নূরুল হুদার কাব্য: বিষয় ও রূপের রসায়ন

মতিন বৈরাগী | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন

nurul.gifপ্রতিভাধর কবি, সাহিত্যিক,শিল্পী কখনোই জীবনবিমুখ হন না। সৃষ্টিতে নানা ব্যতিক্রম থাকলেও তাঁদের প্রতিভার প্রকাশ শেষমেষ মানুষের পক্ষে থেকে যায় । দা’ ভিঞ্চি বলেছিলেন ‘একজন শিল্পী তখনই শিল্পী যখন অন্য মানুষের চকিতে অনুভব করা সত্যকে সৃষ্টিযোগ্য বিষয় রূপে দেখেন’ । বহু কবিতার বিশাল ভাণ্ডার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার। তাঁর কবিতাগুলো সবটাই পড়ে নিয়ে একজন পাঠকের দু’কথা বলতে হলে অনেক সময় ও ভাবনার প্রয়োজন। তবু কোনো সচেতন পাঠক লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন যে তাঁর ব্যাপক সৃষ্টিতে নানামুখী বৈচিত্র্য রয়েছে। তিনি যেমন বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোযোগী থেকেছেন তেমনি বিষয়কে বলবার ক্ষেত্রে রূপের নতুনত্ব এনেছেন। এ কারণে তার কবিতা একঘেয়েমীতে পড়ে না, এবং প্রায় কবিতা ‘ন্যারেটিভ বা বিমূর্তভাবনা মূর্তায়নের ইঙ্গিতময় হোক’, এমন নির্মাণগুণে পারঙ্গম হয়েছে দৃশ্য ও ভাবযোজনায় বহুতল সৃষ্টিতে। ইদানিং প্রকাশিত কাব্য ‘বেদনার বংশধর’ অন্যরকম ভাব অনুসন্ধানের কাব্য পাঠকচিত্তকে নানাভাবে দোলায়িত করবে।

‘অনন্ত বসন্ত এসে
অনন্তর খেলে কানামাছি;
আছি তবু আছি,
চিবুকে চিবুক রেখে
হৃদয়ের খুব কাছাকাছি
***
আমরা আদম হাওয়া
বেদনার চির বংশধর’ [ বেদনার বংশধর]

পাশাপাশি ফের্নান্দো পেসোয়ার একটা কবিতার অংশ উল্লেখ করছি [ অনুবাদ কুমার চক্রবর্তী]
একমাত্র অনুভুতি ছাড়া কোনো দর্শন নেই আমার..
প্রকৃতি সম্পর্কে যদি কিছু বলি তা এজন্য নয় যে আমি তাকে জানি
এজন্য যে আমি তাকে ভালোবাসি, আর কেবল এ কারণেই,
কারণ যারা ভালোবাসে তারা কখনোই জানে না কী তারা ভালোবাসে’

