গাজী তানজিয়ার গল্প: বিম্ব বদল

গাজী তানজিয়া | ২৩ december ২০১৭ ২:০৩ অপরাহ্ন

slave womanমেসেজটা আসার সাথে সাথে আমূল কেঁপে ওঠে ইরিনা। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত এক তীব্র ্আতঙ্কের সাথে বসবাস তার। একবার ভেবেছিল ফোন আর ব্যাবহার করবে না। ফেসবুক বা ওই জাতীয় স্যোসাল মিডিয়া থেকে নিজের আইডেনটিটি প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন এক ভয়ঙ্কর কুৎসিত অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে ইটের পর ইট গাঁথার মতো এক একটা পরিকল্পনা সে জড়ো করে; আবার এর বিপরীত সম্ভাবনা এবং তার প্রয়োগের কথা ভেবে সবটাই ভেঙ্গে চুর চুর হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সে যেন মধ্যযুগে বাস করছে। এই একবিংশ শতক, এই উন্নত প্রযুক্তির সর্বৈব ব্যাবহার, সর্বত্র আধুনিকতার ছোঁয়া! এই যে দৃশ্যত উদার নারী বান্ধব দুনিয়া এ সব কিছু যেন মিথ্যা। এক গভীর ষড়যন্ত্রের জালে সে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর তলিয়ে যাচ্ছে গভীরে, আরো গভীর পুঁতিগন্ধময় এক গহ্বরে। বেশ কয়েকদিন ধরে মেসেজটা আসাছিল। ওরা ডাকছে। ঠিকানা দেয়া আছে, সেখানে যেতে বলছে। প্রথম দুএকদিন ইগনোর করে গেছে। কিন্তু সেই দিন! গোটা পৃথিবীটা যেন ধ্বসে গেছে ইরিনার চোখের সামনে। সেই ডকুফিল্মে দেখা হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমার আঘাতে যেভাবে ধ্বস নেমেছিল আভূমি দিগন্ত জুড়ে। সেভাবেই যেন ধ্বস নামলো তার গোটা অস্তিত্ব জুড়ে। মুহূর্তে বুঝতে পারে কত বড় ফাঁদে পড়েছে সে।

তার মাথার প্রতিটা শিরা জুড়ে সেই তীব্র যন্ত্রণাটা অনুভব করে আবার। ইরিনা ফোনটা সুইসড অফ করে দেয়। ঘরের আলোটাও তার কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। আলোটা বন্ধ করে দিয়ে দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে থাকে সে। কতক্ষণ এভাবে বসে ছিল মনে নেই হঠাৎ সে অনুভব করে ঘরের ভেতর কি যেন নড়াচড়া করছে। কেউ যেন হাঁটছে। হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চমকে ওঠে ইরিনা। সে নিশ্চিত জানে তার ঘরের দরজা লক করা। সে না খুলে দিলে কারো পক্ষে ঢোকা সম্ভব না। অথচ ক্লান্ত ভঙ্গিতে কেউ যেন হাঁটছে। আবার থেমে যাচ্ছে, এটা ওটা নাড়াচাড়া করে দেখছে।
অন্ধকার ঘরের অস্পষ্ট আলোয় সে কাউকে দেখতে পায় না। অথচ শব্দ, নড়াচড়া স্পষ্ট। সে আবারও একবার চোখ বুলিযে নেয়, খাট, আলমারি, পড়ার টেবিল। তার বিড়ালটা না-তো! কিন্তু বিড়াল এভাবে মানুষের মতো হাঁটবে কিভাবে? যেন স্ট্র্যাপ ছিড়ে যাওযা একটা স্যান্ডেল টেনে টেনে হাঁটছে কেউ। ভাবাতে ভাবতে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চোখ পড়তেই চমকে ওঠে সে। ওই তো, ওই, আয়নায় দেখা যাচ্ছে তাকে। তাহলে কি তার ঘরে কেউ ঢুকেছে, দাড়িয়ে আছে তার পেছনে! ইরিনা চকিতে পেছন ফিরে তাকায়। না, তার পেছনে কেউ নেই। অথচ ওই আয়নার ভেতরে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মেয়েটাকে।
মেয়েটার পোষাক অদ্ভুত ধরণের। ঠিক সমসাময়িক কালের মনে হচ্ছে না। লম্বা গাউন টাইপের একটা সাদাটে পোষাক। মাথার চুলে শক্ত করে বাঁধা বিনুনি। গায়ের রঙ কালো, মুখটা লাবণ্যে ভরা। পেটানো স্বাস্থ্য অথচ চোখ দুটো বিষন্ন। কতকালের শোক চোখদুটো জুড়ে।
আতঙ্কিত গলায় ইরিনা প্রশ্ন করে- কে, কে তুমি?
