জীবনানন্দ দাশ: হৃদয়ের কাছাকাছি যার বসবাস

লীনা দিলরুবা | ২২ অক্টোবর ২০১৭ ৭:২৮ অপরাহ্ন

J das-1
‘চিত্র: বিয়ের আসনে জীবনানন্দ ও লাবণ্য দাশ
এক.
মুহূর্তের আনন্দময় অনুভূতি যেন সুখ নয়। ওট প্রপঞ্চ, ইল্যুশন। দুঃখবোধ প্রকৃত প্রস্তাবে সুমহান করে তোলে মানবজীবন। যেমনটি ঘটেছিল জীবনানন্দ দাশ-এর জীবনে। প্রহেলিকার মতন দেখা দেয়া কিছু সুন্দর সময় বিপরীতে সুদীর্ঘ বিষাদময় অভিজ্ঞতা তাঁকে কখনোই স্বস্তিদায়ক কোনো পরিস্থিতির নিশ্চয়তা দেয়নি কিন্তু ঘটনাটিতে বাংলাসাহিত্য, সর্বোপরি বিশ্বসাহিত্য পেয়েছিল এমন এক নিভৃত কবিকে, এমন এক সুরেলা কবিকে, যার কবিতা না পড়লে অজানা থেকে যেত অনেক কিছু। অজানা থেকে যেত কারো কারো সকালের বিষন্ন সময় অলস মাছির শব্দে ভরে থাকে, আমার কথা সে শুনে নাই কিছুই তবু আমার সকল গান ছিল তাকেই লক্ষ্য করে…।
অজানা থেকে যেত, অন্ধকারের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে থাকা যায়। যেমনটি তিনি লিখেছিলেন–
যেদিন শীতের রাতে সোনালি জরির কাজ ফেলে
প্রদীপ নিভায়ে র’ব বিছানায় শুয়ে।
অন্ধকারে ঠেস দিয়ে জেগে র’ব
বাদুড়ের আঁকাবাঁকা আকাশের মতো।
স্থবিরতা, কবে তুমি আসিবে বল তো।

এই বায়বীয় অন্ধকার কেমন? যার শরীর রয়েছে। যাকে স্পর্শ করা যায়?

জীবনানন্দই লিখেছিলেন, ‘আমার মতন কেউ নেই আর।’ দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় পংক্তিটিকে প্রতিধ্বনির মতো করে বলেছেন, ‘রচনার বহিঃশায়ী জীবনকে তিনি উপেক্ষা করেছেন অন্তঃসারকে বৃহৎ মহত্বে পরিণত করার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন, অথবা সংবরণ করেছেন সামাজিক দিনচর্যা।’ এই অন্তঃসার আর বহিঃসারের যৌথতার তুলনারহিত উদাহরণ ছিলেন জীবনানন্দ দাশ যিনি একবার একটি চিঠির খসড়ায় লিখেছিলেন, ‘আমি বিশিষ্ট বাঙালিদের মধ্যে পড়ি না; আমার বিশ্বাস জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন্তু আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কিছু– যা শেষ বিচারে কোনও একটা জিনিসের-মতন-জিনিস– কিন্তু ভাগ্য এমনই যে তার খাদ্য জুটছে না। কিন্তু আশা করি, ভবিষ্যতে খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে; আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না।’ চিঠিটি হুমায়ুন কবিরকে লেখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। হুমায়ুন কবির সেসময় ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের সচিব ছিলেন। জীবদ্দশায় নিজের সুকৃতির তেমন কিছুই দেখে যান নি। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ ক্লাসে তাঁর রচনাসমূহ পাঠ্যসূচীর বিষয় হয়, কিন্তু তার আগেই যাদবপুর এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেসব পাঠসূচীতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল।

জীবনানন্দ দৃশ্য কল্পনা করতেন জানতেন, জানতেন তুলির আঁচড়ে তার চিত্ররূপ দিতে। তিনি বাংলা কবিতাকে এমন এক উচ্চমাত্রায় নিয়ে গিয়ে অবসরে গিয়েছেন মনে হয় যেন কবিতায় আর কারো কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই উপলব্ধি সবারই ঘটেছিল। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্র কী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পাশাপাশি দেখলে রবীন্দ্রনাথকে ঔপন্যাসিক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্প্রভ লাগে। তারাশঙ্কর বা বিভূতিভূষণেরও তদবস্থা। আর কবি হিসেবে জীবনানন্দ যে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক অনেক গুণে গুণী– ঢের বেশি ঈশ্বরপ্রেরিত বুদ্ধিমান –সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না।’ কারো কাছে এসব কথাকে বাড়াবাড়ি মনে হবে। কথাগুলি উড়িয়ে দিতে মন চাইবে। কিন্তু জীবনানন্দ দাশকে অস্বীকার করলে আসলে বাংলা কবিতার হৃদপিণ্ডকেই বাদ দিতে হয়। আর জানি তো, হৃদপিন্ড না থাকলে আসলে ছালবাকল ছাড়া আর কিছুই থাকে না।
কবি শামসুর রাহমান ধুসর পাণ্ডুলিপি পড়ে লিখেছিলেন– ‘এক মোহন ভূতগ্রস্ততায় সারারাত জেগে পড়লাম ধূসর পাণ্ডুলিপি। কবিতার পংক্তিমালা আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে একা কথা বলতে লাগলো, একটানা অনেকক্ষণ। আমার চেতনায় জীবনানন্দীয় ঝরণাধারা বয়ে গেলো, যা অত্যন্ত নির্জন এবং মায়াবী। রাতে এক ফোঁটা ঘুম হলো না; আমার স্নায়ুতন্ত্রী একটি বাদ্যযন্ত্রের মতো সঙ্গীতমুখর ছিলো সারারাত।’
হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন–
‘রাষ্ট্রের কাছে কবিতার কোনো মূল্য নেই– রাষ্ট্র কোথাও কবির জন্য কোনো পদ রাখে না, কিন্তু দশতলা দালান খুবই মূল্যবান; তবে একটি দশতলা দালানের মালিক হওয়ার থেকে অনেক কঠিন ‘অবসরের গান’ লেখা। জীবনানন্দ অবশ্য ওই কবিতাটির বদলে একটি একতলা দালান বানাতে পারলে টামলাইনের পাশে একটু সাবধানে হাঁটতেন। তবে জীবনানন্দ ছাড়া কেউ ওই কবিতাটি লিখতে পারতেন না; দশতলার মালিক অনেকেই হ’তে পারেন, যাঁদের ঠিক যোগাযোগটি আছে, কিন্তু কোনো যোগাযোগের ফলেই ওটি লেখা সম্ভব নয়। কে মূল্যবান– জীবনানন্দ না রাষ্ট্রপতি?’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন–
‘আমি পাগলের মতন জীবনানন্দ দাশের ভক্ত হয়ে গেলাম। ভক্ত কিংবা ক্রীতদাসও বলা যেতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনের রেলিং-এর পুরনো বইয়ের দোকান থেকে একদিন মাত্র চার আনায় এক কপি ধূসর পাণ্ডুলিপি কিনে মনে হয়েছিল যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছি।’
জীবনানন্দ’র কবিতা পাঠ করলে এরকম ভেসে যেতে হয়, ডুবতে ডুবতে যতটা সম্ভব তল খুঁজতে খুঁজতে চলাই নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। জীবনানন্দ এতটাই শক্তিধর, এতটাই সমর্থ…! কাউকে ক্রীতদাস বানিয়ে নেন, কাউকে ভূতগ্রস্ত করে তুলতে পারেন, কা’রো মনে হয় জীবনানন্দ রাষ্ট্রপতি’র মতো মূল্যবান, না– তার’চে বেশি? আর কারো মনে হয় কবি হিসেবে জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক অনেক গুণে গুণী– ঢের বেশি ঈশ্বরপ্রেরিত বুদ্ধিমান।
শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় আরেক কাঠি সরেস। তিনি জীবনানন্দ দাশকে সেয়ানা পাগল বলেছেন, যিনি অন্য সব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে পাগল করে দিতে পারেন। লেখাটির শিরোনাম– ‘যতই পড়ি, ততই ভুল বুঝি– এমন কবি জীবনানন্দ।’ সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘জীবনানন্দ কী বদ্ধ পাগল ছিলেন? নাকি অল্পবিস্তর পাগল ছিলেন, পরে সম্পূর্ণ পাগল হয়ে যান?’ তিনি লিখেছেন, ‘ছবিতে তাঁর চোখ দুটো দেখেছেন ভালো করে?’
জীবনানন্দের চোখ আসলেই গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখার মতো। এই চোখে কেমন একটা ধরা পড়ে যাওয়ার ভাব আছে। কেমন একটা দ্বিধা। কেমন একটা লাজুক ভয়।
জীবনানন্দকে ভালোবেসে পাগল বলে শরৎকুমার লিখেছেন, ‘তাহলে বোঝা যাচ্ছে, এই পাগল মানুষটি এমন সেয়ানা যে, অন্য সব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে পাগল করে দিতে পারেন! তা যদি হয় তবে তিনি বিরল প্রতিভা।’
কবিতায় চিত্ররূপের কথা বলতে হলে তাঁর লেখা অসংখ্য কবিতার উদাহরণ টানা যায়। একটি কবিতা ‘শীত রাত।’ কবিতাটি এমন:
এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,
কিংবা পেঁচার গান; সে-ও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।
শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে-
সার্কাসের ব্যথিত সিংহের।
বেদনা এক দিন বসন্ত ফিরবে ব’লে-?
কোনও এক দিন বসন্ত ছিল, তারই পিপাসিত প্রচার?
তুমি স্থবির কোকিল নও? কত কোকিলকে স্থবির হয়ে যেতে দেখেছি, তারা কিশোর নয়,
কিশোরী নয় আর;
কোকিলের গান ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
সিংহ হুঙ্কার ক’রে উঠছে :
সার্কাসের ব্যথিত সিংহ,
স্থবির সিংহ এক– আফিমের সিংহ– অন্ধ-অন্ধকার।
চার দিককার আবছায়া-সমুদ্রের ভিতর জীবনকে স্মরণ করতে গিয়ে
মৃত মাছের পুচ্ছের শৈবালে, অন্ধকার জলে, কুয়াশার পঞ্জরে হারিয়ে যায় সব।
সিংহ অরণ্যকে পাবে না আর
পাবে না আর
পাবে না আর।
কোকিলের গান
বিবর্ণ এঞ্জিনের মতো খ’সে-খ’সে
চুম্বক-পাহাড়ে নিস্তব্ধ।
হে পৃথিবী,
হে বিপাশা-মদির নাগপাশ, তুমি
পাশ ফিরে শোও
কোনও দিন কিছু খুঁজে পাবে না আর।

