মারিয়ার নজরুল-অনুবাদ ও মূল্যায়ন

রাজু আলাউদ্দিন | ১৩ জুলাই ২০১৮ ১২:৪৫ অপরাহ্ন

১৯১৫ সালে প্রকাশিত হলো রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ প্রথমবারের মতো স্প্যানিশ অনুবাদে। অনুবাদক ছিলেন সেনোবিয়া কাম্প্রুবি দে আইমার নামের এক নারী; হুয়ান রামোন হিমেনেস ছিলেন তার সহযোগী। ঠিক একশ বছর পর রবীন্দ্রনাথের পরের প্রজন্মের সবচেয়ে প্রবল ব্যক্তিত্ব কাজী নজরুল ইসলামের অনুবাদ প্রকাশিত হলো স্প্যানিশ ভাষার আরেক বিদুষী নারীর কল্যাণে: মারিয়া এলেনা বাররেরা-আগারওয়াল। শত বর্ষের ব্যবধানে স্প্যানিশ ভাষায় দু’জনেরই সূচনা হয়েছে দুই নারীর মাধ্যমে।

কিন্তু কেন এই শতবর্ষের ব্যবধান? সন্দেহ নেই যে নোবেল-এর রাজতিলক রবীন্দ্রনাথকে অগ্রগামী করে রেখেছে। অগ্রগামী থাকার আরও একটি বড় কারণ রবীন্দ্রনাথের রচনার ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের সহজলভ্যতা। দুখু মিয়ার ভাগ্য এই দিক থেকে সুপ্রসন্ন ছিল না। আজও নজরুলের রচনা পশ্চিমের কোনো শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনী থেকে ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়নি। হয়নি মারিয়ার স্প্যানিশ অনুবাদে নজরুলের আলোচ্য গ্রন্থটিও। তারপরেও, এই অনুবাদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ঐতিহাসিক মর্যাদার দাবী রাখে। ঐতিহাসিক এই জন্য যে এই প্রথম স্প্যানিশ ভাষায় নজরুল অনূদিত হলেন। আর গুরুত্বপূর্ণ এই জন্যে যে লাতিন আমেরিকার তরুণ প্রজন্মের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক ও ভারতীয় সাহিত্য বিশারদের হাতে নজরুল যথার্থ গুরুত্ব ও সফলতায় অনূদিত হলেন।

এই অনুবাদের সাফল্য ও গুরুত্ব খতিয়ে দেখার আগে অনুবাদক মারিয়া এলেনা সম্পর্কে খানিকটা ধারণা আমাদের সামনে হাজির থাকলে আলোচনা লক্ষ্যচ্যুত হবে না আশা করি।

