সাক্ষাৎকার

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

রাজু আলাউদ্দিন | 25 Dec , 2017  

murtaza-2শিল্পী মুর্তজা বশীরের এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল ২০১৪ সালে তার জন্মদিনের( ১৭ আগস্ট) অল্প কয়েক সপ্তা আগে। কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউ্দ্দিন কর্তৃক গৃহীত এই সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহসান।
রাজু আলাউদ্দিন : বশীর ভাই, আপনার জন্ম তো ১৯৩২ সালে আগস্টে। (১৭ই আগস্ট—মুর্তজা বশীর)। তাহলে আগামী ১৭ আগস্টে হবে…
মুর্তজা বশীর : ৮১ পেরিয়ে ৮২তে গিয়ে পা দেব। আমার জন্মক্ষণ আমার পিতা স্বহস্তে লিখে গিয়েছিলেন। তখন কৃষ্ণপক্ষ দ্বিতীয়া, আরবি সনসহ পুরো দিনক্ষণটাই। কারণ আমাদের বাসায় ছোটবেলায় দেখেছি যে, একটা ছোট খাতা ছিল মেরুন কালার চামড়ার বাঁধাই করা। ওখানে আমার পিতা সন্তানদের নাম নিজের হাতে লিখতেন। আমারটাও তার নিজের হাতে লেখা। ওখানে লেখা ছিল : একটি পুত্রসন্তান লাভ, নাম আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ। উঁনি আবার বাংলা বানান, আরবি বানানটা, প্লাস পহেলা ভাদ্র, বুধবার, ইংরেজি সন-তারিখ, অর্থাৎ পুরো জিনিসটাই উনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। প্রত্যেক ভাইয়েরই ওরকম করা ছিল। ওটা শিল্পকলা একাডেমি থেকে আমার যে বইটা বের হয় সেখানে এর রিপ্রিন্ট করা আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার জন্ম তো ঢাকাতেই।
মুর্তজা বশীর : ঢাকায় মানে… ঢাকাতেই। আমার বাবা তো তখন ইউনিভার্সিটিতে, এখন যেটা ব্রিটিশ কাউন্সিল, ওটা ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের পাশে কলার বাগান। ব্রিটিশ কাউন্সিলের উত্তর দিকে, ওখানে গম্বুজ দেয়া একটা বিল্ডিং ছিল যার সামনে জোড়া কবর—আলু শাহ, মালু শাহ বলে দুইভাই। ওই বিল্ডিংটায় আমার জন্ম। ওটা পরিচিত ছিল হাসান সাহেবের কুঠি বলে। মামুদ হাসান সাহেব ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন। ওটা ছিল প্রোভস্টের বাড়ি। উঁনি যখন বিলেতে যান তখন আমার বাবা অস্থায়ী প্রোভস্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। তখন উনি ওই বাড়িতে ওঠেন। ওই বাড়িতে আমার জন্ম।

ওই বাড়িতে অর্থনীতিবিদ ড. মোশাররফ হোসেন ছিলেন, পরবর্তীতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ভাইস চ্যান্সেলর মনিরুজ্জামান মিয়া, উনিও ছিলেন ওই বাড়িতে। তো ওই বাড়িতেই আমার জন্ম, দিনের ১২টা ২৫ মিনিটে। কিন্তু পরে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বৃটিশ কাউন্সিলের গা-ঘেঁষে গম্বুজওয়ালা বিল্ডিংয়ে থাকতাম—গম্বুজগুলো এখনো আছে, সাদা সাদা চারকোণা পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। আমার