ফারাও ভূমিতে

ইকতিয়ার চৌধুরী | ৪ december ২০১৭ ৯:২৯ অপরাহ্ন

Farao
১৯৯২।
ঈজিপ্টে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মসিয়ু লেকলার্ক আমাকে লিখেছিলেন, ‘তুমি কায়রোতে দূতাবাসের এ্যাপার্টমেন্টে ইচ্ছে করলে থাকতে পারবে।’ আমি তখন প্যারিস থেকে দুমাসের জন্যে কায়রো আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেখানকার ফরাসি দূতাবাসে শিক্ষানবিশের কাজে। ইচ্ছে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ইসরাইলে এই দুমাস কাটানোর। কিন্তু প্রিটোরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তেল আবিবের সাথে ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করে ফরাসি পররাষ্ট্র দপ্তর আমার অনুরোধ নাকচ করল। তারা আমাকে কানাডায় পাঠাতে চাইল কিন্তু শেষ পর্যন্ত কায়রো আসাই স্থির হলো। আমার পছন্দের তালিকায় কায়রোও ছিল। পর্যটন মওসুমে মিসরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার হাজার ভ্রামনিক আসেন। সে রকম একটি দেশে যেতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।
শেরাটন (কায়রো) হোটেলের কাছাকাছি ফিনি স্কোয়ারে আমার আবাস। দূতাবাসের এ্যাপার্টমেন্টেই উঠেছি আমি। বারোতলা ভবনের আটতলায় চার বেড রুমের বিশাল ফ্ল্যাট। বাসিন্দা একমাত্র আমি। ফ্ল্যাটটি পরিত্যক্ত। বহুদিন হলো এখানে কেউ বসবাস করছেন না। রাতে নির্জন বাসায় গা ছমছম করে। খাট, বেতের কয়েকটি নড়বড়ে চেয়ার এবং টেবিল ছাড়া বিশেষ কোনো আসবাব নেই। আমার আগমন উপলক্ষ্যে কিচেনসহ একটি বেডরুম এবং বসবার ঘর পরিষ্কার করা হলেও বাকি ঘরগুলো ধুলোয় ঠাসা। কিচেনটি সজ্জিত। দুটো ফ্রিজ, গ্যাসের চুলো ও অন্যান্য তৈজস রয়েছে সেখানে। বিছানাপত্র পেয়েছি ধারে। আমার এ্যাপার্টমেন্টের কাছেই দূতাবাসের কাউন্সিলর মসিয়্যু স্টেফান গোমপার্দের বাসা। যে রাতে কায়রো পৌঁছুলুম সেদিন ওঁর ইতালীয় স্ত্রী ক্রিস্টিনা একজোড়া চাদর, দুটো করে তোয়ালে ও বালিস আমাকে ধার দিয়েছেন।

কায়রোতে তখন তাপমাত্রা ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শেষরাতে আমি ওই চাদরের একটি গায়ে দেই। আবহাওয়ার কারণে কিনা জানি না রাতে পূর্ণ বিশ্রামের পরও দুপুরের পর আপনাতেই দু’চোখ বুঁজে আসতে চায়। আমার ভালো লাগছে সন্ধ্যার কায়রোকে। দিনের শেষে শুরু হয় মৃদু মন জুড়ানো হাওয়া। সারা দিনের তপ্ত নগর তাতে শীতল হয়ে আসে। প্রত্যহই এর পুনরাবৃত্তি দেখছি। জানি না ভরা গ্রীষ্মে কোনো পরিবর্তন ঘটবে কিনা। এখনকার সন্ধ্যায় কায়রো সত্যিই উপভোগ্য। শহরকে ভেদ করে চলে গেছে ‘নাইল’। আমরা যাকে জানি নীল নদ বলে। নাইল মেঘনা, যমুনা কিংবা এককালের কীর্তিনাশা পদ্মার মতো বেপরোয়া নয়। অনেক স্থানেই নদীটির পাড় পাথরে বাঁধা। সেখানে বিশাল বিশাল রেস্তোরাঁ। চেয়ারে বসে নাইলের জল ছোঁওয়া যায়। কিন্তু কেউ তা ছুঁয়ে দেখে না। আবর্জনাপূর্ণ নাইলের পানি দূষিত। স্রোত আছে কিন্তু স্নানের উপযোগী নয়। হবেই বা কী করে। মিসরের জনসংখ্যা বর্তমানে সাড়ে চার কোটি। এর প্রায় ত্রিশ শতাংশই বাস করে কায়রোতে। নানাভাবে শত রকমের বর্জ্য জমা হয় নাইলে। তা সত্বেও এর দুটি পাড় কায়রোবাসীর অসম্ভব প্রিয়। অবকাশে প্রতিদিন সেখানে জড়ো হয় শত শত নাগরিক। অনেক সন্ধ্যায় আমরাও গিয়ে বসি জল ছোঁওয়া কোনো রেস্তোরাঁয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব শাহাদত হোসেন, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার আহসান সাহেব, রেডিও কায়রোর বাংলা অনুষ্ঠানের উপসস্থাপক মোহাম্মদ আলী কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের ছাত্র রকেট আমার সঙ্গী হন। বিদেশিদের মতো অনেক মিসরীয়কেও এখানে স্থানীয় বিয়ার স্টেলায় মুখ রাখতে দেখা যায়। এই আড্ডা আমার ভালো লাগে অন্য কারণে। প্রবাসে দীর্ঘদিন পর নিজ ভাষায় দেশের মানুষদের সাথে কথা বলতে পারার আনন্দই আলাদা। আর বিশাল নগরীর বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল ইমারতমালার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত নাইলের শান্ত, নিঃস্তরঙ্গ চেহারাটিও মনোগ্রাহী। মাঝেমধ্যে শুধু দু’একটি ইঞ্জিন বোটের চলাচল ক্ষণকালের জন্যে নদীর বুকে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মিকে ভেঙে দেয়।
কায়রোতে বাংলাদেশি সম্প্রদায় খুব ছোট। দূতাবাসে কর্মরতদের পরিবার ও কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাঙালি ছাত্র মিলিয়ে একশ’র কাছাকাছি হবে হয়তো। এখন পর্যন্ত কোনো মিসরীয়র সাথে বন্ধুত্ব হয়নি আমার। কায়রোর প্রথম সকালে প্রাতঃরাশের জন্যে বেরিয়ে রেস্তোরাঁ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রমজান চলছিল তখন। একজনকে হদিস জিগ্যেস করলে বলল, ‘এগারটার দিকে খুলবে সব।’ এবাদে জানতে চাইল, তুমি কি ইন্ডিয়া থেকে এসেছ?
না, বাংলাদেশ।
ওয়েলকাম।
এরপর যত মিশরীয়র সাথে কথা হচ্ছে বাংলাদেশ শুনেই ‘ওয়েলকাম’ বলে স্বাগত জানাচ্ছে। এই নগরের একজন তরুণী ও দুজন তরুণের সাথেই শুধুমাত্র আমার একটু ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ওরা প্যারিসে আমার সহপ্রশিক্ষণার্থী এবং আমার মতোই এখন ফ্রান্সের বাইরে। শাহীনাজ ও তারেক সুইজারল্যান্ড। খালেদ টোকিও। মার্চের শেষ দিন কায়রো আসার পথে খালেদের সাথে দেখা চালর্স দ্য গল এয়ারপোর্টে। ও কদিন আগে ছোট্ট একটি ব্যাগে কিছু জিনিসপত্র দিয়েছিল ওর বাবা-মাকে পৌঁছে দিতে। আমার এক ঘণ্টা আগে ওর ফ্লাইট। খালেদ জানাল আজ রোজা করছে না। চা খেতে এলাম দুজন। এয়ার ফ্রান্সকর্মী এক তরুণীর সাথে দেখা। মেয়েটি আলজেরিয়ান। সে খালেদকে জানাল ওর ইকোনমি ক্লাস আপ গ্রেডেড করে একজিকিউটিভ করে দিয়েছে। শুনে খালেদ ঘোষণা করলো, আজ আমার দিন। কি পান করতে চাও তুমি? হুইস্কি, ভোদকা?
