা এটা মানুষের অনুভূতিকে আরো ভোতা করে রাখছে? বা সেই কারণে নানা রকম সামাজিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে?
গোলাম মুরশিদ: সেই কারণে কি না জানি না। কিন্তু এখনকার ছেলেরা যে এই বিষয়গুলো পড়ছে না, সাহিত্য পড়ছে না, দর্শন পড়ছে না, ইতিহাস পড়ছে না– এর একটা কারণ হচ্ছে এই সাবজেক্টে পড়ে চাকরি পাওয়া যায় না।
রাজু আলাউদ্দিন: কোনো সম্মানজনক পেশায় ঢোকা যায় না। সম্মানজনক বলতে অর্থের দিক থেকে উপরে ওঠা যায় না।
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, অর্থ। সুতরাং তারা এটা পড়তে যায় না। আর পড়তে না যাওয়ার কারণে যেটা হচ্ছে, সেটা হলো মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ কম ঘটছে। কিন্তু যারা সাহিত্য পড়ে, তাদের মধ্যেও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে না। কারণ, তারা বই পড়ে পরীক্ষায় পাশ করার জন্যে। শিক্ষা গ্রহণ করে না। যেমন ধরুন, আপনাকে আমি একটা কথা বলি, সদা সত্য কথা বলিবে। এই কথাটা পড়তে না পারা একটা স্টেইজ। একটা স্টেজ হচ্ছে পড়তে পারা বানান করে– সদা সত্য কথা বলিবে। তারপরের স্টেজটা হচ্ছে, এইটার অর্থ বোঝা। তারপরের স্টেজ হচ্ছে এটাকে পালন করা। আমার নিজের জীবনে এটা ঘটেছে। আমার নানার দেয়ালে লেখা ছিল ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। তো আমি বাবার কোলে বসে একদিন বানান করে পড়ার চেষ্টা করছি। বোধহয় ‘সত্যটা’ পড়তে পারিনি বা কিছু হবে। তো বাবা বললেন সদা সত্য কথা বলিবে। তারপর ভাবলাম, অর্থটা কী? অর্থ নিজেই শিখতে পারলাম কিছুদিন পরে। আর আমি বলতে পারি, পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি কার্যত মিথ্যে কথা বলিনি। কারণ আমার নানা ছিলেন খুবই সত্যবাদী লোক। আর বাবা বলতেন, সত্য কথা বল, মারব না। সত্য কথার একটা মূল্য ছিল। এখন সত্য কথা বলার মধ্যে কেউ কোনো এ্যাপ্রিশিয়েট করে না। সত্য কথা বলার মধ্যে বিশেষ কোনো গুণ আছে–এটা মানুষ মনে করে না।
রাজু আলাউদ্দিন: কারণ সত্যের কোনো সার্ভাইবিং ভ্যালু নাই তো। সেই কারণে এটা মূল্যহীন হয়ে গেছে।
গোলাম মুরশিদ: ধরা যাক, রাজশাহী থেকে নাটোর পর্যন্ত ত্রিশ মাইল রাস্তা নাটোরের রাজা তৈরি করে দিয়েছিলেন। বৃটিশ সরকার করেনি। আর এখানকার এক নাম করা ধনী লোক, এই বাংলাদেশের, যার হাজার কোটি টাকা আছে অন্তত, সেই ভদ্রলোক ওয়ান ইলেভেনে ধরা পড়েছিলেন সম্ভবত। তখন জানা গেল যে বড় রাস্তা থেকে তার বাড়ি, কয়েকশ গজ, এই রাস্তাটা সরকারি টাকায় উনি করে নিয়েছেন। আপনার বাড়ির রাস্তা আপনি তৈরি করবেন। সেটা সরকারি টাকায় কেন!
রাজু আলাউদ্দিন: উনি কিভাবে করলেন সরকারি টাকায়?
গোলাম মুরশিদ: তিনি তো খুবই ইনফ্লুয়েনশিয়াল মানুষ। আর ওদিকে নাটোরের রাজা নাটোর থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ত্রিশ মাইল রাস্তা তিনি নিজে করে দেন। এ যুগে আপনি শত শত কোটি টাকা চুরি করতে পারবেন বা ডাকাতি করতে পারবেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু অল্প কয়েক টাকা চুরি করলে আপনি গণপিটুনিতে মারা যেতে পারেন।
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, তাও মারা যেতে পারেন। এবং আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত! রিজার্ভ করা থাকল। এই হচ্ছে মূল্যবোধের পরিবর্তন। এ যুগে মানুষ ত্যাগ করে না কিছুই। দানশীলতা নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: গ্রহণশীল হয়ে গেছে। আরেকটা জিনিস, সেটা হলো, সংস্কৃতির পরিবর্তন ইতিবাচক নেতিবাচক দুভাবেই ঘটে, যেটা আপনি বললেন; তো একটা বিষয় কি আপনার মনে হচ্ছে না যে মানুষ ক্রমশ আরো বেশি ধর্মপ্রবণ মানে ধর্মান্ধতা বা মৌলবাদী ভাবনার দিকে বেশি ঝুঁকে পরছে?
গোলাম মুরশিদ: ধর্ম অর্থ যদি হয়ে থাকে আচার অনুষ্ঠান, তাহলে ধার্মিক হচ্ছে। অর্থাৎ, যে কথাটা একটু আগে বলছিলাম, সত্য কথা বলা। আপনি যদি বলেন সত্য কথা বলছে কি না, তাহলে আমি বলতে পারব না যে ধার্মিক হচ্ছে। কিন্তু আপনি যদি বলেন ধর্মীয় অনুষ্ঠান করছে কি না; তহালে বলবো ধার্মিক হচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মের নিয়ম কানুন পালন করছে। কিন্তু ধার্মিক হচ্ছে কি না, সেটা বলা মুশকিল। এবং ধর্মীয় গ্রন্থে যা যা লেখা আছে, সেইগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে মানবতার কথাটা নেই। সেখানে সাধারণ একজন ভদ্রলোক হতে গেলে যে সমস্ত নিয়ম পালন করার দরকার, সেটা করে না। যেমন ধরুন, আমি ইংল্যান্ডে আছি, সেখানকার সুপার মার্কেট থেকে মোরগ কিনবে না বহু মুসলমান। তার কারণ, এটা হালাল কি না সন্দেহ আছে। এইটা চিন্তা করে। কিন্তু চুরি করার সময়ে টাকাটা হালাল কিনা সে কথা চিন্তা করে না। কাজেই এটা হচ্ছে ধর্মের বাহ্যিক নিয়মকানুন। সেইটা পালন করার দিকে ঝোঁক বেড়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: হালাল মোরগ কেনা প্রসঙ্গে আমার একটা গল্প মনে পড়ল। আমি তখন ম্যাক্সিকোতে থাকতাম। তো আমাকে একবার এক বাঙালি বন্ধু আড্ডায় বলেছিল, প্রবাসী বাঙালিদের কারো কারো ধর্মসম্পর্কীয় ধারণা কেমন এটা বুঝাতে। তারা বাসায় আড্ডায় দিচ্ছে, মদ্যপান করছে, তারপরে যখন খাওয়ার সময় হয়, হোস্ট বলছে, আসেন, খেতে আসেন। হোস্ট তো বন্ধু। তারা বলে যে, দোস্ত মাংস কোত্থেকে কিনছস? মুরগিটা কি হালাল উপায়ে জবাই করা? সে কিন্তু নিষিদ্ধ মদ্যপান করছে! কিন্তু খাবারটা তার হালাল চাই। আর ওই যে আপনি যেটা বললেন, তার রুজি হালাল কি না সেটা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু খাবারটা হালাল হতে হবে, ইসলামি শরিয়াহ মতো পোশাক আশাক পরতে হবে।
গোলাম মুরশিদ: এবং বউকে সবসময় পর্দায় রাখতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: নিজে বেপর্দায় ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু বউকে পর্দায় রাখতে হবে।
গোলাম মুরশিদ: সবচে’ বড় আক্রোশ হচ্ছে মেয়েদের উপর। মেয়েদের পর্দা করাও। ধর্মের কথা বলে ভয় দেখাও। এটা হচ্ছে সবচে’ বড় অস্ত্র।
রাজু আলাউদ্দিন: ধর্মটা তো এখানে অস্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করা হয়।
Murshid-5
গোলাম মুরশিদ: বিশেষ করে মেয়েদের শাসন করার ব্যাপারে পুরোপুরি ধর্মের রীতি পালন করা হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি পাকিস্তান আমল দেখছেন। তখন আপনি যুবক। তো পাকিস্তান আমলে ধর্ম নিয়ে যতটা কথা বলা যেত, সমালোচনা করা যেত, এখন কি সেইরকম করা যায়?
গোলাম মুরশিদ: মোটেই যায় না। কারণ, ধর্ম সম্পর্কে সমালোচনা করবেন, আপনার মাথা কয়টা? ক’টা মাথা আছে আপনার যে সমালোচনা করবেন? সমালোচনা করতে পারবেন না। করলে গলাটা ঘ্যাচ করে কেটে দেবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু বাংলাদেশ তো স্বাধীনই হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ একটা জায়গা থেকে। ধর্মমুখী কোনো স্লোগান দিয়ে তো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি।
গোলাম মুরশিদ: না, তা হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সেই প্রতিশ্রুতি বলতে গেলে কিছুই পালন হয়নি। যেটা হয়েছে, সেটা হলো অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের লাখখানেক পরিবার অত্যন্ত ধনী হয়েছে। কোটিখানেক লোক অত্যন্ত ধনী হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য বিষয়, সেগুলো তো পালন করা সম্ভব নয়। পালন করা কঠিন। যেমন ক্ষমতার লড়াই, এটা গণতন্ত্রকে ছাপিয়ে উঠেছে। সাম্যবাদ ছিল বাংলাদেশের চারটে স্তম্ভের একটা স্তম্ভ। কবে সেই স্তম্ভ ধ্বসে গেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ধ্বসে গেছে। আছে জাতীয়তাবাদ। সেটা আবার ইসলামি জাতীয়তাবাদ। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা যারা বলে, তারাও গিয়ে ইসলামি দলের সঙ্গে হাত মেলায়। কাজেই তাদের জাতীয়তাবাদটা মুখে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কাজে ইসলামি জাতীয়তাবাদ।
রাজু আলাউদ্দিন: ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগান দিয়ে যেই দলটার নেতৃত্বে বাংলাশে স্বাধীন হয়েছিল সেই দল তো এখন ক্ষমতায় আছে।
গোলাম মুরশিদ: আমি আসলে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। আওয়ামী লীগ হলেও তো কিছু যায় আসে না। আওয়ামী লীগের তো বিবর্তন ঘটছে। আমার যেটা ধারণা, দলের মধ্যেও বিবর্তন ঘটে। কাজেই দল যে আগাগোড়া এক রকম থাকে, তা না। যেমন আওয়ামী লীগ যখন স্থাপিত হয় তখন এটা ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে মুসলিমটা খসে গেল। খসে গিয়ে হয়ে গেল আওয়ামী লীগ। আবার একটা অংশ ন্যাপ হয়ে গেল। ন্যাপ ভাগ হয়ে গেল। ভাগ হয়ে গিয়ে একটা হলো জাসদ। জাসদ থেকে আরেকটা হয়ে গেল বাসদ। কাজেই বিবর্তন ঘটে তো।
রাজু আলাউদ্দিন: ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথা বহুদিন থেকেই বলা হচ্ছে। বহুদিন থেকে অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ আওয়ামী লীগ তো নিতে পারে। আওয়ামী লীগের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি।
গোলাম মুরশিদ: প্রত্যাশার কথা আমি বেশি কিছু বলতে পারব না। আমি আসলে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এটা তো সংস্কৃতির একটা অংশ। এখন আমাদের কী করা উচিত? করণীয় কী?
গোলাম মুরশিদ: করণীয় কী সে তো বলবে রাজনীতিকরা। বা সমাজকর্মীরা। আমি ইতিহাস লিখি। কাজেই অতীতে যেটা হয়ে গেছে আমি সেইটা লিখি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেই অতীতের শিক্ষা থেকে আপনার কী পরামর্শ হতে পারে?
গোলাম মুরশিদ: না, আমার কোনো পরামর্শ নাই। আমার পরামর্শ যাতে আমাদের মঙ্গল হবে সেই দিকে যাওয়া।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো এই সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। আপনি জাতির একটা অংশ। এই জাতির মঙ্গল হলে তার সুফল আপনি ভোগ করবেন। খারাপ হলে আপনি দুর্ভোগ পোহাবেন।