বেশ মনে আছে কিছু স্মৃতি—খুব বৃষ্টির সময় পাথরগুলো খুলে খুলে পরে যেত। বৃষ্টি শেষ হলে আমি আর আমার ইমিডিয়েটলি বড় দুই ভাই মিলে পাথরগুলো কুড়াতাম। কুড়িয়ে ওগুলো ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল বিভাগে জমা দিতাম যাতে আবার রিপ্লেস করা যায়। আর মনে আছে ছুটির সময়, গ্রীষ্মের ছুটির কিংবা পুজোর ছুটির সময়, তখন তো হলগুলো ফাঁকা, তখন আমার মা আমাদের নিয়ে ঘুরে বেরাতেন হলের বারান্দা-টারান্দায়। পুরোটাই ফাঁকা। দুই-একজন ছাত্র তো থাকেই, যাদের হয়তো পরীক্ষা-টরীক্ষা থাকে।

রাজু আলাউদ্দিন : ওই সময়ের ঢাকা শহর আপনার অনেকখানি মনে আছে।
মুর্তজা বশীর : তখন তো ঢাকা ইউনিভার্সিটি সংলগ্ন রমনা ছিল ইউনিভার্সিটির পরিবারদের। শহরতো ছিল চকবাজার, লালবাগ, বংশাল, ইসলামপুর, নওয়াবপুর–ওই দিকটা। কিন্তু এই দিকে শহর ছিল না। এখানে ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আবাসিক এলাকা ছিল। সেই সময় খুব নিরিবিলি, রাস্তায় তখন এই রকম বিজলী বাতি ছিল না, ছিল গ্যাসের লাইট। সন্ধ্যার পর একদম নিঝুম হয়ে যেত, গাড়ি-ঘোড়া কিছুই চলতো না। ঘোড়ার গাড়ি মাঝেমধ্যে চলতো কেবল। রিকশা তো এসেছে আরো পরে, চল্লিশের দিকে। ঢাকায় রিকশা শুরু হয় চল্লিশ-একচল্লিশের দিকে, তখন তো রিকশা ছিলই না।
রাজু আলাউদ্দিন : তো আপনার পড়াশুনা প্রথমে বাসায় শুরু হলো। তারপর…
মুর্তজা বশীর : আমি এক চোটে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হয়েছিলাম নবকুমার হাই স্কুলে। স্কুলটা বকশীবাজারে ছিল। এখন যেটা নবকুমার হাইস্কুল–ওইটা না, এখন যেটা বদরুন নেছা গার্লস কলেজ এটা ছিল নবকুমার হাই স্কুল। আর এখন যেটা নবকুমার হাই স্কুল–ওটা ছিল শিক্ষা ভবন, ওটা ছিল মেয়েদের স্কুল। পার্টিশনের আগের কথা বলছি, মানে দেশভাগ হওয়ার আগে। ওখানে আমার সব ভাইরা পড়াশুনা করেছে। ওখানে আমি সরাসরি ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হলাম।
রাজু আলাউদ্দিন : সরাসরি কেন তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হলেন, এর পেছনে কারণ কী ছিল?
মুর্তজা বশীর : বাড়িতে আমার মা, আমার হাউজ টিউটর পড়িয়েছে। অতএব ক্লাস টু-তে যখন আমাকে ভর্তি করাতে নিয়ে গেল—তখন এর নিচে ক্লাস ওয়ান ছিল, ক্লাস টু, ক্লাস থ্রি—ক্লাস টু-তে আমি যখন সব পারলাম তখন ক্লাস থ্রি-তে তুলে দিল।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার বয়স কত ছিল?
মুর্তজা বশীর : আমার বয়স ছিল সাত বছর। ১৯৩৯ সালে আমি ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হই।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার আব্বা, মানে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কখনো চাপ দেননি অল্প বয়সে ভর্তি করার জন্য?
