শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

রাজু আলাউদ্দিন | ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ১০:৫৯ অপরাহ্ন

রাজু আলাউদ্দিন: আমি যদ্দুর জানি, লেখালেখির একদম শুরুর দিকে আপনি গল্প এবং কবিতা লিখতেন। এখন আপনি আর গল্প কবিতা লেখেন না। প্রচুর ননফিকশন, অর্থাৎ গবেষণা বা প্রবন্ধ এইগুলোতে আপনি এখন অনেক বেশি লিপ্ত। তো এরপরে আর কখনোই কেন গল্প এবং কবিতা লিখলেন না?
শামসুজ্জামান খান: এটা বলতে গেলে আমাকে শুরু করতে হবে একেবারে প্রাইমারি স্কুল থেকে। আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা সব্বাই খুবই বিদ্বান তো ছিলেনই, সেই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাংলার যিনি শিক্ষক ছিলেন, তিনি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তেন, আমরা বুঝতাম না, তবু তিনি আমাদের সামনে সেসব কবিতা পড়তেন। সাহিত্যের ব্যাপারে আমার আগ্রহটা তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। তার চার বা পাঁচ বছর পরে যখন আমি হাইস্কুলে এলাম, আমার বাড়ি হলো বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার চারিগ্রামে। এই গ্রামের স্কুলের নাম হলো এস. এ. খান হাই স্কুল। আমার দাদা-শ্বশুর এই স্কুলটা দিয়েছিলেন। তো সেই স্কুলে আমি ভর্তি হলাম। ভর্তি হওয়ার পর যে শিক্ষকদের পেলাম, তারা সব্বাই ভালো লেখাপড়া জানা মানুষ। প্রধান শিক্ষক ছিলেন ইংরেজির শ্রীযুক্ত বাবু রাজ্যেশ্বর চৌধুরী। অসাধারণ ইংরেজি জানতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তখনকার দিনে বোধহয় সব স্কুল বা কলেজের শিক্ষকরাই একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করতেন।