মারিয়া এলেনা নিজে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও গবেষক। তার গবেষণা গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে Jornadas Y Talentos (2010), Merton Y Ecuador (2010), Leon Americano (2013) Mejia Secreto (2013) Anatomia de una Traicion– La vento de la Bandera (2015) এবং সর্বশেষ প্রকাশিত বইটি হচ্ছে Dolores Veintemilla: Mas alla de los mitos (2016) । এই গ্রন্থগুলো একুয়াদবের ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন লেখককে নিয়ে উন্মোচনকারী গবেষণার ফল। এসব গবেষণায় আমরা দেখবো একুয়াদরের সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাস সম্পর্কিত মহার্ঘ তথ্যসমূহের আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। এসব গবেষণা গ্রন্থের বাইরে আছে প্রাচ্য, প্রতীত্য ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য এবং লেখকদের সম্পর্কে প্রবন্ধের এক অসামান্য সংকলন, La Flama Y el Eco, যেখানে ভারতের মীর্জা গালিব, মহাদেবী বর্মা, আমির খোসরু, হরিবংশ রায়, কুরারাতুল হায়দার, ভৈকম বশীর, প্রমুখকে নিয়ে আছে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ। ভারতের বিভিন্ন ভাষার এসব গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের সম্পর্কে স্প্যানিশ ভাষায়, মারিয়ার আগে অন্য কেউ স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিখেছেন বলে মনে হয় না। অর্থাৎ মারিয়ার কাজের তালিকার দিকে তাকালেই বুঝা যাবে তিনি ব্যবহৃত পথের বাইরে এক কুমারী পথের যাত্রী, অন্তত স্প্যানিশ জগতে। এই নতুন পথের প্রণোদনা থেকেই মারিয়া অনুবাদ করেছিলেন নজরুলের কবিতা ও প্রবন্ধ যা Nazrul: Prosa Y Poemas Selectos শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪ সালে। এই গ্রন্থে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, ‘ঈশ্বর’, ‘ধুমকেতু’, ‘খেয়া পারের তরণী’, ‘বিদায় বেলা’ ‘প্রলয়োল্লাস’ ‘চাঁদের মতো নিরবে আস’, ‘শ্যামা’ ‘দারিদ্র’সহ নজরুলের প্রতিনিধিত্বশীল মোট চোদ্দটি কবিতা এবং ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ এবং ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’ শীর্ষক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন। এছাড়া শেষের দিকে রয়েছে নজরুলের জীবনপঞ্জী এবং ইংরেজিতে প্রকাশিত নজরুল সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী। আর বইয়ের শুরুতে আছে একটি দীর্ঘ ভূমিকা যা স্প্যানিশভাষী পাঠকদের জন্য নজরুলের স্বাতন্ত্র্য ও গুরুত্ব বুঝতে সহায়ক হবে। ভূমিকায় নজরুল মূল্যায়ন ও অনুবাদের পদ্ধতি সম্পর্কে মারিয়ার মন্তব্যে পৌঁছার আগে আমরা তার অনুবাদ নিয়ে সংক্ষেপে দুএকটি কথা বলতে চাই। মূলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে লক্ষ্য করা যাবে তিনি যে বিশ্বস্ততায় নজরুলের কবিতা ও প্রবন্ধগুলো অনুবাদ করেছেন তা রীতিমত বিস্ময়কর। দুটি ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নতা সত্ত্বেও মারিয়া চেষ্টা করেছেন নজরুলের উদাত্ত উচ্চারণ ভঙ্গিকে–বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ক্ষেত্রে–অক্ষুন্ন রাখতে। শব্দ নির্বাচন, বাক্যে নজরুলসুলভ পৌরুষদীপ্তি ও আলংকারিক দক্ষতাকে স্প্যানিশ ভাষায় যে সংবেদনশীলতায় উপস্থাপন করেছেন তা অনুবাদকের গভীর কাব্যবোধের অনন্য নজির হয়ে উঠেছে। অনুবাদের পদ্ধতি প্রসঙ্গে মারিয়া এই গ্রন্থে জানিয়েছেন যে

“কবি তার লেখায় সমৃদ্ধ যে প্রতীকসমূহ অঙ্গীভূত করেছেন তার প্রতি কিভাবে সাড়া দেয়া যায়? একটা উপায় হতে পারে এই যে যে-স্তবকগুলোয় প্রতীকসমূহ দৃশ্যমান সেগুলোকে কবিকৃত মূল নাম ও বর্ণনার পরিবর্তে সম্ভাব্য অর্থের প্রকাশ ঘটিয়ে তাকে সহজ করে নেয়া। আরেকটা উপায় যা দাবী করে সেটা হলো, পৃষ্ঠায় পাদটিকার আকারে মূল রচনায় ভাষ্য সংযোজনের মাধ্যমে এইসব বর্ণনা ও নামগুলো অক্ষুন্ন রাখা।

বর্তমান গ্রন্থে দ্বিতীয় উপায়টি অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে।”
Como actuar respecto de la rica simbologia incorporada por el vate en sus obras? Una opcion implica la de simplificar los pasajes en que esa simbologia aparece, manifestando su probable significado en lugr de las descripciones o los nombres empleados originalmente por el poeta. Otra opcion requiere conservar esas descripciones y nombres, dotando al texto de un paratexto en forma de notas de pie de pagnia.

La segunda opcion ha sido aplicada en las traducciones incluidas en el presente libro. (P-9)

তার মানে মূল রচনাকে অপরিবর্তিত রেখে, প্রয়োজনে অপরিচিত অনুষঙ্গ সম্পর্কে টিকাভাষ্য প্রদান করে অনুবাদকে যতটা মূলের কাছে রাখা যায়, মারিয়া তা-ই করেছেন এই গ্রন্থে। এই পদ্ধতি অনুবাদকের জন্য খুবই শ্রমসাধ্য এবং দুরুহ কিন্তু মূলের প্রতি তা সুবিচারকে নিশ্চিত করে।

মারিয়া নজরুল সম্পর্কিত অন্য এক প্রবন্ধে অনুবাদ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। সেই কথাগুলো শুনলে তার অনুবাদের সার্থকতা সম্পর্কে একটা আন্দাজ পেয়ে যাবো আমরা। তিনি বলেছেন: “আমি নজরুলের কবিতা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। এটি যেমন আলোকসঞ্চারী ও দুরূহ কর্ম, তেমনি আমার জন্য লাভজনকও বটে। শুরু থেকে আমি এ বিষয়ে সচেতন যে, কোনো অনুবাদেই মৌলিক রচনার অনন্য শৈলীর চমৎকারিত্ব পুনঃসৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এমন কি তার কবিতার সুগভীর নিনাদকেও সীমিতভাবে প্রতিধ্বনিত করা যায় না। এতসত্ত্বেও, আমি এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করলাম যে, তার কবিতার আশ্চর্য শক্তিমত্তা (যেমন ‘বিদ্রোহী’), স্প্যানিশভাষী পাঠক-পাঠিকাদের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।” (সর্বজনীন নজরুল, বিডি আর্টস)।

