বাড়ির কাছে আরশি নগর: পাওলো কোয়েলো, ফরিদ উদ্দিন আত্তার এবং পিটার ব্রুক

হোসেন আলমগীর | ২৬ নভেম্বর ২০১৭ ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

koheloব্রাজিলের ঔপন্যাসিক পাওলো কোয়েলো তাঁর ‘দি অ্যালকেমিস্ট’ উপন্যাসে পরমাত্মার অন্বেষণে মানুষের অভিযাত্রাকে রূপকের আশ্রয়ে বর্ণনা করেছেন। এ উপন্যাসের সাথে পারস্যের সুফি দর্শনের ঘনিষ্ট মিল লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে খোরসানের (বর্তমান ইরান) নিশাপুরের দার্শনিক ও কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের Manteq-At-Tair (Conference of the Birds)’ বা ‘পক্ষী সম্মেলন’র ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে। খ্রীস্টিয় বারো শতকে আত্তার কবিতার মাধ্যমে পাঠকের কাছে যে দর্শন সহজবোধ্য করেছিলেন, বিশ শতকের অন্তে পাওলো কোয়েলো ‘দি অ্যালকেমিস্ট’ উপন্যাসে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন। দু-জনের বিষয় মূলত অভিন্ন- পরমাত্মার সন্ধান লাভ। বিশ্বখ্যাত নাট্য নির্দেশক পিটার ব্রুক এবং জ্যঁ ক্লদ কাহিয়ে মিলে আত্তারের কাহিনীর নাট্যরূপ দিয়েছিলেন। পিটার ব্রুক ছিলেন এ নাটকের নির্দেশক। নাটকটি প্রযোজনার আগে তিনি এবং তাঁর দল সাহারা মরুভূমিতে একটি দীর্ঘ সফরে অংশ নিয়েছিলেন । যেমন করেছিল ‘দি অ্যালকেমিস্ট’র সান্তিয়াগো, কিম্বা আত্তারের ত্রিশটি পাখি। এ সফরের মূল লক্ষ্য-সত্যানুসন্ধান।

সুপ্রাচীন কাল থেকেই মানুষ পরম প্রকৃতির সন্ধান করে চলছে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের নানা মহাজন এ পরমাত্মার সন্ধানে লিপ্ত ছিলেন। এ পরম প্রকৃতির নানান অভিধায় চিন্থিত: ঈশ্বর, ভগবান, আল্লাহ, ব্রক্ষ্মা, গড, কিংবা মনের মানুষ। স্রষ্টা সম্পর্কে তাদের উপলদ্ধি বিভিন্ন মতবাদ এবং দর্শনের সৃষ্টি করেছে। প্রাচ্যের সূফী দর্শনে ‘আনাল হক,’ গৌতম বুদ্ধের ‘নির্বাণ’, হিন্দু ধর্মে ‘মোক্ষ’, বাউল সম্প্রদায়ের ‘অরূপ’ কিংবা ‘মনের মানুষ’ অন্বেষণের লক্ষ্য অভিন্ন। তরিকা ও পথের ভিন্নতা থাকলেও সবার উদ্দেশ্য অভিন্ন । যিশু যেমন বলেছিলেন, ‘আমার পিতার বাড়িতে একাধিক অট্টালিকা,’ যার সুপ্রচলিত ব্যাখ্যা হলো- ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য নানা মত, নানা পথ; কিন্তু লক্ষ্য একটাই। সুফি মতানুযায়ী পরম প্রকৃতির স্বরূপ দেখতে চাইলে মানবকুলকে তাদের অন্তরের মাঝে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে। গ্রিক দার্শনিক সক্রেতিসের স্মরণীয় উক্তি Know Theyself র উদ্দেশ্যও মূলত তাই। নিজেকে জানতে পারা মানেই ইহজাগতিক এবং আধ্যাত্মিক জগতের আবছা-অবোধ্য বিষয়াদির মর্মভেদ করা, পরমেশ্বরের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করা। মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, ‘যে নিজেকে জানে, সে জানে তার স্রষ্টাকে, আর এ আত্মজ্ঞান তাকে পরমার্থিক জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়।’ পন্ডিতদের মতে, এ ধারণার ভিত্তিতেই সৃষ্টি হয়েছে সুফি দর্শনের। সুফিরা বিশ্বাস করে পরমেশ্বরের সন্ধানে মক্কা-মদিনা, কৈলাস, বৃন্দাবন যাওয়া নিস্প্রয়োজন কেননা এ দেহতে বৃন্দাবন, এদেহতে গোবর্ধন, এদেহতে কৈলাস-হিমালয়- অর্থাৎ এদেহের মাঝেই পরমাত্মার নিত্যলীলা।