গোলাম মুরশিদ: আমি ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করি। কাজেই ডেমোক্রেটিভ অপিনিয়ন অনুসারে দেশের বেশিরভাগ লোক যদি বলে যে, আমরা ধর্মীয় সংস্কৃতি চাই– তাহলে আমি মানতে পারি কিংবা না পারি, আমাকে ওইটাই মেনে নিতে হবে। আমি পছন্দ করি অথবা না করি ওইটাই মেনে নিতে হবে। কারণ ওইটা হচ্ছে বেশিরভাগ লোকের চাহিদা।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু সব বাংলাদেশিরা তো এই দাবি করেনি যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হোক।
গোলাম মুরশিদ: একটা জিনিস আপনাকে মনে রাখতে হবে, সেটা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমর্থন করলেও এই যে দেশটা, এটা কিন্তু মুসলিমপ্রধান দেশ। কাজেই আমাদের ভালো লাগুক কি না লাগুক, এই দেশটা মুসলমানি দেশ। আমি যেই দেশে থাকি ইংল্যান্ডে, সেই দেশটা হচ্ছে একটা ক্রিশ্চিয়ান কান্ট্রি। কিন্তু সেখানে ক্রিশ্চিয়ান কান্ট্রিতে অন্য ধর্মের যারা লোক, তাদের থাকতে কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ ধর্মের জন্য সেখানে কেউ অত্যাচারিত হয় না। ধর্মের জন্য কেউ ফেবারও পায় না। কাজেই এটা একটা ক্রিশ্চিয়ান কান্ট্রি হলেও ইট অলসো এ ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি। বাংলাদেশ সেরকম হতে পারে। ধরা যাক বাংলাদেশে শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান। কাজেই মুসলমানি আইনকানুন অনেক কিছু থাকতে পারে। আছেও। কিন্তু এটা যদি সত্যিকারের ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি হয়, তাহলে মুসলিম ভ্যালুজ থাকা সত্ত্বেও কোনো অসুবিধা থাকার কথা না।
রাজু আলাউদ্দিন: মুসলিম মূল্যবোধ থাকা–সেটা তো কোনো অবস্থাতেই খারাপ কিছু বোঝায় না। এতে কোনো পশ্চাতপদতাও বোঝায় না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রের কেন একটা ধর্ম থাকতে হয়!
গোলাম মুরশিদ: আমরা তো জানি এরশাদ এটা করেছিলেন। এরশাদ করেছিলেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে। এরশাদ যে খুব ধার্মিক লোক ছিলেন, তা তো কেউ বলবে না। এখনো উনি ধর্ম করেন কি না আমার জানা নেই। কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে, উনি ক্ষমতায় টিকে থাকবেন বলে, ইসলামি দলগুলোর সাপোর্ট পাবেন বলে উনি ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম করেছিলেন। এবং তারপর এখন আপনি যদি শত ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাস করেন তবু আপনার পক্ষে দেশটাকে ধর্মনিরপেক্ষ করা সম্ভব হবে না। তার কারণ, চারদিক থেকে মারমার কাটকাট শব্দ হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন তো এটাই হয়ে গেছে। যে-ই এটাকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেবে, সেই দলেরই পতন ঘটবে।
গোলাম মুরশিদ: কাজেই ইচ্ছা করলেও বর্তমান সরকার বা অন্যকোনো সরকার পরিবর্তন করতে পারবে না। কারণ এটা সংবিধানে লেখা হয়ে গেছে। এটা পরিবর্তন করা কঠিন হবে। এমনকি রাষ্ট্রীয় ধর্ম তো দূরের কথা, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, এই কথাটা সংবিধানে লেখা হবে না বলে যে বাহাত্তরের সংবিধানে যাওয়া হলো সাম্প্রতিক কালে, কিন্তু এই কথাটা মোছা গেল না। তার কারণ, এটি করতে গেলে বর্তমান দল যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদেরকে দারুণ বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে। সুতরাং তারা এটাকে পরিবর্তন করতে পারল না। যদিও পার্লামেন্টে তাদের লার্জ মেজরিটি আছে। পাঁচভাগের চারভাগ হচ্ছে বর্তমান সরকারের পক্ষ। তা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তার কারণ, জনগণের মতামত অন্য রকম। আপনারা দেখেছেন নিশ্চয় হেফাজতে ইসলামের যে ঢাকা দখল করার উদ্যোগ, সেটা ভয়ানক একটা ব্যাপার। ধর্মের নামে মানুষ জীবন দিয়ে দিতে পারে। নিজে অধার্মিক হয়েও ধর্মের জন্য জীবন দিতে পারে। কাজইে এটা তো করা সম্ভব নয়। এটা জাতিরজনক শেখ মুজিব করতে পেরেছিলেন। তার কারণ তখন বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল ওইভাবে। এবং বাংলাদেশের সংবিধান পাশ হয়েছিল ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে। অত সকাল সকাল করতে পেরেছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার সম্পর্কে তীব্র বিরোধিতা দেখা যাচ্ছিল, সেটা তো বোঝাই যায় কয়েক বছর পরের ঘটনা থেকে। কাজেই তিনি এই দেশের একটা ফাদার ফিগার হওয়া সত্ত্বেও তাকে এই দেশে নিহত হতে হয়। তার কারণ স্ট্রং অপজিশন। এবং সেই অপজিশনের একটা ভিত্তি হচ্ছে ইসলাম। ধর্ম একটা ভিত্তি।
রাজু আলাউদ্দিন: ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে সংযোগ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণেই কি সংযোগটা দরকার ছিল না অন্য কোনো কারণ ছিল?
গোলাম মুরশিদ: আমি ঠিক বলতে পারব না। তার কারণ, আমি এই জিনিসগুলো অত খুঁটিয়ে দেখিনি। কিন্তু তার একটা বদনাম ছিল, তার সম্পর্কে বা তখনকার সরকার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে যে, তিনি ভারতের দালাল। রাশিয়ার দালাল। সেই দুর্নাম ঘোচাবার জন্যে ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হয়েছিল। আর তা না হলে, আপনি হয়ত জানেন, ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত সৌদি আরব বাংলাদেশকে রিকোগনাইজড করেনি। উনি নিহত হওয়ার পর সৌদি আরব স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশকে। এবং চিন। এই দুটো দেশতো আগে স্বীকৃতি দেয়নি। তো এর দ্বারা কী বোঝা যায়!
রাজু আলাউদ্দিন: একটা বিষয় নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। সেটা হলো, বিএনপি দাবি করছে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। আর আওয়ামী লী বা দেশের অন্য সবাই দাবি করছে শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আপনার একট বই আছে। সেই বইয়ের মধ্যে আপনি দেখিয়েছেন যে, জিয়াউর রহমান চিটাগঙে শুধুমাত্র স্বাধীনতার ঘোষণাটা পাঠ করেছেন। ‘পাঠ’ আর ‘ঘোষণা’তো এক জিনিস না।
গোলাম মুরশিদ: উনি ‘পাঠ’ করেছেন চল্লিশ ঘণ্টা যুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর। আর বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছেন ৭ মার্চ। উনি যে বলেছিলেন, যা কিছু তোমাদের আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো– সেই কথাটাই মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। জিয়াউর রহমান বলে একজন লোক ছিলেন, এটা এই দেশের মানুষের জানা ছিল না। এবং তার আহবানে কিছু যায় আসে না। কেউ যুদ্ধ করতে নামেনি তার আহবানে। তবে তার যে আহবানটা, সেটা হয়ত লোকেদেরকে উৎসাহিত করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: নিশ্চয়। সামরিক বাহিনীর সংযুক্তিটা সাধারণ মানুষকে বা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আরো উৎসাহিত করেছে।
গোলাম মুরশিদ: এটা করেছিল। এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু ঘোষক হিসেবে দাবি করাটা….
গোলাম মুরশিদ: অবশ্যই তিনি ‘ঘোষক’ না। তার ঘোষণায় কিছুই যায় আসে না। তার ঘোষণায় কেউই যুদ্ধ করতে নামে নাই।
Murshid-6
রাজু আলাউদ্দিন: এবং এটাকে ঘোষণা বলাও তো ঠিক হবে না। আমি মনে করি এখানে এই শব্দটার ব্যবহার হচ্ছে মিসলিডিং ব্যবহার। কারণ হচ্ছে, যিনি সংবাদ পাঠ করেন তিনি তো ঘটনার অংশগ্রহণকারী না। তিনি তো পাঠ করছেন।
গোলাম মুরশিদ: সংবাদ-পাঠক।
রাজু আলাউদ্দিন: সংবাদ-পাঠক। আমি মনে করি, জিয়াউর রহমানের যে ভূমিকা, সেটা হলো উনি ঘোষণার পাঠক মাত্র। ঘোষক না।
গোলাম মুরশিদ: তাছাড়া উনি নিজে ঘোষণা করতে যাননি। এবং নিজে ঘোষণাপত্র লিখেননি। বেলাল মোহাম্মদ তিনি ওইটা লিখে তাকে দিয়েছিলেন। ভদ্রলোক তাকে বলতে উৎসাহিত করেছেন যে, আপনি যদি বলেন, তাহলে এখানকার সৈন্যরা উৎসাহ পাবে। লোকেরা রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্টে অংশ নেবে। সেইটা করিয়েছিলেন। আর এই ঘোষণা সামান্য একটা অংশে শোনা গিয়েছিল। সর্বত্র শোনাও যায়নি। কাজেই এটা নিয়ে খামোখা বিতর্ক করার কোনো মানেই হয় না। বিএনপি বড় করে দেখায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি নিজে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষার বিষয়ে আপনি লিখেছেনও। এখনকার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আমরা অনেকগুলো ব্যাপার দেখতে পাই। একদিকে আছে মাদরাসা। আরেকদিকে আছে ইংরেজি, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজ। আবার আরেকদিকে আছে বাংলা। তো এই যে এতগুলো শিক্ষাব্যবস্থা, এদের সিলেবাস, কারিকুলাম সবই ভিন্ন। আপনি কি মনে করেন এগুলো একটা জাতির জন্য খুব স্বাস্থ্যকর?
গোলাম মুরশিদ: মোটেই না। খুবই অস্বাস্থ্যকর। যতদিন পর্যন্তু এই ব্যবস্থা থাকবে, ততদিন দেশে দুইতিন রকমের শ্রেণি তৈরি হবে। একদল ধর্মজীবি, একদল ইংরেজিজীবি, আরেক দল বাংলাজীবি। এরকম একটা জিনিস তৈরি হবে। এবং দেশের মধ্যে লেখাপড়ার যে বিকাশ ঘটা বাঞ্ছনীয়, সেটা হবে না। যতদিন পর্যন্ত একধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত না হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: মাদরাসা শিক্ষব্যবস্থার আসলে কি কোনো প্রয়োজন আছে?
গোলাম মুরশিদ: আমার নিজের ধারণা, এই দেশের লোক যেহেতু ধর্মভীরু, সেই জন্য ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত শিক্ষা নিতে চায় অনেকেই। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে শিখতে গেলে স্কুলেও শেখা যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, এখনো হয়ত আছে, ইসলাম এটা একটা সাবজেক্ট ছিল।
গোলাম মুরশিদ: ইচ্ছা করলে ইসলামধর্ম সাবজেক্টটাকে বাড়িয়েও দেয়া যায়। যারা ইতিহাস পড়বে তারা যেমন ইতিহাস পড়তে পারে, ভূগোল পড়বে যারা ভূগোল পড়তে পারে, সেই রকম ইসলামিক এডুকেশন যারা নিতে চায় তারা ইসলামিক এডুকেশন নিতে পারে। সেটা স্কুলের মধ্যে থেকেও সম্ভব।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি সেটাই বলতে চাচ্ছি। আলাদা করে মাদরাসা তো দরকার নাই। যদি ইসলামি শিক্ষাটাই লক্ষ্য হয়, সেটা তো স্কুলে কলেজগুলোতেই শিখতে পারে। আগে তো শেখা যেত।