শামসুজ্জামান খান: খুব স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করতেন। বাংলার শিক্ষক যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে ফজলুল করিম স্যার ছিলেন, আনোয়ারুল ইসলাম সাহেব ছিলেন, এঁরাও খুব বাংলার ভালো শিক্ষক ছিলেন। এবং আরেকজন শিক্ষক এলেন, তিনি বাংলা ছাড়াও অন্য বিষয় পড়াতেন। তার নাম খলিলুর রহমান। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। এইটুকু আমরা পরে জানতে পেরেছি। তিনি বামপন্থী চেতনার সাথে আমাদের পরিচিত করেন। তিনি এবং তার স্ত্রী রুকাইয়া সুলতানা; রুকাইয়া সুলতানা পরবর্তীকালে ডক্টর জি. সি. দেবের পালিতা কন্যা হয়েছিলেন। এই দুইজনই আমাদের গ্রামে তখন থাকেন। তারা আমাকে নিয়ে ‘পূর্বাভাস’ নামে একটা পত্রিকা বার করলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কত সালের ঘটনা বলছেন?
শামসুজ্জামান খান: ১৯৫৩/৫৪ সন। এই সময় পত্রিকা বার করলেন। তো একটা মজার ব্যাপার হলো, আমাদের গ্রামেরই কবি মঈনুদ্দীন সাহেব..
রাজু আলাউদ্দিন: খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন?
শামসুজ্জামান খান: খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন এই পত্রিকা দেখে বললেন, সব্বোনাশ! এ তো সুকান্তর বইয়ের নামে পত্রিকা বার করছে, নিশ্চয় কিমিউনিস্ট হবে। তোমাকে তো কমিউনিস্ট করে ফেলবে। তো আমি খুব মজা পেলাম। আমি কিছু বলছি না। আমি হাসছি। কিন্তু আমার সত্যিই তাকে ভালো লেগেছিল, আমার শিক্ষক খলিলুর রহমান সাহেবকে। এই পূর্বাভাস পত্রিকা থেকেই কথাসাহিত্যের প্রতি আমার একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। এবং আমি প্রথমে একটা গল্পই লিখি। সেটি ১৯৫৬ সালের শেষ দিকে লিখেছি বলে মনে পড়ে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ, আমাদের পাশের গ্রামের রফিক, রফিকের কথা আমরা সব্বাই জানি, একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। তো তাকে নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলাম। সেই থেকে গল্প লেখাটা শুরু। আর কবিতা লেখার উৎসটা, যতদূর সম্ভব, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আনিসুর রহমান সাহেব, তিনি যেহেতু জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তেন, কবিতা নিজেও আবার কিছু লিখতেন, সেখান থেকে কবিতা লেখার আগ্রহটা হয়েছিল। তখন আমি মুকুলের মাহফিল, মিল্লাতের কিশোর দুনিয়া এই সমস্ত পত্রিকায় গল্প এবং কবিতা পাঠাতাম। ছোট ছোট প্রবন্ধও পাঠাতাম। সেগুলো ছাপা হতো। বেশ একটা আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল। আর পরবর্তীকালে আমি যখন গ্রামের স্কুল থেকে পাশ করে ঢাকায় এলাম, ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হওয়াটাই আমার লক্ষ্য ছিল। এইখানে বিখ্যাত শিক্ষকরা অনেকেই ছিলেন। বিশেষ করে অজিত কুমার গুহ, এই স্যারের কাছে বাংলা পড়ার প্রচণ্ড রকমের আগ্রহ ছিল। তো সেইখানে ভর্তি হলাম। ওখানে হাসান হাফিজুর রহমান তখন শিক্ষক। আলাউদ্দিন আল আজাদ শিক্ষক। অর্থাৎ প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নক্ষত্রের মতো। ইংরেজিতে ছিলেন আব্দুল মতিন সাহেব। অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। আর অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকরাও খুব ভালো ছিলেন। তো সেখানে থেকে কিছু সাহিত্যচর্চা করতে শুরু করি। তবে তখন ঢাকায় এইসব শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে গ্রামীণ সাহিত্যচর্চার যে পটভূমি, সেটা পাল্টে যায়। কারণ, হাসান হাফিজুর রহমান স্যারকে খুব কাছে পেয়েছি। অজিত গুহ স্যারকে কাছে পেয়েছি। আমি ভাবলাম, আগে শিখে নিই, বুঝে নিই, তারপর লিখি। কারণ, একটা পরিবেশ থেকে অন্য একটা পরিবেশে এলাম। এই পরিবেশটা অনেক বেশি উন্নত সাহিত্যচর্চার দিক থেকে। এই জানাবোঝার চেষ্টায় জগন্নাথ কলেজে থাকাকালীন খুব একটা লেখালেখি করেছি, এমনটা মনে হয় না। তবে পড়ার চেষ্টা করেছি। আর ক্লাশগুলোতে জানাশোনার চেষ্টা ছিল। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা তখন বেরিয়েছে। তার সহ-সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর সাহেব। উনি মাঝে মাঝে পত্রিকার প্রুফ নিয়ে আসতেন। আমাদের দিয়ে দেখাতেন কখনো কখনো। সেই জায়গা থেকে সাহিত্যের আগ্রহটা আমার জন্য কিছু কিছু পরিবর্তন হতে থাকল মনে হয়। আরো সিরিয়াসলি ভাবা, আরো সিরিয়াসলি চেষ্টা করা। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এসে আব্দুল হাই সাহেব, মুনীর চৌধুরী স্যার, আনিসুজ্জামান স্যার– মানে সাহিত্যক্ষেত্রের অতি বিশিষ্টজনরা এখানে আছেন। এবং এইখানে এসে লেখালেখি নিয়ে ভাবতে যেয়ে আমি প্রভাবিত হলাম যদ্দুর সম্ভব মুনীর চৌধুরী এবং আনিসুজ্জামান স্যারের দ্বারা। প্রথমে ভেবে নিলাম আমার কথা বলার ভঙ্গিটা কিরকম হবে। গ্রাম থেকে এলে কথাবার্তার ধরনের মধ্যে এক ধরনের গ্রামীণ ছোঁয়া থাকে। সেইটা দূর করার জন্য ভাবলাম মুনীর চৌধুরী স্যারের মতো অত সুন্দর করে বলা যাবে না, আনিসুজ্জামান স্যারের মতো বলতে পারব কি না; পরে মনে হলো দুজনের মিশ্রণ করতে হবে কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে। সেই চেষ্টা করেছি, কতটুকু হয়েছে জানি না। সেই সময় মুনীর চৌধুরী মীর মানস মীর মশাররফ হোসেনের উপর লেখা বিদেশের লাইব্রেরি থেকে অনেক অংশ টুকে নিয়ে এলেন, পেন্সিল দিয়ে লিখে বা এমনি লিখে নিয়ে এলেন। এবং গবেষণা করা শুরু করে দিলেন। তখন কবিতা লেখা বা গল্প লেখার চাইতে মনে হলো, মুনীর স্যার এত সুন্দর করে সাহিত্যের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে, আনিসুজ্জামান স্যারও একজন গবেষক, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য তার বিখ্যাত বই। সম্ভবত সেইসব কারণেই আমার প্রবন্ধ লেখা এবং গবেষণার দিকে চলে আসা।
রাজু আলাউদ্দিন: একটা জিনিস যেটা জানি, এবং আমার কাছে বেশ ভাল্লাগে, সেটা হলো যে, লোকসাহিত্যের প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ আপানার আগ্রহের এলাকা। এই গোটা এলাকা নিয়ে আপনি লেখালেখি করেছেন। তবে আপনার প্রধান পরিচয়, আপনি একজন লোক গবেষক, লোক সংগ্রাহক।
শামসুজ্জামান খান: আমার নিজের আগ্রহটা কিন্তু সব থেকে বেশি গবেষণায় এবং প্রবন্ধে। তারপরে ফোকলোর।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যে শিক্ষকদের কথা উল্লেখ করলেন, এই শিক্ষকরা আপনাকে লেখায় উদ্বুদ্ধ করলেন; বিশেষ করে প্রবন্ধে?
শামসুজ্জামান খান: সরাসরি উদ্বুদ্ধ করেননি। তাদের ব্যক্তিত্ব, বলবার ভঙ্গি, তাদের জানাশোনা এতটাই আকৃষ্ট করেছিল, যার ফলে আমি আনিসুজ্জামান স্যারের মতো প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করি।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু লোকসাহিত্যের প্রতি আপনার আগ্রহের কারণটা কী ?
শামসুজ্জামান খান: এটা আরো অনেক পরের ব্যাপার। একটা নেগেটিভ ব্যাপারকে আমি পজিটিভ ব্যাপারে পরিণত করেছি। প্রথম দিকে লোকসাহিত্যের প্রতি লেখালেখিতে আমার মোটেও আগ্রহ ছিল না। আমি যেহেতু গ্রামে বড় হয়েছি, স্কুল পর্যন্ত পড়েছি, আমাদের লোক-সংস্কৃতি, যেমন যাত্রা, জারি, সারি এসব আমি অনেক শুনেছি। কিন্তু এই নিয়ে সাহিত্য করব এরকম কোনো আগ্রহ আমার ছিল না। জগন্নাথ কলেজ থেকে পাশ করার পর প্রথম চাকরি হলো আমার, এম এ পাশ করার আগেই, মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে। যেহেতু বাংলায় অনার্স ছিল তাই দরখাস্ত পাঠিয়েছিলাম। তো রেজাল্টা বের হলো। পাশ করলাম। ওখানে যখন চাকরি করছি, চারমাস হয়েছে, তখন জগন্নাথ কলেজ থেকে ফোন পেলাম। আমার পিয়ন এসে বলছে, স্যার, আপনার সাথে অজিত কুমার গুহ ফোনে কথা বলতে চান। আমি ফোনে বললাম, স্যার, আদাব স্যার। আমাকে ফোন করেছেন কী জন্য? বলে, জামান তুমি কি আজকে সন্ধ্যায় জগন্নাথ কলেজে জয়েন করতে পারবে? আমি বললাম যে, আপনি বললে অবশ্যই পারব। তখন আমাদের প্রিন্সিপাল, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহেবের আব্বা, আযীমউদ্দিন আহমদ, উনার কাছে গেলাম। বললাম যে, আমাকে তো জগন্নাথ কলেজে আজকে জয়েন করতে বলছেন অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ স্যার, তো আপনি আমাকে স্যার অনুমতি দেন। বললেন, অনুমতি দিচ্ছি তবে একটা নোটিশ দিতে হবে। আপনি একমাস এখানে থেকে তারপর যাবেন। তো তখন যেটা ঘটল, সেটা হলো, আমি একটা দরখাস্ত দিলাম। ওখানে সারাদিন ক্লাশ নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় চলে আসি জগন্নাথ কলেজে। মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় লাগত। এসে জগন্নাথ কলেজে ক্লাশ করি। আবার দিনে গিয়ে হরগঙ্গায় থাকতাম। পুরো একটা মাস আমাকে এইভাবে দুই কলেজে চাকরি করতে হলো। তো জগন্নাথ কলেজে ঢুকেছি, অজিত বাবু বলেছেন বটে, তবে ওখানে একটা নিয়ম ছিল। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেট দেখলেই হবে না, তিনি পড়াতে পারেন কি না এটা দেখতে হবে। এবং পরীক্ষা নেয়ার জন্য ক্লাশে গিয়ে বসে থাকবেন অধ্যক্ষ সাহেব নিজে, অধ্যক্ষ তখন সাইদুর রহমান সাহেব, বিখ্যাত দার্শনিক, উনি বসে থাকবেন, বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে অজিত বাবু বসে থাকবেন, ভাইস প্রিন্সিপাল বজলুর রহমান বসে থাকবেন। এবং ছাত্রদের প্রতিও নির্দেশ দেয়া থাকে যে তোমরা স্যারকে একটু ডিস্টার্ব করবে, স্যার ম্যানেজ করতে পারে কি না আমরা দেখব। তো ছাত্ররা ফ্লোরে পা ঘঁষাঘঁষি করছে, গলা খাকারি দিচ্ছে, নানা রকম তালবাহানা করছে। আমি ক্লাশ নিলাম। এক ক্লাশে ৩৩৩ জন ছাত্র। এতবড় ক্লাশ! ক্লাশ নেয়ার পরে ওনারা তিনজনই বললেন, ভালো করেছ। তোমাকে আমরা নিতে যাচ্ছি। এইভাবে জগন্নাথ কলেজে ঢুকলাম। ওখানে আমি চাকরি করেছি অত্যন্ত আনন্দের সাথে। অজিত কুমার গুহ স্যার ছিলেন আমাদের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট, হাসান হাফিজুর রহমান স্যার ছিলেন তখন, আলাউদ্দিন আজাদ স্যার তখন চলে গেছেন। আব্দুল কাদির সাহেব আছেন। শওকত আলী সাহেব ছিলেন। মির্জা হারুন-অর-রশীদ ছিলেন। তার সামান্য কিছু পরে এলেন রাহাত খান। তারপর এলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। মাহবুব তালুকদার ছিল। সৈয়দ আব্দুল হাদী ছিল। আজহারুল ইসলাম ভূঁঞা, এরা তখন ওই সময় ছিলেন। বেশ একটা ভালো সময় কাটত। আর প্রায়ই অজিত কুমার গুহ তার বাড়িতে আমাদের খেতে যেতে বলতেন। অনীল নামে একটা কাজের লোক ছিল তার বাড়িতে। আমরা গেলেই বলতেন, অনীল, জামান আজকে খাবে, ওর জন্য রান্না করো।
রাজু আলাউদ্দিন: অনেক প্রিয়ভাজন ছিলেন, আপনি তার।
শামসুজ্জামান খান: বলতেন যে-কথাগুলো, অত্যন্ত মূল্যবান। “শিক্ষক হয়েছি, অথচ ভোর চারটার সময় ঘুম থেকে উঠি। চারটার সময় উঠে বই নিয়ে বসি। তারপর যা ক্লাশ নেব, সেটা পড়ি। কোনোদিন না পড়ে ক্লাশে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারিনি। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত পড়ি, পড়ার পর বাজারে যাই। বাজার করে আনি। অনীলের কাছে দিই। তারপর স্নান করে যথাসময়ে কলেজে যাই। এই হলো আমার রুটিন।” এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। পড়তে হবে। না পড়ে ক্লাশে গিয়ে ফাঁকি মেরে এলাম ছাত্রদের। নিজেকেও তো ফাঁকি দেয়া হলো।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার কাছে যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, সেটা হলো, আপনি যখন লোক গবেষণা করেন, লোক সংস্কৃতির মধ্যে যে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এর যে সহাবস্থান– এই ব্যাপারগুলো আপনার প্রবন্ধে আপনি রেফারেন্স হিসেবে নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে দেখা যায়, এটা আরো গুরুত্বপূর্ণ, আপনি যখন আধুনিক লেখকদের সম্পর্কে লেখেন, যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখায় লোকজ উপাদানের যে ব্যবহার, এমনকি নজরুল প্রসঙ্গেও আপনি এই কথা বলেছেন যে, আমাদের সংস্কৃতির ভেতর ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার যে প্রবহমানতা, সেগুলো তাদের মধ্যে কীভাবে এলো, এগুলো নিয়ে আপনি লিখেছে। এইসব কি আপনি এই শিক্ষকদের দ্বারা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়েছেন?