এয়ারপোর্টে আসার আগে নেপালি প্রকাশ সুবেদির সাথে খেয়েছিলাম সিতে’র রেস্তোরাঁয়। আলু আর মুরগি সেদ্ধ। ফরাসিরা বলে ‘পুলে ফ্রিত্’। প্রকাশ আমাকে মেট্রোতে তুলে দিয়ে বিদায় নেয়। নিজেরও তাড়া। রাত ১১-৫৯ মিনিটে এয়ার ফ্রান্সের নাইরোবিগামী এয়ারবাস ধরবে সে। আমার গলা শুকিয়েছিল। খালেদকে বললাম, ধন্যবাদ। এক বোতল পানি আর চা।
ওর বাবা-মা দুজনেই স্মার্ট। আমার ফোন পেয়ে ওঁরা এসেছিলেন ময়দান ফিনি বা ফিনি স্কোয়ারে। আটতলার ফ্ল্যাটে ওঠেননি কেউই। কারণ কিছুদিন আগে পক্ষাঘাতের আক্রমণে পড়েছিলেন খালেদের বাবা। ছেলেকে এখনও জানানো হয়নি এই দুঃসংবাদ। পাছে প্রবাসে সে মুষড়ে পড়ে। ভদ্রলোক গাড়িতে চুপচাপ বসে আছেন। খালেদের মা ড্রাইভ করছেন। পঞ্চাশোর্ধ মহিলার চুল সামান্য সাদা। চমৎকার ইংরেজি বলেন। খালেদের বাবা ইংরেজি, ফরাসি দুটোই। মহিলার পরনে স্কার্ট। জুতো। খালেদের পাঠানো জিনিসপত্র পেয়ে খুশি হলেন। যাবার আগে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। আমার সম্মতিসূচক হাসিতে ওঁরা আশ্বস্ত হলেন না। খালেদের বাবা বললেন,
প্রতিজ্ঞা করছ আসবে।
আমিতো ভেবেই পাচ্ছিলাম না এতে প্রতিজ্ঞা করার মতো কী আছে। বিষয়টি তো গুরুতর কিছু নয়।
এখন অবশ্য জেনেছি মিসরীয়রা এরকমই। আমরা যেখানে প্রতিজ্ঞা শব্দটি দৃঢ় ইচ্ছে বা সম্মতি প্রকাশের বেলায় ব্যবহার করি এরা নাকি সাধারণ সম্মতির ক্ষেত্রেই শব্দটি অহরহ প্রয়োগ করে। কোনো মিসরীয় যদি ‘ইনশাল্লাহ’ বলে তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে তবে ধরেই নিতে হবে কথাটি সে রাখবে না। দুর্জনেরা বলে, ‘দুর্ভাগ্য হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিসরীয়রা ইনশাল্লাহ ব্যবহার করে।’
প্রসঙ্গক্রমে জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জনৈক কম্বোডিয়ান ভদ্রলোকের একটি গল্প মনে পড়ছে। আমাদের ইনস্টিটিউশনে উন্নয়নশীল দেশ বনাম দাতাসংস্থার প্রক্সি বৈঠকে ওই বৃদ্ধ তাঁর ঝুঁড়ি থেকে এটি খসিয়েছিলেন। দর কষাকষি অনুশীলনকারীদের উদ্দেশ্য তা ছিল কতকটা উপদেশের মতো। কারণ একটু আগে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ফরাসি সুন্দরী একটি বিষয়ে রাষ্ট্রদূত হয়ে বৈঠককারি জায়ারের কুৎসিয়ানজাকে মিথ্যেবাদী আখ্যা দিয়ে আলোচনায় অসম্মতি জানিয়ে ক্লাস ত্যাগ করেছ। মেয়েটি একটু চলবলে। কিন্তু সে যে বালখিল্য আচরণ করবে তা কেউই ভাবেনি। প্রাক্তন জাতিসংঘ কর্মকর্তাটিও নয়। ফরাসিনি ক্লাসে ফিরলে তিনি ভূমিকার পর বললেন,
কোনো কূটনীতিবিদ যদি হ্যাঁ বলে তাহলে বুঝতে হবে কাজটি সে করলেও করতে পারে। ‘চেষ্টা করবে’ বললে ধরেই নিতে হবে কাজটি সে করবে না। আর যদি না বলে তবে বুঝতে হবে সে কূটনীতিবিদই নয়। তেমনি কোনো মহিলা যদি বিশেষ কোনো প্রস্তাবে দৃঢ় অসম্মতি জানায় তাহলে ধরে নিতে হবে কাজটিতে সে রাজি হলেও হতে পারে। আর যদি শুধু না, না বলে তবে বুঝতে হবে প্রস্তাবে সে রাজি। জবাব যদি হয় হ্যাঁ তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায় সে কোনো মেয়েই নয়।
ভদ্রলোকের ইঙ্গিতপূর্ণ গল্পে হাসির সাথে ডেস্কে দ্রুত লয়ে হাত পড়ে সবার। ফরাসিনির মুখে লাল লজ্জা ছলকে ওঠে। তখন তিনি কথা ঘুরিয়ে বলেন,
আমাদের বান্ধবি কূটনীতিবিদ না হলেও শতকরা একশ ভাগ নারী। ওই গল্পের মতো মিসরীয়দের বেলায় বলা যায় কথার সাথে ইনশাল্লাহ যোগ না করলে সে মিসরীয়ই নয়। যার মানে দাঁড়াচ্ছে এরা সবাই ইনশাল্লাহ বলে অর্থাৎ কথা রাখে না।
শ্বজনের মৃত্যুতে মিসরীয়দের শোক পালনের প্রক্রিয়া অদ্ভুত। মোহাদ্দেসীনে প্রায়শ আড্ডায় যাই আহসান সাহেবের বাসায়। একদিন দেখি ওঁর বাসার অদূরে সুন্দর সজ্জায় সামিয়ানা টানানো। ভেবেছিলাম বিয়ের অনুষ্ঠান। আসলে ওটি একজনের মৃত্যু উপলক্ষ্যে করা হয়েছে। আত্মীয় স্বজন ছাড়াও ভাড়াটে লোকজন বসবে সেখানটায়। যাদের কাজ হবে মৃত ব্যক্তির জন্যে কান্নাকাটি ও আহাজারি করা।
মিসরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা। সপ্তম আশ্চর্যের একটি রয়েছে কায়রোতে। পিরামিড। প্রত্নতাতাত্তিক গবেষক এবং ইতিহাসবিদগণ এ নিয়ে ঢের গবেষণা করেছেন। ভ্রমণপ্রিয় আমার কাছে তা সন্দর্ভের বিষয় না হলেও গভীর কৌতুহলের আধার। তাই এক অপরাহ্নে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্র মাহবুব, রঞ্জু, মেহেদী ও ছালামকে নিয়ে গিজায় পিরামিডের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। ওরা সবাই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ওদের হলের অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের মতোই। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। ছাত্রদের পরিচয়পত্র কাছে রাখতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতেও কখনও কখনও সেটির প্রয়োজন পড়ে। ট্যাক্সি নিয়েছি আমরা। কায়রোতে মার্সিডিজ আর বি এম ডব্লিউ গাড়ির ছড়াছড়ি। সে জন্যেই অনেকে বাড়িয়ে বলে জার্মানিতেও এত মার্সিডিজ নেই। ঢাকায় অটোরিক্সা, টেম্পোর মতো এগুলো ভাড়া খাটে। এখানে তেলের দাম প্রায় জলের মতো বলে ভাড়াও কম। সর্বোচ্চ আরোহী সংখ্যা চার। আমরা অনুরোধ করে পাঁচজন উঠেছি।
রোদ পড়ে আসছিল। আমরা যখন গন্তব্যে পৌঁছুলুম তখন হালকা ধূলি ঝড় হচ্ছে। থেমে থেমে। যাকে দমকা হাওয়াও বলা যায়। পর্যটকদের ভিড় কমে এসেছে। চার-পাঁচজন উটওয়ালা আমাদের ঘিরে ধরল। চুক্তিতে তারা পিরামিড এলাকা দেখাতে চায়। মিসরে যত পিরামিড রয়েছে তার মধ্যে গিজার তিনটে পিরামিড সবচে বিখ্যাত। এগুলোর আকার বড় এবং অন্তত দুটির কাঠামো মজবুত রয়েছে বলেই ধারণা। তবে সবগুলোর বহির্দেশে ক্ষয় শুরু হয়েছে। উদোম আকাশের নিচে প্রকৃতির নির্যাতন সয়ে হাজার হাজার বছর হলো পিরামিডগুলো যে দাঁড়িয়ে আছে সেটিও এক বিস্ময়। প্রাচীনকালের এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে অভিনন্দন। বিশাল বিশাল কয়েক মনি পাথর একটার পর একটা স্থাপন করে নির্মিত হয়েছে সভ্যতার এই ত্রিভুজাকৃতি চমক। পাথরগুলো এত নিপূন হাতে কেটে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে পিরামিডের অক্ষত উপরিভাগের মসৃণতায় চোখ রাখলেই তার প্রমাণ মেলে।
আমরা উট নেইনি। অবশ্য মরুতে ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ ধরে ফেরাউনিক সভ্যতার নিদর্শন দেখতে বাহন হিসেবে সেটি ভালোই হতো। পশ্চিমের অনেক পয়সাওয়ালা পর্যটকই উটে সওয়ার হয়ে মরুর দহন দূরে রাখতে চান। আমাদের মধ্যে ছালাম ভালো আরবি জানে। সেই দরদাম জেনে এক কথায় বলল, ‘পোষাবে না।’
আমার সাথিরা পুরোদস্তুর ছাত্র। দামাল স্বভাবের। পিরামিড এলাকায় ঢোকার জন্যে মাথাপিছু দশ মিসরীয় পাউন্ডের টিকেট ক্রয়েও ছিল তাদের অনিহা। মেহেদী আমাকে বলল,
আপনি আমাদের সাথে আসুনতো।
কেন?
দেখেনই না কীভাবে ঢুকি।
যদি ধরা পড়ে যাই।
বললেই হলো। কত ঢুকেছি ফাঁকি দিয়ে। একটি চোরা পথ জানা আছে আমাদের। একটু হাঁটতে হবে এই যা।
আমি রাজি হইনি। মাহবুব আমার সাথে থাকল। বাকি তিনজন গেল এ্যাডভেঞ্চারে। এবং খানিকবাদে পাহারাদারদের মামদো প্রমাণ করে যোগ দিল আমাদের সাথে। সেই থেকে আমরা হেঁটে হেঁটে দেখছি। মরুর হাওয়া চোখে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ধুলো। কখনও তাই বসে জিরোচ্ছি পিরামিডের পাদদেশে। ভাবছি কে সেই মানব যার মাথায় প্রথম এসেছিল এ রকম একটি বিস্ময়কর বস্তুর নির্মাণ পরিকল্পনা। প্রাচীন পৃথিবীর সেই সন্তান যে নিজেকে নিজের কীর্তির মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অবেলা। পর্যটকদের ভিড় তাই কম। কেউ কেউ মৌন হয়ে বসে। তাদের মৌনতা জানান দিচ্ছে পিরামিড যুগ মন্থনের। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেছিল। পিরামিডের ভেতরটা তাই দেখা হলো না।