এতো ঠিকই যে প্রতিটি ভাষার রয়েছে নিজস্ব গড়ন ও বাচনভঙ্গি; ফলে স্রেফ গদ্যে রচিত বিষয়ই যখন এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় স্থানান্তরের পর এক রকম থাকে না, সেখানে কবিতা–ভাষার ভেতরে অন্য এক ভাষা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হওয়ার কারণে–অন্য ভাষায় অনুবাদ তা আরও দুরূহ হয়ে পড়ে। নজরুলের কবিতা এই অর্থে দুরূহতম। ঠিক এই কারণে রবীন্দ্রনাথের কবিতা যখন সেনোবিয়া ও হিমেনেসের হাতে অনূদিত হলো স্প্যানিশভাষায়, তা বদলে গেল অনেকটাই, এতটাই যে সেই অনুবাদকে ‘হিমেনেসিয় আদলে তৈরি রবীন্দ্রনাথ’ বলে অভিহিত করা হলো। মারিয়া নিজে হিমেনেসিয় এই অনুবাদ সম্পর্কে ২০০৪ সালে এক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে অনুবাদের এই ধরন সম্পর্কে তার কোনো পক্ষপাততো ছিলোই না, বরং বলেছিলেন, “মূল থেকে নতুন করে অনুবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা। এমনকি এই কিছুদিন আগেও ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত Translating Nazrul into Spanish প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে “হিমেনেসের মতো রবীন্দ্র আদলে নজরুলের ব্যক্তিত্বকে সৃষ্টি করার বিপদগুলো এড়ানো ছিল আমার লক্ষ্য। তার কবিতাগুলোয় প্রয়োজনে ঠিকাভাষ্যসহ হলেও দেশজ (Local) অনুষঙ্গের পরোক্ষোল্লেখগুলো দরকারী। তার ধর্মীয় কবিতাগুলো অন্তর্ভুক্ত ও উপস্থাপিত হওয়া উচিৎ স্বচ্ছভাবে যাতে থাকবে না বিমূর্ততা, রূপান্তর কিংবা মূল লক্ষ্যকে হাল্কা করে দেয়ার মতো কোনো সাধারনীকরণ। এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ যেটা তাহলো তার শক্তিমত্তা, ক্রোধ আর ন্যায়বোধ তাতে উজ্জ্বল্যের সাথে হাজির থাকতে হবে, ‘বিদ্রাহী’কে হতে হবে ‘বিদ্রোহী’। তার গতিবেগের (Impetus) তরলীকৃত সংস্করন করাটা হবে বিশ্বাঘাতকতার শামিল। বিষয়ের লক্ষ্যে নয়, বরং ধ্বনিসাম্য খোঁজার লক্ষ্যে আমি স্প্যানিশ ভাষায় চিরায়ত কবিতাগুলোও আবার নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। কেবল পাঠযোগ্য একটা অনুবাদ তৈরি করাই যথেষ্ট ছিল নাÑ আমাকে খুজঁতে হয়েছে সেই ছন্দোস্পন্দ যা মূল কবিতাগুলোর সাংঙ্গীতিক প্রবহমানতাকে যাতে অস্বীকার না করে।’
My intention was to avoid the pitfalls of creating a personal Nazrul, in the image of Jimenez’s Tagore. This required that the local allusions in his verses had to be conveyed, even if that required a body of notes and explanations. His religious poetry had to be included and presented in a clear way – no abstractions, transformations or generalisations that would dull his original intention. And, more importantly, his energy, anger and sense of justice had to shine through. “Bidrohi” had to be “Bidrohi.” A diluted version of his impetus would have been a betrayal. I had also to revisit classic poetry in Spanish, not for content but for sound: It was not enough to create a readable translation – I sought to have a cadence that would not deny the musical fluidity of the original verses.

