চলচ্চিত্র, সাক্ষাৎকার

মুহম্মদ খসরু: ৪৩ বছর চলে গেল দেশ স্বাধীন হইছে, একটা ভাল উপন্যাস লেখা হইছে?

রাজু আলাউদ্দিন | 11 Mar , 2019  


আলোকচিত্র:রাজু আলাউদ্দিন

আটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধেই তার নামের সঙ্গে আমি পরিচিত হতে শুরু করি। খুবই চাঁছাছোলা, মুখে সারাক্ষণ গালাগালের খই ফুটতে থাকা এক মানুষ, তার কাছাকাছি ঘেঁষার সাহস আমরা কখনোই করতাম না। দেখলে এড়িয়ে যেতাম, কিংবা দূর থেকে দেখতাম আর তার কথা শুনতাম। ওই সময়েই তিনি–এক সীমিত গণ্ডির মধ্যেই যদিও–কিংবদন্তী। সহজে তাকে কেউ ঘাটাবার সাহস পেত না। তার সমসাময়িকরাও তাকে বেশ সমঝে কথা বলতো, কারণ উল্টাপাল্টা কিছু বললে মুহম্মদ খসরুর শানিত অস্ত্রে রক্তাক্ত হওয়ার ভয়। তার সাথে যদিও পরে মুখোমুখি পরিচয় হয়েছে, আমারই একটি দুটি লেখার সূত্রে: কখনো সমলোচনা, কখনো বা মৃদু প্রশংসা করেছেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্যের হালহকিকত নিয়ে আমার একটি লেখা ভোরের কাগজে প্রকাশিত হলে সেটা নিয়ে বেশ তর্কবিতর্ক হয়। উনিও সেটা দেখেছিলেন। অনেকের অনুবাদের ভুলের বিষয়টি নজরে এলে খানিকটা ঝুলুঝুলু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার লেখাটা ঠিকই আছে, যদিও যাদের ভুল উল্লেখ করা হয়েছিল তাদের অনেকেই ছিলেন তার বন্ধু বা গুণগ্রাহী, নিয়মিতই তার সাথে আড্ডা দিচ্ছেন। একবার একটা সমালোচনা করেছিলেন, আমি কোন একটা লেখায় অক্তাবিও পাসকে ফরাসি পরাবাস্তব আন্দোলনের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছিলাম। তিনি বললেন, তথ্যটা ভুল। ভুলই ছিল, আমি যৌবনের অপরিণত পাণ্ডিত্য ফলাতে গিয়ে ভুলটি করেছিলাম, যদিও সবাই জানেন অক্তাবিও পাস ফরাসি পরাবাস্তববাদী অনেক লেখক কবির সংলগ্ন ছিলেন, ছিলেন দলনেতা আঁদ্রে ব্রেতোঁর মুরিদ। সেই ভুলটি তিনি শান্তস্বরেই নির্দেশ করে সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরপর, বহুবার তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। সৌভাগ্যবশত, তার গালাগাল কিংবা ভর্ৎসনার শিকার হতে হয়নি। বরং প্রশ্রয়ই দিয়েছিলেন, বিশেষত আমার নেয়া সাক্ষাৎকারগুলো পড়ার কারণেই হয়তো। বহু বছর পর, দেশে ফেরার পর আবার যখন দেখা হলো আজিজ মার্কেটে, তিনি সস্নেহে ডেকে নিয়ে বললেন, কী মিয়া, তুমি কই গেলা গিয়া। তুমি নাকি মেক্সিকো না কই গেছিলা। বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু এই যে আবার ফিরে এলাম তো। সেদিন আমার বউয়ের সাথে তার পরিচয় হলো। মেক্সিকোর লেখক শিল্পীদের কথা তিনি বললেন যাদের লেখার তিনি অনুরাগী। বললেন মেক্সিকান সিনেমার কথা। বললাম, হুয়ান রুলফোর সিনেমালগ্নতার কথা। তিনি জানতেন সেটা। আমি তাকে যখন বললাম যে হুয়ান রুলফোর লেখা সিনেমাগুলোর চিত্রনাট্যের একটা বই আছে আমার কাছে, তিনি প্রবল আগ্রহ নিয়ে রুলফোর সিনেমা নিয়ে আমাকে একটা লেখা তৈরির প্রস্তাব করেন। আমি লিখতে রাজীও হয়েছিলাম, কিন্তু লেখাটা আর তৈরি করা হয়নি। পরে তার আমন্ত্রণে আমি আর আমার সাবেক সহকর্মী অনিন্দ্য রহমানসহ তার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম ২০১৭ সালের জানুয়ারী বা ফেব্রুয়ারি মাসে। তার একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণের উদ্দেশ্যে আমি সঙ্গে করে ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে এই আলাপচারিতা এতই দীর্ঘ ছিল যে ক্যামেরার চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ফোনের ক্যামেরায় বাকিটুকু ধারন করতে হয়েছিল। খসরু ভাইয়ের সাথে সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি ছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। নিজে স্বাক্ষর করে তার কয়েকটি বই আমাকে তিনি উপহার দিয়েছিলেন। ঢাকায় তিনি নিয়মিত থাকতেন না বলে তার সাথে দেখাসাক্ষাৎ খুব একটা হতো না, তবে ফোনে কথা হতো প্রায়শই। তার মৃত্যুর কয়েক সপ্তা আগে শিল্পী মাসুক হেলালের এক ফেসবুক পোস্টেই জেনেছিলাম তিনি অসুস্থ অবস্থায় বারডেমে ভর্তি হয়েছেন। তার মৃত্যুর সপ্তা দুয়েক আগে বারডেমের কাছে গিয়ে মাসুক ভাইকে ফোনে বললাম, আমি খসরু ভাইকে দেখতে এসেছি, কিন্তু তার রুম নাম্বারতো জানি না। মাসুক ভাই বললেন, উনি বোধহয় এখন ঢাকায় নেই। চিকিৎসা নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি ফিরে গেছেন। আর এরই কয়েকদিন পর শুনলাম তার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর সংবাদ। খসরু ভাইয়ের প্রয়াণে আজ সেই সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিপি প্রকাশ করা হলো। অনেক পরিশ্রম করে ভিডিওটির শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহ্সান। –রাজু আলাউদ্দিন

ভিডিও:১
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’ সিনেমার সঙ্গে ছিলেন, তাই না?
মুহম্মদ খসরু: ছিলাম মানে কি, এ্যাসিসট্যান্ট ডিরেক্টর ছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার এখনো মনে আছে, সিনেমাটা প্রথম এমন এক সময় দেখি, তখন ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি, স্কুল পালিয়ে পালিয়ে ছবি দেখি। ছবি দেখাটা ছিল ছবি দেখার জন্য না, ছবি দেখাটা ছিল স্কুল পালানোর উপায় হিসেবে। ‘মধুমিতা’তে ছবিটা দেখতে গেলাম, ম্যাটিনি শো আছে না? ওই সময় সকালের দিকে একটা শো হতো। ভেতরে ঢুকে ছবি তো আর ভাল লাগে না, না পারি বের হতে, না পারি…। (কেন, ভাল লাগে না কেন?—অনিন্দ্য)। আরে ওই বয়সে! তখন বাচ্চা তো, এই ছবি দেখার বুদ্ধিসুদ্ধি হয়নি তো…
মুহম্মদ খসরু: এটা বোধহয় সেভিনটি টু কি ওয়ানে দেখানো হয়েছে। ওয়ানে না, সেভেনটি থ্রি। ওটা তো মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের ছবি ছিল। ‍সিনেমা হলগুলোর মালিক ছিল মা্উরারা, ওরা ভাইগা গেছে, ওই সিনেমা হল, আরো দোকান-পাট যা ছিল তা সরকারের সম্পত্তি বা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পত্তি হিসেবে ছিল। ছবিটা ওই খাত থেকে তৈরি হইছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু ওইটা কি ব্যবসা সফল ছবি ছিল?
মুহম্মদ খসরু: না না না। ব্যবসা সফল ছবি কোথায়!
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু অসম্ভব শিল্পসম্মত মনে হয়েছে পরে যখন দেখি।
মুহম্মদ খসরু: খুবই একটা টাচি ছবি ছিল। লেখকও তো খুব বিখ্যাত লোক। তুমি চিনবা, নরেন মিত্র। তিনি তো খুব বিখ্যাত গল্পকার। (হ্যাঁ, তিনি তো আমাদের ফরিদপুরের লোক—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ। তাঁর আরেকটা বিখ্যাত গল্প আছে, ‘রস’। ওই দিয়ে হিন্দি সিনেমা বানাইছে কে যেন, ছাগল।
রাজু আলাউদ্দিন: কোনটা নিয়ে?
মুহম্মদ খসরু: ‘রস’ নিয়া। তাও ছবি খুব খারাপ হয় নাই। ওই যে, অমিতাভ বচ্চন আর কারা কারা যেন আছে। ওটাও দেখেছি আমি।
রাজু আলাউদ্দিন: ভাল হয়েছে ওইটা?
মুহম্মদ খসরু: খারাপ না। তয় এইটার মতো অত ভাল না। ওইটা বানা্ইছিল ইয়েরা, বাঙালি কিন্তু থাকতো বোম্বে, ফিল্ম ফেয়ারের সাথে যুক্ত ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তো, রাজেন তরফদার আপনাকে কিভাবে খুঁজে পেলেন, বা আপনি কিভাবে খুঁজে পেলেন?
মুহম্মদ খসরু: না, রাজেন তারফদারই আমাকে খুঁজে পাইছিল, সে একটা ইন্ডিয়ান কো-অপারেশনে প্রথম ছবি করতে যাচ্ছে, উইথ কোলাবরেশন মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট, তাদের দুই-তিন-চারটা সিনেমা হল, বেশিও হতে পারে। মানে পাকিস্তানিরা যেসব সিনেমা হল ছেড়ে গেছে, যেমন : গুলিস্তান, নাজ। ওগুলোর যারা মালিক ছিল তারা ভাবলো ওগুলো যদি নিজেদের মধ্যে রাখতো… ওরা নিজেরাই ভয়ের মধ্যে ছিল, যারা একটা অপকর্ম করে তাদের ভয়-ভীতি বেশি থাকে তো । ওই জন্যে ফালাইয়া থুইয়া চলে গিয়েছিল। দোসানি ফিল্ম একটা ছিল, খুব নামকরা, গুলিস্তান হলটা ওদেরই ছিল। উপরে একটা চায়নিজ হোটেল এবং বার ছিল। দেখছো তো তুমি। (হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার মনে আছে—রাজু আলাউদ্দিন)। তারপরে আর একটা মিনি সিনেমা হল ছিল—নাজ। এইটা টুইন সিনেমা হল আরকি, নিচেই একটু বাম পাশে ছিল। এটাতে কেবল বিদেশি সিনেমা দেখান হতো, ইংলিশ ছবি।
তারও আগে একটা সিনেমা হল হইছিল আমি দেখছি, আনফরচুনেটলি বলতে হয়, আমি ওইখানে কোন ছবি দেখি নাই। ততক্ষণে ওটা ভেঙে-টেঙে ফেলেছিল। টিএনটি অফিসটা আছে না, তার উল্টা দিকে মসজিদ আছে, জাস্ট তার পাশাপাশি। তখন এই মসজিদ ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি জানতে চাচ্ছি যে, রাজেন তরফদার আপনাকে কি করে খুইজা পাইল, সেইটা বলেন?
মুহম্মদ খসরু: ওওও, না, রাজেন তারফদার যুদ্ধের পর থেকে চেষ্টা করতেছিল। সে আমাকে চিঠি-টিঠি দিছিল আরকি। সবার আগে আমাদের লোহানী ভাই আছেন না, উনি কলকাতায় ছিলেন, কামাল লোহানী, সে তো (বাংলাদেশ) বেতারের সাথে যুক্ত ছিল, তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, ইয়াং ছেলেপেলেদের ভিতরে কারা কাজ-টাজ করে ভাল? আমি দু-একজন ছেলে নিতে চাই প্রডাকশনে যারা কাজ করবে। কামাল ভাই আমার কথা বলেছিল রাজেন তরফদারকে। তারপর আমি চিঠি পেলাম। একটা তারিখ দিলেন, উনি আসবেন আরকি। এলেন, কথাবার্তা বললাম, শুইন্যা তো উনি বেশ খুশি। বললেন, তুমি আমার ছবিতে কাজ করবা। ওই তো তার সঙ্গে আবদ্ধ হইলাম। লোকেশন-টোকেশন যত সব ঢাকাতে এবং লোকেশনগুলো আমি নির্বাচন করেছিলাম। কারণ আমার গ্রাম তো ওইডাই, আমি তো জানি বেশি ভাল করে।
রাজু আলাউদ্দিন: এই গ্রামগুলো কোন কোন গ্রাম?
মুহম্মদ খসরু: সেগুলির বেশিরভাগই এই বিক্রমপুর এলাকা আর নবাবগঞ্জ এলাকা। আর কি যেন, গাড়িগুলা ওই দিকে যায়, (কলাকোপা-বান্দুরা-হাসনাবাদ), আগলা-গালিমপুর।
রাজু আলাউদ্দিন: গালিমপুর তো কুমিল্লার দিকে?
মুহম্মদ খসরু: না না, এইখানে একটা গালিমপুর আছে। ওই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছে না, প্রফেসর। আই ডোন্ট লাইক হিজ রাইটিং এন্ড ভিউজ এট অল। (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী! ইংরেজির প্রফেসর?—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, ইংরেজির প্রফেসর।
অনিন্দ্য রহমান: উনি নাকি পঁচাত্তরের খুনিদেরকে সূর্যসন্তান বলেছিলেন, এ রকম শুনছিলাম আমি।
মুহম্মদ খসরু: কারে বলছিল?
রাজু আলাউদ্দিন: পঁচাত্তরের খুনিদেরকে সূর্যসন্তান বলেছিলেন উনি?
অনিন্দ্য: বলতে পারে। সম্ভব।
মুহম্মদ খসরু: কার কথা বলছ?
রাজু আলাউদ্দিন: এই যে যার কথা বললেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উনি নাকি বলেছিলেন পঁচাত্তরের যারা খুনি তারা নাকি সূর্যসন্তান।
মুহম্মদ খসরু: খুবই স্বাভাবিক তার পক্ষে বলা।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার স্মৃতি কি বলে?
মুহম্মদ খসরু: না, আমি তার সঙ্গে কোনোদিন কথা কই নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কি দেখেছিলেন এ রকম কোনো স্টেটমেন্ট?
অনিন্দ্য : না না না, উনি বলছেন স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক কিছু না।
মুহম্মদ খসরু: না। আমি বলি, তার লেখাটেখা, তারপর মুক্তিযুদ্ধের ধ্যান-ধারণা, এগুলো খুব ন্যাক্কারজনক—এক কথায়।