ছোটো-বড়ো মিলিয়ে মিসরে পিরামিডের সংখ্যা অনেক। এখানে বড়োর পাশাপাশি ছোটোও দেখতে পাচ্ছি আমরা। গিজার এই পিরামিডগুলোই সবচে আকর্ষণীয়। আর কায়রোর একদম লাগোয়া বলে অসংখ্য মানুষ আসে এখানে। পিরামিডের আরবি প্রতিশব্দ আহরাম। আহরামগুলোর অবস্থান অনেকখানি এলাকা নিয়ে। যারা গাড়ি কিংবা অন্য কোনো বাহনে ঘোরেন তাদের কথা আলাদা কিন্তু আমাদের মতো যাদের চরণ ভরসা তাদের বালিতে হাঁটায় অনেক কষ্ট। তেষ্টা পাচ্ছে খুব। জলের অভাবে কোমল পানীয় পানে তৃষ্ণা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই বালিতে রঞ্জু আর মেহেদী পারাপারি করছে। আমি একটু খেয়াল করতেই মেহেদী বলল, ‘পোলাপান নিয়া আর পারি না। মুরুব্বিদের সামনে শরম দেয়।’
আমরা যখন স্ফিংকসকে সামনে নিয়ে বসে পড়লাম তার মুহূর্ত আগে সূর্য ডুবে গিয়েছিল। যেটুকু আলো ভেসে বেড়াচ্ছে পৃথিবীতে তাতে স্ফিংকসকে লাগছে রহস্যময়। মানুষের মাথার সাথে সংযুক্ত হয়েছে সিংহের শরীর। অর্থাৎ স্ফিংকস একাধারে অমিত বলশালী ও বুদ্ধিমান। এভাবেই নিজেদের হয়তো কল্পনা করতে চেয়েছিলেন চারসহস্র বছরেরও আগেকার মানুষ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে থাকল। স্ফিংকসের সম্মুখ বরাবর একটু দূরে খোলা প্রাঙ্গণ। সেখানে সারি সারি চেয়ার। দিল্লিতে রেড ফোর্টে এক দশক আগে যেমনটি দেখেছিলাম এখানেও সে রকম লাইট এ্যান্ড সাউন্ড অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে কিন্তু আমার সঙ্গীদের পড়ার চাপ থাকায় এই চমৎকার অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে ফেরার আয়োজন করতে হলো।
পিরামিডের ভেতরটা দেখলাম ফেরাউনিক ভিলেজ সাককারায়। সাককারা কায়রো থেকে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। সেখানে আরও আছে খ্রিস্টপূর্ব ২৩৬০ সাল আগেকার রাজা উনাসের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। প্রতিদিন প্রচুর পর্যটক আসে এখানে। টিকেটের দামও চড়া। তবু আগমনের কমতি নেই। শাহাদত হোসেনের গাড়ীতে বেলা এগারোটা নাগাদ পৌঁছে দেখি বাস, কারসহ নানা ধরনের গোটা চল্লিশেক গাড়ি এর মধ্যেই সাককারা দখল করে আছে। সাককারার পিরামিড গিজারগুলোর মতো নয়। এ ধরনের পিরামিডকে বলা হয় স্টেয়্যার পিরামিড। যা ধাপে ধাপে উঠে গেছে উপরের দিকে। তবে ধাপগুলো সিঁড়ির মতো ছোটো নয়। অনেক বড়ো। আমার ধারণা ছিল পিরামিডের ভেতরটা ফাঁকা। বিশাল কোনো ত্রিকোণা গুদাম ঘরের মতো। কিন্তু যখন অপরিসর সুরঙ্গ পথে কোমর ভেঙ্গে প্রবেশ মুখ থেকে নিচের দিকে নামতে থাকলাম তখন সে ধারণা আর থাকল না। লঞ্চে উঠা-নামার জন্যে যে ধরনের কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করা হয় একদম সে রকম সিঁড়ি বেয়ে বিশ-পঁচিশ মিটার ঢালুতে নামলে ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের মেঝের মতো এক ফালি জায়গা। সেখান থেকে আবার একই প্রক্রিয়ায় পিরামিডের শীর্ষপানে উঠলে একটি কক্ষ পেলাম। কক্ষের গায়ে প্রাচীন মিসরীয় লিপি। তাতে অনেক কিছুর ছবি লিপি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু ওই যুগে মুদ্রণ যন্ত্র ছিল না সেহেতু বলা যায় এগুলো লিথোগ্রাফ। পাথরের উপর খোদাই বা ছাপানোকে লিথোগ্রাফ বলে। কক্ষের এক পাশে একটি বেদির মতো। সেখানে জনৈক ফেরাউনিক রাজার মমি রক্ষিত ছিল। পিরামিডের ভেতরটা অন্ধকার। বিদ্যুতের লাইন টেনে আনা হয়েছে। কিন্তু অনুজ্জ্বল হলুদ আলো পরিবেশটিকে আরও ভৌতিক করে তুলেছে।
সব পর্যটক পিরামিডে ঢোকে না। ঢুকলেও বেশি সময় থাকে না। আমি অনেক বিস্ময় ও কৌতুহল নিয়ে সব খুঁটিয়ে দেখতে থাকলাম। পৃথিবীর অনেক দ্রষ্টব্য স্থান, মিউজিয়ামের মতো এখানেও ছবি উঠানো নিষিদ্ধ। আলখেল্লা পরা যে মিসরীয় পাহারায় তিনি এই সুবাদে কামিয়ে নিচ্ছেন। দুএক পাউন্ড ছাড়লেই ক্যামেরা চালানোর অনুমতি মিলছে। জন প্রতি এক দু পাউন্ডই ভাইজানের ঈর্ষণীয় উপার্জনের জন্যে যথেষ্ট। পিরামিডের অন্য কোনো রহস্য থাকলেও থাকতে পারে। তবে এগুলো যে সমাধিস্থল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যিনি যত ক্ষমতাশালি ছিলেন, মনে হচ্ছে, তার সম্মানে তত বড় পিরামিড গড়া হয়েছে। আমি তাকিয়ে ছিলাম যেখানটায় মমি শোয়ানো ছিল। কখন যে কক্ষটি শূন্য হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। পেছনে একটি শব্দ হলো। ক্লিক। তাকিয়ে দেখি দশ এগারো বছরের একটি ইউরোপীয় মেয়ে। পরনে হাফ প্যান্ট। টি-শার্ট। ভারি নিষ্পাপ চেহারা। আমি ঘুরে দাঁড়ানো সত্বেও একবারও তাকাল না আমার দিকে। ওর কোনো সঙ্গী সাথী নেই। পাহারাদারটিকেও দেখতে পাচ্ছি না। নির্জন কুঠরিতে শুধু আমরা দুজন। পৃথিবীর অন্যতম কৌতুহল, আজ অবধি রহস্যাবৃত্ত প্রাচীন পিরামিডের অভ্যন্তরে আধুনিক পৃথিবীর সংস্কারহীন মানুষ। তবুও কাকতলীয় একটি কারণে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে থমকে যেতে হলো। কয়েকমাস আগে টেলিভিশনে একটি ছবি দেখেছিলাম। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি কিশোরি। যার উপর ভর করেছিল অশরীরি কিছু। মেয়েটি একে একে ভাই বাবাকে খুন করে। মা খুন হবার আগে কিশোরীটির ভয়ঙ্কর রূপটি ধরে ফেলায় বেঁচে যায়।
আমার পেছনের মেয়েটির চেহারা হুবহু ছবির কিশোরীটির মতো। দ্রব্যগুণ বলে একটি কথা আছে। পরিবেশেরও সে রকম একটি প্রভাব আছে। অন্ধকার ঘরটিতে মেয়েটির নির্লিপ্ত উদাসভঙ্গী অদ্ভুত লাগতে থাকল। আমি কক্ষ ত্যাগ করলাম।
আমাদের সাথে শাহাদতের স্ত্রী, মা ও ছেলে সানিও ছিল। আমরা রাজা নাসের প্রাসাদের দিকে হাঁটতে থাকলাম। প্রাসাদের বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। মরুর মাঝে সাক্ষি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে শুধু দুসারি পিলার এবং একটি তোরণ। আমার ধারণা তোরণটি পুনর্নির্মিত অথবা মেরামত করা হয়েছে। বাকি সবই ধ্বংসাবশেষ। তারই আকর্ষণ আজ বিশ্বজুড়ে। পর্যটন থেকে মিসরের প্রতি বছর আয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। সানির বয়স বছর তিনেক। একনাগারে বেশি হাঁটাহাঁটিতে স্বভাবতই অসমর্থ। ওর বিশ্রাম উপলক্ষ্যে আমরা জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। এক ভদ্র মহিলা এসে বললেন, বাংলা কথা শুনে থাকতে পারলাম না। এ রকম জায়গায় এই ভাষা যে শোনা যাবে সেটিই আশ্চর্য।
নাম বলে নিজেই পরিচয় দিলেন। মহিলার বাড়ি কোলকাতায়। সেখানেই একটি ল কলেজের অধ্যক্ষ। সাথে স্বামীও রয়েছেন। তিনি একজন বিচারপতি। অনতিদূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ভদ্রলোক। পাশে জিনস পরিহিতা এক তরুণী। তাকে দেখিয়ে মহিলা বললেন, আমাদের মেয়ে। লন্ডনে পড়ছে। আমি এসেছি একটি সেমিনারে। ওকেও তাই আসতে লিখেছিলাম।
এ বাদে ওঁর মনে হলো আমাদের পরিচয়টি নেওয়া প্রয়োজন। জিগ্যেস করলেন, তা আপনারা?
শাহাদত সংক্ষেপে জবাব দিলেন,
আমি বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজ করি।
বাংলাদেশের দুচার জনের সাথে আলাপ আছে আমাদের।
তাই।
শাহাদত আর আমি এক সাথে বললাম।
কোলকাতা লীগে ঈস্ট বেঙ্গলের পক্ষে খেলছে আপনাদের মুন্না। ওঁর সাথেও পরিচয় আছে।
স্বামীকে দেখিয়ে যোগ করলেন,
ও আবার ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কিনা।
অধ্যক্ষ মহাশয়া যাবার সময় আমাদের ধন্যবাদ জানালেন। বললেন, ‘পরিচিত হয়ে খুশি হয়েছি।’
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ওয়েসিস। সেটি এখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। সেখানে ফারাওদের ভূগর্ভস্থ সমাধিস্থল। শাহাদতের টয়োটা করোলায় সাককারা এসেছি আমরা। ওয়েসিসের উদ্দেশ্যে ওটিতেই চড়ে বসলাম আবার।
কায়রোতে আমার বেশ সুবিধে হয়েছে ঘোরাফেরায়। আহসান, মোহাম্মদ আলী, শাহাদত তিনজনেরই গাড়ি আছে। অবসরে এদের কাউকে না কাউকে পাই। কোনোদিন চলে যাই মাদির দিকে। ওই এলাকায় বেশ বিদেশি, বিশেষ করে আমেরিকান। কোনো সন্ধ্যায় তাহরির স্কোয়ার বায়ে রেখে একটু ডানে নাইলের পাড়ে বসি। নাইলের কিনার ছোঁয়া রেস্তোরাঁর অভাব নেই। তাই কখনও ইচ্ছে মতো যেকোনো দিকে চলে যাই আমরা।
