নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

রাজু আলাউদ্দিন | ১৩ নভেম্বর ২০১৭ ১১:২৭ অপরাহ্ন

Goon
আলোকচিত্র: রাজু আলাউদ্দিন
২৩ অক্টোবর ২০১৭ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে কবি-প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে যে-ফোনালাপ হয় তার লিখিত রূপ তৈরি করেছেন গল্পকার সাব্বির জাদিদ। বি.স.

রাজু আলাউদ্দিন: গুণদা কেমন আছেন?
নির্মলেন্দু গুণ: আছি মোটামুটি।
রাজু আলাউদ্দিন: কোনো একটা চিত্রপ্রদর্শনীতে গেছিলেন দেখলাম!
নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ, গেছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ছবি আঁকতেছেন না নতুন করে?
নির্মলেন্দু গুণ: না না। আঁকা হচ্ছে না। সামনে আঁকার ইচ্ছা আছে। সময় সুযোগ হলে আঁকব।
রাজু আলাউদ্দিন: গুণদা, আপনি এ্খন কী নিয়ে ব্যস্ত?
নির্মলেন্দু গুণ: আমার রচনাবলী বের হচ্ছে, সেজন্য চর্যাপদ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি যেসব কবি সাহিত্যিকরা কন্ট্রিবিউট করেছে ইন ডেভেলপমেন্ট অব বাংলা লিটারেচার, তাদের মধ্যে যারা গুরুত্বপূর্ণ, তাদেরকে আমার নয় দশ খণ্ডের রচনাবলী উৎসর্গ করব। সেজন্য আমাকে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হচ্ছে, সেই চর্যাপদ থেকে শুরু করে একেবারে আধুনিক কাল পর্যন্ত। রিসার্চ করতে হচ্ছে আর কি। আচ্ছা, ডক্টর শহীদুল্লাহর জন্মসাল এবং মৃত্যুসাল কি মনে আছে?

রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, মনে আছে। কেন, উনাকে নিয়ে কিছু লিখবেন নাকি আপনি?
নির্মলেন্দু গুণ: না না। তাকে উৎসর্গ করব। তাকে রাখব আর কি।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি তো শহীদুল্লাহ সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করতেছি। ইনফ্যাক্ট শহীদুল্লাহকে নিয়ে আমি একটা লেখা লিখব। শহীদুল্লাহকে আসলে ভুল বোঝা হয়েছে। হায়ৎ মামুদ একটা লেখা লিখেছেন, অত্যন্ত বেদনাদায়ক লেখাটা। শহীদুল্লাহ এত প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করছেন, অথচ সেই তাকে হায়াৎ মামুদ বলেতেছেন যে, উনি অত্যন্ত গোঁড়া ছিলেন। উনি মিলাদ পড়াইতেন।
নির্মলেন্দু গুণ: শহীদুল্লাহ তো প্রগতিশীল লোক ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: অসম্ভব প্রগতিশীল ছিলেন। উনি যে কতটা প্রগতিশীল ছিলেন, এটা প্রগতিশীলরাও জানে না। প্রগতিশীলরাও কোনোদিনও ওই ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ধর্ম নিয়ে উনি যেসব কথাবার্তা বলছেন, সেগুলো কোনো প্রগতিশীল কেউ কখনো বলেও নাই।
নির্মলেন্দু গুণ: গদ্যের মধ্যে আমি যাদেরকে নির্বাচন করেছি (রচনাবলী উৎসর্গের জন্য), বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। শহীদুল্লাহকে বাংলাভাষার প্রধান পাঁচজন গদ্যকার এবং চিন্তকদের একজন হিসেবে দেখি। এর আগে তো পদ্যের যুগ। কবিতার যুগ। গদ্যের উদ্ভবের পরবর্তীকালে যারা ইম্পর্ট্যান্ট, আমার বিবেচনায়, তাদের মধ্যে প্রথম হলো বিদ্যাসাগর। বাংলা গদ্যের জনকই তাকে বলা যায়। বিদ্যাসাগরের পরে বঙ্কিম, বঙ্কিমের পরে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, তারপর শহীদুল্লাহ। শহীদুল্লাহর পরে সুকুমার সেন এবং ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন। গিরিশ চন্দ্র সেনও বাংলা গদ্যের বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন। এবং তিনিই প্রথম আমাদের এই অঞ্চলে সচেতনভাবে সেক্যুলারিজমের চর্চা শুরু করেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং এই একই সেক্যুলারিজমের চর্চা আমাদের এখানে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও করেছেন। যেমন উনি এক জায়গায় বলেছেন: “হিন্দু সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্য, হিন্দুর মন্দির ও মুসলমানের মসজিদের মতো এক সম্প্রদায়ের একচেটিয়া জিনিস নয়। বাস্তবিক বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলিমের অক্ষয় মিলনমন্দির হবে।”
নির্মলেন্দু গুণ: গিরিশ চন্দ্র সেন, এই সেনরা কিন্তু আমাদের লিটারেচারে এবং সোশ্যালিজমের মধ্যে ভালো ভূমিকা রাখছে। একেবারে অমর্ত্য সেন পর্যন্ত। তো ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন এবং ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন– এরা দুজন তো খুবই ভালো ভূমিকা রাখছেন। বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন যে বক্তব্য দিছিলেন, দীনেশ চন্দ্র সেন তাকে ওয়েলকাম জানিয়েছিলেন যে, এটা পূর্ববাংলার মানুষের জন্য খুবই দরকারি।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, দেখেন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যে সেক্যুলারিজম, উনি বলতেছেন যে, “হিন্দু সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্য, হিন্দুর মন্দির ও মুসলমানের মসজিদের মতো এক সম্প্রদায়ের একচেটিয়া জিনিস নয়। বাস্তবিক বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলিমের অক্ষয় মিলনমন্দির হবে।”
নির্মলেন্দু গুণ: দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের কন্ট্রিবিউশনের উপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটা লেকচার দিয়েছিলেন। সেইখানেই তো তিনি প্রথম আলাওল, দৌলত কাজী, আব্দুল হাকিম, শাহ্ মুহাম্মদ সগীরের কথা বলেন। এবং এই চারজনকে আমি একটা খণ্ড উৎসর্গ করছি। তার আগে তো মুসলমানদের কন্ট্রিবিউশন নিয়ে কোনো ধ্যান-ধারণাই ছিল না। তখন তো ঢাকা সাহিত্যের কেন্দ্র ছিল না। আমাদের সাহিত্যের রাজধানী ছিল আরাকান। তখন আরাকানের রাজসভায় আলাওল এবং দৌলত কাজী সভাকবি ছিলেন। ঢাকা তো তখন নট ইন দ্য সিন। ঢাকাকেন্দ্রিক কোনো সাহিত্যিকের তখন জন্মই হয় নাই। এবং অনেক পরে এখানে গোবিন্দ দাশ নামে একজন কবির জন্ম হয়। এরপর আরেক জন আছেন কালীপ্রসন্ন সিংহ, হুতুম পেঁচার নকশা নামে গদ্য লিখেছিলেন। এর বাইরে আর তো কারো নামই পাওয়া যায় না। অথচ তার কত আগে সপ্তদশ শতকে দৌলত কাজী, আলাওল, আব্দুল হাকীম যিনি লিখেছেন “যে-সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কার জন্ম নির্নয় না জানি।”–এদের জন্ম। তখন সাহিত্যের কেন্দ্রভূমি ছিল চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা, সন্দ্বীপ– ওই এলাকায়।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনি ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কথা বলছিলেন। রাজনৈতিক ব্যাপারে উনি এমন কথা বলেছেন, যা অনেক রাজনীতিবিদরাও বলতে পারেনি।
নির্মলেন্দু গুণ: আমি যে তার ব্যাপারে খুব পড়েছি, তা না। অত বলতে পারব না। তার সাথে অনেক সময় আমার দেখা হইছে। একবার বাংলা একাডেমিতে উনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তার বাসাতেও একবার গেছিলাম। তার বাসায় রোগীরা গিয়ে ভিড় করত, মনে করত যে তিনি ডাক্তার। হা হা হা। তো উনি হোমিওপ্যাথির ওষুধ দিতেন। আমার মনে আছে, আমি যেদিন গেছি, দেখি উনার বাসার সামনে লোকজন বসে আছে। বললাম, আপনারা কেন? বলে যে, আমরা ডাক্তার সাহেবের কাছে আসছি। হা হা হা। তার ছেলে তো কমিউনিস্ট ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তকীয়ূল্লাহ?
নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ, তকীয়ূল্লাহ। ইয়ের বাবা আর কি।
রাজু আলাউদ্দিন: শান্তা মারিয়া।
নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ, শান্তা মারিয়ার বাবা। তারপরে আমাদের বশীর সাহেবও (মুর্তজা বশীর) তো অমন।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, বশীর ভাইও তো বামপন্থী ছিলেন।
নির্মলেন্দু গুণ: তার পরিবারটাই প্রগতিশীল।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, তার পরিবারের সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িত। আর বশীর ভাই তো সরাসরি ভাষা আন্দোলনের সাথেও জড়িত।
নির্মলেন্দু গুণ: হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদিত বিশেষ সংকলনের ভেতরে তো আমরা প্রথম মুর্তজা বশীরের ছবি দেখছি। তিনিই তো শহীদের ছবি আঁকছিলেন কল্পনায় আর কি। অলঙ্করণ এবং ছবিগুলো মুর্তজা বশীরের ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে যে ভুল ধারণাগুলো তৈরি হচ্ছে, তিনি মাথায় টুপি পরতেন বলে, দাড়ি টাড়ি ছিল বলে উনি বুঝি খুবই ‘পাড়’ মুসলমান ছিলেন। কিন্তু উনি তো অসম্ভব রকমের উদার এবং অসাম্প্রাদায়িক ছিলেন। এবং তার মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তা ছিল। এমনকি ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো আজকে বললে তো তাকে মেরেই ফেলত।
নির্মলেন্দু গুণ: তার সব থেকে বড় কথা, তিনি যেটা বলেছিলেন– টুপি আর পৈতা দিয়ে যে মানুষ পরিচয় পৃথক করা যাবে না… হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যকে সাতচল্লিশের সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে আলাদা করা যায় না।
রাজু আলাউদ্দন: আপনি যেটা বলতে চাচ্ছিলেন, সেটা হলো– “আমরা হিন্দু এবং মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটা কোনো আদর্শের কথা নয়। এটা একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা, তিলক, টিকিতে কিংবা টুপি, লুঙ্গি, দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।
নির্মলেন্দু গুণ: এর থেকে স্পষ্ট করে আর কী বলা যায়! এবং আবুল হাশিম, বদরুদ্দীন উমরের বাবা, তার সম্পর্কেও এমন ভুল ধারণা আছে। তাকে তো আমার কাছে তার ছেলের থেকেও বেশি প্রগতিশীল মনে হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি তার একটা বই পড়ছিলাম– এ্যাজ আই সি ইট নামে তার এ্কটা ইংরেজি বই আছে। ওখানে লিখেছেন যে, “it is questioned whether God created by man or man created by God. Both are true.” ইশ্বর মানুষকে তৈরি করেছে নাকি মানুষ ইশ্বরকে তৈরি করেছে? উনি বলছেন দুইটাই সত্য। এখন, আজকে যদি এই কথা বলা হয়, যে-ই বলুক, মৌলবাদিরা কি তার মাথা রাখবে! মাথা কেটে ফেলে দেবে না!
নির্মলেন্দু গুণ: আসলেই পৃথিবীটা যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, সেই গতিটা নষ্ট হয়ে গেল নাইন ইলেভেনে আমেরিকায় এ্যাটাক হওয়ার পর। এই ঘটনায় মুসলমানদের জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের উপর যে নিপীড়ন শুরু করল, তারপর থেকে মুসলমানরা পেছন দিকে যেতে শুরু করেছে, সারা বিশ্বে।
রাজু আলাউদ্দিন: তার পরে থেকেই না, আসলে তার আগে থেকেই মুসলমানদের ক্ষয়পর্ব শুরু হয়ে গেছে। অনেক আগে থেকেই। নাইন ইলেভেনের ঘটনা বরং তরান্বিত করছে।
নির্মলেন্দু গুণ: ওই ক্ষয়পর্বটা পরাজিত হয়ে যেত প্রগতিশীল মুসলমানদের কাছে। কিন্তু এই ঘটনার পর মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে আমেরিকা যে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করল, হত্যাযজ্ঞ শুরু করল, এটা মুসলমানদেরকে আতঙ্কিত করেছে ভেতর থেকে। তারা ভেবেছে, এটাকে শুধু অস্ত্র আর অর্থ দিয়ে মোকাবেলা করলে হবে না। ইমলামিক চেতনা দিয়ে এটাকে মোকাবেলা করতে হবে। এরপর থেকে তারা ইসলামিক চেতনাকে বেশি করে আকড়ে ধরেছে। ফলে কোথাও একটু আঘাত আসলেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। যার ফলে আবুল হাশিম বা শহীদুল্লাহরা তখন যেটা বলেছে, এখনকার আবুল হাশিম বা শহীদুল্লাহরা সেটা বলতে সাহস পাবে না।
রাজু আলাউদ্দিন: ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে উনি এমন কথা বলছেন, যেমন, “এই সময়ের মতো করে আমাদের ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য সব গড়ে তুলতে হবে। নইলে কিছুই কিছুই টিকবে না। আজ দিন এসেছে যে, সমস্ত নফল নামাজ, রোজা ও তাসবিহ পড়া ছেড়ে খলকুল্লাহর (আল্লাহর সৃষ্টির) সেবায় লেগে যেতে হবে।” তো আপনি বলেন, আজকে এই কথা উনি বলতে পারতেন? ওরা বলত যে, কী, নামাজ রোজা ছেড়ে দিতে বলছে, তাসবিহ পড়া ছেড়ে দিতে বলছে? এটা তো নাস্তিক, এটা তো মুরতাদ!
নির্মলেন্দু গুণ: নজরুলের মতো কবিই তো এখন মুসলিম সমাজে আসা সম্ভব না।
রাজু আলাউদ্দিন: একদমই সত্যি কথা। এখন আর সম্ভব না।
নির্মলেন্দু গুণ: আল মাহমুদের মতো কবি, যে এক সময় সাম্যবাদী কবিতা রচনা করেছে, সেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে, তার ক্রমশই এই অনুভূতি হলো যে, এই বাংলাদেশকে সৃষ্টি করে একটা দুর্বল মুসলিম দেশ তৈরি করা হয়েছে। এই দেশ ইসলামের নির্দেশ মতো চলবে, তার সংস্কৃতি গ্রাস করবে, সেও পশ্চাদদিকে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে ধর্মের গৌরব করতে গিয়ে। ওই ভয়টা আল মাহমুদের মতো কবিকেও বিচলিত করেছে। যে এক সময় জাসদ করত, মার্কসবাদের দীক্ষা নিয়েছিল, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, সে কীভাবে এই পর্যায়ে চলে আসতে পারে! হয় কি, যারা বামপন্থী থাকে তারা সাফল্য দেখে যেতে পারে নাতো, ফলে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: এই কারণে তারা আল্লাহর দরবারে গিয়ে হাজির হন। হা হা হা।
নির্মলেন্দু গুণ: তারা তখন মনে করে এখানে যেহেতু কিছু হইলোই না তাইলে আল্লাহর পথেই যাই। হা হা হা।
রাজু আলাউদ্দন: আপনি দেখবেন, যারা এক সময় মাদরাসার ছাত্র ছিল, তারা শেষে গিয়ে প্রগতিশীল হয়ে যায়, মানে বাম চেতনা দ্বারা আক্রান্ত হয়। আবার যারা শুরুর দিকে বামপন্থী ছিল, তাদের জীবন শেষ হয় মৌলবাদিতার ভেতরে।
নির্মলেন্দু গুণ: একটা ঘটনা মনে পরছে, একবার আল মাহমুদ লাফ দিয়ে উঠে শামসুর রাহমানকে একটা স্যালুট দিয়েছিল চট্টগ্রামে আবুল ফজল স্যাহেবের বাসায়, এটা আমি বলছিলাম কোথায় যেন। লাফ দিয়ে স্যালুট দিয়ে বলে যে, সেদিন বেশি দূরে নাই, যেদিন তোমরা রব-জলিলরে এমন স্যালুট দিবা। আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠানে গেছিলাম। রাতে আবুল ফজলের বাসায় খাওয়া দাওয়া করে একটা মদের আসর হয়েছিল। শামসুর রাহমান, দেবদাস চক্রবর্তী, ফজল শাহাবুদ্দীন ছিল। তরুণতমদের মধ্যে আমি ছিলাম। আমি তখন আল মাহমুদের সঙ্গে গণকণ্ঠে চাকরি করি। হি থট আই উইল সাপোর্ট হিম। সে বলে, বঙ্গবন্ধুর সরকার আর বেশিদিন নাই। আমরা রাষ্ট্র দখল করব। সরকারের পতন ঘটাব। এরপর তিনি লাফ দিয়ে সোফায় উঠে বসলেন। আর্মিদের যেভাবে স্যালুট দেয়, কল্পনায় তিনি রব-জলিলকে সেভাবে স্যালুট দিয়ে বললেন, সেদিন আর বেশি দূরে নয় দোস্ত, তোমরা রব-জলিলকে আজ ব্যঙ্গবিদ্রুপ করছ, এইভাবে স্যালুট দিবা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জিয়াউর রহমানের সাথে তাদের ক্ষমতার ভাগাভাগির স্বপ্ন নষ্ট হয়ে গেল, এবং আল মাহমুদ জেলে চলে গেল। সে প্রথমে বাকশালে গিয়ে জয়েন করেছিল।