কোনো কোনো শীতের রাতে জীবনানন্দের হৃদয়ে মৃত্যু আসতো। মনে রাখতে হবে, সব শীতের রাতে নয়। যখন মৃত্যুর মত অনুভূতি তাঁর ওপর ভর করতো, মানে তিনি আক্রান্ত হতেন, তখন! তখন, তাঁর মনে হতো, বাইরে শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা ঝরছে, অথবা তিনি শুনতে পেতেন পেঁচার গান। সে-গান আবার শিশির ঝরার মত অথবা পাতা ঝরার মত। এ-রকম রাতে শহর আর গ্রামের কোথাও তিনি সিংহের হুঙ্কার শুনতে পেতেন। সে সিংহ বনের বীর বিক্রম সিংহ নয়, সেটি সার্কাসের বন্দি প্রাণী, সে অসহায় নিরীহ সিংহের হুঙ্কার শুনতে পেতেন তিনি। সিংহটি দুঃখী আর ব্যথিত ছিল। সিংহের পরে তিনি কোকিলের কথা টানেন। কোকিলের বেদনা যেন শীত পার হয়ে একদিন বসন্ত আসবে এরকম। এরকম ভাবনা তাড়িত। কোকিল অভিজ্ঞ, সে বসন্ত পার করেছিল। কোকিলের শীতের রাতের ডাক যেন বসন্তের জন্য পিপাসা-কাতর থাকা। কবি এত সব দেখে কোকিলকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, এত পিপাসা তোমার, এত কুহু ডাক ডেকে চলেছ, কিন্তু জেনে রাখো বহু কোকিলকে আমি স্থবির হয়ে যেতে দেখেছি, সেই কোকিলরা কিশোর কিশোরী নয়, এবং জেনে রাখো, কোকিলের গান অশ্রুত নয় আর। এবং ব্যবহৃতও। তার পর তিনি সিংহের কথা বলেন, সেই সিংহ, যে হুঙ্কার করছিল ব্যথিত চিত্তে, সে-ও কোকিলের মত স্থবির এবং কবি বলছেন সে সিংহ আফিম খাওয়া, চোখে দেখতে পায় না সে, আর অন্ধকার। জীবনানন্দ অন্ধকারকে উপলব্ধিতে রেখে নানামুখী পংক্তি লিখেছেন। অন্ধ সিংহ দেখতে পাচ্ছে না, তাই অন্ধকার এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। এরপর তিনি তাৎপর্যময় কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, চতুর্দিকের আবছায়া সমুদ্রের মতো অবস্থার মধ্যে থেকে জীবনকে অনুভব করতে গিয়ে, মরা মাছের লেজের শৈবালে, জলের অন্ধকারে, কুয়াশার ঘেরাটোপে সবকিছু হারিয়ে যায়। কাদের? নিশ্চয়ই প্রাণীর। আরো বেশি ঘন করে বললে, মানুষের। ব্যথিত সিংহ তো সার্কাসের খেলায় বন্দি, জীবনানন্দ বলেন, অরণ্যের সিংহ অরণ্যকে আর ফিরে পাবে না। পাবে না আর পাবে না আর পাবে না আর। আর সেই কোকিল? তার গান বিবর্ণ এঞ্জিনের মতো ঝরে পড়ছে, পাহাড়ে চুম্বকের মত আটকে আছে, নিস্তব্ধ। সিংহ, কোকিলের পরিণতি জানিয়ে শেষে এসে জীবনানন্দ পৃথিবীকে তাঁর রায় দিতে চান। তিনি বলেন, শোনো, পৃথিবী। বিপাশা মদির নাগপাশ, তুমি এবার পাশ ফিরে শুতে পারো। উদগ্র বাসনা হৃদয়ে ঝুলিয়ে রেখে কাজ নেই। জেনে রাখো… আর কোনও দিন তুমি কিছু খুঁজে পাবে না।