‘দি অ্যালকমিস্ট’-এর সার কথা স্বপ্ন বাস্তবায়ন, যার জন্য সান্তিয়াগোকে যেতে হয়েছিল মিশরের পিরামিডে, কেননা গুপ্তধন লুকানো আছে পিরামিডের তলে। মেষপালক সান্তিয়াগো স্পেনের আন্দালুসিয়ার একটি পরিত্যাক্ত গির্জায় রাত কাটালে স্বপ্নে ওই গুপ্তধনের ব্যাপারটি জানতে পারে। কিন্তু অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পিরামিডে পৌঁছে সে উপলব্দি করে যে, গুপ্তধন আছে তাঁর নিজ দেশে, সেই জরাজীর্ণ গির্জায় গজানো চিনার গাছের গোড়ায়, অর্থাৎ স্বপ্নটি যেখানে সে দেখেছিল। অবশ্য ততদিনে সান্তিয়াগোর ইহজাগতিক ধ্যান-ধারনায় অমূল পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘ সফরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাকে পরমেশ্বেরের স্বরূপ দর্শনে সহায়তা করে। কোয়েলো মূলত গুপ্তধন লাভে সান্তিয়াগোর ত্যাগ তিতিক্ষা এবং বিপদসঙ্কুল মরুপথে প্রতিকুলতায় টিকে থাকার মধ্যে দিয়ে তার পরিশুদ্ধ হবার বিষয়টি গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
সান্তিয়াগো যদিও তার পিতা-মাতার ইচ্ছায় পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিল কিন্তু ‘স্রষ্টা’কে সেখানে পাওয়া যাবেনা বিবেচনায় সে বেছে নিয়েছে মেষপালকের পেশা, কেননা মেষপাল নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে ফিরে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। কিন্তু বারংবার দেখা একটি স্বপ্ন তাকে ভবিতব্যের দিকে পরিচালিত করে, আর ‘দি অ্যালকমিস্ট’ হচ্ছে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাহিনী। প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর শৈশবে একটা স্বপ্ন থাকে এবং জীবনভর তারা ঐ লালিত স্বপ্ন পূরণের জন্য কাল কাটায়, কেউ কেউ স্বপ্ন পূরণে সফল হয়, তবে সংখ্যাগরিষ্টরা স্বপ্ন সফল করতে পারে না, কিন্তু স্বপ্ন তাদের বাঁচিয়ে রাখে। আশা জাগানিয়া স্বপ্নের প্রেরণায় মানুষ সচল থাকে। যেমন, পাহাড় চূড়ায় ওই কাচপাত্র ব্যবসায়ী; হজে যাবার জন্য সে স্বপ্ন লালন করে কিন্তু হজে যায় না। কারণ হিসেবে সান্তিয়াগোকে সে জানিয়েছিল, হজ পালন করলে তার স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকবে না। আর স্বপ্ন যদি না-ই থাকে তাহলে সে বাঁচবে কিভাবে? দুনিয়াতে এ প্রকৃতির মানুষেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে সান্তিয়াগো এই শ্রেণীর ভিতরে পড়ে না, সে তার স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়।
সান্তিয়াগোর দেখা স্বপ্নটি ছিলো মোটামুটি এ রকম: এক দিন সে যখন মেষ চরাচ্ছিল তখন একটি শিশু এসে তার মেষগুলোর সাথে খেলতে থাকে। খেলতে খেলতে হঠাৎ শিশুটি সান্তিয়াগোর হাত ধরে তাকে পিরামিডে নিয়ে গিয়ে জানায়, সে যদি এখানে আসে তাহলে গুপ্তধন পাবে। তারপর যেই না শিশুটি তাকে গুপ্ত স্থানটি দেখিয়ে দেবে অমনি তার ঘুম ভেঙে যায়। এ স্বপ্নটা সে আগেও দেখেছে, কিন্তু পুরোটা দেখার আগেই সে জেগে উঠেছে। অতএব গুপ্তধনের বিষয়টি তাকে কৌতুহলী করে তোলে এবং সে তার স্বপ্নের অর্থ জানার জন্য তারিফায় এক জিপসি নারীর কাছে যায়। জিপসি নারী তার স্বপ্ন ব্যাখ্যা করে দেয় এই শর্তে যে, গুপ্তধন পেলে তাকে এক-দশমাংশ দিতে হবে। তার মতে, স্বপ্ন হলো ঈশ্বরের ভাষা- যার অর্থ সে বুঝতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর যদি কারো সাথে আত্মার ভাষায় কথা বলে তাহলে তা একমাত্র বোঝার সাধ্য স্বপ্নদ্রষ্টার নিজের। সে সান্তিয়াগোকে অবশ্যই পিরামিডে গিয়ে গুপ্তধন খুঁজতে পরামর্শ দেয়, কেননা স্বপ্নে গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছে এক শিশু, অতএব তা মিথ্যা হতে পারে না। সান্তিয়াগো তখনও দ্বিধান্বিত, কেননা মিশর অনেক দূর এবং সেখানে পৌঁছানো সহজ কাজ নয়, তাছাড়া ওই স্বপ্নের কতটাই বা মূল্য আছে? কিন্তু এক রহস্যময় মানুষের সাক্ষাৎ তার ধারণা বদলে দেয়। মানুষটির নাম মেলচিযেদেক। নিজেকে তিনি সালেমের রাজা বলে দাবি করেন। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা আর মেধা দিয়ে সান্তিয়াগোকে মুগ্ধ করে তার স্বপ্ন সফলের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। সান্তিয়াগোর এক-দশমাংশ মেষের বিনিময়ে তিনি তাকে যাত্রাপথ দেখাতেও রাজী হন।
সালেমের রাজা সেই শুভক্ষণে এসে উপস্থিত হয়েছে যখন সান্তিয়াগো তার স্বপ্ন পূরণের আশা ত্যাগ করতে যাচ্ছিল। মেলচিযেদেকের মতে, মানুষ তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যাগুলো জানতে পারে অনেক দেরিতে, আর সম্ভবত সে কারণেই তারা সামান্যতেই হাল ছেড়ে দেয়। এই স্বঘোষিত রাজা তাকে জানায়, গুপ্তধন পাবার একটাই উপায়; ওমেন অনুসরণ করা। কোয়েলোর মতে, ‘ওমেন’ হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র ভাষা যার মাধ্যমে স্রষ্টা মানুষের সাথে কথা বলে। মেলচিযেদেক সান্তিয়াগোকে তার লালিত স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত না হয়ে এর চূড়ান্তে যেতে পরামর্শ দেয়।
কেননা, অনেকেই এমন স্বপ্ন দেখে থাকে কিন্তু তার বাস্তবায়ন করে না। তাঁর মতে, আমরা যে-ই হই না কেন এবং যা-ই করিনা কেন, সত্যিই কিছু করতে চাইলে তার ইচ্ছার উৎসারণ ঘটে বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের অন্তস্থল থেকে। আর যখনই আমরা কোন কিছু করতে যাই, পুরো ব্রক্ষ্মান্ড একজোট হয়ে আমাদের তা করতে সাহায্য করে। জগতের সবকিছুই আসলে একটা মাত্র জিনিসের নানান রূপ। সান্তিয়াগো মেলচিযেদেকের যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে মরু যাত্রায় সামিল হয়। অবশ্য, সান্তিয়াগোর যাত্রাপথ মোটেও ফুল বিছানো ছিল না; ছিল শঙ্কা, ভয়, আতঙ্ক, আর উৎকন্ঠায় ভরা। বিপদসঙ্কুল মরুপথে তাকে নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মরুভূমির ওই কঠিন পরিবেশে সান্তিয়াগো আসল প্রেমের রূপ প্রত্যক্ষ করে, অর্জন করে বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড অনুধাবনের সার্বজনীন ভাষা, যার কোন লিখিত রূপ নেই। সুফি মতানুযায়ী স্রষ্টার নৈকট্য লাভে মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। কোয়েলো’র ‘দি অ্যালকমিস্ট’ উপন্যাসে এ কাজটি করে একাধিক মানুষ, যেমন সালেমের রাজা, এবং অ্যালকমিস্ট। এরা কোন না কোন ভাবে সান্তিয়াগোর স্বপ্ন জাগরুক রাখতে সহায়তা করেছে। আর আত্তারের ‘পক্ষি সম্মেলন’ এ মুর্শিদের ভূমিকা নিয়েছিল ‘হুপো।’

