স্মৃতি

আমার বন্ধুর মুখ

বিপাশা আইচ | 19 Oct , 2017  

Aniআমার অনেক দিনের বান্ধবী এ্যনি (Anne )। যার সাথে টিফিন টাইমে খাবার ভাগাভাগি থেকে শুরু করে কতো কিছুই না করেছি সারা জীবন। ও ক্লাসে আগে এলে পাশের সিট আমার জন্য রিজার্ভ থাকতো
। আমি আগে গেলেও ওরকমই হতো। কিছু দিন পরে ক্লাসের সবাই এটা জেনে গেল বলে কষ্ট করে জায়গা রাখতে হতো না।

বেশির ভাগ ও-ই টিফিন আনতো। সবচেয়ে প্রিয় টিফিন ছিল গরুর মাংস ভুনা ও ঘিয়ে ভাজা পরোটা। পরোটা আমার খুবই প্রিয় খাবার। সংগে গরুর মাংস থাকলে তো কথাই নেই। আহ জিবে জল এসে যায় এখনো। খালাম্মা ছিলেন রান্নায় খুব পটু। এ্যনির কল্যাণে ও বাড়ির সব খাবারই আমার রসনাকে তৃপ্ত করতো। শুধু কি বাসার টিফিন? কিনে খাওয়া আটকাবে কে? ডাসা পেয়ারা, সমুচা, সিঙ্গারা, জিভ লাল করা আইসক্রিম। কতো কি খেতাম।

আমরা যখন গিন্নীবান্নী হয়েছি তখনও বেড়াতে বেড়িয়ে খালাম্মার উত্তরসূরি এ্যনির হাতের মাংস পরোটা থাকতো আমাদের দুপুরের খাবার।

যে খাবার স্কুলে টিফিন হিসেবে আনা সম্ভব হতো না সেগুলো খাওয়ানোর জন্য আমাকে ওর বাড়িতে টেনে নিয়ে যেত। ওদের বাড়িতে যেদিনই যেতাম খাওয়া দাওয়াটা হতো ঈদ উৎসবের মতো।
আমাদের বাসার সামনে ছিলো বিশাল মাঠ। কতো যে বড়ো বড়ো গাছ ছিলো মাঠের চারপাশে । এতো এতো কাঠ গোলাপ ফুটে থাকতো। দুই বেনী দুলিয়ে ঘুরে ঘুরে গল্প করতাম আর সেগুলো কুড়াতাম। বিশাল দুটো তেঁতুল গাছ ছিলো সেখানে। এতোই বড়ো গাছ যে তেঁতুল পারার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি বেশির ভাগ সময়। টোকাইদের ধরে এনে রীতিমত ঘুষ দিয়ে কিছু তেঁতুল জোগাড় করতে হতো। কিন্তু তারপর আর পায় কে? ঝাল লবন দিয়ে,আহ তারপর শুধু জিবে জল।

আর ফুলগুলো? ফুলগুলো আর ফুল থাকতো না। মালা হয়ে বেনীতে, গলায়, হাতে দুলতো। আর আমাদের সব গোপন কথা জেনে যেতো। সেজন্য আমরা কখনো নালিশ করিনি। কারণ ফুলগুলো আমাদের গোপন কথা কোন দিন ফাঁস করেনি।
British Council চলে যেতাম মাঝেমধ্যেই। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফুলার রোডের বাসায় থাকতাম আমরা। সামনেই British council. ওখানে কি সুন্দর হিম হিম এসি। তখন আমাদের কারোর বাড়িতেই এসি ছিল না। বইপড়া ও বিনে পয়সার এসি দুটোই খুব লোভনীয় ছিল। মাঝে মাঝে নামকরা British movie গূলোও দেখতাম। সেগুলোও বিনে পয়সায়। তখনতো সোনায় সোহাগা। কতো যে ক্লাসিক মুভি দেখার সুযোগ হয়েছে তখন।
এ্যনির খুব একটা বই পড়ার অভ্যাস ছিলো না। আমার পাল্লায় পড়ে সেই বদভ্যাসও কিছুটা হয়েছিলো। মার্ক টোয়েন আর এডগার এলান পো ওকে গিলতে বাধ্য করে ছিলাম।

