সাক্ষাৎকার

বাংলা সাহিত্যের অনুবাদক

কিয়োকো নিওয়ার সঙ্গে আলাপ

adnan_syed | 1 Jun , 2008  

পশ্চিমবাংলার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পি এইচডি করেছিলেন কিয়োকো নিওয়া। রবীন্দ্রসাহিত্য পড়তে গিয়ে বাংলায়

kyoko-niwa.jpg
কিয়োকো নিওয়া (Kyoko Niwa)

অনুরাগ জন্মে তাঁর। অনুরাগের প্রাবল্যে জাপানিজ ভাষায় বাংলা সাহিত্য অনুবাদ করছেন কিয়োকো। টকিও রেডিওতে বাংলা শিক্ষার একটা অনুষ্ঠানও পরিচালনা করেন তিনি। টকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যের শিক্ষক কিয়োকো নিওয়া ২৬ মে নিউইয়র্ক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আয়োজিত নজরুল-রবীন্দ্র উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন নজরুল বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। আলাপচারিতা হয় সেখানেই।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আদনান সৈয়দ

আদনান সৈয়দ: প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে আপনি বেশ ভালো বাংলা বলতে পারেন। একজন জাপানিজ হয়ে বাংলার প্রতি আপনার এই অনুরাগ কীভাবে জন্মালো, জানতে পারি?

কিয়োকো নিওয়া: সাহিত্যের ছাত্রকালীন অবস্থায় রবীন্দ্রসাহিত্যের সাথে আমার পরিচয়। আপনি হয়তো জানেন যে জাপানে রবীন্দ্র সাহিত্য বেশ জনপ্রিয়। তা রবীন্দ্র সাহিত্য পড়তে যেয়েই আমি বাংলা সাহিত্যেকে আরো বেশি করে কাছ থেকে জানার সুযোগ পাই। যেহেতু বাংলা সাহিত্যের ইংরেজী অনুবাদ সেরকম খুব একটা হয়নি তাই ভাবলাম বাংলাটা যদি নিজে শিখে নিতে পারি তাহলে এ ভাষার সাহিত্যের সাথে আরো বেশি পরিচিত হতে পারবো। এভাবেই বাংলার প্রতি আগ্রহটা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপর পিএচডি করি এবং বাংলা সাহিত্যকে জাপানিজ ভাষায় অনুবাদ করে জাপানিজদের সাথে পরিচিত করার চেষ্টা করছি।

আদনান: আন্তর্জাতিক সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যকে আপনি কোন আসনে বসাবেন?

কিয়োকো: আন্তর্জাতিক সাহিত্যমানের দিক থেকে বাংলা সাহিত্য নিঃসন্দেহে আধুনিক, উন্নত। তারাশঙ্কর, বিভূতি, মানিক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, নজরুল এঁদের উপন্যাস পড়ে আমার এই মনে হয়েছে যে উপন্যাসগুলোর ইংরেজী অনুবাদ হওয়া খুবই জরুরি। শুধুমাত্র অনুবাদ হয়নি বলেই একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এইসব সময়োত্তীর্ণ বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর সাথে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের তেমন কোনো আত্মিক যোগাযোগ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে বাংলা সাহিত্যের মান বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় রচিত বিখ্যাত সাহিত্যের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

আদনান: আপনার অনূদিত বাংলা সাহিত্যগুলো সম্পর্কে জানতে চাই?

কিয়োকো: হ্যাঁ, আমি তারাশঙ্করের কবি উপন্যাস জাপানিজ ভাষায় অনুবাদ করেছি। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীও জাপানিজ ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাছাড়া তারাশঙ্কর, মহেশ্বেতা দেবী, কাজী নজরুল ইসলাম এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ছোটগল্প সংকলন আমি জাপানিজ ভাষায় অনুবাদ করেছি।

আদনান: তা জাপানিজ ভাষায় অনূদিত এই বাংলা সাহিত্য নিয়ে জাপানের মানুষের আগ্রহ কেমন বলে আপনার মনে হয়?

কিয়োকো: অনেক। জাপানীজদের কাছ থেকে এর জন্য বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি। সত্যি কথা বলতে জাপান এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক চেহারায় কিন্তু খুব একটা অমিল নেই। দুটো দেশই ধর্মীয় মূল্যবোধের বেড়ায় বন্দি। দুটো দেশের মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং মনন প্রায় একই রকম। সেদিক থেকে জাপানিজদের বাংলা সাহিত্যের বিষয় এবং ভাবনায় নিজেদের আত্মস্থ করে নিতে খুব একটা হোচট খেতে হয়নি।

আদনান: বাংলাদেশে কি গিয়েছেন কখনো? বাংলাদেশের মানুষ কেমন লাগে?