‘অনন্ত বসন্ত’ এই শব্দদ্বয় কেবলমাত্র আক্ষরিক অর্থকে দ্যোতিত করেনা, বরং কাঙ্ক্ষার রাজ্যের এক সময়কে প্রবহমান রাখে যা চিরকাল মানুষের আরাধ্য আর অনন্তর এক কানামাছি একচক্ষু নিবিষ্টতা [ধ্যানমগ্নতা] আকাঙ্ক্ষার তন্তুতে অতিক্রম করে পাতালরাজ্য [ যা পরিদৃশ্যমান নয়, কল্পনায় রয়েছে] বিবিক্ত প্রান্তর। যা ভয়াবহ দৃশ্য অথচ অদৃশ্যমান। অন্তর জগতের নিশ্চেতনায় নানা বিমূর্ততা স্তুপাকৃত, শঙ্কা ও নিষেধের সীমান্তে আটকানো। তবু চুঁইয়ে পড়া ধারার মতো ফেরে একচক্ষু বিবেচনা, অন্তরের সন্তরণ আবেগ ও উচ্ছ্বাস হয়ে কোনো এক সত্যে ফিরতে চায় যেখানে মানব-মন প্রবাহের সীমাবদ্ধতা সীমিত করেছে গতি, কিন্তু হৃদি তৃষ্ণা তার ধারাস্পর্শ পেতে চায় প্রেম-আনন্দকাননে, সে মানব–সে মানবী, সে দেহ ও মন- ভেলা । আর এই যৌথ শরীর যা প্রত্যেকেই ধারণ করে, এনিমা ও এনিমাস–এর বিরোধ তার সমন্বয় ঘটে এই অন্তরদর্শনে। যদিও জানা যে এ খুব সহজ নয় এ মোটেও সহজলব্ধ বিষয় নয় এ হলো মার্গীয় এক অনুধ্যান যার অপেক্ষা তিত তিক্ত তবু কবি বলে ‘আছি তবু আছি’ অর্থাৎ মোক্ষ-অর্জন সমাধিস্ত ধ্যানের মধ্যের যা দূরও নয় যা কাছেরও নয়, সেই মেঘ শৈল-শিখরপুঞ্জে অন্তরস্থিত সত্যের মনিতে যার অলোক-আলোক দ্যুতিমালার চিরবর্তমান পিপাসার, সে খোঁজে; পায় না আর তার জন্য তার একচক্ষু দৃকপাত, একাগ্রতা পক্ষপাতিত্বের মতো ‘লতানো চুলের চূড়া পার হয়ে/মস্তিস্ক ও মেরুদন্ড বেয়ে/এঁকেবেঁকে/ কোমর নিতম্ব হাঁটু মণিবন্ধ পায়/বাঁকানো আঙুল কিংবা জানুসন্ধি’ তারপরই ‘আটকুঠুরির -নয় দরোজায়/আমরা বেদনা-বন্দি:’ আসীমে সীমিত প্রজ্ঞা। আর এই বর্ণনাত্মক দুজন নর ও নারী থাকে না, আসুক্তি ছড়িয়ে গড়িয়ে নেয় এক অসীম সত্ত্বা যার মধ্যদিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সত্ত্বার সত্য যা একে অন্যকে অন্য আরো অন্যকে একসূত্রে সূত্রায়ন করে গড়ে ভাবজগতের বস্তু সত্তা, নর ও নারীর চিরকালীন কামনাজাত সৃজনশীল বিস্ময় ভাবে ও প্রকাশে। কিন্তু মানুষ তবু নিয়তির মতো, সে পোঁছে সে ফিরে আসে ‘সিসিফাসের মতো’ এক নিয়তি অনন্ততর এক তৃষ্ণা পেরিয়ে যাব পারবো, পেয়ে যাব, হয় না মেলে না পরিপূর্ণ দর্শন। এই বেদনা মানুষের আদমের ‘আমরা আদম হাওয়া /বেদনার চির বংশধর’ এই যেন নিয়তি, যা মানুষের। ‘কারণ যারা ভালোবাসে তারা কখনোই জানে না কী তারা ভালোবাসে’ এই জানা আর কোনোদিনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে না ‘বেদনার বংশধরদের’ কাছে। এখানেই সৃষ্টির পদবিচরণ, এখানেই আকাঙ্খার নব-অন্বেষা, অনুসন্ধান অভীপ্সা।
মা তোর বদনখানি
আমাকে কাঁদায়
তোমাকে ধরেছি বুকে
এ আমার দায়
