সাক্ষাৎকার

যে পেল সেই রূপের সন্ধান

ফিরোজ এহতেশাম | 17 Oct , 2017  

tuntun১লা কার্তিক ১৪২৪ (১৬ অক্টোবর ২০১৭) ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৭তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়ায় আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনের লালন স্মরণোৎসব। এ উপলক্ষে টুনটুন ফকিরের এ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম।
২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথে একটি বাড়িতে টুনটুন ফকিরের সাথে আমার কথা হয়। যথাসম্ভব তাঁর ভাষা অক্ষুণ্ন রেখে কথপোকথনটি এখানে তুলে দিচ্ছি-
ফিরোজ এহতেশাম: বাউলদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে-‘আপন ভজন কথা, না কহিবে যথা-তথা, আপনাতে আপনি সাবধান’- ভজন কথা কহিলে সমস্যা কী?
টুনটুন ফকির: আসলে সাধনের যে কথা সে বড় গুপ্ত কথা, গোপন কথা। যে লোক, গোপনে সাধন করার যার ইচ্ছা জাগবে তার কাছে বলা যায়। বলা যাবে না এমন কোনো কথা না। ইশারা-ইঙ্গিতে ওটাকে বুঝায়ে দেয়া যায়। এবং সাধারণ মানুষকে ইশারা-ইঙ্গিতের ওপরই বোঝানো হয়। যেমন, ধর্মটা কী? বাউল মানে- বাও মানে বাতাস, উল মানে সন্ধান। বাউল বাতাসের সন্ধান করে। নাসিকাতে চলে ফেরে। বাউল, ফকির এসব একই স্তরেরই জিনিস। তো, আপন ধর্মকথা না কহিও যথা-তথা, তার মানে কী? আমার গুরু আমাকে যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথে আমি হইছি কিনা জানার পর তখন তিনি যোগ্য পাত্র পাইল একটা, যোগ্য পাত্র তিনি খুঁজে পান।