মেয়েটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দেয়, আমি আফ্রিদা।
তুমি এঘরে ঢুকলা কিভাবে? দরজাটা তো ভেতরে থেকে আটকানো।
ইরিনা আয়নার ভেতরে থেকেই দেখে মেয়েটা পা টেনে টেনে হেঁটে তার পড়ার টেবিলের কাছে গেল। সেখান থেকে একটা বই হাতে তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, তোমার এই যে সোস্যাল হিস্ট্রি বইটা, এর মধ্যে আমি থাকি। তুমি হয়ত এখানে আমাকে দেখে থাকবে।
ইরিনা বুঝতে পারছে ব্যাপারটা সত্যি না, তার ডিপ্রেসড মাইন্ড হয়ত একে সৃষ্টি করেছে! তারপরও সে প্রচণ্ড আগ্রহ বোধ করছে মেয়েটার সাথে কথা বলার জন্য। সে বলল, আমি তোমাকে দেখেছি?
হ্যাঁ। সেই মিশরের নীলনদ অববাহিকায় যখন ফারাওদের পা পড়ে নাই, তারও আগে থেকে এই পৃথিবীতে আমাদের আবির্ভাব। আমি এক দাস কন্যা, এক কৃতদাস।
ইরিনা অবাক হয় না একটুও। বরং এটা যেন খুব স্বাভাবিক এমন ভঙ্গিতে বলে, তুমি কিভাবে এখানে এসেছ?
ওই যে, তোমার প্রতিবিম্ব হয়ে! বেশ ক’দিন ধরেই দেখছি তুমি কি যেন একটা বিপদে পড়েছ। ভেতরে ভেতরে নিঃশে^স হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু কাউকে বলতে পারছো না, তাই এলাম আর কি! মেয়েটা আবারও পা-টা একটু টেনে হাঁটার চেষ্টা করছে।
তোমার পায়ে কি হয়েছে?
আফ্রিদা এবার ঠোট সামান্য বাঁকা করে ম্লান হাসে। সে হাসি রহস্যময় ঠেকে ইরিনার কাছে।
আফ্রিদা ইরিনার প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়েই বলে ওঠে- জানো, তোমাকে দেখে না, এক সময় আমার ঈর্ষা হতো। ভাবতাম, আহারে কত সুসময়ে তোমার জন্ম হয়েছে। মানুষ এখন কত সভ্য, কত মানবিক। অথচ আমাদের সময়কালটা ভাবো, সেই মধ্যযুগে। আমরা ছিলাম এনিমেটেড টুলস মাত্র। আমাদের জন্য ধর্ম সেদিন মানবতা না, অন্য কিছু। দর্শন বক্র। প্লেটো অ্যরিস্টটলের মতো জ্ঞানীরাও ছলনাময়। প্লেটো আমাদেরকে বলতেন ন্যাচারাল স্লেভ। আমরা নাকি দাস হয়েই জন্মেছি গ্রীসের সভ্যতাকে এগিয়ে দিতে। অ্যারিস্টটল বলতেন, ’প্রাণযুক্ত যন্ত্র’ এনিমেটেড টুলস।
তুমি এসব কী বলছ!
