অনুবাদ, বিশ্বসাহিত্য

স্মৃতির স্থিতি ও বিলয় : প্রেক্ষিত কাজুও ইশিগুরোর “দ্য ব্যারিড জায়ান্ট”

শাকিলা পারভীন বীথি | 8 Oct , 2017  

kazuo-1কাজুও ইশিগুরো প্রথম উপন্যাস লেখেন দশ বছর ধরে যা একই সাথে সাহিত্য জগতের এক নতুন ঘটনা এবং পত্রিকার খবরে পরিণত হয় । ম্যান বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত “The Remains of the Day” এর লেখক ইতিহাসের অনেক গভীরে প্রবেশ করেন এমন এক গল্পের বয়ানে যেখানে কোন দম্পতির যাত্রা পথের কাহিনী ও এক মহৎ সভ্যতার রহস্যময়তার যুগপৎ অবস্থান । দ্য ব্যারিড জায়ান্ট উপন্যাসের বুনন রাজা আর্থার এর যুগের ইংল্যান্ডের সময়াশ্রিত । কিন্তু এ ক্যামিলটের গল্প নয় যা রাজকীয় ব্যক্তি, ধূর্ত জাদুকর, সদর্পে পদচারণা করা ঘোড়া আর সাহসী অভিযানে ঠাঁসা ।

এনপিআর এর প্রতিনিধি স্কট সিমন কে দেয়া সাক্ষাতকারে ইশিগুরো জানান তিনি সেভাবেই লিখতে চান যেভাবে সমাজ মনে রাখে বা ভুলে যায় তার ইতিহাসের কথা , ইতিহাসের বাঁকে বিস্মৃত চোরাবালির কথা । “ আমার ভীষণ ইচ্ছে করে এ সময়ের ঘটনাগুলো লিখে রাখি; যুগোস্লোভিয়ার বিচ্ছিনতা, রুয়ান্ডার গণহত্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ফ্রান্সের কথা। কিন্তু দিন শেষে আমি চাইনি তেমন একটা সময় ও স্থানের আশ্রয়ে সেই গল্পগুলো বলতে । আমি এমন কোন বই লিখতে চাইনি যা পত্রিকার প্রতিবেদন হয়ে দাঁড়ায় । একজন উপন্যাসিক হিসেবে আমি বার বার ফিরে গেছি আরো গভীরভাবে রুপকাশ্রিত বুননে ।”

চৌম্বক অংশ :
প্রাথমিকভাবে এটি একটি প্রেমের উপন্যাস। কিন্তু তোমরা জানো, প্রেমের গল্প বলতে কেমন মিলনের গল্প জেগে ওঠে আমাদের কল্পনায় । আর তা প্রেমে পড়ার নানাবিধ উপকরণে সাজানো। কিন্তু এটি সে অর্থে কোন প্রেমের গল্প নেয়। বরং বলা যায় , উপন্যাসটি প্রেমের পথে ধাবিত হবার গল্প বলে। আমি আগেই বলেছিলাম সামাজিকভাবে স্মৃতি বা বিস্মৃতির পালাবদল কেমন প্রশ্নের জন্ম দেয় আমার মনে । যেমনটা দেয় সমাজের ঘৃণিত ইতিহাস চাপা দেবার বিষয়টি। একই বিষয়ের প্রতিফলন আমরা বিবাহিত জীবনেও দেখি। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে তেমনই জীবনযাত্রা দেখি। এক বৃদ্ধ দম্পতি স্মৃতির অন্বেষণে শেষবারের পথে নামে । সময় ও স্থানকে ডিঙিয়ে তাঁরা তা অনুভব করতে পারে।

তাদের মনে হয় হয়তো তাদের একটা ছেলে আছে । তবে তারা নিশ্চিত নয়। গল্পের অবয়বে মূর্ত হয়ে ওঠে এমন এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভূমি যা তাদের আগলে রাখে। মানুষের মাঝে স্মৃতি হারাবার স্বভাব প্রকট। এবং এই যুগল অনুভব করে খুব দেরী হয়ে যাবার আগে এই মূল্যবান স্মৃতিপট অবশ্যই তাদের উদ্ধার করতে হবে । তারা তাদের সন্তানকে খুঁজে পেতে পথে বের হয় । এবং তাদের ভয় করতে থাকে সেইসব স্মৃতি খুঁজে পেতে। তবু তাদের গভীর বাসনা জাগে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি যেন তাদেরই হয় ।

