স্মরণ

উত্তরাধুনিক সাহিত্য এবং রোকেয়ার ‘জ্ঞানফল’

mostafa_tofael | 10 Dec , 2017  

Rokeya‘জ্ঞানফল’ রোকেয়া এস. হোসেনের একটি রূপকথা গল্প, বা অ্যালেগরি। এ গল্পটি আছে তাঁর ‘মতিচূর’ দ্বিতীয় খন্ডে। ‘জ্ঞানফল’ গল্পটি রোকেয়ার অন্য অনেক গল্প বা গল্পাকৃতির প্রবন্ধের মতো নারীচরিত্রপ্রধান। এই রূপকটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে ‘হাভা’ বা হাওয়া, ইংরেজিতে যিনি ‘ইভা’, তার সাথে যুগল চরিত্র হিসেবে আছে ‘আদম’। তার রূপক কহিনিটি এখানে পুনর্সৃষ্ট। রোকেয়া পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন, “এস্থলে কোরান শরিফ বা বাইবেলের বর্ণিত ঘটনার অনুসরণ করা হয় নাই।”

রূপক গল্পটির চতুর্থ অনুচ্ছেদেই একটি প্রমিথীয় দ্রোহের লক্ষণ স্পষ্ট। প্রমিথিউজ দেবতাকুলে সম্মান ও মর্যাদার আসনে ছিলেন; ছিলেন দেবরাজ জিউসরে প্রিয় পাত্র। কিন্তু স্বর্গীয় সুখ তার ভাল লাগেনি।শুধু আদেশ আজ্ঞা পালন জিউসের সমর্থনে শোভাযাত্রায় শরিক হয়ে ‘ধন্য ধন্য, জিউস দেব’ বলতে বলতে তাঁর বিরক্তি এসে গিয়েছিল। মর্ত্যের মৃত্তিকা তার মাতা; মাতার সন্তান মানবকুল অনাহারে অর্ধাহারে, ছিন্নবস্ত্রে, বিনাবস্ত্রে বসবাস করে। তারা জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা ও উদ্ভাবনী জানে না; বঞ্চনা ও প্রতারণা বুঝে না; সম্পদ সৃষ্টির প্রণোদনা উপলব্ধি করে না। তাই প্রমিথিউজ স্বর্গে আয়োজিত একটি শোভাযাত্রা থেকে আগুনের মশাল চুরি করে এনে মর্ত্যের মানবজাতির হাতে দিলেন। বললেন, ‘তোমরা আমার ভাই। এই মশাল জ্বালিয়ে রেখ; জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করো; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করো। শ্রমের ঘাম আর ত্যাগের রক্ত এক সাথে প্রবাহিত করো; কেউ তোমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ জিউস প্রমিথিউজের এই বিদ্রোহে মহা ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি প্রমিথিউজকে স্বর্গ থেকে বহিষ্কার করে দিলেন। তাকে লোহার শেকলে বেঁধে ককেশাস পর্বতে বন্দি করে রাখা হলো।
‘জ্ঞানফলে’ রোকেয়া লিখলেন,

