গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং মেহিকোর সঙ্গে তার সংযোগ

অরুন্ধতী ভট্টাচার্য | ২৯ অক্টোবর ২০১৭ ৯:৫৪ অপরাহ্ন

garcia-marquez-unoগাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জন্ম কলোম্বিয়ায় হলেও কার্যত মেহিকোই হয়ে উঠেছিল তার জন্মভূমির মতো। সিআইএর তাড়া খেয়ে সেই যে ১৯৬১ সনের ২ জুলাই মাসে এই দেশটিতে আশ্রয় নিয়ে তারপর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত কলম্বিয়ায় তিনি নিয়মিত যাতায়াত করলেও তার কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল মেহিকোই। পরে অবশ্য তিনি একেবারে স্থায়ীভাবেই আমৃত্যু মেহিকোতে থেকে যান। মেহিকোর সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে Televisa.news পত্রিকায় ৬ মার্চ ২০১৭ সালে Gabriel García Márquez y su relación con México শিরোনামে যে-নিবন্ধটি প্রকাশিত এটি তারই অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন প্রাবন্ধিক অনুবাদক অরুদ্ধতী ভট্টাচার্য।

১৯৮২ সালের নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত অমর কথাসাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নব্বইতম জন্মদিন। এই উপলক্ষ্যে সারা বিশ্ব জুড়ে চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কার্যাবলীর মাধ্যমে তাঁর ঐতিহ্যকে স্মরণের আয়োজন।
কলোম্বিয়ার এই মহৎ সাহিত্যিকের জীবন ও কর্মের সঙ্গে পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তাদের মধ্যে অন্যতম হলো মেহিকো। জীবনের বেশ কয়েক দশক এই দেশে কাটিয়েছেন বন্ধুদের অতি আদরের “গাবো”।

একশো বছরের নিঃসঙ্গতার প্রেরণা
মেহিকো আর গার্সিয়া মার্কেসের সাহিত্য প্রতিভা – এ দুয়ের মধ্যেকার ইতিহাসের শুরু ১৯৬১ সালে। সেই সময় কুবার “প্রেন্সা লাতিনা” সংবাদসংস্থার প্রতিনিধি হয়ে নিউ ইয়র্কে থাকার সময় গার্সিয়া মার্কেস যে সাংবাদিক প্রবন্ধ লিখতেন তার ফলস্বরূপ হয় “সিআইএ” নয়তো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত কুবার মানুষ (বিপ্লববিরোধী) প্রতিনিয়ত তাঁকে হত্যার হুমকি দিতে থাকে।