সত্যি বলছি। মানুষ সব সত্যি শুনতে অভ্যস্ত না, তাই তোমার অস্বস্তি হচ্ছে। তবে তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। আমি এসেছি তোমার কষ্ট ভাগাভাগি করে নিতে।
আমার যে কষ্ট, আমার যে যন্ত্রণা এর কোনো ভাগ হয় না।
তুমি যে জন্য কষ্ট পাচ্ছ, তোমার ধর্ম, তোমার সমাজ ব্যাবস্থা একটা সিস্টেমের মধ্যে তোমাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। একটা ধারণা, একটা মানদ- তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাই তুমি প্রতিনিয়ত এই কষ্ট ভোগ করছো। তুমি এই খোলসটা ছিড়ে বের হতে পারছো না।
না পারছি না। ওই যে বলছো না, আধুনিকতা, মডার্ন টেকনোলজি! ওই কথা ভেবেই পারছি না। হ্যাঁ, আমারও এক সময় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়েছে অতি আধুনিক উন্নত প্রযুক্তিধর এক সভ্য সমাজে জন্ম নিয়েছি বলে। হায় প্রযুক্তি! প্রযুক্তি যে আমাকে এভাবে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেধে ফেলবে ভাবি নাই কখনো? একটা ভিডিও ক্লিপ। সেদিন আমার ওপরে হামলে পড়া যাবতীয় যৌন বিকার, না, বলা ভালো যৌন শিকার- তারই পূর্ণ চিত্র। যুগ বদলের সাথে সাথে নারীর জন্য পাতা ফাঁদের চিত্র বদলায়। তোমাদের সময়ে ছিল কৃতদাসী, দেবদাসী, সেবাদাসী, হেরেমবাসী আর এখন, এখন কি বলবো একে, প্রযুক্তি দাসী? আমি একবারও বুঝতে পারি নাই, জন্ম নিয়েছি এক নারী হয়ে। নারী ওদের আজন্ম দাস! নারীকে ছলে-বলে-কৌশলে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেধে ফেলাতেই ওদের সব কৃতীত্ব। সেখানে কোনো দেশ কালের ভেদ নাই।
তোমাকে ওরা বাঁধল কীভাবে? তোমাকে তো বেশ শিক্ষিত আর বুদ্ধিমতিই মনে হচ্ছে।
বন্ধুত্ব! ওরা আমার বন্ধু ছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে গিয়েছিলাম সেদিন সেই পার্টিতে।
আফ্রিদার মুখের রেখা পাল্টাতে থাকে বিস্ময় কাটিয়ে আবার ঠোটের কোনে সেই বাঁকা হাসি।
হাসছো কেন?
ঘরে রাখা একমাত্র সোফাটায় ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে নীল কুশনটা কোলে তুলে নিতে নিতে আফ্রিদা বলল, আমাদেরও ওই একই কাহিনী। শুরুতে ওরাও আমাদের বন্ধুত্বই চেয়েছিল। গভীর সমুদ্রে ভেপু বাজিয়ে ভেসে যাওয়া জাহাজগুলোকে এতোদিন আমরা কৌতুহল নিয়ে দেখতাম। জুম খেতে কাজ করতে করতে হঠাৎ ভেপুর আওয়াজ শুনে কপালে হাত রেখে সূর্যের আলো আড়াল করে অবাক বিস্ময়ে দেখতাম জাহাজ। সেই জাহাজগুলো একদিন আমাদের কাছে চলে এলো। ভিন্ন ভিন্ন দেশের জাহাজ এসে দাঁড়াতে লাগল আফ্রিকার উপকূলে। এক সময়ে তারা আমাদের সর্দারদের দাওয়াত দিলো বন্ধুত্বের। জাহাজে ভোজের আয়োজন হলো। চারিদিকে অঢেল খাবার। এমন সুস্বাদু খাবার আমরা কখনো খাইনি। সাথে থাকতো নাচ-গানের আয়োজন। হুই¯িক, রাম আমরা খেয়েই চলেছি, খেয়েই চলেছি। নেশার ঘোরে বুঝতেই পারি নাই জাহাজ কখন আমাদের নিয়ে নোঙ্গর তুলেছে। আর তারপর করেছে ওদের হাতের পুতুল। আমরা হয়েছি দাস। বিক্রি হয়েছি হাটে হাটে। ওদোর হাতে ছিল ক্ষমতা, ছিল অস্ত্র। যার বলে ওরা মানুষকে দাস করে রাখতে পেরেছে।