নির্মাণে কোনো জটিলতা নেই। যেন স্বতঃস্ফূর্তির মধ্যে ভাষার উন্মেষ। প্রথমে ‘তোর’, সে হলো সম্পর্কের গভীরতা নিনাদিত এক উচ্চারণ যার পাখা দিগন্ত বিস্তারি এবং আপন অধিকার ঈগল ডানার মতো প্রসারিত দিশাধারী সে নির্দেশ করে বিশেষত্ব ‘বদনখানি’ কারণ ‘প্রত্যেক শিশুই নিজকে চিনে তার মায়ের মুখ দেখে’। মায়ের অস্তিত্ব থেকে নিজের অস্তিত্ব প্রত্যেক শিশুর প্রণালীবদ্ধ জীবনকে স্পষ্ট করে, আর তার পর যখন ভাষার নতুন বিন্যাস ‘তোকে’ থেকে ‘তোমাতে’ গড়ায় তখন তা শব্দদ্যোতনায় আরেক অনুভব জাগ্রত করে, আর বলে তোমার স্মৃতি যা আমি বুকে ধরে আছি, ধরবো, বয়ে নিয়ে যাব ‘এ আমার দায়’ এখানেই ভাষাস্ফূর্ততার বিশেষত্ব যে এক্কেবারে ব্যক্তি অনুভব ব্যক্তি থেকে ব্যাপ্তিতে সম্প্রসারণ। উচ্চারণে আরেক ধরণ তৈরি করে দেয়া, যা শ্রবণে নতুন হয়ে বাজে।
মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘বেদনার বংশধর’ কাব্যে মরমীয়া জীবন বোধকে অধিকাংশ কবিতায় বিস্তার দিয়েছেন। সুফিবাদের স্পষ্ট অনুসন্ধান রয়েছে তার কবিতাগুলোতে। খৈয়াম,রুমি,হাল্লাজ এবং গালিবের জগত জিজ্ঞাসা মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, নিত্য ও অনিত্যের দ্যোতনা এই কবিতাগুলোতে ফুটে আছে। কিন্তু নির্মাণে তিনি দ্বাদশ শতকীয় নন, যেমন ‘অসহ্য অশেষ’ বসে থাকতে থাকতে আমি হয়ে যাই ডানা/উড়তে উড়তে তুমি হয়ে যাও বৃক্ষ’ বিশ শতকের নির্মাণকে সঙ্গী করে বলছেন ‘শেষ হয় না শেষ হয় না/আমাদের এই রীতবিপরীত’ অর্থাৎ বিপরীতগুলো মূলগুলোকে দ্যোতিত করে, সত্য হতে হলে মিথ্যে লাগে, নিয়ম হতে গেলে অনিয়ম দরকার, স্বর্গ হতে গেলে দোযখ প্রয়োজন, অর্থাৎ বিপরীতগুলোই মূলকে গুঞ্জরিত করে, আর তা জড়িয়ে থাকে প্রতিটি ভাবনায়, ভাবনার মধ্যে সে তর্ক ও যুক্তি হয়ে ওঠে, সত্যকে নির্ধারণ করে। আর ‘বসে থাকতে থাকতে আমি হয়ে যাই ডানা’ সে ভ্রমণ বিস্তার। হুদার এই পর্বের কবিতাগুলো রোমান্টিকতার নতুন সংযোজন । আবার শব্দের সংগে শব্দ জুড়ে দিয়ে তিনি এক শব্দ সম্মোহনে প্রচলিত অর্থ থেকে নতুন অর্থকে প্রবহমান করেছেন: ঘুরছে তো ঘুরছে/উড়ছে তো উড়ছে/পুড়ছে তো পুড়ছে/একটা কিছু’ এ যেন যাদুকরের হাতের সেই বাজনা, একটানা বেজে যাচ্ছে সম্মোহনে। একটা কিছুতে এসে উপরের শব্দ সংযোজনাকে একটা স্থির বিন্দুতে দাঁড় করায় আর সে সিদ্ধান্ত টানে ‘হাতে নিয়েছি সুই/ছেঁড়াখোড়া/হৃদয়টাকে/অন্তত এই ফাঁকে জোড়া লাগাতে যাই রে’ এই রূপনির্মাণ নতুন কিছু না হলেও তার হাতে অন্যরকম এক গতি নিয়ে বলছে ভাইরে/এই দেহ ইমারত/তার কোনো মেরামত/অন্তত এই জন্মে /নাই রে ’ আর তখন গোটা কবিতা অন্যরকম এক শরীর নিয়ে সম্মোহিত করে আমাদের।

