ঢাকা লিট ফেস্ট : বাংলাদেশের জনবিচ্ছিন্ন এলিটদের উৎসব

আনিসুর রহমান | ২২ নভেম্বর ২০১৭ ৯:২৫ অপরাহ্ন

লেখকরা সঙ্ঘ সমিতি করবেন, উৎসব করবেন, দোষের কিছু না| বরং তা প্রয়োজন এবং প্রাসঙ্গিক| তা নতুন কিছু নয়| ১৯২১ সালে বিলেতে আন্তর্জাতিক পেন প্রতিষ্ঠার আগেই আমাদের এখানে ১৮৯৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের জন্ম হয়ছিল| এমনকি ১৮৯৪ সালে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সহসভাপতি নির্বাচিত হয়ছিলেন; রমেশচন্দ্র দত্ত ছিলেন সভাপতি|

এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলা সাহিত্যের উন্নতি সাধন ছিল পরিষদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রথমদিকে এর প্রায় সব কাজই ইংরেজিতে সম্পন্ন হতো। এমনকি সভার মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ‘দি বেঙ্গল একাডেমি অব লিটারেচার’-এর অধিকাংশই লিপিবদ্ধ হতো ইংরেজিতে। এই অসঙ্গতি দূর করার উদ্দেশে ১৮৯৪ সালে পরিষদের নামটি ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ হিসেবে সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। এরপর থেকে পরিষদের মুখপত্রটি ‘সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা’ নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকা হিসেবে বাংলায় প্রকাশিত হতে থাকে।

এবার আসা যাক আমাদের দেশের হাল আমলের বাস্তবতায় | বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ রকম ক্ষুদ্র জাতি এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রায় ৩৮টি আলাদা ভাষা রয়েছে। তবে মাত্র দুটি ভাষার পূর্ণাঙ্গ এবং কয়েকটি ভাষার আংশিক বর্ণমালা বিদ্যমান| রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও চর্চার সুযোগ না থাকায় এসব ভাষার বিকাশ যখন নানা ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত, ঠিক তখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের টাকায় এলিটতোষণ তথা কর্পোরেট পোষণ করার মাধ্যমে ঢাকা লিট ফেস্ট নামের এক বিতর্কিত উৎসব অনুষ্ঠিত হলো |

এটা শুরু হয়েছিল বছর কয়েক পূর্বে বৃটেন থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমদানী হে-উৎসবের নামে|পরে প্রতিবাদের মুখে এর নাম পালটিয়ে ঢাকা লিট ফেস্ট চালিয়ে দেবার ফন্দি করেন আয়োজকরা| ফন্দি যে অনেকটা সফল হয়েছে তার নমুনা সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ দেখলেই বোধগম্য হবে| এভাবে কর্পোরেট ভূত আমাদের মাথা খেয়ে নিতে বসেছে| এটা যে সাম্রাজ্যবাদী আমদানী তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট; ’Dhaka Literary Festival (DLF or Dhaka Lit Fest), held at the historic premises of the Bangla Academy every year since 2012, marks a resurgence of Bangladeshi literary culture while vigorously engaging other cultures far beyond our own borders. DLF began its journey with a pilot event in 2011 under the aegis of the world famous Hay-on-Wye festival.’

আমার একটা সাদামাটা প্রশ্ন, চর্যাপদের উত্তরাধিকার বহন করা আমাদের বাংলাদেশ কি এতটাই কাঙ্গাল যে, ইংরেজি-নির্ভর এরকম একটা সাম্রাজ্যবাদী উপাদান জনগণের করের টাকায় জায়েজ করতে হবে? আমরা কেন ভুলে ষাই আমাদের রবীন্দ্রনাথ আমাদের মাতৃভাষা বাংলাতে লিখেই দুনিয়াকে জয় করেছিলেন? কবি আবদুল হাকিম কি এমনি-এমনি লিখেছিলেন ‘যেসব বঙ্গে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি?’

ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষকদের চেয়ে মাদ্রাসা মাধ্যমের শিক্ষকরা অধিকতর মেধাবী বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের শিক্ষক দার্শনিক-অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার লোকেরা লেখাপড়া জানে না এমন প্রচারণা সঠিক নয়। আমি অবাক হলাম আমাদের ইংরেজির পণ্ডিত মহোদয়গণ এই বিতর্কে অংশ নিলেন না, সুবোধ বালকের মত অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের বেহুদা কথা মানিয়া নিলেন| এলিট বলে কথা|

মাইকেল মধুসূদন কি হুদাহুদি ইংরেজি ছেড়ে বাংলায় লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছিলেন ? কে কারে বুঝাবে? মূর্খতা আর কপটতা যদি আমাদের পেয়ে বসে আমাদের উদ্ধার করবে কে?

টি. এস. এলিয়ট লিখে গেছেন, সাহিত্য যদি বেনিয়াদের দখলে চলে যায়, তাহলে সর্বনাশ| আমরা কি সেই সর্বনাশা সময় পার করছি?

‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ নামক এই সাহিত্য উৎসবের নামে এই বিদেশিয়ানা ক্লাবের সভ্য ও কুশীলব এরা কারা? আসলে বিভিন্ন কর্পোরেট গণমাধ্যমের সুবিধাভোগী কতিপয় ব্যক্তি, নানা পর্যায়ের কর্তৃপক্ষীয় পদাধিকারী, কর্পোরেট আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি| এদের সঙ্গে ‍যুক্ত হয়েছেন কতিপয় লেখকও| বেশ| এ প্রসঙ্গে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর বিরোধিতাকারী আমাদের জনপ্রিয় এক কবিকে একবার কথা প্রসঙ্গে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কেন বিতর্কিত এই উৎসবে যোগ দিলেন? তাঁর উত্তর, আমি আয়োজক কর্পোরেট-গোষ্ঠী প্রদত্ত পুরস্কার গ্রহণ করেছিলাম| তার কৃতজ্ঞতাস্বরপ আমি এই উৎসবে যোগ দিয়ছিলাম|

এইভাবে পুরস্কার ও গণমাধ্যমের দোকান খুলে বেনিয়া গোষ্ঠী নিজেদের আজ্ঞাবহ লেখকদের আসর জমাচ্ছেন| আমরা কিভাবে ভুলবো, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তব্য দিয়েছিলেন| ১৯৫২ সালে আমরা কেন মাতৃভাষার জন্যে আন্দোলন করেছিলাম? প্রহসন কাকে বলে? আমরা কোন মুখে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা নিয়ে গদগদ, যেখানে নিজেদের আদিবাসীদের মাতৃভাষাকে অবহেলায় বিলুপ্তির অতলে ঠেলে দিচ্ছি? নিজেদের মাতৃভাষা বাংলাকেও অপমান করে ছাড়ছি|

ভাবতে তবুও ভলো লাগে আমরা নাকি এগিয়ে চলছি| আমাদের মুখে ইংরেজি ফুটছে| এভাবেই এরা সাহিত্যের নাম করে দেশি বিদেশি লেখকদের সঙ্গে বেনিয়া, আমলা ও আত্মীয়পোষ্য নতুন এক এলিট ক্লাব গড়ে তুলছেন| সমস্যাটা সেটাও না| সমস্যা হলো টাকাটা আমাদের আমআদমি গরীব জনগণের| আরো একটু ভেঙে বলি, একটি মার্কেটিং কোম্পানীর সভাপতি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আত্মীয়পরিজন, পরিচালকসহ কমপক্ষে চারজন এই উrসবের বক্তা| আহা, তারাও লেখক বটে| ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হয়| আমরা কি সে সত্য বেমালুম ভুলে গেলাম?

১৯৮৭ সালে সেনাশাসক স্বৈরাচার এরশাদ এশীয় কবিতা উrসব নামে ক্ষমতার রসদে জনগণের টাকায় প্রায় এরকম একটা এলিট উrসবের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে দেশের অনেক পদধারী, পদলোভীসহ বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কবিও যোগ দিয়েছিলেন| সে উৎসবে ব্রিটিশ কবি টেড হিউজেসও অংশ নিয়েছিলেন | আজকের ঢাকা লিট ফেস্টে সিরিয়ার নাম-পাল্টানো কবি এদোনিস যেমন এসেছেন|