“ফল ভক্ষণ করিবামাত্র হাভার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হইল।…এই সময় তথায় আদম গিয়া উপস্থিত হইলেন।হাভা তাঁহাকে স্বীয় হস্তস্থিত ফল খাইতে অনুরোধ করিলেন। পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে আদমেরও জ্ঞানোদয় হইল। তখন তিনি নিজের দৈন্যদশা হৃদয়ের পরতে পরতে অনুভব করিতে লাগিলেন। — এই কি স্বর্গ? প্রেমহীন, কর্মহীন অলসজীবন,– ইহাই স্বর্গসুখ? আরও বুঝিলেন, তিনি রাজবন্দী– এই ইডেন কাননের সীমানার বাহিরে পদার্পণ করিবার তার ক্ষমতা নাই…
পরমেশ্বর উদ্যান-ভ্রমনে আসিয়া দেখিলেন, আদম দম্পতি তাঁহাকে দেখিয়া বৃক্ষান্তরালে লুক্কায়িত হইলেন। প্রভু তাঁহাদিগকে ডাকিলেন কিন্তু তাঁহারা ক্ষোভে, অভিমানে, লজ্জায় বিভুসমীপে যাইতে পারিলেন না।… ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন, “তোরা স্বাধীনতা চাহিস? যা তবে দূর হ! পৃথিবীতে গিয়া দেখ স্বাধীনতায় কত সুখ!”
আদম দম্পতি সেই দিন পতিত হইয়া পৃথিবীতে আসিলেন। এখানে তাঁহারা অভাব- স্বাচ্ছন্দ্য, শোক-হর্ষ রোগ আরোগ্য দুঃখ-সুখ প্রভৃতি বিবিধ আলো-আঁধারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া প্রকৃত দাম্পত্য জীবন লাভ করিলেন।”
রোকেয়া তাঁর এই রূপক রচনায় একদিকে নির্মাণ করেছেন পৌরানিক উপনিবেশের চিত্র, অপর দিকে নির্মাণ করেছেন রাজনৈতিক উপনিবেশের প্রতীকধর্মী আলেখ্য। স্বর্গ থেকে পতিত হয়ে আদম-হাভা দম্পতি যখন পৃথিবীতে এলেন, তখন থেকেই শুরু হলো পক্ষপাতিত্বের রাজনীতি, শোষণ-বঞ্চনা ও অসাম্যের ইতিবৃত্ত। রোকেয়া লিখেছেন, (জ্ঞানফল)
“হাভা কন্যাদিগকে অধিক ভালোবাসিতেন; … আদম আবার পুত্রদিগকে অধিক স্নেহ করিতেন।…
জননী হাভার আশীর্বাদ মতে তাঁহার দুহিতানিচয় জন্মে এক গুণ, বাড়ে দ্বিগুণ, দীর্ঘায়ূ হয় চতুর্গূন। আর আদমের প্রিয় তনয় জন্মে এক গুণ, অতি সোহাগে প্রতিপালিত হয় বলিয়া রোগ ভোগ করে দ্বিগুণ, মরে চতুর্গূণ! স্বাভাবিক মৃত্যু না হইলে তাহারা যুদ্ধচ্ছলে পরস্পরে মারামারি কাটাকাটি করিয়া মরে। একদল কারাগারে পচে, অবশিষ্ট নানা ক্লেশ ভোগ করে।”
রোকেয়া বর্ণিত উপরে উদ্ধৃত অংশটুকু পারিবারিক অসাম্যের চিত্র তুলে ধরছে, যে রকম পারিবারিক অসাম্যে তিনি তাঁর শৈশব-কৈশোর জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর ভাইদের জন্য অবারিত দুয়ার খোলা ছিল রংপুর থেকে সুদূর কলকাতা গিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জনে, অথচ রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসা ও স্বয়ং তাঁর জন্য ছিল অবরোধবাসের করুণ জীবন যাপন।
ইয়োরোপীয় উপনিবেশবাদী জাতিসমূহের বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা দখল এবং এখানকার সম্পদ লুণ্ঠণ বিষয়েও রোকেয়া তাঁর ‘জ্ঞানফলে’ আলোকপাত করেছেন। উত্তর-উপনিবেশবাদী এই ডিসকোর্সে কলকাতার নিকটবর্তী বঙ্গীয় অঞ্চলকে বলা হয়েছে কণক দ্বীপ। ইউরোপীয় বণিকদের বলা হয়েছে জিন বণিক, কারণ তারা ছিল শ্বেতকায়। রোকেয়া লিখেছেন,