গোলাম মুরশিদ: আমি এখনকার মাদরাসা ঠিক কী রকম, জানি না। এটা কীভাবে তৈরি হয়েছে, কীভাবে কাজ চলে, কী কী পড়ানো হয় এ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। এ জন্য আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমার নিজের বিশ্বাস, ইসলামিক শিক্ষা মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য থেকেও নেয়া যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আর ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর সংস্কৃতি সম্পর্কে যদি বলেন।
গোলাম মুরশিদ: যারা ধনী তারা এই শিক্ষা নিতে চায়। তার কারণ এই শিক্ষার মধ্যদিয়ে একটা শাসক গোষ্ঠী তৈরি হবে বলে আমার ধারণা। সুতরাং তারা এফোর্ট করতে পারে ইংরেজি শিক্ষা। এবং বিদেশে পাঠায় বা বিদেশে যেতে সাহায্য করে এই শিক্ষা।
রাজু আলাউদ্দিন: শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?
গোলাম মুরশিদ: এটা তো আমি সাজেস্ট করতে পারি না।
রাজু আলাউদ্দিন: শিক্ষক হিসাবে আপনি…..
গোলাম মুরশিদ: শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি একটা ধারাই থাকা উচিত। কিন্তু সেটা দেশে কীভাবে করা হবে সে সম্পর্কে আমার কোনো মতামত নেই। মতামত নেই ঠিক না, আমি কোনো মত দিতে পারি না।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস, যেটা আপনি বলছিলেন, আগে ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করা যেত, কথা বলা যেত, যেমন পাকিস্তান আমলে; ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ উনি নিজে ধার্মিক ছিলেন, পণ্ডিত ছিলেন, গবেষক ছিলেন, ধর্ম করলেও উনার মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না বা ধর্মান্ধতা ছিল না। ধর্ম নিয়ে তার অনেক সমালোচনাও আছে, মানে আচারনিষ্ঠ যে ধর্ম সেটা নিয়ে। সেই শহীদুল্লাহ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
গোলাম মুরশিদ: শহীদুল্লাহ সাহেব সম্পর্কে আমি বেশিকিছু জানি না। উনি বাংলাভাষার একজন মস্তবড় পণ্ডিত। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে উনি লিখেছেন। কিন্তু বাংলাভাষা নিয়েই উনি গবেষণা করেছেন প্রধানত। আমি তার বই পড়েছি। বাংলা ভাষাতত্ত্ব নিয়ে তার লেখা পড়েছি। কিন্তু এমনিতে আমি তার সম্পর্কে বেশিকিছু জানি না। তাকে আমি জীবনে একবারই দেখেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: কোথায় দেখেছিলেন?
গোলাম মুরশিদ: বাংলা একাডেমিতে।
রাজু আলাউদ্দিন: কী উপলক্ষে দেখা হলো?
গোলাম মুরশিদ: একটা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলেন?
গোলাম মুরশিদ: দিতে গিয়েছিলাম। আমি ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম একটা চাকরির জন্য। উনি ছিলেন তার মধ্যে।
রাজু আলাউদ্দিন: একটু ডিটেলস বলেন, উনার সঙ্গে দেখা হওয়া এবং কথা বলা নিয়ে..
গোলাম মুরশিদ: যদ্দূর মনে পড়ছে, আমি পাশ করার পর একটা চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। তখন আমাকে ইন্টারভিউতে ডাকা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমি যাদের দেখতে পাই তাদের মধ্যে একজন উনি। উনার বই আমি আগেই পড়েছি। কিন্তু ইন্টারভিউ বোর্ডে আমি দেখলাম, উনি একজন। কী প্রশ্ন করেছিলেন আমার মনে নাই। কারণ, অনেক কাল আগের কথা। ১৯৬৩ সালের কথা।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার তো আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে পুরনো বাংলা গদ্য নিয়ে। ওখানে পুরনো বাংলা গদ্যের অনেক নমুনা আপনি দেখিয়েছেন। বাংলা গদ্যের বয়স তো অনেক কম। মানে ইংরেজি, স্প্যানিশ কিংবা জার্মান গদ্যের তুলনায়। এবং বাংলা গদ্যের আদিতম নমুনায় দেখা যায় বাক্যগুলো অসংগঠিত। বা আজকে আমাদের কাছে অসংগঠিত মনে হয় বা অবোধ্য মনে হয়। ইংরেজরা এসে বাংলা গদ্যের বিকাশে প্রবল এক ভূমিকা পালন করল। ইংরেজরা এই ভূমিকা না নিলে আপনার কি মনে হয় বাংলা গদ্য তার নিজস্ব চরিত্র নিয়ে দাঁড়াতে পারত?
গোলাম মুরশিদ: নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ ঘটত। হয়ত একটু দেরি করে ঘটত, কিন্তু ঘটত। তবে ইংরেজরা আসায় ইংরেজি চর্চার সাথে বাংলাচর্চার একটা দিক তৈরি হলো। তার আগে পর্যন্ত নবাবী আমলে সরকারি ভাষা ছিল ফার্সি। কাজেই শিক্ষিত হতে গেলে সবাই ফার্সি শিখত। ফার্সি শিখলে চাকরি পাওয়া যেত। এখানে ইংরেজ আসার পরে তারা ফার্সিকে তুলে দিল। ইংরেজি চালু করল। সেই সঙ্গে যারা বাংলা শিখত, তারাও চাকরি পেত। তার কারণ, কলকাতা-কেন্দ্রিক নগরায়ন শুরু হলো। আরো একটা কারণে বাংলার বিকাশ ঘটল, সেটা হচ্ছে, ইংরেজরা আইন করল, সব আইনগুলো বাংলা এবং ফার্সিতে অনুবাদ করতে হবে। মুন্সিদের সাহায্যে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে ইংরেজ সাহেবরা দেখলেন কাজটা খুবই কঠিন। তার কারণ, বাংলাই ঠিকমতো লেখা হচ্ছে না। সাধারণ বাংলাই লেখা যাচ্ছে না। তার উপর আইনের ভাষা অনুবাদ করা। খুবই কঠিন। সেইটা করতে গিয়ে একদিকে বাংলাভাষার বিকাশ ঘটল, আরেক দিকে বাংলাভাষাটা একটা বিশেষ ধরনের ভাষায় পরিণত হলো। কৃত্রিম বাংলায় পরিণত হলো। বাক্যগুলো লম্বা, অসমাপিকা ক্রিয়া দিয়ে ক্রমাগত লম্বা করা হচ্ছে। তার কারণ, আইনের ভাষা সাধারণভাবে ওই রকমই হয়। ইংরেজিতেও আইনের যে ক্লজ, হয়ত একটা প্যারাগ্রাফ একটা ক্লজ। এইটার সঙ্গে মিল রেখে বাংলা করতে গিয়ে এই বাংলাটা জটিল বাংলা হয়ে গেল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের আগে পর্যন্ত এই জটিল বাংলায় মোট ঊনিশটি বই লেখা হয়েছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের যে মুন্সিরা লিখতে শুরু করল, তারা কিন্তু এই মডেলটা সামনে পেয়েছিল, আইনের বইয়ের। এবং তারা সেই জিনিসটা লিখলেন। আইনের বই প্রনয়ণ করতে গিয়ে কঠিন বাংলা লিখে ফেললেন। আপনি আরেকটা বিষয় জানতে চেয়েছেন, ইংরেজরা না এলে হতো কি না। ইংরেজরা না এলে তখনই হতো না। অনেক পিছিয়ে যেত। ইংরেজরা ডকুমেন্টেশন পছন্দ করে। নবাবরা ডকুমেন্টেশনের ধার ধারে না। নবাবরা হুকুম দিল গলাটা কেটে নিয়ে এসো, কেটে নিয়ে আসল। কিন্তু ইংরেজদের হুকুম দিলে চলবে না। হুকুমটা লিখিত হতে হবে। তো এই জাতীয় কাজে বাংলার ব্যবহার বেড়ে গেল। এবং বাংলার ব্যবহার করতে গিয়ে, যেমন আইনের অনুবাদ করতে গিয়ে বাংলাটা একটা বিশেষ ধরনের চেহারা নিল।
রাজু আলাউদ্দিন: ইংরেজরা বিদেশি। বাংলা তাদের মাতৃভাষা না। তাদের পক্ষে অন্য একটা ভাষার কাঠামো বোঝা এবং সেইটা বুঝে বিকাশ ঘটানো– এটা অস্বাভাবিক মনে হয় না? কারণ ওরা তো এই ভাষাটা জানতই না! বাঙালির মতো এই ভাষা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। অথচ তারা গদ্য তৈরি করছে।
গোলাম মুরশিদ: তারা ঠিক গদ্য তৈরি করেনি। তারা কয়েকজন মুন্সিকে নিত। মুন্সিরা অনুবাদ করে করে বলত। সেটাকে চেক করত আবার আরেক দল।
রাজু আলাউদ্দিন: যারা করতেন তারা কি সবাই বাঙালি ছিলেন?
গোলাম মুরশিদ: তারা বাঙালি। তারা বাঙালি কিন্তু পরিচালক যিনি, তিনি হচ্ছেন ইংরেজ।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে তো গদ্যটা ওদের হাত দিয়ে তৈরি হচ্ছে না। গদ্যটা তৈরি হচ্ছে বাঙালিদের হাতে।
গোলাম মুরশিদ: কিন্তু সেটা কী ধরনের গদ্য হবে, সেটা ওরা পরিচালনা করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কি ওরা করতে পারে আসলে?
গোলাম মুরশিদ: করেছেন। তার কারণ অনেক সময় নিয়েছেন। যেমন জোনাথান ডানকান প্রথম অনুবাদ করেন বাংলা গদ্যের। বাংলা আইনের বই। জোনাথান ডানকান কী করতেন? তিনি মুন্সিদের দিয়ে অনুবাদ করালেন। অন্য মুন্সিদের ডেকে বললেন তোমরা এইটার ইংরেজি বলো। তারা যেটুকু ইংরেজি জানত, ভাঙা ইংরেজি, সেভাবে বলত। তিনি দেখতেন যে উভয়ের কথার মধ্যে মেলে কি না।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা একটা জটিল পদ্ধতি।
গোলাম মুরশিদ: জটিল পদ্ধতি। একদিন দুদিনে তো হয়নি। তারা ঊনিশটা বই অনুবাদ করেছেন ১৭/১৮ বছর ধরে। কাজেই সময়ও নিয়েছেন অনেক। কিন্তু অনুবাদ করতে গিয়ে তারা ভাষাটকে কঠিন করে ফেলেছেন। শুধু আইনের বই না তারা প্রায় দুই হাজার বিজ্ঞাপনও অনুবাদ করেছিলেন। এই বিজ্ঞাপগুলো আমি প্রথম খুঁজে পাই।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ। যেগুলো আপনি আঠারো শতকের বাংলা গদ্য বইয়ে ব্যবহার করেছেন। কমলকুমারের গদ্য তো আপনি পড়েছেন? কমলকুমার মজুমদার, ঔপন্যাসিক, গল্পকার।
গোলাম মুরশিদ: পড়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: এই গদ্য পড়ার পরে আপনার কী মনে হয়?
গোলাম মুরশিদ: এই গদ্য কৃত্রিম গদ্য। এটা তিনি একটা স্টাইলের মতোন করে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সাকসেসফুল হননি। কারণ, আপনার গদ্যরীতি কতটা সফল হলো সেটা নির্ভর করবে আপনার কোনো অনুকারী পাওয়া গেল কি না তার উপর। রবীন্দ্রনাথ এত সাকসেসফুল তার কারণ রবীন্দ্রনাথের অনুকরণে এত লোক লিখেছেন। একটা কথা আছে, দেবতাকে যখন অস্বীকার করেন আপনি, তখন দেবতা ডেড। দেবতার মৃত্যু হলো। কারণ, দেবতাকে আপনি বিশ্বাস করছেন না। কাজেই দেবতার অস্তিত্ব নেই। তো একজন শত ভালো গদ্য লিখলেও বা নতুন একটা স্টাইল প্রবর্তন করলেও সেই স্টাইলটা যদি অনুকরণ অন্যরা না করে, তাহলে সেই স্টাইলটা ডেড।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু উনি তো খুব প্রশংসিত এবং বড় লেখক হিসেবে নন্দিত।
গোলাম মুরশিদ: যারা পরের অনুকরণ করেন না তারাই নন্দন করেন। কিন্তু তারাই নিন্দা করেন আসলে। বড় লেখক হচ্ছেন যাদের অনুকারী আছে তারা।
রাজু আলাউদ্দিন: যারা সংস্কৃতির অংশ হয়ে যান, পপুলার কালচারের অংশ হয়ে যান। সেটা তো কমলকুমার হননি আসলে।
গোলাম মুরশিদ: হননি। মোটেই হননি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু তার শিল্পকুশলতার তো অনেক প্রশংসা করা হয়।
গোলাম মুরশিদ: সে তো সুধীন দত্তের গদ্যেরও প্রশংসা করা হয়। কিন্তু কেউই তো সেটা লেখেননি।
রাজু আলাউদ্দিন: সুধীন দত্তের গদ্য আমার সত্যিই অত ভালো লাগেনি। পড়তে হয় বলে পড়েছি।
গোলাম মুরশিদ: উনি এক ধরনের নিজস্ব স্টাইলে লিখেছেন। কিন্তু সেই গদ্যের অনুসারী পাওয়া যায় না। কাজেই সেটাও সাকসেসফুল চেষ্টা হলো না। কিন্তু সবাই স্বীকার করে সুধীন দত্তের গদ্যের আলাদা একটা স্টাইল আছে। আলাদা সৌন্দর্য আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তা আছে। এদের মধ্যে জীবনানন্দের ননফিকশন গদ্য বরং অনেক উপভোগ্য।
গোলাম মুরশিদ: তারও নিজস্ব একটা গদ্য আছে। জীবনানন্দের একটা সুবিধা আছে। তিনি কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করেননি। তিনি শব্দগুলো রেখেছেন সহজ। আইডিয়াটা রেখেছেন কঠিন। জীবনানন্দের কবিতাও তাই। শব্দগুলো সহজ কিন্তু ভাবটা কঠিন। নজরুলের মতো বা সুধীন দত্তের মতো লোকেরা শব্দগুলো রেখেছেন কঠিন কিন্তু ভাবটা সহজ।
রাজু আলাউদ্দিন: অমিয় চক্রবর্তীর গদ্য আপনার কেমন লাগে?
গোলাম মুরশিদ: না, আমি অমিয় চক্রবর্তীর গদ্য পড়িনি।
রাজু আলাউদ্দিন: অবশ্য একটাই তো বই বাংলায়। এর বাইরে তো আর বই নেই। আর বিষ্ণু দের গদ্য?
গোলাম মুরশিদ: না আমি পড়িনি। ভার্চুয়ালি পড়িনি। হয়ত দু একবার চেষ্টা করেছি একটু পড়ার জন্য। বুঝতে আমার কষ্ট হয়। আমি অকারণ পরিশ্রম করে… তিনি এমন সোনার খনি কিছু তৈরি করেননি যেটার জন্যে আমি অনেক সময় ব্যয় করে আমার সময় নষ্ট করব।
রাজু আলাউদ্দিন: বিষ্ণু দের কবিতাও কি আপনার একই রকম লাগে?
গোলাম মুরশিদ: বিষ্ণু দের কবিতাও আমি ভার্চুয়ালি পড়িনি। কার্যত পড়িনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার প্রিয় লেখকদের একজন হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। এবং নজরুলও নিশ্চয়?
গোলাম মুরশিদ: নজরুল আমার অত প্রিয় লেখক না। নজরুল ক্যারেক্টারটা আমার কাছে প্রিয়। নজরুলের লেখা সত্যি সত্যি আমার কাছে খুব একটা প্রিয় না।
রাজু আলাউদ্দিন: এই ক্যারেক্টার কেন আপনাকে আকর্ষণ করল?
গোলাম মুরশিদ: তার ক্যারেক্টারটা হচ্ছে প্রাণোচ্ছ্বল। এবং অত্যন্ত আবেগপূর্ণ।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং বহুবর্ণিল। নানামুখিতা আছে। গীতিকার। নিজে সুরও করেছেন। সুরকার।