ফিরোজ: যোগ্য পাত্র ছাড়া এটা কাউকে বলা যাবে না?
টুনটুন: না। গুরুতে মনুষ্য জ্ঞান যার, অধপতন গতি হয় তার। গুরু কখনও মানুষ না। যে গুরুকে মানুষ ভাবে সে কখনও আল্লাহ পাবে না। কোনো কিছু পাবার আশায় প্রভুকে ডাকা বা আল্লাহকে ডাকা, ধর্ম করা… হ্যাঁ, পাবার আশায়, সব কিছু তো প্রভু তোমায় দিয়ে রেখেছে। তুমি আসার পূর্বে প্রভু তোমায় দিয়েছে। তুমি জানো না তাই। জ্ঞান প্রসারে দেখতে পাবে তুমি তোমার কী ক্ষমতা আছে। তুমি যে আমি আমি করছ, সেই আমির কী ক্ষমতা আছে। সব ক্ষমতার উৎসই হচ্ছে প্রভু।
ফিরোজ: এখানে কি গুরুকে আপনারা বলতেছেন প্রভু?
টুনটুন: গুরু মানে স্রষ্টা। তো সেই স্রষ্টাকে পেতে হলে, যেমন বলছে যে, ‘পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়, রূপকাষ্ঠের এই নৌকাখানি নাই ডোবার ভয়।’ রূপকাষ্ঠের নৌকা মানে রূপ, রূপের মানুষ। যে ভালো মানুষ সে রূপকাষ্ঠের একটা ভালো মানুষের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে তুমি… গুরুকর্ম যখন তুমি শিখে ফেলবে… তুমি যদি গুরুকর্ম না শিখেই গুরুকর্ম আরেকজনের কাছে ব্যক্ত করো এটাতে তোমার আরও ক্ষতি হবে।
ফিরোজ: পাপের পর্যায়ে চলে যাবে?
টুনটুন: মানে গুরুতে তোমার বিশ্বাস নাই।
ফিরোজ: বিশ্বাস নাই, আস্থা নাই…
টুনটুন: গুরুতে যার আস্থা নাই সে তো এরকম কথা বলতেই পারবে। আর যার গুরুতে আস্থা আছে সে কখনওই বলবে না।
ফিরোজ: আচ্ছা, এরকম একটা কথা আছে না যে, গুরুকে ধরলে সবকিছু জানা যায়?
টুনটুন: বাহ!
ফিরোজ: তো, গুরু কে, তাকে কীভাবে চিনব?
টুনটুন: গুরু হচ্ছে একজন মানুষ। ভজন পথে একজন মানুষ হয় গুরু। সাধন-ভজনের পথে একজন মানুষ হয় একজন মানুষের গুরু। সেই জানলেওয়ালা মানুষ ভক্তকে জানায় দিবে কী রূপ সাধনা করতে হয়, কীভাবে সাধনা করলে তুমি সেই স্তরে পৌঁছাতে পারবে। এগুলো গুরুকর্ম। এসব মানুষের কাছ থেকেই শিখতে হয়। এই মানুষকে যে বিশ্বাস করেছে সে মানুষই আল্লাহ দেখবে।
ফিরোজ: আচ্ছা, ‘যাহা আছে ভাণ্ডে (দেহভাণ্ডে), তা-ই আছে ব্রহ্মাণ্ডে’ এই কথাটা যখন বাউলরা বলে তখন কী বোঝাতে চায়?
টুনটুন: যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা আছে মানবভাণ্ডে। যেমন ব্রহ্মাণ্ডে চাঁদি, রূপা, সোনা, গহনা সব কিছু আছে। কী নেই? জ্ঞান নেই।
ফিরোজ: মানবভাণ্ডে সেই জ্ঞানটাও আছে।
টুনটুন: বাহ!
ফিরোজ: মানে, ব্রহ্মাণ্ডের চেয়েও বেশি আছে?
টুনটুন: হ্যাঁ, ওই জ্ঞান। জ্ঞান তো ব্রহ্মাণ্ডের নাই।
ফিরোজ: ওই জ্ঞানটা আমাদের অতিরিক্ত। ব্রহ্মাণ্ডের চেয়েও আমাদের তাহলে বেশি?
টুনটুন: অতিরিক্ত।
tuntun-1ফিরোজ: আত্মতত্ত্বের ব্যাপারটা কী?
টুনটুন: আত্মার খবর করা। আত্মতত্ত্ব মানে আত্মার ভেতরে আল্লাহ।
ফিরোজ: আত্মার ভেতরে আল্লাহ লুকানো?
টুনটুন: হ্যাঁ। আল্লাহ তো তোমার দেহের বাইরে নাই। ওই যে ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে তা তো মানবভাণ্ডেও। দেহেরই উপাসনা করা, দেহকে সুন্দর রাখা, দেহকে যত্ন করা, দেহকে ভজনা করা…
ফিরোজ: আচ্ছা লালনের গানে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয় ‘তিন’ শব্দটা, এই তিনের মাহাত্ম্যটা কী?