অনুবাদকের এই ভাষ্য থেকে আমাদের কাছে এটা পরিস্কার হয়ে ওঠে তিনি নজরুলের কবিতাগুলো অনুবাদের ক্ষেত্রে কী রকম সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। নজরুলের কবিতা ও কয়েকটি প্রবন্ধ এই সতর্কতাসহ অনুবাদের পাশাপাশি মারিয়া নজরুল বিষয়ক যে প্রবন্ধটি তিনি আলোচ্যগ্রন্থে ভূমিকা হিসেবে লিখেছেন সেটি মূল্যায়নের অভিনবত্বে, পর্যবেক্ষণের নবীনতা আর তুল্যমূল্যের বিশ্লেষী গুণে শুধু সমৃদ্ধই নয়, আমাদের জন্য নজরুল-বিচারে পুণর্বিবেচনার দিগন্তকেও তা উন্মোচন করবে নানা কারণে।

বহির্বিশ্বে নজরুল এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচিত নন। এমনকি নিজ ভাষাতেও নজরুল বহু সমালোচকের দ্বিধাদ্বন্দ্বের অন্ধকার ভেদ করে রাঙা প্রভাতের মতো উদিত হয়েছেন– সেও বেশিদিন আগের কথা নয়। তবে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় বিশ্বাসী সৃষ্টিশীল ও মননশীল চিন্তানায়করা তাঁর মহত্বকে চিহ্নিত করতে ভুল করেননি। নজরুলের দুর্মর উত্থানের সূচনালগ্নেই বহুভাষী পণ্ডিত ও চিন্তানায়ক বিনয় সরকার ১৯২২ সালে প্রকাশিত ফিউচারিজম অব ইয়ং এশিয়া গ্রন্থে ‘চরম তারিফ’ করে বলেছিলেন, “নজরুল আধুনিক বাংলা কাব্যের যুগ-প্রবর্তক”। এবং এ কথা বলার পেছনে মূলত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাই যে মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘বিদ্রোহী’কে অনেকেই হুইটম্যানের অনুকরণ বলে অবমূল্যায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন এক সময়। কিন্তু বিনয় সরকারের মতো সুশিক্ষিত ও সুপণ্ডিত লেখক উভয়ের তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “বাঙালীর বাচ্চা এই “বিদ্রোহী’ ছন্দে হুইটম্যানকে নকড়া-ছকড়া করে ছেড়ে দিয়েছে। হুইটম্যা ভেয়র লিবর” বা গদ্য-ছন্দের মালিক। মিত্রাক্ষর বা মিলনাত্মক পদ্যের ছন্দে তার একতিয়ার ছিল না। কিন্তু মিত্রাক্ষর পদ্য-ছন্দে আত্ম-প্রকাশ করতে পেরেছে “বিদ্রোহী”। ” (বিনয় সরকার, বিনয় সরকারের বৈঠকে, দেজ, আগস্ট ২০১১, পৃ ৩৯৮)

বিনয় সরকার থেকে এই উদ্ধৃতি দেয়ার মূল কারণ, আমরা লক্ষ্য করবো লেখিকা মারিয়াও হুইটম্যানের পাশে এই কবিতার স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করতে ভুল তো করেনইনি, বরং আমাদের সামনে উন্মোচন করেন আরও কিছু তাৎপর্য বা আমরা আগে কখনো ভেবে দেখিনি।

‘বিদ্রোহী’তে কবির কণ্ঠস্বর একই সঙ্গে একক ও সামষ্টিক। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিসত্তার ভিতর যে নানাকৌণিক অভিজ্ঞতা লুকায়িত থাকে, এই কবিতায় তারও রূপায়ন ঘটতে দেখা যায়। অন্যদিকে, কবির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার পৌরাণিক প্রসঙ্গসমূহ ঐশ্বরিক ও প্রাকৃতিক শক্তিমত্তায় একীভূত হতে দেখি। এসব ক্ষেত্রে নজরুলের উপর ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্ববহ। এই বাঙালি কবির রচনা সাক্ষ্য দেয় যে তিনি এই মার্কিন কবি সম্পর্কে জানতেন এবং তার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। যা-হোক, আমি বিশ্বাস করি নজরুলের ক্ষেত্রে লিভস অব গ্রাস অনুপ্রেরণার একটি তুঙ্গীয় উৎস, যা ‘বিদ্রোহী’ রচনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। তবে এটা সত্য যে লিভস অব গ্রাস ‘বিদ্রোহী’ রচনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক নির্ণায়ক উৎস নয়।