ভিডিও:২
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যে ছবি বানাবেন বলেছিলেন সেগুলো কী নিয়ে?
মুহম্মদ খসরু: একটা তো ঢাকা জেলার ওপর, ওল্ড ঢাকার ওপর আরকি। আরেকটা হলো কিছুটা ফ্যান্টাসি, কিছুটা রিয়ালিটি, কিছুটা পাস্ট, কিছুটা আগামী এই সব মিলাই-টিলাই এই নাম, দীর্ঘ দিনের ভাবনা তো, নাম হলো ‘প্রাণ প্রতিমার খোঁজে’।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা হলো আপনার ইচ্ছা। আচ্ছা, গোড়ায় ফিরে আসি। ওই যে, রাজেন তারফদার আপনাকে খুঁজে বের করলেন, আপনারা ছবিটা বানাইলেন। ছবিটা ব্যবসা সফল হইল না, তাই না? এরপরে আপনি বোধ হয় ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে কাজ করেছেন।
মুহম্মদ খসরু: না, কাজ করি নাই। কিন্তু ওনার খুব ক্লোজ ছিলাম তো, যাতায়াত ছিল। ঋত্বিকের একটা ইন্টারভিউ করলাম আমি শেষ মুহূর্তে। দ্যাট ওয়াজ দ্য লাস্ট ইন্টারভিউ টেকেন বাই মি। (যেটা আপনার সাক্ষাৎকার ‘চতুষ্টয়’-এ ছাপা হইছে—রাজু আলাউদ্দিন)। শুধু এইটা না। এইটা ইন্ডিয়াতে পনের-ষোল বার ছাপা হইছে। এবং তার যে আঠারটা ইন্টারভিউয়ের বই বাইর হইছিল, সেখানেও আছে। সেখানে বাংলাতেও পাওয়া যায়, ইংরেজিতেও পাওয়া যায় এটা।
রাজু আলাউদ্দিন: ঋত্বিক ঘটকের সাথে সাক্ষাৎকার নেয়ার বাইরে আর কোনো যোগাযোগ কি ছিল, কিভাবে ছিল?
মুহম্মদ খসরু: কার সাথে, ওনার সাথে? তার সাথে আর যোগাযোগ হয় নাই আমার।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই একবারই দেখা হয়েছিল, ঢাকায় যখন এসেছিলেন ছবি বানাতে?
মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ, একবারই। সেখানে আরো একজন খুব বিখ্যাত লোক অভিনয় করেছিল, সেটা হল উৎপল দত্ত।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই ছবিতে!
মুহম্মদ খসরু: সেটা হল ‘পালঙ্ক’। তুমি দেখে থাকলে মনে পড়বে তোমার। আনোয়ার হোসেন হিরো ছিল। উৎপল দত্ত খুব সাহসী লোক, খুব পলিটিক্যাল লোক। এই রকম লোক খুব কম দেখেছি আমার লাইফে, এন্ড হি লাভড মি ভেরি মাচ।
রাজু আলাউদ্দিন: তিনি ঢাকায় আসতেই দেখা হয়েছিল আপনার?
মুহম্মদ খসরু: ঢাকাতে আসাতেই তো। ‘পালঙ্ক’ ছবিতে ক্যামেরাম্যান ছিল ওইখানকার, চিফ এসিসট্যান্ট ওইখানকার, ডিরেক্টের ওইখানকার, তথাকথিত হিরোইন যাদের বলি সে ওইখানকার সন্ধ্যা রায়, হিরোটা হলো এখানকার আনোয়ার হোসেন আর লোকাল ছোটখাট চরিত্র যারা করছে তারা এখানকার এফ.ডি.সির। সে (রাজেন তরফদার) বেশির ভাগ বাহিরের লোক নিয়ে কাজ করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: উৎপল দত্তের অভিনয় তো অসামান্য। দ্বিতীয় আরেকটা গুণ আমি লক্ষ করলাম তিনি লেখক হিসেবেও অসাধারণ।
অনিন্দ্য: আপনি ‘ভুবন সোম’ দেখেছেন?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, ‘ভুবন সোম’ দেখেছি।
মুহম্মদ খসরু : ‘ভুবন সোম’টাই মৃণাল সেনের জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবি।
রাজু আলাউদ্দিন: তো যেটা বলতে ছিলাম, উৎপল দত্তের শেক্সপিয়ার সম্পর্কে যে গবেষণা, সেটা অসামান্য।
মুহম্মদ খসরু: আন্তর্জাতিকভাবেও টপ সে।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা বই আছে, সেটা আবার গবেষণাধর্মী না। সেটা হল স্মৃতিধর্মী– ‘চায়ের কাপে ধোঁয়া’।
মুহম্মদ খসরু: ওটা তো তর্ক-বিতর্ক, এই সব আরকি। শেক্সপিয়রের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে তার একটা বই আছে। (ওইটার কথাই তো বলছিলাম—রাজু আলাউদ্দিন)। ওইটা আমারে দিছিল। ওই যে… তানভীর মোকাম্মেল নিয়া বইটা খাইয়া ফালাইল। ওই বইটার প্রতি আমার একটা সেন্টিমেন্ট ছিল আরকি, ওইটার ওপর তার স্বাক্ষর ছিল। ওই যে তুমি আইস্যাই কইল্যা না সাইন করছেন নাকি( আমাকে উপহার হিসেবে দেয়া তার নিজের বইয়ে স্বাক্ষর করার কথা বলা হচ্ছে এখানে-রাজু আলাউদ্দিন), ওইটা খুব ঠিক কথা, একটা বই লেখকের স্বহস্তে সিগনেচারসহ পাওয়া আর এমনিতে পাওয়ার মধ্যে মেলা পার্থক্য।
রাজু আলাউদ্দিন: এই বইটা( হুয়ান রুলফোর El gallo del Oro) আপনাকে দেখানোর জন্য নিয়ে আসলাম, এই ছবিতে সে অভিনয় করছে।
মুহম্মদ খসরু: বইটা তো মনে হয় আমি দেখছি বাজারে। (এইটা বাজারে দেখছেন, তাই নাকি? এটা কিন্তু স্প্যানিশে।—রাজু আলাউদ্দিন)। ও। বাজারে তাইলে এটার বাংলা… এটা কি ইংরেজি হইছে?
রাজু আলাউদ্দিন: না, এটার ইংরেজি হয় নাই।
মুহম্মদ খসরু: এই মহিলা কে? কি নাম?( বইয়ে মুদ্রিত এক নারীর প্রতি ইঙ্গিত করে) ভারি সুন্দরী তো দেখতে। স্বাস্থ্য শরীর। স্প্যানিশদের তো আবার খুব সুন্দর লাগে না।
রাজু আলাউদ্দিন: ইনি অভিনয় করছেন রুলফোর সিনেমায়। স্প্যানিশদের দেখতে সুন্দর লাগে না? লাতিন আমেরিকার মেয়েরা তো খুব সুন্দর।
মুহম্মদ খসরু: আমি তো সব দেখি নাই। তয় আছে আরকি। আর গোটা লাতিন আমেরিকায় মার্কেসের দেশের মেয়েরা সুন্দর বেশি। এক জায়গায় পাইছিলাম আমি। ভেনিজুয়েলার এক মেয়েকে আমার এক ভাই বিয়ে করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই নাকি? কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা কাছাকাছি আরকি। আমরা তো যাইতে চাই। অনিন্দ্য তো যাইতে চায়।
মুহম্মদ খসরু: ও এখন আমেরিকাতে পড়ায়।