দুই.
জীবনানন্দ একবার সুরজিৎ দাশগুপ্তকে বলেছিলেন, ‘চাষের জন্য জমি বানাতে হয়, বানিয়ে একবার শুধু চারা পুঁতে দিলেই হয় না, জল দিতে হয় সার দিতে হয়, নিড়োতে হয়, তেমনই কবিতা লেখার মনটাকে তৈরি করতে হয়, কবিতার সত্যকে ভাবতে হয়, পড়তে হয়, পড়ার অভিজ্ঞতাকে নিজের অভিজ্ঞতা করে নিতে হয়।’
ফ্রানৎস কাফকাকে বলা হয় লেখকদের লেখক। আমরা জেনেছি, কাফকা কথা বলার সময় মুখমণ্ডলের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতেন। তাঁর লেখায় এর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। কাফকা গল্প আর উপন্যাসে ঘটনার কিংবা দৃশ্যপটের এমন বর্ণনা দিতেন সেটি অভাবনীয় ছিল। ঘটনাকে অণুতে অণুতে বিভক্ত করে তার বর্ণনা করার দক্ষতা তিনি দেখিয়েছিলেন। ঘটনার সময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সমস্ত কিছুর স্বতন্ত্র পরিচয় আর অবস্থান নিয়ে প্রকাশিত হয়েছেন। জীবনানন্দের আলোচনায় কাফকা প্রাসঙ্গিক হন এই কারণে যে গদ্যসাহিত্যে কাফকা যেমন কবিতায় জীবনানন্দ তেমন। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় জীবনানন্দের উপন্যাস নিয়ে এক লেখায় তাঁকে কাফকার সঙ্গে মিলিয়ে কথা বলেছেন। আমরা জেনেছি, জীবনানন্দ তাঁর গদ্যরচনাগুলোকে বাক্সবন্দি করে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেগুলো প্রকাশিত হয়। কাফকাও তাঁর রচনাগুলোকে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সন্দীপন জীবনানন্দের লেখা উপন্যাস মাল্যবান সম্পর্কে বলেন ‘ইওরোপে যার নাম ট্রায়াল, এখানে সেটাই মাল্যবান, বই হয়ে বেরুলো ৩০ বছর পরে; সবার আগে যে, সে দেখা দিল সবার পরে। সন্দীপন খুব বেশি ভুল বলেন নি। প্রকৃত প্রস্তাবে কাফকার মেটামরফোসিস কিংবা দ্য ট্রায়াল পড়লে মনে হবে, এসব সৃষ্টি তাদের স্রষ্টার চাইতেও বেশি শক্তিমান। আর সম্ভবত ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে সাক্ষাৎ না ঘটলে জীবনানন্দ এক-রকম রহস্যই থেকে যেতেন আমাদের কাছে। তাঁর বিপুল রচনাকর্মের অনেক কিছুই থেকে যেত অন্ধকারে। জীবনানন্দর জটিল মনোজগতের অভ্যন্তরে তাঁর লেখা ভেদ করে প্রবেশ করার দুঃসাহস যেসব অনিসন্ধিৎসু পাঠক প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন সে তো ঐ ভূমেন্দ্র গুহর কারণেই।
কাফকার জন্য যেমন ম্যাক্স ব্রড জীবনানন্দর জন্য এই ডাক্তার বাবুটি। তিনি লিখেছিলেন: ‘তখন কতই-বা বয়েস, কুড়ি-একুশ হবে, জীবনানন্দ’র মৃত্যুর ঠিক পরে-পরেই পাকেচক্রে তাঁর পাণ্ডুলিপি-ভরতি কালো অতি-সাধারণ ধরনের টিনের কালো ট্রাঙ্কগুলির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়ে গেল। ভারি ট্রাঙ্কগুলির মধ্যে কী যে সব গর্ভবদ্ধ হয়ে আছে, তা তাঁর আত্মীয়পরিজনরা স্পষ্ট ক’রে জানতেন না, সে-সময়ে সে-সব বিষয়ে মনোনিবেশ করার মতো মানসিক অবস্থা ও সময়ও হয়তো তাঁদের ছিল না, তাঁরা সব ভারী কাজকর্ম করতেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অথবা সরকারি অফিসে, আর আমিও তাঁর কনিষ্ঠ ভগ্নী সুচরিতা দাশ’এর স্নেহানুকূল্যে তখন বছর দুয়েক হল তাঁদের পরিবারটির আশেপাশে প্রায় সম্মোহিতের মতো ঘোরঘুরি করছি, সুতরাং বাক্সগুলির প্রত্নখননের দায় তাঁর বোন এবং আমার উপরেই প্রাথমিক ভাবে বর্তেছিল, বলা যায়।’ ভূমেন্দ্র গুহ’র কারণেই গল্প-উপন্যাসগুলো পাঠকের পড়ার সৌভাগ্য হয়। নয়তো জীবনানন্দকে পৃথিবী চিনতো একজন ব্যতিক্রমধর্মী কবি হিসেবেই। কাফকার ডায়েরি সরল, সহজভাবেই পড়া যায়। জীবনানন্দের ডায়েরি কোডেড ভাষায় ইংরেজিতে লেখা। নানান কসরত করে সেটি বুঝতে চেষ্টা করা হয়। জীবদ্দশায় সবার অবহেলা, অনাদর সয়ে দারিদ্র আর বিরুদ্ধ পরিবেশের মুখোমুখি হয়ে অনেকের দয়ায় মোটামুটি একটা জীবন কাটিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। প্রেমিকার অবহেলা ছিল। প্রেমিকা শোভনা জীবনানন্দের বিয়েতে এসে হাসিখুশী ভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। পাণ্ডুলিপির অনেক গল্পে সেই হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলির বিষাদ জীবনানন্দ কৌশলে লিখে দিয়েছিলেন। সেই জীবনানন্দ, যাকে কেউ ভালো রাখেনি।
আমরা চারজন উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি গত হন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে। জীবনানন্দের কবিতার মত তাঁর গল্প-উপন্যাসে ওজনদার একটি আবহ থাকে। তিনি মূলত মানুষের সম্পর্ক নিয়েই তাঁর গল্প-উপন্যাসের কাহিনী সাজিয়েছেন। ‘আমার কথা’ প্রবন্ধে জীবনানন্দ একবার লিখেছিলেন, ‘ঔপন্যাসিক হওয়ার ইচ্ছে ছিল, এখনও তা ঘোচে নি।’ অর্থাৎ তিনি ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি ঠিক হয়ে উঠছে না। পরে দেখা গেল, মনের কোণে লালিত স্বপ্ন তিনি ঠিকই কাজে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাহলে প্রকাশের সাহস কেন পেলেন না? তাঁর প্রায় সব গল্প-উপন্যাসই তাঁর নিজের জীবনের কথা-কাহিনী। বোধ করি একারণেই এগুলো প্রকাশিত হোক তা তিনি চান নি। তাঁর টেলিগ্রাফিক ভাষায় লেখা কোডেড নোটস যেটি ‘লিটারারি নোটস’ নামে পরিচিত ছিল সেখানে তিনি ব্যক্তিগত কথাবার্তা এমনভাবে লিখেছিলেন যেন কেউ সেগুলো বুঝতে না পারে। নিজেকে আড়াল করে ডায়েরি লেখার বিষয়টি মাথায় রাখলে গল্প বা উপন্যাসে নানান চরিত্রের আর কাহিনীর আড়ালে নিজের কথাগুলো গড়গড় করে বলে দিয়েও সেগুলো ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক থাকা তাঁর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মনে হয়।
আমরা চারজন উপন্যাসটি চার জন বন্ধুর জীবন নিয়ে লেখা। গল্পটি অনাথ, শ্যামল, সুধামাধব এবং উষা’র গল্প। তিন যুবকের সব ক’জনই প্রায় বেকার। মেয়েটির পেশা আবছা রেখেছেন জীবনানন্দ। এদের মধ্যে শ্যামল এবং সুধামাধব কবিতা লেখেন। অনাথ আর উষা করেন গদ্যচর্চা। এই চার চরিত্রের বেঁচে থাকা, স্বপ্ন-ভবিষ্যত নিয়ে নিজস্ব দর্শন এবং প্রায় নিম্নবিত্তের মত জীবন কাটাতে বাধ্য হবার বিষয়গুলো জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণে অতি সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে। এই চারবন্ধুর সবাই লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চান, তাদের সবার রয়েছে নারী বন্ধুটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার জটিল রসায়ন।
জীবনানন্দ দাশ নিজে জীবনের অনেকটা সময় বেকার ছিলেন। এই উপন্যাসের প্রায়-বেকার তিন যুবকের মধ্যেই আমরা জীবনানন্দকে দেখতে পাই। এই তিন যুবক পরষ্পরের লেখার খোঁজ রাখেন, এর মধ্যে অনাথ, যিনি গল্প উপন্যাস লেখেন কিন্তু তার কিছুই ছাপান না। সুধামাধব জীবনে সাকুল্যে কবিতা লিখেছেন বারোটি, সেসবও ধুসর হয়ে পা-ুলিপিতে পড়ে রয়েছে। আর উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসের নায়ক শ্যামল কবিতা লেখেন কিন্তু সেসব কবিতা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। শ্যামলের সাহিত্যচর্চার বিষয়টি উল্লেখ না করা হলেও অনাথ, শ্যামল এবং সুধামাধবের সৃষ্টি আর কল্পনার মধ্যে আমরা বার-বার জীবনানন্দকে খুঁজে পেয়েছি। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে এই তিন চরিত্রের আড়ালে লেখক স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন।