স্মর্তব্য, যে পরিস্থিতিতে ‘বিদ্রোহী’র সৃষ্টি তাতে এই কবিতার মৌলিকতাই বিশেষভাবে বিবেচ্য ও প্রশংসার দাবিদার। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কবিতা লিখেছিলেন হুইটম্যান, যিনি তার নাগরিক অধিকারসমূহকে সহজভাবেই অর্জন করে জীবনযাপন করেছেন। নজরুলের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। নজরুল লিখেছিলেন এক অবর্ণনীয় দমন ও নিপীড়নের মধ্যে। এক বিদেশি শক্তির আরোপিত শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন নজরুল ও তার সম্প্রদায়। কাজেই তার বিদ্রোহ এমন কিছু বিষয়কে তুলে ধরেছে যা হুইটম্যানের রচনায় অনুপস্থিত। নজরুলের রচনায় আছে সীমাহীন ক্রোধ, তৎসহ স্বাধীনতার জন্য আকাক্সক্ষা, যা নিরানন্দ, কিন্তু সুতীব্র।”
La voz del poeta en Bidrohi es, a un mismo tiempo, singular y colectiva. Ocupa, a momentos, la individualidd de seres comunes y corrientes, cuya experiencia vital es invocada en todo su recondito valor. En otras instancias, el espiritu del poeta adquiere proporciones miticas, apropiandose de fuerzas divinas y naturales y superandolas. Por esos y otros detalles, se ha insistido a menudo en la importancia de la influencia de Walt Whitman en el trabajo de Nazrul. Existe evidencia en los escritos del poeta bengali de su conocimiento y admiracion por el estadounidense. Sin embargo, a la luz de la historia de Nazrul, la lectura de Bidrohi deja entrever que Hojas de Hierba debe considerarse una de las muchas fuentes de inspiracion del poema, no la mas determinate.

Resulta imprescindible recordar de nuevo las circunstancias en que Bidrohi fue creado, para mejor apreciar su originalidad. Whitman produce sus versos como ciudadano de un pais autonomo, en el que ha llevado una vida en la que los mas basicos derechos civiles le son acordados de manera natural. Su optica es distinta de la de Nazrul. Este excribe dentro de un contexto de opresion indecible, que implica la imposicion tanto de sujecion material como de degradacion espiritual por parte de un poder extranjero. Su rebeldia proyecta, por tanto, aspectos inexistentes en Whitman. Esta imbuida de una indignacion inmensa, de una voluntad de libertad que no es gozosa, sino lancinante. ( p 24-25)

যে কোনো ভাষাতেই শুধুমাত্র একটি কবিতা দিয়ে সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার নজির বিরল। “বিদ্রোহী’র সামগ্রিক অর্জন পৃথিবীর সেরা কবিদের কোনো কোনো একক গ্রন্থের সমান হয়ে উঠেছে, যেমন হুইটম্যানের লিভস অব গ্রাস, কিংবা র‌্যাঁবোর ইলুমিনেশন কিংবা হাইনের পোয়েমাস

শুধুমাত্র এই কবিতার ক্ষেত্রেই নয়, মারিয়ার মতে, নজরুল সমগ্র সাহিত্যকর্মের মাধ্যমেই হয়ে উঠেছেন এক মহান লেখক। নজরুলের প্রথাবিরোধী ও স্বাধীনচেতা চরিত্রের সাহিত্যিক বিস্ফোরণের মধ্যে উপনিবেশ বিরোধী বৈশিষ্ঠ্য সম্পর্কে মারিয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “কাজী নজরুল ইসলাম এমন একজন অনন্যসাধারণ কবি যার ক্ষেত্রে উত্তর-উপনিবেশাবাদী সাহিত্যের তত্ত্ব খাটে না। কারণ তিনি সেই স্বল্পসংখ্যক লেখকদের একজন- বিশ্বের ইতিহাসে, বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে- যাঁর মন ছিল ঔপনিবেশিক দাসত্বমুক্ত (decolonized), এমন একটা সময়ে যখন এ পরিভাষার উৎপত্তি পর্যন্ত হয়নি।”
(Kazi Nazrul Islam is such an exceptional poet that the theory of post-colonialism literature does not really apply to him. Because he is probably one of the few authors in the world’s history … in literature, in world history … who had a completely decolonized mind, way before the term came to exist.)