ভিডিও:৩
রাজু আলাউদ্দিন: যাইহোক, আমরা পালঙ্ক সিনেমায় ফিরে আসি। ব্যবসা সফল হল না পালঙ্ক। এইগুলো নিয়ে আপনার এসেসমেন্ট কী আসলে? আমরা কী তখন পর্যন্ত দর্শক সৃষ্টি করতে পারি নাই?
মুহম্মদ খসরু: তখনো পারি নাই, এখনো পারি নাই। ওই যে ইয়ের (অঞ্জন) একটা ছবি আছে না, তোমরা দেখছো, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোর্ট’ নিয়ে ‘মেঘমল্লার’। দেখছো না, কোথায় দেখছো?
অনিন্দ্য: দেখছি তো, প্রিমিয়ার শো’তে। (আপনি জানেন না, ও গিয়েছিল, পেছনের দিকে ছিল—রাজু আলাউদ্দিন)।
মুহম্মদ খসরু: এই ছবিও বাজার পাবে না। কারণ বাজারের গাঢ় মাইরা রাখছে আগেই এখন যারা ছবি বানায়। এখন এই জেনারেশন যদি একত্রিত হয়, আমি শেষে যে বক্তৃতা দিলাম, আমি তো বক্তৃতা দিতে পারি না, ইয়াং পুলাপান গো কইলাম, যে প্রতিষ্ঠানটা তৈরি হইছিল বেসিকালি আমার বিরুদ্ধে।
রাজু আলাউদ্দিন: কোনটা?
মুহম্মদ খসরু: শর্ট ফিল্ম ফোরাম।
রাজু আলাউদ্দিন: কাদের যেন? (ওই যে, মোর্শেদ ভাইদের—অনিন্দ্য)।
মুহম্মদ খসরু: ওটায় মোর্শেদ মেইন, আর হইলো আলমগীর কবির।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি কাউন্টার? রেভ্যুলেশন-কাউন্টার রেভ্যুলেশন?
মুহম্মদ খসরু: কাউন্টার না। ওরা ইলেকশন করছিল। ইলেকশনে বাদল (রহমান) আর আমার কাছে হাইরা গেল। হাইরা যাওয়ার পর ওরা ওইটা করলো।
অনিন্দ্য: ওটা কিসের ইলেকশন ছিল? কত সালে?
মুহম্মদ খসরু: এই তো, সংগঠনের দিক দিয়ে ইলেকশন। এইটা কত হবে, নট লেস দেন থার্টি ইয়ারস, টুয়েন্টি ফাইভ ইয়ারস তো হবেই। ওদের সংগঠন যত দিনকার তত দিনকারই।
অনিন্দ্য: আলমগীর কবীর ভাই বাঁইচা ছিল তো।
মুহম্মদ খসরু: আলমগীর কবীর তো সবচেয়ে হারামি লোক। গ্রিডি শুয়োরের বাচ্চা, উইমেনাইজার।
রাজু আলাউদ্দিন: না, এইগুলাকে আপনি খারাপ বলেন কেন খসরু ভাই। গ্রিডিকে না হয় একটু খারাপ বলা যায়, কিন্তু উইমেনাইজারকে তো খারাপ বলতে পারেন না।
মুহম্মদ খসরু: ওই তো, ওইটা ধরলাম না আরকি।
অনিন্দ্য: ওরা কিন্তু সিনেমা বানাইছিল, সিনেমাগুলা পাওয়া যায় না, মুক্তিযুদ্ধের সময়। ডকুমেন্ট্রি আছে। সিনেমার নাম পাওয়া যায়, সিনেমা পাওয়া যায় না।
মুহম্মদ খসরু: না তো। ও, ওইটা ক্যামেরা ওইছে। এ কথাটাকে ইরেস করে দিও তো। হালায় আমি খেয়ালই করি নাইকা। এই জন্যে আমি ইন্টারভিউ-টিন্টারভিউ দেই না।
রাজু আলাউদ্দিন: কয়েকটা গালি থাকা ভাল। আমি বলি থাকা ভাল কেন, আপনার গালাগাল হচ্ছে এই সমাজের সুস্থতাকে ফিরিয়ে আনার জন্য দরকার, সুস্বাস্থ্যের জন্য দরকার। (এটা সবাই কয় আরকি। কিন্তু সহজে কেউ সহ্য করতে পারে না।—মুহম্মদ খসরু)। যেমন ধরেন, বিষ এমনিতে যেমন ক্ষতিকর, কিন্তু অসুস্থ্য রোগীকে সুস্থ্য করার জন্য আবার বিষ লাগে। সেজন্যই বলি, আপনার গালাগাল ফেলে দেওয়া মানে নির্বিষ করে ফেলা। তার মানে, আপনি এই সোসাইটিকে সুস্থ্যতা থেকে রক্ষা করতে চান না! গালাগাল থাকা ভাল।

মুহম্মদ খসরু: তা ভাল। কিন্তু গালাগালি সহ্য করার মতো মেন্টালিটি তো থাকা দরকার।
রাজু আলাউদ্দিন: যা হোক, আপনি বললেন যে ওই সময়ও ভাল ছবি দেখার দর্শক তৈরি হয়নি এবং এখনো হয়নি।
মুহম্মদ খসরু: তখনো হয়নি, বরং এখন তো আরও খারাপ দিন যাচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কেন, ওই যে ফারুকীসহ আর কেউ কেউ ছবি বানাইতাছে।
মুহম্মদ খসরু: ফারুকী তো মাল অন্য জায়গার, ও তো ডাইরেক্ট নর্দমা থেকে উইঠা আইছে।
রাজু আলাউদ্দিন: একজন নর্দমা থেকে উঠে এসেও ভাল কিছু করতে পারে। সে তো ক্লেদজ কুসুম, ফ্লোর দো মাল।
মুহম্মদ খসরু: পারে নাই তো সে। আর এটা কবির ভাবনা। এটা তো করে দেখানোর ব্যাপার, অত সহজ না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কি কবি না?
মুহম্মদ খসরু: না না, আমি কেন কবি হতে যাব! এত বড় গুণ আমার মধ্যে নাই কবিতা লেখার।
রাজু আলাউদ্দিন: যখন কেউ ভালো সিনেমা বানায় আমরা কখনো কখনো বলি সে হচ্ছে—পয়েট অব দ্য সিনেমা, ফিলোসফার অব দ্য সিনেমা; যেমন লুইস বুনুয়েল। তো আপনার কবি হতে অসুবিধা কী?
মুহম্মদ খসরু: আমি কোনো ছবিই বানাইতে পারলাম না মিয়া, এই পরিবেশে।
অনিন্দ্য: বুনুয়েল বাংলাদেশে ছবি বানালে মাইর খাইত।
মুহম্মদ খসরু: সে তো ছিল একটা পিরিয়ডে আমেরিকা বইসা, যুদ্ধ পিরিয়ডে। জানো, কি কাম করতো? ছবি করতো না কিন্তু। একটা এডিটিংয়ের কাজ করতো। ফিল্ম এডিটিং। তারপর যুদ্ধ শেষে যখন বাড়ি এলো… সে বহিষ্কৃত ইয়া থেকে, স্পেন থেকে। সেটা জানো তো?
অনিন্দ্য: মেক্সিকোতে ছিলো তো।
রাজু আলাউদ্দিন: স্পেন থেকে বহিষ্কৃত। মেক্সিকোতে প্রচুর ছবি বানাইতো।
মুহম্মদ খসরু: না, মেক্সিকোতে গেছিল স্পেন থেকে, থাকার জন্য। সে মেক্সিকান না কিন্তু।
রাজু আলাউদ্দিন: না না, তা তো না।
মুহম্মদ খসরু: গেছিল এবং হি মেইড ফিউ ফিল্ম বাট হি নেভার মেইড ফিল্ম ইন আমেরিকা। বিকজ দ্যাট ওয়াজ এবসলিউটলি ওয়ার পিরড ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তার জীবনের অর্ধেক ছবি বানাইছে মেক্সিকোতে বসে।
মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ, অনেক ছবি। তার এই যে কি যেন…
অনিদ্য : ঐ সময়কার মধ্যে ‘নাজারিন’ একটা ভাল ছবি।
রাজু আলাউদ্দিন: ‘নাজারিন’ তো ওইখানে(মেক্সিকোতে) বানানো।
মুহম্মদ খসরু: আমি একটা ছবি পাগলের মত খুঁইজা বেড়াইতাছি। ওই যে বাচ্চাদের কী জানি ছবিটার নাম? বলতো, আমার কিছু মনে থাকে না।
রাজু আলাউদ্দিন: ‘লোস অলবিদাদোস’, তারপরে ‘নাজারিন’…।
মুহম্মদ খসরু: ‘লোস অলবিদাদোস’ই তো। ‘লোস অলবিদাদোস’ দেখছ, তুমি দেখছ? বাচ্চাদের ব্যাপার আছে না?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই।
মুহম্মদ খসরু: এই ছবিটা আমার দেখা হয় নাই, আমি পাগলের মত খুঁজতাছি।
রাজু আলাউদ্দিন: জ্বী, আমি আপনারে জোগার করে দেবো। লাগবে আপনার?
মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ, আমি দেখতে চাই।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি দেব, অসুবিধা নাই।
অনিন্দ্য : আছে আছে, আমার কাছে আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনাকে আমি ওই মেক্সিকান অভিনেতা কান্তিনফ্লাসের ছবিও জোগাড় করে দেবো। বাংলাদেশে একমাত্র আপনিই নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারছেন। ওই যে সেদিন বললাম না, মেক্সিকান একজন অভিনেতা আছে ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ, ছবিতে?
মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ হ্যাঁ, বুজতেছি। এটা দেখছি।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন আপনি আমাকে বলেন যে, আপনি দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রের আন্দোলন করলেন, এই আন্দোলনের কোন ফলাফল আছে?

মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ, ফলাফল তো এখন আইল-ই, এই যে ফিল্ম ইনস্টিটিউট হলো, এই যে ফিল্ম আর্কাইভ—এইগুলো তো আমি করছি।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এগুলো করছেন। তো দর্শক কই?
মুহম্মদ খসরু: দর্শক তো আমি নিজে বানাতে পারব না, দর্শক তৈরি করবে দেশ। Country is responsible for the education.
অনিন্দ্য: আর ফিল্ম আর্কাইভেও আমরা সিনেমা দেখতে পাই না সহজে।
মুহম্মদ খসরু: দেখায় না তো ওরা। ওখানে একটাও শিক্ষিত ভাল লোক নাই। একটা আছে জাহাঙ্গীর, ওরে লাত্থাইতে চাইলাম আমি।
রাজু আলাউদ্দিন: কোন জাহাঙ্গীর, পুরো নাম?
মুহম্মদ খসরু: জাহাঙ্গীরের পুরো নাম হল—সরকারি পক্ষের মা-বাপ। এইটা লেইখো-টেইখো না, ওর কাছে একটা কাজ পরে রয়েছে আমার। শালায় যদি এই সাক্ষাৎকার দেখে, তাইলে কাজটা করে দেবে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি তো সবই লিখব, না লিখলে তো সমাজ ঠিক হবে না।
মুহম্মদ খসরু: এইটুকু বাদ দিয়ো। আমার ভাল ধরনের কাজ আছে ওর কাছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, ঠিক আছে।
অনিন্দ্য: না না, আমরা রেকর্ডিং করছি, আপনি বলে যান।
মুহম্মদ খসরু: না না, আমার মুখে এগুলা আইসা যায়। এই জন্য আমি ইন্টারভিউ দেই না কাউরে। কারণ আমার যে স্লাং, যে গালাগাল… এই জন্য আমি ইন্টারভিউ-টিন্টারভিউ দিতে পারি না বেশি একটা।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা ঠিক আছে, অসুবিধা নাই। এখন ধরুণ আপনি ইন্টারভিউ নিছেন, এই ইন্টারভিউ নিতে নিতে আপনি ইন্টারভিউ দেওয়ার জায়গায় চলে আসছেন।
মুহম্মদ খসরু: আমি ইন্টারভিউ ওই চারজনের নিছি, আর কেউর না।
রাজু আলাউদ্দিন: নিছেন তো, বেশি লাগে না। যেমন ধরেণ হুয়ান রুলফো, একটাই উপন্যাস সারা জীবনে।
অনিদ্য: কাভার হয়ে গেছে কিন্তু, যে কয়জনের ইন্টারভিউ নিছেন তাতে কাভার হয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, তা তো হয়ই। আরেকটা জিনিস খসরু ভাই, সেটা হলো আমাদের নতুন যারা ছবি বানাইছে এই ছবিগুলো দেখে আপনি কী মনে করেন? (এই ছবিগুলো তো আমি দেখি নাই—মুহম্মদ খসরু)।যেমন ধরুণ একটা সময় হয়েছে, এইটিজের পর পর, তখন একটা নতুন ধারা তৈরি হল–শর্ট ফিল্ম।
মুহম্মদ খসরু: এইটাই ওরা স্টার্ট করেছিল, কিন্তু পারে নাই ধরে রাখতে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা আসলে কী?
মুহম্মদ খসরু: এটা ওদের জিজ্ঞাসা করবা।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি না হয় এগুলো বানান নাই, কিন্তু আপনি দর্শক, দীর্ঘ দিন ধরে এই নিয়েই কাজ করছেন।
মুহম্মদ খসরু: আমি দেখিও না এদের ছবি এমনভাবে। আমাদের সংগঠন নিজেই প্রথম একটা শর্ট ফিল্ম করার চেষ্টা করেছিল এবং এটার ডিরেক্টর ছিল তানভীর মোকাম্মেল। নিজেরে বলি ফেইল, অর্ধেক ছবির মধ্যে ওরে বাদ দিয়ে দিলাম। কারণ আমি তো ছিলাম এর এডভাইজার বলো, যা বলো এবং ফিন্যান্স যোগার করা। দুই টাকাও চান্দা নিয়েছি। কারণ আমি তখন ক্যারেলাতে ওদের কাজ দেখে অভিভূত—এই কো-অপারেটিভের কাজ। দুইটা ফিল্ম কো-অপারেটিভ আমি দেইখা আসছি–একটা হল অডিয়েটা ফিল্ম কো-অপারেটিপ, আরেকটি হল আদুর গোপাল কৃষ্ণাণ যেখান থেকে বের হয়ে আসছে আরকি, ওদের নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ও মনে পড়ছে—‘চিত্রলেখা ফিল্ম কো-অপারেটিভ’। আদুরের প্রথম দুইটা ফিল্ম চিত্রলেখা ফিল্ম কো-অপারেটিভ প্রডিউস করেছে চান্দা-মান্দা তুইলা আরকি। আরেক জন আব্রাহাম বলে এক লোক ছিল ঋত্বিক ঘটকের ছাত্র আরকি, সে করছিল অডিয়েটা ফিল্ম কো-অপারেটিভ। ওইখান থেকে সে শেষ ছবিটা বানাইছে।