গোলাম মুরশিদ: সুর শুধু করেছেন না, সুরকার হিসেবেই তিনি কবির থেকে বড়। যদি আমার মতামত জানতে চান, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় বলব, নজরুল এ পোয়েট। নজরুল এ কম্পোজার। কম্পোজার নজরুল বড়।
রাজু আলাউদ্দিন: গানের ক্ষেত্রে আপনার বিশেষ প্রশিক্ষণ আছে, তাই না?
গোলাম মুরশিদ: গান সম্পর্কে আমি মোটামুটি জানি।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা। এই জানাটা হচ্ছে গ্রন্থবাহিত জানা?
গোলাম মুরশিদ: গ্রন্থবাহিত না। শুনেও।
রাজু আলাউদ্দিন: শ্রবণবাহিত।

Murshid-7
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ। শ্রবণবাহিত।
রাজু আলাউদ্দিন: দেবব্রত বিশ্বাস তো আপনাকে ১৯৭৩ সালে রেকর্ড গিফট করেছিলেন?
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: সে রকম কিছু বিরল রেকর্ড আপনার কাছে আছে।
গোলাম মুরশিদ: সেগুলো এখন আমি দিয়ে দিয়েছি। প্রকাশিত হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কাকে দিয়েছেন? কোথায় প্রকাশিত হয়েছে?
গোলাম মুরশিদ: এটা দিয়েছি দেবব্রত বিশ্বাস স্মরণ কমিটিকে। তারা গত ছ’সাত বছর ধরে প্রত্যেক বছরে একটা করে অনুষ্ঠান করে দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মদিনে। এবং এই উপলক্ষে তারা এ পর্যন্ত ৮/১০ টা সিডি বের করেছে। তো আমি যে গানগুলো দিয়েছি, সেটা থেকে চারটা সিডি তৈরি হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা থেকে চারটা সিডি! এত গান ছিল ওখানে! উনার সঙ্গে আপনার ফ্রিকোয়েন্টলি দেখা হতো?
গোলাম মুরশিদ: আমি যখন বাহাত্তর তেহাত্তর সালে ছিলাম ওখানে, তখন। একাত্তর সালে যখন ছিলাম, তখন। আটাত্তর সালে আমি যখন অস্ট্রেলিয়া চলে যাই, তখন দেখা হয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: উনার সম্পর্কে দু’একটা স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে?
গোলাম মুরশিদ: স্মৃতি মানে কী ধরনের?
রাজু আলাউদ্দিন: যে কোনো স্মৃতি। সেটা ফানি হতে পারে। আনন্দদায়ক বা যে কোনো স্মৃতি।
গোলাম মুরশিদ: প্রথমেই যেটা নজরে পড়ে উনি কিশোরগঞ্জের ভাষায় কথা বলতেন। যেমন আমরা যখন প্রথম দিন গেলাম, উনি বললেন, আপনারা ক্যাডা? আমরা যখন বললাম যে, আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, শরণার্থী। তখন উনি দয়ার সঙ্গে আমাদের ঢুকতে দিলেন ঘরে। উনি খুব ভালো মানুষ। উনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কারণে একাত্তর সালের বছরটা তিনি গান করেননি। তার ভাগ্নে মারা গিয়েছিল। সেই শোকে উনি ওই বছরটা গান করেননি। কিন্তু উনি দুটো রেকর্ড করেছিলেন। ওই চলে দলে দলে, মুক্তি সেনানি– এই গানদুটোর র‌্যয়ালিটি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা উনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন। চেকটা।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা আমার জানা ছিল না। আর উনার গান তো আপনার প্রিয়?
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ। গান ভালো লাগে।
রাজু আলাউদ্দিন: রবীন্দ্রনাথের গান তো আরো অনেক শিল্পী গেয়েছেন। উনার গানে, সুরে বা কণ্ঠে কী এমন আছে যেটা আপনাকে আকৃষ্ট করে?
গোলাম মুরশিদ: উনি গানের অর্থ বুঝে গান করেন। উনি স্বরলিপি দেখে গান করেন না। স্বরলিপির সুরটা আয়ত্ত করে নিয়ে তারপর উনি গানগুলোর কথাটার অর্থ করেন। যেমন ধরেন আমি আপনাকে একটা দৃষ্টান্ত দিই। আপনি যদি বলেন, সে তখনো স্বপ্ন কায়াবিহীন, নিশিথ তিমিরে বিলীন, এর কোনো অর্থ হয় না। কথাটা হচ্ছে– সে তখনো স্বপ্ন, (এখানে একটু থামতে হবে) কায়াবিহীন, নিশিথ তিমিরে বিলীন। কিন্তু আপনি যদি একসাথে বলেন স্বপ্ন কায়াবিহীন– তাহলে কিন্তু অর্থটা হচ্ছে না। উনি অর্থ বুঝে এমনভাবে প্রকাশ করতেন যে অর্থটা পরিষ্কার মনের মধ্যে গেথে যায়। আমার একটা ঘটনা মনে আছে। আবু সায়ীদ আইয়ুবের বাড়িতে আমরা গান শুনছিলাম। গানটা হচ্ছে ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’। দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া গান। গানটা শুনে খান সরওয়ার মুরশিদ বললেন, খুব ক্লান্তির সুরে গাইছেন। আমি তখন বললাম, স্যার, উনি গাইছেন ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’– সেটা কি প্যারেড করতে করতে গাইবেন! ভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উনি গান করতেন। উনার ব্যাপারে একটা কথা চালু আছে– উনি ট্রান্সলেশন করে গান করেন। অর্থাৎ উনি গানগুলোকে এমনভাবে পরিবেশন করেন, মনে হয় ট্রান্সলেশন করে তারপর পরিবেশন করছেন। প্রত্যেকটার অর্থ অনুসারে উনি গানটা করেন। আর দুই নাম্বার হচ্ছে উনার গলা তো অসাধারণ। অমন গলা তো বাংলা গানের ক্ষেত্রে আর কারো নেই। একমাত্র হেমন্তই তার সঙ্গে তুলনীয়। কাজেই এই গুণ কি যথেষ্ট না!
রাজু আলাউদ্দিন: নিশ্চয় নিশ্চয়। আবু সায়ীদ আইয়ুবের সাথে আপনার ওই সময়ে প্রায়ই দেখা হতো?
গোলাম মুরশিদ: আমি যে ফ্ল্যাটে আশ্রয় পেয়েছিলাম আবু সায়ীদ আইয়ুব থাকতেন সেখান থেকে চারশ-পাঁচশ গজ দূরে। আমি অনেকবার তার ওখানে গেছি। যুদ্ধের পরেও গেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: সৈয়দ মুজতবা আলী তো তখন ওখানে নেই?
গোলাম মুরশিদ: যে ফ্ল্যাটে মুজতবা আলী থাকতেন সেই ফ্ল্যাটেই আমি উঠেছিলাম। তখন আর উনি ওখানে ছিলেন না। তখন আইয়ুব যে ফ্ল্যাটে থাকতেন তার উপর তলায় থাকতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: মুজতবা আলীকে তো আপনি দেখেছেন?
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ দেখেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: বেশ কয়েকবার দেখেছেন?
গোলাম মুরশিদ: ছেষট্টি সালে প্রথম পরিচয় হয়। উনি তখন এসেছিলেন এখানে। সৈয়দ মুর্তজা আলীর বাড়িতে উঠেছিলেন। সেখানে আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। কারণ, উনার সঙ্গে কয়েকটা চিঠির আদান-প্রদান হয়েছিল আমার। তো তখন দেখা করতে গেলাম। তারপরে একাত্তর সালে দেখা করতে গেলাম। একাত্তর সালে যখন দেখা করতে যাই, সেদিন উনি অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। সম্ভবত উনি মদ্যপান করেছিলেন। সেবার আমার মোহভঙ্গ হলো এক রকম বলা যায় আর কি।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই অবস্থা দেখে?
গোলাম মুরশিদ: না। তার কথাবার্তা শুনে। তারপরে আমি আর কোনোদিন যাইনি। কিন্তু আমি যে ফ্ল্যাটটায় উঠেছিলাম, যেখানে উনি আগে থাকতেন, সেই ফ্ল্যাটে তার হাতের লেখা তখনো ছিল– ‘দুপুরবেলা ঘুমাই। বিরক্ত করবেন না।’
রাজু আলাউদ্দিন: সে সময় বড় ব্যক্তিত্ব আর কার সাথে দেখা হয়েছিল?
গোলাম মুরশিদ: অনেকের সাথেই দেখা হয়েছে। বিষ্ণু দের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমার ফ্ল্যাটে দেখা করতে এসেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, সুবীর রায় চৌধুরী। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের খুবই স্নেহ করতেন। আমাদের ফ্ল্যাটে অনেক বার এসেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। মতী নন্দীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছিল?
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ, আনন্দবাজারে।
রাজু আলাউদ্দিন: উনার লেখা কেমন লাগে আপনার?
গোলাম মুরশিদ: আমি পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমার ভালো লাগেনি।
রাজু আলাউদ্দিন: উপন্যাস নাকি গল্প?
গোলাম মুরশিদ: গল্প পড়ার চেষ্টা করেছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: বঙ্গবন্ধুর সাথে কখনো দেখা হয়েছে?
গোলাম মুরশিদ: না। দেখা হয়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কি রাজশাহী থাকার কারণে দেখা হয়নি?
গোলাম মুরশিদ: রাজশাহী বলে না। আমি রাজনীতিতে ইন্টারেস্টেড না। আমি রাজনীতি সচেতন নাগরিক কিন্তু কোনো রাজনীতিক নেতার সঙ্গে জীবনে দেখা করিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা বিষয় আপনার কাছে জানার ইচ্ছা। সেটা হলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার আগেই মুজতবা আলী বোধহয় সাতচল্লিশ বা আটচল্লিশ সালে বাংলাভাষা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন।
গোলাম মুরশিদ: পঞ্চাশে লিখেছিলেন। ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপরে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও ভাষার পক্ষে তারও আগে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন। তো তাদেরকে আমরা খুব একটা স্মরণ করি না। যারা শহিদ হয়েছেন আমরা কেবল তাদেরকে স্মরণ করি। কিন্তু এক অর্থে তো এই অধিকার আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পটভূমি তারা তৈরি করেছেন। এই বিষয়ে আপনার কী অভিমত?