নজরুলের রাজ বন্দীর জবানবন্দী নামক লেখাটি সম্পর্কে মারিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও এখানে উল্লেখ করা উচিৎ যা আমি নজরুল বিষয়ক অন্য কারোর লেখায় দেখিনি। তিনি এই গ্রন্থের প্রবন্ধ অংশে এই লেখাটি সম্পর্কে বলেছেন যে এটি se trata de una pieza de gran elocuencia, redactado con sutileza de un Jurista y la pasion de un patriota. (P-67)
জবানবন্দী নামক এই স্বীকারোক্তিমুলক লেখাটি সম্পর্কে পরে ইংরেজিতে রচিত Poet for world: The universality of Kazi Nazrul Islam প্রবন্ধে আরও বিস্তারিত বলতে গিয়ে আমাদেরকে চমকে দিয়েছেন এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে:
The ‘Testimony of a Political Prisoner’ is one of the most daring essays ever written, not only in reason of its flawless structure and reasoning, but also because of its central premise: Nazrul places himself in the position of the universal citizen, totally unencumbered by prejudices and above all intolerance. In an exercise, he proposes to consider the fight against injustice from a point of view perfectly unbiased: If India was the colonial power and Britain the colonized country, the British would be justified to revolt as the Indians are justified to revolt against the British colonial power. (Poet for the World: The Universality of Kazi Nazrul Islam.
(http://arts.bdnews24.com/?p=6431#more-6431)

নজরুলের এই লেখাটিকে আমরা ঠিক এই গুরুত্ব ও তাৎপর্য থেকে কখনো ভেবেছি বলে মনে হয় না। নজরুলকে যারা অতি আবেগ ও উচ্ছ্বাসের মোহনীয় রূপ বলে আখ্যায়িত করেন তারা যে এই লেখকের মধ্যে যুক্তিবোধের সৌন্দর্য ও ন্যায়বোধের সর্বজনীন রূপালেখ্যও–মনোযোগ দিলে– খুঁজে পাবেন, মারিয়ার এই বক্তব্য আমাদেরকে সেকথাই মনে করিয়ে দেয়। মারিয়ার এই ব্যাখ্যায় আমি আবিস্কার করি নজরুলের দেশোত্তর এমন এক রূপ যা জাতির গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানবিক মোহনায় গিয়ে স্থিত হয়।
যে-কোনো ভালো অনুবাদই পাঠকদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে আবিস্কারবোধের চেতনা। মারিয়ার এই গ্রন্থে আমরা সেই আবিস্কারকে পাই দ্বিগুণ রূপে। একটি এই অনুবাদে, আর অন্যটি তার এই ভূমিকায় ও নজরুল-বিষয়ক অন্যান্য লেখা ও উক্তিতে। আমা বিশ্বাস, মারিয়া এই অনুবাদের মাধ্যমে নজরুলের বৈশ্বিক চরিত্রকে অত্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরেছেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মারিয়াকে অভিনন্দন।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saif Barkatullah — জুলাই ১৩, ২০১৮ @ ২:০০ অপরাহ্ন

      দারুণ একটা কাজ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr.Debabrata Chakrabarti — জুলাই ১৩, ২০১৮ @ ৫:১৪ অপরাহ্ন

