শাড়িতে ফ্রিদা কাহলো! পাশে নয়নতারা

মুহিত হাসান | ২৪ নভেম্বর ২০১৭ ১০:২৮ পূর্বাহ্ন

Fridaভারতীয় মার্ক্সবাদী লেখক ও ইতিহাসবিদ বিজয় প্রসাদ একদিন ইন্সটাগ্রামে একটি ছবি খুঁজে পান, যা তিনি আগে কখনোই দেখেননি। ‘বর্ডারস অ্যান্ড ফল’ নামের ভারতীয় শিল্প ও ফ্যাশন নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের ইন্সটাগ্রাম একাউন্ট থেকে পোস্ট করা সেই ছবিতে দেখা যায়, একটি চমৎকার শাড়ি পরিহিত অবস্থায় বসে আছেন প্রখ্যাত মেক্সিকান চিত্রকর ফিদ্রা কাহলো, আর তাঁর দু পাশে আরো দ্জুন নারী– চেহারার দিকে খেয়াল করলে যাঁদের ভারতীয় বলেই মনে হয়। শাড়িতে ফিদ্রাকে দেখে তাঁর রীতিমতো চমকে যাওয়ার দশা হলো স্বভাবতই। ওই ইন্সটাগ্রাম পোস্টের শিরোনামে বা কোনো মন্তব্যেও সংশ্লিষ্ট জরুরি তথ্যাদি ছিল না।
পরক্ষণেই তাঁর খেয়াল হলো, ছবিটিতে থাকা ভারতীয় দুই নারীর মধ্যে অন্তত একজনকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। পরে নিশ্চিত হলেন, ফিদ্রার বাঁ পাশে যিনি বসে আছেন তিনি প্রখ্যাত লেখিকা নয়নতারা সেহগল। রনজিৎ সীতারাম পণ্ডিত বিজয়লক্ষী পণ্ডিতের কন্যা ও জওহরলাল নেহেরুর ভাগ্নি এই কথাশিল্পী এখন থাকেন ভারতের দেরাদুনে। আর ডান পাশে যাঁকে দেখা যাচ্ছে, তিনি নয়নতারার কনিষ্ঠ বোন রিতা ধর। তাঁদের মা বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ভারত স্বাধীন হবার পর সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর তিনি মেক্সিকোয় ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন। তিনি আমেরিকাতেও রাষ্ট্রদূত হিসেবে ছিলেন।

ফিদ্রা কাহলোর সাথে এই দুই বোনের দেখা হবার নেপথ্যে তাঁদের পারিবারিক ঘটনাবলি এবং প্রেক্ষাপটের একটি ভূমিকা রয়েছে আসলে। গত শতকের চল্লিশের দশকের শুরুতে যখন স্বাধীনতার দাবিতে ভারত উত্তাল হয়ে উঠেছে, তখন নয়নতারা-রিতার বাবা-মা দুজনই ইংরেজ-বিরোধীতার দায়ে গ্রেফতার হন। এমনকি তাঁদের বড় বোন চন্দ্রলেখাকেও ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে কারাগারে যেতে হয়েছিল। এমন সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও শুরু হয়। তখন চীনের নেতা চিয়াং কাই শেক তাঁর স্ত্রী সুং মেই লিংকে সাথে নিয়ে ভারতে এলেন এই বার্তা নিয়ে যে ভারতে একটি ‘জাতীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তাহলে বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির শক্তি অধিকতর হারে বাড়বে। ইংরেজ সরকার স্বভাবতই ওই প্রস্তাব মেনে নেয়নি। এই সময়, নেহেরু-পণ্ডিতের পরিবারের দুর্দশা জানতে পেরে সুই মেই লিং তথা চৈনিক জনতার ‘ম্যাডাম চিয়াং’ নয়নতারা ও রিতা দুই বোনকে আমেরিকায় বিখ্যাত ওয়েলসলি কলেজে পড়াশোনার জন্য ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি ছিল না। উল্লেখ্য, তিনি নিজেও ওই কলেজের শিক্ষাথী ছিলেন।
১৯৪৭ সালের গ্রীষ্মকালে নয়নতারা সেহগল ওয়েলসলি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করলেন। এমন সময় তাঁর ইচ্ছা হয়েছিল, আমেরিকায় আর নয়, বোনকে নিয়ে ছুটিতে মেক্সিকো বেড়িয়ে আসবেন। যে কথা সেই কাজ। আর মেক্সিকোতে তাঁরা যাঁর বাড়িতে অতিথি হয়ে ছিলেন, তিনি আবার ফ্রিদা কাহলোকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন। কাজেই ফিদ্রার সাথে দেখা করার এই সুযোগ ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। ওই সময়টায় ফ্রিদা বেশ অসুস্থ ছিলেন। থাকতেন নিজের শৈশবে বেড়ে ওঠার স্থান লা কাসা আজুল এলাকায়। তখন তিনি মেরুদণ্ডের সমস্যায় বিকট আকারে ভুগছিলেন। ভীষণ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া শিরদাঁড়া সোজা রাখার জন্য তিনি সর্বদা করসেট পরিধান করে থাকতেন।
নয়নতারা সেহগল পরে লিখেছেন, সরাসরি ফ্রিদার বাড়িতে গিয়ে তাঁরা দুই বোন তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত একজন শিল্পীর সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি তাঁদের কাছে দারুণ আকর্ষণ-জাগানিয়া ছিল বৈকি। আলাপসালাপ হবার পর তাঁরা ফ্রিদাকে তাঁদের সঙ্গে করে আনা একটি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্রিদার নাকি এই উপমহাদেশীয় পোশাকটি খুব পছন্দ হয়েছিল। পরে তিনি নয়নতারাকে নিজের দু্িট আলোকচিত্র উপহার দিয়েছিলেন, তাতে আবার নিজে সইও করেছিলেন। এক কথায়, ফ্রিদার সান্নিধ্য দুই বোনকে যারপরনাই মুগ্ধ ও ঋদ্ধ করেছিল।
এর মাত্র ক’ বছর পর, ১৯৫৪ সালে, ফ্রিদা কাহলো সাতচল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

সূত্র: স্ক্রল.ইন।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurita Nusrat Khandoker — নভেম্বর ২৪, ২০১৭ @ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রিসিলা রাজ — নভেম্বর ২৬, ২০১৭ @ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন

      সত্যি অসাধারণ এক আবিষ্কার! বিডিনিউজ২৪.কমকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুদরাতে খোদা — নভেম্বর ২৮, ২০১৭ @ ৮:২১ পূর্বাহ্ন

      ফ্রিদা কাহলোকে শাড়ীতে বাঙালির সামনে হাজির করে এক অসাধারণ কাজ করেছেন।
      আগ্রহীজনেরা Julie Taymor পরিচালিত ‘ফ্রিদা’ ছবিটি উপভোগ করবেন আমার বিশ্বাস।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com