রাজু আলাউদ্দিন: আল মাহমুদ?
নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ, আল মাহমুদ। আমি তার সাথে দেখা করতে গেছিলাম। সে বলল, কালকে তো গিয়াস কামাল চৌধুরী আসছিল, আমি তো বাকশালে জয়েন করেছি। আমি এই কাহিনিটা আল মাহমুদের কোনো এক জন্মদিনে তাকে বলেছিলাম। সে খালি হাসে। কী বলবে! বলেছিলাম, গিয়াস কামাল আপনার সাক্ষর নিয়ে গেছিল। আপনি বাকশালে জয়েন করলেন বঙ্গবন্ধুর গলায় মালা দিয়ে। তারপর বঙ্গবন্ধু আপনাকে শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি দিল। ভুলে যান কেন? কবি তো ভোলে না! আপনি এমন ভাব দেখান যে সব ভুলে গেছেন। সে একটা কথারও জবাব দিতে পারে নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: এখনো তো বোধহয় উনি স্বীকার করেন না।
নির্মলেন্দু গুণ: জানি না কিছু। তবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তো তিনি কোনো কবিতা লেখেন নাই। যিনি তাকে জেল থেকে ছাড়ালেন, তিনি নন-মেট্রিক… তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরী পেলেন।