কয়েকদিন আগে দূরে গেলাম। লোহিত সাগর তীরবর্তী আইনুস শাকুনায়। কায়রো থেকে একশ চল্লিশ কিলোমিটারের মতো দূরে। ওই দিনের ভ্রমণও ছিল শাহাদতের উদ্যোগে। সারাপথে কোনো জনবসতি চোখে পড়ল না। শুধু একটি সিমেন্ট কারখানা ছাড়া। কায়রো থেকে বেরিয়েই শাহাদত দেখালেন কিংবদন্তির সিপাহশালার সুলতান সালাহ্ উদ্দিনের ফোর্ট। একটি পর্বত শৃঙ্গ। কায়রোয় পিআইএর প্রথম ফ্লাইট এটির সাথে ধাক্কা লেগেই দুর্ঘটনায় পড়ে এবং আরোহীদের সবাই নিহত হন। মধ্য ষাটের কিছু পরের ঘটনা সেটি। ওই উদ্বোধনী ফ্লাইটে কয়েকজন বাঙালি সাংবাদিকও ছিলেন। তাঁদের একজন রীনা সুলতানার বাবা। অভিনয়ের সাথে জড়িত রিনা সাংবাদিকতা বিভাগে আমাদের সময়ে পড়তেন। আমি পাথুরে পাহারটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এক বিন্দু সবুজ নেই সেখানে। সেখানেই মিশে আছে রিনার বাবার দেহাবশেষ। মনে মনে আমি সবার আত্মার শান্তি কামনা করি।
গরম এখনও পড়তে আরম্ভ না করলেও লোহিত সাগরের তীরে যথেষ্ট ভিড়। একটি সুবিধেজনক জায়গা খুঁজে পেতে দুবার চক্কর দিলাম আমরা। সুয়েজ খাল লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে ভূমধ্য সাগরের সাথে। জানি না সুয়েজ যাবার রুট এখান দিয়ে কিনা তবে চোখে পড়ছে নোঙর ফেলা মাঝারি আকারের দু’তিনটে জাহাজ। রেড সি অর্থাৎ লোহিত সাগরের জল আইনুস শাকুনায় স্থির হয়ে আছে। কোনো ঢেউ নেই। হয়তো পূর্ণ জোয়ার। জল তাই চলৎহীন।
স্নানে নামলাম আমরা। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জল। বুক পানিতে দাঁড়িয়ে আছি তবুও পায়ের পাতা দেখা যাচ্ছে। কখনও কৌতুহলি ছোট মাছ শুঁকে যাচ্ছে আমাদের দেহের গন্ধ। রেড সি’র পানিতে এখনও শীতের প্রভাব। সাঁতারের পরও তাই শরীরের উত্তাপ সাথে সাথে নেমে যাচ্ছে। খুব বেশি মানুষ সাগরে নামেনি। মিসরীয় পরিবারগুলোর আড্ডা গাড়িকেন্দ্রিক। যে সমস্ত যানবাহনে তারা এসেছে সেগুলোর পাশে বসে জটলা করছে। পর্যটনের কটেজ আছে সাগর পাড়ে। কিন্তু সেখানে লোকজন আছে বলে মনে হলো না।
দুপুরের খাবার কিনলাম রেস্তোরাঁ থেকে। সাকুল্যে দুটো রেস্টুরেন্ট। নোংরা। কিন্তু লোকালয় থেকে দূরে সমুদ্র পাড়ে আড্ডার জন্যে তা আমার দৃষ্টিতে চমৎকার। রুটি, মাকারোনি (ডালের মতো কতকটা), অমলেট, ক্যানড টোনা ফিশ আর কোমল পানীয় পাওয়া যায় দুটো রেস্তোরাঁতেই। চাপলিশে কঠিন পানীয় যে পাওয়া যায় না তা কে বলতে পারে। ভোদকা পর্যন্ত যেখানে তৈরি হচ্ছে মিসরে, সে অবস্থায় এ ধরনের বস্তু নাবিক আর পর্যটকদের বিচরণ ভুমিতে পাওয়া যাবে না তা বলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
বিকেলে ফেরার পথে তেলের অবস্থা দেখে শাহাদত বললেন, ‘কায়রো পর্যন্ত যেতে পারব কিনা সন্দেহ হচ্ছে।’ হাইওয়েটি চলে গেছে মরুকে দুফালি করে। আমরা তেলের জন্যে ধর্না দিলাম সিমেন্ট ফ্যাক্টরিটির গেটে। বিদেশি তাই তেল মিলল। অবশ্য নগদে এবং ঘণ্টাখানেক ধরে মেঝ কর্তা, বড়োসাহেবের অনুমতির জন্য ছোটাছুটির পর। সুয়েজ সিমেন্ট কারখানাটি বড়ো। বছরে এর উৎপাদন ক্ষমতা দশ মিলিয়ন টন।
ফারাওদের সমাধিতে যেতে ওয়েসিস থেকে একটু হাঁটতে হয়। শাহাদত গাড়ি পার্ক করলেন। নবীন কিছু গাছপালার মাঝে রেস্তোরাঁ, স্যুভেনির সপ, পর্যটন অফিস ও পুলিশ ফাঁড়ি। বিশাল বালির প্রান্তরের মাঝে এক টুকরো সবুজ। এক চিলতে ছায়া। একটু খানি স্বস্তি। ইতোমধ্যে রোদ তেজি হয়ে উঠেছে। ঝাঁ ঝাঁ করছে বায়ুমণ্ডল।
প্রশস্থ সুড়ঙ্গ পথে ভূগর্ভে ঢুকলাম আমরা। সেখানে ফারাওদের সারি সারি কবর। কবরগুলো কফিনের আকারের। দৈর্ঘ্য, প্রস্থে সাধারণ কফিনের চেয়ে কয়েকগুণ বড়। আর পাথরে তৈরি হওয়ায় ভারী। কবর কুঠুরির ঢাকনাও পাথরের। কুঠুরি ও ঢাকনা এত মসৃণ ও উজ্জ্বল যে প্রশ্ন জাগে এগুলো তৈরির প্রযুক্তি ফারাওরা কীভাবে পেলেন। এই সমাধিগুলো বের করে আনা হয়েছে মাটি খুঁড়ে। কোনো কোনো কবরের মাঝে মূল্যবান ধাতুর অলংকারসহ ব্যবহৃত নানা রকম জিনিসও পাওয়া গেছে। ফারাওরা হয়তো বিশ্বাস করত মৃতের এগুলো দরকার হতে পারে। এসব নিদর্শনসহ প্রাচীন সভ্যতার হাজাররকম চিহ্নে মিসরের জাতীয় জাদুঘর পূর্ণ। প্রত্যেক দিন শ শ দেশি বিদেশি সার করে মিউজিয়ামে ঢুকছেন। বিদেশিদের জন্যে টিকেট মূল্য বেশি । লম্বা কিউয়ে আমার মনে হয়েছে বাড়তি আয়ের জন্য সিদ্ধান্তটি ভালোই। তুরস্ক থেকে এসেছেন ফজলুল হক। এই নামে বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ আছে জানাতে তিনি খুব খুশি। ব্যবসা করেন ভদ্রলোক। কায়রো এসেছেন বেড়াতে। ইংরেজি ব্যাকরণের তরুণ শিক্ষক বিলম্বিত মধুচন্দ্রিমায় বেরিয়েছেন। সাথে ওঁর পোয়াতী বউ। বউটি পরে আছে লম্বা স্কার্ট। চেহারাটি সারল্যে ভরা। আসোয়ানের এক গ্রামের স্কুলে যুবকটির চাকরি। আসোয়ান বাঁধ বিদ্যুৎ আর সেচের পানি জুগিয়ে মিসরকে নতুন জীবন দিয়েছে। জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্যে আপাতত কোনো মমি নেই। মমির অনেক খোলস রাখা আছে সর্বসাধারণের জন্যে। খোলসগুলোর সামনের অংশে নানা রকম গাঢ় রঙে মানুষের অবয়ব আঁকা। মমি হচ্ছে আসলে একটি প্রক্রিয়ার নাম। এই ব্যবস্থায় মগজসহ দেহের ভেতরকার অন্যান্য জিনিস ফেলে দিয়ে বিশেষ ধরনের ঔষধিতে শব সংরক্ষিত হয়।
ভূগর্ভস্থ সমাধি ক্ষেত্রটি বিরাট। আধা অন্ধকার। একটি বিশেষ আবহ তৈরির জন্যেই মনে হয় আলোর জোগান কমিয়ে রাখা হয়েছে। আমি সিঁড়ি বেয়ে একটি কবর গহব্বরে নামলাম এবং লাইটার জালিয়ে পাথরের কফিনে চোখ রাখলাম। না ভেতরে কিছু নেই। যে সমস্ত শব মমি করে রাখা হয়েছিল তার অনেক বিনষ্ট হয়েছে, কিছু সরিয়ে সযত্নে রাখা হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। সবার থেকে। তখুনি ফারওদের সারি সারি কবরের মাঝে আবছা অন্ধকারের ভেতর পিরামিডে দেখা সেই কিশোরীকে আমার পেছনে আবিষ্কার করে ছবির সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো দেখতে শুরু করলাম। আমার দিকে মেয়েটির সামান্য খেয়ালও নেই। সে যেন একাত্ম হয়ে আছে কবর ভূমির নিথর সৌন্দর্যে। তার কোনো সঙ্গী দেখছি না। একাকী সে এসব জায়গায় ঘুরছে কীভাবে সেটিও ভাববার বিষয়। আর কাকতলীয়ভাবে আবার ওর কাছাকাছিই বা হব কেন। একবারের জন্যেও মেয়েটি দৃষ্টি দিচ্ছে না আমার দিকে। নিজেকে সাহসী দাবি করব না কিন্তু বলব যে, ভীতু নই। তবু শরীর একটু শিহরিত হয়ে উঠল। সঙ্গীদের খোঁজে হাঁটা দিলুম আমি।
কায়রোর দিনগুলো বহতা নদীর মতো। প্যারিসে পড়াশোনার চাপ ছিল প্রচণ্ড। সে অর্থে এখানে কোনো কাজই নেই। সকাল ন’টা থেকে একটা পর্যন্ত দূতাবাসে থাকি। বাকি সময়ের হিসেব কাউকে দিতে হয় না। আড্ডা, ঘোরাফেরা। যেন ছুটি কাটাচ্ছি কায়রোয়। রাষ্ট্রদূতের বাসায় প্রতি সপ্তাহে একটি দুটি পার্টি থাকছেই। তিনি অতিশয় সজ্জন তাই অতিথিদের তালিকায় প্রত্যেকবারেই নাম থাকছে আমার। রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাস ভবনটি গিজা স্ট্রিটের দূতাবাস প্রাঙ্গনেই। এক পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নাইল। ভবনটির ভেতরের বারান্দায় দাঁড়ালে তা দেখা যায়। বারান্দা থেকে নামলে বাগান। নানা ধরনের পুষ্পরাজি আর গাঢ় সবুজ ঘাসে মাটি মনোরম। প্রতি অনুষ্ঠানেই দেখি আমন্ত্রিতগণ রাষ্ট্রদূতের জোড়া ড্রয়িংরুমের চেয়ে বারান্দা আর বাগানকেই বেশি পছন্দ করেন। এই ধরনের সান্ধ্য আসরে উত্তেজনা আসে মন্থর গতিতে। প্রথম দিকে সবার স্বরগ্রাম নিচুতেই থাকে কিন্তু দ্রব্য গুণ শুরু হলে সে শিষ্টাচারে সামান্য ঘাটতি হতে পারে। আরবীয় পোশাকে তিন-চার জন খানসামা ট্রেতে পানীয় স্নাকস নিয়ে ঘুরতে থাকে অতিথিদের জটলায় । ঐতিহ্যবাহী আরবীয় পোশাকে ইউরোপীয়দের আসরে এদের অনুগত ভাবটি দেখে আমার সব সময় মনে হয় শ্বেতকায়রা বাদামীদের চিরকাল গৃহপালিত বানিয়েই রাখল। সময় ক্ষয়ের সাথে সাথে শূন্য হতে থাকে সবার পাত্র। তাতে উত্তেজনা বেড়ে যায় আর গুঞ্জন এতই পল্লবিত হয়ে ওঠে যে তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় লোকজন শোনার চেয়ে বলছে বেশি। তবে বিশৃঙ্খল কোনো কিছুই ঘটে না।
