বইয়ের আলোচনা

অনিকেত শামীমের কবিতা: সারল্য ও গাম্ভীর্যের দিকে

সরকার মাসুদ | 6 Nov , 2017  

Aniket২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেরিয়েছে ‘অনিকেত শামীমের কবিতা।’ বাংলালিপি কর্তৃক প্রকাশিত এই গ্রন্থে আছে প্রায় একশত কবিতা। যারা আগে কখনো অনিকেত শামীমের কবিতা পড়েননি কিংবা অল্প স্বল্প পড়েছেন তাদের জন্য এই বই বলা যায় পূর্ণাঙ্গ এক আয়োজন। শামীমের কবিতার সব রকম বৈশিষ্ট্যই ধারণ করেছে এটা।
অনিকেত শামীমকে আমি চিনি ১৯৮৭ থেকে। সে-সময় আমি ঢাকার অদূরে একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতাম। শামীম তখন কিশোর কবি; তার বিশ্ববিদ্যালয়ী পড়ালেখার পাঠ চোকেনি তখনো।
কিন্তু শামীমের কবিতার সঙ্গে আমি পরিচিত হই ১৯৯১/৯২-এর দিকে। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকেও তার আরও কিছু কবিতা পড়েছি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে। হ্যাঁ, শামীম গোড়া থেকেই লিটল ম্যাগাজিনের লেখক। দৈনিক বা সাপ্তহিক কোনো কাগজে তার লেখা পত্রস্থ হতে দেখিনি কখনো। পুরো নব্বইয়ের দশকজুড়ে শামীম তরুণ কবি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাতে সচেষ্ট ছিলেন। যশোপ্রার্থী আর-দশজন তরুণ কবির মতোই ছিল তার কর্মকান্ড। কখনো কখনো তার কোনো কবিতার পুরোটা অথবা কিছু পংক্তি আমার ভালো লাগতো। আজ বলতে দ্বিধা নেই সেই ভালো লাগাটা ছিল বুদ্বুদের মতো। কেননা মনে রাখার মতো বিশেষ কোনো ধরন বা কায়দা সে সব লেখার মধ্যে ছিল না; অন্তত আমার চোখে পড়েনি।

‘অনিকেত শামীমের কবিতা’ গ্রন্থটি পুরোপুরি পাঠ করার পর মনে হয়েছে, এখানে আমি অন্য এক শামীমকে দেখতে পাচ্ছি যিনি কেবল তার নামই পালটাননি, পালটে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন কবিতার প্রকাশরীতিও। বেশ কল্পনাসচ্ছল এবং হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে তার কবিতার ধরন। কয়েকটি দৃষ্টান্ত:


মাথায় অগ্নিপিণ্ড
চুপচাপ বসে আছি পিনপতন স্তব্ধতায়
আলোর ফেরিওয়ালা
সব কিছু ধরা পড়ে আমার এন্টেনায়
তোমাদের সমূহজীবন
দূরে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করি।
–পিলসুজ


ক্রমশ বিন্দু থেকেই বৃত্ত হতে হতে সেই বৃত্তাকার ঢেউ
গড়িয়ে গড়িয়ে একসময় হাওয়া হয়ে উড়ে যায় শূন্যে


লেরমন্তভের নায়কের মতো
তুমি নিঃসঙ্গ এবং অসুখী
তোমার জীবনের অপ্রাপ্তিসমূহ
উদাসী হাওয়ায়
মিলিয়ে যায়…

র‌্যাঁবো একবার বলেছিলেন, ‘সারল্য আমাকে কাঁদায়।’ অর্থাৎ সরলতার ভেতর যে বেদনাবোধ লুক্কায়িত আছে সেটাই তার অন্তর্গত কান্নার হেতু। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী রচিত আধুনিক কবিতায় আমরা অজস্র জটিল গ্রন্থি এবং অবাঞ্ছিত অনচ্ছতার বিচিত্র রূপ প্রত্যক্ষ করেছি। শুধু ইংরেজি ভাষায় রচিত কবিতার কথাই যদি বলি, তাহলে উদাহরণ হিসেবে টি এস এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, হার্ট ক্রেন, ডিলান টমাস, ফিলিপ লারকিন, জন অ্যাশবেরি, টেড হিউস, অ্যালান টেট, ক্রেগ রেইন, অ্যান্ড্রু ওয়াটারম্যান প্রমুখের কথা বলা যেতে পারে। এই কবিগণ সকলেই নিজ নিজ ভাবসম্পদ ও রচনারীতির বৈশিষ্ট্য দীপ্তিময়। কিন্তু এদের কারও রচনা সহজপাচ্য নয়। অনিকেত শামীমের কবিতা কিন্তু আমরা বুঝতে পারি। আর কেবল ভাষিক সারল্য ও সহজবোধ্যতাই নয়, তার কবিতায় মাঝে মাঝেই দেখা দেয় ভাবগাম্ভীর্যও। তার চেহারা কেমন দেখুন–
ক) তোমাকে পাঠ করা মানেই/ অপার রহস্যের ঘূর্ণাবর্তে দোলাচল/ আমি সহজপাঠ্য। কোনো ঝুটঝামেলা নেই/ এসো– আমরা সরল অংক কষি। পাঠ নিই সরলতার/ জীবন এতটা জটিল কে বলল তোময়?
খ) সকাল থেকে সন্ধ্যা/ তিনজন ফেলো খুঁজে ফেরে জীবনের সঙ্গ/ নীলাচল থেকে নামতে নামতে/ একজন আখতার হামিদ খান বলে দেন কানে কানে/ এই তো জীবন এই তো জীবন/ তোমাদের অতি নিকটেই গড়াগড়ি যায়।