Murtaza-1মুর্তজা বশীর : আমার সেটা সঠিক মনে নাই। তবে সরাসরি আমি এবং আমার ইমিডিয়েট বড়ভাই একই ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম। একই সাথে পড়ছিলাম ক্লাস থ্রি-তে, তারপর ’৪০ সালে ক্লাস ফোর-এ উঠলাম, ক্লাস ফোর থেকে ফাইভ-এ ওঠার সময় আমার ইমিডিয়েট বড় যে ভাই সে ফেইল করল। ফলে আমার মা আমাকে আর ফাইভ-এ পড়তে দিলেন না। বলেন যে, ছোটভাই উপর ক্লাসে পড়বে আর বড়ভাই নিচের ক্লাসে পড়বে, ও ক্লাস ফোরে আবার পড়ুক, সে পাকা হয়ে উঠবে। ওই সময় আমার একটা স্মৃতি মনে আছে, ওই সময় লিপটন কোম্পানির চা স্কুলগুলোতে বিনা পয়সায় খাওয়ানো শুরু করল। মনে হয় প্রায় বছরখানিক টিফিন আওয়ারে বিনা পয়সায় চা দিত।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা কি বাঙালিদের চা-এ অভ্যস্ত করার জন্য? লিপটন তো পাকিস্তানি কোম্পানি।
মুর্তজা বশীর : না, বৃটিশ কোম্পানি।
রাজু আলাউদ্দিন : এখানে (তৎকালিন পূর্ব-পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করে) এই কোম্পানির যে এজেন্ট সে তো বোধহয় পাকিস্তানি ছিল, নাকি?
মুর্তজা বশীর : না, পাকিস্তান তখন হয় নাই, তখন তো বৃটিশদের শাসন ছিল। মনে আছে আমাদের টিফিন আওয়ারে বড় বড় পিতলের গোল ডেকচি থাকতো, তারপর আমরা ছাত্ররা লাইন ধরে দাঁড়াতাম ওই চা খাওয়ার জন্য। এই যে এক বছর-দেড় বছর চা খাওয়ালো, এতেই কিন্তু চা-র প্রতি মানুষের আগ্রহ জাগল; এই ইনভেস্টমেন্টটা, বিনা পয়সায় চা খাওয়ানো, এতে করে মানুষ জানল চা সম্পর্কে।
রাজু আলাউদ্দিন : ওই সময় স্কুলে ভর্তি হওয়র আগে আপনার আব্বা কি পড়াশুনা শেখানোর ব্যাপারে সহায়তা করতেন?
মুর্তজা বশীর : না, তেমন না, উনি করতেন না। আম্মা তদারকি করতেন আর হাউজ টিউটর ছিল, তিনি আমাকে পড়াতেন।
রাজু আলাউদ্দিন : ইউনিভার্সিটিতে তখন সহিংস ব্যাপার ছিল না এত।
মুর্তজা বশীর : তখন তো টিচাররা বিভক্ত ছিল না। একটা হার্দিক সম্পর্ক ছিল টিচারদের মধ্যে। এখন যেটা মেডিকেল কলেজ এটা তখন ইউনিভার্সিটি ছিল। এই ইউনিভার্সিটিটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হসপিটাল হয়ে যায়। তখন তো আসাম ফ্রন্ট-বার্মা ওই দিকে যুদ্ধ হচ্ছে। ওই সময় ইউনিভার্সিটিটা পুরোটাই হাসপাতাল হয়ে গেল। এখন যেখানে শহীদ মিনার সেখানে ব্যারাক ছিল সৈনিকদের থাকার সেবা-শুশ্রূষার জন্য। পরবর্তীকালে যখন পাকিস্তান হল, দেশভাগ হল, তখন মেডিকেল কলেজের দক্ষিণ অংশটা ইউনিভার্সিটির কাছে থাকল, বাকিটা হাসপাতালই থাকল। আর ব্যারাকগুলোতে মেডিকেলে পড়া ছাত্ররা থাকত। আর ওইখানে যে ব্যারাক, আমার মনে আছে, ছোটবেলায় ওখানে নানা রকম গাছ-গাছালি ছিল। ওখানে একটা ফকির ছিল। ওকে বলতো তেলীশাহ, অবাঙ্গালী, হিন্দি বলতো, গাঁয়ের রং কাল কুচকুচে, সারা শরীরে তেল মাখত। ধুতির মত একটা কিছু গান্ধীর মতো পড়ত আর গাঁয়ে ছালা-টালার মতো একটা কিছু লাগাত। তখন ঢাকায় রেসকোর্সের ঘোড়-দৌড় হতো। লোকজন ওর কাছে যেত রেসে কোন ঘোড়া জিতবে, ওঁর কাছে টিপসের জন্য। ওর কথা মতো লাঠি দিয়ে যাকে মারতো সেই জিততো। এইগুলো আমার মনে প্রকলভাবে আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি তো পড়েছেন আর্ট কলেজে।
