রবিরশ্মিতে আলোকিত পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়

শান্তা মারিয়া | ১২ নভেম্বর ২০১৭ ১১:২৪ অপরাহ্ন

Tagoreসুদূর বেইজিং শহরে যখন একদল চীনা তরুণ তরুণীর কণ্ঠে শোনা যায় রবীন্দ্রসংগীত ‘মায়াবন বিহারিণী হরিণী’ তখন মনটা ভরে ওঠে প্রিয় মাতৃভাষার জন্য ভালোবাসার আবেগে। এরা চীনের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ‘পিকিং বিশ্বদ্যিালয়ে’র শিক্ষার্থী। তারা এখানে পড়ছেন বাংলাভাষা। চর্চা করছেন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে। বাংলাদেশে অবস্থিত চীন দূতাবাস আয়োজিত গণমাধ্যম কর্মীদের চীনসফর কর্মসূচির আওতায় সম্প্রতি কয়েকজন সাংবাদিকের চীন সফর। সেই সুযোগেই বেইজিং ভ্রমণ। সফরসূচিতে ছিল পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাবিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত অনুষ্ঠান দেখার আমন্ত্রণ। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় আমরা ক’জন সাংবাদিক গেলাম সেই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯২১ সাল থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের চীনা ভাষায় অনুবাদ, প্রচার ও গবেষণার কাজ চলছে। আলাপ হলো বিখ্যাত রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. দং ইউচেন-এর সঙ্গে। তিনি সরাসরি বাংলা থেকে চীনা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের রচনার একটি বিশাল অংশ অনুবাদ করেছেন। বললেন, রবীন্দ্রসাহিত্য ও বাংলাভাষার একজন অনুরাগী তিনি।