“তাহারা মাকাল ফলে জাহাজ বোঝাই করিয়া বাণিজ্য-ব্যপদেশে যাত্রা করিল। জিনদের জাহাজখানি নানাস্থান ঘুরিয়া বিরাট সাগরের উপকূলে কনক দ্বীপের এক বন্দরে উপনীত হইল। কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ করিয়া বণিকরা কৃষকের নিকট মাকাল বিনিময়ে ধান্য প্রার্থনা করিল। কৃষক তাহার ভাষা বুঝিল না; অপিচ ছোট ছোট হৃষ্টপুষ্ট বালক বালিকার দল সবিস্ময়ে জিনদের পরিবেষ্টন করিয়া দাঁড়াইল। বণিকরা মনে মনে ভাবিল, “একি রঙ্গ! আমরা এই কৃষক-শিশুদের তামাসার বিষয় হইলাম দেখি।” যাহা হউক, কোন প্রকারে কৃষককে বণিকেরা নিজেদের মনোভাব জ্ঞাপন করিল। কৃষক প্রথমে মাকালের পরিবর্ত্তে ধান্য দান করিতে অস্বীকৃত হইল; কিন্তু তাহার পুত্র বলিল, “আহা! দাও; ওরা ক্ষুধার্ত্ত আমাদের এত ধান আছে।”
পূর্বে দুই একখানি জাহাজ বৎসরে একবার মাত্র মাকালের আমদানি হইত; পরে অসংখ্য তরীপূর্ণ মাকাল বৎসরে তিন চারিবার কনক দ্বীপে আসিতে লাগিল। আর রাশি রাশি ধান্য পরীস্থানে রপ্তানী হইতে চলিল। মাকালের মায়া এমনই যে কৃষক আর কিছুতেই আত্মসংযম করিতে পারিতেছিল না।অদ্য যে ধান্য ক্ষেত্র হইতে কর্ত্তন করিয়া আনে, কল্য তাহা মাকাল বিনিময়ে বিক্রয় করে। সুতরাং কনক দ্বীপে দুর্ভিক্ষ রাক্ষসী আসিয়া ঘর বাঁধিল।”
হাভা, স্বয়ং জ্ঞানফল খেয়ে তার উচ্ছিষ্ট অর্ধেক অংশ আদমকে খেতে দিয়েছিলেন। সুতরাং, জ্ঞানফল পৃথিবীতে নিয়ে আসার কৃতিত্ব নারী জাতির। দ্রোহের ফসল ছিল এই জ্ঞানফল।প্রমিথীয় দ্রোহ পৃথিবী ব্যাপী চাষবাস, আবিষ্কার-উদ্ভাবন, উন্নয়ন-উৎপাদনের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু, প্রথমত পুরুষ জাতি পরিবারতন্ত্রের নামে অর্ধাঙ্গ নারীকে বঞ্চিত করতে থাকে, পরে ইউরোপীয় বণিকরা এসে তাদের দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করে। এর ফলে, দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ‘শুষ্ক তরু’র প্রতীকে রোকেয়া এ দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যে রূপকল্প উপহার দেন, তার মর্মার্থ হচ্ছে: ভ্রাতা-ভগ্নি, পুরুষ-নারী যৌথ প্রচ্ষ্টোর মধ্য দিয়ে দেশ-রাষ্ট্র-সমাজ ও অর্থনীতেক রুগ্ন অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারবে। কেবলমাত্র ভ্রাতা বা পুরুষ পক্ষের চেষ্টা দ্বারা এ-উদ্ধারকর্ম সম্ভব হবে না। পুরুষ-রমণী উভয়ে সম-উদ্যোগে উদ্যোগী হয়ে দেশ রক্ষার মহতী তৎপরতায় নিয়োজিত হলে পৃথিবীর কোনো শক্তির পক্ষেই এ-জাতিকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।বৃটিশ উপনিবেশবাদী শক্তি আমাদের দেশকে প্রায় দু’শ বছর শোষনের যাঁতাকলে পিষ্ট করে রেখেছিল, তার উল্লেখে রোকেয়া ‘জ্ঞানফলে’ লিখেছেন,
“বৎস! ক্রন্দনে কোন ফল হইবে না। দুই একটি কেন, দুই লক্ষ নরবলি দান করিলেও জ্ঞানবৃক্ষ পুনর্জ্জীবিত হইবে না। দুই শত বৎসর হইল এই দেশের অদূরদর্শী, স্বার্থপর পণ্ডিত-মূর্খেরা ললনাদিগকে জ্ঞানফল ভক্ষণ করিতে নিষেধ করে; কালক্রমে ঐ নিষেধ সামাজিক বিধানরূপে পরিগণিত হইল এবং পুরুষেরা এ ফল নিজেদের জন্য একচেটিয়া করিয়া লইল।”
সুতরাং, রোকেয়া দর্শনের প্রতিপাদ্য পাশ্চাত্যের উগ্র নারীবাদী উত্তরাধুনিকতা নয়। বরং, তাঁর দর্শন নারী-পুরুষ সম অধিকার, সম-উদ্যোগ, সম-ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। শুধু উন্নয়ন নয়, আত্মরক্ষার কাজেও দেশের নারী পুরুষের সমান কর্তব্য ও ক্ষমতা আবশ্যক। রোকেয়া দর্শনের এ-দিকটাই উত্তরাধুনিক সাহিত্য, সম্ভবত পশ্চিমের তুলনায় উৎকৃষ্টতর। উৎকৃষ্টতর এ জন্য যে ডেরিডীয় বিকেন্দ্রীক নির্মাণতত্ত্বের প্রয়োগে তিনি পৌরানিক গ্রান্ড-ন্যারেটিভ ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.