দূরাগত গলায় বলে যায় আফ্রিদা- কাউ হুইপ, বুল হুইপ, চিকেন হুইপ, রকমারি চাবুক, শেকল, আর ওভারশিয়ার, ক্রিসিফিকেশন। ওরা কৃতদাসদের কখনো কখনো মাঠের ধারে গাছের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে কানে পেরেক ঠুকে আটকে রাখতো, বলত- ’রোমানদের ক্রুশে বিদ্ধ করে মারা হতো, তোদের ভাগ্য ভালো, তাই কানের ওপর দিয়ে গেল’। হাতের চাবুকটা নাচিয়ে ওভারশিয়া গর্ব করে বলত, ’আমি ওভারশিয়ার কেন জানিস? আই ক্যান সি অল ওভার এ্যান্ড হুইপ অল ওভার।’
দাড়াও, দাড়াও আফ্রিদা, এটা তোমার কাহিনী? ঠিক এমনটা আমার সাথেও যে ঘটেছে ওইদিন। এটা কিভাবে সম্ভব, এতটা কাল পেরিয়ে কীভাবে সম্ভব হয়! ঠিক ওভাবেই সেদিন চুড়ান্তভাবে অপমানিত হওয়ার দিনে, ধর্ষিত হওয়ার সেই ক্ষণে, লোকটা এইট বোরের রিভারবারটা দেখিয়ে বলেছিল, ’এটা চিনিস? জানিস আমি কে? জানিস কতবড় স্মাগলিং ডিল আমাদের? সব কিছু আমাদের কেনা, প্রশাসন, ক্ষমতাবানেরা সব, সবকিছু। তোর মতো মাগিকে কেটে ভাসিয়ে দিলেও কেউ জিজ্ঞেস করতে আসবে না’। তারপর সে প্রয়োগ করতে লাগল তার সব রকম যৌন বিকৃতি। শরীরের প্রতিটি রোমকূপে ঢেলে দিচ্ছিল তীব্র গরল। ধ্বসিয়ে দিয়েছিল গোটা জীবন, বেঁচে থাকার ন্যুনতম ইচ্ছাটুকু।

ঘরে তখন পীন পতন নিস্তব্ধতা। নিঃশ^ব্দে কাঁদছে ইরিনা। কেঁদে চলেছে।
ইরিনা তুমি কাঁদছো? আমরাও কাঁদতাম জানো, প্রভুর অত্যাচার সইতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়তাম বড় পাদ্রির পায়ে, তখন তিনি উল্টে উপদেশ দিতেন,’ প্রভুকে অমান্য করা পাপ, এ জীবনে সৎভাবে কাজ করে যা, পরকালে নিশ্চই স্বর্গের হেসেলে কাজ পাবি!’ হাতে বাইবেল নিয়ে পরকালেও সেই দাসত্বের পথই বাতলে দিতেন তিনি।
ইরিনা নিশ্চিত এ যুগের বিচার সভাও তারই দোষ খুঁজে বেড়াবে। তাকে ছিড়ে খাবে, খুবলে তুলে নেবে তার ত্বক, মাংস। সে যেন শুধুই এক ভোগ্যা, এক পণ্য প্রকারান্তরে নারী। ‘তুমি নারী, তুমি খোলা ধনশালার মতো, তুমি কেন রাতের বেলা সেখানে গিয়েছিলে একা? তুমি নিশ্চই ভ্রষ্টা! তুমি নিশ্চই লোভী! তুমি নারী, তুমি জান না, রাত তোমার জন্য নয়! তোমার সাথে যদি কিছু ঘটে থাকে সেজন্য তুমি দায়ী, তোমার বন্ধুত্বের ছল দায়ী। তুমি নারী তাই তুমি পাপের অংশ- তুমিই পাপী।’ অব্যর্থ এ সমাধান সে জানে।
আমি ভেবেছিলাম ভিন্ন কথা। তোমাদের আইন আছে, বিচার আছে। আমাদের তো ওরা শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতো। এক একটা বন্দরে ছিল দাস গুদাম। ক্রেতারা সেখান থেকে সহজে কিনে নিত আমাদের। গর্বিত দাস সম্রাট তার ক্লায়েন্টকে আকৃষ্ট করার জন্য সগর্বে ঘোষণা করত, ‘কোন মেয়ে চাই তোমার বলো, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, গ্রিক, ইংলিশ, ডাচ, ইতালিয়ান, এশিয়াটিক, আফ্রিকান?