তখন স্ত্রী মেরসেদেস আর ছেলে রোদ্রিগোকে নিয়ে গার্সিয়া মার্কেস মেহিকো শহরে চলে আসেন। কাজ শুরু করেন “সুসেসোস” ও “লা ফামিলিয়া” নামের দুটি পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে। কিন্তু এই কাজে বিশেষ সাফল্য না পাওয়ায় “ওয়াল্টার টমসন” বিজ্ঞাপন সংস্থায় কপি লেখার কাজ নেন এবং পাশাপাশি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন।
এর আগেই তিনি কয়েকটি উপন্যাস ও গল্প লিখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কলোম্বিয়ার বাইরে তখনও তাঁকে বিশেষ কেউ চিনত না। তাছাড়াও সেই সময় বেশ কিছুদিন যাবৎ তিনি কিছু লিখতে পারছিলেন না।
১৯৬৫ সালের শুরুতে তাঁর জীবন এক অপ্রত্যাশিত বাঁক নেয়। এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে স্ত্রী-পুত্রসহ বেড়াতে যাচ্ছিলেন আকাপুলকোয়। পথে, গাড়ি চালাতে চালাতে, তাঁর মাথায় আবির্ভূত হয় একটি বাক্য:
“বহু বছর পরে, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে, কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মনে পড়ল দূরবর্তী সেই বিকেলের কথা যখন তাঁর বাবা তাঁকে বরফ আবিষ্কার করতে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
অবশ্য অনেক বছর ধরেই তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল বুয়েন্দিয়া পরিবার নিয়ে একটা উপন্যাসের ধারণা। এমনকি তাঁর পূর্ববর্তী লেখায় “মাকোন্দো” ইতিমধ্যেই উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু উপরে উল্লিখিত ওই বাক্যটাই ছিল তাঁর মস্তিষ্কে নিহিত উপন্যাসের বহিঃপ্রকাশের প্রথম উৎসরণ।
“মাথার ভেতরে লেখাটা এতটাই প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল যে ওখানেই, কুয়ের্নাবাকার পথেই, শব্দের পর শব্দ ধরে, প্রথম অধ্যায়ের পুরোটা একজন টাইপিস্টকে মুখে মুখে বলে দিতে পারতাম”, সেই যাত্রার কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন।
বাকি পথটায় তিনি গল্পটাকে মনে মনে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। তারপর এতটাই মগ্ন হয়ে পড়লেন যে তৃতীয় দিনে ফিরে এলেন আকাপুলকো থেকে।2 পৌঁছলেন সান আনহেল ইনের ১৯ নম্বর লা লোমার বাসায় আর ছেড়ে দিলেন সব কাজ, ঘরে ঢুকে গেলেন লিখতে এবং পরের মাসগুলোয় লেখা ছাড়া আর কিছু তিনি করেননি। প্রতিদিন ছ’ঘন্টা বা তার একটু বেশি ধরে সময় লিখতেন। বাড়ির বাইরে যেতেন খুবই কম।
এদিকে টাকা ফুরিয়ে আসতে লাগল। মেরসেদেস তখন ধার করতে শুরু করলেন। বাড়িওলাকে বলতেন পরে টাকা দেবেন, এলাকার দোকানদারদের থেকেও জিনিষ নিতেন ধারে এবং একে একে তাঁর যা কিছু ছিল বন্ধক দিয়ে দিলেন। গাড়িটাও একসময় বিক্রি করে দিতে হলো। সেই দুরূহ সময়টা যে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন তা শুধু বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশি, এমনকি কিছু অপরিচিত মানুষেরও উদার বদান্যতার সৌজন্যে।
আঠারো মাস পরে শেষ হলো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস। বুয়েনোস আইরেসে সুদামেরিকা প্রকাশনায় ডাকযোগে পাঠানো হলো পান্ডুলিপির অর্ধেক (কেননা পুরো পান্ডুলিপি একসঙ্গে পাঠানোর মতো টাকা ছিল না) এবং প্রকাশক ছাপতে রাজি হলেন।
একশো বছরের নিঃসঙ্গতা প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালের মার্চ মাস। এবং অনতিবিলম্বেই অধিকার করে নেয় বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি্র আসন।

বন্ধুরা
মেহিকো বাসের শুরু থেকেই ওখানকার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়। একেবারে প্রথমে তিনি শুধু চিনতেন আরেক কলোম্বিয়ার মানুষ আলবারো মুতিসকে। মুতিস তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন হোসে এমিলিও পাচেকো আর কার্লোস ফুয়েন্তেসের, এই শেষোক্ত মানুষটির সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে জমে উঠল নিবিড় সখ্য।
অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কার্লোস মোনসিবাইস, আউগুস্তো মোন্তেরোসো ও এলেনা পোনিয়াতো্উস্কা। কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও ছিলেন তাঁর বন্ধুত্বের পরিধিতে। সকলেই জানেন যে বহুবার তাঁর কাছে এসেছেন কার্লোস সালিনাস দে গোতারি।

দ্বিতীয় নির্বাসন
একশো বছরের নিঃসঙ্গতার সাফল্যের পর গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস মেহিকো আর কলোম্বিয়া দু’ দেশেই থাকতেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে “এল তিয়েম্পো” কাগজের এক সাংবাদিক, যাঁর ছদ্মনাম ছিল “আইয়াতোলা”, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন যে এম-১৯ গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে এবং দক্ষিণ কলোম্বিয়ায় এক গেরিলা সেনাবাহিনীর উত্থানে তিনি মদত দিয়েছেন।
তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান হুলিও সেসার তুরবাই আইয়ালার আমলে তাঁকে কারারুদ্ধ করার জন্য এই অভিযোগ যথেষ্ট ছিল। কলেরার সময়ে প্রেম উপন্যাসের স্রষ্টা এরপর থেকে মেহিকোতেই আমৃত্যু তাঁর নিবাস গড়ে তোলেন।

