নৈঃশব্দের সংস্কৃতি: কথা না বলার যতো অজুহাত

পূরবী বসু | ১৬ অক্টোবর ২০১৭ ৭:৩১ অপরাহ্ন

comunicatonআধুনিকতা কিংবা ভদ্রতার আরেক নাম কি পরস্পরের সঙ্গে কথা না বলা? লিখিত রূপে কিংবা মৌখিকভাবে অন্য কারো সঙ্গে নিজের কথা বা ভাবের আদানপ্রদান না করাই কি আজকের সভ্যতা? চারদিকে দেখে শুনে তো তাই মনে হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, কী ব্যক্তিগত পর্যায়ে, কী কর্মক্ষেত্রে, কী অফিস-আদালতে-ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে, আজকের দিনে কেউ যেন কারো সঙ্গে একান্ত বাধ্য না হলে কথা বলতে চায় না। অন্তত এখানে, এই মার্কিন মুল্লুকে। যেহেতু জগৎ জুড়ে অনেক তরঙ্গেরই উৎস এখানে যা অতিদ্রুত তরঙ্গায়িত হয়ে মৃদু থেকে শুরু করে বিশাল আকারের ঢেউ তোলে আমাদের মতো সমাজে, ভাবছি এই ছোঁয়াচে রোগটির আক্রমণ যদি প্রতিহত করতে না পারা যায়, আসলেই কী হবে আমাদের প্রাণপ্রিয় আড্ডার, নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতো যা নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি অনুক্ষণ? আড্ডা হলো সেই বস্তু যা দিয়ে শূণ্য থলে বগলে নিয়ে, জাগতিক বা মূল্যবান কিছু না থা্কা সত্বেও কথার ফুলকি দিয়ে ভরে রাখি জীবন। আড্ডা দিতে দিতে আমরা স্বপ্নের ঘোরে প্রবল জ্যোত্স্নার আলো ক্রমাগত চষে বেড়াই, ঘুরে বেড়াই বন্ধুর বাইরের ঘরে অথবা পেছনের খোলা মাঠে, তছনচ করি মেঘলা ঘোলা ঘোলা আকাশের নিচে সরু বুনো পথ, কিংবা বৃষ্টিস্নাত প্রভাতে দিঘির কিনারায় হেলে পড়া হিজল গাছের ডালে শাখামৃগের মতো ঝুলতে ঝুলতে কথার খৈ ফোটাই। আড্ডার রূপ, রস, আনন্দ, আবেগ, উত্তেজনা আমাদের বাঁচার রসদ – আরেকটি নতুন ভোরে জেগে ওঠার প্রত্যয়-প্রেরণা। কথা ছাড়া আড্ডা কী করে সম্ভব? আড্ডা মানেই তো একটানা কথা বলা-নিরর্থক গল্পগুজব, তলাবিহীন তর্ক, পরনিন্দা, নিরন্তর হাসি, ঠাট্টা, কৌতুক, কাচা গলায় প্রিয় সুর ভাজার নিরলস ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

ভাবি, এই নৈঃশব্দের সংস্কৃতি কি পরোক্ষে আপন চিন্তা, মনোভাব বা অনুভূতি পাশের মানুষটির কাছে, প্রিয় বন্ধুর কাছে খুলে ধরার, প্রকাশ করার অনীহা বা অনাগ্রহই প্রমাণ করে না? বহুকাল ধরেই একটি মন্তব্য লেখালেখির জগতে গুঞ্জরিত হয়ে আসছে। বলা হয়, সাহিত্য রচনায় পুরুষ লেখক আর নারী লেখকের এক মৌলিক পার্থক্যের কথা। কথিত আছে, যার সত্যতাও অনেক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যে নারীদের লেখায় থাকে অনেক আবেগ, তারা সাধারণত স্পর্শকাতর। নারীরা নিজের ও অপরের বোধ, অনুভুতির হেরফের, বিচিত্র মনোভাব ও তার প্রকাশভঙ্গির কথা বিষদভাবে প্রকাশ করতে ভালোবাসে। মানুষে মানুষে সম্পর্ক নিয়ে তারা বেশি কথা লেখে। অন্যদিকে পুরুষ লেখকরা অনুভব প্রকাশে সংযত, পারস্পরিক সম্পর্কের চাইতে তাদের লেখায় ঘটমান জগৎ, বস্তু ও পরিপার্শ্ব, রাজনীতি, বেশি উপস্থিত থাকে। অনুভূতির প্রকাশের চাইতে কর্মের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষন তাদের রচনায় অপেক্ষাকৃত বেশি প্রাধান্য পায়।

আজ চারদিক দেখাশোনা করে, ভালোমতো লক্ষ্য করে, বুঝতে চেষ্টা করে আমার মনে হচ্ছে, কথামালা নির্মাণের এই দার্শনিক দ্বন্দ ও বিভাজনে আমরা, নারীরাও, যেন আস্তে আস্তে পুরুষের মতো হয়ে যাচ্ছি, যার অর্থ পুরুষালি মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো নারীরাও অর্জন বা গ্রহণ করতে শুরু করেছে ইদানীং। আর যারা স্বাভাবিকভাবে আগে থেকেই ছিল পুরুষ, তারা আরো কঠোর পুরুষ, আরো কঠিন লেখক হয়ে উঠছে। আগের মতো দিলখোলা, আত্মভোলা আর নেই। অন্যের জন্যে চিন্তাভাবনা বা সময়দান সংকুচিত হয়ে আসছে। উন্মুক্ত বিশাল আকাশের নিচে বৃহৎ মানব পরিবারের স্থলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একক ও ছাড়া ছাড়া, বেড়া দেওয়া, আলাদা ঘুপচিতে মানুষ একভাবে নিভৃতিতে বাস করতে শুরু করেছে। তারা ধীরে ধীরে এবং ক্রমশ নিজের ভেতর গুটিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির খোলসে আটকা পড়ে বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশে আর বেরুতে পারছে না। অন্য মানুষের সঙ্গে চলাচল, যোগাযোগ, দেখাশোনা, কথাবার্তা কমে যাচ্ছে।
আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে এক ডাচ সমাজ-মনোবিজ্ঞানী বেশ কিছু সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক উপকরণের পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর যাবতীয় দেশগুলোকে দু’টি লিঙ্গে ভাগ করেছিলেন: নারী-দেশ ও পুরুষ-দেশ। নারী দেশের অত্যাবশ্যক বৈশিষ্ট্য ছিল সেসব দেশ যুদ্ধবিমুখ, শান্তিকামী, সাধারণ মানুষের ও প্রতিবেশী দেশের কল্যাণেও তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সদাব্যস্ত, জনহিতকর বহু কর্মযোগের সম্ভার সেখানে, প্রতিযোগিতার চাইতে সংবেদনশীলতা, সহমর্মিতা তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবার ভিত্তি। এসব বিচারে যুদ্ধবাজ, আত্মমুখী, পুরো সমাজের চেয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতায় বেশি বিশ্বাসী আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, ইটালী, জার্মানীকে বলা হয়েছিল পুরুষ-দেশ। এসব পুরুষ-দেশ মানুষের মধ্যে সমহমর্মিতার চাইতে প্রতিযোগিতার মনোভাব টিকিয়ে রাখতে বেশি পছন্দ করে। জাগতিক বিভিন্ন উপকরণ/সামগ্রী আহরণের সোপান হিসেবে ব্যক্তি মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। শ্রেণী সচেতনতা উস্কে দেয়। নারী রাষ্ট্রের উদাহরণ নরোওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্কের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। এছাড়া অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ড, হাঙ্গেরীও নারী-দেশ।
একটা সময় ছিল, যখন চিঠি ছিল মনে্র ভাব বা ব্যক্তিগত তথ্য আদানপ্রদানের প্রধান মাধ্যম। জীবন-ঘনিষ্ঠতার কথা চিন্তা করলে – ব্যক্তি পর্যায়ে পারস্পরিক যোগাযোগের কথা ভাবলে সামনাসামনি বসে কথোপকথনের পরেই ছিল চিঠির স্থান। সেই সময় পত্রসাহিত্য ছিল মূলধারার অন্যতম সাহিত্যউপাদান। মানুষে মানুষে বন্ধন রচনার এক মস্ত বড় সেতু ছিল পারস্পরিক চিঠি-পত্রের আদানপ্রদান।
এই প্রসঙ্গে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা লিখি। আমরা গত সাড়ে সাত বছর ধরে কলোরাডোতে বসবাস করছি। এবার অনেকদিন পরে মাসাধিক কালের জন্যে নিউ ইয়র্কেগিয়ে থেকে এলাম। কলোরাডো যাবার আগে নিউ ইয়র্কে-ই বাস করতাম আমরা। এবার নিউ ইয়র্ক যাবার পরিকল্পনায় অন্যতম প্রধান করণীয় ছিল, সেখানে দেড় যুগ আগে থেকে রক্ষিত প্রায় পঁয়তাল্লিশটি বড় নড় কার্ডবোর্ড বাক্সগুলোর সব খুলে দেখা কী রেখে গেছি ওখান্। প্রয়োজনীয় বা মূল্যবান কিছু রয়েছে কিনা। যদি থাকে সেগুলো নিয়ে এসে বাকি সব জঞ্জাল ফেলে দিয়ে স্টোরেজ পরিস্কার করে দিয়ে আসা। কেননা এতোদিনে নিশ্চিত হয়েছি নিউ ইয়র্কে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে আবার ফিরে যাবার সম্ভাবনা খুব-ই ক্ষীণ। আর এই প্যাক করা বাক্স বা কার্টুনগুলো সাড়ে সাত বছর আগে কলোরাডো যাবার আগে প্যাক করা নয়। প্রায় পনেরো বছর আগে যখন কাজের জায়গার কাছাকাছি থাকার উদ্দেশে নিউ ইয়র্ক শহর ছেড়ে শহরের উপকন্ঠে এই গ্রামে উঠে এসেছিলাম, তখন-ই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম এগুলো। কয়েকটি খুলে ভেতরের জিনিসপত্র ব্যবহার করলেও বাকি বেশির ভাগ বাক্সই কোনদিন আর খোলা হয়নি। এবার গিয়ে এতো বছর পরে অবশেষে একটি একটি করে থরে থরে সাজানো আঠালো টেপ দিয়ে সুচারুরূপে বেঁধে রাখা বাক্সগুলো খুলতে শুরু করলাম। আশ্চর্য লাগে ভাবতে এগুলোর ভেতর কী রয়েছে, কিছুই আর এখন মনে করতে পারছিলাম না। বিগত বছরগুলোতে দৈনন্দিন কাজেকর্মে কোন দিনই কোন কিছুর প্রয়োজন হয়নি সেখান থেকে, কিছুরই অভাব বোধ করিনি। এ বাক্সগুলোর ভেতর যা রয়েছে সেসব কোন কিছু ছাড়া অর্থাৎ তা না খুঁজে বা না পেয়ে যখন দেড় দশক কেটে গেছে, কোনদিন কোন জিনিসের খোঁজ-ও করিনি কেউ, বুঝেছিলান, বাকি জীবন-ও দিব্যিকেটে যেতো এসবের কণামাত্রউদ্ধার না করেই। কিন্তু যখন সব খুললাম মনে হলো এ আমার চেনা পৃথিবীর সব অতি পরিচিত ও প্রিয় উপকরণ। এগুলোর সবকিছুর-ইযে দরকার আমার- সব-ই অতি প্রিয়, প্রতিটি বস্তুর সঙ্গেইলেপ্টে আছে কোন না কোন প্রিয়জনের বা একান্ত নিজের কিছু জ্বলন্ত স্মৃতি । এখান থেকে এক টুকরো কাগজও যেন ফেলা যায় না। সামান্য ঘরবাড়ির সাজাবার টুকিটাকি, কিছু বাসনপত্র, রান্নার জিনিস ছাড়া মূলত ছিল সেখানে অনেক বই (যদিও কলোরাডো যাবার সময়েও সঙ্গে অনেক বই নিয়ে গিয়েছিলাম।), বাচ্চাদের অতি প্রিয় কয়েকটা খেলনা যেমন মেয়ের তখনকার দিনের অতি লোভনীয় ক্যাবেজ প্যাচকিডডল, ছেলের ব্যাটারি পরিচালিত ঘুরানো প্যাঁচানো ট্র্যাকসহ ইঞ্জিনে শব্দ করা ট্রেইনসেট, ওদের ছোটবেলায় কাঁচা হাতে লেখা কবিতা, গল্প, রচনা, তাদের স্বহস্তে লিখিত ডায়েরি, রঙ্গিন ছবি, ম্যাগাজিন, নিজেদের পুরনো হাতেলেখা মেনাস্ক্রিপ্ট, সেলাইয়ের উপকরণ, ধাতুর ও কাচের চুড়ি, কাঠের ও মাটির গয়না, মেয়ের অসমাপ্ত তৈলচিত্র, শিক্ষকদের মন্তব্যসহ বাচ্চাদের রিপোর্ট কার্ড, তাদের নানা অর্জনের সার্টিফিকেট যার দিকে এখন তারা ফিরেও তাকাবে না জানি, কিছু মেডিকেল রিপোর্ট, পে স্টাব, বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত আমার নিজের বিভিন্ন আর্টিকেলের রিপ্রিন্ট, অন্যদের লিখিত কিছু জরুরী বিজ্ঞান পেপার ও জার্নাল যা একসময় আমার গবেষনার কাজে লাগতো,আর সবচেয়ে মূল্যবান বন্ধু ও পরিবার পরিজনের বেশ কয়েকটি ছবির অ্যালবাম, সেই সঙ্গে তাদের গুচ্ছগুচ্ছ চিঠি। বুঝি এ সব-ই জাগতিকভাবে আজ প্রায় মূল্যহীন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে নিজের কাছে মহা মূল্যবান। ফলে সব জিনিসপত্র বোঝাই বাক্সগুলো পুনরায় বন্ধ করে বহু টাকা খরচ করে সেগুলোকে ১৮৫০ মাইল দূরে ডেনভার, কলোরাডোতে নিয়ে আসি। মনে মনে ভাবি,দ্বিজেনদা(দ্বিজেন শর্মা), আনোয়ার ভাই (আলী আনোয়ার), বজলু ভাই (বজলুর রহমান) তো চলে গেলেন। এমন করে চিঠি আর লিখবেন না তাঁরা। বিশেষ করে দ্বিজেনদা তাঁর অতি স্নেহের জেপিকে অথবা আমাকে ছোট ছোট হরফে কী বড় বড় চিঠিই না লিখতেন রাশিয়া থেকে। সেসব আর কখনোই লিখবেন না তিনি। কিন্তু যাঁরা আজো বেঁচে আছেন, যেমন মনিদা (হায়াৎ মামুদ), শাহরিয়ার কবির, মুনিরা কায়েস, শফি আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, যাঁরা এতো সুন্দর হাতের লেখায় কাঁটাছেড়া ছাড়া এতো বড় বড় এতোগুলো চিঠি লিখেছেন জ্যোতিকে, আমাকে, অথবা দুজনকেই,তাঁরাও কি আর লিখবেন চিঠি? কখনো? এমন বিস্তৃত করে, টান টান লম্বা লাইনে, সুন্দর হাতের লেখায়, আর কোনদিন? না, লিখবেন না। চিঠি লেখার দিন শেষ হয়ে গেছে।ফলে এগুলো এখন মহামূল্যবান সম্পদ আমার কাছে (কালের বিচারেও), যা আর কখনো কোথাও পাবো না।
সময়ের বিবর্তনে একসময় চিঠির জায়গা করে নিয়েছিল টেলিফোন। এর আগে কেবল ইমার্জেন্সীর জন্যে তোলা থাকতো টেলিগ্রাম তো বটেই, দূর পাল্লার টেলিফোনও। টুংটাং বা গটাগট শব্দ করে অপারেটরের মাধ্যমে টেলিগ্রাম করার প্রধান এবং আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য ছিল কত অল্প শব্দে জরুরী বার্তাটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌছে দেয়া যায়। কেননা শব্দ প্রতি খরচ নির্ধারিত হতো। রুটিন টেলিগ্রাম না হলে , যেমন গদবাঁধা, “MOTHER SiCK COME SHARP”, প্রতিটি টেলিগ্রাফ করার আগে দুই তিনবার ড্রাফট করা হতো যাতে শব্দ আরো কমানো যায়, কিন্তু অর্থটা স্পষ্ট বোঝা যায়। মনে পড়ে মনিদাকে টেলিগ্রাম করার সময় বা তার আমাদেরকে টেলিগ্রাফ করার সময় আমরা একটি শব্দের জন্যে পয়সা না দিয়ে টেলিগ্রাফ অফিসকে আইনসঙ্গতভাবে কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঠকিয়ে খুব মজা পেতাম। অনেকেই জানেন, মনিদার স্ত্রীর নাম খুকু। আমরা তাদের একসঙ্গে সম্বোধন করতাম খুকুমনি বলে। মনিদাও টেলিগ্রামের শেষে লিখতো খুকুমনি। ভিন্ন ভিন্ন খুকু ও মনি লিখলে একটির বদলে দুটি শব্দ হয়ে যেতো। প্রসঙ্গটা মনে পড়লো এজন্যে যে যোগাযোগের বড় মাধ্যম টেলিগ্রাফ তো ঘোষনা দিয়ে বহু আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সম্ভবত ফ্যাক্স মেশিন আসার পর পরেই। টেলিগ্রাফের দরকার ফুরিয়েছিল। তাই ওটা আর নেই।

এখন টেলিগ্রাফ মেশিন যাদুঘরে অ্যান্টিক যন্ত্র হিসেবে শোভা পায়। টেলিগ্রাফ চলে যাবার পরে আর মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার আসার পরে মোবাইল টেলিফোনের, বিশেষ করে অ্যাপলের আই-ফোনের, রমরমা বাজারের-আধিপত্য চলছে অনেকদিন। আর সেই সঙ্গে কম্পিউটারে ই-মেইল এসে চিঠি লেখার, পত্র সাহিত্যের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