গোলাম মুরশিদ: এরা তৈরি করেছিলেন বলেই আন্দোলন হয়েছিল। সচেতনতা জেগে উঠল এদের লেখার জন্য। এদের বক্তব্য রাখার জন্যে। এবং এই কার্যকারণে তখন এটা একটা রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হলো। চেতনার বিকাশে এদের ভূমিকা আছে বৈ কি! এরা না করলে তো সচেতন হতো না।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং আমি মনে করি উনারা দুজন যখন এটার পক্ষে লিখেছেন, এটা অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল এই কারণে যে, তারা ইতোমধ্যে বাঙলা সমাজে বহুভাষি পন্ডিত লেখক হিসেবে গ্রাহ্য। ফলে তাদের বক্তব্যগুলো যেমন অসাধারণ ছিল এবং সেটার গ্রহণযোগ্যতাও বেশি ছিল। বেশি ছিল এই কারণে যে তারা অনেকগুলো ভাষার সঙ্গে জড়িত। মুজতবা আলী, তিনি দেখিয়েছেন যে, যদি উর্দু প্রবর্তন করা হয় তাহলে কী কী সমস্যা হতে পারে। এগুলো তার প্রবন্ধেই আছে। নানান ভাষার সঙ্গে তুলনা করেও দেখিয়েছেন। ফলে আমার মনে হয় যে তাদের ভূমিকাটা সাঙ্ঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ।
গোলাম মুরশিদ: গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের বক্তব্যটা যে খুব বেশি জায়গায় ছড়িয়েছিল তা কিন্তু না। তার কারণ, তাদের বই কত কপি ছাপা হয়েছিল! কজন কিনেছিল! কজন পড়েছিল! কাজেই সেটা ছোট পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সাহেব চর্যাপদ, বাংলাভাষা ধ্বনিতত্ত্ব নানা বিষয়ে উনি লিখেছেন। এমনকি ইতিহাসও। তার মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছরই বলা যায়, এখনও কিন্তু তার রচনা সমগ্র প্রকাশিত হয়নি। কয়েকটা খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে।
গোলাম মুরশিদ: আমি ঠিক জানি না। কত খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে বা কতটুকু প্রকাশিত হয়েছে আমি ঠিক জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন: তিনটা বা চারটা খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সবগুলো এখনো হয়নি।
গোলাম মুরশিদ: এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নাই। আমি আসলে চৌত্রিশ বছর ইংল্যান্ডে আছি। তার আগে দু বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলাম। তার আগে এক বছর ভারতে ছিলাম। আমার জীবনের বেশিরভাগ সময়, অর্ধেকের বেশিরভাগ সময় কেটেছে দেশের বাইরে। কাজেই আমি দেশ সম্পর্কে খুব একটা খবর রাখি না।
রাজু আলাউদ্দিন: চর্যাপদ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা তো আপনি দেখেছেন। যেমন অতীন্দ্র মজুমদার, তারাপদ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন এবং ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কাজও আছে।
গোলাম মুরশিদ: ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ গায়ের জোরে অনেক কথা বলেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কোন জায়গাগুলোতে?
গোলাম মুরশিদ: উনি ফিকশনাল ক্যারেক্টার যেগুলো, সেগুলোকে উনি ঐতিহাসিক চরিত্র ধরে নিয়ে আলোচনা করেন। যেমন গোরক্ষনাথ। গোরক্ষনাথ বলে একজন লোক ছিল কি না তাতেই সন্দেহ আছে। কবে ছিল সেটা তো বলা আরো মুশকিল। চর্যাপদকে উনি সপ্তম শতাব্দিতে নিয়ে গেছেন। তখন চর্যাপদের অস্তিত্ব ছিল না। চর্যাপদের সময়, আমরা যেটা দেখতে পাই, সেই চর্যাপদ দশম শতাব্দির আগে হতে পারে না। দশম থেকে দ্বাদশ হবে। এই হচ্ছে চর্যাপদের সময়। এবং চর্যাপদগুলো লেখা হয়েছে মানে রাইটিং ফর্মে এসছে আরো পরে। সেইগুলোই পাওয়া গেছে নেপালের রাজ দরবারে। উনি সময় নিয়ে বলেছেন বারবার। মিননাথ, গোরক্ষনাথ এই সমস্ত ফিকশনাল ক্যারেক্টারকে উনি জ্যান্ত ধরে নিয়ে তর্ক করেছেন। শহীদুল্লাহর এই ধারণাগুলো সম্পর্কে আমার নিজের কোনো শ্রদ্ধা নাই। তবে তার একটা অপেনিয়ন আছে। তার নিজস্ব একটা বক্তব্য আছে। আমার নিজের ধারণা যে, চর্যাপদ সম্পর্কে সুনীতি চট্টোপাধ্যায় যে ধারণা দিয়েছেন, সুকুমার সেন যে ধারণা দিয়েছেন– সেটা অনেক বেশি রিয়ালিটির কাছাকাছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তাদেরটা কেন বেশি রিয়ালিটির কাছাকাছি মনে করছেন?
গোলাম মুরশিদ: ভাষার বিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে। ভাষার বিবর্তন হয়নি তখনো। কাজেই ভাষার বিবর্তন হয়নি আর ওই ভাষায় কবিতা লেখা হয়ে গেল, এটা তো কোনো কাজের কথা না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু কবিতা তো ভাষার লিখিত রূপ বা বিবর্তন হওয়ার আগেও হতে পারে।
গোলাম মুরশিদ: ভাষাটা তো তৈরি হতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: ভাষার মৌখিক রূপ রয়ে গেছে হয়ত।
গোলাম মুরশিদ: তখনকার লিখিত রূপ আমরা কোথায় পাব! তা না হলে আমরা সাক্ষ্যটা পাব কী করে যে কখন এটা লেখা হলো! তখন যেটা ছিল– অপভ্রংশ। সপ্তম শতাব্দিতে বা অষ্টম শতাব্দিতে। অপভ্রংশের পরবর্তী স্টেজ হচ্ছে চর্যাপদ। যে চর্যাপদ হচ্ছে প্রোটো বাংলা, প্রোটো আসামিজ, প্রোটো উড়িয়া। প্রোটো মানে হচ্ছে সবেমাত্র উন্মেষ ঘটছে আর কি। পুরোপুরি শেইপ নেয়নি। সেইটা হচ্ছে প্রোটো।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে ঐতিহাসিকভাবে যে সময়টা ধরা হয়….
গোলাম মুরশিদ: সেই সময়টা আমি বলব দশম থেকে দ্বাদশ। এমনকি কিছু দোহা আমরা পাই, সেই দোহাগুলো ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতাব্দির। সেই জন্য বাংলাভাষার জন্ম, সত্যিকারের জন্ম বলা যেতে পারে চর্যাপদের আমলেও হয়নি। চর্যাপদের মধ্যে বাংলার আদি নিদর্শন আছে, কিন্তু বাংলার আদি নিদর্শনই শুধু নেই, ওটা আসামি ভাষারও আদি নিদর্শন। ওটা উড়িয়া ভাষারও আদি নিদর্শন। মিলেমিশে আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ‘রিল্যাকট্যান্ট অফ ডিবুট্যান্ট’ ওইটার বাংলা ছিল সংকোচের বিহ্বলতা (মুরশিদ সাহেবের বইয়ের নাম) ওখানে আপনার মূল লক্ষ্য ছিল ঊনিশ শতকের নারীদের জাগরনের ইতিহাসটাকে ধরা।
গোলাম মুরশিদ: আমার লক্ষ তার থেকেও বেশি ছিল যে মেয়েরা কিভাবে রিঅ্যাক্ট করছে এই আন্দোলনে। এই আন্দোলনটা করেছিল পুরুষরা। যেমন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর করেছেন। যেমন কেশব সেন করেছেন। যেমন করেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। তো এরা যে আন্দোলনটা করছেন, সেই আন্দোলনটার প্রতি মেয়েরা কিভাবে সাড়া দিচ্ছেন! মেয়েরা আন্দোলন করছেন না কিন্তু সাড়া দিচ্ছেন। আমি মেয়েদের রচনা প্রথম ব্যবহার করে তাদের রেসপন্স বোঝানোর চেষ্টা করি। সেইখানটায় আমার বইটা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তার আগে পর্যন্ত পুরুষরা কী আন্দোলন করেছে, সেই আন্দোলনের কথাই লেখা হয়েছে। বিদ্যাসাগর কী করেছেন, কেশব সেন কী করেছেন, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর কী করেছেন ইত্যাদি।