মুর্তজা বশীর : আর্ট কলেজও ছিল না, ব্যাপার হলো আমার বাবা ১৯৪৩/৪৪ সালে বোধ হয় ইউনিভার্সিটি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তখন বগুড়াতে তিনি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ রূপে চাকরি পান। আমরা তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির এই সব কোয়াটার ছেড়ে ৫ নম্বর উর্দু রোডে হ্যাপি ভিলা বলে একটা বাড়িতে ভাড়া থাকি। আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিল বেগম বাজারে। ৭৯ বেগম বাজার, নাম ছিল পেয়ারা হাউজ, দুতলা বাড়ি। কিন্তু ওই বাড়িতে ভাড়াটে ছিল বলে আমরা একটা ভাড়া বাড়িতে থাকি। ওই সময় কিন্তু আবার যুদ্ধ চলছে। উর্দু রোডে থাকার সময় দুটো জিনিস প্রত্যক্ষ করি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। ট্রাকে করে সাদা সৈনিকদের মাঝে কালো সৈন্য। পড়ে জেনেছি ওরা ছিল নিগ্রো। এককালে আফ্রিকা থেকে তাদের দাস হিসেবে আমেরিকায় নিয়ে গিয়েছিল, তাদেরই বংশধর এরা। আর দেখেছি কঙ্কালের মতো ভূখা মানুষ—শিশু, পুরুষ ও নারী। তেতাল্লিশে দুর্ভিক্ষের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে ‘মাগো ফ্যান দাও’ আর্তনাদ।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি তো ফিগারেটিভ পেইন্টার ছিলেন, কবে থেকে বিমূর্ত চিত্রকলা শুরু করলেন?

মুর্তজা বশীর : মানে সমাজের প্রতি আমার যে দায়বদ্ধতা যে অঙ্গীকার তার ফলে সম্পূর্ণ বিমূর্ত ছবি আঁকার কোনো তাগিদ অনুভব করি নি। সম্পূর্ণ বিমূর্ত ছবি একজন শিল্পীর মনোজগৎ, তার চিন্তা-ভাবনা, তার আনন্দ, সেখানে যা সে সৃষ্টি করছে। কিন্ত যেহেতু সমাজের প্রতি আমার অঙ্গীকার রয়েছে, বিমূর্ত চিত্রকলা ভালো লাগলেও বিমূর্ত চিত্রকলা আঁকার জন্য কোন তাগিদ বোধ করি নি।
কিন্তু ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে—যখন দেখলাম আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব; যেমন আমিনুল ইসলাম, কিবরিয়া–এরা সম্পূর্ণ বিমূর্ত ছবি করছে, নিজে যেহেতু করছি না তখনও আমি সেমি-এ্যাবস্ট্রাক মানে আধাবিমুর্ত—ফিগারিটিভ কাজ যা মানুষকে ভিত্তি করে—ছবি আঁকতাম। নিজের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতা কাজ করলো যে—আমি বোধহয় এদের থেকে পিছিয়ে পরছি, মেইন স্টিম যেটা সেখানে পা রেখে চলতে পারছি না। কিন্ত আমার তো কমিটমেন্ট টু আওয়ার সোসাইটি, বিমূর্ত ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে কিন্তু করতে পারছি না, যেহেতু কমিটমেন্ট।
তখন দেশে রাজনৈতিক অবস্থা হল এক প্রকারের দমবন্ধ অবস্থা, আয়ুব খানের মার্শাল ল এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক কারণে একটি জটিলতা; স্বামী স্ত্রীকে বুঝছে না, পুত্র পিতাকে বুঝছে না—মানে কোথায় যেন যোগাযোগ আদান-প্রদানে একটা ব্যাঘাত ঘটছে। তখন আমার কাছে মনে হল যে, মানুষ একটা অদৃশ্য প্রাচীরের ভিতরে বন্দী, যার ফলে কেউ কারো সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে পারছে না। তখন আমি খুব অস্থির হয়ে গেলাম যে, কী করব?