সেই সময়ে আমাদের কপাল ভাল ছিল| কবি শামসুর রাহমানের নেতৃত্বে এদেশের কবিরা কবিতার নামে এলিট মেলার প্রতিবাদ করেছিলেন| পাল্টা উৎসব করেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন জাতীয় কবিতা উৎসব| যা আজও চলমান| শামসুর রাহমান আজ বেঁচে নাই| জাতীয় কবিতা পরিষদ আছে| তাঁর অবর্তমানে আমরা কি কর্পোরেট বেনিয়ার করাল গ্রাসে ঢুকে গেলাম? আমরা কি সকলেই এলিট হয়ে গেলাম?
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুদরাতে খোদা — নভেম্বর ২৩, ২০১৭ @ ৩:৫৯ পূর্বাহ্ন

      অতি যুক্তিযুক্ত, তথ্যবহুল ও সাহসী লেখার জন্য লেখককে ধন্যবাদ ।
      তবে, মনজগতে ইংরেজি প্রভুদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে বাঙ্গালীর এখনও বহু দেরী।
      কবি আবদুল হাকিম কি এমনি-এমনি লিখেছিলেন ‘যেসব বঙ্গে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি?’

      অতএব, এই সব বাঙ্গালীর বাংরেজি প্রেম থেকে এখন বুঝে নেন তাহারা কাহার জন্ম …

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন DILRUBA SHAHANA — নভেম্বর ২৪, ২০১৭ @ ৫:০৭ অপরাহ্ন

      লেখাটি পড়ে আনন্দ হল। লেখক ও আর্টস বিডি নিউজকে ধন্যবাদ। প্রথম নন ইউরোপিয়ান এবং প্রথম নন-হোয়াইট বাংলাভাষায় লিখেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁকে আমরা সবাই চিনি, তিনি রবীঠাকুর।
      এবার বাংলাভাষী কেমন পাঠক সে ঘটনা বলছি। বাঙ্গালিরা গল্প, উপন্যাস, কবিতাই শুধু পড়েন তা নয়। আরও নানা বিষয়ে তাদের আগ্রহ লক্ষণীয়। বৈচিত্রময় তাদের পাঠস্পৃহা। এই বক্তব্যের সপক্ষে একটি প্রমাণ তুলে ধরছি। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর আত্মজীবনী বাংলায় অনূদিত হয়। ওই বইয়ের গ্রন্থস্বত্ত্ব বা কপিরাইট রয়েছে অষ্ট্রেলীয় এক পাবলিশারের। তার কাছ থেকে আইনগত অনুমোদন নিয়েই অনুবাদ করা হয়। ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বই ‘আমার কৈশোর আমার তারুণ্য’ বাংলাদেশের পাঠকেরা সাদরে গ্রহণ করেন। এর প্রমাণ বইয়ের বিক্রিবাট্টা ভাল নয়। বাংলাদেশের প্রকাশক ও অনুবাদক দুজনেই খুশী। পরবর্তী সময়ে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে অষ্ট্রেলীয় প্রকাশককে তার প্রাপ্যও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে এসে আমার উপর দায়িত্ব পরে অষ্ট্রেলীয় ওশেন প্রেসকে তার প্রাপ্য অর্থ পৌঁছে দেয়ার। উল্লেখ্য এই প্রকাশক ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার বইয়ের ইংরেজী অনুবাদ বিক্রি থেকে বছরে ৪০০, ৫০০ হাজার ডলার অর্জন করে থাকে। তারপরেও সুদূর বাংলাদেশ থেকে বাংলা অনুবাদ বই বিক্রির অর্থ শতেক ডলার পেয়ে যতোনা খুশী প্রকাশক হলেন তার চেয়ে বেশী বাংলাদেশের পাঠকদের প্রতি বিস্ময় মিশ্রিত শ্রদ্ধা জানালেন। আমাদের বাংলাভাষার পাঠকও নমস্য!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরাফাত — নভেম্বর ২৭, ২০১৭ @ ১২:০৫ অপরাহ্ন

      ঢালাও অভিযোগ কোনো কাজের কথা না। সাহিত্য সব সময়ই এলিটদের ছিল, হয় জ্ঞানে বিজ্ঞান চিন্তায় এলিট কিংবা টাকা পয়সায়। বাংলাদেশের কালি ও কলম সাহিত্য পত্রিকার মতো ম্যগাজিন বিক্রি হয় দু তিন হাজার কপি। সেখানে যে যার মতো চেষ্টা করলে দোষ কি? কিছু পাঠক যদি বাড়ে, দুটো লোক যদি বেশী বাংলাদেশকে চিনে, আমার কোনো অসুবিধা নেই উৎসবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাজুল হাসান — নভেম্বর ২৭, ২০১৭ @ ২:৪৭ অপরাহ্ন