রাজু আলাউদ্দিন: বাঙালি লেখিকাদের মধ্যে, আমি মুসলমান বা হিন্দু বলব না, বাঙালি লেখিকাদের মধ্যে বেগম রোকেয়ার যে ভূমিকা, লেখায় এবং সামাজিক কর্মে– সেই বিবেচনায় রোকেয়া সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
গোলাম মুরশিদ: রোকেয়া সম্পর্কে আমি লিখেছি আমার বইয়ে। রাস সুন্দরী থেকে রোকেয়া। সেইটা পড়ে নেবেন। আমার নিজের ধারণা, তিনি লিখেছেন, তার লেখা অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ, কিন্তু তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে, ১৯০৪ সালে। তার আগে পঞ্চাশ বছর ধরেই লেখা হচ্ছে। মেয়েরাই লিখেছেন। কাজেই উনি প্রথম লেখিকা নন। আর দুই নম্বর হচ্ছে, উনি যে স্কুলটা করলেন, ১৯০৯ সালে, সেই স্কুলটা মুসলমানদের জন্যে। সেটা সমস্ত মেয়েদের জন্যে নয়। এবং সেই মুসলমানরা আবার বাঙালি না। সেই মুসলমানরা হচ্ছে উর্দুভাষি মুসলমান। কাজেই বেগম রোকেয়াকে যতবড় করে দেখানো হয়, তিনি ততবড় ছিলেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: সামাজিক জায়গায় হয়ত বড় না। কিন্তু তার চিন্তা…..
গোলাম মুরশিদ: উনার চিন্তা খুবই অগ্রসর। উনি ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন, ধর্ম দিয়ে মানুষ মেয়েদের বন্দি করে রাখে। উনি নিজে বলেছেন। উনি বলেছেন, যদি নবি হতো মেয়ে, তাহলে হয়ত অন্যরকম করে ধর্মগ্রন্থ লেখা হতো।
রাজু আলাউদ্দিন: কোরআন শরিফ পুরুষদের রচিত– উনার এরকম একটা বক্তব্য আছে বোধহয়।
গোলাম মুরশিদ: ‘কোরআন শরিফ’ না ‘ধর্মগ্রন্থ’–বলেছেন
রাজু আলাউদ্দিন: উনার ভূমিকা তো বিপ্লবাত্মক ভূমিকা।
গোলাম মুরশিদ: এবং উনি মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। উৎসাহ দিয়েছেন। বলেছেন, পুরুষরা যদি চাষ করতে পারে আমরা কেন পারব না! এতবড় কথা অন্য কেউই লেখেননি।
রাজু আলাউদ্দিন: তাছাড়া সুলাতানাস ড্রিম– এটাও তো অসাধারণ একটা বই।
গোলাম মুরশিদ: আমার ধারণা, এটা অন্যকোনো কাহিনির উপর নির্ভর করে লেখা। আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। আমি পাইনি এখনো। কিন্তু এই জাতীয় একটা লেখা প্রাচীন গ্রিক ভাষায় আছে বলে আমার ধারণা। আমি সেই অরিজিনালটা দেখিনি। কিন্তু আছে বলে আমি ধারণা করি। লাইসেসট্রিয়া বা এরকম নামে। সুলতানাস ড্রিম খুব একটা অরিজিনাল লেখা না। যতটা বলা হয় অতটা অরিজিনাল না। তার থেকে তার প্রবন্ধ অনেক বেশি বলবান।
রাজু আলাউদ্দিন: ওইটা যদি অরিজিনাল নাও হয় তাহলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা।
গোলাম মুরশিদ: অরিজিনাল হলে ওইটা মূল্যবান লেখা।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এই পর্যন্তু আমি ওইটার অরিজিনালিটি নিয়ে লিখিতভাবে কাউকে প্রশ্ন তুলতে দেখিনি।
গোলাম মুরশিদ: না, কেউই ধরতে পারেননি লিখিতভাবে। কিন্তু যেমন মুনীর স্যার ধরলেন যে, জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারটে নাটক অনুবাদ।
রাজু আলাউদ্দিন: জ্যোতিরীন্দ্রনাথ, উনি তো অনুবাদ করতেনই।
গোলাম মুরশিদ: কিন্তু এটা যে অনুবাদ, এটা কেউই লেখেনি। কক্ষনো লেখেনি। উনি একদম লাইন লাইন মিলিয়ে অনুবাদ বের করলেন– রাসিন থেকে। আমার এখন সময় নেই ওটা খোঁজার। তা না হলে আমি খুঁজে বের করতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: ওটা পেলে তো বেশ মজার হয়।
গোলাম মুরশিদ: মজার হয়। কিন্তু এমন মূল্যবান কোনো কাজ হয় না। কারণ বেগম রোকেয়া মাইনর একজন লেখিকা। কাজেই মেয়ে হিসেবে তার দাম আছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তো তার দাম নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: তো কাদেরকে আপনার বাংলাভাষার বড় লেখক মনে হয়?
গোলাম মুরশিদ: বাংলাভাষার বড় লেখক রবীন্দ্রনাথ।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপরে?
গোলাম মুরশিদ: জীবনানন্দ দাশ।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপরে?
গোলাম মুরশিদ: নজরুল ইসলাম। বঙ্কিমচন্দ্র, মস্তবড় লেখক। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যার নাম বলা যায় একবারে লেগে থাকে। বঙ্কিমচন্দ্র। মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপরে?
গোলাম মুরশিদ: এত নাম তো মনে রাখা মুশকিল। এ রকম অনেক লোক আছেন। ধরা যাক মানিক বন্দোপাধ্যায়। মানিকের একটা পদ্মা নদীর মাঝির তুলনা হয়! বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের কোনো কোনো লেখা।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের এখন যারা জীবিত লেখক আছেন, তাদের লেখা পড়েন আপনি?
গোলাম মুরশিদ: পড়ার সময় হয় না। আমার নিজের কাজ নিয়ে আমি এত ব্যস্ত থাকি… আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন এখন সবচে’ ভালো গল্প কে লেখেন বাংলাদেশে, আমি নাম বলতে পারব না। কারণ আমার জ্ঞানগম্মি হাসান আজিজুল হক পর্যন্ত। তখন আমরা একত্রে সাহিত্যচর্চা করি। কাজেই তাকে আমি জানি। তার লেখা আমি পড়েছি। কিন্তু আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন নারীদের মধ্যে সবচে’ ভালো কে লেখেন বাংলাদেশে, আমি বলতে পারব না। কারণ আমি পড়ি না। সেদিক থেকে আমি অশিক্ষিত মানুষ।
রাজু আলাউদ্দিন: না, সবার পক্ষে তো আর সবদিক ঠিক রেখে চলা সম্ভব হয় না। আর জ্ঞানের এত শাখাপ্রশাখা– সবগুলো তো একজনের পক্ষে জানা সম্ভব না। আপনার যে বিষয়ে স্পেশালিটি আছে সেই বিষয়ে আপনি সবচে’ ভালো জানেন। এবং সবচে’ বেশি দখল নিয়েই আপনি জানেন। এটাই তো যথেষ্ট, আমি মনে করি।
Murshid-8
গোলাম মুরশিদ: ন্যারো এ্যাঙ্গেল থেকে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাও কি আর সেটা বলা যাবে! তা তো মনে হয় না। আপনি অনেক সময় দিলেন। এত সময় আপনার কাছ থেকে পাব ভাবিনি।
গোলাম মুরশিদ: আমার তো কোনো কাজ নেই। বেকার।
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুল শেষ করে তো আপনি অন্য কাজ ধরবেন?
গোলাম মুরশিদ: নজরুল শেষ হয়ে গেছে। ছাপার কাজ শুরু হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনার পরবর্তী প্রকল্প কী?
গোলাম মুরশিদ: বঙ্গীয় স্থাপত্যের বিবর্তন নিয়ে লিখব। বা বাংলা গানের বিবর্তন নিয়ে লিখব। দুটোর একটা নিয়ে লিখব।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি এই বয়সেও লেখায় এত লিপ্ত, এবং সেইসব লেখা প্রচুর পাঠ ও পরিশ্রম দাবি করে। আপনি সেটা করছেন। আমাদের জন্য এটা খুবই উদ্দীপনাময়।
গোলাম মুরশিদ: বাংলা রেনেসাঁস নিয়ে আমি যেটা লিখেছি সেটা আর কেউ লেখেনি বাংলায়। বাংলাভাষায় অদ্যাবধি কেউ লেখেনি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার তো অনেক ধরনের কাজ এবং সেগুলো যথেষ্ট পরিশ্রমী। তথ্যসমৃদ্ধ কাজ।
গোলাম মুরশিদ: তথ্যের থেকেও আমি যেটা চেষ্টা করি, সেটা বিশ্লেষণ। গরুর চারটি পা আছে এ রকম রচনা আমি লিখি না।