কায়রোতে আমার সময় বহতা নদীর মতো। এখানে আসার দ্বিতীয় দিবসে রাষ্ট্রদূতের বাসায় প্রথমবার যাবার সুযোগ ঘটে। তিনি আমাকে মধ্যাহ্নভোজে ডেকেছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ভদ্রমহিলা এখন দিল্লিতে। ওঁর স্বামী কিংবা সে নিজেই সেখানে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত। প্রথম বিবাহজাত এক ছেলে এবং বর্তমান স্ত্রীর আগের ঘরের মেয়ের সাথে রাষ্ট্রদূত পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছেলে মেয়ে দুটি বয়সে তরুণ। ওঁর স্ত্রী কায়রোর বাইরে থাকায় আলাপ হলো না। রাষ্ট্রদূতের প্রিয় পানীয় জিন। তিনি আমাকে জিন টনিকে আপ্যায়িত করলেন। আমাদের অল্প সময়ের গল্পে রাজনীতি, সাহিত্য, মিসরের ঘনায়মান সামাজিক অবস্থা এবং বাংলাদেশ কিছুই বাদ গেল না।
আলাপেই জানলাম নোবেল পুরষ্কার প্রত্যাখ্যানকারি ফরাসি লেখক জ্যঁ পল সার্ত ওদের আত্মীয়। চারজনে খেতে বসলাম আমরা। মেনুতে মাছ, মাংস, দুটোই থাকায় ফরাসি খাবার রীতি অনুযায়ী ক্ষুধা বর্ধনকারী হিসেবে নেওয়া জিনের পর সাদা ও লাল মদ এলো। কায়রোতে তখন ‘টব অব দি টাউন’ একটি ধর্ষণের ঘটনা। বাসস্ট্যান্ডে অনেক লোকের সামনে একটি মেয়ে ধর্ষিতা হয়েছেন। অবগুণ্ঠনহীন তরুণীটি আধুনিক পোশাকে সজ্জিত ছিলেন। তাকে যখন বলৎকার করা হয় কেউ এগোয়নি। মিসরের মতো রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে এ ধরনের ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক। তার চে অচিন্তনীয় মেয়েটির সাহায্যে কারও এগিয়ে না আসা। রাষ্ট্রদূত আর তাঁর সৎ মেয়ে এ নিয়ে খোলাখুলি কথা বললেন খানিক সময়। দুজনকেই উদগ্রীব মনে হলো এ বিষয়ে। অনেকের ধারণা এই জঘন্য কাজটি ঘটিয়েছে মৌলবাদিদের কেউ। কারণ তারাই মেয়েদের প্রকাশ্য হয়ে চলা পছন্দ করছে না।
যেদিন আমার কোনো সঙ্গী থাকে না সেদিন আমি প্রায়শ সেতু ধরে নাইল পেরিয়ে হাঁটতে তাহরির স্কোয়ারের দিকে চলে যাই। কায়রোতে অনেক রেস্তোরাঁ। সেখানে খাবার ছাড়াও পাওয়া যায় একটি মজার জিনিস। যার স্থানীয় নাম শিশা। শিশা হচ্ছে লম্বা নলওয়ালা হুঁকো। একেকটি রেস্টুরেন্টে বিশ-পঁচিশটি পর্যন্ত শিশা থাকে। লোকজন লাল চায়ের সাথে শিশা টানে। মিষ্টি তামাকের গন্ধে সময় কাটে আলস্যে। তবে আরও মজার বিষয় হলো পাঁচ তারকা হোটেলে পর্যন্ত শিশার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কায়রোতে ফাইভ স্টার হোটেল অনেকগুলো। প্রতিযোগিতায় টিকতে পারলে তবে না ব্যবসা। খদ্দেরদের চাহিদা মেটাতে তাই হুঁকোর ব্যবস্থা। সে বিকেলে আবু ওসমানে একা ঘুরছিলাম। সেখানে চায়ের একটি দোকান ভালো লেগে গেল। চায়ের সাথে ধূমপানের ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো খাবার নেই দোকানটিতে। ছোটো ছোটো টেবিল। সাথে কোনো কোনোটায় চেয়ারের বদলে মোড়া। লোকজনের ঠোঁটের ফাঁকে শিশার নল। সামনে সাদা হাফ গ্লাসে লাল চা। আমিও তাতে সামিল হলাম। কিন্তু জমাতে পারলাম না। নলে টান দিলে কলকিতে শুধু ফসফস শব্দ ওঠে কিন্তু মুখে ধোঁয়া আসে না। এর জন্যে চোয়ালে জোর চাই। সিগারেটের টান শিশার বেলায় অচল। বিড়ম্বনায় পড়ে গেলাম। বিদেশি বলে অন্যদের চাপা কৌতুহল থাকলেও থাকতে পারে। কেউ খেয়াল করছে ভেবে একটু আড়ষ্ট ভাব এসে গেল আমার। টান সত্বেও কলকের আগুন নিভে গেল। শিশাগুলো রাজকীয়। জলের আধারটি রুপোলি। না হলেও সেখানে দু’লিটার পানি ধরবে। লম্বা রবারের নলটিও মোটা। টিকিয়া বদলে নিয়ে প্রাণপনে টানতে শুরু করলাম। এবারে ধোঁয়া বেরুতে থাকল। অল্প। তাতেই রক্ষা।
কোনো নগরকে জানা অসম্পূর্ণ থাকে যদি না তার বাজারে ঢোকা যায়। উপমহাদেশ কিংবা আফ্রিকায় আমরা বাজার বলতে যা বুঝি সে ধারণাটি অবশ্য ইউরোপে কাজ করে না। সেখানে বাজারের জায়গা নিয়েছে সুপার মার্কেট। সবজি, মাছ, মাংস থেকে আরম্ভ করে বাচ্চাদের গেমসের জন্যে কম্পিউটার পর্যন্ত সহজলভ্য একটি বহুতল মার্কেটে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের নগর রূপটি দেখতে হলে আছে অন্য ধরণের হাতছানি। কায়রোতে সেসব কিছু থাকতে পারে। তবে বাজারও রয়েছে মেলা। বৈশিষ্ট্য ঢাকার বাজারের মতোই। নোংরা। অস্বাস্থ্যকর। ভির একটু কম আর বিক্রেতারা আমাদের তরকারি ও মৎস ব্যবসায়ীদের চেয়ে ভদ্র। কায়রোর রুইয়ের স্বাদে আমাদের থেকে ভিন্নতা পাইনি আমি। ওখানে শিং, মাগুর মাছও কাটিয়ে নেয়া যায়। মিসরীয়রা এজন্যে মাছদা’র বদলে কাচি, ছুরি ও আঁশ ছাড়াতে স্টিলের আচড় ব্যবহার করে। পারিশ্রমিক মাছের ওজনের উপর। বাজারে যথেষ্ট সংখ্যক মহিলা ক্রেতা, বিক্রেতা। বলাই বাহুল্য বোরখা পরে কাজে অসুবিধে হয়। তাই তা চোখে পড়ে কদাচিৎ। কোনো কোনো মিসরীয় মেয়ে বেশ সপ্রতিভ। গিজা বাজারে একদিন পেঁয়াজ কিনছিলাম। আমার দরকার ছিল এক কেজি। কিন্তু ভ্যানের উপর সওদা সাজিয়ে বসা দোকানি দ্বিগুণ ধরিয়ে দিতে চাচ্ছিল। তাতে দাম কম পড়বে এই বিষয়টি ভাষাগত অসুবিধের কারণে বোঝাতে পারছিল না। মাঝ বয়সী এক মহিলা তা লক্ষ্য করে বুঝিয়ে দিলেন ইংরেজিতে। প্রচলিত বিদেশি ভাষার মধ্যে ইংরেজি সেখানে শীর্ষে। তবে খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে ফরাসি। এই ভাষা জানা লোকের সংখ্যা ইংরেজির চেয়ে খুব কম নয়। কায়রো থেকে ফরাসি দৈনিক পর্যন্ত বেরোয়। অনেক পুরনো পত্রিকা সেগুলো। একটির বয়স প্রায় শতবর্ষ। এতেই বোঝা যায় মিসরীয়দের ঐতিহ্য কত সমৃদ্ধ। সারা মিসরে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অন্তত পঞ্চাশটি ফ্রেঞ্চ মিডিয়াম স্কুল রয়েছে। জার্মান এবং ইতালীয় স্কুলও চোখে পড়ে।
নতুন কোনো শহরে গেলেই আমি স্থানীয় পত্রিকার বিজ্ঞাপনগুলো পড়ার চেষ্টা করি। তাতে সমাজ, সংস্কৃতি, জনগণের মন-মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা পেতে সুবিধে হয়। কায়রোর নৈশ ক্লাবে প্রসিদ্ধ আরবীয় ক্যাবারে নাচের কথা আমি পূর্ব হতেই জানতাম। কিন্তু সেখানটায় ব্যালে নাচের চর্চা আছে এবং তা কম জনপ্রিয় নয় সে তথ্য আমার ছিল না। ধারণা ছিল এটি পূর্ব ইউরোপ বিশেষ করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একচেটিয়া বিষয়। ফরাসি দৈনিক ল্য জুরনা দেজিস্ট-এর বিজ্ঞাপনে জানলাম পর পর তিনরাত সেক্সপিয়রের রোমান্টিক নাটক রোমিও জুলিয়েট ব্যালে নাচে মঞ্চায়িত হবে। টিকেট এবং ভেন্যু সম্পর্কে বাড়তি কিছু তথ্যের জন্যে টেলিফোন করলাম। সে সবের সাথে অতিরিক্ত একটি তথ্য দেওয়া হলো। দর্শকদের জন্যে পোশাক নির্দিষ্ট। পুরুষদের স্যুট বাধ্যতামূলক। এ খবরটি আগাম না জানলে ‘অপেরা হাউজ’ থেকে নির্ঘাৎ ফিরে আসতে হতো আমাকে। আমিতো মনে করতে পারছি না প্যারিসের অভিজাত নাচ গৃহে এ ধরনের ব্যবস্থা বলবৎ কিনা। বারবনিতা পল্লী পিগালের মুলা রুজ অথবা প্যারিসের হৃদপিণ্ড সনজাঁলিজের লিডো’তে নৈশভোজের সাথে পারিবাসীদের নৃত্য দর্শন বহুকালের ঐতিহ্য। অবশ্য তা কায়রোর ব্যালে থেকে আলাদা। নগ্নবক্ষা গোটা পঞ্চাশেক নর্তকী একযোগে মঞ্চে উঠে আসলেও কেউ তাতে অশ্লীলতা দেখেন না। সস্ত্রীক এবং সপরিবার উপভোগ করেন অনেকে। দক্ষিণ কোরীয় কূটনীতিক আমাদের সহপাঠী মি. লি এমন একজন। লি অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছে ওর শিল্পপতি বাবা ও মায়ের মাঝখানে বসে।
রোমিও জুলিয়েটভিত্তিক ব্যালের পরিকল্পক জনৈক রুমানীয় ভদ্রলোক। দীর্ঘদিন কায়রোতে আছেন তিনি। সেখানকার স্বল্পায়ু জীবনে ব্যালে দর্শন আমার কাছে একটি স্মরণীয় সন্ধ্যা।
কায়রোর নাইট ক্লাবের অনেকগুলোই পিরামিড রোডে। আরবি মিউজিক বহু শোনা হয়েছে কিন্তু নাচ দেখিনি কখনও। ক্যাবারেতে ঢুকলে রাতের খাবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ন্যূনতম একশ মিসরীয় পাউন্ডের প্রয়োজন যা এখানকার একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারির সারা মাসের বেতন।
একদিন নাইলের পাড় ধরে ফিয়াটে ছুটছি। সঙ্গীকে বললাম,
সন্ধ্যার তো দেরি নেই। চলুন কায়রোর বেলি নাচের অভিজ্ঞতা নিতে হবে।
সেতো অনেক খরচ আর সারা রাতের ব্যাপার। তা ছাড়া আমার অন্য অসুবিধেতো বোঝেন।
সঙ্গী ভদ্রলোক বাঙালি। গৃহিনী করেছেন মিসরীয় মেয়েকে। ভাবী অবশ্য কায়রোতে নেই। রিয়াদে। দুটো ছেলে ওদের। এখানেই। অসুবিধে অবশ্য সে সবে নয়। ভদ্রলোক নিজেই ধর্মভীরু। মাতৃকূল পীর বংশে। ওর গাড়িতেই আমরা।
: আরে চলুনতো, আমরা কি সারা বছর ক্যাবারেতে ঢুকি নাকি?