faridফরিদ উদ্দিন আত্তারের (ফরিদ আল-দীন মুহম্মদ ইবনে ইব্রাহীম ১১৪৫-১২২১ খ্রিঃ) জন্ম খোরসানের নিশাপুর’এ। পদবিতে আত্তার থাকার কারণে পন্ডিতদের ধারণা তাঁর পিতা, পিতামহ, কিংবা প্রপিতামহ’র কেউ একজন কবিরাজ অথবা আতর ব্যবসায়ী ছিলেন। সে কারণে তাঁর নামের শেষে আত্তার যোগ হয়েছে। আত্তার যদিও তাঁর সৃজনশীলতার সুবাস ছড়িয়েছিলেন লেখনীর মাধ্যমে যার প্রমাণ ‘Manteq-At-Tair,’ ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’ এবং ‘ইলাহিনামা’। প্রথমটিকে সুফি দর্শনের ব্যাকরণ বলা যেতে পারে। কারণ, এতে একদল পক্ষীর পক্ষীরাজকে দেখার অভিযাত্রার আবডালে সুফি দর্শনের সাবলীল ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। শোনা যায়, তরুণ কবি জালাল উদ্দিন রুমি নিশাপুরে আত্তারের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তিনি রুমিকে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘Asrar Nama (Book of Mystics)’ উপহার দিয়েছিলেন। পাওলো কোয়েলো সুফি দর্শন প্রভাবিত।

সুফি দর্শন হলো স্রষ্টা সম্পর্কে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের চর্চা, যাকে বলা হয় ‘ইরফান’ কিংবা ‘মারফত’। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা অথবা তার নৈকট্য লাভ সুফিবাদের লক্ষ্য। সুফিমতে কোরান এবং হাদিসের একটি অন্তর্নিহীত অর্থ এবং প্রতীক রয়েছে যা তফসির অর্থাৎ সরাসরি ব্যাখ্যার বিপরীত। সুফিমত রূপক পদ্ধতি প্রয়োগে পবিত্র কোরানের অন্তর্নিহীত অর্থ এবং প্রতীক সমূহের অনুসন্ধান করে। তারা বিশ্বাস করে যে, স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করতে হলে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন যা অর্জন করতে হয় বস্তুজগতের ঘটমান নানাবিধ ঘটনার উপলব্দি থেকে। মানুষকে ইহজাতিক প্রেম-ভালবাসা এবং লোভ-লালসার মৃত্যু ঘটিয়ে নতুন রূপে আর্বিভূত হতে হয়। সুফি মতানুযায়ী স্রষ্টা বিরাজ করে মানুষের মাঝে কিন্তু তাকে সহজে লাভ করা যায় না; এ জন্য কঠিন সাধনার প্রয়োজন। আত্তার এবং কোয়েলো এ সাধনাকে সফরের সাথে তুলনা করেছেন, যে সফর মূলত নিজের অন্তরের ভেতর। মানুষ নানাবিধ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তার কলবের মাঝে পরমাত্মার সন্ধান করে এবং মহাজন’রা সেখানে মনের মানুষের প্রতিফলন দেখতে পায়। মারফতি গানে বয়াতিদের আর্তি সে কারণেই:
দয়াল বাবা কেবলা কাবা আয়নার কারিগর
আয়না বসাইয়া দে মোর কলবের ভেতর।

সুফি দর্শনের প্রবক্তা কে তা অমিমাংসিত, তবে ইসলামের সাথে সুফি মতাদর্শ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পন্ডিতদের মতে, হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) সুফি দর্শনের প্রবর্তক। তিনি বলেছেন মানব দেহের কলব বা হৃদয় পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর প্রেমার্জন করাই বান্দার লক্ষ্য। আট-শতকে সুফি দর্শন তাত্ত্বিক ভিত্তি লাভ করে, এবং এক্ষেত্রে অগ্রদূত একজন নারী সুফি, তাঁর নাম রাবিয়া আল আদাউইয়া (৭১৭-৮০১ খ্রিঃ)। মূলত তিনিই প্রথম সুফি তত্ত্ব প্রদান করেন। তিনি স্রষ্টাকে তাঁর প্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাবিয়া খুব সহজ এবং সাবলীল ভাষায় সুফিবাদের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তার মতে, স্রষ্টাকে ‘স্রষ্টা’র কারণেই ভালবাসা উচিত, কোন পুরস্কারের আশায় নয়। প্রসঙ্গত রাবিয়া উল্লেখ করেছিলেন, ‘খোদার প্রেমে তিনি এতটাই মগ্ন যে অন্য জিনিসের প্রতি তাঁর না আছে ভালবাসা, না রয়েছে ঘৃণা।’ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সত্তাকে স্রষ্টার মাঝে বিলীন করে দেয়া। উল্লেখ্য যে, রাবিয়ার মত আরো অনেক নারী সুফিমতের চর্চা করলেও তাঁরা আবডালেই থেকে গেছেন, যেমন মার্চিনা’র শামস এবং কর্ডোভার ফাতিমা বিনতে ইবনে আল মুথান্না। আন্দালুসিয়ার সুফিসাধক ইবনে আরবি এ দু’জন দ্বারা প্রভাবিত। ফাতিমা নিশাপুরি’র (মৃত্যু ৮৩৮ খ্রিঃ) প্রভাব ছিল বায়েজিদ বোস্তামির উপর।

অবশ্য অনেক দার্শনিক সুফিমতের চর্চা করছেন সনাতনি ইসলামি ধ্যান-ধারণা থেকে নিজেদের আড়াল করার জন্য। তবে সুফিসাধকরা কখনই ইসলামি দর্শনের সাথে প্রকাশ্যে তর্কে লিপ্ত হন নি। সুফি মতাদর্শ পরিপূর্ণ হয়েছে প্রাচ্যের প্রাচীন দার্শনিক চিন্তা চেতনার মিথস্ক্রিয়ায়। সুফি দর্শনের সাথে জরথুস্ত্র, খ্রিষ্টিয় মতবাদ, উপনিষদ এবং বেদ’র অনেক উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটেছে। আর এ ঋদ্বতা সম্পন্ন হয়েছে মুসলিম শাসকদের রাজ্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে। ভারতের সাথে পারস্যেও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সুফি দর্শনের ভিত্তি তৈরী করেছে। পারস্য, ইরাক এবং আফগানিস্থানের অনেক সুফি সাধক ভারত ভ্রমণের ফলে তাদের চিন্তাধারা বা মতবাদ সমৃদ্ধ করেছেন, যেমন: বাগদাদের মনসুর আল হাল্লাজ (৮৫৮-৯২২ খ্রিঃ), বলখ (আফগানিস্থান)’র জালালউদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৩৭ খ্রিঃ), ফরিদ উদ্দিন আত্তার, গজনীর হাকিম সানাই, শিরাজের শেখ সাদী, এবং খোরসানের নুরুদ্দিন জামি।

ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘পক্ষী সম্মেলন’র মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সুফি দর্শনের একটি সহজ ও সাবলীল ব্যাখ্যা প্রদান করা। একটি রূপক কাহিনী সৃজণের মধ্যে দিয়ে এ ‍দুরূহ কাজটি তিনি সম্পন্ন করেছেন। আত্তার বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ বিভিন্ন অজুহাতে স্রষ্টার অন্বেষণ এড়িয়ে যায়। তিনি মূলত দু’টি বিষয় অনুধাবন করেছিলেন; (ক) আধ্যাত্মিক অন্বেষণের প্রতিবন্ধকতা, এবং (খ) মানুষের পলায়নপর প্রকৃতি। তাঁর কবিতার লক্ষ্য হচ্ছে পাঠকদের কাছে একটি আধ্যাত্মিক সফরের বয়ান করা, যে সফর মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে- যেন তাতে স্রষ্টার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। বিষয়টি তিনি একটি রূপক কাহিনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
একদিন একদল পাখি সমবেত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা তাদের রাজা’কে খুঁজে বের করবে। জগতের সকল প্রাণী এমন কি মানবকুলেরও রাজা থাকে। অতএব তাদের নিশ্চয়ই একজন আছে, এবং তাকে খুঁজে পাওয়া দরকার। পাখিরা হুপোকে সফরের নেতা নির্বাচন করে, তার বিশেষ মর্যাদার জন্য, কেননা হুপো সলোমন বাদশাকে মরুভূমিতে পথ দেখিয়ে শেবা’র রানি বিলকিসের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। অতএব এ সফরের নেতৃত্ব তারই প্রাপ্য। হুপো এখানে মূলত সুফি শেখ বা গুরুর প্রতীকি চরিত্র যারা তাদের অনুসারীদের জ্ঞানচক্ষু উন্মিলনে সহায়তা করে থাকে। হুপো জানায়, পক্ষিরাজের নাম ‘সীমরগ’, তিনি থাকেন ‘কাফ’ নামের একটি স্থানে; পৃথিবীকে ঘিরে যে পর্বতমালা, তার ওধারে। তার দেখা পেতে হলে সাতটি উপত্যকা পাড়ি দিতে হবে, যা অত্যন্ত কষ্টসঙ্কুল আর শ্রমসাধ্য, কারণ ‘এ সফর দিন নয়, মাস নয়, বছর অবদি- হয়তোবা অমৃত্যু, বিপদসঙ্কুল, সন্দেহ আর আতঙ্কের।’
আত্তারের এই সপ্ত উপত্যকা আসলে সুফি দর্শনের সাতটি ধাপ যা উত্তীর্ণ হয়ে খাঁটি মানুষে পরিণত হতে হয়। এ সাতটি ধাপ হচ্ছে:
১) অন্বেষণ – আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জনের প্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন ধাপ। এ ধাপ অতিক্রমের পথে শত বাধা-বিঘ্ন আসবে, কিন্তু তা ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে হবে। এ ধাপে বান্দা প্রচলিত মতবাদ এবং বিশ্বাস- অবিশ্বাসকে প্রত্যাখান করবে।
২) প্রেম- যার কারণে মানুষ করণীয় অনেক কিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তারা প্রেমের মোহে অন্য কিছু করতে বা ভাবতে পারেনা।
৩) জ্ঞান- এ ধাপে বান্দা প্রজ্ঞা অর্জনের জন্য নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী জ্ঞান লাভ করবে। এক্ষেত্রে পথের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য অভিন্ন- প্রজ্ঞালাভ।
৪) নিরাসক্তি- এ ধাপ অতিক্রমের মধ্য দিয়ে সকল কামনা বাসনা এবং জগৎ সংশ্লিষ্টতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে ।
৫) একত্ব- বান্দা এ ধাপে উপলব্দি করবে যে জগতের সবকিছু আসলে একটা জিনিসের সমষ্টি, একটা জিনিসের নানান রূপ, এবং একে অন্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। পরমাত্মা হচ্ছে সবকিছুর উর্ধে, এমনকি ঐক্য, ইহজাগতিকতার উর্ধে।
৬) বিমুগ্ধতা- এ ধাপে প্রবেশ করে বান্দা পরমেশ্বরের রূপে বিমোহিত হয়ে উপলব্দি করবে যে তারা আসলে এ ধাঁধার কিছুই জানেনা, তাদের ভেতরে কেবলই শূন্যতা।
৭) দীনতা এবং নির্বাণ- এ ধাপে মানব সত্তা তার পূর্ব পরিচয় বিস্মৃত হয়ে একত্বের অংশ হয়ে যাবে এবং মহাজাগতিকতার মাঝে বিলীন হয়ে সময়ের উর্ধ্বে উঠে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে বিরাজ করবে।
অনেক পাখি কষ্ট আর শ্রমের কথা শুনে এ লম্বা সফরে যেতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে এবং নানা অজুহাতে সফর এড়িয়ে যেতে চায়। তাদের প্রতিটি অজুহাত মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি লাভের অনিচ্ছাকেই প্রতিকায়িত করে। যেমন নাইটিঙ্গেলের মতামত হচ্ছে, সে তার সঙ্গী আর গোলাপের প্রতি ভালবাসায় তুষ্ট, তাছাড়া এ দীর্ঘ যাত্রা তার সামর্থ্যরে বাইরে। হুপো তাকে স্বরণ করিয়া দেয় যে, ইহজাগতিক প্রেমের দাসত্ব আত্মশুদ্ধি লাভের পথে অন্তরায়। তোতা তার প্রাণটা হারাতে চায় না, তার চেয়ে বরং মৃত্যুর পরেই স্বর্গে যাবে। রাঁজহাস পানির প্রতি এতটাই আকৃষ্ট যে সে সীমরগের কাছে যায় কিভাবে। হুপো তিতিরকে স্বরণ করিয়ে দেয় যে রত্ন আসলে কিছুই না- রঙীন পাথর, এর প্রতি ভালোবাসা অন্তর কঠিন করে ফেলে। তার প্রকৃত রত্ন খোঁজা উচিৎ। হুমা অহঙ্কারী, পেঁচা তিতিরের মত ইহজাগতিক জিনিসের নেশায় মগ্ন। সারস সাগরের প্রতি মোহাবিষ্ট। হুপো চড়–ইকে তার হীনমন্যতার জন্য তীরস্কার করে নিজেকে সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে পরামর্শ দেয়। হুপোর মতে বিভিন্ন ধরনের পাখি আসলে সীমরগের-ই ছায়া। সীমরগকে পেতে হলে নিজেকে অবশ্যই নিজের সত্তার সাথে বোঝাপড়া করতে হবে। তার মতে ‘তোমরা যদি ইহজগত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে পার তাহলে সুখের প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারবে’। হুপো:
So long as we do not die to our selves,
and so long as we identify with someone or something,
we shall never be free.