টুনটুন: আলিফ, লাম, মিম। আলিফে একজন, লামে একজন, মিমে একজন। তোমার ভিতর দেখো দিনি কয়জন আছে। দেখো তুমি গোনে গোনে। ভিতরে স্ত্রী-লিঙ্গ আছে। তোমার কাছে পুং লিঙ্গ আছে, আবার…
ফিরোজ: ক্লিব লিঙ্গ আছে।
টুনটুন: সবই আছে তোমার কাছে। কোনটা ব্যবহার করলে তুমি লাভবান হবা সেটা তুমি তো জানোই। তোমাকে সেইরূপ পথ অবলম্বন করতে হবে।
ফিরোজ: তিনের মাহাত্ম্যটা তাইলে বিশাল তো… আল্লাহ, মোহাম্মদ আর আদম?
টুনটুন: তিনের মর্ম সাধিলে হয় স্বরূপ দর্শন। একের যুতে তিনের লক্ষণ… লালন তার একটা গানে বলছেন-দ্বীনের ভাব যেদিন উদয় হবে/সে দিন মন তোর ঘোর অন্ধকার ঘুচে যাবে।
ফিরোজ: লালন সাঁইজির দর্শনটা কী, এইটা একটু বলবেন সংক্ষেপে?
টুনটুন: লালন সাঁইজির দর্শন হচ্ছে… আমি দেখেছি উনাকে, উনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, অপরূপ সে এক মানব…
ফিরোজ: কীভাবে দেখা হইল?
টুনটুন: আমি স্বপ্নে দেখেছি। আমি ঘুমের ঝোরেই দেখেছি।
ফিরোজ: ও, আচ্ছা-আচ্ছা।
টুনটুন: অপরূপ মানুষ। আল্লাহর রূপের কোনো শেষ আছে? আল্লাহর রূপটা হচ্ছে এমনই। আল্লাহ নিজে কোনো রূপ ধরেননি। আল্লাহ অনন্তের মধ্যে ঢুকেছে, কিন্তু একটা রূপ, গোপন রূপ আছে। যে পেল সেই রূপের সন্ধান সে ওই রূপ নিয়েই থাকবে। লালনের জীবন দর্শনটা হইছে মানবতাবাদী ধর্ম।
ফিরোজ: সাধুসঙ্গের বিষয়টা একটু বলেন। সাধুসঙ্গ করলে কী হয়?
টুনটুন: সাধুসঙ্গ করলে কী হয়? জ্ঞান হয়।
ফিরোজ: সাধুসঙ্গ করলে জ্ঞান হয়?
টুনটুন: জ্ঞান হয়। জ্ঞান লাভ করার জন্যে সাধুসঙ্গ। মানুষের জ্ঞানেরই অভাব, তাছাড়া সবই আছে।
ফিরোজ: বাউলধর্মের মূল টার্গেটটা কী, উদ্দেশ্যটা কী?
টুনটুন: আল্লাহ প্রাপ্ত হওয়া। সৃষ্টিকর্তা প্রাপ্ত হওয়া। টার্গেট।
ফিরোজ: লালনের পথে কী করে আকৃষ্ট হইলেন? আপনার গুরু কে?
টুনটুন: লালনের পথে আকৃষ্ট হইলাম লালন সাঁইজির কালাম শুনে। ‘কী হবে আমার গতি…’। সাঁইজির প্রতিটা গানই আকৃষ্ট করার মতো। প্রত্যেকটা অর্থবহ গান। লালন সাঁইজি বাংলা ভাষায় স্বআনন্দে মহাকাব্য রচনা করে দিয়ে গেছেন। আনন্দের সঙ্গে। তাই ধর্মটা হচ্ছে আনন্দ। যে ত্যাগ করেছে তার আনন্দ হয়েছে। আনন্দে সে হরি হরি করে বলবে… তার আর পেটে খিদে নাই, তার আর যম-যন্ত্রণা নাই, এই ভব কারাগারে তার আর কোনো যন্ত্রণা থাকে না। আমার গুরু নহিরুদ্দিন ফকির।
ফিরোজ: আপনি কখনও গান লেখেননি?
টুনটুন: আমি গান লিখতে গিয়ে দেখেছি, কিছু লিখতে গেলে লালন সাঁইয়ের কথাই চলে আসে। আমার প্রভুর কথাই চলে আসে, আর কারও কথা আসে না। অতএব, তখন থেকে জানি যে খালি গাইতে হবে, আমার জন্য লেখা না। তখন থেকেই আমি গাওয়ার চেষ্টা করি।
ফিরোজ: সহজ মানুষ কী?
টুনটুন: সহজ মানুষ এই যে, বিবেক।
ফিরোজ: বিবেক?
টুনটুন: সহজ মানুষের কোনো রূপ নাই। সহজ মানুষ খারাপ কাজ কখনও করে না। বিবেক কি কখনও খারাপ কাজ করে? ধর্ম করতে হলে নিজকে আগে জানতে হবে। নিজেকে জানাটাই ধর্ম।
ফিরোজ: অটল পুরুষের কথা যে আপনারা বলেন…
টুনটুন: অটল পুরুষ। যে ব্যক্তি সাধনার শীর্ষে পৌঁছে যাবে। যার আর কাম, ধাম, এই পৃথিবীর গন্ধ যার কাছে আর থাকে না, সে-ই হলো অটল পুরুষ।
ফিরোজ: জ্যান্তে মরা…
টুনটুন: হ্যাঁ, সে জ্যান্তে মরে গেছে।
ফিরোজ: জ্যান্তে মরে গেছে।
টুনটুন: প্রাণ থাকতে সে মরে গেছে একেবারে। আর ওর মরার ভয় নাই।
Flag Counter