স্টিয়ারিং আলগোছে ধরে আছেন তিনি। কী যেন ভাবলেন কিছুক্ষণ। বললেন,
গেলে যাওয়া যায় এক হিসেবে। বাসায় তো টিভিতে কত সময় নাচ দেখি।
পীর সাহেবের নাতি তাৎক্ষণিকভাবে যে যুক্তি দিলেন তা খুবই নড়বড়ে কিন্তু সেসব পরিমাপের বিষয় নয়। আমার প্রয়োজন একজন সাথীর। তিনি রাজি হতে চলেছেন তাতেই আমি সন্তুষ্ট। ধরা যাক ওর নাম তসলিম। তসলিম খুব ভালো আরবি জানেন, রাস্তাঘাটও ভালো চেনা। কায়রোতে প্রায় দেড় যুগ হয়ে গেল ওর। তসলিম গাড়ি দাঁড় করায়। বলে,
বাসায় ছেলেদের ফোন করে দিই।
এখানে প্রাইভেট টেলিফোন সার্ভিস খারাপ নয়। রাস্তার সর্বত্র টং-এর মতো সিগারেটের দোকান। সেখান থেকে পাউন্ড খসিয়ে অনায়াসে ফোন করতে পারে যে কেউ।
তসলিমের সাথে মাঝেমধ্যেই বেড়াতে বেরোই। গেল সপ্তাহে গেছিলুম খান-এ-খলিল। সেটি ছিল খান-এ-খলিলে দ্বিতীয় দফা ভ্রমণ। প্রথমবার সঙ্গী হয়েছিলাম ছালামের। ছালাম পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আল আযহার ইউনিভার্সিটির ছাত্র। সমগ্র মুসলিম জাহানে এই ভার্সিটি যথেষ্ট সুনামের অধিকারী ছিল এক সময়। কায়রো এসে সেখানে না যাওয়া এক অর্থে জ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্রে প্রবেশ না করা। আল আযহার ও খান-এ-খলিল পাশাপাশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সময় কাটিয়ে আমরা ঘুরে বেরিয়ে ছিলাম খান-এ-খলিলে। ভার্সিটিতে আমি ভবন দেখেছি ঢুকেছি শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু গ্রন্থাগার দেখার সুযোগ হয়নি। জানি না সেটি কত সমৃদ্ধ। তবে বাহ্যিক পরিবেশ বলছিল তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো এই বিশ্ববিদ্যালয়টিও রুগ্ন। রোদ আমাদের ক্লান্ত করে ফেলছিল। কাছাকাছি কয়েক শতাব্দী প্রাচীন আল আযহার মসজিদে ঢুকলাম। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। ভেতরটা স্নিগ্ধ। মেঝেতে পুরু গালিচা। টিয়া রং। বিশাল মেঝে জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু লোক সটান ঘুমুচ্ছে। প্রবেশ দ্বারের কাছাকাছি মসজিদের অভ্যন্তরে দুটো বয়স্ক মেয়ে। তাঁদের মুখমণ্ডল খোলা। গলা চড়িয়ে ভিক্ষে চাইছে। বেরুতে নিয়ে এক তরুণীর সাথে চোখাচোখি। তার পা, মুখ খোলা। শ্বেতকায়। পরনে বোরখা। মেয়েটি আসলে পর্যটক। বেআব্রু হয়ে যেহেতু মসজিদে ঢোকা নিষিদ্ধ তাই তার এ বেশ। মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে প্রচুর পর্যটকের ভিড় সেখানে। মহিলাদের জন্যে তাই সদর দরজায় বোরখার ব্যবস্থা।
খান-এ-খলিলেও আছে একটি বিখ্যাত মসজিদ। সাধারণভাবে যেটি আল হোসাইন মসজিদ নামেই পরিচিত। এর অভ্যন্তরে একটি কবর। বলা হয়ে থাকে সেটি হযরত হোসেনের। একটি প্রৌঢ় লোক পানির পিপে নিয়ে সারাক্ষণের জন্যে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে। আলাভোলা ভাব নিয়ে সবাইকে জল পান করিয়ে চলেছে। প্রত্যেককে সে এগিয়ে দিচ্ছে এক অঞ্জলি পানি। তাতে নেই কোনো ছেদ, ক্লান্তি।
তসলিমের সাথে দ্বিতীয় বার খান-এ-খলিল যাওয়া কেনাকাটার জন্যে। প্রচুর স্যুভেনির সপ সেখানে। পর্যটকরা গিজ গিজ করছে সারাক্ষণ। সভ্যতার প্রথম কালে ব্যবহৃত প্যাপিরাস কাগজ থেকে আরম্ভ করে ফারাওদের মূর্তি, পিরামিড, স্ফিংকসসহ নানা রকম নিদর্শন বস্তুতে দোকানগুলো ঠাসা। পাথরের মনোহরি গয়নাপত্র, কাপড়চোপড় এবং অন্যান্য সামগ্রীর জোগান বিস্তর। আমি কিনলাম ফেরাউনিক যুগের নানা চিত্র সম্বলিত প্যাপিরাস পেপার আর বিয়াট্রিসের জন্যে মেহেদী গুঁড়ো। স্মরণিকা হিসেবে চাহিদা থাকায় কায়রোতে বর্তমানে লেদার প্যাপিরাস তৈরি হচ্ছে। বলিভিয়া যেখানকার জঙ্গলে সি আই এ খুন করেছিল কিউবার কম্যুনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম নায়ক চে গুয়েবারাকে সেখানকার মেয়ে বিয়াট্রিস প্যারিসে আমার সহপাঠী। কায়রো আসার সময় সে হাতে এক টুকরো কাগজ ধরিয়ে দেয়। তাতে ফরাসিতে লেখা ‘হেনা লা পুর্দ ন্যাতুরেল’। মেয়েরা এই প্রাকৃতিক পাউডারটি চুল খয়েরি করতে ব্যবহার করে। কিন্তু খান-এ-খলিলে তসলিমের চমৎকার আরবিও দোকানীদের বোঝাতে পারল না দ্রব্যটি কী। অথচ বিয়াট্রিস আমাকে বলেছে সারা কায়রোয় এটি সহজলভ্য। কিন্তু কেবল যখন তসলিম ওর লেখা চিরকুটটি দেখল তখনই জানা গেল এটি এতই সাদামাটা জিনিস যে মুদি দোকানে পর্যন্ত মেলে। তসলিম কাগজটি হাতে নিয়ে বলল, ‘আরে এত এন্না। মেহদী গুঁড়া। আপনি খালি বলছেন হেনা ন্যাচারাল পাউডার তাই বুঝতে পারছি না।’
তবে জিনিসটি আসলেই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তৈরি। শুকনো মেহেদী পাতা গুঁড়ো করে ভরা হয়েছে পলিথিনে। বিক্রি ওজনে।
ফোনে বড় ছেলের সাথে কথা বলে তসলিম আবার স্টিয়ারিং ধরল। ওর হালকা খয়েরি রঙের ফিয়াট ছুটে চলল পিরামিড রোডের দিকে। আমাদের হাতে যথেষ্ট সময়। কেবল সন্ধ্যা নামছে কায়রোতে। বেলি নাচের ক্যাবারে শো হতে তখনও ঢের বাকি। অন্ধকার নামলেই না কেবল গহব্বর ছেড়ে বেরুবে নিশাচরেরা। বেরুবে ছিচকে চোর, ডাকসাইটে বদমাশ, সুরা প্রেমিক মদ্যপ, দুর্ভাগা ভবঘুরে এবং ধর্ম ব্যবসায়ী। শুধু তাই বলি কেন- রাতের পৃথিবীতে পাওয়া যাবে এবাদতকারী, ভ্রমনপ্রিয় পর্যটক, লেখক অথবা সিফলিস আক্রান্ত জনপদ কন্যা। আমরা অনুমান করি নৈশক্লাবের মেঝে এখন ধোওয়া মোছা চলছে। টেবিলে লাগছে চেয়ার। মঞ্চের পাশে এখনও পড়ে আছে গেল রাতের অগোছাল বাদ্যযন্ত্র।

কায়রোতে পপুলার ফুড হচ্ছে পুলি আর সোয়ার্মা। সাধারণ মানুষের অল্প পয়সার খাবার। পুলি কতকটা ডাল পুরির মতো। সোয়ার্মাকে বলা যেতে পারে বার্গার। বড় আকারের পাতলা স্লাইস মাংস খাড়া শিকে গেঁথে অবিরাম ঝলসানো হয় অল্প তেজের আগুনে। সেখান থেকেই একটু একটু কেটে বন রুটিতে ঢুকিয়ে তুলে দেওয়া হয় খদ্দেরের প্লেটে। অনেক রেস্টুরেন্টের সোয়ার্মা, পুলি খুবই সুস্বাদু। রীতিমতো লাইন পড়ে যায় দুপুর কিংবা বিকেলে।