The spiritual way is not for those wrapped up in exterior life.
.
(অনুবাদ Edward Fitz Gerald)
প্রতিটি দ্বিধান্বিত পাখিকে হুপো নীতিকথা এবং স্মরণীয় কাহিনীগুলো শুনিয়ে আশ্বস্ত করে এবং উদাহরণস্বরূপ প্রাক্তন সুফি সাধকদের প্রসঙ্গ টেনে আনে, যেমন: রাবিয়া আল-আদাইয়া, আবু সা-ইদ ইবনে আবিল-খায়ের, মনসুর আল হাল্লাজ, এবং শিবলী। উল্লেখ্য, প্রতিটি পাখি এবং তাদের পলায়নপর মনোভাব মূলত মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিকায়ন।
অবশেষে সীমরগ’র সন্ধানে হাজার পাখি সফর শুরু করলেও অনেকেই যাত্রা পথে ঝরে যায়, মাত্র ৩০টি পাখি তার দরবারে যেতে সক্ষম হয়। ততদিনে তাদের ডানা ভেঙে গেছে, পালক ঝরে গেছে, তারা ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত এবং অর্ধমৃত। ফার্সিতে সী’র অর্থ ৩০, আর ‘মরগ’ এর অর্থ পাখি, অর্থাৎ ‘সীমরগ’ বলতে বিশেষ কিছু নেই, প্রতিটি পাখি-ই সীমরগ আর প্রতিটি সীমরগ-ই পাখি- যদি তারা সুফি দর্শনের সাতটি ধাপ অতিক্রম করতে পারে, আত্তার যাকে রূপকার্থে বলেছেন ‘সপ্ত উপত্যকা’। পাখিরা সীমরগ’র দরবারে গিয়ে কেবল একটি সিংহাসনে বিশাল আয়না ছাড়া কাউকেই দেখতে পায়না। সেটার দিকে এগিয়ে গেলে প্রতিফলনে তারা নিজেদের অবয়ব দেখতে পায় এবং উপলব্দি করে যে তারা আর সীমরগ আসলে অভিন্ন। এ সফর আসলে আত্ম-উপলব্দির জন্য। পাখিদের এ আত্ম-উপলব্দির সময় আকাশের ঘোলাটে আলোয় স্থানটি পূর্ণ হয়ে যায়। মনে হয় উঁচু থেকে মহাজাগতিক আলোর প্রক্ষেপণ ঘটছে, এবং দরবারে উপস্থিত ৩০টি পাখি সে আয়নার মাঝে ঝাপ দিয়ে বিলীন হয়ে যায়। সুফি মতে যাকে বলা হয় ‘ফানা’ অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অবস্থান করা। বুদ্ধদর্শনে এটাই ‘নির্বাণ’ আর হিন্দু দর্শনে এটাই হলো মোক্ষ।
আমাদের আত্মার প্রতিটি কোন আলোকিত করার জন্য মনের আয়নায় আলোর প্রতিফলন দরকার, যেন আমরা আমাদের সত্ত্বার ভেতরে লুকায়িত সম্পদ খুঁজে পাই। যেন আমরা আমাদের মাঝে পরিভ্রমন করতে পারি এবং নিজেকে জানতে পারি। আর এ আত্মজ্ঞান মানুষকে পারমার্থিক জ্ঞানের দিকে পরিচালিত করে। ফরিদ উদ্দিন আত্তার:
Myself within the mirror Myself hold
To see myself, in, and each part of me
That see himself, through drowned shall ever see.

(অনুবাদ Edward Fitz Gerald)

আসলে স্রষ্টাকে পেতে হলে দুরে যাওয়া নিস্প্রয়োজন, স্রষ্টা আছে খুব কাছে কিন্তু সে তো পরশী, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাকে চেনেনা, চেনার চেষ্টাও করেনা, তাইতো ফকির লালন সাই গেয়ে বেড়িয়েছেন:

বাড়ির কাছে আরশি নগর
সেথা পরশি বসত করে, একঘর পরশি বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।