তখন আমি বেগম বাজারে থাকি, পিতার বাসায়। রিকশা করে যাবার সময় ওই জেলখানার প্রাচীর দেখি। জেলখানার প্রাচীরে কখনো দেখি যে, অনেক জায়গাতে অনেক সময়ের জন্য পলেস্তরা খসে গেছে, কখনো ইট বেরিয়ে গেছে, কখনো হয়ত কোনো রাস্তার ছেলে পেরেক দিয়ে একটা আঁচর কেটেছে, হয়ত হাতে আলকাতরা মেখে দেয়ালে হাতের ছাপ লাগিয়েছে, হয়ত কোন পোস্টার অথবা বিজ্ঞাপন ছিল সেটা তুলে ফেলে দিয়েছে, ফলে আকার দাগ কিংবা টুকরো কাগজ লেগে রয়েছে–এইগুলো আমি দেখতাম। তখন আমার মনে হল যে, এই গুলোকে আমি যদি—মানে যা আছে—এই গুলোকে যদি আমি আঁকি তার এপারেন্ট লুক হবে এ্যাবস্ট্রাক, কিন্তু হান্ড্রেট পার্সেন্ট রিয়ালিজম। রিয়ালিজম আমরা কাকে বলি, যেটা আমরা চিনতে পারি; যেমন আমি যদি তোমার পোর্ট্রেইট করি আর পোর্ট্রেইটটা যদি মিলে যায় তাহলে বলবে যে এটা রাজু, রাজু সাহেব। (কারণ সে তো চিনতে পারছে—রাজু আলাউদ্দিন)। কিন্ত যদি সেটা না চেনা যায় তাহলে বলবে—এটা একটা যুবক বা একজন লোকের পোর্ট্রেইট। তো যেটাকে আমরা বুঝতে পারি সেটাকে আমরা রিয়ালিজম বলি আর যেটাকে বুঝতে পারি না সেটাকে আমরা বিমূর্ত বলি।

তো আমি দেখলাম যেভাবে নৈঃসর্গিক দৃশ্য আঁকছি দেখে দেখে কিম্বা একটা মানুষকে সামনে রেখে যেভাবে আমি আঁকছি, যদি আমি এই দেয়ালটা ওইভাবে আঁকি, কিন্তু যেহেতু এখানে কোন অবয়ব নাই, এখানে নানা রকম ট্যাক্সচার, ইমেজ… ফলে হবে কি, এইগুলো বিমূর্তভাবে ধরা দিবে। এই তখন আমি দ্যা ওয়াল বলে একটি সিরিজ করি। আমি প্রথম শুরু করি ঢাকায়, তারপর আমি লাহোরে প্রদর্শনী করব বলে পাকিস্তানে যাই, তখন সারগোদাতে আমার শালি থাকতো এয়ারফোর্সে, সেখানে বসে আমি কিছু ছবি আঁকি।

তারপর ’৭১ সালে যুদ্ধের সময় আমি সপরিবারে ফ্রান্সে চলে যাই। সেখানে আমি কিছু ছবি আঁকি। এই নিয়ে ৯২টি দেয়াল আমি এঁকেছিলাম।
কিন্ত এই ‘দেয়াল’ আমি ওই দেয়ালের সামনে বসে আঁকি নি। আমি নোট করেছি মানে কাগজ-কলম নিয়ে, আমি কখনো প্যাস্টেল রঙ দিয়ে এঁকেছি, আবার কখনো কলমে লিখেছি—লাল, নীল করে—তারপর আমি আমার ঘরে ওই নোট দেখে এঁকেছি, কিন্ত চাক্ষুষভাবে ওই দেয়ালটা আমার সামনে ছিল না। তো এইভাবে দেয়াল সিরিজ আমি আঁকি।

পরবর্তী কালে, যুদ্ধের সময় যখন দেশ থেকে চলে গেলাম, তখন বৃহত্তর প্যারিসের মোমোঁরসি নামক একটা জায়গায় ছিলাম—যেখানে দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশোকে অন্তরীন করে রাখা হয়েছিল, ওই মোমোঁরসিতে আমি থাকি। তখনও বাংলাদেশ হয়নি, আমি চলে গেলাম নভেম্বরের ৪ (’৭১) তারিখে, যখন ঘরে ঘরে সার্চ হচ্ছে। দেশ থেকে পালালাম