J das-2
‘চিত্র: পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত
অনাথের কথাই ধরা যাক। অনাথ একটি উপন্যাস লিখতে চান, সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করবেন। অনাথ স্বপ্ন দেখেন উপন্যাসটি বিক্রি করে পঞ্চাশ হাজার টাকা আসবে এবং সে টাকা দিয়ে তিনি একটি মনের মতো বাড়ি তৈরি করবেন। চালচুলোহীন মেসবাড়িতে বসবাসকারী প্রায় বেকার একজন যুবকের জন্য এটি কষ্টকল্পনা বটে। অনাথের এই কল্পনার মধ্যে কীভাবে জীবনানন্দ নিজেই ধরা পড়েন সেটি দেখা যাক।
অশোক মিত্র তাঁর আত্মজীবনীগ্রন্থ ‘আপিলা চাপিলা’য় লিখেছেন ‘জীবনানন্দের সঙ্গেও কলকাতায় এলে নিয়মিত দেখা হতো, তিনি ক্রমশ আত্মবিশ্বাসরহিত। তাঁর ঘনিষ্টবন্ধুরা, যেমন প্রেমেন্দ্র মিত্র, যেমন অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, সচ্ছলতার মুখ দেখেছেন, তাঁর ধারণা বুদ্ধদেব বসু-বিষ্ণু দে প্রভৃতিও দেখেছেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রসঙ্গ না হয় উহ্যই রইলো, অথচ তিনি নিজে একটি ভদ্রগোছের অধ্যাপনার কাজ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারছেন না। পরিচিত এঁকে-তাঁকে ধরেও কোনও ফল হচ্ছে না, আমরা যাঁরা তাঁর অনুরক্ত শুভানুধ্যায়ী তাঁরাও কিছু করে উঠতে পারছি না। একদিন, বর্ষার ম্লাান সন্ধ্যা, রাসবিহারী এভিনিউর প্রায় মোড়ে ল্যান্সডাউন রোডের গলিতে তাঁর একতলার ফ্ল্যাটের বহির্দুয়ার দিয়ে সদ্য ঢুকেছি, হঠাৎ আমাকে টেনে এক কোণে, নিচু নিমগাছের ডালের আড়ালে, নিয়ে গেলেন, কানে-কানে তাঁর অস্ফুট প্রশ্ন : ‘আচ্ছা, আপনি কি জানেন বুদ্ধদেব বাবুর নাকি পঞ্চাশ হাজার টাকার ফিক্সড ডিপোজিট আছে?’ বুদ্ধদেবের আর্থিক অবস্থা তখন কিন্তু আদৌ ভালো নয়, কিন্তু জীবনানন্দ এতটাই তিমিরে অবগাহিত, যে অলিক লোকপ্রবাদও তাঁর কাছে ধ্রুব সত্য বলে প্রতিভাত। যেখানে তিনি নিজে কোনওদিন পৌঁছাতে পারবেন না, সেখানে তাঁর বন্ধু ও পরিচিতরা কীরকম অমোঘ নিয়মে পৌঁছে গেছেন; তখনকার নিরিখে কোনও সাহিত্যিকের পক্ষে পঞ্চাশ হাজার টাকার সঞ্চয় অবশ্যই বিস্ময়ে অবাক করার মতো।’ জীবনানন্দ এরকম ভাবতেন। ভাবতেন বুদ্ধদেব বসু’র সঞ্চয় পঞ্চাশ হাজার টাকা। লিখে টাকা কামাই করার এরকম চিন্তা বা কল্পনা তিনি অনাথের মাধ্যমে এখানে নিবিড়ভাবে তুলে ধরেছেন। অনাথ সম্পর্কে উত্তম পুরুষে তিনি লিখেছেন:
‘বইয়ের বিক্রির থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা যা হাতে আসবে তার, তা-ই দিয়ে বালিগঞ্জের দিকে ছোট-খাটো একটা নিরিবিলি বাড়ি তৈরি করবে–সারাটা জীবন নিজেও বিড়ি ফুঁকে কাটাবে (চুরুট-সিগারেটের চেয়ে সে বেশি ভালোবাসে বিড়ি)।’
আবার উত্তম পুরুষে লেখেন:
‘কিন্তু গল্প লিখতে ব’সে অনাথ এ-সব উদ্দেশ্যের কথা ভুলে যেত আমি লক্ষ ক’রে দেখেছিলাম, সত্যিই লেখা-ই ছিল তার কাম্য-টাকাও নয়, সম্মান প্রতিপত্তিও নয়।’
জীবনানন্দ ব্যক্তি জীবনে এরকমই ছিলেন।
তারপর উত্তম পুরুষে আবার বলেন:
‘এ-জন্য অনাথকে শ্রদ্ধা করতাম; মনে হত, লেখকের প্রতিভা তার ভেতর না থাক, এক জন ভালো লেখকের অবহিতি-সমাহিতি ভাব তার আছে। একটা গল্পকে মনের মতো ক’রে দাঁড় করাবার জন্য সে অনেক কিছু সুখের ও আরামের জিনিস ত্যাগ করতে রাজি আছে।’
লেখক বলছেন ‘বন্ধু সুধামাধব অনাথকে বলত: তা হলে তোমার জীবনটা যাতনা-বিশেষ অনাথ।’
আবার উত্তম পুরুষে বলেন:
‘কিন্তু বোঝা যেত, জীবনে আমাদের সকলের চেয়ে কম যাতনা তার, লিখে কিংবা লিখবার প্রয়াসে থেকে সে অনেক রকম ব্যথা ভুলে যায়। অনেক আশ্চর্য উজ্জ্বল জিনিস আশা করে; না যদি মেটে, তা হলে আজকের দিনটা আশায়-আশায় কাটল, কালকে মিটবে, কিংবা তার পরের দিন, তার পরের দিন…অনাথের মনে হত।’
জীবনানন্দের জীবনের সঙ্গে মিল রেখে কল্পনা করলে যেন ধরা পড়ে, এই অনাথ আর কেউ নন, জীবনানন্দ নিজেই।
এর একটু পরেই শ্যামলের জবানীতে জীবনানন্দ লেখেন:
‘কিন্তু আমাদের জীবনের বিলাস এই ধরনের যে, তা আমরা সকলেই জানি। কাজেই, এই শীতের দিনেও না পারি একটা কমলা-লেবু কিংবা একটা কাগজি-লেবু কিনতে। অথচ এই দু’টো জিনিসকেই তো খুব ভালোবাসতাম।’
জীবনানন্দ কমলালেবু ভালোবাসতেন। মৃত্যুর পর রোগীর পথ্য একটি কমলালেবু হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাওয়ার আকুতিভরা একটি কবিতা রয়েছে তাঁর। ১৪ অক্টোবর ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ট্রাম দূর্ঘটনায় পতিত হয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তখন সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কাছে কমলালেবু খেতে চেয়েছিলেন।
অনাথের খুব অসুখ করলো। বন্ধুরা তাকে সেবা দিয়ে যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তুলতে চেষ্টা করছে। এর মধ্যেও সে নিজের লেখা নিয়ে কথা বলে। অনাথ বলে:
‘না লেখা ছেড়ে দেব না। আস্তে আস্তে লিখতে-লিখতেই শেষে এক দিন সফলতা পাওয়া যাবে।’
উপন্যাসটির চরিত্রগুলো যেন অনেক মুখোশের এক-একজন জীবনানন্দ। সবগুলো মুখোচ্ছবি জড়ো করলে একজন পূর্ণাঙ্গ অবয়বের জীবনানন্দ আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হয়।
জীবনানন্দের গল্পের ভাষায়ও কবিতার শোভা রয়েছে। এসব বেশিরভাগই তাঁর জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে নতুন উপলব্ধি হয়। যেমন ‘নিরুপম যাত্রা’ গল্পটি। গল্পের চরিত্র প্রভাত আর কমলার আড়ালে যেন জীবনানন্দের অসুখী দাম্পত্য লুকিয়ে রয়েছে। বেকার প্রভাতের কত রকম গ্লাানি। জীবন নিয়ে প্রভাতের ‘জীবনকে বুঝি জীবনধারণ বলে’, পড়ে থমকে যেতে হয়। জীবনকে যে কেবল জীবনধারণ বলে, এরকম ভাবনা কখনো মাথায় আসে নি। তাঁর সব গল্পেই অদ্ভুত সব জীবন দর্শনের দেখা মেলে। কত রকমভাবে তিনি জীবনকে দেখিয়েছেন! মৃত্যুর মধ্যে জীবনের সৌন্দর্য, জীবনের নিষ্ঠুরতার মধ্যে জীবনকে দেখার চোখ, জীবন হল বিধাতার খেলা, নিজের জীবনকে মিছেমিছি ভুল বুঝে অন্ধ হবার অনর্থ করার দরকার কী?…আরও কত কি…। ‘নিরুপম যাত্রা’ গল্পে একজায়গায় লেখা রয়েছে:
‘পৃথিবীর সাধারণ হাঁটা-চলার পথ তুচ্ছ খুঁটিনাটি যতদিন অনাবিষ্কারের বিস্ময়ে কুয়াশালাভ হয়ে থাকে, ততদিনই খুব গভীরে লাভ ধীরে ধীরে কল্পনা শুকিয়ে যায় স্বপ্নগুলো যায় ভেঙেচুরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি তৃপ্তি পাই না, শান্তি পাই না, জীবনটা একটা দাঁড়কাকের বাসার মতো ছন্নছাড়া জিনিশ হয়ে দাঁড়ায়; সকাল থেকে রাত্রি অবধি একটা ক্ষুধিত কাকের মতো সমস্ত রকম কদর্যতা, চিত্তপ্রসাদহীন লালসা ও গ্লাানির ভিতর নিবৃত্তি খুঁজে মরি, জীবনকে বুঝি জীবনধারণ বলে।’