      প্রথমে বলছি, আমি এই উৎসবে গিয়েছি ও কবিতা পড়েছি, দু হাজার টাকা সম্মানি পেয়েছি। আমি এলিট না, সামান্য কবিতাকর্মী। আমি বাংলায় কবিতা পড়েছি, আমাদের সেশনের প্রায় সবাই তাই করেছে।

      এটা তো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় উৎসব নয়, বাংলা একাডেমির উৎসব নয়, তাই আয়োজকদের রুচি অনুযায়ী হবে- এটাই স্বাভাবিক। আমার একটা প্রশ্ন : এলিটদের কি উৎসব করার অধিকার নাই?

      এই উৎসব যখন হয়নি তখনও বাঙলা ভাষা গেলো গেলো, বাংলিশ সব খেয়ে ফেললো বলে রব ছিল। এখনও আছে। নতুন কি?

      বাংলায় শিল্প সাহিত্য চর্চা-পৃষ্ঠপোষকতা, যারা কুতুব, অধ্যাপক/সার/করপোরেট কবি সবাই তো শোষক শ্রেণির, কেউ তো আর প্রলেতারিয়েট নয়, এই যে বছর বছর সাহিত্য পুরস্কার এগুলো কি এলিটজমের প্রাতীক না?

      পুজিবাদী রাষ্ট্রে শিল্প-সাহিত্য তা যে ভাষাতেই হোক, যে স্লোগানে হোক তা বর্জুয়া নিয়ন্ত্রিত; এমন কি আজকের লালন উৎসবও

      আর বিশ্বায়নের দুনিয়ায় কবি কবিতা সবাই পন্য, এ অলংঘনীয় বাস্তবতা, এটাকে কাউন্টার দিতে হলে বিকল্প যা দাঁড়াবে (যদি দাঁড়ায়) তাও আরেক ফর্মে বিশ্বায়ন।

      এবার প্রতিবাদ প্রসঙ্গ। কখনও কখনও স্যোসাল একমডেশনে টানাপোড়েন থেকে তৈরি হয় বিরোধিতা। যেমন: হে ফেস্টের যারা বিরোধীতা করেছিল, তাদের অনেকে লিট ফেস্টে আসর গুলজার করেছেন। মানে তারা এলিটিজমের পার্ট হতে পেরে ধন্য। (হয়তো আমিও…)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আইরিন সুলতানা — নভেম্বর ২৮, ২০১৭ @ ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

      শুরুতেই আলোচককে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ প্রসঙ্গটির অবতারণায়।

      লিট ফেস্ট এর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয়যুক্ত আলোচনা নিয়ে আমার সায় আছে। তবে এমন আলোচনায় কিছু প্রসঙ্গকে ভুল ভাবে ব্যবহার করা হলো বলে এই মন্তব্য। কারণ, সেই ফোকর দিয়ে লিট ফেস্ট যদিও সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না, তবে সাহিত্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

      আলোচক যখন চর্যাপদের উত্তরাধিকার বহন করা আমাদের বাংলাদেশে সাহিত্য প্রচারে ইংরেজি-নির্ভরতাকে কাঙালপনা বলেন, তখন সেটা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেনা।

      মনস্তত্ব খোলাসা করলেই, ’ইংরেজি নির্ভরতা’ উপমা এড়িয়ে বাংলা সাহিত্য প্রসারে ’ইংরেজি মাধ্যম ব্যবহার’ করাকে খাটো করে না দেখে ইতিবাচক ভাবে দেখা যায়।

      যেহেতু আলোচক ’ইংরেজি নির্ভরতা’ উপমায় আটকে গেছেন তাই এরই ধারাবাহিকতায় পরের স্তবকে রবীন্দ্রনাথকে মহিমান্বিত তিনি বলেন রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষাতে লিখেই দুনিয়া জয় করেছিলেন।

      আসলেই কি তাই?

      রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই বাংলাভাষার কবি। বাঙাল কবি। তবে তিনি সাহিত্যের প্রসারে এর প্রচারে মোটেও নিভৃতচারী ছিলেন না। জমিদার রবীন্দ্রনাথের জন্য বিদেশ ভ্রমণ যেহেতু বড় সংকট নয়, তাই তিনি নোবেল প্রাপ্তির (১৯১৩ সালের) পূর্বে ও পরবর্তীতে একাধিক দেশে ভ্রমণ করেন – ৩০টিরও বেশি দেশে।

      এসব দেশে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ কী করেছেন? তার সাহিত্য রচনার প্রচার। এবং তাতেেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে যে বাংলা সাহিত্য তার বৈশ্বিক প্রসার ঘটে।

      রবীন্দ্রনাথ কীভাবে আসরে প্রচার করেছিলেন? রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি নির্ভরতাকে কাঙালপনা হিসেবে দেখেননি। বরং ইংরেজিকে ’ব্যবহার’ করেছিলেন তার বাংলা সাহিত্যকে বিদেশি সাহিত্য রাজ্য মাঝে তুলে ধরতে।

      রবীন্দ্রনাথ বিদেশে গেলে অবশ্যই তার বিভিন্ন রচনার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে যেতেন। সেসব অনুবাদ তিনি বিদেশি সাহিত্যিকদের পাঠের জন্য দিতেন। তার পরিশ্রমী নিবেদন ব্যর্থ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ এর সাহিত্য বিদেশি সাহিত্যিকদের দ্বারা প্রশংসিত হতে থাকে, ইংরেজি অনুবাদের সুবাদে।

      রবীন্দ্রনাথের দুনিয়া জয় বলতে যদি নোবেলপ্রাপ্তি হয়ে থাকে তবে সেই নোবেল প্রাপ্তি বাংলা গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদকরণের পরই হয়েছিল। এবং ইংরেজি গীতাঞ্জলির মুখবন্ধ লিখেছিলেন আইরিশ কবি ইয়েটস। ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশিতও হয়েছিল বিদেশে – বিদেশি প্রকাশনা থেকে। নোবেল একাডেমিতে রবীন্দ্রনাতের মনোনয়নও গিয়েছিল একজন আইরিশ কবির নিকট হতে।

      রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি নির্ভরতা নিয়ে নেতিবাচক না থেকে ইংরেজি ব্যবহার নিয়ে কতটা তৎপর ছিলেন? রবীন্দ্রনাথ নিজেই অসংখ্য অনুবাদ করেছেন এবং ইংরেজি নিয়ে তিনি যথেষ্ট শ্রম দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ’ইংরেজি সহজ শিক্ষা’ এমনি এমনি তো রচিত হয়নি!

      পাবলো কোয়েলহোর সাহিত্যও ইংরেজিতে অনুদিত হয়। অনুন্ধতী রায়ের ফিকশনও ইংরেজিতে পড়ছি। সুতরাং বাংলা সাহিত্য প্রসারে ইংরেজিকে ব্যবহার করলে তাতে বাংলা ভাষার দীনতা প্রকাশিত হয় না মোটেও।

      ***
      আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী একটি বহুল পঠিত কাব্য। বিশেষত দুটি লাইনই চর্চিত হরেদরে –
      যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
      সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।

      আলোচক তার আলোচনায় উপরের চরণ দুটিও যুক্ত করেছেন ইংরেজি নির্ভরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে।

      আবদুল হাকিমের পুরো কবিতাটিতে ভাষার প্রতি তীব্র প্রেম রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তবে ভাষাপ্রেমে কট্টরতা বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয় যখন জন্ম নিয়ে সংশয় তোলা হয়। কবি কেনো আম-মানুষের মত জন্মের ধরণ নিয়ে বিচলিত হবেন? ‘কাহার জন্ম’ বলতে আসলে কবি কী ধরনের জন্মকে অবজ্ঞা করতে চান? বেজন্মা? বেজন্মা সম্বোধন অথবা জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলে কাউকে হেয় করা কি কবিকে শোভা দেয়?

      আবদুল হাকিম ৩০০ বছর পূর্বের সমাজের একজন হয়ে না হয় হেয় করার জন্য বেজন্মা ইঙ্গিতপূর্ণ উপমা বেছে নিতে পারেন, ধরে নেই তিনি এক্ষেত্রে চিন্তায় কালান্তরি হতে পারেননি, কিন্তু আজকের সাহিত্যিকরা কেন পশ্চাদপদ থাকবেন চিন্তায় এবং ভাষাপ্রেম প্রকাশে কেন অপরের জন্মপ্রসঙ্গ তুলে হেয় করতে চাইবেন?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com