‘যতোদূর বাংলা ভাষা ততোদূর এই বাংলাদেশ’

ব্যাঞ্জনাময় এই পঙক্তিটি জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে এই সময়ে । ষাটের যে ক’জন মেধাবী কবি বাংলা কাব্য-ভূবন কাঁপিয়ে কবিতা নির্মাণে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন রাখছেন, মুহম্মদ নূরুল হুদা তাদের মধ্যে প্রধান কবি। বহু-মাত্রিক এই কবি কেবল মাত্র কবিতা রচনাই নয়; কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, তত্ত্ব বিজ্ঞান আলোচনা, সকল ক্ষেত্রেই তিনি দাঁড়িয়েছেন একজন সচেতন লেখক ও সংগঠকের মতো । তিনি যেমন সমাদৃত হয়েছেন দেশে তরুণ ও প্রবীনদের কাছে তেমনি বিশ্বপরিমণ্ডলে তাঁর কাব্য-কৃতির সুবাতাস খানিকটা ছড়িয়েছে। তার লেখা দেশ-বিদেশে নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে । এখানেও গবেষণার বিষয় হয়েছে এবং উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনে কেউ কেউ কাজ করছেন তাঁর কাব্য-প্রতিপাদ্যকে চিহ্নিত করতে। বাংলাদেশে কপি রাইট আন্দোলন তাঁর চেষ্টায় আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে এবং তাঁর সাথে রয়েছে তাঁর ক্রিয়া-মুখরতা ।
এঙ্গেলস-এর মতে ‘ইতিহাসের গতি এমনই যে শেষতক যা ঘটে তা বহু ব্যক্তির সঙ্কল্পের সংঘর্ষের ফল আর এই সংকল্প আবার প্রত্যেকটি জীবনের বহু বিশেষ অবস্থার দ্বারা অন্বিত সুতরাং বহু শক্তির প্রতিচ্ছেদ আছে, বহু সামান্তরিক শক্তি আছে যার ফল হচ্ছে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা’ কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা কবিতা নির্মাণের নানা পর্যায়কে পরীক্ষা নিরীক্ষায় নিয়োজিত থেকে অতিক্রম করছেন কবিতার নব-বলয় তৈরির কাজে। নিয়োজিত করেছেন কাব্য নির্মাণের এমন এক জিজ্ঞাসা, যেখানে বহুর আকাঙ্ক্ষা আছে। তিনি বহুর আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে সচেতন কাব্য-নির্মাণের মধ্য দিয়ে শিল্প-সত্তা মানবমুখী করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ’দিক দিক থেকে তিনি প্রান্তিকতার কবি নন, কবিতার বহু মাত্রিকতা-প্রিয়তার অনুগামী। কবি তাঁর জাতিসত্তার কবিতায় ( ,৯২ সালে প্রকাশিত) সচেতন ভাবেই একটি জাতির নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে তাঁর আদি পর্বের ইতিহাস, ইতিহাসে তার বিস্তার, সংগ্রাম, জয়-পরাজয়, নির্মাণ এবং বিবর্তন ইত্যাদিকে কাল-পঞ্জির মতো বিশ্লেষিত করে কাব্য-রসায়ন নির্মাণ করছেন এবং শিল্প-মানকে অটুট রেখে কবিতা নতুন স্বপ্ন-ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পেরেছেন ।

১. বুনতে বুনতে বেড়ে উঠি, বুনতে বুনতে বুড়ো হয়ে যাই;
আমার অস্তিত্ব জুড়ে অসংখ্য সুতোর দাগ
বুকের গভীরে ঘোরে জন্মস্মর সুতো-কাটা কল
শিরায় শোণিত- স্রোতে
সুতোর মতোন কত শ্বেত শুভ্র নদী
পলিহীন প্লাবনবিহীন
সে নদীতে ভেসে ওঠে নাওয়ের বহর,বুকে তার
হাসন-লালন আর এক তারে বাঁধা লক্ষ সাঁই;
পুনর্বার-’