অনিন্দ্য: ওর ওপর একটা সিনামা হইছে রিসেন্ডলি।
মুহম্মদ খসরু: তা জানি না ভাই।
অনিন্দ্য: ওই ‘ডার্টি পিকচার’, ওই সাউথের এক রগরগে নায়িকা, সত্যিকারের কথা, তার প্রেমে পড়ে ছিল ওই কথিত আর্ট ফিল্মের ডিরেক্টর, ওইটার উপর। ওইখানে ডিরেক্টরের নাম ছিল জন আব্রাহাম।
মুহম্মদ খসরু: কী ছবি?
অনিন্দ্য: ‘ডার্টি পিকচার’ সিনেমার নাম।
মুহম্মদ খসরু: কবে হয়েছে?
অনিন্দ্য: তিন বছর আগে হয়েছে।
মুহম্মদ খসরু: সে পাঁচ-ছয় বছর আগে মারা গেছে, আরও বেশি হবে।
অনিন্দ্য: না না, ওর উপরে সিনেমা হয়েছে, ও অভিনয় করে নাই।
মুহম্মদ খসরু: ওর উপরে হবে, ওতো মারা গেছে!
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, মানে তার সম্পর্কে।
মুহম্মদ খসরু: সেখানে নাম ‘ডার্টি পিকচার’ হয় ক্যামনে?
অনিন্দ্য: ‘ডার্টি পিকচার’, ও একটা ক্যারেক্টার, ও মূল ক্যারেক্টার না। আবার আর্ট ফিল্ম ডিরেক্টার ওর উপরে না ঠিক, সেটা হচ্ছে সিল্ক স্মিথা।
মুহম্মদ খসরু: অইতে পারে। দেখি নাই আমি, শুনিও নাই।
অনিন্দ্য: বাণিজ্যিক সিনেমা, বাজাইরা সিনেমা।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের এখানে তো তথাকথিত অর্থে যেটাকে আমরা আর্ট ফিল্ম বলি, আর্ট ফিল্মের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রগন্য হিসেবে স্মরণ করি আলমগীর কবীরকে। আপনার মনে হয় না তার ছবি আলাদা ছবি?
মুহম্মদ খসরু: একদম বাজাইরা ছবি, দশটা-পাঁচটা ছবি যা হয়, একই ছবি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু ‘সূর্য্যকন্যা’ সেই রকম কিছু না। (না, ‘সূর্য়্যকন্যা’ আহা মরি কিছুও না—মুহম্মদ খসরু)। ‘সূর্য়্যকন্যা’কে কোনো বাণিজ্যিক লক্ষ্যে তৈরি করা হয়নি।
মুহম্মদ খসরু: সব বাজাইরা ছবি হইছে, কিন্তু সব বাজার পায় এটা ঠিক কথা না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এর মধ্যে বাণিজ্যিক উপাদান কোনটা, যেটাকে আপনি বলবেন বাজাইরা ছবি বানাইছে?
মুহম্মদ খসরু: এর মধ্যে নতুনত্ব, বক্তব্য, উদ্দেশ্য শুরু করে কোনো কিছু নাই। যা যা হয় সে তাই তাই করছে। এই জন্য এর মধ্যে কোন ক্রিয়েটিভ মালমসলা পাই নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: এই ছবিটার (সূর্য়্যকন্যা) থিম আমার কাছে মনে হয় দুঃসাহসী—ইস্থেটিকসকে থিম করে একটা ছবি বানানো।
মুহম্মদ খসরু: থিমটা কী?
রাজু আলাউদ্দিন: ইস্থেটিকস, ওই নন্দনতাত্বিক যে চিন্তা এই ছবিটার। ‘সূর্য়্যকন্যা’ ওই যে মেয়েটি, মেয়েটি কী আসলে—রিয়ালিটি নাকি ইলুশন।
মুহম্মদ খসরু: আমার এতকিছু মনে আসছে না এখন। চিন্তু করতে পারলে তো তোমাকে কইতামই কিছু।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই যে মূর্তিটা, যেটা জীবন্ত হয়ে ওঠে, বুলবুল যার প্রেমে পরে। মনে পড়ছে কাহিনিটা আপনার?
অনিন্দ্য: আমরা মনে হয় এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সিনেমাটা খসরু ভাইয়ের মনে দাগ কাটেনি। সুতরাং আমরা এটা বাদ দিতে পারি।
মুহম্মদ খসরু: দাগকাটার কথা না। তখন তো সে ঘটনাগুলো কইরা ফেলছে আরকি। ভাল লাগে নাই তার ছবি যার জন্যে, আর তার ছবি আমি দেখি নাই ওই রকমভাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আপনি এই ছবিটা দেখেন।
মুহম্মদ খসরু: না, আমার দেখার দরকার নাই, আমি এখন বুঝতে পারি। দেখছিও হইতে পারে, আলমগীর কবীরের ছবি বারবার দেখি নাই।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি হয়তো ক্ষোভ থেকে আর দেখতে চাচ্ছেন না।
মুহম্মদ খসরু: না না না, ক্ষোভ থেকে না। সে পল্টি লইছে আমার লগে। আলমগীর কবীর, আরেকটা হলো মাহাবুব জামিল—দুইজনকেই আমি আমার সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারির পদে রেখে কিছু দিন কাজ করছিলাম। দুইজনেই অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করছে, দুজনকেই আমি আমার সংগঠন থেকে বাদ দিয়েছি। যখন ১৯৬৯-এ গণআন্দোলন হইলো না, আমরা ওইটা নিয়ে খুব ব্যস্ত, তখন আলমগীর কবীর ভেতরে ভেতরে কিছু মেয়ে-ছেলে জোগার করে একটা ক্লাব তৈরি করল— সে হইলো জেনারেল সেক্রেটারি বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির। এটা করা উচিত না, উচিত কি? তুমি তো একটা সংগঠনে আছ, সংগঠন ছেড়ে দিয়ে করতে পারতা।

রাজু আলাউদ্দিন: স্বাধীনতার আগে আমাদের যে বাংলা ছবিগুলো তৈরি হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আপনি উল্লেখযোগ্য ছবি-নির্মাতা বা ছবি কোনগুলোকে মনে করেন?
মুহম্মদ খসরু: জহির রায়হান এবং সালাউদ্দিন ভাই।
রাজু আলাউদ্দিন: সালাউদ্দিন জাকি?
মুহম্মদ খসরু: না না না, ইনি তো গিরিঙ্গি মাল। সালাউদ্দিন ছিল–‘ধারাপাত’, এই সব কিছু ভাল ছবির নাম উঠলেই সালাউদ্দিনের নাম উঠতো।
রাজু আলাউদ্দিন: সালাউদ্দিন জাকি-র ‘ঘুড্ডি’ ছবিটা ভাল লাগে না আপনার?
মুহম্মদ খসরু: না তো। এখানে একজন শিক্ষিত লোকের ছবি যদি মনে নাড়া দিতে না পারে তার ছবি তো অতদিন মনে থাকে না।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই ছবিটা কি সাধারণ মানুষের মধ্যে নাড়া দেয়নি এইটা বলছেন?
মুহম্মদ খসরু: সাধারণ মানুষের দায়দায়িত্ব তো আমি নিতে পারবো না। আমরাটা আমি বুঝাইছি। আমাকে নাড়া দেয়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু, জহির রায়হান আপনাকে কিভাবে নাড়া দিল, সালাউদ্দিন জাকি যা দিল না?
মুহম্মদ খসরু: তার ভাল ছবি আছে কিছু।
রাজু আলাউদ্দিন: সেগুলো কি শিল্পসম্মত ওইমানের দিক থেকে, নাকি বিষয়ের দিক থেকে? আমরা অনেক সময় বলি না যে—থিমটা, যেমন ধরেন ‘মেঘমল্লার’ থিমটার মধ্যে প্রো-পিপল একটা ব্যাপার আছে, প্রো-ন্যাশন একটা ব্যাপার আছে। ছবি নির্মানকৌশল যাই হক না কেন, সেটা আমরা পরে বলি, একেকজন একেক কারণে একটা পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারে, তাই না? এখন আপনার কারণটা কি, জহির রায়হানের পক্ষ নেয়ার?
মুহম্মদ খসরু: জহির রায়হান তিন-চারটা ভালো ছবি করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা কি শিল্পমানের কারণে নাকি বিষয়ের কারণে?
মুহম্মদ খসরু: দুইটাই করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, সালাউদ্দিন জাকি’র মধ্যে সেটা নাই?
মুহম্মদ খসরু: ঐ রকমভাবে নাই।
অনিন্দ্য: আমার মনে হয়, জহির রায়হানের আলোচনায় সালাউদ্দিন জাকি অপ্রাসঙ্গিক।
মুহম্মদন খসরু: না না, তুমি জানতে চেয়ে দুইটাকে একসঙ্গে আনতেছ কেন! ডিরেক্টর তো কোনো তুলনামূলক মেজারমেন্ট না।
রাজু আলাউদ্দিন: যেকোনো আলোচনাই হচ্ছে তুলনামূলক–প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, খসরু ভাই। যেমন আপনি যখন বলেন, এই ছবিটা আমার ভাল লাগছে। এর সঙ্গে কিন্তু পরোক্ষভাবে একটা তুল্যমূল্য চলে আসে। ভাল লাগা মানে কি, এর মানে খারাপ একটা কিছু ছিল। এক্ষেত্রে এই খারাপটাকে আমি সাইলেন্ট রেফারেন্স বলি। ফলে যে কোনো আলোচনাই তুলনামূলক আলোচনা। হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন প্রত্যক্ষ তুলনাটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।