রাজু আলাউদ্দিন: তা তো বটেই। আমি জানি সেটা। তো আজকাল আপনি কি লক্ষ করেছেন, গবেষণার মান অনেক নেমে গেছে।
গোলাম মুরশিদ: গবেষণা মানে হচ্ছে তথ্য খুঁজে বের করা। এইটা হচ্ছে বাংলা গবেষণার বৈশিষ্ট্য। তথ্য খোঁজো। তথ্য খোঁজো। কিন্তু তথ্যগুলোর মধ্যে জোড়া লাগিয়ে সত্যে উপনীত হওয়া, সত্যানুসন্ধান– এটার চেষ্টা বাংলা গবেষণায় এখনো হচ্ছে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আর তথ্য অনুসন্ধানের কথা বললেন। এখন যে গবেষণা, বেশিরভাগই ডেরিভেটিভ। এমন না যে এই বিষয়ে সে একদম পাইয়োনিয়ারিং হয়ে থাকবে। সবই হচ্ছে আগের পঁচা ছয়টা গবেষণা হয়েছে, ওখান থেকে কিছু ছোঁ মেরে নিয়ে তারপরে একটা গবেষণা গ্রন্থ তৈরি হচ্ছে। তো গবেষণার এই দারিদ্য সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
গোলাম মুরশিদ: সহজেই যদি প্রফেসর হতে চান তাহলে কি সেইটেই করা উচিত না? সহজ কাজ বেছে নেয়াই তো ভালো। আপনি দেখিয়েছেন যে এই জিনিসটার সাথে এটা মেশালে এই জিনিসটা তৈরি হয়। ক্যামেস্ট্রি। তো আপনি যদি ওই বিষয়টাই বেছে নেন তাহলে আপনার রিডিংগুলো ভিন্ন হবে খানিকটা। আপনি একটা ভিন্ন রিডিংয়ের রিজার্ভটা দেবেন। তারপর আপনার পি.এইচ.ডি হয়ে গেল। এইটেই তো করা সহজ। একটা নতুন জিনিস নিয়ে কাজ করা তো কঠিন। কাজেই কঠিন কাজ করে লাভটা কি। তার থেকে সহজ কাজ করে সহজে উন্নতি করা, আর্থিক এবং সামাজিক। সেইটেই কি ভালো না?
রাজু আলাউদ্দিন: ডক্টর সালাহউদ্দীন আহমদের গবেষণার সাথে তো আপনি নিশ্চিতভাবেই পরিচিত। খুবই ছোট্ট আয়তনের একটা অসাধারণ গবেষণাকর্ম করেছেন।
গোলাম মুরশিদ: সেই গবেষণাটার বৈশিষ্ট্য এই, যে পঞ্চাশ বছরেও তা পুরনো হয়নি। অর্থাৎ ওটার থেকে বাইরে গিয়ে নতুন কথা বলতে পারেনি কেউ। এই হচ্ছে বৈশিষ্ট্য। তিনি যে সময়টা নিয়ে কাজ করেছেন সে সম্পর্কে সত্যটা অনুসন্ধান করেছেন। কাজেই তার গবেষণা মূল্যবান। কিন্তু তার ওই জিনিস ভাঙিয়ে অনেকেই লিখেছে। তার ওই জিনিস থেকে ডিরাইভ করে অনেকেই অনেক কথা লিখেছেন। আর উনি নিজেও পরবর্তীকালে অনেক লিখেছেন। সেগুলো টেকেনি।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই মানের কাজ ওই একটাই। মানে উনার অন্যসব রচনার মধ্যে। আর কমলকুমার মজুমদার সম্পর্কে আপনার যে অনুভূতি, আমি মিল দেখতে পেলাম সনৎকুমার সাহা, উনারও একটা লেখা আছে কমলকুমার নিয়ে। আপনি দেখেছেন কি না আমি জানি না।
গোলাম মুরশিদ: না আমি দেখিনি। বললাম তো আমি সাম্প্রতিক লেখাটেখার সম্পর্কে পরিচিত নই। আমি ডাইনোসর।
রাজু আলাউদ্দিন: গদ্যশৈলীর বিচারে বাংলাভাষায় যাদেরকে আপনি উপভোগ করেন, তারা কারা?
গোলাম মুরশিদ: গদ্যশৈলী তো এক রকম না।
রাজু আলাউদ্দিন: না, তা না। মানে শৈলীর সৌন্দর্যের কারণে….
গোলাম মুরশিদ: সৌন্দর্যের কারণে বিদ্যাসাগর, সৌন্দর্যের কারণে বঙ্কিমচন্দ্র, সৌন্দর্যের কারণে সবার উপরে রবীন্দ্রনাথ, সৌন্দর্যের কারণে বুদ্ধদেব বসু।
রাজু আলাউদ্দিন: গদ্য?
গোলাম মুরশিদ: হ্যাঁ। আরো অনেকেই আছেন। ধরা যাক বিভূতিভূষণ বন্দোপ্যাায়। তার যে শৈলি সেটার সঙ্গে তো বুদ্ধদেব বসুর শৈলির তুলনা করতে পারব না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি ননফিকশনের কথা বলতে চাচ্ছি আসলে। মানে প্রবন্ধ।
গোলাম মুরশিদ: এনজয় করার কথা যদি বলেন,তাহলে যাদের বলে ফেলেছি তারাই।
রাজু আলাউদ্দিন: শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধ কেমন লাগে আপনার?
গোলাম মুরশিদ: খুব একটা ভালো লাগে না আমার কাছে। আমার ধারণা, শঙ্খদাকে তৈরি করা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কোন অর্থে?
গোলাম মুরশিদ: মানে তিনি খুব কম লিখেছেন। তো তার যে গ্লোরিটা, সেটা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে। কিন্তু নিজে কম লিখেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: ওইপারের একজন প্রাবন্ধিক আছেন, অশ্রুকুমার শিকদার, তার প্রবন্ধ আপনি পড়েছেন কখনো?
গোলাম মুরশিদ: তার লেখা আমি দেখেছি, বা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের লেখা। এরা আরেক ধরনের লেখক। আমার ধারণা, এরা ত্রিশের দশকের কবিদের দ্বারা প্রভাবিত। এবং এরা লেখেন স্টাইলের জন্য। বিষয়বস্তুর জন্য লেখেন না। স্টাইলটাকেই দাম দেন বেশি। সেটা বোধগম্য হোক অথবা না হোক।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু অশ্রুকুমার শিকদার তো বোধগম্য।
গোলাম মুরশিদ: কিন্তু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বোধগম্য নয়।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের গদ্যের খুবই বড় রকমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, ভাষিক স্বাতন্ত্র্য। উনি নতুন নতুন শব্দ তৈরিও করেন। এবং সেইসব শব্দ প্রয়োগ করেন অভাবিত জায়গায়। কিন্তু যা বলতে চান, উনি বোঝাতে পারেন। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে।
গোলাম মুরশিদ: আমার হাতে অত সময় নেই পড়ার। তাই আমি পড়তে পারি না তেমন।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মুরশিদ ভাই। অনেক সময় আপনি দিলেন।
গোলাম মুরশিদ: আপনি যে এসছেন আমার সঙ্গে আলাপ করার জন্য, এ জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কারণ আমাকে কে চেনে!
রাজু আলাউদ্দিন: না না। আপনাকে অনেক মানুষ চেনে। আপনি অত্যন্ত মশহুর লেখক। আপনার গবেষণার জন্য, জীবনীর জন্য, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি নিয়ে নানান ধরনের লেখার কারণে। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন miltonkumar — december ১৮, ২০১৭ @ ১২:৩৪ অপরাহ্ন