২. ‘বৃক্ষ তুমি জমজ ভ্রাতা
পাখি তুমি বোন
মা গঙ্গা ভগীরথী
শেকড়-কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম’

৩. ‘তোমাদের হাড়গুলো বাংলার হৃদপি-ে অবিনাশী ঝড়
বাঙালীর জন্মতিথি,রক্তে লেখা ষোলো ডিসেম্বর.’।
{জাতী সত্তার কবিতা, কাব্য]

অর্থাৎ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিশাল বুননে তাঁর এই কাব্য-নান্দনিকতা কাব্য-পিপাসু মানুষকে প্রাশান্তি দেয় এবং তিনি জাতিসত্তার কবি বলে সকলের স্বীকৃতিও পেয়ে যান ।

‘ভালোবেসে জীবনকে আনগ্ন চেয়েছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি

রাজধর্ম পিছে ফেলে পিছে ফেলে গোত্রের আরতি
লোকধর্মে লোকসংঘে সুদীক্ষা নিয়েছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি ।’
[জাতি সত্তার কবিতা. কাব্য]

ঘোষণা পত্রের মতো ‘আমরা তামাটে জাতি’ শিরোনামের কবিতাটি। বাঙালী জাতিসত্তার নানা স্তর অতিক্রম তার অস্তিত্ব স্বাধীনভাবে ঘোষণার মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে ‘জাতিসত্তার কবিতা’। অর্থৎ শুরুর পর্যায় থেকে নানা ধাপ নির্মাণে একটি জাতির অস্তিত্ব ঘোষণার পর্যায়গুলো অতিক্রম করেছেন কাব্যিক শৈলীতে। নির্মাণে উত্তরাধিকারিত্ব রয়েছে বাংলা কাব্য-ধারাবাহিকতায়। ফলে কবিতাগুলো খণ্ড আকারে পাঠকের সামনে এলেও অখ-ের জমিনে পড়ে নিতে অতৃপ্তি থাকে না । হেগেলের মতে ‘শ্রেষ্ঠ শিল্প ও দর্শন অভিন্ন’ এই কাব্যে শেষতক বিধৃত হয়েছে এক দর্শন যা ‘লোক ধর্মে লোকসংঘে সুদীক্ষা নিয়েছি’- র মধ্যদিয়ে উপমহাদেশের ঐতিহ্যকেও ধারণ করে যুক্ত করে বিশ্ব-মানব সংস্কৃতির মৌলিকে যা সবসময়ই গণমুখী এবং গণ-মানুষের এবং নানা সময়ে স্বার্থ-অন্বেষী নিপীড়ক শাক্তি দ্বারা রুদ্ধ হয়েছে, লুন্ঠিত হয়েছে. কুক্ষিগত হয়ে আছে।
‘নন্দনতত্ত্বের বিতর্কিত প্রশ্ন শিল্পের বিষয় ও রূপ অর্থাৎ শিল্প বিষয এবং রূপের সমন্বয়ই শিল্পের নান্দনিক প্রকাশ’ । শেলীর কাব্যের বিশেষ গুণ যেমন গতিশীলতা, প্রচন্ড অন্তর আবেগে, মূর্তবাণী বিশাল মানব সমুদ্রে মিলিত হয় তেমনি কবি হুদার কাব্য-আবেগ শেষতক মানব প্রেমেরই অনুষঙ্গ হয়ে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো । ‘জাতিসত্তার কবিতায়’ কবিতার গঠন এবং পঙক্তির নির্মাণ-বিস্তার-বিন্যাস-এর স্বতন্ত্রতা এখানে । যেমন–

‘তোমার স্মৃতিতে আজ লেখা হয় জীবনের লাল ইতিহাস
তোমার হাড়ের বহ্নি তাপ দেয় গৃহে গৃহে শীতার্ত নিশীথ’ ।
[ জাতি সত্তার কবিতা, কাব্য]