গীতিকার হবার বাসনায় সৃজনশীল লেখা বিষয়ক কোর্সে অংশগ্রহণ :

ত্রিশ বছর আগে আমি একটি সৃজনশীল লেখার কোর্সে অংশগ্রহণ করি । এটি ছিল বৃটেনে হওয়া এ জাতীয় প্রথম কোর্স । মূল কথা হল সৃজনশীলতা শেখানোর বিষয় নয় । কার মাঝে একজন সৃজনশীল মানুষ বাস করে পুরো বারোটা মাস শুধু এটুকুই খোঁজা হয়েছিল। আমি লেখক হবার কোন ভ্রম নিয়ে সেখানে যাই নি । আমি গীতিকার হতে চেয়েছিলাম । আমার মনে হয় আমার মাঝে সবসময় একজন গীতিকার বাস করে। এমন কি তখনও যখন কিনা আমি উপন্যাস লিখতে বসি । এবং আমার মনে হয় সেই তরুণ বয়সে লেখা গানগুলোর সাথে আমার গদ্যের বিরাট সাদৃশ্য আছে। আমার উপন্যাসের বিশেষ ধরনকে অনেকে আমার স্টাইল বলে মানে । আমি সেই স্টাইলকে আমার ভেতরের গীতিকারের ভূমিকা বলে মানি ।
গান এক ব্যক্তির কথা – একজন একলা মানুষের কথা যা অন্যের সামনে উপস্থাপন করা হয়। আর আমার শুরু থেকে সর্বশেষ উপন্যাস যেন ওভাবেই লেখা হয়েছে ।

ইংরেজী ভাষা শেখার মাধ্যম : পশ্চিমা দূরদর্শনের দুনিয়া
পাঁচ বছর বয়সে আমি বৃটেনে আসি। আমার মা–বাবা কেউ ভালো ইংরেজী বলতে পারতো না । আমার মনে পড়ে না আমার মা আদৌ ইংরেজী বলতো কি না! সুতরাং নানাভাবে শোনা শব্দই আমার ভাষা শেখার একমাত্র উৎস । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শেখার সুযোগ হয় নি। কিন্তু ঘরে ফিরেই প্রিয় কাউবয় শো দেখতাম। তখনকার দিনে টেলিভিশনে পশ্চিমা দুনিয়ার শোগুলোই চলতো। যা একজন জাপানি শিশুর কাছে বেশ বিব্রতকর ছিল ।
বোনানযা আর ওয়াগ্যন ট্রেইন-এর ইংরেজী আর স্থানীয় ইংল্যান্ডবাসীদের ইংরেজীর মধ্যে যে পার্থক্য তা আমি বুঝতাম না। স্কুলে গিয়ে আমি যখন হাউডি (howdy) বলতাম বা এ জাতীয় কিছু তখন সবাই একটু চমকে যেত। তখন থেকেই ওয়েস্টার্ন মুভি বা টিভি শো আমি ভালোবাসতাম । আমি তাদের মাঝে সামুরাইয়ের গল্প খুঁজে পেতাম যা আমার মনের খোরাক মেটাতো। স্যার গাওয়াইন ছিলেন রাজা আর্থারের সর্বশেষ নাইট। তিনি ওয়েস্টার্ন মুভির এমন এক চরিত্র যাকে নিয়ে শোকগাঁথা রচনা করা যায়। আমার তাকে অতীত থেকে ফিরে আসা গানফাইটার মনে হতো, মনে হতো এক বয়স্ক নায়ক। আমার মনে হয় এখনো সে এই বিস্তীর্ণ আকাশের নিচে একাকী দন্ডায়মান।

২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি NPR books Magazine- এ প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলা তর্জমা।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.