এমন একটা সময় ছিল যখন ঢাকা শহরেও ঘরে ঘরে টেলিফোন ছিল না। যাদের ছিল (ল্যান্ড ফোনের সময়কার কথা বলছি) তারাও অতি প্রয়োজনেই তা ব্যবহার করতেন, বিশেষ করে দূর পাল্লায়। বাকি সময় এম্ব্রডয়েরি করা বিশেষ ধরণের কাপড়ের ঢাকনী দিয়ে কালো রঙের বড়সড় টেলিফোন সেটটিকে সযত্নে ঢেকে রাখা হতো। আমেরিকার পুরনো দিনের সিনামাতেও দেখা যায়, কিছু নারীর চাকরীই ছিল ঘরে ঘরে এসে সপ্তাহে একদিন করে টেলিফোন সেটটি পরিস্কার করে মুছে দেওয়া। তাহলেই বোঝা যায় কী মুল্যবান কী পরিমাণ যত্নের জিনিস মনে করা হতো টেলিফোন নামক যন্ত্রটিকে। আরেকটি জিনিস ছিল তখন যা আজকের মানুষ হয়ত চিন্তাও করতে পারবে না। সত্তুর দশকের গোড়াতেও প্রতি ঘরে টেলিফোন লাইন দেবার সামর্থ্য ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে অপেক্ষাকৃত কম বিত্তবানদের কম খরচে শেয়ার্ড টেলিফোন লাইন দেওয়া হতো তখন। মানে একই লাইন ব্যবহার করতো অপরিচিত দুই বা তিনটি পরিবার। শর্ত হলো, একজন যখন তা ব্যবহার করবে অন্যজন তখন তা ব্যবহার করতে পারবে না। প্রাইভেসীর ব্যাপারে অতি সজাগ ও সতর্ক আজকের লোকজন ভাবতেও পারবেন না, ছাত্র অবস্থায় সস্তা শেয়ার্ড টেলিফোন সার্ভিস নিয়ে কতো বিড়ম্বনার ভেতর দিয়েই না যেতে হয়েছে আমাদের। সন্ধায় ঘরে ফিরে কোন বন্ধুকে ফোন করবো। রিসিভার তুলে দেখি অচেনা অজানা আমাদের শেয়ার্ড টেলিফোনের পার্টনার আমেরিকান এক লোক মনের সুখে তার প্রেয়সীর সঙ্গে দীর্ঘ প্রেমালাপ জুড়ে দিয়েছে,ডরিসডের পুরনো সিনেমাতে(খুব সম্ভবত “পিলোটক” ছবিতে)যেমনটি দেখা গেছে। পর পর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পর-ও যখন লাইন খালি পাই না, তাদের কথার ভেতর ঢুকে পড়ে কখনো সখনো বিনয়ের সঙ্গে বলতে বাধ্য হয়েছি তারা যেন এবার ফোনটি দয়া করে ছাড়েন কেননা জরুরী একটি কল করতে হবে আমাকে। তখনকার দিনে তাই কেউ ইচ্ছে করলে অন্য কারো কথোপকথনে কান পেতে পারতো, যদি তেমন অতি উৎসাহী হতো কেউ। তবে নিঃসন্দেহে সেটা অনৈতিক ও অভদ্রতা।
কিন্তু এতো সাধের যে টেলিফোন, যে টেলিফোনে প্রিয়জনের ডাক পাবার আশায় আজো হাপিত্তেশে বসে থাকি, আজকাল লক্ষ্য করছি, অনেকেই আর সেই টেলিফোন কল ধরতে চায় না। অন্যের খেয়াল খুশিমতো করা সময়ে-অসময়ের ফোনে নিজেকে কথা বলতে বাধ্য করাকে তারা অবাঞ্ছিত ও অনাহুত আচরণ বলে মনে করে। আমার মেয়ে ও তার বন্ধুদের বলতে শুনি, নিজের খুশিমতো যখন তখন অন্যকে ফোন করাটা নাকি “ভেরি রুড।” এটা অন্যের ব্যক্তিগত স্পেসে সরাসরি আক্রমণ- অপ্রিয় হামলা। তাহলে কী করতে হবে আমাদের, অসহায় জিজ্ঞাসা। উত্তর খুব সহজ। টেক্সট মেসেজ কর। টেক্সটে জানাও যা ফোনে বলত চেয়েছিলে। যাকে টেক্সট করা সে তার অবসরে, তার সুবিধামতো সময়-সুযোগ করে তা পড়বে। ইচ্ছা হলে জবাব দেবে, কোন চাপে থাকবে না। আর একান্তই যদি ফোন করতে ইচ্ছে হয় আগে থেকে টেক্সট মেসেজ করে জানাও অমুক দিন অমুক সময় আমি তোমাকে ফোন করবো। সেটা যদি প্রাপকের কাছে সুবিধার মনে না হয় আগে থেকেই সে জানিয়ে দিতে পারে ঐ সময় সে ব্যস্ত থাকবে, তাকে পাওয়া যাবে না।
মোদ্দা কথা। ইদানীং এখানকার লোকজন, বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়, ফোনে কথা বলতে চায় না অথচ তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই সারাক্ষণ স্মার্ট ফোন রয়েছে এবং ২৪ ঘন্টায় এক মিনিট-ও ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না তারা। আমি এক তরুণীকে জানি কোমোডে বসেও ফোন নিয়ে নাড়াচড়া করে সর্বক্ষণ, যার প্রমাণ এক বছরের ভেতর দুই দুবার দু’টি খুব দামী ফোনসেট কোমোডের জলে পড়ে গিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে তার।