শামসুজ্জামান খান: আমার শিক্ষকরা সবাই অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। তবে ফোকলোর সম্পর্কে কারো কোনো আগ্রহ ছিল না। আমার আসার পেছনে কারণ, বোধহয় আমার রক্তের মধ্যে আছে, আমি বলব। কারণ, আমাদের পরিবারের আদালত খান, উনি ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একমাত্র প্রুটুলিয়া কলেজের মুন্সি। এবং উনি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, সেকালে মুসলিমরা মুসলমান ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে ভাবতে পারত না; অথচ উনি ইংরেজিতে বই লিখেছেন কাশীদাসের রামায়নের উপর। এটা আমি তোমাকে দেখাতে পারব। এর একটা প্রভাব ছিল। আর আমার নানা চাকরি করতেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ওখানে। আচার্য খুবই আদর করতেন তাকে। অর্থাৎ আমার পারিবারিক পরিবেশের মধ্যেও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মনোভাব ছিল। এবং আমার বাবাও ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী। তো এই সবটা মিলিয়েই সম্ভবত অসাম্প্রদায়িকতা আমি পেয়েছি। আরেকটা জিনিস খুঁজে পেলাম এই সাম্প্রতিককালে। মীর মশাররফ হোসেনের চিঠিপত্র বেরিয়েছে, সেখানে লেখা আছে এহলাদাত খান, তিনি যখন বিপদে পড়েছিলেন, টাঙ্গাইলের চাকরি বাকরি নিয়ে মামলা হচ্ছে; পঞ্চাশ টাকা তাকে পাঠিয়েছিলেন। সেকালে পঞ্চাশ টাকা অনেক টাকা। এবং আমার দাদা যিনি ছিলেন আহমদ খান, তিনি কবি কায়কোবাদকে চাকরি দিয়েছিলেন। উনি পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। কায়কোবাদকেও পোস্ট অফিসে চাকরি দিয়েছিলেন। এইসব ব্যাপারগুলোর প্রভাব আমার মধ্যে ছিল। কিন্তু তখনো ফোকলোর সম্পর্কে গভীরভাবে সিস্টেমেটিক্যালি আমার চিন্তা ভাবনা কিছুই ছিল না। তো এরপরে জগন্নাথ কলেজের অবস্থা যখন খারাপ হয়ে গেল, মোনায়েম খানের অত্যাচার তীব্র হলো, তারপরে জগন্নাথ কলেজকে সরকারি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, অজিত বাবুকে নির্যাতন করা হচ্ছে, তিনি হিন্দু বলে তাকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি প্রথমে মতিঝিল কলেজে গেলেন, যেতে বাধ্য হলেন। আমি ভাবলাম যে, এখানে বোধহয় আমাদের আর চাকরি করা যাবে না। কারণ, আমরা মানুষটাই অসাম্প্রদায়িক, একটা মিশ্রিত সংস্কৃতিকে আমরা বিশ্বাস করি। তখন গোলাম মুর্শিদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। তিনি রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলেন। পোস্টটা খালি হয়ে গেল। আমি দরখাস্ত দিলাম। আমরা সাইত্রিশজন ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। আমাকে সিলেক্ট করা হলো। ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন আব্দুল হাই সাহেব, ডক্টর এনামুল হক সাহেব, সৈয়দ আলী আহসান সাহেব, কাজী আব্দুল মান্নান সাহেব। বড় বড় পণ্ডিতরা ছিলেন। তো তারা আমাকে সিলেক্ট করলেন। আমি ওখানে গেলাম। পাঁচ বছর ওখানে অধ্যাপনা করেছিলাম। ওটা আবার আরেকটা জীবন হলো। কৃষির নানা বিষয়ের ধারণা জন্মাল। এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তো আমি বাংলা একাডেমিতে চলে আসলাম। উপ-পরিচালক হিসাবে ফোকলোর ডিপার্টমেন্টে যুক্ত হলাম। আমি যেহেতু অসাম্প্রদায়িক, আমার চিন্তা চেতনায় অসাম্প্রায়িকতাই প্রাধান্য পাবে। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় তখন। বাংলা একাডেমির প্রোগ্রামগুলো আমরা সেক্যুলারিজমের আদর্শে বিন্যস্ত করতাম। কিন্তু যখনই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, তখন আমার উপর খড়গ নেমে আসে। আশরাফ সিদ্দিকী সাহেব তখন পরিচালক। সরকার হয়তো তাকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, একে সংকুচিতভাবে রাখতে হবে। কারণ, আমাদের বর্তমান সরকারের যে আদর্শ এবং নীতি, তার চিন্তা ভাবনা এবং কাজকাম সবটাই ভিন্নমুখী। তো তাকে কী করা যায়! তাকে ডাম করা হোক ফোকলোর ডিপার্টমেন্টে। ওই ডিপার্টমেন্টের যেহেতু কোনো গুরুত্ব নাই, ওখানে থাক, ওখান থেকে কিছু করতে পারবে না। কিন্তু আমার মনে হলো, দেখি, আমি কিছু করতে পারি কি না! তখন আমি ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টা করলাম যে ফোকলোর ব্যাপারটা কী! এখানে যে বিপুল সংগ্রহ ছিল, শহীদুল্লাহ সাহেব, এনামুল সাহেবের সময়ের অনেক সংগ্রহ ছিল, সেগুলোও দেখলাম। দেখে মনে হলো এগুলো নিয়ে কি আধুনিকভাবে কোনো কাজ করা যায় না! যেভাবে এখানে কাজ করা হচ্ছে, আমার তো মনে হয় না এটা ফোকলোর ব্যাখ্যার আধুনিক পদ্ধতি। তখন আমি ডক্টর নওয়াজেশ আহমদের সাথে একদিন আলাপ করলাম। তিনি কৃষি বিজ্ঞানী। উনার ভাই নাইবুদ্দিন আহমদ আমার কলিগ ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং আমরা পাশাপাশি গ্রামের মানুষও। তো নাইবুদ্দিন সাহেব আমাকে একদিন বললেন যে, আপনার জন্য একটা সুখবর আছে। বললাম কী সুখবর? বলল যে, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের ফোকলোর তো সমৃদ্ধ, সে জন্য ওরা একটা গ্রান্ট দিতে চায়। ওদের আগ্রহ ছিল শিল্পকলায় দিবে। কিন্তু আমি বলেছি ওদের দিলে কোনো কাজ হবে না। বাংলা একাডেমিতে শামসুজ্জামান আছে, তাকে দেন। তারা রাজি হলো। ওদের একটা টিম আসবে। আপনি তাদের সাথে কথাবার্তা বলুন। মনজুরে মওলা সাহেব তখন মহাপরিচালক। তাকে আমি বললাম, উনি আগ্রহ দেখালেন বেশ। কিন্তু আগ্রহ দেখিয়ে বললেন, সবটাই ঠিক আছে। আমাদেরও আগ্রহ আছে। কিন্তু ওরা এলে ওদের সাথে আমি এক কাপ চা খাব আর পাঁচ মিনিট কথা বলব। তরপর বাকিটা সব আপনাকেই করতে হবে। তারা চা খেয়ে আমার ঘরে এসে বসল। আমার সম্পর্কে জানল। বাংলা একাডেমির পটভূমিটা জানল। সংগ্রহের ইতিহাস জানল। এখানে কিভাবে কাজ করা যায় জানল। সব জেনে বলল, আমরা নিউইয়ার্ক যাচ্ছি, সেখানে আমাদের অফিস, ওইখান থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। পরে তারা সিদ্ধান্ত জানাল যে বাংলা একাডেমিতে গ্রান্ট দেয়া যায়। এবং তারা একটা কথা বলল যে, এখানে তো ভালো ফোকলোরিস্ট বা কালচার সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞানঅলা কেউ নেই। কথাটা কিন্তু ঠিক। অনেকেই লিখেছেন, কিন্তু তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়াই লিখেছেন। একমাত্র সংস্কৃতি বিষয়ে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছাড়া আর কেউই কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে লেখাপড়া করেননি। তো ওরা ডক্টর জোশির কথা বলল। উনি ইন্ডিয়ান, ইন্ডিয়া থেকে আসবেন। পূর্ব পাঞ্জাব থেকে। তোমাদের সংস্কৃতির সাথে ওদের সংস্কৃতির একটা মিল আছে, সে বুঝতে পারবে। অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। সুশিক্ষিত মানুষ। তার ভাই অন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। উনি এলেন। উনার সাথে আমার কথাবার্তা হলো। উনি আমাকে পছন্দ করলেন যে আমাকে দিয়ে কাজটা হবে। তারপর উনি সালাহ্উদ্দিন সাহেবের সাথে কথা বললেন।
রাজু আলাউদ্দিন: ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দিন আহ্‌মদ?
শামসুজ্জামান খান: হ্যাঁ, ইতিহাসবিদ সালাহ্উদ্দিন আহ্‌মদ। উনি তার সাথে কথা বললেন। স্যার আমার সম্পর্কে ভালো বলেছেন যে, হ্যাঁ, একে দিয়ে কাজটা হবে। তখন আমাদের জন্য গ্রান্ট দেয়ার ব্যপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল। উনি আসবেন তখন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট হিসেবে। সেই সময়ে আমি খোঁজখবর নিলাম, বিশ্বের সবচে’ বিখ্যাত ফোকলোরিস্ট কে কে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড এই দেশগুলো মিলে একটা ফোকলোর ইনস্টিটিউট ছিল। তার পরিচালক ছিলেন লাউরি হংক। প্রথমবার এ্যালান ডান্ডিস এলেন। আর ইন্ডিয়া থেকে হান্ডু এলেন যেহেতু আমাদের সংস্কৃতির সাথে যোগ আছে। আমরা ১৯৮৫ সনে তেইশ দিনের একটা ওয়ার্কশপ করলাম। আমাদের তরুণ যারা আছে, তারা যেন তাত্ত্বিকভাবে ফোকলোরের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। ফ্যাকাল্টি মেম্বর হিসেবে প্রফেসর এ্যালান ডান্ডিস থাকলেন। প্রফেসর হান্ডু থাকলেন। আমাদের এখান থেকে মাযহারুল ইসলাম, আশরাফ সিদ্দিকী, আব্দুল হাফিজ এরাও থাকলেন। আমরা মূলত শিখলাম এ্যালান ডান্ডিসের কাছে। মনসুরউদ্দীন সাহেবকে দিয়ে উদ্বোধন করালাম। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। ফোকলোরের ভালো কাজও করে গেছেন। ডক্টর মাযহারুল ইসলাম, আশরাফ সিদ্দিকী সাহেব আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা পদ-পদবি ইত্যাদিতে ব্যস্ত, ব্যবসায় ব্যস্ত। এ জন্য সিরিয়াসলি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেননি। করলে হয়ত করতে পারতেন। এ্যালান ডান্ডিস এবং মাজহারুল ইসলাম সাহেব ক্লশমেট ছিলেন ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে। এ্যালানের সাথে আমার খুবই সখ্য হলো। আমি তাকে গুরু বলেই মানলাম। আরো একজন গুরু আমার আছে ফোকলোরের। জার্মানির বাউথিংগা। আমি বিভিন্ন সম্মেলনে গেছি, সেই সূত্রে তার সাথে পরিচয় হয়েছে। এদের কাছ থেকে আমি অনেক শিখেছি। এরদ্বারা হলো কি, আমাদের ফোকলোর যে ডাম্প করা ছিল, সেইটা বিশ্বে আমাদের সাহিত্যের চাইতেও বেশি জানাশোনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
রাজু আলাউদ্দন: আমি সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম, আপনাকে এখানে নিষ্ক্রিয় করে রাখার জন্য দেয়া হলেও এটা আপনার জন্য শাপে বর হয়েছে। যেই ফোকলোর ছিল সবচে’ অবহেলিত, সেই ফোকলোর আপনি এখন সবচে’ বেশি আলোচনার জায়গায় নিয়ে গেছেন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
শামসুজ্জামান খান: আমার আগে কেউ না কেউ কিন্তু এই কাজটা করেছিলেন। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের কথা বলতে হবে। ময়মসিংহ গীতিকা কিন্তু এক সময়ে বিশ্বব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই কথাটাও অনেকেই জানতেন। তো এ্যালান ডান্ডিস তাত্ত্বিকভাবে আমাদের শিক্ষা দিয়ে উনি আমাদের বললেন, তোমাদের এখানে কাজ করার জন্য সবচে’ভালো হবে হেনরি গ্লাসি। উনি মেটেরিয়াল কালচারের খুবই বিখ্যাত প্রফেসর। উনি সাধারণ মানুষের সাথে খুব মিশতে পারেন। আমি তাকে অন্তত সাত বার বাংলাদেশে এনেছি। এ্যালানকে একবার। হংকোকে দুইবার। তো উনি সাতবার এসে ফিল্ড ওয়ার্ক করে চমৎকার একটি বই লিখলেন: লাইফ এন্ড আর্ট ইন বাংলাদেশ। যে বইটা পরে বাংলা একাডেমি থেকে অনূদিত হয়েছে। এভাবেই ফোকলোরের সাথে আমার সম্পর্ক। এবং আমি এই চিন্তাধারা থেকেই ফোকলোর সম্পর্কে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। আমাদের এই দেশে যাতে ফোকলোরের একটা ক্যাডার গড়ে তোলে, সে জন্য ট্রেনিং ওয়ার্কশপটা এখনো বজায় রেখেছি। প্রতি বছরই পয়লা বৈশাখে আমরা দুইজনকে নিয়ে আসি। একজন হয়ত ভারতীয়, একজন আমেরিকা থেকে আসেন। এরা এসে সামারিজগুলো করেন। ওই সামারিজ আমরা ওই সময় করি এইজন্য, পয়লা বৈশাখে যে বিশাল মিছিল হয়, এটাও তো ফোকলোরের একটা ব্যাপার। তাই সেইটা সম্পর্কে ধারণা নেয়ার জন্য এবং তাদের দেখানোর জন্য… বাংলাদেশ সম্পর্কে যেন তাদের উচ্চ ধারণা হয়, সেক্যুলার মাল্টিকালচারের একটা পরিবেশ আছে। না হলে হিন্দু-মুসলিম-বৈদ্ধ-খৃস্টান সবাই মিলে নববর্ষ একসাথে পালন করে কিভাবে! এদের জাতিসত্তার বিকাশের ক্ষেত্রে এইটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এবং এটা করায় যেটা হয়েছে, জামদানিকে আমরা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যে স্বীকৃত করাতে পেরেছি। আমরা বাংলা একাডেমি থেকে ফাইল তৈরি করে দিয়েছি। অন্যরা পারেনি। শিল্পকলা দিয়েছিল, হয় নাই। জাদুঘর দিয়েছিল, হয় নাই। আমাদের হয়েছে। এবং মঙ্গল শোভাযাত্রা, এটাও স্বীকৃতি পেয়েছে।
রাজু আলাউদ্দন: বাহ! এটাও কিন্তু বিশাল অর্জন।
শামসুজ্জামান খান: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে আছি বলেই আমরা এই কাজটা করতে পেরেছি। আমার সঙ্গে ডক্টর ফিরোজ মাহমুদ, শাহিদা খাতুন এরা আছেন। এক সময় মোহম্মদ সাইদুল ছিলেন। আরো অনেকেই ছিলেন। সবটা মিলিয়ে আমরা এখন একটা জায়গায় পৌঁছেছি। আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, চীন এমন বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আছে আমাদের।
রাজু আলাউদ্দিন: ফোকলোরের বাইরেও আপনার একটা প্রধান এলাকা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি। পাশাপাশি ইতিহাস বিষয়েও আপনি বেশকিছু কাজ করেছেন। যেমন আপনি নিজেই মুক্তবুদ্ধি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রনীতি প্রবন্ধে বড় একটা উদাহরণ দিয়েছেন যে আমাদের এই অঞ্চলে গণতন্ত্র চর্চার যে নমুনা ছিল, এই ভূখণ্ডের মানুষ যে অষ্টম শতকেই গণতান্ত্রিকভাবে একজন রাজা নির্বাচন করেছিল, তার গুরুত্বও ঐতিহাসিক দিক থেকে দেখতে গেলে সামান্য নয়। এবং সাধারণ মানুষ যাকে রাজা নির্বাচন করেছিল তার নাম ছিল গোপাল।
শামসুজ্জামান খান: গোপাল ছিলেন পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। এটা লক্ষ রাখতে হবে, তাকে সাধারণ মানুষ একজন সৎ মানুষ হিসেবে নির্বাচন করেছিল। নিশ্চয় তিনি সুশাসক হিসেবে এই পাল রাজবংশের গোড়াপত্তন করেছিলেন, যার ব্যাপ্তি ছিল চারশ বছর। পাল রাজবংশের সময়ে, আমাদের এই অঞ্চলের নাম হয়ত তখন বাংলা ছিল না, সেই জায়গায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির যে বিকাশ ঘটেছে, সেটি একটা বিশাল ব্যাপার ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: এই উদাহরণটা দেয়ার কারণ হলো যে, প্রাচীন যুগ থেকেই যদি গণতন্ত্রের প্রতি, সৎ মানুষের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের আগ্রহ থেকেই থাকে, তাহলে আমরা সেই ঐতিহ্যটা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি? বা সেটার এখন পরিবর্তন কেন ঘটছে?
শামসুজ্জামান খান: গোপালের ব্যাপারটা আমি নোবেল বিজয়ী বাঙালি অমর্ত্য সেনের কাছ থেকে অনেকটা জানতে পারি। তার আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়া, সেখানে এই প্রসঙ্গটা আছে। আমার সম্পর্কে দু’খানি বই বেরিয়েছে। তার একটি হলো ফোকলোর ইন কনটেক্সট এস এজ ইন অনার অব শামসুজ্জামান খান। এখানে উনার একটা লেখা আছে। এছাড়া বহু বিদেশি পণ্ডিত আমাদের ফোকলোর নিয়ে ভাবে। তারা আমাদের এটাকে বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ কোনো ব্যাপার মনে করে, তা কিন্তু না। এট ইন্টেলেকচুয়াল ডিসকোর্সের একটা অংশ হয়ে গেছে। ফোকলোর এবং লিটারেচারের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে খুব একটা পার্থক্য নেই। বাইরের দেশে যে কোনো সম্মেলনে ফোকলোরিস্টরাও যায় আবার সাহিত্যিকরাও যায়। আমাদের এখানে বিভাজনটা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এই বিভাজনটা তো আসলে ঠিক না।