এই জন্য যে বাঁচতে চেয়েছি, মরতে চাই নি। কারণ ঢাকাতে মার্চ মাসে যে মিছিল বের হয়েছিল, যেটাতে ৪টি মেয়েকে সামনে রেখে, লেখা ছিল ‘স্বাধীনতা’– ওটার নেতৃত্ব আমার ছিল। ফলে মনে একটা অপরাধবোধ, আমার গাড়ি ছিল, গাড়িতে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ উড়ত, কিন্তু জীবনকে ভালবাসি বলেই, মরতে চাই নি বলেই দেশ থেকে পালালাম—এটা সহজ সরল কথা। তো টেলিভিশনে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি দেখছি (ফ্রান্সে বসে¬—রাজু আলাউদ্দিন), তখন মনে একটা অপরাধবোধ, একটা অস্থির বোধ মনে। তো ওই অস্থিরতায়, ফ্রান্সে বরফ পড়ার পরে যেন উঠান নোংরা না হয় সে জন্য পাথরের ছোট ছোট নুড়ি বিছানো থাকে। তো হটাৎ জুতায় ঠোকর লেগে একটা নুড়ি উল্টে গেল। আমি নুড়ি পাথরটা তুল্লাম; তুলে দেখলাম যে, পাথরটা অনেক দিনের পুরনো মানে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো, মানে ডিসেকটেড অর্গানের মতো। তখন আমি ওইগুলো কুড়িয়ে নিলাম এবং তখন আমার মনে পরলো যে প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোন যোদ্ধা মারা যেত, তখন তার মাথার সামনে একটা পাথর রাখা হত। তখন সেই পাথর আক্ষরিক অর্থে আর পাথর না, একটা প্রতীক হয়ে যেত উন্মুক্ত আত্মার, যেটাকে বলা হয় ‘মেনহির’। তখন আমি এই নুড়ি পাথরগুলোকে আঁকলাম। এগুলোকে নাম দিলাম ‘এপিটাফ অব দ্যা মার্টারস’। এবং আঁকলাম হুবহু পথরটাকে দেখে। যেমন করে টেবিলের ওপর বোতল, বই কিংবা কারো পোর্টেট করি ঠিক ওই ভাবেই, ইউথ দ্যা ভিশন অব দ্য রেনেসাঁস পেইন্টার, একজন রেনেসাঁস শিল্পীর দৃষ্টি থেকে, মানে হুবহু-নিখুঁত আঁকা; কিন্তু মানসিকতাটা নিলাম ইমপ্রেশনিস্টদের।
এই যে রেনেসাঁস ছবিতে মানুষের রঙ বাদামী, কিন্তু ইমপ্রেসনিস্টদের ওখানে কিছু লাল, কিছু সবুজ, কিছু বেগুনি। তো আমার আঁকা পাথরের একটা জায়গায় কিছুটা হলুদ আছে, যেহেতু মানসিকতায় ইমপ্রেসনিস্টদের নিলাম, তাই আমি ওই হলুদটাতে নানা রকম হলুদ নিলাম—আমাদের তো নানা রকম হলুদ আছে : লেমন ইয়েলো, ইয়েলো, ক্যাডম্যাস ইয়েলো—একটা হলুদ লাগালাম না, যেটা ইমপ্রেশনিস্টরা করত—একটা ব্লেন্ড করলাম আমি, এমন করে ‘এপিটাফ ফর দ্যা মার্টাস’ ৩৭টা ছবি আঁকলাম। ফ্রান্সে এঁকে মোট ৯২টার মতো হলো। দেশে ফিরে আসলাম ’৭৩-এর জুনে, আগস্টের ১ তারিখে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলাতে যোগ দিলাম এবং ’৭৬ সালে শিল্পকলা একাডেমিতে শহীদ শিরোনামে ‘এপিটাফ ফর দ্যা মার্টাস’ প্রদর্শনী করলাম।