pitarনাট্যনির্দেশক পিটার ব্রুক’র ও এমন আত্ম-উপলব্দির প্রয়োজন ছিল। তাঁর ‘সর্বজনীন থিয়েটার’ নীরিক্ষার সাথে আত্তারের পরমাত্মার অন্বেষণ প্রক্রিয়ার মিল রয়েছে। আন্তর্জাতিক থিয়েটারে পঁচিশ বছরের সাফল্য এবং খ্যাতি অর্জনের পরেও ব্রুকের মনে হয়েছে যে, এ প্রচলিত থিয়েটার মানুষের কাছাকাছি পৌঁছুতে পারছে না। দরকার এমন একটা কাঠামোর যা থিযেটারকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। এ লক্ষ্যে- ব্রুক থিয়েটারের মূল সত্ত্বার সন্ধানে আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে একটি দীর্ঘ সফরের নেতৃত্ব দেন। ১০০ দিনের ওই সফর শুরু হয়েছিলো ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে । The International Centre for Theater Research’র কুড়িজন শিল্পীর সমন্বয়ে একটি দল এ সফরে অংশ নেয়। এদের মাঝে ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী হেলেন মিরেন, ওশি ওইদা, এবং লেখক-সাংবাদিক জন হিলপান। আফ্রিকার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দলটি যাত্রা শুরু করে আট হাজার পাঁচশ মাইল পরিভ্রমন করে আবার সেখানেই যাত্রার সমাপ্তি ঘটায়। যেমনটি করেছিলো ‘দি আলকমিস্ট’ উপন্যাসের সান্তিয়াগো; আন্দালুসিয়ার একটি জরাজীর্ণ গির্জা থেকে যাত্রা শুরু করে আবার সেখানেই ফিরে এসে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পেরেছিল। ঠিক তেমনি, ব্রুকের এ সফর তাকে নতুন থিয়েটারের ধারণা পেতে সহায়তা করেছে। এ মরুযাত্রায় তারা আত্তারের কাব্যগ্রন্থটি সঙ্গে নিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে অনেকগুলো কাহিনী তারা মরুবাসীদের মাঝে অভিনয় করে দেখিয়েছেন। এ অভিনয়ে পোশাক-আশাক, কিংবা আনুসঙ্গিক উপকরণের কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলনা। ব্রুকের এ সফরের অভিজ্ঞতার ফসল হচ্ছে আত্তারের কাহিনী The Conference of the Birds’র প্রযোজনা। রুশ-আর্মেনিয় মরমী সাধক এবং আধ্যাত্মিক গুরু জর্জ আইভানোভিচ গার্জিয়েফ’র প্রভাব পড়েছে ব্রুকের উপর । তিনি গার্জিয়েফ’র Movement এবং Proportion ধারণাটি গ্রহণ করেছিলেন। অটোমান সাম্রাজ্যের ক্রান্তি লগ্নে ইস্তানবুলের দরবেশদের মাধ্যমে গার্জিয়েফ এ ধারণা লাভ করেছিলেন। ব্রুক ১৯৭৯ সালে গার্জিয়েফ’র রচনা ‘Meetings with Remarkable Men’র চলচ্চিত্রায়ন করেন। তখন থেকেই তিনি সুফি দর্শনে সংশ্লিষ্ট থেকে `spiritual path’র সন্ধান করে চলেছেন।
সাহারার মরু সফরের মধ্য দিয়ে ব্রুক মূলত থিয়েটারের অচিন পাখি, অর্থাৎ একটি সর্বজনগ্রাহ্য থিয়েটার- নিরাভরণ থিয়েটারের সন্ধানে নেমেছিলেন যে থিয়েটার বুঝতে দর্শকের নাটকের ভাষা জানার প্রয়োজন নেই, কিংবা অভিনয় অনুধাবনের জন্য তাদের বিশেষ কোন cultural identity থাকার প্রয়োজন নেই। লেখক জন হিলপান মনে করেন, ব্রুকের এ সফর ছিল অনেকটা আধ্যাত্মিক অন্বেষণের অনুরূপ। পুরো ব্যাপারটি ছিল একেবারে শূন্য থেকে একটি কাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়ার মতন, কেননা এ সফরে ব্রুক এবং তাঁর শিল্পীরা সচেতনভাবে তাদের পূর্বলব্দ জ্ঞান পরিত্যাগ করে থিয়েটারের মূল সত্তা অনুধাবনের একটি নতুন কাঠামোর সন্ধান করেছেন। যেমন, নাটকে ভাষার ব্যবধানটি কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি এবং টেড হিউজ মিলে নতুন শব্দভিত্তিক একটি ভাষা ‘language of sound’ আবিষ্কার করেছেন, হিউজ যার নাম দিয়েছেন Orghast । ব্রুকের পরবর্তী প্রযোজনাগুলো যেমন নব্বই মিনিটের ‘কারমেন’, কিংবা সাত ঘন্টার ‘মহাভারত’এ তাঁর সাহারা অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। ২০০৫ সালে ব্রুক নির্দেশনা দেন মালির সুফি সাধক তিয়েরনো বোকা’র (Tierno Bokar) জীবন কাহিনীভিত্তিক নাটক ‘11 and 12।’
আত্তারের কাহিনীর বীজ নিহিত আছে হাকিম সানাই’র কবিতা সংকলনে। সেখানে পাখির কলরবকে স্রষ্টার বন্দনা কিংবা স্রষ্টার নামকীর্তন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফরিদ উদ্দিনের পূর্বসূরি ইবনে সীনা’র ‘দ্যা বার্ড’র প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। সীনা’র কাহিনীতে উত্তম পুরুষে একটি পাখির (মানুষের প্রতীক) বর্ণনা রয়েছে যে কিনা অন্য পাখিদের সহায়তায় খাঁচা থেকে মুক্তিলাভ করে এবং মহান রাজার কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদের সাথে উড়ে যায়। পাখিরা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে (নয়টি পর্বত) অতিক্রমের মধ্য দিয়ে বিশেষ চেতনা লাভ করে। কোরানের ২৭/১৬ সুরায় স্বীকৃত যে, পাখির ভাষা আছে যা সলোমন বুঝতে পারতেন। আত্তারের অর্ধশত বছর আগে সুফি গুরু আহম্মদ গাজ্জালি লিখেছিলেন Risalat at-Tayr (Treatise on Birds), আত্তার এটা দ্বারাও প্রভাবিত। সেই প্রাচীন কাল থেকে পারস্যে পাখিকে আত্মার রূপক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে । হাল্লাজ, হাকিম সানাই, এবং রুমি তাদের লেখায় পাখির প্রতীক ব্যবহার করেছেন। রুমি প্রায়ই আত্মাকে শুভ্র ঈগল হিসাবে ব্যাখ্যা করতেন।
অনেকের মতে কোয়েলোর গল্পের প্লট হর্হে লুই বোর্হেসের ছোটগল্প Tale of Two Dreamers প্রেরণালব্দ। আসলে সেই প্রাচীন কাল থেকেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন বিষয়টির উপর ভিত্তি করে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে অনেক লেখালেখি হয়ে আসছে। স্বপ্নদর্শী, যারা গুপ্তধন খুঁজে ফেরে ভিনদেশে, কিন্তু শেষাবধি খুঁজে পায় নিজ দেশে এমন কাহিনীর সংখ্যা অনেক। যেমন: জালাল উদ্দিন রুমির The Man Who Dreamed of a Hidden Treasure, কিংবা তুরস্কের লোককথা ‘How the Junkman Traveled to Find Treasure in His Own Yeard’, অথবা `The Dream of Treasure Under the Bridge at Limerick’ (আয়ারল্যান্ডের লোককথা)। তবে পাঠ বিশ্লেষণে ‘দি অ্যালকমিস্ট’র উপর আত্তারের প্রভাব স্পষ্ট। কোয়েলো মূলত পারস্যের সুফিদর্শন প্রভাবিত। ২০০৯ সালে সিরিয়ার ফরোয়ার্ড পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করেছেন: ‘বস্তুত সুফীবাদ আমার জীবনব্যাপী প্রেরণা যুগিয়েছে এবং আমার কয়েকটি বইতে আমি এ ঐতিহ্যটির সাহায্য নিয়েছি যেমন ‘দি অ্যালকমিস্ট ’ এবং অতি সম্প্রতি ‘দি জাহির।’ অবশ্যই রুমি হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তিত্ব যার কথা মানসপটে ভেসে ওঠে।’