তিন.
১৯৬০ সালে জীবনানন্দ দাশ-এর পারিবারিক বাড়িটি যেটি বরিশালের বগুড়া রোডে ‘সর্বানন্দ ভবন’ নামে পরিচিত ছিল বিক্রি হয়ে যায়। জনৈক আবদুর রাজ্জাক বাড়িটি কিনে নেন এবং পরে কবির সম্মানে একে ‘ধানসিড়ি’ নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার আবদুর রাজ্জাকের পরিবারের কাছ থেকে কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে ‘জীবনানন্দ স্মৃতি পাঠাগার’ স্থাপন করেছে। এর আগে, আবদুর রাজ্জাক কিছু জমি অন্যত্র বিক্রিও করেছেন। মধ্যখানে ধানসিড়ি, ডানে স্মৃতি পাঠাগার, আর বাঁয়ে আরেকজন মালিকের বাড়ি। আমরা যেদিন সেখানে ভ্রমণ করেছিলাম সেদিন ভাগ্যবশত বর্তমান মালিক আবদুর রাজ্জাকের পুত্রবধু ‘বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলে’র শিক্ষিকা হাসিনা বেগমকে পেয়ে যাই। তিনি জানান, সর্বানন্দ ভবনের কিছুই আর অক্ষত নেই। সুতরাং বাড়িটির কিনারায় দাঁড়িয়ে বহুবছরের পুরনো স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে বয়ে যাওয়া হাওয়া থেকে এক প্রকারের ঘ্রাণ নিজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাবার উদ্যোগ গ্রহণ করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। এ হলো অক্ষমের আমোদ। হ্যাঁ, এই বাড়িটিতে এককালে জীবনানন্দ থাকতেন, এই বাড়িটি, বগুড়া রোডের চারপাশ নিয়ে তাঁর লেখাগুলো মনে করার চেষ্টা করা সহ যাবতীয় বিষয়গুলো স্মৃতির থলে থেকে মিলিয়ে দেখারও এক রকমের আনন্দ আছে। অক্ষম লোক এসব ভেবে অনেক আনন্দ পায়। বিষয়টা ওরকমই ছিল আমার জন্য। জীবনানন্দ বর্ণিত বাড়িটির কিছুই এখানে আর দৃশ্যমান নয়। তিনি গল্পে লিখেছিলেন, ‘চার বিঘে জমি নিয়ে বাড়িতে দু’খানা ঘর পশ্চিম পোতায় আর দক্ষিণ পোতায়, ইলেকক্ট্রিক কানেকশন আসে নি। দক্ষিণ পোতার বাড়িটা পাকা নয়, মেঝেটা মাটির মেঝে, শাল সুন্দরী গরাণের খুঁটি, আসাম থেকে আনানো হয়েছিল, এক কাকা এনেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয় নি তখন।’ জীবনানন্দের ছাত্র আবুল কালাম শামসুদ্দিন লিখেছিলেন, ‘বাংলো ধরণের বাড়ি উপরে শনের চাল। বেড়া আধেক ইট আর আধেক বাঁশের। কিন্তু ভিতরে সাহিত্য-পাঠকের কাছে আশ্চর্য এক জগৎ। বই আর বই।’ এর পর জীবনানন্দের কবিতায় বর্ণিত ধানসিড়ি নদীটির সন্ধান করতে যাই। নদীটির অবস্থান ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলায়। ঝালকাঠি একসময় বৃহত্তর বরিশালের অধীনে ছিল, বর্তমানে এটি একটি স্বতন্ত্র জেলা। বরিশাল থেকে রাজাপুরের দূরত্ব চৌত্রিশ কিলোমিটারের কাছাকাছি। রাজাপুরের বামনকাঠি গ্রামেই ধানসিড়ি নদীর অবস্থান। অদূরে গাবখান সেতু। নীচে প্রমত্তা গাবখান নদী। এর একটি শাখা চলে গেছে পুবে। পুব থেকে পশ্চিমের সরু নদীটি ধানসিড়ি। বামনকাঠি থেকে হাঁটতে হাঁটতে সড়কের বিভাজন মাড়িয়ে হঠাৎ দক্ষিণ দিকে চলে গেছে চুনসুরকির রাস্তা। সেটি ধরে এগোতে থাকলে শান্ত, নীরব, নিথর ধানসিড়ি নদীটির দেখা মেলে। নদীতে কোনো বাঁক নেই, টলটলে কালো জল, নদীর দুকূল ঘিরে মাঠ আর জমি। ‘নদী’ নামের জীবনানন্দের একটি কবিতা রয়েছে। ‘ধূসর পা-ুলিপি’তে রয়েছে কবিতাটি। সেখানে লেখা রাইসর্ষের খেতের পাশে নদী। ধানসিড়ির পাশে ফসলের মাঠ। একদম লাগোয়া। অদিগন্ত ে খালা মাঠের দিকে তাকালে শরীর অবশ হয়ে আসে। কবিতায় যেভাবে আশপাশের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তিনি সেসব এখানে দাঁড়ালে হুবহু মিলে যায়। কবিতাটির শুরুর কয়েকটি লাইন:

রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হ’ল–দুপুরে বিবর্ণ হয়ে গেল
তারই পাশে নদী;
নদী, তুমি কোন কথা কও?

এর পর কিছু দূর গেলে লেখা আছে:

এক-পাল মাছরাঙা নদীর বুকের রামধনু
বকের ডানার সারি সাদা পদ্ম–নিস্তদ্ধ পদ্মের দ্বীপ নদীর ভিতরে
মানুষেরা সেই সব দেখে নাই।

১৯৯৬ সালের নির্বাচন পরিদর্শনে এলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বরিশাল-ঝালকাঠি অঞ্চল নিয়ে একটি চমৎকার ভ্রমণ কাহিনী লিখেছিলেন। ধানসিড়ি নদী নিয়ে অপূর্ব বর্ণনা জীবনানন্দ দাশের অনুরাগী হিসেবে সুনীল মোহনীয়ভাবেই সম্পন্ন করতে পারবেন এ-তো অনুমেয়। সেটিই হয়েছিল।
জীবনানন্দের বরিশালে বগুড়া রোডের বাড়ি নিয়ে, সেটি ছেড়ে আসা নিয়ে তাঁর স্মৃতির মুখোমুখি হতে একটি কবিতা পড়া যাক।
এই কবিতাটি বিশেষ ধরনের। তাঁর অনেক কবিতাতেই তিনি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে ক্রমশ দূরবর্তী কোনো পথের, দূরবর্তী কোনো নিশানার মাধ্যমে জীবনের একটি সামগ্রিক রূপের সন্ধান দিতে চাইতেন। এটিও তেমন। কবিতাটি মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
‘বলিল অশত্থ সেই’
বলিল অশ্বত্থ ধীরে : ‘কোন্ দিকে যাবে বলো–
তোমরা কোথায় যেতে চাও?
এত দিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে;
ম্লাান খোড়ো ঘরগুলো– আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে;
এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্ দিকে কোন্ পথে ফের
তোমরা যেতেছ চ’লে পাই না ক’ টের!
বোঁচকা বেঁধেছ ঢের– ভোলো নাই ভাঙা বাটি ফুটা ঘটিটাও;
আবার কোথায় যেতে চাও?

পঞ্চাশ বছরও, হায়, হয় নি ক’– এই তো সে-দিন
তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়
আজও, আহা, তাহাদের কথা মনে হয় ! —
এখানে মাঠের পারে জমি কিনে খোড়ো ঘর তুলে
এই দেশে এই পথে এই সব ঘাস ধান নিম জামরুলে
জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাক্সক্ষার বেদনার শুধেছিল ঋণ;
দাঁড়ায়ে-দাঁড়ায়ে সব দেখেছি যে, মনে হয় যেন সেই দিন!
এখানে তোমরা তবু থাকিবে না? যাবে চ’লে তবে কোন্ পথে?
সেই পথে আরও শান্তি — আরও বুঝি সাধ?
আরও বুঝি জীবনের গভীর আস্বাদ?
তোমরা সেখানে গিয়ে তাই বুঝি বেঁধে র’বে আকাক্সক্ষার ঘর!..
যেখানেই যাও চ’লে, হয় না ক’ জীবনের কোনো রূপান্তর;
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনি ধূসর
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাক্সক্ষার ঘর!’
বলিল অশ্বত্থ সেই ন’ড়ে-ন’ড়ে অন্ধকারে মাথার উপর।

অশথ গাছটি যেন বুড়ো ভদ্রলোক, সে কোনো বালকের সঙ্গে গল্প করছে। বালকদের পরিবারের লোকজন পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে সে মুহূর্তে গল্পচ্ছলে বুড়ো অশথ বালককে কখনো ভর্ৎসনার, কখনো উপদেশ এর ভঙ্গিতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাইছে।

বলিল অশ্বত্থ ধীরে : ‘কোন্ দিকে যাবে বলো–
তোমরা কোথায় যেতে চাও?
এত দিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে;
ম্লাান খোড়ো ঘরগুলো– আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে;
এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্ দিকে কোন্ পথে ফের
তোমরা যেতেছ চ’লে পাই না ক’ টের!
বোঁচকা বেঁধেছ ঢের– ভোলো নাই ভাঙা বাটি ফুটা ঘটিটাও;
আবার কোথায় যেতে চাও
?

J das-3
‘চিত্র:মাতা কুসুমকুমারী দাশ
অশথ গাছটি বালককে বলছে, তোমরা নাকি চলে যাচ্ছ? তা কোথায় যাবে? এতদিন তো এখানে কাছাকাছি ছিলে, আমার কাছাকাছি। তোমাদের ভিটেতে তোমাদের ঘর তা যত নড়বড়ে হোক, ম্লান হোক- ছিল তো! এখনো দ্যাখো ঘরগুলি দাঁড়িয়ে আছে। তা তোমরা এইসব ঘর-দোর ছেড়ে যে চুপি চুপি চলে যাচ্ছো, দেখি সব নিয়েই চলে যাচ্ছ, ঘটি বাটি কিছুই তো ফেলে যাচ্ছ না। বুঝেছি! তল্পিতল্পা গুটিয়েই যাচ্ছ!
পঞ্চাশ বছরও, হায়, হয় নি ক’–এই তো সে-দিন
তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়
আজও, আহা, তাহাদের কথা মনে হয় !
এখানে মাঠের পারে জমি কিনে খোড়ো ঘর তুলে
এই দেশে এই পথে এই সব ঘাস ধান নিম জামরুলে
জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাক্সক্ষার বেদনার শুধেছিল ঋণ;
দাঁড়ায়ে-দাঁড়ায়ে সব দেখেছি-যে, মনে হয় যেন সেই দিন!
এখানে তোমরা তবু থাকিবে না? যাবে চ’লে তবে কোন্ পথে?
সেই পথে আরও শান্তি আরও বুঝি সাধ?
আরও বুঝি জীবনের গভীর আস্বাদ?
তোমরা সেখানে গিয়ে তাই বুঝি বেঁধে র’বে আকাক্সক্ষার ঘর!..