শামসুজ্জামান খান: না ঠিক না। ইশিগুরো যে নোবেল পেল, সেও কিন্তু ফর্মগুলো ভেঙে দিচ্ছে। এখন ফোকলোরের সাথে নানা বিষয় যুক্ত হচ্ছে। সাইক্লোজি ছাড়া ফোকলোর হবে না। হিস্ট্রি ছাড়া হবে না। জিওগ্রাফি ছাড়া হবে না। এই রকম একটা ব্যাপার দাঁড়িয়ে গেছে। তুমি প্রশ্ন তুলছিলে যে গণতন্ত্রের সেই যে প্রবণতা, ওই প্রবণতা একদিক থেকে আছে বলে আমি মনে করি। চিন্তা করে দেখ, আমাদের এখানে চুয়ান্নর যে নির্বাচনটা হলো, তার জন্য কত সংগ্রাম করতে হয়েছে। একুশে প্রাণ দিতে হয়েছে। নানা রকম সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চুয়ান্নার নির্বাচন হয়েছে। বিপুল মানুষ অংশগ্রহণ করেছে, যাতে ভোটে একটা সরকার হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানি স্বৈরশাসকেরা সেটাকে টিকতে দেয় নাই। গণতন্ত্র হতে দেয় নাই। এরই ধারাবাহিকতায় সত্তরের যে নির্বাচন হলো, সেটাও গণতান্ত্রিক মানসের পরিচয়। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক মানস নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। মৌলবাদি শক্তির বিশাল বিকাশ ঘটে গেছে। স্বাধীনতার পরে দেশের আনাচে কানাচে এত মাদরাসা হয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষার বিরুদ্ধে আমাদের বক্তব্য নাই, কিন্তু সেই শিক্ষা থেকে আগে কারা বের হতো? মাদরাসা থেকে বের হয়েছেন ওবাইদুল্লাহ আল উবাইদী, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নানা। তিনি রাজা রামমোহন রায়ের যে মেইন বই, তুহফাতুল মুমিনীন, বিশ্বাসীদের জন্য উপহার, এই জাতীয় নাম, বইটার কিন্তু ইংরেজি অনুবাদ করতে দেয়া হয়েছিল ওবাইদুল্লাহ সাহেবকে। এটা কিন্তু লক্ষ করার মতো। মাদরাসায় পড়া একজন পণ্ডিত, রাজা রামমোহন রায় জানতেন, উনার পক্ষেই এটা করা সম্ভব। তিনি ফারসিও জানেন, ইংরেজিও জানেন। আমাদের শওকত ওসমান, মাদরাসার। আমাদের আবু জাফর শামসুদ্দীন, তিনিও মাদরাসার। আমাদের জহির রায়হান এবং শহীদুল্লাহ কায়সার, তারাও মাদরাসার। আমাদের কুদরৎ-ই-খোদা মাদরাসার। ইনারা কেউ কি ধর্মান্ধ ছিলেন? কেউ কি মৌলবাদি ছিলেন? ছিলেন না। বরং মানুষকেই প্রধান বলে বিবেচনা করতেন। যেটা বলেছিলেন, চতুর্থদশ শতকের অজ্ঞাত কবি। যদিও অনেকে বলে, এটা চণ্ডীদাসের লেখা, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” কিন্তু চণ্ডীদাসের রচনায় ওটা আমরা পাই না। অতএব লোকজ চিন্তুাধারা এবং আধুনিকতা আমাদের মতো করে কিন্তু এখানে ছিল। লালনের ভেতরেও সেটা দেখি। মানুষ ভজলেই সোনার মানুষ হবি। গণতান্ত্রিক চেতনাটা ছিল। কিন্তু তাকে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে এই যে বললাম, এত মাদরাসা, সেখানে প্রকৃত শিক্ষা দেয়া হয় না। অথচ এই মাদরাসা শিক্ষিত আদালত খানই কিন্তু অনুবাদ করেছেন কাশীদাসের রামায়ন। আগে তো এই রকম একটা অবস্থা ছিল। সংস্কৃতির মিলন, মানুষে মানুষে মিলন, সেই জায়গাটায় নানাভাবে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য এত মাদরাসা এবং তাতে একেবারেই প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা। এটা আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এই প্রসঙ্গে আপনাকে বলি, বাংলাদেশে এখন ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা, বাংলা মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা, আরবি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা। এতগুলো শিক্ষাব্যবস্থা আপনার কি মনে হয় না এটা এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে?
শামসুজ্জামান খান: এটা কোনো মতেই চলতে দেয়া উচিত না। এখানে প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাই চর্চা করা উচিত। পরবর্তীকালে একটা বিদেশি ভাষা শিখতে হবে। যেহেতু আমাদের এখানে অন্য কোনো ভাষার উপযুক্ত অবকাঠামো নাই, ইংরেজি শেখারই অবকাঠামো আছে। এখন পর্যন্ত গ্রামগঞ্জে ইস্কুলে ইংরেজি পড়ানো সম্ভব। ফরাসি পড়ানোর অবকাঠামো নাই। স্প্যানিশ পড়ানোর অবকাঠামো নাই। এমনকি আরবিরও অবকাঠামো নাই। সেই জন্য ইংরেজিটা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিখতে হবে। এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে একটি বিদেশি ভাষা লাগবেই। সেটা ফরাসি ভাষা হতে পারে। স্প্যানিশ ভাষাও হতে পারে। এই দুটি বেশি প্রচলিত। আরবিও মোটামুটি চলে। কিন্তু এই দ্বিতীয় ভাষাটিকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি না। অথচ পশ্চিমবঙ্গ, শুধু পশ্চিমবঙ্গ না, গোটা ভারতেই মাতৃভাষা তো বটেই হিন্দিটাও ভালো করে জানে। তার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি এত সুন্দর করে বলতে পারে, যেন এটাও ওদের মাতৃভাষা। ওরা অনেক এগিয়ে গেছে। আমি একটা উদাহরণ দিই। আমাদের এখানকার সাহিত্য অত্যন্ত উঁচু মাপের সাহিত্য। আমাদের এখানে ছ’সাতজন সাহিত্যে নোবেল পেতে পারত। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় পেতে পারতেন। মানিক বন্দোপাধ্যায় পেতে পারতেন। জীবনানন্দ দাশ পেতে পারতেন। নজরুল পেতে পারতেন। অমিয়ভূষণ মজুমদার পেতে পারতেন। সতীনাথ ভাদুড়ী পেতে পারতেন। কিন্তু ভালো অনুবাদক নেই বলে হয় না। ইংরেজি ভাষার জন্য কায়সার হক আর ফখরুল আলম, এই দুজন ছাড়া পাই না। অথচ কলকাতাতেই অন্তত পাঁচশ থেকে সাতশ অনুবাদক আছেন, যারা ভালো অনুবাদ করতে পারেন। এক্ষেত্রে আমাদের সাহিত্যে আন্তর্জাতিক পরিচিতি তেমন পাচ্ছি না।
রাজু আলাউদ্দিন: অনুবাদ বিষয়ে আমার আলাদা প্লান আছে। সে বিষয়ে আমি পরে কথা বলব। একটা জিনিস, সেটা হলো যে, আপনি উল্লেখ করেছেন, এবং আমরা সেটা জানিও, মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের নবযুগের সূচনা হয়েছে। বাংলা চর্চার জন্য ব্যাপকভাবে তারা উদ্বুদ্ধ করেছেন। আবার আমরা উনিশ শতকে যখন আসি, তখন কিন্তু দেখা গেল, এই মুসলমানরা শাসক না, মুসলমান একটা শ্রেণি বাংলাবিমুখ হয়ে গেল। এই ভাষাচর্চার জন্য তারা সেভাবে নজরই দেননি। এইদুটো পরস্পর বিরোধী বিষয়কে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
শামসুজ্জামান খান: এটার ব্যাপার হলো, চতুর্দশ শতাব্দি থেকেই কিন্তু ভারতবর্ষে সুলতানরা চেষ্টা করতে লাগে যে, এখানকার সংস্কৃতির ভেতর একটা ঐক্য সৃষ্টি করা। শাসন করতে গেলে সাংস্কৃতিক ঐক্য না থাকলে রাজ্যে নৈরাজ্য দেখা দেবে। নানা রকম বিভেদ দেখা দেবে। নানা রকম সমস্যা দেখা দেবে। হয়ত সেই রাজনৈতিক প্রয়োজনেই এবং রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকেই তারা মিলিত সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করল। সে জন্য আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই দুইজনের ভূমিকা অসাধারণ। তারা অনুবাদ সাহিত্য চালু করেন। মানে ভারতীয় ক্লাসিক সংস্কৃত ভাষায় কিংবা অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা তারা করলেন। তার আরো কিছু পরে ষোল সতেরো শতাব্দিতে দারাশিকো উপনিষদের অনুবাদ করলেন। সুলতানদের এই ধারা অব্যাহত ছিল। সুলতানরা বাংলাকে শুধুমাত্র প্রচলনই করেননি, বরং বাংলাভাষাকে প্রায় ইংরেজি ভাষায় পরিণত করলেন। সে জন্য মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশাহদের কাছে তারা কটূকথা, ভর্ৎসনাও শুনেছেন। আমার এখানে মনে হয়, তারা এটা করলেন বাস্তব বুদ্ধিতে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যেমন, ঠিক তেমনিভাবে রাজা গণেশের একটা প্রভাব ছিল। রাজা গণেশ যেহেতু স্থানীয়, তিনি চাইলেন বাংলাভাষার প্রচার প্রসার। সে কারণে বাংলাভাষার প্রচার প্রসার শুরু হলো। এবং এর ফলে আমরা পঞ্চদশ শতাব্দি থেকে ষোলশ শতাব্দিতে গিয়ে দেখলাম, বাংলা সাহিত্য একটি উন্নত সাহিত্যের পর্যায়ে প্রায় পৌঁছে গেছে। ওই সময় প্রায় শতাধিক কবি এলেন। আরাকান রাজসভায় এলেন দৌলত কাজী, আলাওল, শাহ মোহাম্মদ সগীর, মাগন ঠাকুর, সৈয়দ সুলতান, এরা এলেন আর কি। কিন্তু এলেন বটে, তবে ওই মোগল শাসনের মুখোমুখি তারা হলেন। ওই সময় এই অঞ্চলের সামান্তসমাজের মধ্য থেকে একটা মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে। তারা বাংলার পক্ষে না গিয়ে তারা চাইল উর্দু বা ফারসি ভাষায় মুসলমানরা কথা বলবে। আর নওয়াব আব্দুল লতিফ পরবর্তীকালে বলেছে, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা উর্দু। বা ফারসিও তারা বলতে পারে। আর নিম্নবিত্তের গরিব যারা আছে তারা বাংলা বলুক। এ রকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। সৈয়দ সুলতান এত উন্নত সাহিত্য সৃষ্টি করার পরেও তাকে মুনাফেক আখ্যা দেয়া হলো। কারণ, ফাতিহা-ই-ইয়াজ দহম, এই বিষয়ে তিনি বাংলায় একটা কবিতা লিখেছিলেন। বাংলায় লেখার কারণে তাকে মুনাফিক আখ্যা দেয়া হলো। তিনি তখন কী অসাধারণ বিদ্রোহী কথা বললেন! বিদ্রোহ কিন্তু সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছে। “যারে যেই ভাষে প্রভু করিলে সৃজণ, সেই ভাষ হয় তার অমূল্য রতন।” কী অসাধারণ কথা! বাঙালি জাতিসত্তা এবং বাংলাভাষার বিকাশ একই সঙ্গে তখন শুরু হয়ে গেল। কিন্তু তার একশ বছর পরেও দেখছি এই সমস্যার সমাধান হয়নি। বাংলাভাষার বিরোধী লোকেরা আরো বেশি কঠোর হয়ে উঠেছিল। তা না হলে কেন আব্দুল হাকীম বলবেন: যে জন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী…
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার লেখাতে এটা উল্লেখ করেছেন, সুলতানরা শুধুমাত্র বাংলাভাষার চর্চাকে উৎসাহিতই করেনি, তারা এমনও বলেছেন, আপনি নিজে লিখেছেন, বাঙালি জাতি বাঙালিত্ব নিয়ে এক ধরনের অহঙ্কারও করেছে সুলতানের আমলে। সে জন্য শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে শাহে বাঙ্গালিয়ান বলে ঘোষণা করে। শাসক হয়েই যখন, অর্থাৎ অবাঙালি হয়েই যখন বাঙালি পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন, সেখানে বাঙালি হয়ে উনিশ শতকের মানুষেরা…
শামসুজ্জামান খান: এর আগে একটা কথা বলে নিই। এই কারণেই বঙ্কিমচন্দ্রকে যারা সাম্প্রদায়িক বলে আমি কিন্তু তাকে সাম্প্রদায়িক বলে মনে করি না। তার কারণ হলো সুলতানরা এই যে কাজটা করল, শাহে বাঙালিয়ান বলল, বাঙালিত্বের বিকাশ ঘটাল, সে জন্য বঙ্কিম তার প্রবন্ধে বলেছেন, আমি মোগলদের পছন্দ করি না। তারা এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদী, যদিও প্রাথামিক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী। আর এই সুলতারা ছিলেন দেশপ্রেমিক। তারা বাঙালিত্বের বিকাশ ঘটিয়েছেন। এবং বিদেশি শাসকরা যারাই ভারতে এসেছে, তার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বর্পূ হলো চতুর্দশ পঞ্চদশ শতকের বাংলার সুলতানেরা। এতটাই কৃতিত্ব তাদের দিয়েছেন। উনবিংশ শতাব্দিতে এসে যে সঙ্কটটা দেখা দিল– ফারসি না ইংরেজি? এই সমস্যা দেখা দিল। তো ইংরেজি পড়বে না। নাসারা ভাষা। ওই মৌলবিরা, ফান্ডামেন্টালিস্টরা, নাসারা ভাষা– ওইটা পড়লে বেহেশতে যাওয়া যাবে না। ওইটা পড়া ঠিক হবে না। এই বলে তারা ইংরেজি ভাষা শিখতে দিল না। এবং ইংরেজি ভাষাটা শেখার ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বেঙ্গল রেনেসাঁ শুরু হয়ে গেল। মাইকেল মধুসূদন এলেন। রাজা রামবসু এলেন। অক্ষয় দত্ত এলেন। বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের রেনেসাঁ হলো। সেই রেনেসাঁকে আমরা খণ্ডিত রেনেসাঁ বলি। বাঙালি মুসলমান সমাজ নাই। গ্রামের মানুষ তারমধ্যে নাই। শুধুমাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক বিশেষ একটা বিদ্বান শ্রেণি গড়ে উঠল।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু প্রশ্ন হলো যে, বাঙালিদের মধ্যে এই হীনম্মন্যতা কেন জন্ম নিল বলে আপনি মনে করেন? এই যে ইংরেজি ভাষা শিখবে না…
শামসুজ্জামান খান: ধর্মীয় ভাষাটাকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণে। কিন্তু নিম্নশ্রেণির মানুষ, তারা তো বাংলা চায়। কৃষক, শ্রমিক তারা বাংলা চায়। কিন্তু তাদের তো সেই ভয়েস নেই। নওয়াব আব্দুল লতিফের যে ভয়েস আছে, সেই ভয়েস তো ওদের নাই। যে জন্য মাইকেল বলেছেন যে, আমাদের তো এক ধরনের রেনেসাঁর মতো হলো কিন্তু বাঙালি মুসলমানেরা হতে পারল না। পশ্চিমবঙ্গে একজন লোক ছিলেন, মুসলমান, তিনি ইংরেজিতে বই লিখেছিলেন; বইতে মাতৃভাষার গুরুত্বের ব্যাপারে লিখেছেন, কিন্তু লিখেছেন ইংরেজি ভাষায়। তার বই আমরা বের করেছি। নামটা ভুলে গেছি এই মুহূর্তে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবার আরেকটা প্রসঙ্গে আসি। আপনি নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন। রাষ্ট্র নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ– এই শিরোনামের একটা লেখায় বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা কী, খুব স্পষ্ট করে আপনি বিষয়টা উল্লেখ করেছেন। এখানে আপনি বুদ্ধিজীবীর যে ভূমিকা এবং বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, ওই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আপনি কি মনে করেন, ঠিক আমাদের এই সময়ে ওই রকম বুদ্ধিজীবী আছে?