মেহিকোপর্ব
মেহিকোর মাটিতে গার্সিয়া মার্কেসের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর রচনায় সেই অর্জনের প্রতিফলনের সামগ্রিক বিবরণ দেওয়া অসাধ্য সাধন। তবুও মেহিকো শহরে থাকাকালীন তাঁর জীবনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা বলা যেতে পারে:
• মেহিকোর সঙ্গে গাবোর প্রথম প্রকৃত সংযোগ তৈরি হয় যখন আলবারো মুতিস তাঁকে হুয়ান রুলফোর পেদ্রো পারামো পড়তে বলেছিলেন।
• গার্সিয়া মার্কেস নিজেই উল্লেখ করেছেন যে ১৯৬১ সালের ২রা জুলাই প্রথমবার তিনি মেহিকো শহরে পা রাখেন আর সেদিনই আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেন।
• “পালাসিয়ো দে বেইয়াস আর্তেস”-এর হলে “আন্দেসের ওডিসি” ডকুমেন্টারি ছবি দেখার সময় মারিও বার্গাস ইয়োসা গাবোকে একটা ঘুষি মারেন। সর্বজনবিদিত এই ঘটনার কারণ কেউ জানে না কিন্তু এর পরেই লাতিন আমেরিকার দুই নোবেলজয়ীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সমাপ্তি ঘটে।
• মেহিকো শহরে তাঁর বাসায় বসে তিনি একটি টেলিফোন পান এবং তাঁকে বলা হয় যে তিনি নোবেল পুরষ্কারের জন্য বিবেচিত হয়েছেন।
যদিও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের জগতে তিনি আর বেশি বেরোতেন না, তবে জন্মদিনে সাধারণত বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করতেন।
মেহিকোর এই বাড়িতেই তাঁর প্রয়াণ ঘটে ২০১৪ সালের ১৯শে এপ্রিল। “পালাসিয়ো দে বেইয়াস আর্তেস”-এ আয়োজিত স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন এনরিকে পেইনঞা নিয়েতো এবং হুয়ান মানুয়েল সান্তোস, যথাক্রমে মেহিকো ও কলোম্বিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান।
তাঁর চিতাভস্ম নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর জন্মস্থান কার্তাহেনায়, কিন্তু মেহিকোর রাজধানীর মর্মে মর্মে তাঁর যাপনের যে নির্যাস আজও অনুভূত হয় তা চির অম্লান থেকে যাবে।

অনুবাদকের টীকা:
১। প্রেন্সা লাতিনা: পুরো নাম “আহেন্সিয়া দে নোতিশিয়াস লাতিনোআমেরিকানা” (Latin American News Agency) কুবার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম, কুবার বিপ্লবের কিছুদিন পরে, ১৯৫৯ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত।
২। মতান্তরে, গার্সিয়া মার্কেস আকাপুলকো পৌঁছাননি, মাঝপথ থেকেই তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। এই মতানৈক্যের অন্যতম প্রধান কারণ তিনি নিজে বিভিন্ন স্মৃতির মধ্যে গোলমাল করে ফেলতেন এবং সর্বোপরি, সাংবাদিকদের সঙ্গে মজা করতে তিনি খুব ভালোবাসতেন।
৩। একশো বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের প্রকাশের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়েও মতদ্বৈধতা আছে।
৪। এই ঘটনার ব্যাখ্যায় মেহিকোর কবি ও প্রাবন্ধিক হোসে এমিলিও পাচেকো বলেছেন: “ইঙ্গ-মার্কিন উপন্যাসের জমানার অবসান ও ইস্পানোআমেরিকার কথাসাহিত্যের জয়যাত্রার সূচনা”।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com