অনিন্দ্য: আমার মনে হয় সমসাময়িক দিক দিয়ে আলমগীর কবীর আর জহির রায়হান কমপেয়ার করা যেতে পারে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, তাহলে আমরা সেই আলোচনার দিকে যাই।
মুহম্মদ খসরু: আলমগীর কবীর আর জহির রায়হান তো এক সঙ্গে ছবিই করছে এবং একই সঙ্গে কিছুদিন ছিলও।
রাজু আলাউদ্দিন: এক সঙ্গে কোনটা করছে ছবি?
মুহম্মদ খসরু: ওইভাবে করে নাই। কিন্তু একই টাইমে যা কিছু শিক্ষা-দীক্ষা সে জহির রায়হান থেকে নিয়েছে ছবি করার ব্যাপারে। আলমগীর কবীর যে প্রথম ফিচার ফিল্ম করলো, ববিতা নায়িকা ছিল। (জেনসাইড—রাজু আলাউদ্দিন)। না না, ওইটা ডকুমেন্ট্রি। ওইটা নিয়ে অনেক সন্দেহ আছে। অনেকে বলে ওই ইন্ডিয়ান কারা কারা মিলে করছে। ওইটা আমরা কইতে যামু কেন, আমরা তো তখন ইন্ডিয়াতে যাই নাই, ছবিটা দেখছি, ছবিতে যার নাম দেখছি তার কথাই বলি।
অনিন্দ্য: না, ওই সময় ফিল্ম ডিভিশন অনেক ছবি বানাইছে, কিন্তু ওই ছবির স্টাইলিস্টিক মিলে না ‘স্টপ জেনোসাইড’র সাথে। তবে ‘স্টপ জেনোসাইড’ অনেকটা থার্ড সিনেমার সঙ্গে মিলে, ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে মিলে না। ফলে ওইটা ইন্ডিয়ানদের বলে আমার মনে হয় না।
রাজু আলউদ্দিন: ‘স্টপ জেনোসাইড’টা আমি অবশ্য এখনো দেখি নাই। ভাল ডকুমেন্ট্রি?
অনিন্দ্য: ডকুমেন্ট্রি শব্দটা জানি না ঠিক কি না, আসলে প্রপাগান্ডা। কিন্তু আমার মনে হয় থার্ড সিনেমার এলিমেন্ট আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: খসরু ভাই কি বলেন, থার্ড সিনেমার এলিমেন্ট আছে বলতে চাচ্ছে?
মুহম্মদ খসরু: থার্ড সিনেমা বলতে ক্রিয়েটিভ সিনেমার একটা টাইটেল ধরা হয়েছে। যাই হোক, অনেকটা লড়াকু টাইপের ছবি। লড়াকু টাইপের বলতে আমরা বুঝি, রিয়েল যুদ্ধ বেইস করে যে লড়াইটা হয়েছে এগুলাই।
রাজু আলাউদ্দিন: মারদাঙ্গা টাইপের।
মুহম্মদ খসরু: মারদাঙ্গা তো এখন বাজে ছবি সম্পর্কে বলা হয়। ও রকম না। যেমন তুমি দেখেছো ফের্নান্দো সোলানাসের ছবি? ছবিটা দেখলাম একটা অদ্ভুত জিনিস করছে। ছবিটা দেখিয়েছিলাম আমরা। মানুষ পেছন দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কালচারাল ক্রাইসিসের ওপর ছবিটা করছে কিন্তু, খুব সুন্দর।
রাজু আলাউদ্দিন: বিষয়টা আমাদের এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। যারা পেছনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে তাদের মাথায় টুপি পড়িয়ে দিলেই হলো, এটা এইখানকার হয়ে যায়। আপনি কি মেক্সিকান এই নির্মাতার ছবি দেখছেন, ‘বাবেল’ সিনেমা, ইনঞারুতির? খুব নাম করছে সে।
মুহম্মদ খসরু: না।
রাজু আলাউদ্দিন: নাম করছে বলে বলতেছি না, সে ভাল ছবি বানায়। আপনি ওই ছবিটা দেখছেন বোধ হয় ‘আমোরেস পেররোস’–‘ডগস লাভ’।
মুহম্মদ খসরু: ওই যে কুকুর পালে, বিক্রি করে। ওই ছবিটা আমি দেখছি কিন্তু মাথায় ঢুকাইতে পারি নাই। এই যে আমারে দিছিল, সেখানে কুকুরের যুদ্ধটা খুব মারাত্মক?
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা ভাল ছবি বানাইছে। ওটা একটু হলিউডি ধরনের, জাঁকজমক আছে, কমার্শিয়াল ব্যাপার আছে, কিন্তু বানাইছেও ভাল, ওটা হলো ‘বাবেল’।
মুহম্মদ খসরু: এইটা মেক্সিকোতে বানাইছে?
রাজু আলাউদ্দিন: এতে সিন আছে মেক্সিকোর। অদ্ভুদ ব্যাপার হলো, মেক্সিকোতে আমি যে-জায়গায় ছিলাম ওই জায়গার সিন আছে।
মুহম্মদ খসরু: লোকটার বাড়ি বোধ হয় ওই জায়গায়ই। তোমার শ্বশুরবাড়ি কি মেক্সিকো টাউনে, না বাইরে?
রাজু আলাউদ্দিন: না না,ক্যালিফোর্নিয়া বর্ডারের কাছেই। বর্ডারের একটা ব্যাপার আছে তো, সে জন্য বললাম। আমার শ্বশুর বাড়ি হলো মেক্সিকোর আরেক প্রান্তে, দক্ষিণ প্রান্তে। আর আমি থাকতাম এক্সট্রিম নর্থ-এ।
তো ‘বাবেল’-এ যে অঞ্চলটা আছে না, ওই অঞ্চলে আমি ছিলাম। ঘটনাক্রমে প্রতি সপ্তাহে এক বন্ধুর বাড়িতে যেতাম, ওই বন্ধুর বাড়ির একেবারে আশপাশটা ছিল ওই ছবিতে।

( উপরোক্ত অংশটি ক্যামেরায় ধারনের পর চার্জ শেষ হয়ে গেলে বাকি অংশটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারন করা হয়।)
মুহম্মদ খসরু: হ, আমাদের তো চিনে না কেউ। ওই যে কইলাম, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের চরণের দাস হয়ে রইছে সব। (হুম, হুম, বুঝতে পারছি। চরণদাস—রাজু আলাউদ্দিন)।‘চরণ দাস চোর’ কইরা একটা নাটক আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: হাবীবের, হাবীব তানভীর, না? আমি দেখছি নাটকটা।
মুহম্মদ খসরু: না না না, নাটকটা হাবীবের না। তয় হাবীব তানভীর ওইটা স্টেজ (মঞ্চায়ন) করছে, ডিরেকশন দিছে, কিন্তু মূল নাটকটা কে করছে তা এই মুহূর্তে কইতে পারতেছি না।
রাজু আলাউদ্দিন: অনিন্দ্যর মনে আছে, ‘চরণ দাস চোর’ নাটকটা কে লিখছে, সবদর হাশমি?
মুহম্মদ খসরু: এইডা লেখেটেখে নাই কেউ, এটা ফোক স্টোরি আরকি। লোকমুখে প্রচলিত ফোক, খুব বিখ্যাত।
অনিন্দ্য: সবদর হাশমির নাকট হচ্ছে ‘হল্লা বোল’।
মুহম্মদ খসরু: ‘হল্লা বোল’ নাটকের পরই তো মারলো ওকে, বাইড়া্ইয়া মাইরা ফালাইল। ইন্ডিয়া থেকে প্রকাশিত একটা বই আছে আমার কাছে ওর ওপর। আর ওই যে একটা মেয়ে আছে না, ফিল্ম-টিল্মে অসাধারণ অভিনয় করে, কি দাশ যেন? নন্দিতা দাশ। ওই গ্রুপের খুব নাম করা মেম্বার। সে তো কাশ্মিরি ছেলে, বাঙালি বিয়ে করছিল, কলকাতায় ওর বিশাল সাপোর্টার আছে, সিপিএম ঘরানা।
হাবীব তানভীরের সাথে আমি মিট (দেখা) করছি, ঢাকায়, শিল্পকলা একাডেমিতে। এই যে তথাকথিত মাস্তান লোকজনের সাথে ঢাকায়ই আমার পরিচয়। কলকাতায় গেলে তো এইগুলিরে খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথায় থাকে, কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর, কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায় না। সুনীল দা’র বাড়ি গেলে কোন দিন তো পাই নাই আমি। সে আবার একটা বাড়ি করছে শান্তিনিকেতনে। সে না শুধু, বড় বড় মানুষরাই করছে ওখানে—বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু।
আমার ভাস্তিরে বিয়া দিছি তো শান্তিনিকেতনে। আমার ভাইপোও বিয়ে করছে ওইখানে, বিয়া অবশ্য ভাইঙ্গা গেছে। ভাইস্তা হইলো আর্ট কলেজের ডিন হইছে যে, নিসার হোসেন। আমার ভাইয়ের ছেলে। আপন ভাই না আরকি। আমার আপনজনদের নিয়ে আমি কোন সময় আগ্রহ দেখাই না। যে-রিলেশনের কথা বলবো না, ধইরা নিবা সেটা আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক না। কিন্তু এদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রক্তের চাইতে বেশি হইছে।
আমি খুব কম বয়সে চাকরিতে ঢুকছি। তিন বছর না চার বছর তফাৎ। তাইলে আমার চাকরি হত না। আমার চাকরিটা হইছে ইউনুস ভাই আর কামরুল হাসান–এই দুইজনের রিকমেন্ডেশনে তাদের ডিপার্টমেন্টেই। অবজেকশন দেয়া হলে কইল, দুই-এক বছর আমাদের সাথে কাজ করবে তো, তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তারা আবার কামরুল হাসানকে খুব শ্রদ্ধা করতো। তার কথার উপর কোনো কথা নেই।
আমার জন্ম কিন্তু ইন্ডিয়াতে। ইন্ডিয়া মানে ওয়েস্ট বেঙ্গল। জন্ম হুগলিতে, গঙ্গা নদীর হুগলী ব্রিজের এই পারে ছিল, হুগলী ব্রিজের নাম শুনছো তো? তারপর সব বেঁচে দিয়ে এই দিকে চলে আসছি।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আপনার পিতৃভূমি হচ্ছে হুগলী।
মুহম্মদ খসরু: না না না।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে, মাতৃভূমি?
মুহম্মদ খসরু: কোনো ভূমিই না। জন্মস্থান। তোমার বাড়ি কোথায়?
রাজু আলাউদ্দিন: শরিয়তপুর। শরিয়তপুরের নড়িয়া গ্রামে, ওই আবু ইসহাকের এলাকা।
মুহম্মদ খসরু: নড়িয়া তো বিখ্যাত জায়গা। শরিয়তপুর তো আমি প্রায়ই যাইতাম। ওই যে সরোয়ার আছে না, ও ঢাকায়ই থাকে, ছবিটবি বানায়। শুকনাটুকনা খায়। নামকরা শুকনাবাজ আর ছবিবাজ।
রাজু আলাউদ্দিন: আমরা তো অনেক আগে থেকেই পিছিয়ে আছি। সেটা হলো যে ছবির অনেক ট্যাকনিক্যাল ব্যাপার থাকে।
মুহম্মদ খসরু: ট্যাকনিক মানে! ঋত্বিক তো আমায় গালাগাল করছিল—1কলম তিনটা পকেটে গুইজা নিয়া শুটিং করতে আসছ, মিয়া! গলা পানিতে নেমে শুটিং করতে হয়। ছবির আঁতলামি স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত, তারপর আর আঁতলামি নাই, গোটাটাই পরিশ্রম।’
রাজু আলাউদ্দিন: পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ব্যাপারগুলো যেখানে আছে সেই জায়গাগুলোতে আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আমাদের ফিল্ম ইনস্টিটিউটগুলো আছে, ছবি বানাবার যে জায়গাগুলো আছে…
মুহম্মদ খসরু: একটাই জায়গা তো, ওই এফডিসি।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এফডিসি তো আসলে প্রযুক্তিগত জায়গা থেকে অনেক পিছিয়ে পরা একটা জায়গা।
মুহম্মদ খসরু: কারণ, মানুষ এতই পিছিয়ে পরা মানুষ… আমাদের দেশের লোকজন পিছিয়ে পরা। তুমি তাকে আলাদা করে ফিল্মে নিয়ে বিচার করবা কী দিয়া। এই যে ব্যাটারা বলছে ছবি তৈরি হয় নাই, আমি এই সব কিছুর মূল্য দেই নাই। আজ ৪৩ বছর চলে গেল দেশ স্বাধীন হইছে, একটা ভাল উপন্যাস লেখা হইছে? ভাল লেখক জন্মাইছে, ভাল ঔপন্যাসিক বা ভাল টাইপের কবি? কিছুই হয় নাই। এদের কাছে তুমি ভাল জিনিস চাইবা কেন?

রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের তো অনেক বড় বড় লেখক আছে।
মুহম্মদ খসরু: লেখক থাকলে কি হইবো, ওই একটা আছে, কি সৈয়দ যেন? আগে এক সৈয়দ খাইত। আরেকটা বাইর হইছে। আরেকটা তো মইরাই গেল, মান্নান (আব্দুল মান্নান সৈয়দ) । ওই সৈয়দ তো বহুকাল ধরে ফিল্মকে কোনো আর্ট মিডিয়া বলতো না। দুই সৈয়দই খারাপ।
রাজু আলাউদ্দিন: কোন সৈয়দের কথা বলছেন?
অনিন্দ্য: সৈয়দ হক?
মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ, ও ঠিক কইছে। ও টিটকারি মারছিল আমারে। বিজুর (শহিদুল ইসলাম বিজু) দুই নাম্বার দোকানটা আছে না বড় (পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র), কি এক অনুষ্ঠান যেন ওইখানে দেখলাম আইলো। আমি চিনি না, আমাকে ডাইকা নিয়া বসাইল আরকি। তারপর সে হিন্দি ছবির স্ক্রিপ্ট, তখন লারেলাপ্পা ছবি হইতো না আগে, পাকিস্তানি সময়, ঐ সব ছবির স্ক্রিপ্ট করছে আরকি।

রাজু আলাউদ্দিন: কে, সৈয়দ হক?
মুহম্মদ খসরু: সৈয়দ হকের নাটক করছে দুই-তিনটা না কি। খুব হিট-টিট হয়েছে, আমি দেখি নাই ওইগুলা।
রাজু আলাউদ্দিন: তবু তো একটা জিনিস ভাল যে, তখনকার লেখকরা সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
মুহম্মদ খসরু: অনেক ছিল এখনকার চাইতে। এখনকার ইয়াং জেনারেশন কোন একটাও যুক্ত নাই ফিল্মের সাথে। কও তো একটা।
অনিন্দ্য: লেখকটা কে?
মুহম্মদ খসরু: সেটাত খুব আলাদা একটা প্রসঙ্গ তুললা, যা-ই আছে। তাদের ফিল্মের ব্যাপারে কোন আগ্রহ আছে? অথচ অন্যান্য দেশে দেখ, কেরেলাতে আদুর দা’, আদুর গোপাল কৃষ্ণাণ সিনেমা করছে তার গল্প দিয়া।
অনিন্দ্য: অনেকের গল্প দিয়ে হইছে তো যেমন—খাজা আহম্মদ আব্বাস, ভৈকম মুহম্মদ বশীর, কৃষণ চন্দ, রাজেন্দর সিং বেদি, সাদাত হাসান মান্টো…।
রাজু আলাউদ্দিন: একজন ফিল্ম মেকার হচ্ছে, আমি বলি, ফিল্ম মেকারকে আহত করার জন্য না, একজন ব্যর্থ লেখক কিন্তু সফল ফিল্ম মেকার, একজন ব্যর্থ পেইন্টার কিন্তু সফল ফিল্ম মেকার হতে পারেন। তিনি বিভিন্ন বিভাগের সর্বোচ্চ জায়গায় হয়তো যাবে না কিন্তু বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে তার কমন সেন্স থাকতে হবে। ওই জায়গাগুলো সম্পর্কে তার পরিপূর্ণ ধারণা থাকবে। ওই জায়গাগুলোর সর্বোচ্চ জায়গায় সে যাবে না, যত দূর সে যেতে পারে তা মিডিওকারের। (সে মিডিওকারও হবে, সে ওসব কিছুই হবে না, কারণ সে ফিল্ম মেকার হতে চায়—অনিন্দ্য)। হ্যাঁ, সে কথাই বলছিলাম, ফিল্ম মেকিং-এর জন্য ওই সম্পর্কে তার পরিপূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। ওইটা থাকলে সে ভাল ফিল্ম মেকার হতে পারে। যেমন বলছিলাম লুইস বুনুয়েল, সে কি বিখ্যাত লেখক? বিখ্যত পেইন্টার? না। কিন্তু বিখ্যাত ফিল্ম মেকার যে শিল্পের অন্য মাধ্যমগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখে।
অনিন্দ্য: আপনি ‘রাম কিঙ্কর’ দেখছেন? ঋত্ত্বিক ঘটকের, বানাইতে পারে নাই। (অর্ধেক হওয়ার পর মারা গেছে। পরে ওর পুলা করছে।—মুহম্মদ খসরু)। ওইটার শর্টগুলা নিয়া কমপ্লিট হইছে। সে রাম কিঙ্করকে ধমকাইতেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, ভাল তো। সে তো রাম কিঙ্কর হতে পারছে, পারে নাই?
অনিন্দ্য: সে তো রাম কিঙ্কর হতে চায় নাই। সে ঋত্ত্বিক ঘটক, ফিল্ম মেকার হতে চেয়েছে, রাম কিঙ্কর কি ঋত্ত্বিক ঘটক হতে চাইছে? এখানে পারে নাই আবার বলছেন কেন! পারা না-পারার বিষয়টা অন্য বিষয়। কিন্তু চাইলে পারতো না, এইটা তো আপনি বলতে পারেন না। আপনি সর্বোচ্চ বলতে পারেন, তিনি পরীক্ষা দিলে ফিফটি পেতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: না, হওয়া না-হওয়াটা অন্য বিষয়। সে তো হয় নাই। এটাই রিয়ালিটি। যেটা রিয়ালিটি সেটাই তো আমি দেখব।
অনিন্দ্য: রিয়ালিটির উপরেও একটা কথা বলছেন, সে হইতে চাইলে মিডিওকার হইতো। হইতে চাইলে সে মিডিওকার নাও হতে পারতো, আরো বড় হতে পারতো। আপনি সত্যজিৎ রায়ের ছবি আঁকা ধরেন, তার টাইপোগ্রাফি নিয়ে কাজ আছে, আইকনগ্রাফি নিয়া কাজ আছে। ঋত্ত্বিক ঘটকেরও অনেক কাজ আছে। তার সিনেমাগুলো ফালায় দিলেও সে নাট্যকার হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। (গল্প লিখছে কিছু ভাল—মুহম্মদ খসরু)। মানে আমি রাজু ভাইয়ের সঙ্গে একমত না। আপনি বলতে পারবেন না পাবলো পিকাসো একজন ব্যর্থ কবি, বলবেন কী?
রাজু আলাউদ্দিন: ব্যর্থ কবি—আমি তা-ই বলব। কারণ হচ্ছে, সে কবিতা লিখেছে এবং সে যায়গায় সে ব্যর্থই ছিল, কিন্তু পিকাসোর কাব্যবোধ ছিল, যে-কাব্যবোধ দিয়ে একজন সফল চিত্রকর হওয়া সম্ভব। আমি ওই জায়গাগুলি বলতে চাচ্ছি। এইখানে আসলে উঁনি কবি বা ওইটাকে খাটো করার জন্য বলতে চাচ্ছি না, আমি বলতে চাচ্ছি যে একজন সফল ফিল্ম মেকারের মধ্যে সমস্ত বিষয়ে জ্ঞান থাকবে। কারণ আমি মনে করি একজন কবি আলাভোলা ভাবে সফল কবি হয়ে যেতে পারে, কিন্তু একজন ফিল্ম মেকার ওই রকম আলাভোলা ভাবে হওয়া সম্ভবনা কম। কারণ হচ্ছে যে এই প্রযুক্তিটা এসেছে অনেক দেরিতে এবং এইটা অনেকগুলো শিল্প মাধ্যমকে সে এসিমিলেট করে এবং সে ওইগুলো এসিমিলেট করার পর সে একজন সফল ফিল্ম মেকার হয়। আমি ওই জন্য বলছি, ওটা কোন কবি সফল, কে ব্যর্থ ওইটা আমি আক্ষরিক আর্থে বুঝাতে চাইনি।
অনিন্দ্য: আপনার শব্দ নির্বাচন ত্রুর্টিপূর্ণ।
রাজু আলাউদ্দিন: হয়তো আমার শব্দ নির্বাচনে ত্রুটি থাকতে পারে। আমার কাছে এটা অসম্ভব রকমের জটিল শিল্প মাধ্যম বলে মনে হয়। এই কারণে মনে হয় এখানে অনেক বিষয় একসঙ্গে ধারণ করতে হয় । কিন্তু…
মুহম্মদ খসরু: অনেক বিষয় জানে এমন একজন লোক ফিল্ম বানাইছে, এমন একজন এদেশে দেখাও না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের এখানে নেই তো ।
মুহম্মদ খসরু: আমি ফিল্ম নিয়ে কথা বলছি না, সাহিত্যে দেখাও।
রাজু আলাউদ্দিন: সাহিত্যেও তো নাই। সাহিত্যের দায় নাই যে ফিল্ম, সঙ্গীত এ সমস্ত কিছু সম্পর্কে তাকে জানতেই হবে। কিন্তু একজন ফিল্ম মেকারের সেই দায়টা আছে। দায় কেন? তাকে মিউজিক দিতে হবে, তাকে লিটারেচার দিতে হবে, তাকে পেইন্টিং দিতে হবে। পেইন্টিং থ্রু ক্যামেরা। আমি এই জন্য বলতে চাচ্ছি আসলে, আমি খাটো কারার অর্থে বলিনি। খসরু ভাই কী একমত, নাকি দ্বীমত?