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বরিশালের বগুড়া রোডের ‘সর্বানন্দ ভবন’ ছেড়ে ‘বালকে’র পরিবার যখন চলে যাচ্ছে তখন তো বাড়িটির বয়স পঞ্চাশ বছরও হয় নি। এই বাড়িতেই তার পিতামহ, পিতাসহ নিকটজনদের বসতি ছিল। অশথ গাছটির চোখের সামনেই এসব দৃশ্য রচিত হয়েছে। তাই বগুড়া রোডের মাঠের পাশে জমি কিনে বাড়ি তুলে এখানের ঘাস নিম জামরুলের যে গন্ধ বালক সহ পরিবার ধারন করেছে, সেসবতো বেশি দিনের কথা নয়। অশত্থ অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে বলছে: এখানে তোমরা আর থাকবে না? সত্যি চলে যাবে! গেলে কোন পথে যাবে? সেখানে বুঝি অনেক শান্তি? অনেক সাধ-অস্বাদ মেটাবার রাস্তা আছে বুঝি?
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙক্ষার ঘর!’
বলিল অশ্বত্থ সেই ন’ড়ে-ন’ড়ে অন্ধকারে মাথার উপর।

অশত্থ বালককে কৌতুকভরে বলছে, যেখানে যাচ্ছ হয়ত মনে হচ্ছে স্বাদ আর আকাক্সক্ষা খুব মেটানো যাবে, কিন্তু জেনে রাখো যেখানেই যাও না কেন জীবনের কোনো পরিবর্তন বা রূপান্তর কোনো কিছুই হয় না। ঠিকানা ছেড়ে মানুষ স্থান থেকে স্থানান্তরিত হয় কিন্তু নিজ শরীর থেকে তো কেউ বিচ্যুত হতে পারে না! তার ক্ষুধা চলে পাশে, তার স্বপ্ন, তার ব্যথা-বেদনারা, তার সমস্ত বিচ্ছেদের যাতনা…। অশত্থ বলে, চলে গিয়ে যেখানেই থিতু হবে সেখানেই এইসব গাঢ় বেদনা তোমার সঙ্গেই বসত গড়বে।
বসত তো করেছিল। জীবনানন্দ’র অপরিসীম বেদনার জীবন তাকে ছেড়ে যায় নি। কলকাতার ভাড়াবাড়িতে বরং গ্লানি আর ক্লান্তি তাঁকে সম্পূর্ণ গ্রাস করেছিল, জড়িয়ে ধরেছিল গভীর আলিঙ্গনে। শেষ-মেষ তিনি চলে গিয়েছিলেন জীবনের অন্যপারে, যেখানে গেলে আর ফিরে আসা যায় না, কবিতা লেখা যায় না, সেখানে জীবনের আর কিছু নেই, রয়েছে শূন্যতা আর মৃত্যু নামের হাহাকার।

চার.
তাঁর সমালোচকের অভাব ছিল না। স্থায়ী সমালোচক সজনীকান্ত তো ছিলেনই, কারণে-অকারণে ফরমায়েশেও লোকে তাঁর সমালোচনা করতো। জীবনানন্দ-জন্ম-শত-বর্ষের অনুষ্ঠান-মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘সাহিত্য অকাদেমির কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, তাঁরা আমায় সভার মঞ্চে বসার সুযোগ দিয়েছেন। পুরনো পরিচিতরা জানেন কেন আমার কাছে এই মঞ্চ কিছুটা কাঠগড়ার সামিল। আকৈশোর জীবনানন্দের অন্ধভক্ত হয়েও একটা সময় সংকীর্ণ মতবাদের মাদকতায় আমি ছোটমুখে বড় কথা বলার স্পর্ধা দেখিয়েছিলাম। এ সত্ত্বেও তাঁর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হইনি। আমার দূর্ভাগ্য যে, পরে নিজের ভুল স্বীকার করে যে-একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে যাঁকে দিয়েছিলাম, তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে আমার সেই পাণ্ডুলিপিও নিখোঁজ হয়ে যায়। সুধীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজেকে এই বলে আজ স্তোক দিই : ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কি লাভ বল/মনস্তাপেও লাগবে না তাতে জোড়া।’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নিজের অন্তরের উপলব্ধিকে চাপা দিয়ে পার্টির দাদাদের শেখানো বুলি উচ্চারণ করার প্রয়োজন পড়েছিল।
জীবনানন্দ’র জীবদ্দশায় বনলতা সেন বইটা পুরস্কার পেলে সুভাষ মুখোপাধ্যায় পরিচয় পত্রিকায় লিখেছিলেন, “নাম ডাকার দেশ-দশক পরে হলেও এ-দেশের “খাঁটি রসবোদ্ধা” সেই “হীন ভগ্নাংশ” যে শেষ-পর্যন্ত পেছনের বেঞ্চির থেকে দাঁড়িয়ে “প্রেজেন্ট স্যার” বলতে পেরেছেন, তার জন্য আশা করা যায় ‘বনলতা সেন’ এর কবি তাঁদের ধন্যবাদ দেবেন।’ এসব দেখে সে-সময় জীবনানন্দ একবার বলেছিলেন, ‘সুভাষের ধারনা বদলাত ও যদি আমার শেষ বই ‘সাতটি তারার তিমির পড়ত।’ কিন্তু পড়ে বা বুঝে কি সবাই সবকিছু বলে! বর্তমান সময়েও অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলা যাবে না। এদেশের বেশিরভাগ কবি/লেখক নিজের বিবেক-বুদ্ধি কোনো না কোনো জায়গায় বর্গা দিয়ে লেখালেখির হালচাষ করে থাকেন। কলম চালানোর প্রেষণা আসে এই জায়গা থেকে লেখাটি দ্বারা আমার কোনো স্বার্থ উদ্ধার হবে তো? গোষ্ঠীপ্রেম, বন্ধুস্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে জীবনানন্দর মত কত লেখক-কবি সাহিত্যযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন সে হিসেব করে কূল পাওয়া যাবে না। মৃতের স্মরণসভায় মন রাখা কথা বলা, মৃত ব্যক্তির লেখালেখি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রদর্শন কিংবা সান্তনা বাক্য যতই নির্গত হোক পূর্বদিনের হিংসার বিষবাষ্প কখনো নির্বাপিত হয় বলে মনে হয় না।
একদম নিজের মত জীবন যাপন করতেন জীবনানন্দ দাশ। সামাজিক মেলামেশা ছিল না বললেই চলে। বেশভূষাও ছিল সাধারণ। তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশ মানুষ জীবনানন্দ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘তিনি মিলের মোটা ধুতি ছাড়া পরতেন না, এবং একটু উঁচু করেই পরতেন। আমি একদিন একখানা ভাল ধুতি কিনে কবিকে বললাম- ‘কী যে তুমি মোটা মোটা ধুতি হাঁটুর উপরে পরে রাস্তা দিয়ে হাঁট লোকে হাসে না?’ কথাটা বলেই ধুতিখানা তাঁর দিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। তিনি তখন কি একটা লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ধুতিখানা ধরেও দেখলেন না। তাঁর মুখে সামান্য বিরক্তির ভাবও প্রকাশ পেল না। শুধু লেখাটা থামিয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “দেখ, তুমি যে ভাবে খুশি সাজ-পোশাক কর, তোমার সে ইচ্ছেয় আমি কোনদিনই বাধা দেব না। কিন্তু আমাকে এ বিষয়ে তোমার ইচ্ছামত চালাতে বৃথা চেষ্টা কোরো না ! যতদিন তিনি পৃথিবীতে ছিলেন, আমার মুখ থেকে এরকম কথা আর কোনদিনই বের হয়নি। যেদিন তিনি চিরদিনের মতই যাত্রা করলেন, সেই ধুতিখানাই পরিয়ে দিয়েছিলাম। সেখানা বছরের পর বছর আমার বাক্সে রাখা ছিল।”
‘মানুষের সঙ্গে মেশেন না কেন?’
‘ভালো লাগে না!’
মানুষের সঙ্গ তাঁর অসহ্য লাগত। সাহিত্যিক আলাপ আলোচনার মধ্যে অন্যেরা যদি হাজার হাজার কথা বলতেন, জীবনানন্দের মুখ থেকে বেরুতো দু-একটি নিস্পৃহ মন্তব্য। নিজের মধ্যে ডুবে থাকাই ছিল এই নিঃসঙ্গতা প্রিয় কবির স্বধর্ম। তাই রবীন্দ্রনাথের পর অদ্বিতীয় কাব্যপ্রতিভার অধিকারী হয়েও জীবনানন্দ একাকীত্বের নির্মম অহঙ্কারে এই প্রাণবন্ত প্রগতিশীল যুগবিভুতির গৌরব-টিকা ললাটে ধারণ করার যোগ্যতা অর্জন করত পারেন নি।”
মন্মথনাথ সান্যাল/ প্রবাসী
জীবনানন্দর ললাটে শেষাবধি কী জুুটেছে আজ মন্মথনাথ বেঁচে থাকলে (বেঁচে আছেন কি না জানি না) দেখতে পেতেন। তখন তিনি এ লেখা ফিরে পড়ে দুটো নতুন লাইন যোগ করতেন হয়ত;
‘তাই রবীন্দ্রনাথের পর অদ্বিতীয় কাব্যপ্রতিভার অধিকারী হয়েও জীবনানন্দ একাকীত্বের নির্মম অহঙ্কারে এই প্রাণবন্ত প্রগতিশীল যুগবিভুতির গৌরব-টিকা ললাটে ধারণ করার যোগ্যতা অর্জন করত পারেন নি”- বলে যে ভ্রম আমিসহ অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছিল সেটি ভ্রান্ত, কারণ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সজনীকান্তসহ অনেকেই প্রথমে জীবনানন্দকে অস্বীকার করে কবির মৃত্যুর পর জিভ কেটেছিলেন। আমিও জিভ কাটলাম। আর স্বীকার করলাম, রবীন্দ্রনাথকে পাশ কাটিয়ে নতুন শব্দ তৈরি করতে কেবল ঐ এক জীবনানন্দই পেরেছিলেন। হইচই করলেই কেবল কবি-লেখক হওয়া যায় না, নীরব থেকেও সমুদ্রকে তরঙ্গায়িত করা যায়।