কিয়োকো: হ্যাঁ, এ পর্যন্ত চারবার গিয়েছি। এই তো মাস দুয়েক আগেও বাংলাদেশ আর কলকাতা ঘুরে এলাম। সত্যি, দেশটাকে খুব ভালো লাগে। আগেই বলেছি জাপানিজদের সাথে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক এবং মানসিকতার অনেক মিল আছে। আর এ মিলের কারণেই বাংলাদেশ ভ্রমণ আমাকে সবসময়ই এক বাড়তি আনন্দ দিয়েছে।

আদনান: বাংলাদেশের কার কার বই পড়ছেন?

কিয়োকো: অনেকেরই। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, হাসান আজিজুল হক, হুমায়ূন আহমেদসহ অনেকের বই আমি পড়ছি। তবে এ ক্ষেত্রে ধরাবাধা কোনো গণ্ডী আমার নেই। সুযোগ সময়মত সবার বই আমি পড়তে ভালোবাসি।

আদনান: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যের উপর কোনো অনুবাদের কাজে হাতে দিয়েছেন কি?

কিয়োকো: হ্যাঁ, এই বছরই বাংলাদেশের চারজন কবিদের নিয়ে আমার একটা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ বের হয়েছে। এই সংকলনটিতে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী এবং আল মাহমুদের নির্বচিত কবিতাগুলো জাপানিজ ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
kyoko-niwa-at-bsk-mela.jpg

আদনান: বাংলাদেশের তো আরো অনেক বিখ্যাত কবি আছেন। তা শুধুমাত্র এই চারজন কবির কবিতা বেছে নেওয়ার কারণ কী?

কিয়োকো: না, কারণ কিছুই নাই। আমি জানি বাংলাদেশে অনেক বড় বড় কবিরা আছেন। আপাতত এই চার জনের কবিতা অনুবাদ করেছি তারপর এর সংখ্যা নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে বাড়বে।

আদনান: আপাতত কি কোনো কাজে হাতে দিয়েছেন?

কিয়োকো: হ্যাঁ, পশ্চিম বাংলার চারজন কবির কবিতা এবার জাপানিজ ভাষায় অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছি।

আদনান: কাদের কবিতা জানতে পারি কি?

কিয়োকো: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী আর চতুর্থজন এখনো ঠিক হয় নি।

আদনান: আপনি সুদূর জাপান থেকে এই যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষা আর বাংলা সংস্কৃতির টানে নিউইয়র্ক, লন্ডন, বাংলাদেশ, কলকাতা চষে বেড়ান, তা ঘর সংসার করতে কোনো সমস্যা হয় না?

কিয়োকো: হুম, ভালো কথা বলেছেন(হেসে হেসে)। আমি পারিবারিক ভাবে আমার স্বামী, ছেলে এদের সবার কাছ থেকেই খুব উৎসাহ আর সাপোর্ট পাই। তবে আমি এঁদের সবাইকে খুব মিস করি। সেই জন্যই তো এইবার আপনাদের নিউইয়র্কে স্বামী-সন্তান সবাইকে নিয়েই বেড়াতে এসেছি।

আদনান: বাংলা খাবার পছন্দ করেন?

কিয়োকো: অবশ্যই। খুব এবং খুব।

আদনান: যদি আপনাকে বাংলাদেশের অনারারি নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, বাংলদেশে যাবেন কি?

কিয়োকো: এটা তো আমার সৌভাগ্য। তবে আপাতত জাপানেই থাকতে চাই।

আদনান: আমরা জানি জাপানে আপনি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি আপনার সময় কাটে কীভাবে?

কিয়োকো: ভালো কথা। আমি টকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব আর সাহিত্য পড়াই। তবে পাশাপাশি টকিও রেডিওতে আমি বাংলা শিক্ষার একটা অনুষ্ঠান পরিচালনা করি। জাপানে বাংলা সংস্কৃতি বিকাশের জন্য বিভিন্ন রকম কাজ করার পরিকল্পনা আছে আমার।

আদনান: কিয়োকো, বাংলা সাহিত্যকে জাপানের সাহিত্য অঙ্গনে আপনি নিশ্চয় আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তবে শুধু পুরনো সাহিত্যই নয়, বাংলাদেশ থেকে নতুন লেখকদের হাত থেকে নতুন নতুন গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ বের হচ্ছে। আশা করি সেদিকে আপনার চোখ খোলা থাকবে।

কিয়োকো: অবশ্যই।

আদনান: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কিয়োকো: আপনাকেও ধন্যবাদ।

নিউইয়র্ক, ২৬/৫/৮

adnansyed1@gmail.com


9 Responses

  1. FAQIR ELIAS says:

    চমৎকার কিছু কথা জানা গেলো। বাংলা সাহিত্যের সেতুবন্ধনে একটা ভালো কাজ করলেন আদনান সৈয়দ। কিপ ইট আপ প্লিজ।