“এই সমালোচনা না করাটা তো অনৈতিক। নিজের দলের কোনো সমালোচনা করব না, অন্যদের করব– তাহলে তো সে পার্সিয়াল হয়ে গেল। পার্সিয়াল হয়ে সে আর তখন বুদ্ধিজীবী থাকে না।”

শামসুজ্জামান খান: ধারে কাছেও নেই। বুদ্ধিজীবী বিষয়ে চমস্কির একটা বই আছে। ওই বইটা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। সেই সঙ্গে পার্থ চ্যাটার্জি, গৌতম ভদ্র, এদের লেখাও আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। সেখান থেকে দেখেই লিখেছিলাম। আমাদের এখনকার বুদ্ধিজীবীরা হয় সরকারের একেবারে ধামাধরা হয়ে গেছে অথবা উল্টাপাল্টা কথা বলছে। একটা কথা আছে, মাওলানা রুমীর বোধহয়, একটি দেশে সুস্থ এবং আধুনিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় যখন রাজনীতিবিদরা বুদ্ধিজীবীদের পেছনে পেছনে ঘোরে। আর যখন বুদ্ধিজীবীরা রাজনীতিবিদদের পেছনে ঘুরবে, বুঝতে হবে সাংস্কৃতিক অধপতন ঘটে গেছে। আমাদের এখানে প্রায় সাংস্কৃতিক অধঃপতনের পর্যায়ে চলে গেছে। বঙ্গবন্ধু কোনো দিন কোনো বুদ্ধিজীবীকে ডেকে পাঠাননি। একবার মোজাফ্ফর অাহমদ চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ করে কী এক বিষয়ে আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আলাপ করবেন, কেউ বলছিল আপনি তাদেরকে ডেকে পাঠান। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুমি কী বলো! উনাকে আমি ডেকে পাঠাব! আমি উনার কাছে যাব। এই পার্থক্যটা হয়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে অক্টাবিও পাজের একটা চমৎকার উক্তি ছিল। তিনি বলেছেন, আমি সেই লেখকদের বেশি প্রশংসা করি, যিনি নিজের দল, প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করার নৈতিক সামর্থ্য রাখেন।