নির্মাণের গুণে উপমা-উৎপ্রেক্ষা এবং মিথ সম-পুষ্টিতে মিশে গেছে প্রতিটি পঙক্তিতে । ফলে রূপ-রস-আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে কাব্য-শরীরে এবং অখ- হয়ে উঠেছে ।
‘আমরা তামাটে জাতি আমরা এসেছি’ ‘জাতিসত্তার কবিতা’ কাব্যের শেষ পঙক্তির ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে। পঙক্তিটি যেনো অনিবার্যভাবে মানুষের শ্রম-ঘাম-কল্পনা-স্বপ্নের সাথে মিলে-মিশে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে এবং ২০১৩ সালের যাত্রা আরম্ভের নির্দেশক হয়েছে । ‘দার্শনিক কিয়ের্কেগার্দ’ প্রসংগে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এরিশ ফ্রীড-এর তাঁর অনুবাদ একটি কবিতার উলে¬খ করেছেন

‘যে নাকি
একটি কবিতার কাছ থেকে
মুক্তির হদিশ চায়
সে বরং কবিতা পড়তে শিখুক

আর যে একটি কবিতার কাছ থেকে
মুক্তির হদিশ চায় না
সে বরং কবিতা পড়তে শিখুক।

আমি বলবো কবিতার কাছে মুক্তির হদিশ আছে । শুধু হাসিটুকু, শুধু কান্নাটুকু, পাতার লাল নীল রং টুকু আর নারীর শরীর বাঁকের নানা উপমা ভাঁজে ভাঁজে বসিয়ে দেয়ার বিভ্রম, কারণে অকারণে পুরাণ আর মিথের ব্যবহার কবিতাকে নৈতিকতার মানদ-ে কবিতা করে তোলে না। কবিতায় থাকতে হয় বেশী কিছু–ভাব আর প্রকাশের সামঞ্জস্য, গণমানুষের ভাব-ভাবনার সাথের ঐক্যবদ্ধতা এবং ইতিহাস চেতনা যা মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা পাঠে সংশয়হীন ভাবে মিলে যায়।

তাঁর হাতে কাব্য পঙক্তি নির্মাণে কোনো আড়াল-আবডাল বা বিভ্রান্ত নেই । আবেগের সরলতম প্রকাশ বলে তাৎক্ষণিক মনে হলেও বাস্তবে তাও নয়। মহাত্মা মার্কস ‘প্রকৃতি বলতে হিউম্যানাইজড ন্যাচারের উল্লেখ
করেছেন যার সংগে মানবিক সম্পর্ক উদ্ভাসিত, নব রূপে রূপায়িত, সে ক্ষেত্রে কল্পনার স্থান আছে সৃষ্টিতে’। কল্পনা ছাড়াও শিল্পের জগতে ইন্ট্যুশন শব্দটির অস্তিত্ব রয়েছে যার সংগে কল্পনার কোন বিরোধ নেই । ‘ ইন্ট্যিুশন’ হচ্ছে একদৃষ্টিপ্রসূত বিকল্প-বিহীন অখন্ড উদ্ভাস’ । গোর্কির মতে ‘কল্পনা ছাড়া মানুষের চিন্তা অনুর্বর, যেমন বাস্তবতা ছাড়া কল্পনা’ । সুতরাং কবি প্রতিভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘সৃজনধর্মী কল্পনা শক্তি’ কবি তাঁর অন্তর-আবেগের উদ্ভব ঘটিয়ে চৈতন্য-শরীর নির্মাণ অখ- ও মানবিক করে তুলেবেন। এ’যুগ মহাকাব্যের নয়, বীর একিলিসের আবির্ভাব ও সম্ভব নয়। সমাজ খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, শত শত বছরের ব্যাবধান কমে যাচ্ছে. টেকনোলোজির ব্যাপক প্রভাবে । প্রতিক্রিয়ায় মানুষের মনে যে ব্যাপকতর পরিবর্তন ঘটে চলেছে তার প্রেক্ষাপটে চেতনা-জগতের দেয়ালগুলোতে নানা রকম ছাপ পড়ছে কোনটা বিকৃতির কোনটা নতুনের । একজন সচেতন কবির তাই সবসময় নতুনে হয়ে থাকতে হয়, বদলাতে হয় তার প্রকাশ কাঠামো। পাঠকের সংগে সংযোগের মুল বিষয়টি হলো তাই । যদিও এ কথাটি বেশ চালু আছে যে শিল্পের দাবী দূরবর্তী, খানিকটা সত্য, তবে কৈবল্যবাদিরা যেমন করে বলেন আসলে তা’ নয়। শিল্প সমকালীন ও দূরবর্তী ।
১ …ওরা চিরকাল টানে দাঁড়
ধরে থাকে হাল;
ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে

পাকা ধান কাটে–ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে ’
২. কবি কাজী নজরুল ইসলামে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা
‘যবে উৎপীড়িতের ক্রনন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারির খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত‘
আমি সেই দিন হবো শান্ত..’
৩. পোল-আমেরিকান কবি চেসোয়াভ মিউশ-এর কবিতা- (অনুবাদ মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়)
‘এই-তো পোল্যাণ্ডের সব অগভীর নদী–ধোয়া উপত্যকা। আর বিশাল সেতু
শাদা কুয়াশায় চলে যাচ্ছে । এই-যে ভাঙাচোরা শহর আর হাওয়া ছিটিয়ে দেয়
তোমার কবরের ওপর গাং চিলের চীৎকার.
যখন আমি তোমার সঙ্গে কথা বলি
কাকে বলে কবিতা,যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষ?’
৪. আমেরিকার কবি গীন্সবার্গের কবিতা-অনুবাদ: [কবি মুনির সিরাজ]
আমেরিকা আমি তোমাকে সব দিয়েছি
এখন আমি নিঃস্ব
জানুয়ারী ১৭,১৯৫৬-আমার কাছে মাত্র দু’ডলার সাতাশ সেন্ট
আমার নিজের মনকেই আমি সহ্য-করতে পারছিনা
আমেরিকা . কবে আমরা মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করবো।
৫.. বা জার্মান কবি গুন্টাগ্রাসের কবিতা [অনুবাদ: সলিমুল্লাহ খান ]
‘যে কথা না বললেই নয়’

এতদিন কেন চুপ মেরে আছি ,কেন মুখ খুলিনি এত দীর্ঘ দিন
একটা খেলা চলছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
মহড়া চলছে প্রকাশ্যে দিবালোকে
এ খেলার শেষে আমরা বেঁচে যাই তো হবো পাদটীকা’
কবিতাগুলো সমকালে এবং দূর-কালে সবসময়ই থেকে যাবে প্রাসঙ্গীক । উল্লেখিত কবিতাগুলোর গঠন, শব্দ প্রয়োগ রীতি, বাক-বিন্যাস, বিষয় এবং রূপ নির্মাণ একই রকম কেবল প্রকাশের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা আমরা লক্ষ্য করি। যদিও তাঁদের মধ্যে দেশ কালের ব্যাবধান আছে. তবুও ঐক্য একই সুর-মুখী । অর্থাৎ সময়, সামাজিক অবস্থা ও অবস্থানের দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও বিষয় ও রূপ-কল্পনার ঐক্য এক হয়ে আছে।
১. ‘মানুষের ভাষা হোক পাখিদের ভাষা
পাখিদের ভাষা হোক মানুষের ভাষা’
কিংবা
২. ‘তুমি আমি জন্মে জন্মে ভাষা-নাগরিক
ভাষা বাংলা বিশ্বজোড়া, নাই দিগ্বিদিক