আরো অনেক নাম না জানা ফুলের সাথে বেগুনী রঙের জারুল ফুলে ভরে থাকতো গোটা এলাকা। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়াও কিছু কম রাজত্ব করতো না। হাটতে হাটতে গল্প করতে করতে সন্ধ্যা নেমে আসতো। খেয়ালই থাকতো না এনিকে বাসায় ফিরতে হবে। দুজন মিলে ছুটতাম এনির বাসার দিকে। ওদের বাসার কাছাকাছি পৌঁছে খেয়াল হতো আরো অন্ধকার হয়ে গেছে। এখন আমি ফিরি কিভাবে? কি বিপদ! কতো বোকা ছিলাম।
শেষ পর্যন্ত ভাইদের শরণাপন্ন হতে হতো সমস্যা সমাধানের জন্য। ওরা কেউ একজন পৌঁছে দেওয়ার বদলে জমানো পয়সা থেকে আইসক্রিম খাওয়ার পয়সা হাতিয়ে নিতো। কি যে দুষ্ট ছিল ওরা।

আমার মনে আছে একটা বাঘমার্কা সিকির জন্য আমার বড় দুই ভাই সবুজ ও সোহেল-এর সাথে কত যে হাতাহাতি করেছি। নিয়ম ছিলো যে কেড়ে নিতে পারবে তারই হবে পয়সাটা। এসব মনে করলে কি যে হাসি পায়।

আমাদের বাসার এমনকি আমার সমস্ত আত্মীয়স্বজন এ্যনিকে পছন্দ করত। তার পিছনে অনেক কারণ ছিল। কোন কারণের জন্য কে পছন্দ করত জানি না। তবে ও খুব ভালো ছবি আঁকতো। কাগজ ও কাপড়ে অসাধারণ সুন্দর ফুল বানাতো। এত সুন্দর কাপড়ের পুতুল বানাতো যে তেমনটি আমি কোনো প্রফেশনালদেরকেও দেখিনি। ওর কাছে আমি উল বোনা কুরুশ কাঁটার কাজ এমব্রয়ডারি, চুড়িদার পাজামা, পাঞ্জাবি বানানো শিখেছিলাম। আরো কতো কি শিখেছিলাম ঠিক নেই। ফেব্রিক পেন্টিং কোনোভাবে শিখে বাটিক ও ব্লক শিখতে গিয়ে চম্পট দিয়েছিলাম। আমার অতো ধৈর্য ছিল না।

আমার আব্বা খুব রাশভারী মানুষ ছিলেন। কিন্তু ওকে দেখলেই বলতেন, ” any body else? কেমন আছ তুমি? হা হা হা ” খুব মজা পেতেন যেন নিজের রসিকতায়।

আমার বন্ধু হলে কি আমার মা, বোন এষা, কন্যা খেয়া, জুয়েল সবাই ভালোবাসত ওকে।
বাসত কেন? এখনো বাসে। ও সবার বন্ধু, সবার ভালবাসার পাত্রী। আমার কি হিংসা আছে সে জন্য? না আমি হিংসুটে নই মোটেই। আমাদের অটুট বন্ধুত্বে ছায়া পড়েনি কখনো।

আমরা প্রায়ই গল্প করি। দেখা না হলে কি, ফোন তো আছে। গল্পের বিষয়ের কোনদিন কমতি হয়নি আমাদের। ও কিছুদিন ধরেই বলছিল নানান শারীরিক সমস্যার কথা। কিন্তু গল্পে গল্পে নিজেরাই ভুলে যাই সব। আড্ডা চলে অবিরাম।

কিন্তু বেশি দিন ভুলে থাকা গেল না। শ্বাসকষ্টসহ আরো অনেক ঝামেলা শুরু হল। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো ফুসফুসে অনেক পানি জমেছে। সংগে আরও সব জটিলতা। শুনে আমার ভিতর পর্যন্ত নড়ে গেলো। শুরু হল সীমাহীন যন্ত্রনা ও ছুটোছুটি।

ani-1আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যাবস্থা কতটা নির্দয় ও কঠিন আরো একবার হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। এ্যানির ফুসফুস থেকে পানি বের করতেই একমাস পার হয়ে গেল। বুকের দুই পাশে রিবের ভিতর ফুটো করে মোটা নল লাগিয়ে দেয়া হল। ঘোলাটে আর ঘন হয়ে যাওয়া পানি শুধু বের হতে লাগল দিনের পর দিন। ব্যাগ ভরে গেলে নতুন ব্যাগ। প্রায় নয় লিটার পর্যন্ত ঘন তরল বের হল। যেন আর শেষ হবে না। আমার প্রাণের বান্ধবি মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত। কষ্টের কোনো সীমা পরিসীমা থাকে না। সহানুভূতিহীন ডাক্তারদের কখনো মনেই পড়ে না একটু পেইন কিলার বা ঘুমের ওষুধ হলে বেচারির একটুখানি স্বস্তি হয়।
নন-মেডিকেল লোকজনেরাও বলতে লাগলো কোথাও ক্যানসার আছে নিশ্চয়ই, তা নাহলে ফুসফুসে পানি আসবে কেন? শেষ পর্যন্ত একজন ডাক্তার বুঝতে পারেন বায়োপসি করা দরকার।
শেষ পর্যন্ত এলো সেই অমোঘ ভয়াবহ সংবাদ -ক্যানসার। নন হচকিং লিম্ফোমা। হ্যাঁ, এ্যানি এখন যুদ্ধ করছে ক্যানসার নামক ভয়াবহ সেই রোগটির সাথে। কেউ তাকে জিগ্যেস করেনি এই যুদ্ধটা সে করতে চায় কিনা? এই যুদ্ধটা করার যোগ্যতা তার আছে কিনা? সে কি দোষ করেছে? কিছু না, কিচ্ছু না। তবু শুধু শুধু জোর করে ভয়াবহ এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাড় করিয়ে দেয়া হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে।