রাজু আলাউদ্দিন: ওটাতো বঙ্গবন্ধুর কারণে হয়েছে।
নির্মলেন্দু গুণ: বঙ্গবন্ধুর বিশেষ নির্দেশে তাকে শিল্পকলার চাকরি দেয়া হয়। তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি।
রাজু আলাউদ্দিন: না, লেখেননি।
নির্মলেন্দু গুণ: এবং সে যে কোলকাতায় গেছিল (যুদ্ধ চলাকালে), সেখানেও তিনি স্বাধীনতা নিয়ে কবিতা রচনা করেন নাই। অথচ শামসুর রাহমান দেশে থেকেই গোপনে ‘স্বাধীনতা তুমি’ ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ ‘বন্দী শিবির থেকে’– এসব তিনি লিখেছেন, চেতনাগত দিক থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারন করেছিলেন। কিন্তু আল মাহমুদ কোলকাতা গিয়েও সেই চেতনা ধারন করেন নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: মোটেও করেন নাই। এবং পরবর্তীতেও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার শ্রদ্ধাশীল কোনো বক্তব্য আমি শুনিনি কখনো। সমর্থক হোক বা না হোক, স্রেফ বাংলাদেশের জন্মের ব্যাপারে তার যে ভূমিকা, সেই ভূমিকাটাও যদি কেউ সৎভাবে বলে, তাহলে তো বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা না করে উপায় থাকবে না।
নির্মলেন্দু গুণ: আসলে বাংলাদেশকে যারা সমর্থন করে, তারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন না করে পারে না। কিন্তু কথা হলো, বাংলাদেশ নিয়েই তো তাদের সংশয়।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা ব্যাপার আপনি নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে যেটা বলা হচ্ছে; বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক জগতে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার যে লড়াই, এমনকি বাঙালি জাতিসত্তার ধারণারও অগ্রপথিক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এবং বাংলাভাষার জন্যও তার….
নির্মলেন্দু গুণ: মধ্যযুগের কাব্য পড়তে গিয়ে একটা জিনিস আমি দেখলাম, সেখানে যে বিতর্কগুলো হইছে, চর্যাপদ যদি না হয় তাহলে আমাদের আদি কাব্য কোনটা, এই নিয়ে যে বিতর্ক হইছে, সেখানে শহীদুল্লাহ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পক্ষে মত দিছেন। এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচানাকাল অন্যরা যা বলছে তার থেকে তিনি একটু আগায়ে দিছেন। তিনি সব থেকে অতীতে গিয়ে বলছেন যে, চোদ্দ শতকের রচনাকাল বলে আমার মনে হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: চর্যাপদের ক্ষেত্রেও উনি এমন বলেছেন। অনেকেই বিশ্বাস করে যে, চর্যাপদ দশ থেকে বারোশ সালের ভেতর লেখা হয়েছে। উনি অবশ্য আরো একটু পিছিয়ে গিয়ে সাতশ আটশ শতাব্দি পর্যন্ত যান।
নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ, সাতশ পঞ্চাশ এরকম আর কি। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে উনি বলেছেন এটা চোদ্দশ সালের রচনা। এটাই আমাদের আদিকাব্য আর কি। এখন মুসলমানদের পক্ষে এটা মেনে নেয়া কষ্টকর যে তাদের আদিকাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক ধারায় তিনি এটাকে উপেক্ষাও করেন নাই বা এটাকে পরবর্তীকালের রচনাও বলেন নাই। যখন এগুলো লেখা হয়, তখন তো আলাদাভাবে বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে ওঠে নাই। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সব একসাথে ছিল। তাই চর্যাপদের ভাষা বাংলার সাথে অন্য ভাষার মিশ্রণ ছিল। সংস্কৃতর সাথে মিশ্রণ ছিল। সুতরাং তারাও এটাকে দাবি করে। তবে এখন যে বইটা বেরিয়েছে, যেটা শশিভূষণ দাশগুপ্ত এবং অসিত কুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদনা করছেন, সেখানে আরো দুইশ পঞ্চাশটা পদ তারা যুক্ত করেছেন, তারা বলছেন, মাঝখানে যে মিসিং টাইমটা পাওয়া যাচ্ছে, যে সময়টায় কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, দ্যট টাইম ওয়াজ নট রিয়েলি মিসিং, তখনও চর্যাপদ রচনার ধারাটা অব্যাহত ছিল। বড়ু চণ্ডীদাসের আগেও কতক কবি ছিলেন, তারা চর্যাপদই রচনা করেছেন, যেমনটা জাপানে শত শত বছর ধরে হাইকুর রচনার ঐতিহ্য রয়েছে। সুতরাং এই কাব্যধারাকে বাঙালি কবিরাই নিজেদের কাব্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।

goon pictur
আলোকচিত্র: ইন্টারনেটের সৌজন্যে
রাজু আলাউদ্দিন: নিজেদের না হলে তো এত দীর্ঘ সময় ওটা আকড়ে ধরে থাকার কথা না। অন্যান্য পণ্ডিতদের থেকে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর একটা বড় পার্থক্য আছে। সেটা হলো, চর্যাপদ বা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যে নমুনাসমূহ পাওয়া গেছে, সেগুলোর ব্যাপারে উনি যখন কালের দিক থেকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলেন বা এটাকে বাংলা ভাষা বলে উনি জোর দিয়ে কথা বলেন, তখন কিন্তু মনে রাখতে হবে উনি একই সঙ্গে এই ভাষার ব্যাকরণ, এই ভাষার নানা ক্রিয়াপদ, এই ভাষার নানান রকম উপাদানগুলো তিনি শুধু বাংলা ব্যাকরণ দিয়েই দেখেন না; উনি তুলনা করেন অন্যান্য অনেক ভাষার সাথে। সুতরাং তার বলার একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে অন্যান্য গবেষকদের তুলনায়।
নির্মলেন্দু গুণ: তিনি তো বহু ভাষাবিদ ছিলেন। তার পক্ষেই তো এটা সম্ভব। তিনি ফ্রান্সে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, (সরবন বিশ্ববিদ্যালয়– রাজু) ওই বিশ্ববিদ্যালয় আমি দেখছি। যাচ্ছিলাম, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ওখানে পড়ছেন বলে থামলাম কিছুক্ষণ। অর্থাৎ, আই হ্যাভ লট অব রিসপেক্ট ফর দিস পারসন। আমি হ্যাপি যে, একজন মুসলমান ভাষাবিদ, চিন্তাবিদকে পাইলাম আমার ওই পাঁচজনের মধ্যে। তিনি না থাকলে জায়গাটা শূন্য হয়ে যেত। তিনি আঠারোটা ভাষা জানতেন। এক্ষেত্রে তিনি অন্য পণ্ডিতদের থেকে এগিয়ে ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দন: আমি একটু আগেই এটাই বলতে চাচ্ছিলাম। তিনি যেহেতু এতগুলো ভাষা জানতেন, ফলে এতগুলো ভাষার চরিত্র, এদের চলন, এদের গড়ন– এগুলো জানতেন। এইসব কিছু জেনে যখন উনি বলেন যে, চর্যাপদ বাংলাভাষার নমুনা, তখন কিন্তু এটা আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
নির্মলেন্দু গুণ: আচ্ছা, নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের কাছে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গেছিলেন কি শহীদুল্লাহ সাহেব?
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, শহীদুল্লাহ সাহেব। উনি নিয়ে গেছিলেন। ঠিকই আছে তথ্যটা।
নির্মলেন্দু গুণ: এখন চিন্তা করেন নজরুলকে তিনি রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। এটা খুবই ভালো একটা কাজ করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং রবীন্দ্রনাথও তো ওনার সম্পর্কে সশ্রদ্ধ ছিলেন।
নির্মলেন্দু গুণ: তো তার মতের বিরোধিতার কথা তো শুনি না। হায়াৎ মামুদ কী লিখছে জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন: হায়াৎ মামুদ কিছু প্রশংসা করছেন। আবার কিছু জায়গায় এমন কিছু সমালোচনা করছেন যে আমার কাছে ঠিক মনে হয় নাই।
নির্মলেন্দু গুণ: হুমায়ুন আজাদ কী বলছে?
রাজু আলাউদ্দিন: হুমায়ুন আজাদ কী বলছে এটা আমি জানি না। এই মুহূর্তে কোনো ডকুমেন্ট আমার হাতে নাই। তবে আমার দেখার ইচ্ছা আছে। আচ্ছা, এটা কি সত্যি, শহীদুল্লাহ সাহেব সঙ্গীত অনুমোদন করতেন না? হায়াৎ সাহেব এক জায়াগায় লিখছেন, কন্যার সঙ্গীতানুরাগকে উনি প্রশ্রয় দেননি, ধর্ম অনুমোদিত নয় বলে।
নির্মলেন্দু গুণ: তার কন্যাদের তো আমি চিনলাম না। তার কন্যা কে?
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো আমিও সেভাবে চিনি না।
নির্মলেন্দু গুণ: এটা হওয়ার কথা না। কারণ, ওই সময় তো আব্বাস উদ্দীনের মেয়ে ফেরদৌসী, লায়লা আরজুমান বানু, তারা তো তখন বিখ্যাত। তখন তো মুসলমান সমাজে এগুলো ছিল। এমনকি পাকিস্তান আন্দোলনের পাশাপাশি তারা গানবাজনার সাথে জড়িত ছিল। এই চিন্তাটা তো শহীদুল্লাহ সাহেবের করার কথা না।
রাজু আলাউদ্দিন: যেমন, হায়াৎ ভাই বলছেন যে, “বাঙালি মুসলমানের স্বদেশান্বেষণের প্রশ্নে তিনি কখনো জর্জরিত হননি। এবং সংস্কৃতি সঙ্কটের ঘূর্ণাবর্তের বিরুদ্ধে তাকে কখনো যুদ্ধ করতে দেখি না।” এটা কি ঠিক গুণদা? বাঙলি মুসলমানের স্বদেশান্বেষণের প্রশ্নে তিনিই তো সবচে’ বেশি সক্রিয় ছিলেন, বাঙালি মুসলমানদের ভেতর। সেই জন্য উনি হিন্দু এবং মুসলমানের একই সাহিত্যের কথা বলেছেন। একসাথে থাকার কথা বলেছেন। স্বদেশান্বেষণের প্রশ্নে জর্জরিত ছিলেন বলেই তো এসব বলেছেন। তারপর সাংস্কৃতিক সঙ্কটের ঘূর্ণাবর্তের বিরুদ্ধে তাকে নাকি কখনো যুদ্ধ করতে দেখি না। তাহলে উনি এই বাংলাভাষার পক্ষে কেন লড়াই করলেন সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে!
নির্মলেন্দু গুণ: আমার ক্ষুদ্র জীবনের রচনা কণ্ঠস্বর-এ আমি লিখছি, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা পাকিস্তানের দিকে ছিল, তাদের মধ্যে ডক্টর কাজী দীন মুহাম্মাদ, আশরাফ সিদ্দিকী– এরা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে যে চল্লিশজন বিবৃতি দিছিলেন, যার তালিকা পাওয়া গেছে, তার মধ্যে মুনীর চৌধুরীও ছিলেন। তারা জীবন বাঁচাতে গিয়ে স্বাক্ষর দিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: পরে বোধহয় মুনীর চৌধুরী ওগুলো প্রত্যাহারও করেছিলেন বা ওই মত থেকে সরে আসছিলেন, তাই না?
নির্মলেন্দু গুণ: ওই সময় তো শহীদুল্লাহ সাহেব জীবিত ছিলেন। উনি মারা গেছেন কবে?
Goon-1
আলোকচিত্র:রুবাইয়াৎ সিমিন