“শেখ মুজিব হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। আরেকটা হলো শামসুর রাহমান সই করেননি। তো কেউ একজন, হয়ত ইলিয়াস ভাই বলেছিলেন, শামসুর রাহমান তো সই করেনি, উনি বলেছিলেন, সবাইকে কেন আমার রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতে হবে! শামসুর রাহমান আমাদের আত্মীয়। উনি যদি সই না করেন, তাহলে বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাকে আমি প্রশংসাই করি। এখনকার রাজনৈতিক নেতা হলে কী বলবেন! ও আমাদের প্রশংসা করল না, ও আমাদের না। ও অন্য দলের। ”

শামসুজ্জামান খান: এই সমালোচনা না করাটা তো অনৈতিক। নিজের দলের কোনো সমালোচনা করব না, অন্যদের করব– তাহলে তো সে পার্সিয়াল হয়ে গেল। পার্সিয়াল হয়ে সে আর তখন বুদ্ধিজীবী থাকে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আর একজন লেখক, শিল্পী বা বুদ্ধিজীবী সে তো কোনো দলের হতে পারে না। সে গোটা জাতির। গোটা সমাজের। দলের হলে তো সবসময় স্বার্থকেন্দ্রিক একটা বৃত্তের ভেতর থাকতে হবে। ফলে একটা দলের যখন আপনি মুখপাত্র হয়ে উঠবেন, প্রোপাগাণ্ডাইস্ট হয়ে উঠবেন, তখন বুদ্ধিজীবী হিসেবে সেই ভূমিকাটা আর থাকে না আর কি। তো এটা দুঃখজনক, আপনি যেটা বললেন, ওই ধরনের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্কটের ভেতর আছি আমরা।
শামসুজ্জামান খান: আমি একটা উদাহরণ দিই। বঙ্গবন্ধু কিন্তু এই ব্যাপারে অনেক উদার ছিলেন। ওই যে বললাম, উনি যখন বললেন, স্যার কেন আমার কাছে আসবে, আমি যাব। আরেকটা হলো, উনি যখন বাকশাল করলেন, বাকশাল করার সময় সই আনার জন্য অনেকের কাছে যাওয়া হয়েছিল। যেমন এনামুল হক সাহেবের কাছে যাওয়ার পরে এনামুল হক সাহেব বলেছিলেন, আমি তো ভাইস চ্যান্সেলার, আমার এখানে সই করা ঠিক হবে না। তবে একটা কথা আমি বলতে পারি, শেখ মুজিব হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। আরেকটা হলো শামসুর রাহমান সই করেননি। তো কেউ একজন, হয়ত ইলিয়াস ভাই বলেছিলেন, শামসুর রাহমান তো সই করেনি, উনি বলেছিলেন, সবাইকে কেন আমার রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতে হবে! শামসুর রাহমান আমাদের আত্মীয়। উনি যদি সই না করেন, তাহলে বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাকে আমি প্রশংসাই করি। এখনকার রাজনৈতিক নেতা হলে কী বলবেন! ও আমাদের প্রশংসা করল না, ও আমাদের না। ও অন্য দলের।
রাজু আলাউদ্দিন: বুদ্ধিজীবীর বিষয়টা পরিষ্কার করার পর আপনি আরেকটা বিষয় বলেছেন। সেটা হলো বিপ্লব। আমরা কোনটাকে বিপ্লব বলব, কোনটাকে বলব না, যেমন ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব দিবস হিসেবে দাবি করা হয়, সেটা কেন বিপ্লব না, তার একটা চমৎকার ব্যাখ্যা আপনি দিয়েছেন। এটা নিয়ে আপনার একটা লেখা আছে। লেখাটা আমার ভালো লেগেছে। এই বিষয়ে আপনার নতুন কিছু সংযোজন করার আছে?
শামসুজ্জামান খান: কথা তো ওটাই। আমি দেখব, আমরা কি সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট অর্জন করছি। এনলাইনমেন্ট অর্জন করছি। এবং সবচে’ বড় কথা, সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থায় উন্নতির কোনো পরিকল্পনা সেখানে আছে কি না। যদি সেটা থাকে তাহলে সেটা বিপ্লব হতে পারে। তা না হলে তো সেটা বিপ্লব না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কি মনে পড়ে, আপনার একটা প্রবন্ধ ছিল: ‘আসল মুরতাদ কে?’
শামসুজ্জামান খান: আহমদ শরিফ সাহেবকে যখন মুরতাদ ঘোষণা করা হলো, তখন এমন একটা ব্যাপার দাঁড়াল, যারা স্যারের সঙ্গে নিয়মিত তার বাড়িতে যেতেন, বা তিনি যখন মাঠে হাঁটতেন, তখনো তার সঙ্গে অনেকে আড্ডা দিতেন। কিন্তু মুরতাদ ঘোষণার পর একটা লোকও এগিয়ে এল না। আমি আর বাংলা একাডেমিতে নুরুর ইসলাম বাঙালি বলে একজন ছিল, এই দুইজনই তার পক্ষে দাঁড়ালাম। এবং আমি ওই লেখাটা লিখেছিলাম। আমিও অবশ্য স্বনামে বেশি লিখতে পারিনি। কারণ, আমার বিরুদ্ধেও তখন অনেক ক্ষোভ। তবে আমি এটাকে আসল বিপ্লব বলি, ইসলামের ব্যাপারে এবং বাঙালির অধিকারের ব্যাপারে আহমদ শরিফের চাচা আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ যা করেছেন বা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী যা করেছেন বা আহমদ শরিফ যা করেছেন– অন্য কোনো মুসলমান তা করতে পারেনি। এবং একালে কোনো মৌলবির পাঠযোগ্য কোনো লেখাই আমরা পাই না। অথচ আগে মাদরাসা শিক্ষার মধ্য থেকে বা ধর্মীয় শিক্ষার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসাদের কাছ থেকে অনেক বই-পুস্তক পেয়েছি। মাওলানা আযাদ, তিনি তার প্রমাণ দিয়েছেন ইসলাম থেকেই।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি বলছিলেন, বাইরের দেশগুলোতে ফোক এবং আধুনিক সাহিত্যকে আলাদা করে দেখা হয় না।
শামসুজ্জামান খান: হ্যাঁ। এটা আলাদা নেই। এটা সেইম ইন্টেলেকচুয়াল ডিসকোর্সের অন্তর্ভূক্ত।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং আপনি মাইকেল বিষয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। শিরোনাম ছিল মাইকেল: লৌকিক উৎস থেকে নবনির্মাণ। সেখানে আপনি বলেছেন, হিন্দু পুরাণ ও শাস্ত্রকে অগ্রাহ্য করে রাবণকে মহিমাময় ও রামকে ম্লান করার জন্যে মাইকেল নিন্দিত হয়েছিলেন। এমনকি তরুণ রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এক সময় এই নিন্দাবাদে সোচ্চার ছিলেন। এই যে উনি পরিবর্তন ঘটালেন পুরাণের, এই পরিবির্তনের পেছনে আপনি বলেছেন, লোক উপাদানের প্রভাব তার উপর ছিল।
শামসুজ্জামান খান: চর্যাপদের কবিরাই তো বিদ্রোহী। ওই সময়েই বিদ্রোহী। সৈয়দ সুলতান মধ্যযুগে বিদ্রোহী। সপ্তদশ শতকে আব্দুল হাকীম বিদ্রোহী। এরা কিন্তু সমাজের খুব প্রভাবশালী লোক ছিল না। এরা বিদ্রোহটা করেছে। লালনকে তো লাঠি ধরতে হয়েছে। মৌলবাদিরা বাউলদের চুল কেটে দেবে। ফতোয়া দেবে, ধর্ম নষ্ট হয়ে গেছে, বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, এইসব কারণে।
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুল ইসলাম সম্পর্কেও আপনি এই ধরনের কথা বলেছেন। তার মধ্যেও লোক উপাদানের প্রভাব ছিল। উদাহরণ হিসেবে আপনি বলেছেন, লালনের বিচারের যে ধারালো যৌক্তিকতা, বা দুর্দশায় হিতকামী ঈশ্বনকে খান্না শয়তানের সঙ্গে তুলনা করা, এই রকম আরো উদাহরণ, চণ্ডীদাস থেকে আপনি উদাহরণ দিয়ে আপনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, নজরুলের কবিতার মধ্যে আমরা মানবিকতার যে বন্দনা পাই, সেগুলো লোকজ উপাদান থেকে এসেছে।
শামসুজ্জামান খান: নজরুলের মধ্যে লোকজ উপাদান থেকেও আসছে, আবার হিন্দু পুরাণ থেকেও আসছে আবার গ্রিক থেকেও আসছে। পুরাণটাকে ক্লাসিক ধরা হয়। কিন্তু পুরাণের মধ্যে তো আবার একটা অংশ বিদ্রোহী।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এই সূত্রে বলা যেতেই পারে যে-কোনো প্রধান কবি তার লোক ঐতিহ্যকে ধারণ করেন এবং তার নবরূপায়ন ঘটান।
শামসুজ্জামান খান: আমি এটা গভীরভাবে মনে করি। আমি এখানে ইয়েটসের কথাও বলব। ইয়েটসও বড় মাপের কবি। তিনি আয়ারল্যান্ডের লোকজ উপাদান সংগ্রহ করেছেন, এবং গভীরভাবে কাজ করেছেন। ওই জায়গায় যেতে না পারলে তার পক্ষে ক্লাসিক রচনা, উন্নত কিছু রচনা করা সম্ভব হতো না। আমি মনে করি, আমাদের দেশে যে ক্লাসিক একটা উপন্যাস হলো না, মহাকাব্যিক একটা উপন্যাস হলো না, কেউ লিখতে পারলেন না, তার কারণ হলো, তারা সমাজের উপরি কাঠামোর ব্যাপারটুকুই জানেন। ফোকের মধ্যে হলো গোটা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির শাঁস থাকে, খুব বিচিত্র বিষয় থাকে। সেইটা আনতে পারলে তলস্তয় হওয়া যায়। সেইটা আনতে পারলে দস্তয়েভস্কি হওয়া যায়। শেক্সপিয়র, শেক্সপিয়রে প্রচুর লোকজ ঐতিহ্য আছে। জীবনানন্দ দাশের মধ্যে প্রচুর আছে। বেহুলা থেকে শুরু করে কত বিষয় তার মধ্যে এসে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুল প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র আর ঈশ্বরগুপ্তকে নিয়ে যে প্রবন্ধটি আপনার আছে, ‘খাঁটি বাঙালি কবি’ আপনি নজরুলকে বলছেন না, আপনি বলছেন ‘বাঙালি কবি’। খাঁটি বাঙালি কবি হিসেবে আপনি নজরুলকে দাবি করছেন না, কারণ, একটা বিপদ আছে। বিপদটা বঙ্কিমই তৈরি করে গেছেন। বিপদটা হলো যে, ঈশ্বরগুপ্ত সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, “খাঁটি বাঙালি কবি। তবে এখন আর খাঁটি বাঙালি আমাদের দরকার নাই। খাঁটি বাঙালিকে দরকার।”
শামসুজ্জামান খান: তারমানে বাইরের বহু প্রভাব নিজের ভেতর নিতে হবে। নিয়ে সেগুলো আত্মস্ত করতে হবে। আমাদের এখানে যোগীরা ছিল। আমাদের এখানে হিন্দু ব্রাহ্মনদের ঐতিহ্য ছিল। মুসলিম ঐতিহ্য ছিল। তারপর সুফিবাদ যখন এল, যোগীদের সাথে, প্রান্তিকদের সাথে সুফিবাদকে তারা মিলিয়ে নিল। তখন নতুন বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে উঠল। সুফিরা যে ওদের সাথে একাত্ম হলো, এটা বিস্ময়কর। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতা, একটা সমাজ সংহতি করার চিন্তা, সেখান থেকেই কিন্তু হলো।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সঠিক। খাঁটি বলে আসলেই কিছু নেই। খাঁটি মানে হচ্ছে কূপমণ্ডুকতাও।
শামসুজ্জামান খান: এখানে হোম এন্ড ওয়ার্ল্ড যদি ধরি, তাহলে হোমের ব্যাপারটা আছে। ওয়ার্ল্ড কিন্তু আমার ঘরে ঢুকে গেছে। আমার আগে যে হোম ছিল, আমি যেটাকে ভালোবাসি, ঈদের সময় সমস্ত লোক গ্রামে চলে যায়। কিন্তু সেই গ্রাম কি আছে? আগে কিছুই ছিল না। এখন গ্রামেও ঘরে ঘরে টেলিভিশন ঢুকে গেছে। রেডিও তো ঢুকেছেই। কম্পিউটার ঢুকেছে। অর্থাৎ এইটা নিতে না পারলে এই দুনিয়ায় আমি অকেজো হয়ে থাকব।
রাজু আলাউদ্দিন: ধর্মনিরপেক্ষতার বোধের উপর আপনার একাধিক লেখা দাঁড়িয়ে আছে। তো আমরা এই ধর্মনিরপেক্ষতাবোধ কেন ক্রমশই হারিয়ে ফেলছি? রাজনৈতিক জায়গাতেও আমরা হারাচ্ছি। আমাদের সাংস্কৃতিক জায়গা থেকেও হারিয়ে ফেলছি। আগে যেটা ছিল, ওই আয়তনে ওই গভীরতায় এখন আমরা আর নাই।
শামসুজ্জামান খান: ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারটা কিন্তু মুসলমানদের অবদান। অনেকে মনে করেন যে ভারতবর্ষে নেহেরু, মাওলানা আজাদ এরাই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করেছেন, মোটেও তা না। ধর্মনিরপেক্ষতা এখানে এসেছে সবুক্তগীনের সময় থেকে। সবুক্তগীনের সময়ে সামান্য পরিমাণে, ইলতুৎমীশের আমলে খুব বড় আকারে হয়েছে। ইলতুৎমিশ যখন শাসন করছেন, তখন তিনি বললেন যে, নতুন একটা দেশে আমরা এলাম, এই দেশে আমাদের ধর্মের প্রয়োগ আমরা কিভাবে করব?
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এক প্রবন্ধে এই বিষয়টা লিখেছিলেন। আপনি গিয়াস উদ্দীন বলবনের উক্তি উল্লেখ করে বলেছেন: আমার প্রভু ইলতুৎমিশ বলতেন যে, সুলতানের পক্ষে ধর্মবিশ্বাস মেনে রাষ্ট্র শাসন করা সম্ভব নয়। ধর্মবিশ্বাস রক্ষা করতে পারাই তাদের জন্য যথেষ্ট। সুলতানের ঘোষিত আদর্শ ছিল ন্যায়বিচার। মধ্যযুগের ভারতে ন্যায়বিচারের অর্থ ছিল সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা। অর্থাৎ, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের অধিকার রক্ষা। অর্থাৎ সমাজ বা ধর্ম সম্প্রদায়ের এক অংশ যেন অন্য অংশের উপর আধিপত্য না করে এমন ব্যবস্থা। আাপনার লেখা থেকেই বললাম।
শামসুজ্জামান খান: এটা চমৎকার কথা না! তারা এটাই করেছিলেন। তারা ঠিক করে নিয়েছিলেন, সুলতান হবেন দীনদার। মানে ধর্মপ্রবণ। কিন্তু রাজনীতিতে অনেক মিথ্যাচার করতে হয়, অনেক কিছু গোপন করতে হয়, সততা থাকে না, তাই তিনি দীনদার হবেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রনীতি হবে জাহানদারি। জাহান মানে দুনিয়া। অর্থাৎ দুনিয়াদারি। দুনিয়াদারি মানেই ইহজাগতিকতা। এটা কিন্তু মুসলমানদের অবদান। ভারতবর্ষ সেই ইতিহাসটা নিয়েছিল, যেটাকে এখন বিজেপি নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কালকেই পত্রিকায় উঠেছে, বিজেপির এক নেতা বলেছেন, মুসলিম স্থাপনার নাম বদলাতে হবে। তাজমহল বাদ দিতে হবে। এবং আরো যতগুলো আছে সব পাল্টে ফেলা হবে। তারপর আওরঙ্গজেবের নামের রাস্তা তো তারা বদলেই ফেলেছে। এটা চলছে। ভারতে খুব ঐতিহাসিক উপলব্ধিগত সিদ্ধান্ত ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া এতবড় রাষ্ট্রকে এক রাখা যাবে না। এবং সুশাসন বজায় রাখা যাবে না। সেই জায়গাটা বিজেপি এসে নষ্ট করছে। এর ফলে সাম্প্রদায়িকতা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি বলছি আমাদের বাংলাদেশে সেই ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ক্রমশ হারিয়ে ফেলার পেছনে কি রাজনীতি অনেকটা দায়ী?
শামসুজ্জামান খান: এই রাজনীতি তো তোষামোদই করে। ধর্মের তোষামোদি করে। মাদরাসা শিক্ষায় কী পাঠ্য হবে, শক্ত হাতে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: মাদরাসার কি আসলে দরকার আছে? কেন দরকার?
শামসুজ্জামান খান: ধর্মীয় শিক্ষার জন্য এটা থাক। আগে কিন্তু ছিল। মাদ্রাজে ছিল। কলকাতায় আলিয়া মাদরাসা ছিল।

“ধীরে ধীরে এমন একটা পর্যায় আসবে, তখন আর মাদরাসা দরকার হবে না।”

রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু ইউরোপে যারা ক্যাথলিক, মানে ক্রিশিচিয়ান, তারা কি মাদরাসার মতো আলাদা করে কোনো স্কুল-টিস্কুল রাখে? তা তো রাখে না। তার মানে কি ওরা অধার্মিক?
শামসুজ্জামান খান: তা রাখে না। কিন্তু এটা যেহেতু চালু হয়ে গেছে… আগে তো মাদরাসার লোকজন ভালো ইংরেজি জানতেন। ভূগোল পড়তে হতো তাদের। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এর প্রবর্তক ছিলেন। ভুগোল পড়তে হবে, ইতিহাস পড়তে হবে, ইংরেজিও পড়তে হবে। সবটাই করতে হবে। সেটা যদি রাখা যায় তো খারাপ হবে না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু সেটা তো বাংলা মাধ্যমেই আছে।
শামসুজ্জামান খান: ধীরে ধীরে এমন একটা পর্যায় আসবে, তখন আর মাদরাসা দরকার হবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে ওটা বলা যাবে না। মানুষকে এতটা ধর্মান্ধ করে দেয়া হয়েছে, এখনই ওটা হবে না। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসা দরকার ছিল সেটা আসেনি। বরং ধীরে ধীরে আরো বেশি ধর্মান্ধতা বেড়েছে। পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এই যে ‘মানুষ থুয়ে খোদা ভজো এই মন্ত্রণা কে দিয়েছে’ আমাদের ময়মনসিংহের লোককবির বলা। কিন্তু সেইটা এখন বলা কঠিন। লালনের একটা গান আছে। সেটা বলা খুব মুশকিল।
রাজু আলাউদ্দিন: না, বলেন। লালনের কথাই তো বলছেন। কথা তো লালনের।
শামসুজ্জামান খান: কয়জন খোদা বাণী পাঠায়? নয়তো একেক যুগে একেক বাণী পাঠায় কেন? এক বাণীই তো পাঠানোর কথা।

“ওই যে দীনদারী আর জাহানদারী, শেখ হাসিনা কিন্তু এটা করেন। তিনি রোজা নামাজ ইত্যাদি সবকিছু করেন। আবার ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখেন তার বিচারমতো। কিন্তু আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেকেই অত উঁচু পর্যায়ে যেতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে তার অনুসারীদের কিছু কিছু অংশ বিচ্যূত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বড় সমস্যা।”