পাঁচ.
দূর্ঘটনায় পড়ে হাসপাতালের শেষের দিনগুলোতে কোনো স্বস্তি ছিল না। এই দুম জ্বর, এই ব্যথার আর্তনাদ। কত কী ইচ্ছে করে, কত কী মনে আসে। কখনো বলেন, ‘এখানে ভালো লাগছে না। একটা কমলালেবু খেতে পারব?’ সঞ্জয় ভট্টাচার্য’র কাছে চেয়েছিলেন। ভূমেন গুহ’কে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এখানে কেন, এই রাতের বেলা, খুকি তো নেই দেখছি, আমি কোথায় আছি বলো তো।’ তিনি কোথায় আছেন! কোনো আলাদা কক্ষ মেলে নি, বারোয়ারী ওয়ার্ডে আসামী আর পোড়া রোগীর সান্নিধ্যে ব্যথায়, কষ্টে কেটেছিল শেষ দিনগুলি। পরে সেই ওয়ার্ডটিতেই কিছুটা ভদ্রমতো করে আড়াল করার ব্যবস্থা হয়েছিল। আরেক দিন বলেছিলেন, ‘লিখে রাখ আজকের তারিখটা, আজ থেকে গত এক বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। এখন ভোর, না সন্ধ্যে? আমি কী দেখতে পাচ্ছি জান? বনলতা সেন এর পাণ্ডুলিপির রং।’
সেদিন পাশে শুয়ে ছিল না বধুটি, শিশুটিও নয়, ততদিনে প্রেম-আশা মিটে গিয়েছিল জীবনের! ক্লান্তিটা বেশিই ভর করেছিল। ক্লান্তি ফুরায় একমাত্র মৃত্যুতে? এরকমটাই তাঁর কবিতায় তিনি লিখেছিলেন। অনেক দিনের কল্পনার লাশ কাটা ঘরে টেবিলের পরে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকবার গলিত ইচ্ছে বাস্তবের দৃশ্য হতে প্ররোচিত করেছিল হয়ত। প্রকৃতি ঘটনার দিন বেছে নিয়েছিল ১৪ অক্টোবর ১৯৫৪’র একটি অভিশপ্ত অপরাহ্নকে। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। জীবনানন্দের জীবনীকার প্রভাতকুমার দাস ঘটনাটির কথা এভাবে লিখেছেন, রাসবিহারী এভিনিউ এবং ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগস্থলে অকুস্থলে ছিল দুটো দোকান, ‘জলখাবার’ ও ‘জুয়েল হাউস’- এর সামনে দিয়ে রাস্তা পেরোতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। কিছুটা দূরে যে একটা ট্রাম, অবিরাম ঘণ্টা বাজিয়ে এগিয়ে আসছে সেদিকে খেয়াল নেই, হয়তো ডায়াবেটিসের জন্য সামান্য মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। গাড়ি যখন থামল, তখন তাঁর দেহ ক্যাচারের ভেতর ঢুকে গেছে। রক্তাপ্লুত অচৈতন্য দেহ উদ্ধারের কাজে এগিয়ে এলেন সেলি ক্যাফের মালিক চুনিলাল। জীবনানন্দকে ভর্তি করানো হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। তাঁর আরেক জীবনীকার ক্লিন্টন বি সিলি লিখেছেন, ট্যাক্সিতে করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে দেখা যায় দূর্ঘটনায় তাঁর বুকের পাজর ভেঙে গেছে, চিড় ধরা কণ্ঠাস্থি এবং চূর্ণবিচুর্ণ হয়ে পড়েছে পা।
১৪ তারিখ গড়াতে গড়াতে চলে গেল ২২ তারিখ রাত্রি সাড়ে এগারটার দিকে। হাসপাতালে উপস্থিত প্রিয়জনদের অনেকেই চোখের সামনে… রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাঙালি কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য, সাহিত্য জগতের অসম্ভব প্রতিভাসম্পন্ন কবি জীবনানন্দ দাশ পৃথিবীতে একসময় তাঁর শেষ নিঃশ্বাসটি ত্যাগ করলেন। পরের নিঃশ্বাসটি আর গ্রহণ করতে পারলেন না।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Reza — অক্টোবর ২৩, ২০১৭ @ ৯:০৯ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় লীনা দিলরুবা , আমার প্রিয় কবিকে নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Khalid Mohammad Sharif — অক্টোবর ২৩, ২০১৭ @ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ, সুখপাঠ্য এবং তথ্যবহুল। এধরনের আরো লেখা আশা করছি আপনার কাছ থেকে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মঈন — অক্টোবর ২৩, ২০১৭ @ ৪:১২ অপরাহ্ন

      জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে এমন চমৎকার লেখার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। গল্পের মতো করে জীবনানন্দ’র কথা পড়লাম, তাঁর কথা জানলাম। যত্ন করে লেখাটা তৈরি করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে ভাল কাজ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লীনা দিলরুবা — অক্টোবর ২৩, ২০১৭ @ ৬:২২ অপরাহ্ন

      আমার লেখাটি পড়ে যারা মন্তব্য করলেন, জনাব রেজা, খালিদ মোহাম্মদ শরীফ এবং মঈন, আপনাদের প্রীতি সহ শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

      জীবনানন্দের মতো অগ্রসরমান, বড়ো মাপের কবি সম্পর্কে লিখতে গেলে যে মাপের লেখক হতে হয় আমি তার কিছুই নই। শুধু তাঁকে ভালোবাসি বলে, তাঁর কবিতার বহুদিনের পাঠক বলেই তাঁকে নিয়ে লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছি।

      সুন্দর মন্তব্যের জন্য আপনাদের তিনজনকেই অশেষ ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশিস বড়ুয়া — অক্টোবর ২৮, ২০১৭ @ ৯:৫৪ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে লিখাটি অত্যন্ত চমৎকার, প্রাঞ্জল এবং তথ্যসমৃদ্ধ। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ। আরও লিখা আশা করি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com