মনে পড়ে গেল রবার্ট ফ্রস্টের সেই প্রাবাদিক উক্তি– আধুনিক কবি তিনিই যিনি আধুনিক পাঠকের মনে সাড়া জাগাতে পারেন। সেই কবি কখন বেঁচে ছিলেন সেটা তার কাছে প্রধান নয়। অনিকেত শামীম সময়ের বিচারে আধুনিক; শৈলীর বিচারেও। প্রতীক এবং কল্পচিত্র কবিতার দুটি প্রধান সহযোগী বিষয়। শামীমের কাব্যে এসবেরও কল্পনাসচ্ছল ও ভাষানিবিড় প্রয়োগ লক্ষ করেছি।

১) তুমি যতোবার বলো ঘৃণা করি ঘৃণা করি/ ভালোবাসা ততবার ন্যাপথলিন গন্ধ ছড়ায় বুকে।
২) যতই নিকটে যাই পাহাড় ততটা সরে সরে যায়
৩) মানুষ দেখতে হলে চলে এসো হাশরের ময়দান/ এই হাওড়া স্টেশন!
৪) একদিন ঠিক ঠিক/ এই বুকে মাথা রেখে পড়ে যাবে গহিন ফাঁদে।

শিল্প বজায় রাখার গরজে আধুনিক কাব্য একদা অস্পষ্টতাকে আহ্বান করেছিল। ভাবনার ও কল্পনার যুগল ছবি তৈরি করেছে এক অদ্ভুত আলো-আঁধার। এই অস্পষ্টতা কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু তার পরিমাণ কতটুকু হবে? সেটা নির্ধারণ করার মধ্যে একজন কবির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে। আবার কোনোরকম অনচ্ছতা ছাড়াই শুধু কথা বলার বিশেষ স্টাইলের কারণেই কবিতা হয়ে উঠতে পারে প্রথম শ্রেণির রচনা। এটা আমরা তারাপদ রায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, মুস্তফা আনোয়ার প্রমুখ কবির মধ্যে দেখেছি। অনিকেত শামীম অন্ধ বালকের প্রতি ঈর্ষা-১ কবিতার শেষে বলেছেন, ‘ক্রমশ নিভে আসছে আলো, আবার দপ করে নিভে যাবার আগে আমাদের করণীয়/ বিষয়ে সজাগ করে যায় অন্ধ বালক।’ সহজ সরলভাবে বলা এই কথার মধ্যে কিন্তু ব্যঞ্জনা আছে। কেননা নিভন্ত আলোর চেয়েও ‘অন্ধ বালক’-এর প্রয়োগ এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যত্র, ‘দূরত্ব’ শিরোনামের কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে লেখক বলছেন, ‘এসো আমরা সরল অংক কষি। পাঠ নিই সরলতার’। এই উচ্চারণও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সরল অংক আসলে সরল নয় অথচ এর ভেতর দিয়েই লেখক জীবনের সারল্যের পাঠ নিতে আহবান করেছেন। এমন কূটাভাষ কবিতাকে ঋদ্ধ করে থাকে। ‘দূরত্ব’ একটি সার্থক কবিতা, কমপ্লিট কবিতা; মুখ্যত ঐ কূটাভাষদীপ্তির জন্যই। আদ্যোপান্ত ভাবনার একত্ব রক্ষিত হয়েছে এরকম আরও কয়েকটি কবিতা হচ্ছে : ‘পিলসুজ,’ ‘বিন্দুবৃত্ত’, ‘কচুপাতা জীবন’, ‘অসমাপনী ক্রিয়া’, ‘হেমন্তের পাখি’, ‘অনন্য প্রজন্ম’, ‘নান্দনিক মুখ’, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রীর খোঁজে’ এবং প-িত রবিশংকর।’ শামীম তার রোমন্টিক কবি-কল্পনার পাশাপাশি কয়েকটি ভিন জাতের বিষয়কেও উপজীব্য করেছেন কবিতার। তেমন দুটি কবিতার নাম, ‘কষ্ট কোলাজ’ ও ‘মহাবৃত্ত’। বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞানকে লেখক এখানে কাজে লাগিয়েছেন। ‘কষ্ট কোলাজ’-এর প্রথম স্তবকটি পড়–ন : ‘গণিতের সূত্রে আকাশ থেকে আনা হলো বেদনার নীল রং/ বিরানভূমি থেকে ধূসর/ তামসিক আফ্রিকা দিলো তার গর্বিত অহং কালো/ এইভাবে বেনিআসহকলা গণিতে পাথরে খোদাই হলো কষ্টকোলাজ।’ অন্যদিকে, রাজনীতিবোধ ও সমকালচেতনা উঠে এসেছে ‘লক্ষ্মণরেখা’, ‘একজন গডোর প্রতীক্ষায়’ প্রভৃতি কবিতায়। ‘লক্ষ্মণরেখা’ থেকে কয়েকটি পংক্তি ‘পুঁজির প্রবল স্রোতে ভেসে যায় স্বকীয়তা/ ঘামের সোঁদাগন্ধ, ভাটিয়ালি সুর/ রাঙা বউয়ের বিনম্র চাহনি কি অনুবাদযোগ্য?/ এইখানে এসেই থমকে দাঁড়ায় তৃতীয় বিশ্ব/ পাশ্চাত্য তাত্ত্বিকের ফুটনোট লেখা ছাড়া/ কোনো কাজ নেই আমাদের!
বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র্যভাবনাও শামীমের মধ্যে কম বেশি কাজ করেছে। তারই সাক্ষ্য বহন করছে ‘যুগসন্ধিক্ষণে মনোবিকলন’ কবিতাটি। যেখানে ‘আদম ইভের পাশে বসে মৈথুনের বীর্যপাত ঘটায়’-এর মতো একটি ভাবনাপ্রদ পংক্তি আছে। এরকম ব্যতিক্রমী ভাবনার পেছনে আছে যুগধর্মের প্রণোদনা। যতো ক্ষমতাবানই হোন এ-জাতীয় উচ্চারণ উনিশ শতকের, এমনকি বিশ শতকের প্রথমার্ধের কোনো কবির পক্ষেও সম্ভব ছিল না।
নিখুঁত শিল্প বলে কিছু নেই। নিটোল কবিতাও শুধু কল্পনায় সম্ভব। বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। ভালো-মন্দ, সাধারণ-অসাধারণ অসংখ্য পঙ্ক্তি নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘অনিকেত শামীমের কবিতা’ গ্রন্থটি। এখানে অন্তর্ভুক্ত কিছু কবিতা যেমন আমাকে আশাহত করেছে, তেমনি একধিকবার পড়া যেতে পারে এমন কিছু কবিতাও আছে এতে ভেবে আশান্বিত হয়েছি। আর টানা গদ্যে রচিত কবিতাগুলো সম্বন্ধে একটা কথাই বলবো, নির্ভেজাল গদ্য তখনই পুরোপুরি কবিতা হয়ে ওঠে যখন লেখক তাতে দক্ষতার সঙ্গে মেশাতে পারেন কল্পনাচিন্তার মনোহর কুমকুম। এই জায়গায় শামীমের বেশ ঊনতা আছে। তবে সর্তক থাকলে তিনি এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন আশা করি। আশা করি এজন্যই যে, তার দেখার চোখ আছে, কল্পনার বিভা আছে। তার কবিতায় মৃত মাছ ‘অপলক চোখ’ নিয়ে তাকিয়ে থাকে, তার ভালোবাসা লুকোনো থাকে ‘কষ্টিপাথরের নিচে’; হেমন্তের পাখিদের তার মনে হয় ‘বড়ো হারামি।’
অনিকেত শামীম তার প্রথম পর্যায়ের কবিতার ভাঙাচোরা অনুভব, ভাষাজনিত আড়ষ্টতা ও জাড্য অতিক্রম করে এসেছেন। এখন তার কবিতা হয়েছে স্বচ্ছ, সারল্যখচিত, কল্পনাদীপ্ত, কখনো কখনো বলিষ্ঠতাও। এবং এই পথে লেখক অনেকখানি অগ্রসর হতে পেরেছেন। এমন কিছু বয়স হয়নি শামীমের। ৫১+ চলছে। এখন তার খুব প্রয়োজন কবিতার পেছনে, শিল্পের পেছনে অনেক বেশি সময় দেয়া। স্বতস্ফূর্ততা কবিতার জন্য ভালো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এটা অনেক সময় লেখককে আচ্ছন্ন করে। লেখক ভুলে যান কোথায় থামতে হবে তাকে, আর কী কী বর্জন করতে হবে। এখন, আরও খানিকটা এগুতে হলে, মগ্নচৈতন্যকে মনোগ্রাহী বাণীরূপ দেয়ার সাধনায় লিপ্ত হতেই হবে শামীমকে।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.