      নোবেলের রাজতিলক নেই বলে বিশ্ব দরবারে নজরুল অবহেলিত রয়ে গেছেন – তবু আমি বলি নোবেলহীন নজরুলকে এইভাবে ব্রাত্য করে রাখা যায়নি৷
      একথা ঠিক ইংরেজী বা অন্য কোনও ইউরোপীয় ভাষার একজন এত বড় মাপের কবি কখনও অনুবাদহীনতার রোগে ভোগেন না৷ কখনওই না৷ এর কারণ ১৷ সেখানে বিদ্বান জনগণের মধ্যে পাঠকের শতকরা ভাগ অনেক বেশী, সুতরাং প্রকাশকরা আগ্রহী ২৷ সরকারও এঁদের বই অনুবাদের ব্যাপারে উন্নাসিক নন৷ তাঁরা অনুবাদের জন্য নানা আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা রেখেছেন৷ আমার প্রশ্ন ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং তৎসহ বাংলাদেশ অন্য কোনও ভাষায় অনুবাদের জন্য কোন আর্থিক অনুদান দেন কি? বিশ্বভারতীর একটি সভায় শুনেছিলাম এক আমলা বলেছিলেন, আমরা কেন রবীন্দ্রনাথের বিদেশী ভাষায় অনুবাদের জন্য ব্যাকুল হব? সেই সেই দেশের লোকেরা আসুক, আমাদের প্রস্তাব দিক৷ আমার শরীরের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড অট্টহাসি ফল্গু নদীর স্রোতের মধ্যে মিশে গিয়েছিল৷
      শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে অবশ্য নজরুলের ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে৷ আমি এক্ষুনি কোনও রেফারেন্স দিতে পারব না, কিন্তু জানি হয়েছে৷ আর জানি জার্মান ভাষাতেও হয়েছে৷ এই তো কিছুদিন আগে শেখ মুজিবুর রহমান-এর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর জার্মান অনুবাদ বার করল হামিদুল খান আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু – ফ্রাংকফুর্ট থেকে, যা অধিকাংশেই বারবার দাশগুপ্তের অনুবাদ৷ আমি তার তথ্য সচিত্র গ্রন্থিত করেছিলাম এই মুখমিত্র-তেই – প্রসঙ্গত জানিয়েছিলাম নজরুল-এর অনুবাদক হিসাবে বারবারা দাশগুপ্তের কৃতিত্বের কথা৷
      আমাদের পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে অনুবাদের জন্য পুরস্কার খুব সম্ভবত আছে দুটি৷ হ্যাঁ, অ্যা-অ্যা-তো বড় দেশে৷ সেখানে ধর্নায় বসে আছে কয়েক কোটি লোক৷ এ এমন দেশ যেখানে – ধরা যাক – স্প্যানিশ খেকে সরাসরি অনুবাদ না করে হাত ফেরতা ইংরেজী থেকে স্প্যানিশ সাহিত্যের অনুবাদ করলেও পুরস্কার পাওয়া যায়, যদি আপনি কোনও লবিভুক্ত হন৷ সেখানে ভারতের সরকার নজরুলের অনুবাদ করাবে হাঙ্গেরিয়ান-এ, স্লোভাক-এ, স্লোভেনিয়ান-এ, ক্রোয়াশিয়ান-এ, ইতালীয়-তে গ্রীক-এ, ক্যাটালান-এ, রোমানশ-এ, প্রোভেশাঁল-এ – এ যে স্বপ্নেরও অতীত৷ “ট্যাগোর-জ্বী”-ই তো পুরোটা হিন্দি, মালয়ালম, তামিল-এ বা ভারতের গোটা পঁচিশ প্রাদেশিক ভাষায় অনুবাদ করানো যায়নি – যা হয়েছে তা হয়তো সর্বসাকুল্যে সব ভাষা মিলিয়ে মোট শ দুয়েক পাতা৷ মাই ডিয়ার রাজু আলাউদ্দীন, রাজতিলক মানে আপনি কি আকাশকুসুম বা শশশৃঙ্গের কথা বলছেন? অথবা হাঁসজারু?
      বাংলাদেশও কি নজরুলের বিদেশী ভাষায় অনুবাদ-কে অনুদান দেবে? টাকা স্রোতের মত বাজে কাজে ব্যয় হয়, চুরি হয়, মায় ডাকাতি হয়৷ গরীব দেশ বলবেন না বাংলাদেশকে৷
      (লোকে পড়বে তো?)
      পুনশ্চ : এই বইয়ের মলাট-টি দেখে খুব হতভম্ব হয়ে গেছি৷ ফ্রন্ট কভার-এর ফ্ল্যাপ-এ (একে কি প্রচ্ছদলতিকা বলব?) অনুবাদকের ছবি? যদি কেউ বলেন যে না, নজরুল-এর ছবি তো সামনে ছাপাই আছে – তবু আমি বলব প্রথম ফ্ল্যাপ-এ নজরুল-এর ছবিই থাকা উচিত৷ অনুবাদকের ছবি ও তাঁর পরিচয় অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেটা পিছন দিকে৷ অনুবাদক যতই বিশাল কাজ করুন না কেন, তাঁকে মূল লেখকের/কবির কাছে নতজানুই থাকতে হয়৷

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razualauddin — জুলাই ১৪, ২০১৮ @ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন

      শ্রদ্ধেয় অনুবাদক দেবব্রতদা, আপনার উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দেয়ার মাধ্যমেই শুরু করা যাক,“ ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং তৎসহ বাংলাদেশ অন্য কোনও ভাষায় অনুবাদের জন্য কোন আর্থিক অনুদান দেন কি?” ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের কথা আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশে কেবল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে আর্থিক অনুদান দেয়।
      আমলাদের কথা আর কী বলবো! এরা কিসের যোগ্যতায় যে চাকরী পায় ভগবানই জানেন। নজরুলের অনুবাদ ইংরেজি ছাড়াও অন্যান্য ভাষায় হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেসব অনুবাদ বিদেশি কোনো প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরিয়েছে কিনা? অনুবাদের ক্ষেত্রে পুরস্কারের বিষয়টি আমাদের দেশেও একই রকম পরিস্থিতি। ““ট্যাগোর-জ্বী”-ই তো পুরোটা হিন্দি, মালয়ালম, তামিল-এ বা ভারতের গোটা পঁচিশ প্রাদেশিক ভাষায় অনুবাদ করানো যায়নি – যা হয়েছে তা হয়তো সর্বসাকুল্যে সব ভাষা মিলিয়ে মোট শ দুয়েক পাতা৷” –আপনার এই তথ্যটি জেনে একটু বিস্মিতই হলাম। তাহলে নোবেলের রাজতিলকও দেখছি খুব একটা কাজে লাগেনি। হায় রবীন্দ্রনাথ! কী দুর্ভাগ্য। “বাংলাদেশও কি নজরুলের বিদেশী ভাষায় অনুবাদ-কে অনুদান দেবে?” আপনার এই প্রশ্নের উত্তরে এটুকু বলতে পারি সরকার অনুদান দেবে, হয়তো লবিং টবিং করতে হবে কিংবা তা নাও লাগতে পারে। এদেশে টাকা ভূতে জোগায় আবার ভুতেরাই এসব টাকা খেয়ে ফেলে । না , বাংলাদেশ গবীর না, গরীব হলে ভারত সর্বাধিক রেমিটেন্স বাংলাদেশ থেকে পায় কী করে! গরীব হচ্ছি আমাদের মন। দেশপ্রেমহীনতার দারিদ্রে ভুগি আমরা, মননের মিশকিন আমরা।
      মলাট সম্পর্কে অবশ্য আমার কোনো বক্তব্য নেই, যেহেতু এটা প্রকাশকের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে “অনুবাদক যতই বিশাল কাজ করুন না কেন, তাঁকে মূল লেখকের/কবির কাছে নতজানুই থাকতে হয়৷” –এই কথাটায় আমার সশ্রদ্ধ দ্বিমত আছে। আপনি স্বয়ং এত বড় অনুবাদক হয়ে কেন একথা বললেন তা আমি বুঝতে পারছি না। অভিমান থেকে যদি বলে থাকেন তাহলে তো এনিয়ে তর্ক করার কিছু নেই। তবে সত্যি সত্যি যদি বলে থাকেন তাহলে আমার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে অনুবাদক কোনো মূল লেখকের কাছে নতজানু নন, বরং মূল হচ্ছে তার কাছে শিল্পীর মডেল-এর মতো যাকে সামনে রেখে তিনি মূলকে ইনটেলিজিবল, ও ইউনিভার্সেল করে তোলেন অন্য ভাষীদের কাছে। আপনার নিশ্চয়ই মনে পরবে অক্তাবিও পাসের সেই কথা যে There no original text; all are translation: each word and each phrase explains (translate ) what other words and phrases mean. Speech is continual translation within the same language.( Seven Voices , p-235) এমন কি তার সেই বিখ্যাত প্রবন্ধ Translatoin: Literature and letters –এও আমাদেরকে অনুবাদক ও অনুবাদ বিষয়ে এমন এক ধারণার মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেন যেখানে নতজানু ধারণাটি উধাও হয়ে যায়। কিংবা আপনার হয়তো মনে পরবে হোর্হে লুইস বোর্হেসের সেই প্রবন্ধটির কথা যেখানে তিনি আলোচনা করেছেন ওমর খৈয়াম ও তার অনুবাদক ফিটজেরাল্ড নিয়ে, যে-লেখাটির শেষ স্তবকে এসে তিনি অনুবাদক বিষয়ক যুগান্তকারী ঘোষণাটি দিলেন: All collaboration is mysterious. That of the Englishman and the Persian was even more so, for the two were quite different, and perhaps in life might not have been friends; death and vicissitudes and time let one to know the other and make them into a single poet. (Selected Non-fictions, p-368) । অনুবাদকই কি একজন মূল লেখককে দেশ ও কালের সীমা থেকে ছিনিয়ে এনে তাকে অনুবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক করে তোলেন না? আশা করি আপনি আমার বাচালতায় ক্লান্ত হয়ে পরবেন না। আমাদের দেশে এমনিতেই অনুবাদ ও অনুবাদককে অবহেলার চোখে দেখা হয়—আপনি তা ভালো করেই জানেন। যারা অবহেলা করেন তারাই আবার আহাজারি করেন এই বলে: আহা , তাদের মৌলিক লেখা অনূদিত হচ্ছে না বলে বুঝাতে পারলেন না তারা কত বড় আর কত মৌলিক লেখক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানিক বৈরাগী — জুলাই ১৪, ২০১৮ @ ৭:৪৩ পূর্বাহ্ন

      মারিয়াকে বাংলা ভাষাভাষী, নজরুল-পাঠক হিসেবে অভিনন্দন কৃতজ্ঞতা জানাই।
      আমি আশা করি নজরুল ইন্সটিটিউট মারিয়াকে একটি সংবর্ধনা দিবে।
      আর কবি রাজু আলাউদ্দিনকে এই নিবন্ধ লেখার জন্য ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com