রাজু আলাউদ্দিন: হা হা হা। সেটাই তো। একই খোদা যদি হয়, তাহলে এত ভিন্নরকম বাণী কেন পাঠায়। আরেকটা জিনিস, সেটা হলো যে, একটা রাষ্ট্রকে যদি সাংস্কৃতিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাখতে হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সংবিধানকেও ধর্মনিরপেক্ষই থাকতে হবে, তাই না!
শামসুজ্জামান খান: অবশ্যই থাকতে হবে। এটা জিয়াউর রহমান সাহেব এবং এরশাদ সাহেব করে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের উচিত ছিল এটা পরিবর্তন করা। অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হতো। এটা করে নির্বাচনে যদি হেরেও যেত, কিন্তু এতে তারা জিতে যেত।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা আমিও মনে করি, জামান ভাই। খুব সুন্দর একটা কথা বলেছেন। বুঝি না, এটা কেন উনারা বুঝতে পারছেন না। এই বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, এই বাংলাদেশ কোনো ধর্ম বা সাম্প্রদায়িক স্লোগান দিয়ে স্বাধীন হয়নি। বরং উল্টোটা হয়েছে। একদম ধর্মনিরপেক্ষ জায়গা থেকে যে বাণীটা এল, শেখ মুজিবুর রহমান সেটাকেই প্রধান স্লোগান হিসেবে তুলে ধরলেন। এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও কোনো হিন্দু বা কোনো মুসলমান এ নিয়ে কোনো তর্ক তোলেননি। মুসলমানরা তো বলতে পারত এই স্লোগান মানব না।
শামসুজ্জামান খান: এই যে না বুঝে বানিয়ে নিয়েছে ‘আল্লাহ হাফেজ’। আটশ বছর বাঙালি মুসলমান খোদা হাফেজ বলে এসেছে। খোদা এবং হাফেজ দুটোই ফারসি শব্দ। আরবি আল্লাহ যদি বলো তাহলে হাফেজ বাদ দিয়ে এখানে আরবি শব্দ বসাও। তা তো বসাচ্ছ না।
রাজু আলাউদ্দিন: আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জন্ম এবং উত্থানের পেছনে প্রধান দায়িত্ব পালন করেছে। এবং শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যখন ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রধান অবলম্বন হিসেবে নিলেন, আজকের আওয়ামী লীগ কেন সেটা নিতে পারবে না! সংবিধান থেকে সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিতে হলে, আপনি যেটা বললেন, এটা আওয়ামী লীগেরই করা উচিত। অন্য কোনো দল কতটা করতে পারবে এই নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
শামসুজ্জামান খান: ওই যে দীনদারী আর জাহানদারী, শেখ হাসিনা কিন্তু এটা করেন। তিনি রোজা নামাজ ইত্যাদি সবকিছু করেন। আবার ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখেন তার বিচারমতো। কিন্তু আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেকেই অত উঁচু পর্যায়ে যেতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে তার অনুসারীদের কিছু কিছু অংশ বিচ্যূত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বড় সমস্যা।
রাজু আলাউদ্দিন: আমরা জানি, আপনি যেটা উল্লেখ করেছেন, লেখক-কবি-শিল্পী এদের সাথে বঙ্গবন্ধুর সবসময় ঘনিষ্ঠ একটা সম্পর্ক বজায় ছিল। এদের সম্পর্কে তার কৌতূহল ছিল। আগ্রহ ছিল। এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে এদের ভূমিকা থাকবে সেটা উনি জানতেন। তাই এদেরকে উনি কদর করতেন। এদেরকে সম্মান করতেন।
শামসুজ্জামান খান: এখানে আমি দুটো উদাহরণ দেব। একটা হলো ১৯৩৯ সনে উনি যখন কলকাতা ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন তিনি একটা উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। ফরিদপুরে একটা সাহিত্য সম্মেলন করলেন। সেই সাহিত্য সম্মেলনে তিনি তিনজনকে আমন্ত্রণ করলেন। একজন হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আরেকজন হুমায়ুন কবির। আর আরেকজন ইব্রাহীম খাঁ। কিন্তু তিনি সাহিত্য সম্মেলন করবেন, সেখানে নজরুলকে নেবেন, হুমায়ুনকে নেবেন এটা ওখানকার মুসলিম লীগের লোকজনের পছন্দ না। ওয়াহিদুজ্জামান তীব্র বিরোধের সৃষ্টি করল। এমন একটা অবস্থা করল, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ওখানে সম্মেলন করাই সম্ভব হয় না। শেষে ওই সম্মেলনে নজরুল এলেন, হুমায়ুন এলেন কিন্তু ইব্রাহীম খাঁ এলেন না। কারণ তিনি মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। তো হুমায়ুন কবির বললেন, মুজিব তুমি চিন্তা করো না। এই সাহিত্য সম্মেলন হবে। তুমি চেয়েছ, হবে। আমার বাড়ি তো ফরিদপুর। সেখানে আমার বিশাল বাড়ি। ওখানেই হবে। এখান থেকে বোঝা যায়, সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু কাদের পছন্দ করতেন। আর প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ এই নামটা তখন খুব জনপ্রিয় ছিল, সে জন্য বোধহয় তিনি তাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আরেকটা উদাহরণ দেব। আমি তখন এখানকার সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান। তখন ১৯৭৪ সালে বিশাল সাহিত্য সম্মেলন করলাম। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্য সম্মেলন। সেই সম্মেলনে ভারত থেকে পঁচাত্তরজন প্রতিনিধি এসেছিলেন একটি নাট্যদল সহ। আর অন্নদাশংকর রায়ের নেতৃত্বে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ আরো বহু সাহিত্যিকরা এসছিলেন। তো এইটার জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে আমরা যখন প্রথম গেলাম, যে, আমরা একটা সাহিত্য সম্মেলন করতে চাই, আপনাকে প্রধান অতিথি হতে হবে। উনি বললেন, আমাকে কেন প্রধান অতিথি করতে চাও তোমরা, আমি বুঝতে পারছি না। আমাদের সময়ে দেখেছি যে, সাহিত্য সম্মেলনে একজন বড় সাহিত্যিক মূল সভাপতি হয়, আর সাহিত্যিকরাই বিভিন্ন শাখার সভাপতি হয়। কেউ লোকসাহিত্য শাখার, কেউ শিশুসাহিত্য শাখার, কেউ উপন্যাস শাখার সভাপতি হয়। আমাকে করতে আসছ কেন? তখন আমাদের দলে আমি ছিলাম, খন্দকার ইলিয়াস সাহেব ছিলেন, সন্তোষদা ছিলেন, মাযহারুল ইসলাম সাহেব ছিলেন। সন্তোষদা বললেন, বঙ্গবন্ধু, এখন তো ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। নতুন একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ রকম রাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় বলতে গেলে নাই-ই। এই রাষ্ট্রের সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পের নীতি কী হবে সেটা তো আপনাকেই বলতে হবে। তখন উনি একটু চুপ করলেন। পাইপে একটা টান দিলেন। দিয়ে বললেন যে, কথাটা সন্তোষদা মন্দ বলেননি। তবে আমার শর্ত আছে। কী শর্ত? আমার বন্ধু কবি জসীমউদ্দীনকে মূল সভাপতি করতে হবে। আগের ধারা আমি বজায় রাখব। আমি প্রধান অতিথি হিসেবে যাব। এবং আমার একপাশে থাকতে হবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, অন্য পাশে বসবেন আব্দুল মতিন চৌধুরী। আমরা তাই করলাম। উনি এলেন। এখান থেকে তার আদর্শটা বোঝা যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। উনি একটা ঘটনার কথা বললেন যে, একবার কী একটা কাজে বঙ্গবন্ধুর কাছে জয়নুল আবেদিনকে নিয়ে আসার ব্যাপার হলো, তো উনি বললেন, উনি কেন আসবেন! আমি যাব তার কাছে। উনি একজন রাষ্ট্র প্রধান, জয়নুল আবেদিনের কাছে যাবেন।
শামসুজ্জামান খান: ওই যে রুমীর কথা। যখন রাজনীতিবিদরা শিল্পী সাহিত্যিকদের পেছনে পেছনে ঘোরে তখন বুঝতে হবে দেশের অবস্থা সুস্থ আছে এবং শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা উন্নত আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা উদাহরণ আমি দিই। আজকাল অনেকেই বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন তোলে যে, শেখ মুজিবুর রহমান আসলেই কি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন নাকি পুরো ঘটনার পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে তিনি তৈরি হয়ে গেছেন! এ রকম অনেকেই বলে। তকিউল্লাহ সাহেবের একটা বই আছে, সেখানে একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেটা হলো, শেখ মুজিবুর রহমান একদিন শফিউল্লাহ সাহেবকে সাথে নিয়ে দেখা করলেন জ্ঞানতাপসের সাথে। জ্ঞানতাপস মানে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তার পদধূলি নিয়ে বললেন, স্যার, পূর্ব পাকিস্তান নাম পাল্টিয়ে বাংলাদেশ করে আপনার আশা পূরণ করব। দোয়া নিতে এলাম। তারমানে বাংলাদেশ হবে এটা তার চিন্তাতে ছিল।
শামসুজ্জামান খান: ছাত্রজীবন থেকেই তার চিন্তায় ছিল। এবং তিনি মুসলিম লীগের আন্দোলনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবে পাকিস্তান সমর্থন করেছিলেন বটে, কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পরে কলকাতার সিরাজ-উদ-দৌলা হোটেলে বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন হলো বটে, কিন্তু আমরা প্রতারিত হলাম। আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। মানুষ সমালোচনা অন্যায়ভাবে করতে চায়। কিন্তু শেখ মুজিব শেখ মুজিবই। পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে থাকা একটা মানুষ। এবং সঙ্গীও পেয়েছিলেন তাজ উদ্দীনের মতো অসাধারণ এক ব্যক্তিকে। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। মনসুর আলীকে। কামরুজ্জামানকে। শেখ হাসিনার মধ্যেও এটা আছে, কবি সাহিত্যিকদের দুস্থ অবস্থায় তিনি যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন, তার শিক্ষক আনিসুজ্জামানকে সম্মান করেন, রফিকুল ইসলাম স্যারকে সম্মান করেন– সেগুলো তার বাবার দৃষ্টান্তকেই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি খেয়াল করেছি, বঙ্গবন্ধুর সাথে আপনার অনেক পুরনো ছবি আছে। বঙ্গবন্ধুকে আপনি প্রথম কোথায় দেখেন?
শামসুজ্জামান খান: প্রথম আমি দেখেছি, আমি যখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। তখন ছাত্রলীগ করতে শুরু করেছি। দীপুমনির আব্বা ইত্তেফাকের আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব ছিলেন, তার সান্নিধ্যে এসে ছাত্রলীগ করতে শুরু করি। তো জগন্নাথ কলেজে পড়ি, ওই সময় একটা মূক মিছিল হবে। মৌলি ব্রাদার্সের সামনে থেকে শুরু হবে, ওখানে তখন শেখ মুজিবুর রহমান এসেছিলেন। উনি একটা বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতা দিয়ে মিছিল শুরু করলেন। চকবাজার পর্যন্ত যাবে মিছিল। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে গেলাম। গুলি হলো মিছিলে। ইকবাল নামে জগন্নাথ কলেজের এক ছাত্র গুলিবিদ্ধ হলো। তাকে তৎকালীন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে নেয়া হয়েছিল। তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধু দেখতে গেলেন। আমরাও গেলাম। এই প্রথম তাকে দেখি। দেখে আকৃষ্ট হই। তারপরে তো জগন্নাথে পড়াকালে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে গেছি। সভা-সেমিনারে তাকে দেখেছি। প্রথম যখন মন্ত্রী হলেন তিনি, পূর্ব পাকিস্তান সরকারে, ৫৪ সালে নির্বাচনে জেতার পর তিনি শ্রমমন্ত্রী হলেন। তিনি গাড়ি নিয়ে নামলেন মৌলি ব্রাদার্সের সামনে। তখন আওয়ামী লীগের অফিস হলো আরেকটু সামনে, হলুদ একটা বিল্ডিং ছিল, সেই হলুদ বিল্ডিঙে। তো ওখানে রাস্তার পাশে হকাররা বসত। পুলিশ অস্থির হয়ে উঠল। মন্ত্রীর গাড়ি ঢুকাতে হবে, হকারদের সরাতে হবে। কিন্তু উনি গাড়ি থেকে নেমে গেলেন– না, আমি হেঁটে যাব। সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পরা। চাদর গায়ে। ওই লম্বা মানুষকে মনে হলো অসাধারণ এক জ্যেতিষ্মান পুরুষ, হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: উনি দীর্ঘদেহী ছিলেন। উনার চেহারার ভেতর আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল।
শামসুজ্জামান খান: ওভাবেই প্রথম দেখি। তারপর তো নানাভাবে, বিভিন্ন মিটিঙে, সভা-সমিতিতে দেখি।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার না যে, আপনি নিজে লেখক এবং লেখক বঙ্গবন্ধুর রচনার সাথে কোনো না কোনো সূত্রে জড়িত হয়ে পড়লেন। যেমন তার আত্মজীবনীর কথা বলছি।
শামসুজ্জামান খান: এটা মনে হয় অনেক ভেবে বুঝেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্বাচন করেছিলেন। উনি আমার এই ব্যাপারগুলো জানেন আর কি। ট্রাস্টেড লোক দরকার। বেবী মওদুদ ছিল আর আমি। তখন থেকেই আমরা দুজন প্রধান কাজটুকু করেছি। সালাহ্উদ্দীন স্যার ছিলেন আমাদের উপদেষ্টা। শামসুল হুদা হারুন স্যার উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হন। সালাহ্উদ্দীন স্যার মারা গেছেন। হারুন স্যার মারা গেছেন। তারপরে ফখরুল আলম সাহেব, ইংরেজি বিভাগে, তিনি এসে যুক্ত হলেন। ইংরেজিটা তিনি করেন। বাংলাটা আমি দেখি। ইংরেজিটাও আমরা একসঙ্গে সবাই পড়ি দেখি। এইভাবে কাজটা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এই রচনাটি এতদিন পরে কেন প্রকাশিত হলো?
শামসুজ্জামান খান: পুরোটা তখন পর্যন্ত তো পাওয়া যায়নি।
রাজু আলাউদ্দন: এটার নেপথ্যের কথা একটু বলেন, কাইন্ডলি।
শামসুজ্জামান খান: নেপথ্যের ব্যাপারট হলো দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু কিন্তু ডিকটেশন দিতেন। সেই ডিকটেশন নিতেন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। কখনো কখনো মাহবুব তালুকদার। যেদিন তাকে হত্যা করা হলো তার আগের দিন মাহবুব তালুকদার ওই পাণ্ডুলিপি তার ব্রিফকেসে ভরে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমি তখন বাংলা একাডেমীতে আছি। সে আমার কাছে নিয়ে এল। বলল যে, এটা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী। উনি বলেছেন যে আমার ভাষা চেঞ্জ করতে পারবা না তোমরা। আমি যেন ওটা একটু দেখি। আমার দুর্ভাগ্য, আমি অফিসে রেখে এসছিলাম ১৪ আগস্ট। ১৫ আগস্টে ঘটনা ঘটে গেল। তারপরে ওই পাণ্ডুলিপি আর পাওয়া যায়নি। গাফ্ফার ভাই অনেক দিন বলেছিলেন তার কাছে আছে। কিন্তু তিনিও আর বার করতে পারেননি। তবে চারটা খাতা পাওয়া গিয়েছিল। সেটি কিভাবে পাওয়া গেল? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি যেটা শুনেছি, সেটা হলো, আর্মিরা ধানমণ্ডির একটা বাসায় তাদেরকে আবদ্ধ করে রেখেছিল। কিছুদিন পর ওরা দেখাতে চাইল যে, দেশে একটা স্বাভাবিক অবস্থা এসে গেছে। সে জন্য স্কুল কলেজে যাওয়ার ব্যাপারে সবাইকে উৎসাহিত করতে লাগল। একদিন এসে বেগম মুজিবকে বলল, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাও। সুকুল মানে হলো স্কুল। উনি চালাক ছিলেন। বললেন, সুকুলে তো পাঠাব, কিন্তু খাতাপত্র তো রয়ে গেছে আমাদের পঁচাত্তর নাম্বার বাড়িতে। ওরা বলল, ঠিক আছে। ওহা যায়ে লে আয়ে। উনি তখন শেখ হাসিনাকে পাঠালেন। বললেন, তুমি যাও, আলমারির উপরে তোমার আব্বার জেলের ডায়রি আছে। ওটা যদি পাও তো দারুণ কাজ হবে। উনি পেলেন। ওরা এটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। ময়লা খাতা। উনি নিয়ে এলেন। এই প্রথম চারটা খাতা পাওয়া গেল। কিন্তু দেখা গেল তারপরেও কিছু মিসিং আছে। পাওয়া যাচ্ছে না। তো যাইহোক, উনার সন্দেহ হলো যে, এগুলো আমাদের বাড়িতে রাখা ঠিক হবে না। আমাদের বাড়িতে যে কোনো সময় সার্চ করতে পারে। পেলে নিয়ে যেতে পারে। তো উনি শেখ মুজিবের আরামবাগের বাসায় শিকের মধ্যে কোনো রকম রেখে দিয়েছিলেন। তো কিছু উদ্ধার হয়ে গেছে। আর পরবর্তীকালে আরো কয়েকটা খাতা পাওয়া গেছে। একজন অস্ট্রেলিয়ান বাঙালি, তার কাছে একটা খাতা ছিল। সে এসে দিয়ে গেছে। আর কিছু টেপ ছিল। বঙ্গবন্ধু বলে যাচ্ছেন তার টেপ ছিল। ওই টেপ, খাতা, অস্ট্রেলিয়ান খাতা এগুলোর তারিখ মিলিয়ে মিলিয়ে আমাদের এগুলো সম্পাদনা করতে হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: ওরে বাবা! এটা তো খুবই কঠিন কাজ।
শামসুজ্জামান খান: এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী ভূমিকায় লিখেছেন, শামসুজ্জামান খান না থাকলে এই কাজ করা সম্ভব হতো না। এই সম্মানটুকু দিয়েছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো অসাধারণ কাজ। জাতির জন্য অসাধারণ কাজ।
শামসুজ্জামান খান: আর এটা কি ভাবা যায়,কারাগারের রোজনামচায় কারাগার সংক্রান্ত যে বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন, অবাক করার মতো ব্যাপার।
রাজু আলাউদ্দিন: আর সমকামীদের কী একটা শব্দ আছে, ওই শব্দটা পড়ে আমি অবাক হয়ে গেছি। উনি কোনোরকম সংকোচ ছাড়া সরলভাবে বলে গেছেন।
শামসুজ্জামান খান: পৃথিবীর কোনো কারাসাহিত্যে এত ডিপলি বিবরণ পাওয়া যায় না। রাজনীতি না করলে উনি অনেক বড় মাপের লেখক হতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: কোনো সন্দেহ নেই। কারণ উনার তো ওঠাবসা ছিল শিল্পী লেখক এদের সাথে। এবার একটা প্রশ্ন করি জামান ভাই। সেটা হলো যে, বিদেশি সাহিত্য আপনি অনুবাদও করছেন, বিদেশি সাহিত্য নিয়ে লিখছেনও। মানে দেশি সাহিত্য নিয়ে তো লিখছেনই– আধুনিক, মধ্যযুগ, প্রাচীনযুগ নিয়ে লিখেছেন। এর বাইরে বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ করেছেন। এমনকি আপনি ইয়ের অনুবাদও করছেন, মার্সেল মাস্ত্রোয়ানি, বিখ্যাত অভিনেতা।
শামসুজ্জামান খান: উনার সানফ্লাওয়ার ছবিটা আমার খুব প্রিয় ছিল। সোফিয়ার অভিনয় এতটা আপ্লুত করেছে, কেঁদেছি। তারপর আমি আইনস্টাইনের অনুবাদ করেছি। হোয়াই সোশিয়ালিজম।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এটাও আমি দেখলাম। তারপর আফ্রিকান কবি সেঙ্ঘরের উপর আপনার দীর্ঘ প্রবন্ধই আছে।
শামসুজ্জামান খান: ওটার একটা পটভূমিকা আছে। বঙ্গবন্ধু তখন বেঁচে ছিলেন। সেঙ্ঘর এখানে আসবেন। আলী আহসান সাহেব তখন আমাদের উপদেষ্টা। তো বাংলা একাডেমীর কাকে দেবে দায়িত্ব? আমাকেই দিল যে তুমি এই কাজটা করো। সেঙ্ঘরের একটা বই দিলেন। এই বই পড়ে তার উপর একটা বই করতে হবে। তখন ওই বইটা করি। তবে বিদেশি সাহিত্য পড়ার আমার আরো ইচ্ছা ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: একটা বই যে ছিল সেঙ্ঘরের কবিতা, ওখানে কি আপনার এই ভূমিকাটা ছিল যেটা করুণাময় গোস্বামী….
শামসুজ্জামান খান: ভূমিকা আছে আমার।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে ওটা কিন্তু আমি ওই সময়ই পড়ছি। প্রথম যখন বেরোয় আর কি। কভারটা ছিল নীল। হালকা নীলের।
শামসুজ্জামান খান: এখন অন্যরকম হয়ে গেছে কভার।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার প্রথম সংস্করণের কথা মনে আছে।
শামসুজ্জামান খান: ওই বইটা সেঙ্ঘরকে উপহার দেয়া হয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এই লেখাটার মধ্যে হিউজ রেফারেন্স আছে। শুধু তো সেঙ্ঘর না, এর বাইরেও আপি অনেক কবিদের উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
শামসুজ্জামান খান: আসলে আমি তো বহুদিকে ছড়ানো মানুষ। একদিকে ফোকলোর, সেটার জন্য কিছু করতে হয়। প্রবন্ধ করতে হয়। বাচ্চাদের জন্য লিখতে হয়। এত দিকে লিখতে গিয়ে একদিকে মনোযোগ দেয়া কঠিন। এ জন্য অনুবাদে ঠিকঠাক সময় দিতে পারি না। তবে এখানে ইয়াং কিছু ছেলেপেলেকে নিয়েছি, যাদের অনুবাদের ট্রেনিং দেব। এবং আমার ইচ্ছা, বাংলা একাডেমীতে একটা ট্রন্সলেশন ইনস্টিটিউট করে যাব।
রাজু আলাউদ্দিন: এটাই আমি বলতে চাচ্ছিলাম, আগে বাংলা একাডেমীতে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর ক্লাসিকস অনুবাদ হতো…
শামসুজ্জামান খান: অন্য কোনোদিন বাংলা একাডেমী নিয়ে সময় নিয়ে কথা হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: ঠিক আছে। ঠিক আছে। তো জামান ভাই, অনেক ধন্যবাদ। আপনি দীর্ঘ সময় দিয়েছেন।
শামসুজ্জামান খান: তোমাকেও ধন্যবাদ। ভালো লাগল আমার। প্রিয় কথাই তো বললাম।
রাজু আলাউদ্দিন: তবে সবটা বলা হলো না।

সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিখন তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prokash — ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৮ @ ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

      শামসুজ্জামান খানের এ রকম ইন্টারভিউ আগে কখনো পড় নি। ভাল লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ আলী আজম — ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৮ @ ৭:৪২ অপরাহ্ন

      প্রাণভরে উপভোগ করলাম। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন salim jahed — ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৮ @ ১০:০৬ অপরাহ্ন

      এক কথায় অসাধারণ।দারুন একটা সাক্ষাতকার।বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। হোয়াই সোশিয়ালিজমসহ আরো কিছু অনুবাদ বাংলা একাডেমি থেকে আবারো বের করেন না, স্যার?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল — ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮ @ ১:৫৭ পূর্বাহ্ন

      বাহ। অনেক কিছু জানতে পারলাম। এ যেনো আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক ইতিহাস! দারুণ এক সময়ের সাক্ষী জামান ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরাফাত হোসেন — ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৮ @ ৯:১৯ অপরাহ্ন

      সাম্প্রদায়িকতা দিন দিন কেবল বেড়েই চলছে । কমার কোন লক্ষন নেই । কারণ যারা সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায় তাদের কৌশল যারা সাম্প্রদায়িকতা আটকানোর চেষ্টা করে তাদের চাইতে অনেক আকর্ষণীয় ও কার্যকরী । আর মানুষও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার উপরে বিরক্ত ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com