রাজু আলাউদ্দিন: উনি মারা গেছেন তো আরো অনেক অনেক পরে। উনি মারা গেছেন উনসত্তর সালে। কই, তখন তো উনি সাক্ষর করেন নাই। তখন তো উনি মুসলমানদের মধ্যে শীর্ষ বুদ্ধিজীবী, শীর্ষ ব্যক্তিত্ব।
নির্মলেন্দু গুণ: বানান সংস্কারের যে ব্যাপারটা ছিল, যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারে হচ্ছিল, এটা আমি নিজে সংগ্রহ করতাম। সেখানে আবুল হাশিম সাহেব এর পক্ষে বিবৃতি দিছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: বানান সংষ্কার না ভাষা সংস্কার?
নির্মলেন্দু গুণ: বানান সংষ্কার। আমার কণ্ঠস্বর বইয়ের মধ্যে এটার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। হাসান ভাই আমাকে দায়িত্ব দিছিলেন বিবৃতি সংগ্রহ করার জন্য।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম এবং মৃত্যু তারিখ জানতে চাচ্ছিলেন। উনার জন্ম হচ্ছে ১০-০৭-১৮৮৫ এবং মারা গেছেন ১৯৬৯ সালে। উনি একাত্তর সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকলে, অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে নিঃসন্দেহে উনি অনেক বেশি খুশি হতেন। কারণ, ‘বাংলাদেশ’– এই শব্দটাও উনি অনেক আগে উচ্চারণ করেছিলেন। এবং বঙ্গবন্ধু কোনো এক লেখায় এটা দেখেছিলেন। লেখাটি পড়ার পরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলেকে তিনি বলেছেন, আপনার আব্বাকে বলবেন, আমি এসে তার পদধূলি নিয়ে যাব, যে, তার বাংলাদেশ আমি সফল করব। এটা বঙ্গবন্ধুর কথা। রেকর্ডেড। ফলে উনি খুবই খুশি হতেন যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন। মারা গেছেন বোধহয় চুরাশি বছর বয়সে। শহীদুল্লাহ সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নাই। ফলে যেটা হয়, সেটা হলো, উনার মতো প্রগতিশীল মনের মানুষ এখন আর সামনের কাতারে নাই। না থাকায় যেটা হইছে, সেটা হলো, মৌলবাদিরা সাংস্কৃতিক জগতে জায়গা দখল করে নিচ্ছে আর কি। তো যাই হোক, ভাল্লাগছে জেনে যে, আপনি গুণীজনদেরকে বই উৎসর্গ করছেন। এবং এর মধ্যে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহও আছেন। এটা আপনার নিখাঁদ ভালোবাসা।