এ যুগের দালালরাও ওভাবেই প্রপোজ করে তাদের ক্লায়েন্টকে জানো আফ্রিদা।
ধর্ষিতার ভিডিও ভাইরাল করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে ব্যাবহার করা হয় বার বার। প্রতিবার আবার ভিডিও হয়। ধনী বাবার বখে যাওয়া ছেলে, নব্য ধনী, লম্পট আমলা কত কত রকম ক্লায়েন্ট ওদের। ডেভিডের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি শুধু নামে; কী ধরণের ইভেন্ট সে আড়ালে ম্যানেজ করে তা তার ক্লায়েন্ট মাাত্রেই জানে। সেখানে যেমন প্রফেশনাল মেয়ে আসে, তেমনি কেউ কেউ চায় আনকোরা, তন্বী তরুনী অক্ষত যোনী। প্রতিবারই তারা সাজিয়ে পরিবেশন করে অক্ষত যোনীর ভূমিকায় বহু ব্যবহৃত নারীকে! পৃথিবীর যাবতীয় অপমান শরীরে মর্মে চাবুকের মতো আঘাত হানে তাদের, ঘৃণায় নীল হয় শরীর।
একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে আফ্রিদা বলে, তাহলে সব কিছু একই রকম আছে ইরিনা! শুধু তোমরা আধুনিক বলে ধরণটা বদলেছে মাত্র। আমার ভাবনাটা কত ভুল ছিলো বলো। আমি ভাবতাম তোমাদের জানা আছে ইতিহাস। তোমাদের আছে জ্ঞান। তুমি জানো না ইরিনা, মনিষীদের মতে, সর্বপ্রথম নারীরই জ্ঞানচক্ষু উম্মীলিত হয়েছিল। তাই সে গন্ধমে কামড় বসিয়েছিল। সৃষ্টির নেশায় নারীই প্রথম সঙ্গীটির উপর উপগত হয়। নারী ধরিত্রী, নারী জন্মদাত্রী। শুধুমাত্র গায়ের জোরে চতুর পুরুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে শোষণ করেছে, এখনো করে যাচ্ছে। তুমি একটা সভ্য সমাজে বাস কর, মধ্যযুগে না। তোমার কিসের ভয়!
ভাইব্রেশন মুডে থাকা ফোনটা যেন ক্রোধে ফুসে ওঠে। মুহূর্তে আয়নায় আফ্রিদা নেই। যা আছে তা হলো ইরিনার ভেতরে এক ক্রোধের বোধ। সেই ক্রোধ যেন ছড়িয়ে পড়ে ইরিনার শিরায় শিরায়। ঠিকই তো বলছে আফ্রিদা, সে কেন ভয় পাচ্ছে? ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে? এতোদিনে তার নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে। কেন সে নিজেকে এক মধ্যযুগের বন্দি নারী করে রেখেছে? কেন সে তার সময়কালকে আমলে নিয়ে সে রকম আচরণ করে নাই? এভাবে বারে বারে ধ্বংশ হওয়ার আগে একবার ঘুরে দাঁড়াবে সে। অতল গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ তাকে ভোরের আলোর মতো হাতছানি দেয়।


অভিযোগ দায়ের করা মাত্র সর্বত্র ঢি-ঢি পড়ে যায়। ইরিনা শুনেছে মিডিয়া ওদের হাতে। সেরকম কিছু মিডিয়া এবার খেল দেখাতে শুরু করল। ইরিনাদের জীবন অতিষ্ট বললে কম বলা হয়। সাংবাদিক নামের একদল ভাড়াটে মানুষ তাদের বাড়িতে এসে হামলে পড়ল। এদের মধ্যে কেউ কেউ এসেই জিজ্ঞেস করে,‘এ বাড়িতে ধর্ষিতা হয়েছে কে?’
ইরিনার বাবা ভেতরের যাতীয় ক্ষোভ, অপমান উগরে দিয়ে বলেন, আমি, আমি ধর্ষিত হয়েছি। এবার খুশি তো? তবে আমার এক ঘোর অন্যায় হয়ে গেছে জানেন, আপনাদের পুরোপুরি খুশি করতে পারি নাই। মেয়ে গিয়ে থানায় কমপ্লেইন করেছে। মেয়েকে নিয়ে আমি এখনো ট্রেনের নিচে আত্মাহুতি দিতে পারি নাই।
এমনটা হবে ইরিনা জানতো, তা বলে তো দিনের পর দিন একটা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া চলে না। সে নারী তাই যতবার সে জন্মেছে ততবার দলিত হয়েছে। কখনো কখনো সে জন্মায়ইনি, ভ্রুণেই তার যাত্রা থেমে গেছে। হয়ে গেছে জন্মের আগেই জীবন্ত কবর।