মুহম্মদ খসরু: আমি একমত।
অনিন্দ্য: এখান থেকে আমরা মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চলচ্চিত্র অধ্যয়ন হচ্ছে সেই জায়গায় আসতে পরি। আমাদের অডিও অংশ চলে যাওয়ার আগে খসরু ভাই যেটা বলতে ছিলেন যে, বাদবাকি শিল্পকলা সম্পর্কে না জেনে কোন ধারণা না নিয়ে ফিল্মের পড়াশুনার যে স্টাইলটা বাংলাদেশের আছে সেটা খুব ফলপ্রসু হবে না। খসরু ভাই এটা সম্পর্কে কিছু বলবেন।
মুহম্মদ খসরু: কারণ টিচারই তো নাই, কারে জিগাইবা টিচার না থাকলে। আমি ‘পালঙ্ক’র সময় একটা ছেলেকে আর্ট ডিরেক্টরের চাকরি করাইয়া দিছিলাম ডিরেক্টর রাজেন দা’রে বইলা, তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম, এবং খুশি হয়েছিল এবং আর্ট ডিরেক্টরের কাজটা দিয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: কে উনি?
মুহম্মদ খসরু: ফারুক মহিউদ্দিন নাম, চেন নাকি কেউ?
রাজু আলাউদ্দিন: মহিউদ্দিন ফারুক?
মুহম্মদ খসরু: না না, ফারুক মহিউদ্দিন যাই হোক, কে সে? তার সম্পর্কে কি জানো?
অনিন্দ্য: সে আর্ট ডিরেক্টর, স্ট্যাম্পফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস-ট্লাস নেয়।
মুহম্মদ খসরু:> হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই লোক। তারে ফিল্মে আমিই আনছিলাম।
অনিন্দ্য: আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল তখন।
মুহম্মদ খসরু: আর্ট কলেজে শিখছে আরকি। সে এখন ওখানকারই, ও তো কিছুই জানে না, ফিল্মের ‘ফ’-ও জানে না।
অনিন্দ্য: তখন জানতো না, নাকি এখনো জানে না?
মুহম্মদ খসরু: তারপর আরেকটা আছে, খচ্চর শালা, তার নামটা যেন কী, মনে আসতেছে না এই মুহূর্তে।
অনিন্দ্য: আমারে দিয়া বলাইবেন?
মুহম্মদ খসরু: না না, তুমিও তার নাম জান না।
অনিন্দ্য: ও আচ্ছা তাইলে ঠিক আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: নাম কী? কার কথা বলতেছেন?
মুহম্মদ খসরু: নামটা মনে আইতেছে না আমার। বয়স্ক লোকটা।
অনিন্দ্য: আর্ট ডিরেকটার, না ফিল্ম ডিরেক্টর?
মুহম্মদ খসরু: না না, ফিল্মের টিচার সে।
অনিন্দ্য: সাজেদুল আওয়াল?
মুহম্মদ খসরু: না না, ওইটা তো গু থেইকা উইঠা আইছে।
অনিন্দ্য: বুড়া।
মুহম্মদ খসরু: বুড়া না সে, মহাহারামি শালা, চালবাজ।
রাজু আলাউদ্দিন: রাজীব।
মুহম্মদ খসরু: রাজীব না।
অনিন্দ্য: অনুপম হায়াত।
মুহম্মদ খসরু: হ্যাঁ, এই বারও কিন্তু নামটা ও-(অনিন্দ্য)ই বের করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, অনুপম হায়াত চালবাজ কেন?
মুহম্মদ খসরু: তুমি আগেরটা কইলা না, এবারও কিন্তু নামটা ওরে দিয়া বের করলাম। হা হা হা।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনে তো আরো মহাচালবাজ। যাই হোক, আপনাকে মহাচালবাজ বলার পেছনে আসলে আপনাকে শ্রদ্ধা রেখেই বলছি।

মুহম্মদ খসরু: না না, এটা কিছু না, বুঝছি তো।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার যেটা মনে হয় সেটা হল, খসরু ভাই, বাংলাদেশে আপনি যে নিবেদিত প্রাণ, ওই যে চলচ্চিত্রের জন্য এত কিছু করলেন তারপরও আমাদের চলচ্চিত্র বদলাচ্ছে না।
মুহম্মদ খসরু: বদলাবে কেমনে? বদলানোর উপায় নাই এইজন্য যে, একটা নতুন জিনিস ভাল জিনিস রপ্ত করলো না সে বুঝতে পারবে—আমি এটা শিখলাম বা বুঝলাম। আমি কিন্তু প্রফেশনালিও ফিল্মের খুব কাছাকাছি ছিলাম। ফিল্ম, আর্ট ইত্যাদির। আমি যেখানে চাকরি করছি সেখানে চল্লিশ জন আর্টিস্ট কাজ করতো ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা। সেটার প্রধান ছিল এমদাদ হোসেন, কামরুল হাসানের মত লোক। ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় আছি, ঢাকা আর্ট কলেজের সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক। তারপর তিন ভাই আর্ট কলেজ থেকে পাশ করছে। একটা ছবি সম্পর্কে তোমরা হয়তো খবর রাখ না, আমি বলব এখন ‘জাগো হুয়া সাবেরা’।
রাজু আলাউদ্দিন: ও, ‘জাগো হুয়া সাবেরা’, আরে বাপরে বাপ, কি কন মনে রাখব না! এটা আপনি কী করে বললেন?
মুহম্মদ খসরু: কে দেখছে ছবিটা?
রাজু আলাউদ্দিন: ছবিটা আমি দেখি নাই, কিন্তু নামে এত পরিচিত। আসলে আমি এই ছবিটা পাই-ই নাই।
অনিন্দ্য: দেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু দেখার কোন উপায় নাই এখনো।
মুহম্মদ খসরু: রাজু বলে একটা ছেলে আছে না, ফিল্ম পড়ায়।
অনিন্দ্য: হ্যাঁ হ্যাঁ, জাকির হোসেন রাজু।
মুহম্মদ খসরু: ওই ব্যাটা অস্ট্রেলিয়া পড়ত তো, একটা প্রিন্ট আনছিল, ওখানে আমি দেখছি।
রাজু আলাউদ্দিন: এই ছবিটা সম্পর্কে একটু বলেন তো খসরু ভাই।
মুহম্মদ খসরু: এই ছবিটায় একদিনের জন্য কাজ করছিলাম আমি। তো, আমাদের এত ছোট বয়স যে আমরা ন্যাংটাই থাকি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার বয়স তখন কত?
মুহম্মদ খসরু: ‘জাগো হুয়ে সাবেরা’, আর এখানে হল ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। তবে ‘জাগো হুয়ে সাবেরা’র স্ক্রিপ্ট করেছে ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, কবি।
রাজু আলাউদ্দিন: এ জে কারদার এই স্ক্রিপ্ট পেল কিভাবে?
মুহম্মদ খসরু: তখন কোন ইন্ডিয়ান গল্প বা কাহিনি—বাংলাদেশ তো ছিল না—ইস্ট পাকিস্তান ওয়েস্ট পাকিস্তান করতে পারবে না—এই রকম একটা আইন ছিল। তখন ‘পদ্ম নদীর মাঝি’র ইংরেজি তো ছিল। যার জন্য তারা ওই নাম না রেখে ‘জাগো হুয়ে সাবেরা’ নাম রাখছে। এই ছবির এডিটর ছিল একজন ইংলিশ মেয়ে। আনিস, আনিসকে চিন? আনিস হল খান আতা। ‘জাগো হুয়ে সাবেরা’র হিরো খান আতা ছিল। খান আতা আর কিছু নাটকের লোকজন মিলে ১৯৫৫ সালে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। এই ছবিটার খ্যাতিও হয়েছিল, মস্কোতে বেস্ট স্ক্রিপ্ট অ্যাওয়ার্ড পায়।
অনিন্দ্য: এটা আর্কাইভে নাই?
মুহম্মদ খসরু: আর্কাইভে ভাল ছবি থাকবে না, এটা থাকবে কেন আর্কাইভে। আর্কাইভে পাকিস্তানি ছবি আইনা রাখবে ভইরা! রাজুরে, চোদনারে কইলাম একটা প্রিন্ট আমাগো দেও না কেন দেখি-টেখি। ওই কি নাই-টাই এসব কইরা কাইটা গেল। আর্কাইভের যে ডিরেকটর ওতো এই ছবিগুলা কালেক্ট করে না। ওই চোদনাই তো ছবির নাম জানে না।
অনিন্দ্য: এইটা জানে তো।

মুহম্মদ খসরু: জানে তো কালেক্ট করে না ক্যান? তার কাজটা কি ওইখানে? এত কষ্ট কইরা কাজটা আমরা করলাম। তারপর কারদারের যে ইউনিট ছিল ওখানে ছিল মমতাজ কইরা একটা লোক।
রাজু আলাউদ্দিন: কোন মমতাজ?
মুহম্মদ খসরু: মমতাজ আমাদের দেশি, কিন্তু মুম্বাইতেও ছিল অনেক দিন। এই ফুটপাতে এটা-সেটা বিক্রি-টিক্রি করতো। ওর ছবি করার স্বাদ ছিল অনেক আগে থেকে।
রাজু আলাউদ্দিন: ফুটপাতে কি বিক্রি করতো?
মুহম্মদ খসরু: এই বিজনেস-টিজনেস করতো; তারপর বিভিন্ন লোকজনের সাথে, ফিল্ম ডাইরেক্টরের সাথে মেলা-মেশা করার চেষ্টা করতো। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে চইল্যা আসে, আইস্যা কয়েকটা ছবি করছিল আরকি। ওই ধুম-ধারাক্কা ছবি আরকি। বোম্বেতে পড়ছে, ওর এডুকেশনের প্রবলেম ছিল। সাধন রায় ছিল ওই ছবির সাথে যুক্ত, ক্যামেরা এসিস্টেন্ট হিসেবে। সাধন রায়ের নাম শুনেছ?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, অবশ্যই।
মুহম্মদ খসরু: সাধন রায় বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান ইন্ডিয়ার। ইন্ডিয়া মানে সে কাজ করেছে, তারপরে সে ইন্ডিয়া গেছে। তারপর যত আর্টিস্ট এখানে কাজ করেছে…।
রাজু আলাউদ্দিন: গৌতম ঘোষ তো একজন মিডিওকার ফিল্ম মেকার।
মুহম্মদ খসরু: একদম থার্ড ক্লাস ছবিতে, মিডিওকারের চাইতে নিচে। কিন্তু আমি যেটা বলব He is a good camera man, but bad film maker.
রাজু আলাউদ্দিন: গুড ক্যামেরাম্যান, কিন্তু ওনি যখন ‘মনের মানুষ’ বানাইল ওইখানে সে গুড ক্যামেরাম্যান ছিল, কিন্তু ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ যখন বানাইছে He was a worst camera man.
মুহম্মদ খসরু: কে?
রাজু আলাউদ্দিন: গৌতম ঘোষ, ওইখানে তো ক্যামেরাম্যান হিসেবে তার কোনো ভূমিকাই নাই।
অনিন্দ্য: না, তা মানা কঠিন একটু। এই সিনামাটা ওইভাবে একটু সমস্যাজনক, কিন্তু ক্যামেরার কাজ খারাপ হয় নাই।

রাজু আলাউদ্দিন: না না। এই জায়গায় আমার একটু দ্বিমত আছে। সেটা হচ্ছে যে, আমি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবিটা দেখলাম এবং ‘মনের মানুষ’ ছবিটা দেখলাম…
অনিন্দ্য: ‘মনের মানুষ’ ছবিটা একটা বাজে সিনেমা।
চতুর্থজন: ছবিটা মেকিং হয়েছে কবে আপনি এই জায়গায় আসেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা অনেক পরে হইছে।
চতুর্থজন: ‘মনের মানুষ’ যখন হইছে তখন এপার-ওপার সব জায়গার টেকনলজি এক হয়ে গেছে। কিন্তু যখন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ করতে আসছিল গৌতম ঘোষ তখন এফডিসিতে একটা ভাল ক্রেনও ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: তাইলে আপনি কেন অস্বীকার করছেন যে, সেই ফটোগ্রাফি খারাপ ছিল।
চতুর্থজন: ফটোগ্রাফির সাথে ট্যেকনোলজির একটা ইয়ে আছে না।
রাজু আলাউদ্দিন: না, ফটোগ্রাফির সাথে ট্যেকনোলজির একটা সম্পর্ক আছে বলেই তো আমি বলছি…
চতুর্থজন: এটা আমাদের এখানে নাই, এটা গৌতম ঘোষের দোষ না।
রাজু আলাউদ্দিন: না এটা গৌতম ঘোষের দোষ না, কিন্তু গৌতম ঘোষ তো একটা টিম নিয়ে কাজ করে। গৌতম ঘোষের ওই টিমের মধ্যে…
অনিন্দ্য: টিম তো ব্যাপার না, ও তো এইখানে আসছে যৌথ প্রযোজনার সিনেমায়, যেটা পাইছে সেইটা দিয়ে কাজ করছে। সেটা অনুকূলে ছিল না আরকি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা অনুকূলে ছিল না, তার মানে ফটোগ্রাফিটা খারাপ ছিল–এটা স্বীকার করব না কেন?
অনিন্দ্য: না, তার মানে এটা না, এটা মানতে পারতেছি না, সরি।
রাজু আলাউদ্দিন: না, আপনি মানতে পারতেছেন না, কিন্তু আপনি বলতেছেন যে টেকনিক্যাল সাপোর্টগুলো ছিল না।
অনিন্দ্য: আমার কাছে মনে হয়েছে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র ফটোগ্রাফিটা ঠিক আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: যাই হোক, আমি এখানে একমত হতে পারছি না।
অনিন্দ্য: আমার মনে হয় এখানে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কনস্ট্রাকশন নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। এমনিতে সিনেমায় ফটোগ্রাফি জিনিসটা তিন নাম্বর, চার নম্বর বিষয়।
রাজু আলাউদ্দিন: না না, ফটোগ্রাফিটা হচ্ছে সিনেমার একদম প্রাণ কেন্দ্র। কারণ হচ্ছে যে, আপনি যখন সিনেমা দেখেন সিনেমা ভিজুয়্যাল একটা মিডিয়া। যদি ভিজুয়্যাল মিডিয়াই হয় তাইলে ফটোগ্রাফি একটা বড় ব্যাপার।
অনিন্দ্য: একবারে ক্যামেরা কখনো না খুইলা আপনি সিনেমা বানাতে পারেন। ধরেন আলবারেজ সিনেমা। আলবারেজের সিনেমা আপনি দেখছেন?