’ডাকছে সেই অণুকোকিল
কোকিল ডাকছে
বিগ ব্যাং খেকে বিগ ব্যাং পর্যন্ত
সীমিত মানবজীবনে তুমি-আমি হঠাৎ হঠাৎ শুনতে পাচ্ছি সেই কুহু’
লাখনৌর কুহু কবিতাটি ফ্রয়েডের মনস্তত্ব-এর মিশেলে একটি পরাবাস্তব কবিতা হলেও এরকম নয় যে এর রস আস্বাদন দুরূহ হয়ে আছে, কারণ প্রয়োগকৃত বাাংলা কাব্য-নীতিমালার কাঠামোটি অটুট রেখে তিনি তাঁর অন্তর আর বাহিরকে পরিপার্শ্বে দৃশ্যমান, অদৃশ্যমানকে চলমান ও ফ্রিজ করে ইন্দ্রিয়ের অনুভব কে সুরের মাধ্যমে ধরতে চেষ্টা করেছেন, যা ধীরে ধীরে নানা স্থানচ্যুতি ও সংযোজনের মাধ্যমে ঘুরে-ফিরে চেতনা-মহলে প্রবেশ করে। পাঠকের অনুভুতিতে সেই কোকিলের ডাক অনুরনণিত হয় যা চেতনার অংশ হযে যায় এবং এর গঠন যে ভাবে কবি শুনতে পান একজন মুনূহুর শ্রবনে –লাখনৌর কোকিল ডাকছে– । ‘ফ্রয়েডের আবিষ্কার অনুসারে– আমি কে? আমি আমি নই, অন্য কেউ.. আমি ও আমার অপর মিলে আমি একটা অন্য কিছু.’। কবি অনন্ত কাল ধরে বিরামহীন সেই ডাক শুনে যাচ্ছেন একজন মুনূহু; মানে ‘মুহম্মদ নূরুল হুদা’ আর তখন অগণিত পাঠক যারা পাঠ করলেন নিবিষ্ট হলেন তারাও তেমনি এক অনুভবের দরোজায় পৌঁছালেন। এই রহস্যময়তা আবহমান বাংলার, বাউল কবিদের প্রকাশে ‘আমি’-র উপস্থিতি মানুষের অন্তরের ‘আমি’ পরম। এখানে কোকিল সুন্দর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে অন্দরে ফিরে আসা আনন্দরূপ- যা ‘স্থান-কাল-বদলরত বস্তু-অবস্তুর আলোকডানায় ডাকছে অণু-কোকিল’।

‘পরিশেষে সমতালে বদ্ধ হতে না পারার জন্যে যে তত্ত্বকে একমাত্র সত্য রূপে একদল শিল্পী আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তার পরিণতি. গোর্কির ভাষায় অলস মস্তিষ্কের সস্তা আমোদের খোরাক’। এর কবল থেকে উদ্ধারের জন্যে শিল্পী সাহিত্যিকদের কিছু নির্দেশ তর্জনী সংকেতের মতো তুলে ধরেছিলেন ব্রেশট। তিনি মনে করে শিল্পী যিনি তার কাজ হবে–
১. জনসাধারণের অহিতকারী শক্তির বিরোধিতা করা
২. ঐতিহাসিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ করে বাস্তবের রূপায়ণ
৩. অন্তরে প্রগতি-চিন্তার লালন
৪. মানুষে মানুষে বৈষম্যের কারণ সম্পর্কে সচেতন
৫. জনগণের চাহিদা প্রসংগে বাস্তব জ্ঞানার্জন
৬. জনগণের সাংস্কৃতিক জীবনের মান উন্নয়নে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির ভঙ্গি গ্রহণ ।
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বাংলা কাব্যের ধারাবাহিকতায় সাঁতার কেটে কেটে আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন । মিশেয়ে দিয়েছেন আধুনিক সকল মনোভঙি তার কবিতার শরীরে, যার জন্য প্রতিভার দরকার। সংগত কারণেই তাঁর কাব্য-প্রতিভা ও গ্রহণযোগ্যতা ঈর্ষণীয়।

সহায়কঃ
১. শিল্প সংস্কৃতি ও সমাজ, বিনয় ঘোষ,
২. সবার জন্য নন্দন তত্ত্ব , হাসানাত আবদুল হাই
৩. কিয়ের্কেগার্দ,এবং মুশায়েরা,
৪. মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব, বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com