ঠিক ইরিনা, ঠিক। তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো! আমি এমনটাই চেয়েছিলাম তোমার কাছে। এ ছিল আমার জন্ম জন্মান্তরের শোধ। সৃষ্টির মূলেই যার আবির্ভাব তাকে দাবিয়ে রাখবে সাধ্য কার! আয়নায় এসে দাঁড়িয়েছে আফ্রিদা। তাকে আজ অন্য রকম লাগছে। তার ঠোটের কোনে ঝলমলে হাসির রেখা। চোখের সেই বিষন্ন ভাবটা নেই। জল জল করছে চোখের তারা। তাতে তার রূপ যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
ইরিনা মোহাবিষ্টের মতো বলে, তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে আফ্রিদা।
আমি যে কি খুশি হয়েছি, তোমাকে কি বলব! জানি তোমাকে আরো অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। সেজন্য তোমার ভিতরের আগুন জ্বালিয়ে রাখো। সমাজ, সংসার, দৃষ্টিভঙ্গী নামক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে যতবার তুমি জন্মাবে ততবার ভেতরের আগুন আরো নতুন করে জ্বালবে মেয়ে।
তুমি তো বলেই খালাস। কিন্তু আমার ওপর দিয়ে যে কি যাচ্ছে শুধু আমিই বুঝতে পারছি। কড়াই থেকে যেন উনুনে এসে পড়েছি।
কড়াই থেকে উনুনে পড়ার অভিজ্ঞতা তো তুমি জানোই না ইরিনা! সে অভিজ্ঞতাও আমার আছে ।
শোনো সব গল্পের একটা পরিশিষ্ট থাকে না, তেমন আমারও একটা আছে। এবং তোমারও একটা থাকবে। সে জন্য তোমাকে প্রস্তুত হতে হবে। তোমার কিছুতেই উনুনে পড়া চলবে না। আমার ওপরে ঘটা নির্মমতার চুড়ান্ত রূপটার কথা শোনার পর তুমি তোমার সিদ্ধান্ত নাও মেয়ে।
এর পরও নির্মমতা আছে?
আছে আছে। শোনো তাহলে, ঈশ^রের কোন চক্রান্তে জানি না আমি সুন্দরী হয়ে জন্মেছিলাম। তুলো খেতের সবচেয়ে জোয়ান তরুণের স্বাস্থ্য তখন আমার দেহে। দূরের যাত্রীরা আমাকে দেখতে পেলে খেতের কাছে ঘোড়া থামিয়ে ইতিউতি করে। বাড়িতে নতুন অভ্যাগতরা আমার দিকে আড়ে আড়ে তাকায়। তাছাড়া কেবিনের দাসদের মধ্যে আমাকে নিয়ে মারামারি লেগেই থাকত। তাই আমাকে নিয়ে ঝামেলা এড়াবার জন্য আমার তুলনামূলক নিরীহ মাস্টার আমাকে দ্বিতীয় বারের মতো বিক্রি করে দিলো অন্যত্র। এবার হাটে বিক্রি হলাম শুধু দাসত্ব করবার জন্য না। এবার আমার ভূমিকা যন্ত্রের। দাস শিশু উৎপাদনকারী এক মা। ‘আই নার্সড বেবিস, অল স্লেভ বেবিস।’ দাস ভা-ার পরিপূর্ণ রাখার বাসনায় প্রভুরা যেদিন বেবি নার্সিংয়ের চিন্তা মাথায় নিয়ে কৃতদাসীদের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ায় সেদিন থেকে মানুষের সুখের শেষ বিন্দুটুকুও তাদের জীবন থেকে উধাও হয়ে যায়।
যৌবন, ভালোবাসা, মা হওয়া, পিঠে নিজ সন্তানের বোঝা নিয়ে মাঠে কাজ করা, তাও যখন গেল তখন আর কি থাকল? আগে তবুও দাসেদের মধ্যে একটা কিছু একটা হতো, মাস্টার নিজে সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, দাস নর-নরী দুজনে লাফিয়ে একটা ঝাঁটা পার হতো, মাস্টার বলত- ‘যা, তোদের বিয়ে হয়ে গেল’। সব সময় যে পছন্দের মানুষের সাথে ব্যাপারটা ঘটত তা, না। তবু একজন নির্দিষ্ট মানুষ ও তার সন্তান ধারণের অধিকার তো ছিল। কিন্তু দাস শিশু যেদিন পণ্য হয়েছে, সেদিন থেকে ওই সব দাস নারীরা মানুষের কাহিনীতে সবচেয়ে অসহায় জননী। অন্ধকার ঘরে রাতের আঁধারে কারা চোরের মতো আসে, আর দস্যুর মতো সব তসনস করে দিয়ে চলে যায়, তারা জানে না। তারা শুধু জানে তামাক খেত, আখ খেত, তুলো খেতের মতোই তারা স্বর্ণ গর্ভা। তাদের ওই মজবুত দেহে অনেক অনেক ডলারের সম্ভাবনা। আফ্রিকার উপকূল অনেক আগেই দাস শুন্য হয়ে গেছে। এক একটা কৃষ্ণাঙ্গ দাস শিশু তখন রাশি রাশি ডলার, হলুদ সোনা।