নির্মলেন্দু গুণ: আমি হ্যাপি টু ফাইন্ড, মধ্যযুগের চারজন কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, আলাওল, আব্দুল হাকীম। আব্দুল হাকীম ওই সময়ে কীভাবে যে, মাইকেলের বঙ্গভাষা কবিতার আগে, ‘বঙ্গবাণী’ কবিতা লিখেছেন, এবং তার যে সংগ্রাম, এটা অনন্য। যদিও তিনি এখানকার না। তিনি বোধহয় সন্দ্বীপের ছিলেন। দৌলত কাজীর জন্ম চট্টগ্রামের রা্উজানে। আর আলাওলের জন্ম ফরিদপুরে।
রাজু আলাউদ্দিন: এই মহাকবি আমাদের এলাকার।
নির্মলেন্দু গুণ: তখন সাহিত্যের কেন্দ্র ছিল যেহেতু আরাকান, তিনি সেখানে গেছিলেন। আরাকান রাজার প্রধান সেনাপতি ছিল আশরাফ খান, আশরাফ খানের অনুরোধে তিনি পদ্মাবতী কাব্যটা অনুবাদ করেন। তো ওই সময়ের আমি চারজন পেয়েছি। তার পরবর্তীকালে জসীমউদ্দীন, শহীদুল্লাহ আর শামসুর রাহমানকে রাখছি মুসলমানদের ভেতর। এই তিনজন হলো আমার এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে স্থান পাওয়ার যোগ্য বলে আমার মনে হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তবে আমার মনে হয়, শহীদুল্লাহকে আপনি আলাদাভাবে একটা খণ্ডই উৎসর্গ করতে পারেন।
নির্মলেন্দু গুণ: না। আলাদাভাবে কাউকেই উৎসর্গ করছি না। রবীন্দ্রনাথ যে খণ্ডে, সেই খণ্ডেও পাঁচজন আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আপনি পঞ্চপাণ্ডব ধরে ধরে করছেন?
নির্মলেন্দু গুণ: কমপক্ষে তিনজন আছে। কারণ আমার খণ্ড তো বেশি নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: নয়টা না বললেন? নয়টা খণ্ড বললেন না?
নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ নয়টা খণ্ড।
রাজু আলাউদ্দিন: তো এর মধ্যে একটা খণ্ড হবে না শহীদুল্লাহর জন্য?
নির্মলেন্দু গুণ: রবীন্দ্রনাথকেই আলাদা খণ্ড দেয়ার চিন্তাটা বাদ দিছি। তিনজনের নিচে নাই। চর্যাপদের তিনজন। চর্যাপদের পরে চলে আসছে পদাবলী কীর্তনের যুগ। তারপরে আসছে মধ্যযুগের মুসলমান কবিরা। যে চারজনের নাম বলেছি আগে। এরপরে আছে মঙ্গলকাব্য। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বিজয়গুপ্ত, কানাহরি দত্ত– এরা। এদের মধ্যে কানাহরি দত্ত আবার আমাদের মাতৃকূলের, আমাদের মাতৃকূল কানাহরি দত্তের সাথে মিলিত হয়েছে। যদিও বিজয়গুপ্ত তাকে মূর্খ বলছেন। হাহাহা। “মূর্খে রচিত গীত না জানিয়া তত্ত্ব,” তারপরে কী যেন .. “গাহিল গান কানাহরি দত্ত।” মঙ্গলকাব্য পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গ দুই জায়গাতেই রচিত হয়েছে। পূর্ববঙ্গে এটাকে পদ্মপুরাণ বলা হতো আর পশ্চিমবঙ্গে মনসামঙ্গল বলা হতো। আমি দেখেছি, আমাদের গ্রামেও পদ্মপুরাণ পাঠ হয়। শ্রাবণ মাসে। মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়, মনসাপূজার ভেতর দিয়ে সেই পদ্মপুরাণ পাঠ শেষ হয়। এটা আমাদের ময়মনসিংহে খুবই জনপ্রিয়। এখনো মানুষ মুখস্ত বলতে পারে। আমার মা’র নাকি পদ্মপুরাণ মুখস্ত ছিল। আমার মাসিমা আমাকে বলেছে এটা। তো মনসামঙ্গল মঙ্গলকাব্যের কবিদেরকে একটা খণ্ড দিছি। তারপরে আসল পঞ্চ মহাকবি। এই পঞ্চ মহাকবির ভেতর আমি আবার একজন মুসলমান মহাকবিকে পাচ্ছি। তিনি হলেন কায়কোবাদ। মাইকেল মধুসুদন দত্ত, হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় আর কায়কোবাদ, এই পাঁচজন। এরপরে কিছুটা আধুনিক যুগ শুরু হইল আর কি। সেখানে আছে ঈশ্বরগুপ্ত, বিহারী লাল চক্রবর্তী, বিহারী লাল চক্রবর্তীর কিন্তু অনেক রচনা আছে। আমি তার পাঁচশ পৃষ্ঠার একটা কাব্য সংকলন সংগ্রহ করেছি। তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। অথচ আমরা শুধু তার নামটাই জানি। তাও কাদম্বরী দেবী এটা যদি রবীন্দ্রনাথকে না বলতেন, তাহলে বিহারীলালের কথা বোধহয় আমরা ভুলেই যেতাম। তো সেই বিহারীলাল, ঈশ্বরগুপ্তের পরে রবীন্দ্রনাথ, তারপরে নজরুল আর জীবনানন্দ। তো রবীন্দ্রনাথ যে খণ্ডে, সেই খণ্ডে পাঁচজন আছে। তারপরের খণ্ড জসীমউদ্দীন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, শামসুর রাহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এর পরে আরো পাঁচজন বা ছয়জন আছে। আমি সৈয়দ শামসুল হকের কথাও চিন্তা করছি, সর্বশেষ কবি হিসাবে তাকে খণ্ডে তোলা যায় কি না। এর নিচে আর নামার কোনো স্কোপ নাই। এবং আমি যাদেরকে নিয়েছি তাদেরকে কেউ বাদ দিতে পারবে না। আরো এ্যাড করতে পারবে। ইউ ক্যান এ্যড মোর নেমস বাট ইউ কান্ট ড্রপ এ সিঙ্গেল নেম ফ্রম দ্য লিস্ট। এরা সবাই অপরিহার্য বলে আমার মনে হইছে। আমার মনে হয় ইট উইল হেল্প দ্য রিডার্স অব বাংলা লিটারেচার, অনেক বই না পড়েই তারা বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস আমার উৎসর্গপত্র থেকে পেয়ে যাবে। আমার উৎসর্গ পত্রটা একত্রিত করলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস তারা জানতে পারবে। এবং সবার জন্মসাল দিয়ে দিচ্ছি।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে শহীদুল্লাহ সাহেবের জন্ম-মৃত্যু সালও দিয়ে দিয়েন। ১৮৮৫ থেকে ১৯৬৯।
নির্মলেন্দু গুণ: চুরাশি বছর বেঁচে ছিলেন তাই না?
রাজু আলাউদ্দিন: জি জি। তো ঠিক আছে গুণদা, ভালো থাইকেন।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (13) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুল হাসান — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ তথ্যবহুল এক অালোচনা। পাঠে ঋদ্ধ হলাম। কবি নির্মলেন্দু গুণকে অভিনন্দন নয় খণ্ডে তাঁর রচনা সমগ্র প্রকাশের জন্য। ধন্যবাদ সেসব পুস্তক উৎসর্গের মাধমে বাংলাা ভাষা ও সাহিত্যের মহারথীদের সমুখে নিয়ে অাসার জন্য। রাজু অালাউদ্দিন চমৎকার সব প্রশ্ন করেছেন। বিশেষ করে ভালো লাগলো ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লার অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ভূমিকা জেনে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাকির আকন্দ — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ৮:০৫ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিন পুরো সাক্ষাৎকারে ঘুরিয়েফিরিয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে এনেছেন……

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razualauddin — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ৮:৪৭ পূর্বাহ্ন

      কারণ শহীদুল্লাহ একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং দুঃখজনকভাবে অবহেলিত ও অবমূল্যায়িত। তার সম্পর্কে সচেতনা বৃদ্ধি না হলে আমরা আরও বেশি অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করবো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শেখ আব্দুস সালাম — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ৯:১০ পূর্বাহ্ন

      পড়লাম। ভাল লাগলো। ঋদ্ধ হলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dilruba Shahana — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ১১:১৬ পূর্বাহ্ন

      It is so good and rich discussion! I can not but agree with Razu Alauddin on Dr.Muhammed Shahidullah. It is a wonderful gift from Poet Goon to his readers.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গীতা দাস — নভেম্বর ১৪, ২০১৭ @ ১০:২৫ অপরাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিন যেমন সাক্ষাৎকার গ্রহণে পটু, নির্মলেন্দু গুণ তেমনি সাক্ষাৎকার প্রদানে কৌশলী। ভালো লাগলো ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুল হাসান খান — নভেম্বর ১৫, ২০১৭ @ ২:০৯ পূর্বাহ্ন

      নির্মলেন্দু গুণ অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি কেন?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mahmudul Haque — নভেম্বর ১৫, ২০১৭ @ ৩:২৭ অপরাহ্ন