সুফিরা বিশ্বাস করে যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এতটাই যেন তা আয়নায় পরিণত হয়- স্রষ্টার অবয়বের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য। সুফি দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার সপ্তম ধাপে (Poverty and Nothingness) মানুষের আত্মা স্বচ্ছ আয়নায় পরিণত হয়। এধাপেই মানুষ স্বর্গীয় প্রেমের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজে তার অংশ হয়ে যায়। আত্তারের মতে, সীমরগ আমাদের ভেতরে একটি আয়না দিয়ে দিয়েছেন তার প্রতিফলন দেখার জন্য, আর সে আয়না হচ্ছে আমাদের অন্তর। অন্তরের মাঝে তাকালে আমরা তার স্বরূপ দেখতে পারি কিন্তু সেজন্য আমাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হবে, আর পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে একটা লম্বা আর প্রেমময় সফর।
অ্যালকমিস্টের মতে, প্রকৃত শিক্ষার একটাই মাত্র পথ- তা হলো কর্ম থেকে শেখা। মানুষের জানার সবকিছুই শিখতে হয় সফর থেকে, কেননা, সফরের অভিজ্ঞতাই তাদের যোগ্য করে তুলবে। কোয়েলো বলেছেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে যাত্রা পথে মানুষ যা যা শেখে, ব্রক্ষান্ডের আত্মা তার সবকিছু যাচাই করে। আত্তারের মতে, এ যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় সাতটি ধাপে। ‘দি অ্যালকমিস্ট’ উপন্যাসের চূড়ান্তে গিয়ে দেখা যায়, সান্তিয়াগো গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে সহায়-সম্বল খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। টিকে থাকার জন্য তার ছিল মেষপাল তাও বিক্রি করে দিয়েছিল সফরের জন্য। সান্তিয়াগোর স্বপ্ন বাস্তবায়নে পথে প্রথম বাধা হয়ে দেখা দেয় তাঞ্জির-এ টাকা চুরি। এক চতুর ছেলে তার টাকা মেরে ভেগে যায়। মরুভূমিতে যা অর্জন করেছিল তাও পথিমধ্যে গুন্ডারা কেড়ে নেয়। আল ফয়াম মরুদ্যানে অ্যালকমিস্টের কাছে থেকে বিদায় নেবার সময় তিনি তাকে যে সোনার চাকা দিয়েছিলেন তা কেড়ে নেয় পিরামিডের গুন্ডার দল। অতএব, সে হয়ে পড়ে নিঃস্ব। তার এ ভাগ্যবিড়ম্বনার একটা রূপক অর্থ আছে। আসলে সে ইহজাগতিক ধনসম্পদের মোহমায়া ধাপে ধাপে কাটিয়ে পরিশুদ্ধ হচ্ছিলো। মরুভূমিতে ফাতিমার প্রেমও সে কাটিয়ে ওঠে। এভাবে সে পরীক্ষার অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়।
উপন্যাসের সমাপ্তিতে দেখা যায়, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সান্তিয়াগো পিরামিডে পৌঁছায় বটে কিন্তু খুঁড়তে থাকার সময় কয়েকজন গুন্ডা তাকে ধরে ফেলে এবং গুপ্তধনের লোভে তাকে দিয়ে মাটি খোঁড়ায়। কিন্তু কিছুই না পেয়ে তারা তাকে মারধোর করে ফেলে যায়। যাবার আগে সর্দার তাকে জানায়, দু’বছর আগে ঠিক এখানেই সে একটা স্বপ্ন দেখেছিল-অনেক দূরে, সেই স্পেনের পরিত্যাক্ত গির্জায় গুপ্তধন আছে, সেখানে মেষপাল আর রাখাল ঘুমিয়ে থাকে। গির্জায় ধ্বংসাবশেষের ভেতরে যে চিনার গাছ গজিয়েছে তার গোড়া খুঁড়লে নাকি ধন পাওয়া যাবে। কিন্তু সে অত বোকা নয় যে ওই বারংবার দেখা স্বপ্নের জন্য এন্তার মরুভূমিটা পাড়ি দিয়ে যাবে। এবার সান্তিয়াগোর টনক নড়ে, সে বুঝতে পারে যে গুপ্তধন আসলে কোথায়, আর পাঠক বুঝতে পারে গুপ্তধন আসলে কী। গৌতম বুদ্ধ যেমন বোধিবৃক্ষ তলে দীক্ষা লাভ করছিলেন, তেমনি সান্তিয়াগো সেই পরিত্যাক্ত গির্জায় চিনার গাছের তলায় সত্যিই গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিল। আর সে ধন হলো মনের মানুষ, আল্লাহ, গড, ব্রক্ষা, ভগবান। কোয়েলো এমন সমাপ্তি টেনে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চান যে, স্রষ্টাকে পেতে হলে নিজের ভেতরে খুঁজতে হবে। আর তাতে সাফল্য লাভ করতে হলে নানা ধরনের বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা প্রয়োজন; আত্তারের ত্রিশটি পাখির যেমন পরমাত্মার সন্ধান পেতে সপ্তধাপ উত্তীর্ণ হতে হয়েছিল।
ফরিদ উদ্দিন আত্তার কবি এবং দার্শনিক, পাওলো কোয়েলো কথাশিল্পী, আর পিটার ব্রুক নাট্য নির্দেশক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তিন মহাজনের সৃজণশীলতার ক্ষেত্র ভিন্ন। আত্তার এবং কোয়েলো সত্যের সন্ধানে যে পথের সন্ধান দিয়েছেন, পিটার ব্রুক বাস্তবে সে পথ অনুসরণ করেছেন। তিনি এবং তাঁর দল নয়া থিয়েটার কাঠামোর সন্ধানে সাহারা মরুভূমিতে হাজার হাজার মাইল সফর করেছেন। সুফি দর্শনের চতুর্থ ধাপে (নিরাসক্তি) বান্দা যেমন ইহজাগতিক কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে মুক্ত মানুষে পরিণত হয়, ঠিক তেমনি ব্রুক ও তাঁর দলের শিল্পীরা অভিনয়ের প্রচলিত ধ্যান ধারণা পরিত্যাগ করে নবচেতনায় উদ্বুদ্ব হয়েছেন। তাদের এ সফর ছিল আত্মউপলব্দির জন্য। মনসুর আল হাল্লাজ, জালাল উদ্দিন রুমি, কিম্বা ফরিদ উদ্দিন আত্তার- কেউই স্রষ্টার সরাসরি অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি। তারা মূলত স্রষ্টার সন্ধানে নিজের অন্তরের মাঝে দৃষ্টিনিবেশের পরামর্শ দিয়েছেন। কবি রাম প্রসাদ সেন’র মতামতও অনুরুপ: ‘মন রে কৃষি কাজ জান না, এমন মানব জমিন রইলো পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা’। অতএব পরম প্রকৃতি বা পরম সত্যের সন্ধানে মানুষ নিজের ভেতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে উপলব্দি করবে ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Faruk Kader — নভেম্বর ২৬, ২০১৭ @ ১২:২১ অপরাহ্ন