সে কী অসহ্য যন্ত্রণা! দাস নারীরা বছরের পর বছর অজ্ঞাত জনকের সন্তান বহন করে চলেছে। এক শিশু ভূমিষ্ঠ হলো, সে মাটিতে পা দিতে না দিতে কোলে এলো আর একটা। মাস্টার বলল, ‘এবার ওটাকেই দেখা-শোনা কর আমি এটাকে নিয়ে যাচ্ছি’। এভাবে একের পর এক জন্মে, আর তার খোঁজ নেই। জন্মদাত্রী দাস মা আমি আমার পয়ত্রিশ বছরের জীবনে জন্ম দিয়েছে ১৪টা শিশুর যাদের কেউ আমার কাছে ছিল না। বিক্রী হয়ে গেছে কবে! পৃথিবীর সমস্ত বেদনা নিয়ে বেঁচে আছি আমি, শুধু আমি একা। কপালে জ্বলজ্বলে দাস ছাপ। বহু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে ক্ষয়াটে জরায়ুধারী বেদনার্ত, শোকাহত, জরাগ্রস্থ এক সন্তান উৎপাদনকারী পণ্য। কোনো মানুষ নয়, নারী, প্রকারান্তরে দাসী। তুমি জানতে চেয়েছিলে না, আমি কেন পা টেনে টেন হাটি? কথা শেষ করতে পারে না, ডুকরে কেঁদে ওঠে আফ্রিদা।
ইরিনা এই বেদনা উপশমের কোনো সান্তনা খুঁজে পায় না। আয়নার মধ্যে ওকে কি ছুঁয়ে দেয়া যাবে! জড়িয়ে ধরে বলা যাবে, কেঁদোনা! ইরিনা এ ধরনের লৌকিক আচরণ কখনো করে নাই তাই একটু দ্বিধায় ভুগতে থাকে। এরই মধ্যে দরজায় হঠাৎ ডোরবেল বেজে উঠলে আফ্রিদাকে কোথাও আর দেখা যায় না। তবে আফ্রিদার যন্ত্রণাগুলো ঘরময় এক চাপা কষ্টের কাতর আর্তনাদ হয়ে ফিরতে থাকে।
ইরিনা ঈশারা ইঙ্গিতে টের পেয়ে গেছে। তাকে নিয়েও বিকি-কিনির এক হাঁট বসে গেছে। ওরা চায় একটা সমঝোতা। তাই ওরা এসে গেছে। তাদের ছোট্ট ড্রইংরুমে ভারী ব্রিফকেস ও মোটা মোটা নেগোসিয়েশন পেপারস নিয়ে বসে আছে। বাবা-মাকে এর মধ্যে সোয়াট এনালিসিসটা বোঝানো হয়ে গেছে। হয় একটা মোটা অংকের ডিল নয়ত বিয়েতে সম্মতি! সতীত্ব-সম্ব্রম নামের সামাজিক মারপ্যাঁচে ফেলে দিয়ে আর একবার বন্দি করতে চায় তাকে। এই দ্বিতীয় ডিল তাকে সরাসরি নরক যন্ত্রণায় ফেলে দেয়ার জন্য সব রকম বেড়ি নিয়ে হাজির হয়েছে।
কিন্তু কে কবে শুনেছে, একবার যে নরক দেখে আসে সে সেই নরকে দ্বিতীয়বার ফিরে যেতে চায়!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Arafat — december ২৩, ২০১৭ @ ২:৫২ অপরাহ্ন

      an inspiring story for women who were harassed physically and mentally.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবালাহমেদ — december ২৪, ২০১৭ @ ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন

      ১. নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ভালো, কিন্তু গল্প হিসেবে ততটা ভালো হয়নি। সার্বিকভাবে ভালো গল্প বলা চলে না।

      ২. দাস নারীদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু তুলনাটা ঠিকমত গল্পে উপস্থাপিত হয়নি।

      ৩. গল্পটা খানিকটা অসমাপ্ত। সমাপ্তি টানতে না পারায় গল্পটি আংশিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com