এ্যানি এখন ক্লান্ত বিধ্বস্ত। কেমোথেরাপির পর কিছু খেতে পারে না। মাথায় একটাও চুল নেই। ভ্রু পর্যন্ত নেই। কোথায় সেই মালা-দোলান বেনী? ভ্রু নেই বলে নিজেই মজা করে বলে “আমি এখন মোনালিসা”। এতো যন্ত্রনা, তবু ও কখনো কষ্টের কথা বলে না। সারাক্ষণ বলে সে ভাল আছে। হাসে। পাছে ওর কষ্টের কথা শুনে আমি মন খারাপ করি। আমি অসহায়, শুধু দেখি। এতোটুকু কষ্টও ভাগ করে নিতে পারিনা।

Flag Counter


4 Responses

  1. রশিদা আফরোজ says:

    খুব খারাপ। খুব খারাপ। একটা লেখা পড়ছি, সেইসাথে ঘুরে বেড়াচ্ছি নিজের শৈশব কৈশোরে…আচ্ছা ওরাও কি তেঁতুলের কচি পাতা লবণ গুঁড়ো মরিচে কচলে খেতো?… কী দারুণ সুখ সুখ ব্যাপার! মিষ্টি স্মৃতিতে ডুবে যেতে পারার আনন্দ…আচমকা চোখ ভিজে যাবে এটা কেমন কথা!… এই অসুখটা চেনা-অচেনা যারই হোক, মেনে নিতে পারি না, একটা অক্ষম অসহায় বোধ কাজ করতে থাকে…আমার প্রিয় বান্ধবীও ফুসফুস নিয়েই লড়াই করেছে, অর মাথাভর্তি চুল ছিল, বিয়ে বাড়িতে গেলে ভিডিও ক্যামেরা চুলের উপর উপুড় হয়ে পড়তো, কেমোথেরাপির পর দলা দলা চুল ওঠা ও সব চুল ফেলে দেওয়ার যন্ত্রণার কথা বলেছিল ও। আমার বান্ধবী সুস্থ হয়েছে, জবে ফিরেছে, বাচ্চাকে বড় করছে…। মন বলছে, আপনার বান্ধবীও সুস্থ হয়ে যাবে। ইনশাল্লাহ। আমি আশাবাদী। তখন ওকে আমার পক্ষ থেকে বলবেন, ” anybody else?”

  2. M. Ahad Chowdhury says:

    It’s really unbearable. Just pray to Almighty Allah to save her life, specially to continue your friendship everlasting in this world.

  3. অাহা!!! কি অদ্ভুত সুন্দর সব দিন; আহা কত সুন্দর এই জীবন- এমন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ‘আহা কেন এমন হয়, কেন এমন হতে হবে’ ভাবনায় শেষ হল আমার পড়া। শেষ পর্যন্ত ‘কেন এমন হতে হবে এই ভাবনাতে আটকা পড়ে গেলাম। বলা হয়ে থাকে অসুখ-বিসুখ না-কি মানুষের কর্মফল। জীবনে জেনে না জেনে-বুঝে না বুঝে প্রাণীর করা অকর্মের ফসল হচ্ছে ‘অসুখ’। এমনটাই জেনে আসছি….বলতে দ্বিধা নেই, পুরোপুরি না হলেও এই কথাটা আমি বিশ্বাসও করি। তবু যখন কেউ রোগে পড়ে, কারও প্রাণ যখন শোকে বিপর্যস্ত হয় তখন কেন যেন মন কাঁদে—

    এ্যানি ম্যাডাম সুস্থ হোক। অনেক অনেক দোয়া রইলো।

  4. অনেক অনেক দোয়া রইলো। ম্যাডাম সুস্থ হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.