      সুফী দর্শনের উপর চমৎকার ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। সুফী দর্শনে আগ্রহী সবার এটা পড়া উচিত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সালমা আক্তার — নভেম্বর ২৬, ২০১৭ @ ৫:১১ অপরাহ্ন

      লেখক খুব সাধারণ ভাষায় তার অসাধারণ জ্ঞানের প্রকাশ করেছেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গনী আদম — নভেম্বর ২৬, ২০১৭ @ ৭:৫৪ অপরাহ্ন

      এতো ভালো, গভীর আর মৌলিক লেখা অনেক দিন পর পড়লাম। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।

      পাওলো কোয়েলহো’র ভালো অনুবাদ সম্ভব আপনার হাতে, আমার মনে হয়েছে। করবেন?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সারা — নভেম্বর ২৭, ২০১৭ @ ৫:২৬ অপরাহ্ন

      নিপুণ কারিগর
      মুগ্ধতায় ঠাঁসা
      শুভকামনা অবিরাম প্রিয় লেখক
      ডঃ হোসেন আলমগীর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saiful shaheen — নভেম্বর ২৯, ২০১৭ @ ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ রচনা সুফি মতবাদের উপর…কালের পরিভ্রমণ রয়েছে…আছে র্ব্তমান প্রেক্ষিত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সারওয়ার চৌধুরী — december ৩, ২০১৭ @ ৮:৩৪ অপরাহ্ন

      লেখককে শুভেচ্ছা। বিস্তারিত আলাপ ভাল লেগেছে।
      শেষের দিকের এই বাক্যটি— “মনসুর আল হাল্লাজ, জালাল উদ্দিন রুমি, কিম্বা ফরিদ উদ্দিন আত্তার- কেউই স্রষ্টার সরাসরি অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি।” এই বাক্যটির পরিপ্রেক্ষিতে দুটি কথা বলি:
      আল্লাহর ব্যাপারে ‘অস্তিত্ব’ শব্দটিও যায় না। কোনো প্রকার ম্যাটাফিজিক্যাল বীঙ এর আওতাভুক্তও না। ‘অস্তিত্ব’ শব্দটি সসীম কিছুকে ধরে। আল্লাহকে থিংকিংয়ের ভেতর কোনো কিছু আকারে পাওয়ারও সুযোগ নাই।
      কোরআনের সুরা আল আনআম এর ১০৩ আয়াতে বলা- ‘লা তুদরিকুহুল আবসার’, মানে, নো ভিশন ক্যান গ্রাস্প হিম। মানে, কোন চোখের অন্বেষা তাকে ধরতে পারে না। মানে, তিনি বোধগম্যতারই বাইরে।
      উপস্থিত আর অনুপস্থিত হওয়ার জন্যে ‘কিছু’ হওয়া লাগে। যে-‘কিছু’ বস্তু বা ব্যক্তি একটা কিছু আকারে আবির্ভূত হতেই হয়। যদি ‘কিছু’ হওয়ার বাইরের হয়, তাইলে কেমনে উপস্থিত অথবা অনুপস্থিত? শরীরের চোখে দেখা যায় না এমন কিছু- যেমন বাতাস, কিঞ্চিত কাব্যিক ব্যঞ্জনায় কোনো স্থানে নির্দিষ্ট পরিমান বাতাস উপস্থিত বা অনুপস্থিত অথবা নিদেনপক্ষে বিরাজমান আছে বা নাই বলা যায়। বাতাসের জন্যেও নির্দিষ্ট দেশ/স্পেস নির্ধারিত, মানে সীমিত। বাতাসের জন্যে রয়েছে অদৃশ্য দেয়াল। এই সীমা বাতাসও মানতে বাধ্য। ইচ্ছে করলেই বাতাস ছড়িয়ে পড়তে পারে না আউটার স্পেসে।
      ‘কিছু’ মানেই সীমা চিহ্নিত হয়ে আসা কিছু। ইংরেজি জবানে thing, আরবিতে শাই (شيء) আর বাংলায় ‘কিছু’ এর উপস্থিত বা অনুপস্থিত হওয়ার প্রসঙ্গ আসা মানেই সসীম কিছু। গড বা আল্লাহকে ‘সত্তা’ ধরলে, সর্বশক্তিমান বিবেচনা করলেও, ‘সত্তা’ বিবেচনা করলে সীমিত করা হয়। এই তর্ক তুলেছিলেন গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিদ্রিখ হেগেল, জার্মান দার্শনিক পন্ডিত লেখক। হেগেলের ‘ফিলোসফি অব রিয়েলিটি’ এর তলানিতে, তাঁর গড যদিও ‘অমনিপ্রেজেন্ট’ কিন্তু ‘কিছু’ আকারে সর্বত্র বিরাজমান না। তার মানে কি এই যে, মুসলমানদের বিশ্বাস মোতাবেক আসমান জমিন তথা মহাবিশ্বমন্ডলের সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানের আওতাধীন অর্থ মোতাবেক ‘অমনিপ্রেজেন্ট’! তা-ই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এই কারণে যে, দার্শনিক হেগেল দরবেশ জালালউদ্দিন রুমীর পংক্তি সমূহ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আরো একটি কারণ ফিলোসফিক্যাল থিওলজির খোঁজ নেয়ার প্রথম দিকেই গড কোনো কিছু আকারে থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। (এ বিষয়ে আমার রচনা ‘হেগেল ও রুমির খোদা’ -তে কিছু আলাপ আছে।)
      যাহোক, আপনার লেখাটির জন্যে আবারো ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com