রাজু আলাউদ্দিন: আলবারেজের সিনেমা আমি দেখছি।
অনিন্দ্য: বিভিন্ন স্টক ফুটেজ নিয়া কাজ করছে। স্টক ফুটেজ নিয়া হাবিযাবি যা মন চায় লাগাইয়া একটা বানাইছে, কোনো সমস্যা হয় নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: না না, আপনি সিনেমা দেখেন কি ক্যামেরার চোখ দিয়ে, নাকি সিনেমা দেখেন বই দিয়ে? আপনি তো সিনেমা দেখেন ক্যামেরা দিয়েই, তাই না? যদি ক্যামেরা দিয়ে দেখতে হয় তাহলে ওইখানে ক্যামেরার প্রধান ভূমিকা থাকে। এই ক্যামেরা ছাড়া কোন সিনেমা হয় না।
চতুর্থজন: আলবারেজের যে আলাপটা ছিল…।
মুহম্মদ খসরু: কোন আলবারেজ, কিউবার?
চতুর্থজন: সান্টিয়াগো আলবারেজ। আলবারেজের যে বিষয়টা ছিল, সে ক্যামেরার উপর ডিপেন্ড করে নাই। আলবারেজ কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ফুটেজ, এমনকি টেলিভিশনের ফুটেজ নিয়ে কাজ করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: সেই ফুটেজগুলো তো ক্যামেরাতেই ধারণ করা হইছে, তাই না?
অনিন্দ্য: সিনেমা জিনিসটা ক্যামেরা না, সিনেমা জিনিসটা এডিটিং। (হ্যাঁ, এটা কিন্তু তৃতীয় একটা জায়গায় গেছে।—চতুর্থজন)।
রাজু আলাউদ্দিন: না, সিনেমা জিনিসটা এডিটিং, কিন্তু ক্যামেরাতে যদি ধারণই না করেন তাহলে এডিটিং কী করে করবেন?
অনিন্দ্য: ওইটা তো কাঁচামাল এটার। কিন্তু আপনি আলোচনা করতেছেন—এটা নাজিরশাইল চাল, না এটা মিনিকেট চাল, এই টাইপের আলোচনা। চাল তো আপনাকে ভাত রানতে লাগবেই। কিন্তু এটা এমন একটা জিনিস যে, এটা নিয়ে আলোচনা করার কিছু নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু চালটা তো আপনাকে ধারণ করতে হচ্ছে ক্যামেরা দিয়েই।
চতুর্থজন: দুইদিন আগে নান্দুসে একটা খিচুরি খাইছি, বাংলাদেশে নান্দুসের সবচেয়ে দামি খিচুরি, ২৫০ টাকার একটা খিচুরির দাম না কি ৩০০ টাকা। ওইটা কিন্তু বানাইছে বাংলা চাল দিয়ে। আপনি যখন বাসায় মেহমান ডাক দেন তখন কিন্তু আপনি বাংলা চাল দিয়া খিচুরি বানান না, তখন পোলাওয়ের চাল ব্যবহার করেন। ক্যামেরা অনেক পরের বিষয়। যেটার সাথে যেটা যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যদি ফিল্মের কথা বলেন, ফিল্মে ক্যামেরাই তো মূ্খ্য জিনিস। এখানে আমাদের দ্বিমত থাকার পরেও আমরা এগোতে পরি। আমরা যেন কোথায় ছিলাম?
অনিন্দ্য: ‘গঙ্গা’ সিনেমাটা কে বানাইছে?
মুহম্মদ খসরু: রাজেন তারফদার। এটার ফাইন্যান্স করছে ইন্ডিয়া। বেশ একটা লতিক-বাতিক কিছু ছবি হয় না, ওই রকম আরকি। এটা তো সমরেশ বসুর লেখা। সমরেশ বসুর বাড়ি কিন্তু এই গ্রামের সাইডেই, রাজানগর বলে একটা গ্রাম আছে বিক্রমপুরে, এই ধলেশ্বরী নদীটা পার হলেই কিন্তু বিক্রমপুর।
রাজু আলাউদ্দিন: নদীটা কি কাছেই?
মুহম্মদ খসরু: অতটা না, চেষ্টা করে দেখি পরে আইস। নদী তো মইরা গেছেগা। ধলেশ্বরী আর বাঁইচা নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: খসরু ভাই, যেটা আমরা বলতে ছিলাম সেটা হল যে, আমরা একটা জায়গায় এসছিলাম সেটা হল এফডিসিতে কোন প্রযুক্তিগত…।
মুহম্মদ খসরু: এফ.ডি.সি সম্পর্কে আমার একটাই বক্তব্য আছে এখন—এফডিসিকে প্রাইভেট সেক্টরে দিয়ে দেয়া উচিত, সরকারে রাখা উচিত না। মানে গভমেন্টের দায়দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া, ওরা যা করে করুক। সরকার এটা রাখবে কেন। এটা প্রাইভেটে দাও, আরো ভাল হবে। এখন ইন্ডিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ছবি বানাচ্ছে। হলিউড যে ফর্মে গেছে অলমোস্ট ওই লেভেলে চলে গেছে বোম্বের ছবিগুলা। ওইখানে তো কোন সরকারি প্রসেস নেই। সরকার এই প্রজেক্টটারে অনুদান বা টাকা পয়সা দিতে পারে। গোটাটাই সরকারের কাছে থাকা ঠিক না। এই যে সরকারের কত কত টাকা পাওনা রয়েছে ফিল্ম মেকারের কাছে, তুমি জানো? কল্পনাও করতে পারবে না এত টাকা পাওনা রইছে। এটার শোধও হয় নাই।

অনিন্দ্য: কিন্তু আমার যেটা মনে হয়, ইন্ডিয়ান সিনেমাও তো আরেক দিকে চলে গেছে।
মুহম্মদ খসরু: সেটা কী?
অনিন্দ্য: ইন্ডিয়ান সিনেমা হলিউডের মত হয়ে যাচ্ছে এক হিসেবে, কিন্তু ওই সিনেমাগুলো নাই আর, প্যারালাল যে সিনেমাগুলো হয়তো আরকি।
মুহম্মদ খসরু: ইন্ডিয়াতে?
অনিন্দ্য: হ্যাঁ। এখন তো অন্য ধরনের, গ্লোবাল হইতে গিয়ে ইন্ডিয়ান ক্যারাক্টারিস্কিটক চেঞ্জ হয়ে গেছে।
মুহম্মদ খসরু: নাই, ক্যারেকটার কিছু নাই। এটা বোম্বের ছবিতে বেশি হচ্ছে। কোলকাতা ছবিতে অল্প, কিন্তু বোম্বে ধুম-ধারাক্কা ছবি, যেটা এখন তাদেরই আরকি।
অনিন্দ্য: আগে কমার্শিয়াল সিনেমাও তো হতো, এখন…।
মুহম্মদ খসরু: কমার্শিয়াল সিনেমার কথা বলতেছি আমি। আগে যে এফডিসির সাথে কোলাবরেশন সিনেমাগুলো হতো, তা অনেক বেটার।
অনিন্দ্য: ইয়ে সিনেমা করছিল যে ‘যানে ভি দো ইয়ারোঁ’, কমেডি ছবি।
মুহম্মদ খসরু: কার ছবি এটা?
অনিন্দ্য: সাই পরাঞ্জেপো।
মুহম্মদ খসরু: ও মহিলা, দেখছি এটা, ভাল ছবি। ফিল্মের ওরা নিয়ে আসছে সবাইরে দেখানোর লাইগা। ওই যে, বিচের পিকচার আছে যে।
অনিন্দ্য: ওই যে আক্তার মির্জা বলে একজন ছিল, অনেক ভালো ভালো…।
মুহম্মদ খসরু: এগুলো তো এনএফডিসির ছবি।
অনিন্দ্য: ওই যে—আলবার্ট পিন্টু, পোকিয়া, ওছাতে, মোহন জসি হাজির হো।
মুহম্মদ খসরু: সব এনএফডিসির। মনি কাউলের ছবিগুলা, কুমার সাহানি সব ছবি গভমেন্টের পয়সায় বানাইছে।
রাজু আলাউদ্দিন: মনি কাউল তো বোধ হয় আপনার খুব পিয়ারের লোক, না?
মুহম্মদ খসরু: ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: মনি কাউলকে তো আপনি ইয়ে করেন। একটা সময় দেখা গেল মনি কাউল, অঞ্জন এক ইয়ের মধ্যে আসতেন। মনি কাউলের শিষ্য হল কে?
অনিন্দ্য: অঞ্জন। মনি কাউলের ওখানে পড়ালেখা করছে আরকি।
মুহম্মদ খসরু: ও একটু বেশি এ্যাডভাটাইজ দিচ্ছে আরকি। ওই রকম কিছু না, ওর মতো শিক্ষক অনেকেই ছিল–তার কথা কয় না সে। আমার লেখাতে লেখছি আরকি, আমার লেখাটা পড়ছো তোমরা? ওখানে বলা আছে তো এইগুলা। ও আমার কী করছে জানো, আমার লেখাটা ও এডিট করছে। আমি খুব মাইন্ড করছি।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

“হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে
শিল্পী রফিকুন নবী: ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম

শামসুজ্জামান খান: নিজের দলের কোনো সমালোচনা করব না, অন্যদের করব– তাহলে তো সে পার্সিয়াল হয়ে গেল

মোহাম্মদ রফিক: আমার কাছে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অসম্পূর্ণ উপন্যাস মনে হয়

রবীন্দ্র-গবেষক মার্টিন ক্যাম্পশেন: ভারতকে চিনতে এখনো আমার বাকি আছে

Flag Counter


3 Responses

  1. Faruque Alamgir says:

    Extraordinary.I have been amazed to read this interview of Muhammad Khasru where he spoke candidly.It should have been published before his death with an edited version.

  2. ইকবাল করিম হাসনু says:

    রাজু আলাউদ্দিন এবং অনিন্দ্যকে রহমানকে সাধুবাদ জানাই খসরু ভাইয়ের অকপট ভাষ্যটি তুলে ধরার জন্য।

  3. সাক্ষাতকারটি থেকে মুহম্মদ খসরুকে চেনা যায়। সেইসঙ্গে এটাও বুঝতে অসুবিধা হয় না, সাক্ষাতকারটি যখন নেয়া হয়েছে তখন বার্ধক্যজনিত ডিমেনশিয়ার কারণে অনেক বিষয়ে তিনি খেই হারিয়ে ফেলছেন। দশ বছর আগে এ ধরনের একটি সাক্ষাতকার নিলে প্রকৃত মুহম্মদ খসরুকে ধরা যেত। তবুও এ থেকে আমরা যতটুকু পেলাম তার জন্য রাজু আলাউদ্দিন ও অনিন্দ্য রহমানকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.