ফলে দেখা যাচ্ছে তরুণ সমাজ ফোন কল চায় না। বিশেষত আগের প্রজন্মের মানুষের কাছ থেকে তো নয়-ই। কেউ যোগাযোগ করতে চাইলে তারা টেক্সট মেসেজ বা ইমেইল করুক, এটাই চায় তারা। বিশেষত পিতামাতার কাছ থেকে দূরে থাকা সন্তানেরা। কথা বলা মানেই সময়ের অপচয়। তাছাড়া ইচ্ছে করলেই মাঝপথে কথা থামিয়েও দেওয়া যায় না। অথচ তারা যে খুব-ই ব্যস্ত। কতো জায়গায় কতো রকম কমিটমেন্ট! টেক্সট করলে সঙ্গে সঙ্গে তারা যা করছিল সেখান থেকে তাদের মনোযোগ সরাতে হয়না যেমনটি করতে হয় টেলিফোনে উত্তর দিতে হলে। ফোনে কথা না হলে কিছু অবাঞ্ছিত প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হয় না। টেক্সট করলে সময় সুযোগমতো অতি সংক্ষেপে (প্রায়-ই পুরো শব্দের বদলে সংক্ষিপ্ত আকারের শব্দব্যবহারে) দু চার সেকেন্ডে টেক্সটের জবাব দেওয়া যায়। অথচ ওপাশ থেকে প্রবল উৎসাহী কেউ ফোন করলে মাঝপথে ফোন রেখে দেয়া মুস্কিল হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত টেলিফোনে বেজে ওঠা শব্দকে আজকাল অনেকেই তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতায়, তাদের প্রাইভেসীতে, তাদের বহু কষ্টে অর্জিত নিভৃতিতে, তাদের নিজস্ব স্পেসে অনাকাংখিত হামলা মনে করে।
আর সেটা শুধু ব্যক্তি পর্যাতেই নয়, অফিস আদালতেও আজকাল টেলিফোন নম্বর ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া হয় না। আর টেলিফোন করলেও অনেক সময়েই কাউকে পাওয়া যায় না। রিং হতেই থাকে। কেউ ধরে না প্রায় সময়েই এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম নয়- বিশেষ করে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফোনের জবাব কেউ না দিলে প্রায়শ-ই তা ভয়েস মেইল-এ চলে যায় । কিন্তু আগেকার দিনের মতো ভয়েস মেইল শুনে শুনে ক্রেতার বিশেষ প্রশ্নের বিশেষ উত্তর আসবে জ্যান্ত কোন মানুষের গলায়, এ যেন আর আশাই করা যায় না। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর খুঁজে পেতেই প্রচুর ঝক্কি সামলাতে হয় আজকাল। প্রচুর খোঁজাখুজি করতে হয়। কোথাও কোথাও তা পাওয়াও যায় না। অথচ আগে এদেশের কাস্টমার সার্ভিসের ভিত্তি ছিল সরাসরি সাক্ষাৎ অথবা ফোনে আলাপ। তখন কী দারুণ কর্মব্যস্ত ছিল খরিদ্দার সেবায় নিয়োজিত এই বিভাগ। কাস্টমারের সমস্যার প্রকৃত সমাধানের কেন্দ্র ছিল কাস্টোমার্স সার্ভিস। ডেস্কে বা টেলিফোনের কাছে যে বসে আছে সে ক্রেতার বিশেষ প্রশ্ন বা অভিযোগের জবাব/সমাধান না দিতে পারলে, ভালো করে সব শুনে টেলিফোনেই এক ধাপ এক ধাপ করে উঠতে উঠতে প্রয়োজনে অফিসের সবচেয়ে বড়কর্তার সঙ্গেও কথা বলিয়ে দেওয়া হতো, যা আজ কল্পনাও করা যায় না। আজকাল ফোন করলে বেশির ভাগ সময়ে লাইন ব্যস্ত থাকে। আর যদি লাইন ব্যস্ত না-ও থাকে, তবু এমন করে প্রোগাম করা থাকে যন্ত্রপাতি যে টেলিফোন কলটি অটোমেটিক মেসেজ সিস্টেমে চলে যায়, সেখানে এক, দুই, তিন, চার টিপে নির্ধারিত ও রুটিন কোন প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া যেতে পারে। তার বাইরের কোন জিজ্ঞাসার উত্তর নয়। প্রতিনিধি বা সুপারভাইজারকে চাইলে সে দীর্ঘ প্রতিক্ষা আবার নতুন করে শুরু হয় – প্রায়শ-ই ১৫ মিনিট থেকে এক ঘন্টা। প্রতীক্ষা শেষে কথা বলতে অনিচ্ছুক মেয়েটি সেই অটোমেটিক সিস্টেমের বা কম্পিউটারের মতোই বাঁধাধরা কয়েকটি তথ্য ছাড়া আর কিছুই প্রায় বলতে পারে না। ক্রেতার সঙ্গে এতো কম যোগযোগে তারা তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও ট্রেইনিং ঝালাই করে নেবার সুযোগ-ও পায় না। কম্পিউটারের মতোই পূর্বনির্ধারিত কিছু প্রশ্নের উত্তর ছাড়া তারা আর জবাব দিতে পারে না। চায়-ও না বেশি কথা বলতে। ফোন রেখে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বিরক্তিকর, সমস্যা সমাধানে জট বেঁধে গেলে কিংবা তা রুদ্ধ দ্বারে এসে ঠেকলে হঠাৎ দেখা যাবে ফোন লাইন কেটে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেও সেই আগের মানুষটিকে আর পাওয়া যায় না। হয়তো আগের মেয়ে বা পুরুষটি ছিল বম্বেতে- পরে যে উত্তর দিল সে হয়ত সিঙ্গাপুরে, যদিও কোম্পানীটি আমেরিকান যার হেড কোয়ার্টার হয়তো শিকাগোতে। সিঙ্গাপুরের নতুন মানুষটির সঙ্গে আবার গোড়া থেকে সব শুরু করতে হবে তখন।