প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য

কাজুও ইশিগুরো: ১৯৮৯-এ ম্যান বুকার , ২০১৭-এ নোবেল বিজয়

আবদুস সেলিম | 15 Oct , 2017  

unnamed২০০৯ সালে আমি আমার এক ইংরেজি ফিচারে (৯ই অক্টোবর ২০০৯-এ ‘স্টার ইউকএএন্ড’ প্রকাশিত) কাজুও ইশিগুরোর প্রসঙ্গে কিছু মন্তব্য করেছিলাম। সেখানে বলেছিলাম ঠিক কবে আমি তার লেখা পড়েছি আমার স্মরণে নেই–সম্ভবত ১৯৮৯-এ লেখা তার ‘দ্য রিমেইন্স অফ দ্যা ডে’ উপন্যাসটিই যেটি ঐ বছরই ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছিল– আমার প্রথম পড়া কাজুওর লেখা। পড়েছিলাম ১৯৯০ সালে এবং বলতে দ্বিধা নেই, আমার এই উপন্যাস পড়াটি কোন বিচারেই সুখকর ছিল না এবং ফলে তার লেখা অপরাপর সাহিত্যকৃতি নিয়ে আমি আর উৎসাহিত বোধ করিনি। কাজুও সম্মন্ধে আমার কৌতুহলের সেখানেই সাময়িক অবসান ঘটে। আমার এই মনোভাবের সমর্থন পরবর্তীতে খুঁজে পাই ‘দ্য টাইমস্’ পত্রিকায় প্রকাশিত নীল মুখার্জির সমালোচনা নিরীক্ষায়। তিনি লিখেছিলেন, কাজুও ইশিগুরো-র পাঁচটি ছোটগল্পের সংকলন ‘নকটার্নস্’ প্রসঙ্গেঁ, “… কাজুও ইশিগুরো তর্কাতিতভাবে অস্পষ্টতা, প্রান্তিক অবস্থান এবং অবিরাম পরিবর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব।” স্পষ্টতই বোঝা যায় নীল-এর মন্তব্য কূটাভাস আকীর্ণ এবং স্ববিরোধীও বটে কারণ একজন গল্প-উপন্যাস লেখক তার গল্পগাঁথুনীতে অস্পষ্ট, প্রান্তিক এবং অবিরাম পরিবর্তমান হয়েও প্রতিভাবান হতে পারে তার উদাহরণ বেশ অপ্রতুল।

অবশ্য উপরোক্ত সমালোচনাটি পড়েই আমি ২০০৯ সালে আরও একবার কাজুও ইশিগুরো পড়ায় উদ্বুদ্ধ হই। আমার এক পরদেশি সংযোগের মাধ্যমে বইটি সংগ্রহ করি। আগেই বলেছি বইটি এক ছোটগল্প সংকলন। সর্বমোট পাঁচটি গল্প সম্বলিত এই বইয়ের একটি উপনামও আছে–‘ফাইভ স্টোরিজ অব মিউজিক এ্যান্ড নাইটফল’-এই সংকলনের মূল শিরোনাম ‘নকটার্নস্’-এর সাথে মিল রয়েছে, যার অর্থ, ‘স্বপ্নিল সংগীতাংশ’। এ বইটি পড়ার অভিজ্ঞাও তেমন আনন্দদায়ক ছিল না আমার যদিও লেখক ভালবাসা, সংগীত এবং সময়ের গতিময়তার কথা পাঁচটি গল্পেরই প্রতিপাদ্য রূপে উত্তম পুরুষীয় বৃত্তান্তে লিপিবদ্ধ করেছে। এই বৃত্তান্তলিপিকে কাজুও ইশিগুরো সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘অদ্যন্ত এক সমরূপী, সংগঠিত প্রক্ষেপ রূপে’ অর্থাৎ পুরো সংকলনে এক ঐক্যতানের অন্তস্রোত পাঁচটি গল্পকে একীভূত করেছে। এই অভূতপূর্ব পরিকল্পনাটিই কাজুও ইশিগুরোকে লেখকরূপে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করে। সম্ভবত ২০১৭ সালে তার সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পাবার একটি অন্যতম মানদন্ড এই স্বাতন্ত্র্য।

কাজুও ইশিগুরোর জন্ম নাগাসাকি, জাপানে। তার পিতামাতা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের জন্য ১৯৬০ সালে চলে আসে। কাজুও ইশিগুরোর বয়স তখন পাঁচ বছর। তার বেড়ে ওঠা এবং পড়াশুনা ইংল্যান্ডে এবং জন্মভূমি নিয়ে কোনো অতীতবিধূরতা তার কোন লেখাতেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়নি যেমন পেয়েছে প্রবাসী চীনা লেখক গাও শিং জিয়ান এবং আফগান লেখক খালেদ হোসাইনির লেখায়। তবুও আমার মনে হয়েছে তার ভেতরে অতীত নিয়ে একটি চাপা দুঃখবোধ এবং স্নেহময় অনুভূতি কাজ করেছে ১৯৮৯ সালে রচিত, বুকার পুরষ্কারপ্রাপ্ত ‘দ্য রিমেইন্স্ অফ দ্য ডে’ উপন্যাসে। উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও গল্পের পরিপ্রেক্ষিত যুদ্ধ পরবর্তী (দ্বিতীয়) ইংল্যান্ডকে নিয়ে যেখানে এক বয়ষ্ক ইংরেজ খানসামার কথা বলা হচ্ছে। সে স্মৃতিচারণ করছে তার সেই কর্মজীবনের যে কর্মজীবন ছিল যুদ্ধের এবং ফ্যাসিবাদের উত্থানের। পুরোটাই তার মোহমুক্তির উপাখ্যান। মনে রাখা প্রয়োজন জাপান ফ্যাসিবাদের সমর্থক হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সে শাস্তি ভোগ করেছে তারই হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বিস্ফোরণ– তারই এক অন্তছায়া বোধ হয় কাজুও ইশিগুরোর শোনিতে অজান্তে প্রবিষ্ট ও প্রবহমান হয়েছে। কারণ তার জন্ম তো সেই নাগাসাকিতে যেখানে পরমাণু বোমায় অগণিত মানুষ মারা গেছে। যদিও ‘নকটার্নস’- এর পাঁচটি গল্পের একটিতেও কাজুও কোনো প্রকার অতীতবিধূরতার প্রকাশ ঘটায়নি, গভীরে ইংরেজ আভিজাত্যের একঘেয়েমী (যেমন ডি. এইচ. লরেন্স–এর ‘লেডী চ্যাটারলিজ লাভার’-এ বর্ণিত) মৃদুভাবে হলেও উপস্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত হয়ে কাজুও ইংরেজ আভিজাত্যে অবগাহিত হতে পেরেছে হয়তো।

কাজুও ইশিগুরোর একটি বাণী অবশ্যই আছে। আমার কাছে তাৎক্ষণিক যেটি ধরা পড়েছে সেটি হলো– মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং জীবনের অপূর্ণতার কারণে এক দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ জীবনযাত্রার সাথে সন্ধি করে বেঁচে থাকা। সম্ভবত এই দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ জীবনযাত্রার সাথে মানিয়ে চলাটাই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের নিয়তি।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.