      অনেক বড় সাক্ষাৎকার তবে অনেক তথ্যবহুল। ভাল লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গোলাম রব্বানী — december ১৮, ২০১৭ @ ১০:০৪ অপরাহ্ন

      রাজু সাহেবকে অনেক ধন্যবাদ। সাক্ষাতকারটি খুবই তথ্যবহুল এবং সহজগম্য।

      আমার নিজস্ব মন্তব্যে: গোলাম মুর্শিদ স্যার কোন পপুলার ক্যারেকটার নন। তাঁকে হাতে গোনা মানুষজন চেনেন। কিন্তু স্যার তাঁদেরকে প্রাণ দান করেন। সমাজ বদলের প্রেক্ষাপট তৈরি করে যারা, তাঁদেরকে সামান্য মানুষ মনে রাখে এবং সেলিব্রেট করে। এই কঠিন সত্যটা মেনে নেয়া কঠিন। স্যারের জন্য গর্ব বোধ করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিয়াজ মেহেদী — december ১৯, ২০১৭ @ ২:২২ পূর্বাহ্ন

      গোলাম মুরশিদের মতো বড়মাপের গবেষক বাংলাভাষায় আর একজনও নেই। কেবল ‘আশার ছলনে ভুলি’ কিংবা ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ এই দুইটা বইয়ের জন্য তিনি প্রাত:স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। নজরুলজীবনীর জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে আছি। দীর্ঘজীবী হোন, প্রিয় লেখক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mohammad Mohiuddin — december ২২, ২০১৭ @ ৭:৩৮ পূর্বাহ্ন

      আমাদের দেশের জ্ঞানী ব্যাক্তিদের একটা সমস্যা হল অন্য জ্ঞানীদের তাঁরা শ্রদ্ধা করতে পারেন না। যে-কারণে এদেশে জ্ঞানী তৈরি না হয়ে রাজনীতিবিদ বেশী তৈরি হচ্ছেন। তারপরও মুর্শিদ স্যারকে এমন সুদীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার প্রদানের জন্য ধন্যবাদ। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকেও ধন্যবাদ। সাথে সাথে বিডি নিউজ কর্তৃপক্ষকেও ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শ. জামান — december ২২, ২০১৭ @ ৬:২৫ অপরাহ্ন

      শিরোনামে ধারনাটি সঠিক নয়, ধর্মগ্রন্থের কোথাও এ কথা লেখা নেই বরং বলা আছে ‘হালাল রুজি এবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত’ । ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sourav — december ২২, ২০১৭ @ ৮:৩৩ অপরাহ্ন

      সাক্ষাতকারটি খুবই তথ্যবহুল এবং সহজগম্য। সাক্ষাৎকারটার ভিডিও আশা করছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Enamul Khair — december ২৩, ২০১৭ @ ১:৪৫ পূর্বাহ্ন

      এ জাতীয় লেখা লিখার পূর্বে একটু সাবধান হলে ভালো হয়, কারণ এই সব মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়। আমি বেগম রোকেয়ার কোন লিখা পড়িনি। এই অংশটুকু বাদ দিলে পুরো সাক্ষাতকারটি চমৎকার ছিল…। আপত্তিকর অংশটুকুর কপি পেস্ট করে দেয়া হল নিচে।
      Copied from the disscussion
      ===”রাজু আলাউদ্দিন: কোরআন শরিফ পুরুষদের রচিত– উনার এরকম একটা বক্তব্য আছে বোধহয়।কোরআন শরিফ পুরুষদের রচিত– উনার এরকম একটা বক্তব্য আছে বোধহয়।”====

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরাফাত হোসেন — ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৮ @ ৯:৪৫ অপরাহ্ন

      শিক্ষার মান নেমে গেছে। অসাধুতা ঢুকেছে। অসাধুতা কতটা ঢুকেছে সেটা আপনাকে একটা প্রতিতুলনা দিয়ে বলতে পারি। যেমন ধরুন, আমার বাবা ছিলেন একজন হেডমাস্টার। এখনো আমার মনে পড়ে, আমাকে বললেন যে, আজকে ইংরেজি পরীক্ষা। প্রশ্নগুলো (স্কুলে) নিয়ে আসিস। আমিও একজন ছাত্র। অথচ আমাকে বললেন যে প্রশ্নগুলো নিয়ে আসিস স্কুলে। আমি তখন ছোট। কাজেই আমি চেয়ারের উপরে উঠে তাকের মধ্যে দেখে দেখে ইংরেজির প্রশ্নগুলো একসাথে করে বোগলে করে নিয়ে গিয়ে অফিসে গিয়ে বাবার হাতে প্রশ্নগুলো দিলাম। তারপরে আমি পরীক্ষার হলে চলে গেলাম। ওর মধ্যে আমার প্রশ্নও আছে। কিন্তু আমার কোনোদিন মাথায়ই আসেনি যে প্রশ্নগুলো দেখি। এই যে সততার শিক্ষাটা ছিল, এই শিক্ষাটা এ যুগে নেই। এ যুগে টাকা দিয়ে মানুষ নকল করে এবং এ যুগে যেহেতু ডিগ্রির দাম বেশি, ডিগ্রি না হলে উন্নতি করা যাবে না, সে জন্য বোধহয় এ রকম অসাধুতার আশ্রয় নেয়।

      100% right

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com