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বা পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমের বিবর্তনের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, চিঠি, টেলিফোন বা টেলিগ্রাফের জায়গায় আজ জনপ্রিয় হয়েছে টেক্সট মেসেজ, চ্যাটিং, ইমেইল, টুইটার, ফেসবুক, ইত্যাদি। একসময় টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমে আমেরিকা থেকে কল বুক করে প্রতি মিনিটে চার ডলার খরচ করে অনির্দিষ্টকাল প্রতিক্ষার পর তিন মিনিট কথা বলা যেতো বাংলাদেশে। সেখানে আজ লোকাল কলের মতো সরাসরি নিজে ডায়াল করে ফোন করে কথা বলা যায়। শুধু সেটাই নয়, বিভিন্ন মাধ্যম যেমন ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপ এর সাহায্যে বিনা পয়সায় যতক্ষণ খুশি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ফোন করে কথা বলা যায়। বিনা খরচে আজকাল শুধু টেলিফোন-ই করা যায় না,সেই সঙ্গে পৃথিবী জুড়ে সর্বত্র মেসেজ পাঠানো যায়, ইচ্ছা করলে ভিডিওতে পরস্পরকে দেখাও যায়।

এমন একটা সময় ছিল যখন টেলিফোন, টেক্সট মেসেজ, ফেসবুক, ই—মেইল, টুইটার কিছুই ছিল না আমাদের। তখন কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয়ের বাড়িতে আমরা আগের থেকে কিছু না বলেই বেড়াতে চলে যেতাম। সেই সব সময় বাড়ির সদর দরজাও থাকতো গভীর রাত পর্যন্ত খোলা। এখন যত কাছের মানুষ-ই হোক, প্রাইভেসির নামে, ভদ্রতার নামে, সভ্যতার নামে, নগরায়নের নামে, সৌজন্যের স্বার্থে আগে থেকে টেলিফোন না করে অথবা মেসেজ না দিয়ে আর কারো বাড়িতে কেউ প্রায় যায়-ই না। এই বিশেষ কাজেও টেক্সট মেসেজ টেলিফোনের চাইতে আদরনীয়। কেননা যদি অন্য সঙ্গ সেই সময় বাঞ্ছিত না হয়, টেক্সট মেসেজের উত্তরে ভদ্রভাবেতা প্রত্যাখ্যানের সুযোগ থাকে,বর্ণিত কারণটা নির্জলা সত্য না হলেও। আকস্মিক টেলিফোন কল এলে সেই সুযোগ নেবার সামর্থ কমে যায়। এই লুকোচুরি, ছোটখাটো প্রতারণা, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যদি সভ্যতার, ভদ্রতার অংশ হয়ে থাকে, আমি যে ব্যক্তিগতভাবে চূড়ান্ত অভদ্র এটা জানার অবকাশ অনেকেরই হয়ে গেছে ইতোমধ্যে।
এই কথা না বলা, বিশেষ করে মোবাইল ফোনে জবাব না দেয়া, টেলিফোন নামক বস্তুটি যে জন্যে আবিস্কৃত হয়েছিল, তার প্রাথমিক ও প্রধাণ প্রয়োজনেই তাকে কাজে না লাগানো, আমার আশঙ্কা, বিচিত্র এক সংস্কৃতির, ভয়াবহ অসামাজিক এক তরুণ গোষ্ঠির জন্ম দিচ্ছে। মোবাইল ফোন যখন বাজারে এলো, আশা করা গিয়েছিল প্রিয়জন যেখানেই থাক না কেন, তাদের কথা খুব মনে পড়লে তাদের ডাকা যাবে যখন তখন। এছাড়া কোন বিপদের দিনে, দুর্ঘটনা বা অত্যন্ত সুখকর সময়ে, চট করে মোবাইল ফোনে প্রিয়জনকে ডেকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে আনন্দ বা কষ্টটি ভাগাভাগি করে নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা-পরামর্শও চাওয়া যাবে, সেই মুহূর্তে সে যেখানেই থাকুক না কেন। কিন্তু কার্যত তা ঘটে ওঠে না আর। অন্য প্রান্তের রিং এখান থেকেই শোনে ফোন-কলের উদ্যোক্তা। ফোন বেজে চলে একটানা। প্রায়শ-ই কেউ ধরে না কিংবা ফোনটি আগে থেকেই বন্ধ করে রাখা থাকে, টের পাওয়া যায় ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডেড মেসেজ শুনে। অথবা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয় মেইলবক্স ভরে গেছে। কোন বার্তা আর রেকর্ড করা যাবে না, বা গ্রহণ করা হবে না।
মোবাইল ফোন এখন এতো উন্নত, এতো স্মার্ট হয়েছে যে টেলিফোন আজ কেবল পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার একটি যন্ত্র নয়; টেলিফোন আজ কম্পিউটার, ব্যাঙ্ক (চেক জমা দেয়াসহ), সিডি প্লেয়ার, স্ক্যানার/ফটো কপিয়ার, টেক্সট ম্যাসেজ বা ইমেইল পাঠাবার বাহন, টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ, কিন্ডেল লাইব্রেরী, ডিজিটাল ক্যামেরা, ফটো অ্যলবাম, এলার্ম দেয়া ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, ক্যালকুলেটর, জিপিএস (নেভিগেটর), আরো কত কী!। অর্থাৎ এই একটি ছোট জিনিস সঙ্গে থাকলে আধুনিক জীবনযাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় সব কিছুই উপভোগ করা চলেঃ যেমন, ছবি তোলা , সেলফি তোলা, খবর পড়া ,পছন্দমতো গান খুঁজে নিয়ে গান শোনা, অচেনা জায়গায় যাবার পথ নির্দেশনা পাওয়া, আবহাওয়া, দুর্যোগের পূর্বাভাস বা চলমান অবস্থার সংবাদপ্রাপ্তি, লাইভ খেলা দেখা বা অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, ব্যাঙ্কিং করা, চেক জমা দেয়া, স্টক এক্সচেঞ্জের যাবতীয় কাজ, ইমেইল ব্যবহার বা ওয়েব ব্রাউজ করা, স্বল্পদীর্ঘভিডিও বা ফিল্ম বানানো, পছন্দের যে কোন ছবি, গান বা ভিডিও দেখা, পছন্দের বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ পড়া, রেডিও টেলিভিশন প্রোগ্রাম আস্বাদন, ইত্যাদি। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইদানীং এই ছোট্ট সেলুলার ফোন দিয়ে অন্য সব কাজ-ই হয়, হয় না কেবল সেই কাজ যে কাজটির জন্যে এটাকে প্রাথমিকভাবেও প্রধানত তৈরি করা হয়েছিল – অর্থাৎ ফোনে লোকের সঙ্গে কথা বলা। দেখা যাচ্ছে জগৎ জুড়েই ফোন রিসিভ করে কথা বলার অনাগ্রহ বাড়ছে দিন দিন, যদি না সদ্য বিবাহিত বা নতুন প্রেমে পড়া কোন মানুষের কাছে তার একান্ত ভালোবাসার জন ফোন করে থাকে, অথবা কোন বিশেষ সময়ে অফিসের বা ব্যবসার কোন জরুরী কাজে কোন এক নির্দিষ্ট ফোন কল ধরার প্রয়োজন থেকে থাকে।

মনে পড়ে বছর তিনেক আগে প্রথম একদিন একটি দৃশ্য দেখে চমকে উঠেছিলাম। মায়ামী বিমানবন্দরে ব্যাপারটি লক্ষ্য করলাম। দেখি, এক-ই সোফাতে গাদাগাদি হয়ে বসে আছে একটি সাদা আমেরিকান পরিবার। চল্লিশোত্তর মা,বাবা; সঙ্গে কিশোরী এক কন্যা এবং প্রায় কিশোর এক পুত্র। চারজনের হাতে চারটা আইফোন। প্রত্যেকে নিজ নিজ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত এবং অতি দ্রুত টিপাটিপি করছে। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। প্রায় ঘন্টাখানেক ছিলাম সেখানে। এই দৃশ্যের কোন পরিবর্তন দেখলাম না। আজ সে দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়। সর্বত্র। আমাদের চোখে সেসব সয়ে গেছে। আর অবাক হয় না এখন। এটাই এখন স্বাভাবিক চিত্র। অথচ সেদিন কী অদ্ভুত মনে হয়েছিল। জলজ্যান্ত রূপ,রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দে ভরা প্রাকৃতিক পৃথিবী ছেড়ে এক ভার্চুয়েল রিয়েলিটির জগতে ঢুকে বসে থাকছে মানুষ বাস্তব অনেক সমস্যা অগ্রাহ্য করে। জানা যায় কষ্ট করে , সময় ও বিস্তর পয়সা খরচ করে লাস ভেগাস বা টোকিও না গিয়ে ঘরের ভেতর বসে কম্পিউটার চিপ ঢূকিয়ে দিয়ে একটি হেডসেটে ব্যবহারের মাধ্যমে খুশিমতো ভ্রমণ করে সব দেখে আসতে পারা যায় নিজের পড়ার ঘরের চেয়ারে বসে বসেই। এমন কি ডিজনী ল্যান্ড বা সিক্সফ্ল্যাগের বিভিন্ন জনপ্রিয় রাইড পর্যন্ত নেয়া সম্ভব এই ভার্চুয়েল রিএলিটিতে। আজকাল অনেক সময় দেখা যায়, একটি বড় গ্রুপে একসঙ্গে অনেকে বসে আড্ডা দিতে দিতেও কোন প্রেমিক জোড়া হয়তো পরস্পরকে নিঃশব্দে টেক্সট করে যাচ্ছে, অথচ তারা হয়তো পাশাপাশি বা সামনাসামনি-ই বসে আছে। তারা নিশ্চিত তাদের পারস্পরিক কথার লেনদেন আর কারো শুনে ফেলার কোন সম্ভাবনা নেই। টেক্সটিং এর মারাত্মক আসক্তির জন্যে গাড়িচালাতে চালাতে টেক্সট করতে বা পড়তে গিয়ে প্রবেশ কিছু দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে–বিশেষত তরুণ সমাজে। যদিও অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যেই এখন গাড়ি চালাতে চালাতে সেলফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ।
এই পরস্পরের সঙ্গে কথা না বলা আর শ্রবণেন্দ্রিয়কে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে শব্দের ওঠানামা, প্রতিটি কন্ঠের বিশেষ কাঁপুনি মনোযোগ দিয়ে না শুনে, মানুষের গলার স্বরের আকুতি বা ক্লান্তির পার্থক্য বোঝার চেষ্টা না করে বা মনকে স্পর্শ করার চেষ্টা বা আগ্রহ বন্ধ করে দিয়ে কেবল দৃষ্টিশক্তির ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে দিয়ে(ফোন ছাড়াও দৃষ্টির মনোযোগ কাড়ছে টিভি, মুভি, ভিডিও খেলা, খবর বা বই পড়া) কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে মানুষ? ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাক্যালাপ শুধু নয়, সাধারণভাবে এবং বৃহত্তর পৃথিবীতে কথা বা মতামত শোনার, কথা বলার আকাঙ্ক্ষা কিংবা চিঠি বা দলিলে মত বা অমত প্রকাশ করার, তর্কবিতর্ক করে সমঝোতায় পৌঁছাবার ধৈর্য, ইচ্ছা বা প্রতিশ্রুতি যদি নিঃশেষিত হয়ে যায়, সমস্যা সমাধানের একটি মাত্র পথ-ইতো তখন খোলা থাকবে। আর সেটা হলো, বাকবিতন্ডা, আলোচনা, পরামর্শ, উপদেশের মধ্য দিয়ে অথবা শান্তি-আলোচনায় অংশগ্রহণ করে সমস্যার সমাধান না করে সামরিক ও আর্থিক শক্তির বাহ্যিক প্রদর্শনে ও অহমিকায় অন্য রাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিকভাবে কাত করে দেওয়া বা সরাসরি সামরিক অস্ত্র দিয়ে তাকে আক্রমন করা। যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে শক্তির খেলা দেখানো। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের মতো অযৌক্তিক, আলোচনাবিমুখ, একপেশে, সংবেদনশীল ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি অন্য দেশেও আসীন থাকেন, তাহলে শান্তি আলোচনা নয়, যুদ্ধ-ই হবে আমাদের সকল সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়। কে জানে কবে কোন কথা নেই বার্তা নেই কী মনে করে, কোন অছিলায় উত্তর কোরিয়া বা ইরান আক্রমন করে বসে ট্রাম্প। বহু “চেক ও ব্যালেন্স” থাকা সত্বেও আমেরিকান সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে শুধু সামরিক বাহিনীর কম্যান্ডার ইন চিফ-ই করেনি, জরুরী অবস্থায় তাঁকে অগাধ ক্ষমতাও দিয়েছে। এসব জেনে শুনেও কি আমরা মানবিকতার স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে আরো বেশি করে কথা বলবো না ? TGIF (thank god it’s Friday), OMG (Oh my god), ILU (I love you), র মতো বিজাতীয় সাংকেতিক ও সংক্ষিপ্ত ভাষার লেখার বদলে স্বাভাবিক এবং নিজস্ব ভাষা দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্টাইলে,মনের ভেতর ধারণ করা, প্রকৃত অনভূতি, নিজস্ব কথাগুলো প্রকাশ করবো না প্রিয়জনের কাছে? ইদানীং কালে আধুনিক স্টাইলে এই অতি প্রচলিত শব্দাংশে বা ভগ্নাংশে যে সংবাদ বা তথ্য প্রেরণ বা পরিবেশন করা হয়, সেটাই কি চিঠি লেখার, পারস্পরিক যোগাযোগের একমাত্র উদ্দেশ্য? তাহলে তো হলমার্কের বহু ধরণের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যসহ দৃষ্টিনন্দন কার্ডের বাজারের কাছে হাতে লেখা চিঠির বা দু লাইন শুভেচ্ছা বার্তার কদর কবেই শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু তা তো হয়নি! প্রায় সকল রকম অনুষ্ঠানের জন্যে, কিংবা সব রকম মনোভাবকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশের জন্যেই বিভিন্ন কথা লিখিত সুদৃশ্য কার্ড রয়েছে দোকানে। তবু আজোরয়েগেছে আমার মতো পুরনো দিনের মানুষ যে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লিখিত হলেও আপনজনের নিজের হাতের লেখা নিজস্ব শব্দ চয়নে রচিত নির্ভুল যদি নাও হয় অন্তত তার হাতের স্পর্শ পাওয়া, তাঁর প্রাণের কথা দিয়ে রচিত চিঠি বা কার্ডের প্রত্যাশা করে। তেমনি প্রায় এক-ইরকম ভাবে আগ্রহী হই প্রিয়জনের বিশেষ গলার স্বর টেলিফোনে লাইভ শোনার আশায় (সকলের জন্যে ধারণকৃত অনবরত শোনা সেই পুরনো রেকর্ডেড মেসেজ নয়) যখন ফোনে কথা বলার চেষ্টা করি। ব্যক্তিগত টেলিফোনকে যে কেবল তথ্য বিনিময়ের যন্ত্র হিসেবে দেখতে শিখিনি আজো।
তাহলে কি বলবো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো আজকের যুগের প্রায় সকল রাষ্ট্র, সমাজ, সব মানুষই, বিশেষ করে আমাদের পরবর্তি প্রজন্ম আস্তে আস্তে এক ধরনের পুরুষালি রূপ পরিগ্রহণ করতে শুরু করেছে? আমরা কি এই পৃথিবীর মাত্র অবশিষ্ট কয়েকজন বৃদ্ধ নারী যারা যান্ত্রিক শব্দ নয়, মানুষের জীবন্ত কন্ঠস্বর, তাদের মুখের পরিচিত ভঙ্গিতে বলা তাদের নিজস্ব পছন্দের বিশেষ শব্দে গাঁথা বয়ান বা তাদের নিজের হাতের লেখা নিজস্ব শব্দ চয়নে রচিত একখানি চিঠির জন্যে আজো আকুলিবিকুলি করি?

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রিসিলা রাজ — অক্টোবর ১৭, ২০১৭ @ ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

      পৃথিবীতে এখন চলছে smart যুগ। সব যন্ত্র, সব মানুষ, সবকিছু স্মার্ট হওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ছুটে চলেছে। স্মার্ট smart শব্দের একটা অর্থ আঘাত। পারস্পরিক আঘাতই যেখানে চূড়ান্ত ফললাভ হিসাবে গণ্য, যোগাযোগহীনতাই যে সেখানে মোক্ষলাভ তাতে আর সন্দেহ কী?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com