      Namaz porun, Ete backdated hobenna ba gora hobenna

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাকির আকন্দ — নভেম্বর ১৬, ২০১৭ @ ১২:১১ পূর্বাহ্ন

      রাজু আলাউদ্দিন পুরো সাক্ষাৎকারে ঘুরিয়েফিরিয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে এনেছেন, কিন্তু শিরোনাম দিয়েছেন অন্য প্রসঙ্গে, পুরো সাক্ষাৎকার পড়ে রুচিহীন দুই ব্যাক্তির অনুভুতি জানতে পারলাম, যাদের একজন আবার পুরষ্কারের পাওয়ার জন্যে চিল্লেপনা করে!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rakibul Hasan — নভেম্বর ১৭, ২০১৭ @ ২:১১ পূর্বাহ্ন

      অত্যন্ত চমৎকার একটি সাক্ষাৎকার এতে কোন সন্দেহ নেই – প্রাণবন্ত, তথ্যবহুল ও ভাবনা উদ্রেককারী। সাক্ষাৎকার গ্রহিতাকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ আর কবির প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। তবে প্রতারণাপূর্ণভাবে বেদনাদায়ক বিষয় হোল সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম – অত্যন্ত সস্তা ও কুরুচিপূর্ণভাবে “বাজারে”। বাজারে পত্রিকা অবশ্য এমনটা করবে তার কাটতি বাড়াতে এটা স্বাভাবিক কিন্তু যখন এতে কবি-সাহিত্যিকরা কোন প্রকার প্রতিরোধহীনভাবে আপোষকামী তখন বোঝা যায় আমাদের জাতিগত নীতি নৈতিকতার মান কোথায় নেমে গেছে। একটু ব্যাখ্যা করে না বললে আমাকেও হয়ত একজন মৌলবাদী এবং আল মাহমুদের মতের অনুসারী ভাবা হবে। এটা সত্যি কবি আল মাহমুদ আমার শামসুর রাহমানের পরে বাংলাদেশের কবিকুলের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পছন্দের। তবে তাই বলে তাঁর আদর্শিক স্খলন বা নৈতিক বিচ্যুতি আমি কখনওই সমর্থন করব না। কাজেই গুণ দা যা বলেছেন তা নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই এই কারণে যে আমি তার সত্য মিথ্যা জানিনা। সত্য হলে ব্যক্তি আল মাহমুদের প্রতি আমার শ্রদ্ধ্যা আরও কমে যাবে তবে কবি আল মাহমুদকে বিশেষকরে সেই আগের কবিতাসমুহের কবিকে আমি ছুঁড়ে ফেলে দেব না কখনওই। আর যারা দেবেন তাদের হয়ত ব্যক্তিগত পছন্দ বা রাজনৈতিক স্বার্থ থাকতে পারে। এটা যেকোনো কবি-লেখক বা সৃজনশীল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – তাঁদের কর্ম সবার আগে, ব্যক্তি জীবন পরে যদিও এ দুয়ের মধ্যে প্রায়শই গভীর সংযোগ আছে। গুণ দার ব্যক্তি জীবন নিয়ে যে যাই বলুক, কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর অর্জনকে কেউ ছোট করতে পারবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের ভিত্তিতে একজন মানুষের অর্জনকে পরিমাপ বা মূল্যায়ন করা হয়। সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের কোন সংস্কৃতি যেন এখানে গড়ে ওঠেনি। যাহোক, অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আপনাদের দুজনের কাছেই জানতে চাই – বঙ্গবন্ধু নিয়ে যদি আল মাহমুদ কোন কবিতা নাই লিখে থাকেন তাতে কী এসে যায় বঙ্গবন্ধুর, বাংলা সাহিত্যের বা কবিতার পাঠকদের? একজন সত্যিকারের কবি কী বিষয়ে কবিতা লিখবেন সেটা কি যেকোনো সরকারি দলের বা রাষ্ট্রের বিশেষ দিবসের পত্রিকার ক্রোড়পত্রের মতো যে আপনি তা কবির উপর চাপিয়ে দেবেন বা সরকার কিংবা রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী তাই অনুগত কবিরা নিজেরাই ঝাঁপিয়ে পড়বেন সেই বিষয়ে লেখার জন্য? কবি লিখবেন তাঁর নিজের মত কিন্তু অবশ্যই তাঁর এমন একটা রাজনৈতিক দর্শন থাকা উচিত যেটা গণ-মানুষের পক্ষে ও অন্যায়ের বিপক্ষে। আল মাহমুদের এমন দর্শন ও অবস্থান “সোনালী কাবীন” এ পাই আর এজন্যই তাঁকে বারবার ক্ষমা করে দেই। আবার, একজন কবি রাজনৈতিকভাবে কতটা সঠিক এটা তো অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু সেই সঠিক রাজনৈতিক অবস্থানের মানদণ্ডটা কী? অবশ্যই মৌলবাদীতা বা প্রতিক্রিয়াশিলতা নয়। কিন্তু আল মাহমুদের কাব্যসমগ্র কি পুরোটাই মৌলবাদীতা বা প্রতিক্রিয়াশিলতায় পূর্ণ? আমাদের শিল্প-সাহিত্যের “উগ্র” প্রগতিশীলেরা যেন আল মাহমুদ বা এমন বিরোধিতার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রগতিশীল পরিচয় টিকিয়ে রাখেন বা জানান দিতে চান। এটা হীনমন্যতার পরিচায়ক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উপায়। তবে এই দলে আমি অবশ্যই কবি নির্মলেন্দু গুণ কে রাখতে চাইনা। উনি আল মাহমুদ সম্পর্কে যে মন্তব্যটি করেছেন সেটি আল মাহমুদের সাথে উনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর স্রদ্ধ্যা ও আবেগ থেকে উৎসারিত, এটাকে আমি এত বড় করে দেখার কোন কারণ দেখি না। কিন্তু বাজারে পত্রিকা তার কাটতি বাড়ানোর জন্য ধোঁকাপূর্ণভাবে ওটাকেই শিরোনাম করেছে যেটা কিনা মূল সাক্ষাৎকারের অত্যন্ত সামান্য ও প্রায় অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ। যাহোক, আমার পুরো আলোচনাটা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও কেবল আল মাহমুদকে “ডিফেনড” করার মতো হয়ে গেল যেটার একটা কারণ হতে পারে চারদিকে আল মাহমুদকে সমালোচিত হতে দেখে এটা আমার এক ধরণের দায়িত্ব মনে হয়েছে। মৌলবাদিতা, সাম্প্রদায়িকতা বা প্রতিক্রিয়াশিলতার বিরুদ্ধে অবশ্যই আমারা শক্ত অবস্থান নেব, কিন্তু সেটা যেন পক্ষপাতদুষ্ট ও হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উপায় না হয়। একজন ব্যক্তি কবি বা সাহিত্যিকের মৌলবাদিতা বা সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে তাঁর লেখার ভিতরে এসব উপাদানের উপস্থিতি কতোটা এটাই আমাদের মূল অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিৎ এবং এই উপস্থিতির রাজনীতি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে এবং প্রয়োজনে বর্জন করতে হবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে একজন লেখককে সবাই মিলে বর্জন করলে সেটা শেষ পর্যন্ত মৌলবাদি ও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের মানুষদেরই সুবিধা হবে যদি সেই লেখক পুরোপুরি তেমনটা না হন। তারা তখন ঐ বর্জিত লেখককে নিজেদের বলে পরিপূর্ণভাবে দাবী করতে পারে। এতে করে আল মাহমুদদের মত লেখকদের ক্ষেত্রে যাদের লেখক জীবনের দুটি পর্যায় – সেটি একটি এবং ভুলটিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এতে কাদের লাভ? তা-ও ঐ প্রতিক্রিয়াশীল বা উগ্রবাদীদেরই লাভ। যাহোক, আল মাহমুদ বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা লিখেছেন কিনা এই প্রশ্ন অনেকটা *লালসালু* উপনাস্যের মজিদের সেই প্রশ্নের মত – তোমার দাঁড়ি কই মিয়াঁ? এই দুটো বিষয়ে না লিখলে যেন কেউ বাংলাদেশে বড় সাহিত্যিক বা সুসাহিত্যিক হতে পারবেন না (যদিও আল মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে কবিতা পড়েছি কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিয়ে হয়ত নাই)। তবে এজন্য আল মাহমুদকে অকৃতজ্ঞ বলা যাবে না – আপনার তথ্যমতে উনার বাকশালে যোগ দেয়াটাই তো বঙ্গুবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। আর তাঁকে যে শিল্পকলায় চাকুরীটা দেয়া হয়েছিল, উনি সেটা “ডিজারভ” করেন বলেই ওটা দেয়া হয়েছিল – ওটা কোন দয়া ছিল না। নির্মলেন্দু গুণও যেমন “ডিজারভ” করেন বলেই নিজের পুরস্কারের দাবী তুলতে পারেন এবং উনি সেই পুরুস্কারের যোগ্য বলেই সেটি তাঁকে দেওয়া হয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অরুণ চক্রবর্তী, দিল্লি — নভেম্বর ১৯, ২০১৭ @ ৮:৫২ অপরাহ্ন