সোয়ার্মার চরিত্রটি আন্তর্জাতিক। প্যারিসেও এ খাবার টার্কিশ, গ্রিক রেস্টুরেন্টে পেয়েছি আমরা। সেখানকার স্যাম মিশেল এলাকা বারোয়ারি রেস্তোরাঁয় ভরা। তিউনিশিয়ান, ইতালীয়, আলজেরীয়, টার্কিশ, সিসিলিয়ান সব ধরনের রেস্টুরেন্টে রসনা তৃপ্তির আয়োজন দেদার। প্যারিসের মত এই অল্প একটু স্থান জুড়ে এত বিচিত্র খাবারের সমাহার খুব কমই পাওয়া যাবে। সৌমিত্র, প্রকাশ, চো কখনও কখনও নাসির কিংবা কীর্তিদাকে নিয়ে সেখানে যত না যেতাম খেতে তার চে বেশি চলতো আড্ডা। রেস্তোরাঁর সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে ওখানটায় গজিয়ে উঠেছে বার। ফুটপাতে ছাতার নিচে সাজানো টেবিল চেয়ারে বিয়ার ও কফি নিয়ে প্যারিজিয়ানদের রগড় উপভোগে অনেক বিকেল, সন্ধ্যা কেটেছে আমাদের। স্যাম মিশেলে মেট্রো থেকে বেরুলেই ম্যারাথন আড্ডার প্রাণভূমি, কত আয়োজন। বই আর পত্রিকার দোকান, সিনেমা হল, ফুটপাতে গানের জটলা এবং অপেক্ষমাণ রুপোপজীবিনী। আরও আছে পাড় বোহোমিয়ান যার নিজের খাবারের সংস্থান নেই কিন্তু সঙ্গী কুকুরটির দেহ দশাসই, মোটর সাইকেলে প্রায় পুরো সংসার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো গোছানো পর্যটক, মাগির দালাল আফ্রিকান যুবক এবং অবশ্যই ছেলে বন্ধুদের সাথে প্যারিসের অনিন্দ্য সুন্দরীরা। সবাই যার যার জায়গায়। নিজের মতো করে উপভোগরত। যাতে স্বাধীনতার নামে অন্যের অধিকারে ভাটা না পড়ে। পাশেই নদী সিয়েন। যেন কলহাস্যরতা ত্রিশোর্ধ মহিলা। পাড়ে সার বেঁধে পুরনো বইয়ের দোকান। ছোটো ছোটো। কোনো কোনোটায় আবার পেইন্টিংস, এ্যানটিকস্। ওপারে গির্জা নতারদাম। তীক্ষ্ণ মাথাটি খাড়া। তার ভেতরে, সামনের মাঠে ভিড়। সেখানে কোনো সাধু সন্তের অবয়ব চোখে পড়ে না। তবে অনুমান করি কোথায়ও না কোথায়ও তারা আছেন। আছেন ঘোর ধর্মী গোঁড়া খ্রিস্টান। ইউরোপ কোনো ভিন গ্রহ নয়। সেখানেও এ্যালুপাথের পাশাপাশি না হলেও ধারে কাছে আছে হোমিওপ্যাথ। তার পিছনেই হাতুড়ে। হাতুড়ের কোনো সনদ নেই। তাই বিজ্ঞাপনে প্রচারিত হয় না তাদের নাম। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও বাংলাদেশের মতো সেই ফ্রান্সেও এদের নাম মানুষের মুখে মুখে ছড়ায়।
তসলিমকে পুলি সোয়ার্মার কথা বললে তিনি ফুটপাত লাগোয়া একটি দোকান দেখে গাড়ি দাঁড় করান। পিরামিড রোড ধরে আমরা অনেকটা চলে এসেছি। এদিকটায় গাড়ি চলাচল কম। ফিয়াটে হেলান দিয়ে খাবারের অর্ডার দেই। রাত নামছে কায়রোতে। এই নগর জেগে থাকে গভীর রাত অবধি। বারোটা সাড়ে বারোটায় রাস্তা যদিও নির্জন হয়ে আসে তবুও সারা রাতই কম বেশি ট্যাক্সি মেলে। উইক এন্ডে রাত তিনটার পরও শেরাটনের পাশে নাইলের পাড়ে আমি আড্ডা দেখেছি। কোনো কোনো রাতে মোহাদ্দেসীন থেকে ফিনি স্কোয়ারে ফিরতে রাস্তা পাই ট্যাক্সি চলাচলে জীবন্ত। এর কারণ বড়ো বড়ো নগরে আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে যে ধরনের সমস্যা হয় তা এখানে নেই। কায়রোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট সংগঠিত। সারা শহরেই সতর্ক পাহারা। রাহাজানি, খুন, ছিনতাই প্রায় ঘটে না বললেই চলে। এ জন্যে রাতেও লোকজন বাইরে বেরুতে দ্বিধা করে না। ওয়াকিটকি হাতে আইল্যান্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার কেউ ডিউটি করছে এ দৃশ্য এখানে অস্বাভাবিক নয়। তবে জনান্তিকে বলে রাখি মিসরে ব্রিগেডিয়ারের ছড়াছড়ি। এর কারণ, তাদের সেনা বাহিনীর আকার বড় এবং কায়রো, আছিয়ুতসহ আপার ইজিপ্টের অনেক স্থানেই মৌলবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতা। প্রেসিডেন্ট হুসনে মোবারককে তা ভেবে চিন্তে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা দূর করবার জন্যে দীর্ঘকাল ধরে অনুসৃত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির স্থলে বাজার অর্থনীতির লক্ষ্যে বিনিয়োগ পদ্ধতি অনেক উদার করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক শিল্প কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় ফিরিয়ে দিচ্ছে তার সরকার। দেশ পরিচালনায় তিনি কতটুকু যোগ্য তা আমি জানি না তবে মিসরীয়রা তাঁকে একজন উপযুক্ত প্রশাসক মনে করে না বলেই ধারণা। কায়রোতে এ নিয়ে মজার মজার গল্প আছে। একবার এক মিসরীয় দম্পতি মোবারককে নিয়ে দুটো চমৎকার কৌতুক আমাদেরকে শুনিয়ে ছিলেন আহসানের বাসায়। ভদ্রলোক কম্পিউটার নিয়ে বড় কোনো কাজ করেন। বউটি থাকেন হার্ভার্ডে। লোক প্রশাসনের উপর পি.এইচ.ডি. করতে। ওঁদের বয়ানেই শোনা যাক কেচ্ছা দুটি।
ফেরাউনিক রাজা রামসিসের মূর্তি। সামনে বিব্রত মুখে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। তিনি কায়রোবাসীর সুখ-দুঃখের খবর নিতে নগর পরিভ্রমণে বেরিয়ে রামসিসের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল দেখে বড়ই নাজুক অবস্থায় পড়েছেন। জিগ্যেস করলেন,
রাজা আপনি কাঁদছেন কেন?
আমার খুব কষ্ট সাদাত। তুমি তো জান এভাবে চারহাজার বছর ধরে টানা দাঁড়িয়ে আছি। অন্তত বসার জন্যে যদি একটি ঘোড়াও পেতাম। এ দেশে কত জনের কত কিছু হয়ে গেল আর আমার সামান্য বসার ব্যবস্থাও হলো না।
সাদাত দপ্তরে পৌঁছে জরুরি ক্যাবিনেট সভা ডাকলেন। উদ্দেশ্য মিসরের গর্ব রাজা রামসিসের ব্যাপারে কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া। বৈঠকে স্থির হলো রাজার মূর্তিটির পেছনে একটি সিংহাসন স্থাপন করা হবে যাতে তিনি প্রয়োজনে বসতে পারেন।
বিকেলে প্রেসিডেন্ট সাদাত তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মোবারককে নিয়ে রামসিসের কাছে গেলেন ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত জানাতে। তাদেরকে দেখা মাত্র রামসিস ডুকরে কেঁদে উঠলেন। সাদাত তাড়াতাড়ি বললেন,
কাঁদবেন না রাজা। আপনার জন্যে ভালো খবর আছে।
তখন রামসিস মোবারককে দেখিয়ে হতাশ স্বরে উত্তর করলেন,
আর খবর। আমি চাইলাম একটি ঘোড়া আর তুমি নিয়ে এলে একটি গাধা।
দ্বিতীয় কৌতুকটিও রসাল।
কায়রোতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশের অনুষ্ঠান। স্থান প্রেসিডেন্ট মোবারকের কার্যালয়। রাষ্ট্রদূত তাঁকে নমস্কারের সাথে সেই যে মাথা নোয়ালেন আর কিছুতেই তুলছেন না। সবাই হতবাক। ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করল মিসরীয় কর্মকর্তারা। দূতাবাস কোনো কারণ বলতে পারল না। পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে সমস্ত জানিয়ে খবর গেল দিল্লির সাউথ ব্লকে। ভারতীয় কূটনৈতিক সার্ভিসের কর্তাব্যক্তিরাও প্রথমে বিমূঢ় হয়ে থাকলেন। শেষে মিসর সরকারকে বলা হলো রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত ধর্মভীরু গোঁড়া হিন্দু। দেবতাতে ভক্তি একটু বেশি। মাথা নুইয়ে থাকার একটি কারণ হতে পারে ওর সামনে কোনো গো-দেবতা পড়েছে। বিষয়টি অনুসন্ধানের অনুরোধ করা হলো। তখন মিসরীয়রা মোবারককে সরিয়ে নিলে তবেই না রাষ্ট্রদূত মাথা তুললেন।
খাবার আধাআধি শেষ করে তসলিম আর আমি আবার গাড়িতে উঠলাম। বাসি হয়ে যাওয়ায় খাবারগুলো খুব বিস্বাদ লাগছিল। পিরামিড রোডে একটার পর একটা নাইট ক্লাবে হানা দিতে থাকলাম আমরা। অনুমান ঠিক ছিল আমাদের। নাচশালার গোছগাছ শেষ কিন্তু অভিসার প্রিয় মানুষের আগমন ঘটেনি এখনও। শুধু ফোনে কিছু কিছু টেবিল সংরক্ষণ করেছে কেউ কেউ। কোলকাতায় এক সময় যখন যথেচ্ছ নৈশক্লাবের প্রকোপ ছিল তখন এক বোতল বিয়ারে পুরো ক্যাবারে শো কাবার করতে দেখেছি কাউকে কাউকে। কায়রোতেও ব্যবস্থাটি তেমনই। কোনো টিকেট ব্যবস্থা নেই। তবে কোলকাতার মতো শুধু বিয়ার যথেষ্ট নয়। সেখানে ন্যূনতম অর্ডার নৈশভোজ। দর্শক শ্রোতারা আহারের সাথে দীর্ঘক্ষণ ধরে নাচ দেখে। সে জন্যেই মঞ্চের কাছের টেবিল আগাম ঠিক করে রাখা।