7 Responses

  1. টুনটুন ফকির সাহেবের কথাগুলো ভালো লাগলো। অনেকেই অনেক কথা বলেন, তবে এত সহজ ভাবে-উদার মনে-প্রশস্ত দৃষ্টিতে জগতটা এমন করে দেখার চেষ্টা করাও নিরন্তর সাধনার ব্যাপার, এমনটা আমার মনে হয়। আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য যে নিরন্তর সাধনার চর্চা হক্কানি আলেম বা বাউলরা করে থাকেন তার অনুসারি হতে পারলেও জীবনের অন্তত আশি ভাগ পেরেশানি দূর হয়ে যায়……..

    জনাব ফিরোজ এহতেশাম সাহেবকে আন্তরিক ধন্যবাদ। বাউলদের কথা আরও জানতে চাই্।

  2. ফিরোজ এহতেশাম says:

    মুহম্মদ আবু রাজীণ, আপনার আন্তরিক প্রতিক্রিয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। টুনটুন বাউলের এই সাক্ষাৎকারটা তার পুরো সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ। এর পূর্ণাঙ্গ রূপসহ ১৩ বাউল-ফকিরের সাক্ষাৎকার নিয়ে আমার একটা বই প্রকাশিত হবে আগামী বইমেলায়, নাম ‘সাধুকথা’। সেখানে হয়ত ‘আরও জানতে’ পারবেন।
    জয়গুরু!

  3. ধন্যবাদ এই তথ্যটি দেয়ার জন্য। আমি অবশ্যই চেষ্টা করব বইটি সংগ্রহের জন্য।

    প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করি, আমি নিজেও লেখালেখির চেষ্টা করি। কিছু টিভি নাটক লিখেছি, যা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার হয়েছে। কিছু প্রচারের অপেক্ষায় আছে।কিছু গল্প ছাপা হয়েছে ক’য়েকটা লিটল ম্যাগ-এ। আমাদের ফোক সংগীত, বিশেষ করে সাঁই জি’র ভাব আমি আমার লেখায় তুলে ধরতে চাই- এ ব্যাপারে আপনার সাহায্য কামনা করছি। অাসলে আমি নিজে আগে বুঝতে চাই সাঁই জি কে…..

  4. ফিরোজ এহতেশাম says:

    বাহ! তাহলে তো সেটা বেশ ভালো কাজ হবে। আমি আমার পক্ষ থেকে আপনাকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করতে চাই।

  5. আপনার সাথে কি উপায়ে যোগাযোগ করা সম্ভব, দয়াকরে জানালে উপকৃত হব। সম্ভাব্য একটা উপায় হিসেবে আমার ফোন নম্বরটা অাপনাকে দিলাম-০১৭১১৩৩৮৮২৮।

    ধন্যবাদ।

  6. মোস্তাফিজুর রহমান সুমন says:

    (লিখতে গেলেই লালন সাইজির কথা চলে আসে)। ভাল লাগল এই কথাটি।

  7. ফিরোজ এহতেশাম says:

    ধন্যবাদ মোস্তাফিজুর রহমান সুমন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.