      ড.শহীদুল্লাহ’র লেখা পড়েই চিরকাল অনুভব করে এসেছি, তিনি বাংলার অন্যতম বিজ্ঞান মনস্ক উদার ভাবধারার মানুষ। তাঁর দাড়ি টুপি কখনই আমার এই অনুভবের পরিপন্থী ছিল না। শহীদুল্লা যখন মারা যান তখন আমার বয়স ২৪, অর্থাৎ আমার কাছে তিনি বাংলার কোন বিস্মৃত প্রতিভা ছিলেন না। তবু এই কথপকথনে মনে হল, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা প্রকৃত মানুষটিকে ভোলার জন্য নানা অপব্যখ্যায় তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে সচেষ্ট হয়েছেন। বর্তমানের ডামাডোলে মনে হয়, তা সম্ভবও হচ্ছে। বেদনাদায়ক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামীম রেজা — নভেম্বর ২১, ২০১৭ @ ৭:৩৭ অপরাহ্ন

      পুরো সাক্ষাৎকারটি বেশ ভালো লাগলো। কিছু তথ্য জানা গেলো। নির্মলেন্দু গুণ যে মাতৃকুলের দিক দিয়ে চর্যাকার কানাহরি দত্তের সাথে সম্পর্কিত, এটা জেনেও ভালো লাগলো।

      চর্যাপদ বাদে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’কে বাঙলা সাহিত্যের প্রথম নমুনা হিসেবে বলতে পারাটাই নির্দেশ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ব্যক্তিজীবন ও গবেষকজীবন’কে আলাদা করতে পেরেছিলেন।

      আর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র জীবন ও কর্ম নিয়ে রেফারেন্সসহ ৪৮ পৃষ্ঠার একটা তথ্যবহুল আলোচনা আছে গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান রচিত “পূর্ব বাঙলায় চিন্তাচর্চাঃ ১৯৪৭-৭০ দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া” বইতে। সেখানেই সঙ্গীত বিষয়ে উনার মত (রেফারেন্সসহ) পাওয়া যাবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurita Nusrat Khandoker — নভেম্বর ২৪, ২০১৭ @ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

      উহু, বাপরে বাপ কী সব্বনাশ! আবারও শিরোনামে বিশ্রী রকমের ঝামেলা হয়ে গেছে।

      আর একটা বিষয় খুব অপছন্দ করলাম, একজন কবির সাক্ষাতকার সেদিকে খেয়াল কম। মুখের কথা দিছি, করছেন ইত্যাদি সব শব্দ হুবহু লিখিতরূপে আসতেই হবে কেন? এসব কবির সাক্ষাতকারে দূষণ লেগেছে। কবি মানে তো ভাষার ক্লাসিক ও নান্দনিক চর্চাকারী। যিনি ফোনালাপকে লিখিতরূপ দিয়েছেন তাকে এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হত, আলবাত।

      কবি আল মাহমুদ যদি বাকশাল করে থাকেন তো এখানে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নিয়ে কবিতা না লিখলে অকৃতজ্ঞতার কী হলো? শিল্পকলার চাকরী নিয়ে যে কথা বলা হয়েছে, তাতে তো বঙ্গবন্ধুরই বিচক্ষণতাকে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। অতি ভক্তির চোটে অভক্তির ফুরসুত!

      রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেই কি সাহিত্য দক্ষতা অস্বীকার করা উচিত? শহীদুল্লাহ মহোদয়ের হিন্দু-মুসলিমের মন্দির-মসজিদ উক্তির উদাহরণ টেনে, বাঙলা ভাষা সাহিত্যকে উদার নভে ছুঁড়ে দিয়ে আবার নিজেরাই আওয়ামী রাজনীতি পন্থী সুর তুললে বিষয়টি কেমন কেমন হয়ে যায় না? রাজনীতির বিভেদগুলোও মেনে নিয়েও তো হিন্দু-মুসলিম মন্দির-মসজিদ মিলনকেন্দ্র হতে পারে সাহিত্য সেবকের কাছে, নয় কি? নইলে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার মতোই ব্যাপারটা প্রতিবিম্বিত হয় কি না!

      সার্থক লেখক-কবি সার্বজনীনতার চর্চা করেন জানি। কারণ, তাঁদের রচনায় এমন কিছু উৎকৃষ্ট চিন্তার প্রকাশ থাকে যা সর্বমঙ্গলের প্রচেষ্টায় উৎসর্গিত থাকে মহাকালের প্রান্তরে। নইলে আজকের যুগেও প্রাচীন আলাওল আলোচনায় কেন আসবেন! কিন্তু রাজনৈতিক একপেশে দৃষ্টি প্রতিষ্ঠা পেলে পাঠকেরও দৃষ্টি একপেশে হতে থাকে- সেদিকটা ভেবে সাক্ষাতকার নেওয়া ও দেওয়া বিবেচ্য।

      দলাদলির চোটে দেশের বাস্তবতা আজ বিদ্বেষ জর্জরিত। তার উপর সাহিত্য পাতাও যদি এসব অত্যাচার শুরু করে দেয় তাহলে নিঃশ্বাস নিবে কোথায় পাঠক। বিডিনিউজ২৪ কে বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com