পছন্দের জন্যে খুব বেশি ঘোরাঘুরিতে আমার আগ্রহ নেই। আরবীয় নাচ দেখা বলে কথা। তাই যে কোনো নাইট ক্লাবে আপত্তি নেই আমার। কিন্তু তসলিমের প্রবল উৎসাহ এতে। তিনি প্রত্যেকটি ক্লাবে নর্তকীদের টানানো ছবি দেখছেন এবং নৈশভোজের বিল জেনে নিচ্ছেন। ওঁর আরবি চমৎকার তাই খুব স্বচ্ছন্দে চালিয়ে যাচ্ছেন কথাবার্তা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব নাইটক্লাবেই একই নাচিয়েদের ছবি। অর্থাৎ গুটিকয়েক মেয়েই রাতের বিভিন্ন প্রহরে একাধিক জায়গায় নাচে। কিছু মেয়ে আছে তারা শুধু গান করে। ‘ডানানীড়’ নামে একটি ক্লাব পছন্দ হলো আমাদের। তসলিম ওঁর ফিয়াট দাঁড় করিয়েছিলেন রাস্তার অন্য পাড়ে। গাড়িটি নিয়ে আসতে চাইলেন তিনি। খদ্দের কেটে যাবার ভয়ে ক্লাবের একজন এগিয়ে বললেন, ‘চাবি দিন নিয়ে আসছি। আপনারা কেন কষ্ট করবেন।’ চাবি নিয়ে লোকটি যে গেল অনেকক্ষণ আর আসে না। ক্লাবটি ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে। আমরা বাইরে ফুটপাতে এসে দাঁড়ালাম। আর তখুনি আমাদের আশ্চর্য করে দিয়ে একটি সাদা ফিয়াট নিয়ে হাজির হলো সে। তসলিম বললেন, ‘কি সাংঘাতিক আপনি তো অন্যের গাড়ি হাঁকিয়ে এসেছেন। আপনাকে তো দেখিয়ে বলেই দিলাম আমার গাড়ি হালকা মেরুন রঙের। যান, তাড়াতাড়ি যান, দেখেন গিয়ে মালিক ছুটে আসছে কিনা।’
আমার মনে হলো কি ধন্ধরে বাবা। এক গাড়ির চাবি অন্যটিতে লেগে গেল। হোক না দুটোই ফিয়াট। তসলিম আসলে চাবি ছাড়তে চায়নি লোকটির হাতে। কিন্তু ওরা খদ্দের হাতছাড়া হবার ভয়ে মিনতিপূর্ণ ভদ্রতায় চাবিটি না নিয়ে ছাড়ল না।
কদিন আগেও এই রকম গাড়ি নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছিলাম। ট্যাক্সি করে আসছি তাহরির স্কোয়ার থেকে ময়দান ফিনি। নাইলের ওপর দীর্ঘ, প্রশস্থ সেতু। চার লেন। বেলা বারোটার মতো। মাথার ওপরে ডগমগে সূর্য। তার তাপে দগ্ধ হচ্ছে সমগ্র চরাচর। গাড়ি ছুটছে সাঁ সাঁ। কায়রোতে ঢাকার মতো রিকশা নেই। সেতুর মাঝখানে ট্যাক্সির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার দরজা খুলে একহাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অন্য হাতে ঠেলতে লাগল গাড়ী। তাতে কি আর বি এম ডব্লিও এগোয়। পেছনে গাড়ির লাইন বাড়ছে। কায়রোর ব্যস্ত দিন। হর্ন পড়তে থাকল। ফরাসি দূতাবাসের বাণিজ্যিক শাখা থেকে ফিরছিলাম আমি। গায়ের পোশাকটি তাই দস্তুরমতো আনুষ্ঠানিক। গাড়ি থেকে নেমে সেটির পিছে হাত লাগালাম। ঝাঁক ঝাঁক যানবাহনের মাঝে গাড়ি ঠেলার সে দৃশ্যটি সবার চোখ কাড়ছিল। রোদে ঘেমে যাচ্ছিল শরীর। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। পাশ দিয়ে ধাবমান পাবলিক বাস সামনের খোলা দরজা ফটাস করে মেরে বেরিয়ে গেল। দরজাটি ঢং করে পরল সেতুর উপর। খুব বাঁচা ড্রাইভারের কিছু হয়নি। কিন্তু তার মুখটিতে এত করুণভাব ফুটে উঠল যে আমার খুব খারাপ লাগতে থাকল। সে দাঁড়িয়ে পড়লে আমি পুরো ভাড়া দিয়ে দ্রুত ফুটপাতে উঠলাম। ততক্ষণে ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেছে।
তসলিম নিজেই গাড়ি নিয়ে এলেন। নাইটক্লাব হিসেবে ডানানীড় খুব একটা বড় নয়। চল্লিশটি আসন হবে কিনা সন্দেহ। মঞ্চের সামনে চার চেয়ারের একটি টেবিল। সংরক্ষিত। তসলিমকে নিয়ে তার পাশে বসলাম। কক্ষটিকে মনে হচ্ছে একটি গুহার মতো। দেওয়াল, পিলার অমসৃণ। সেগুলোর গায়ে পাথরের মাথা বেরিয়ে আছে। পরিকল্পনা মতো এভাবেই করা হয়েছে নির্মাণ কাজটি। ছাদও তা থেকে বাদ যায়নি। দেয়ালে মানি প্ল্যান্টসহ টবে নানা জাতের চারা। অর্কিড। অনুজ্জল আলো। ছায়ার মতো ঘুরছে বেয়ারারা। ছাইদানিতে কোনো সিগারেটের টুকরো জমতেই পালটে দিচ্ছে। পানীয়ের ফরমায়েশ পড়ছে অল্প। সারারাত নাচ চলবে। পেটে অ্যালকোহল পড়লে চোখ যদি বুজে আসে। বারোটার পর নাচ শুরু হলো। আরম্ভ হবার ধরনটি গ্রাম্য যাত্রার মতো। রাত বেড়ে চলে কিন্তু যাত্রাপালার মঞ্চে পাত্র মিত্রের দেখা নেই। শুধু বাদন চলতে থাকে। দীর্ঘ সময় নিয়ে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার তীব্রতা দ্রুত লয়ের সাথে। শেষমেষ দর্শকরা যখন অতিষ্ঠ হয়ে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে তখুনি কেবল শুরু হয় পালা। বসে বসে এতক্ষণ যা দেখছি তাতে মনে হতেই পারে আরবীয় নাচের আরম্ভ ওই রকমই। একবার ধারণা হয়েছিল সবগুলো টেবিল পুরো না হওয়া পর্যন্ত বুঝি মঞ্চে কোনো নাচিয়ের দেখা পাওয়া যাবে না। কিন্তু কারণটি ছিল অন্য রকম। যিনি নাচবেন প্রথমে, তিনি ততক্ষণে অন্য ক্যাবারে কাঁপাচ্ছেন কোমরের কারুকাজে। কায়রোর নাইট ক্লাবগুলোয় রাত ভোর না হওয়া অবধি এরা ঘুরেফিরে নাচে।
ক্যাবরেতে কোনো হল্লা নেই। আরবীয় নর্তকীদের পোশাক পাশ্চাত্যের মতো নয়। এদের বক্ষ বন্ধনী ও প্যান্টিতে যথেষ্ঠ সোনালি, রূপালি জরির কাজ। কোমর থেকে নিতম্বের নিচ পর্যন্ত ঝালর। হাতে চুমকি বসানো ওড়না। কোনো কোনোটি সবুজ, কোনোটি আবার গাঢ় বেগুনি। নাভি আর বুকের দুলনিতে নাচ মাঝেমধ্যেই উদ্দাম হয়ে উঠছে কিন্তু কোনো টেবিল চাপড়ানো বা শিষ নেই। আছে পীনোন্নত বক্ষ পানে পাউন্ড ছুড়ে মারা। মজনু পরিচিত হলে নাম ঘোষিত হচ্ছে সাথে সাথে। না চেনা হলে নাম জানার চেষ্টা চলে। পাউন্ড ছড়ানো দর্শকদের কারও কারও দেশের নামও স্পীকারে শুনলাম আমরা।
তাসলীম বলল
দেবেন নাকি কিছু?
সংক্ষেপে জবাব দিলাম
না।
নাচের মাঝে মাঝে গান ঢোকানো হচ্ছে। একক কণ্ঠে। কখনও নারী কখনও পুরুষ শিল্পী আসছে মঞ্চে। রজনি গভীরতর হচ্ছে। এর মাঝে লোকজন নর্তকীর দেহে চোখ রেখে সেরে নিচ্ছে নৈশভোজ। কেউবা টয়লেটের সামনে। হাতে সিগারেট। পায়চারি করছে।
ধোঁয়ায় আটকে যাচ্ছে ভেনটিলিটিং পাখার বাতাস। আমার চোখ জ্বালা করে। ধোঁওয়া ও ঘুমে। ঘুম তাড়াতে সিগারেট জ্বালাই। কিন্তু তবুও হাই ওঠে। একটি দুদ্দাড় শব্দ উঠল। সংরক্ষিত টেবিলটিতে দেখতে পেলাম অর্ধ বোতল ব্ল্যাক লেবেল। বরফ। চারজন গিয়ে বসলেন সেখানটায়। তাদের একজন নারী। নগ্ন হাটু। স্কার্ট পরে আছে। দুপেগ পানের পর মহিলা মঞ্চে উঠে নাচতে শুরু করল। তার পেটে মেদ। থলথলে শরীর। নিচের ঠোঁট ঝুলে থাকায় মনে হলো ফাঁক হয়ে আছে মুখ।
তসলিমকে বলি
এবার আমায় উঠতে হবে।
উঠবেন। বসলেই হয় খানিকটা। রাতের বেশি বাকি নেই।
তসলিমের ওঠার ইচ্ছে নেই বুঝে বসে থাকি। আমি আর বৈচিত্র্য পাচ্ছি না। একই নাচ নানা দেহে। এক তরুণী গায়িকা তসলিমের নজর কেড়েছে। মেয়েটির চেহারা ছায়াছবিতে ঘোড়া ছোটানো নায়িকার মতো। তসলিম খুব ভালো মানুষ। দোষ নেই তাঁর। গায়িকাই ওকে বিরক্ত করছে। তসলিমের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে গান গায় আর আঙুল কাটে। ঠোঁটের এক চিলতে হাসি বাড়তে দিচ্ছে না কোনোমতেই। তসলিমের দেশের নাম জিগ্যেস করল মেয়েটি। মঞ্চ থেকে দর্শকদের এ ধারার জিজ্ঞাসাবাদ হামেশাই চলছে। তসলিম স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলো
বাংলাদেশ।
শুরু হলো বাংলাদেশের প্রশংসা। তসলিমকে বললাম
উঠি এবার। যথেষ্ট হয়েছে। আর না।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com