    FAQIR ELIAS

  2. আদনান সৈয়দ আপনাকে এত ভালো একটি সাক্ষাৎকার নেবার জন্য ধন্যবাদ।

    ইরতেজা আলী

  3. বকলম says:

    আদনান সৈয়দ, এত সুন্দর একটা সাক্ষাৎকারের জন্য আপনি প্রশংসার দাবিদার। একজন বিদেশীর বাংলা ভাষার প্রতি ভালবাসা ও একে তার দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার যে চেষ্টা, তার জন্য তাকেও ধন্যবাদ জানাই। যে আমার ভাষাকে ভালবাসে, আমি কি তাকে ভাল না বেসে থাকতে পারি। কিয়োকো নিওয়ার জন্য অনেক অনেক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা। তার দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

    বকলম

  4. Faysal Islam says:

    লেখাটি পড়ে ভারো লাগল।

    Faysal Islam

  5. মুমু says:

    বাহ! সত্যি এ চমৎকার। অন্য ভাষার কেউ বাংলাভাষাকে এতটা ভালবাসছে দেখে খুবই আনন্দ লাগছে। আদনান সৈয়দ এত সুন্দর একটা খবর আমাদের জানানর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    মুমু

  6. P.R.Placid says:

    আদনান সাহেব, আপনার সুন্দর কাজটির জন্য ধন্যবাদ। যে কাজটি আমি অনেক দিন চেষ্টা করেও পারিনি, অথচ আপনি আমেরিকাতে বসে করেছেন, এজন্যে অবশ্যই আপনি প্রশংসার দাবিদার।
    Placid
    Japan

  7. আদনান সৈয়দ says:

    লেখাটি পড়ে আপনাদের ভালো লাগলো জেনে আমারো ভালো লাগছে। কিয়োকোর মত আরেকজন বাংলা ভাষার উপর অনেক কাজ করছেন। তিনি ক্লিনটন বি সিলি। তাঁকে আপনারা অল্প-বিস্তর সবাই চিনেন। গত বছর মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিউইয়র্কে এসেছিলেন একটা সম্মেলনে অংশ নিতে। তাঁর সাথে আমার আলাপচারিতা হয় সেখানে। আর্টসের পাঠকদের জন্য আলাপচারিতাটি খুব শিগগিরই প্রকাশ করার ইচ্ছা রাখি। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

    আদনান সৈয়দ
    নিউইয়র্ক

  8. Saif Tinku says:

    কিয়োকো নিওয়া দীর্ঘায়ু হোন আর তাঁর দীর্ঘ জীবনে বাংলা সাহিত্যের আরো অনেক অনেক জাপানি অনুবাদ করুন — এই কামনা করি। বাংলাদেশের কোনো সাহিত্য সংস্থা তাঁকে সংবর্ধনা দিয়ে আরো বাংলাভাষী মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে ভালো হয়। বাংলাপ্রেমী এই বিদেশিনীর সাক্ষাৎকারের জন্য আদনান সৈয়দকে ধন্যবাদ।

    Saif Tinku

  9. মনোজকুমার দ. গিরিশ says:

    জাপানি বাংলাভাষাবিদ কিয়োকো নিওয়া নিউইয়র্কে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তা পড়ে খুব ভালো লাগল। বাংলা তথা রবীন্দ্রসাহিত্যের স্বাদ অনুভব করার জন্য ইংরেজি অনুবাদের উপরে নির্ভর না করে তিনি মূল বাংলা ভাষাই শিখে নিলেন, তাঁর এ অধ্যবসায়কে সাধুবাদ দিতেই হয়। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আদনান সৈয়দ। আমি কিন্তু এক নামবিভ্রাটে পড়ে গেলাম। বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন উপলক্ষে ৩০/১২/১৯৯৯ তারিখে পঃবঙ্গ বাংলা আকাদেমি সভাগৃহে আমি এক জাপানি বাংলা ভাষাবিদের বক্তৃতা শুনেছি। তিনি স্পষ্ট ভালো বাংলাতেই বলেছেন যে, ‘আমি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াই।’ তাঁর নামও — কিওকা নিয়োয়া। তাঁর চেহারাটি এখন আর মনে নেই। এখানে সাক্ষাৎকার দেওয়া কিয়োকো নিওয়া যদি এর রহস্য ভেদ করেন তো ভালো হয়। তিনিই কি ১৯৯৯-তে বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, আমার ভুল হয়েছে? তখনকার আলোচনাকারীর বয়স কমই ছিল। সেখানে কাজুও আজুমা নিজেও বক্তা ছিলেন। তিনিই আগে বলেন, নিওয়া পরে বলেন।

    মনোজকুমার দ. গিরিশ
    কোলকাতা, ২৯/৬/৮
    manojkumardgirish@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.