বর্তমানে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষা শিক্ষার কার্যক্রম চলছে। এই বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও যথেষ্ট। চীনা একজন শিক্ষার্থী বাংলায় বললেন তিনি বাংলাভাষাকে ভালোবাসেন কারণ এই ভাষা খুব শ্রুতিমধুর। অন্য একজন বললেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভক্ত তিনি। আমরা যেদিন গেলাম তার পরদিন থেকেই পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি উৎসব। সেখানে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, বাংলার লোকসংগীত, নজরুল সংগীত এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
চীনের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বাংলাভাষা পড়ানো হচ্ছে। দেশটিতে জনপ্রিয়তা বাড়ছে আমাদের প্রিয় বাংলাভাষার। অন্যদিকে বাংলাদেশেও চলছে চীনাভাষার চর্চা। বিখ্যাত চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস এর আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং তার নামে স্থাপিত কনফুসিয়াস ইন্সটিটিউটের ক্লাসরুমের আওতায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনাভাষা শিখছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।
ফিরে আসি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ চর্চা প্রসঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের চীন সফরের পর থেকেই চীনের সাহিত্যজগতে রবীন্দ্র-অনুরাগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। চীনের মূল ভূভাগে রবীন্দ্রনাথের যে তিনটি ভাস্কর্য রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরানোটি আছে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরিয়েন্টাল ভাষা বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রচার, অনুবাদ ও গবেষণার কাজ চলছে। গত সত্তর বছরে এই বিভাগে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী কাজ হয়েছে। ১৯৫৪ সালে চীনে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের শৈশব স্মৃতি ‘আমার ছেলেবেলা’র অনুবাদ। অনুবাদ করেন অধ্যাপক চিন খ্য মু। মাদাম শি চেন হলেন চীনের প্রথম নারী যিনি বাংলাভাষা শিখেছিলেন। তিনি শান্তিনিকেতনে বাংলা ভাষা শিখে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। নয়া চীন প্রতিষ্ঠার পর তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক রচনা চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন। সাহিত্যিক বিং শিন, জেং জেন তুও এবং শি চিন মিলে রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত কবিতা সংকলন প্রকাশ করেন ১৯৫৮ সালে। ওই বছরই মি চিন ‘মুক্তধারা’র অনুবাদ করেন। ২০০০ সালে চীনা ভাষায় প্রকাশিত হয ২৪ খন্ডের রবীন্দ্র রচনাবলী। পিকিং বিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিউ আন উ ছিলেন এর প্রধান সম্পাদক। বাংলা অনুবাদক দলে ছিলেন পাই খাই ইউয়ান, শি চি উ, দং ইউ চেন, হুয়াং জি খুন এবং লি ইউয়ান শান।
এরপর অধ্যাপক দং ইউচেন-এর উদ্যোগে ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় সম্পূর্ণ রবীন্দ্ররচনাবলী। ৩৩ খণ্ডে প্রকাশিত এই রচনাবলীর অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজে ছিলেন চীন আন্তর্জাতিক বেতারের নবীন প্রবীণ কর্মী এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞরা। সে সময় আমি চীন বেতারে বিদেশী ভাষাা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় নিজেও এই কাজে অংশ নিয়েছি।
Tagore-1শুধু অনুবাদ নয়, রবীন্দ্রবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার কাজও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষা বিভাগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই হয়ে আসছে। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ হলেন প্রাচ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে চীনে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ‘প্রাচ্য সাহিত্য কোর্সে’ রবীন্দ্রনাথের লেখা সবচেযে বেশি পড়ানো হয় । অধ্যাপক ওয়েই লি মিং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নামে নতুন কোর্স চালু করেছেন যা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সফরে রবীন্দ্রভক্ত হিসেবে আমার বড় প্রাপ্তি অধ্যাপক ওয়েই লি মিং, অধ্যাপক দং ইউচেন এবং অধ্যাপক ছি চান নং- এর সঙ্গে পরিচয় ও রবীন্দ্র বিষযক আলাপ। সত্যিকারের গুণী এই তিনজন অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপে ঋদ্ধ হয়েছি। জানতে পেরেছি চীনে রবীন্দ্রচর্চা বিষয়ে। ররিরশ্মিতে আলোকিত তারা। এই বিভাগে রবীন্দ্রনাথ বিষযে পিএইচডি গবেষণা করছেন ইয়াং ওয়েই মিং, বাংলার শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. কিশোর কুমার বিশ্বাস। তাদের কাছ থেকেও পেলাম অনেক অজানা তথ্য। চীনে রবীন্দ্রনাথ ঠাইগোর নামে পরিচিত। রবীন্দ্রপ্রীতির সূত্র ধরেই বাংলা ভাষার প্রতিও সৃষ্টি হয়েছে আাগ্রহ। চলছে বাংলা ভাষার চর্চা।
১৯২১ সালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেং জেন তুও রবীন্দ্র গবেষণা সমিতি স্থাপন করেছিলেন। এরপর পার হযেছে ৯৬ বছর। রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা দিন দিনই বেড়েছে। বেড়েছে তাকে নিয়ে চর্চা, আলোচনা। বাংলার রবি চীনের আকাশে ক্রমশ আরও বেশি দীপ্তিময় হয়ে উঠছেন।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গীতা দাস — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ৭:১২ অপরাহ্ন

      রবীন্দ্রচর্চায় যে চীন বাংলাদেশকে হার মানাচ্ছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন miltonkumar — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ৮:৪৫ অপরাহ্ন

      দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে রবিরশ্মির কদর কমছে দিন দিন। যে রশ্মিতে আলোকিত হচ্ছে সুদূর পিকিং সহ দূর বিশ্বের অজানা প্রান্ত, সেই রশ্মিকে দূরে রেখে বাংলা সাহিত্যে আলোকিত হতে চাচ্ছি বাংলাদেশি বাঙ্গালিরা। বড়ই অদ্ভুত আমাদের ভাবনা যা গ্রাস করতে চলেছে আগামীকে!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com