এই ছবিগুলোর বিষয়বস্তু দেখতে এ্যাবস্ট্রাক, কেউ তো পাথর এভাবে দেখেনি, তারপরে এরশাদ (স্বৈরশাসক হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ) বিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হল, তখন মিছিলের ছবি তো আমি আঁকি নি। তখন চিটাগং থেকে এসে ধানমণ্ডিতে আমার ভাইয়ের বাসায় থাকতাম, আমার ভায়ের একটা ওয়ার্কশপ ছিল, তো সেখানে একটা গাড়ী রোজা নামে; যেমন নোয়া, ভক্সি নামের¬—ওটা একটু এক্সিডেন্ট করেছিল, ওয়ার্কশপে যখন ডেন্টিং-টেন্টিং করত, ওইটা আমি দেখে ফটোগ্রাফ করলাম। সেগুলো এ্যাবস্ট্রাক্ট একেবারে। সেই ফটোগ্রাফ দেখে দেখে আমি ইরাপ্সন, রোজা-১, রোজা-২, ইত্যাদি কাজগুলো ওয়র্কশপের ওই ডেন্টিং কার দেখে করতাম। পরে যখন পত্রিকা খুলে দেখি ধর্ষণ, হত্যা, ফেন্সিডিল এই সব থাকতো; তখন অবশ্য ইয়াবা আসেনি।
আমি একজন সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে এবং মার্কসবাদে বিশ্বাসী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি—আগামীর একটা সুন্দর দিন আছে; কিন্ত পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে মানুষ হতাশায়, তাই একজন সমাজ সচেতন শিল্পী হিসেবে আমার কর্তব্য দাঁড়াল মানুষকে এই হতাশা থেকে মুক্তি দেওয়া। তখন আমার মাথায় আসলো প্রজাপতির খুব ক্ষণিকের জীবন, কিন্তু খুব ভাইব্রেন্ট, জীবন্ত, লাফাচ্ছে এবং তার ডানায় নানা রকম আলো। আমি প্রজাপতি, আমার এখানে আছে প্রজাপতির কালেকশন (ঘরে টাঙান ছবিগুলোকে ইঙ্গিত করে—সাক্ষাৎকারগ্রহীতা), আমি প্রজাপতির পাখায় যা আছে হুবহু আঁকলাম। এটার নাম হলো ‘দ্যা উইং’, পাখা, ডানা। এই ভাবেই আমার কাজ এখন পর্যন্ত করছি।

রাজু আলাউদ্দিন : আপনি তো ফ্রান্সে ছিলেন এবং ফ্রান্স হচ্ছে শিল্প-সাহিত্যের নানা রকম আন্দোলনের জায়গা, যেমন সুরিয়ালিজম, পরাবাস্তববাদ। তাদেরও তো একধরনের কমিটমেন্ট ছিল এবং সেই কমিটমেন্ট যতটা না সমাজের কাছে, তার চেয়ে বেশি শিল্পের কাছে। এই কমিটমেন্টকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মুর্তজা বশীর : প্রথমেই বলেছি আমি বিশ্বাস করি, যেহেতু একজন শিল্পী সমাজবদ্ধ, সামাজিক এবং সমাজ তাকে সবকিছু দিচ্ছে, তাকে খাদ্য দিচ্ছে, পরনের কাপড় দিচ্ছে, ইন্টারনেইনমেন্ট দিচ্ছে; অতএব তার কর্তব্য হচ্ছে সমাজকে প্রতিদানে কিছু দেয়া, এটা আমি বিশ্বাস করি। এবং বিশ্বাস করি বলেই আমি পুরোপুরি নিজের আনন্দের জন্য কোনো ছবি আঁকি নি।
এই যে নিজে আনন্দ পাচ্ছি—রঙ ছিটালাম, এটা করলাম ওটা করলাম। কিন্তু আমি যা করেছি সেটা প্রথমেই আমার মাথায় ছিল যে, একজন দায়বদ্ধ শিল্পী হিসেবে যতটুকু স্বাধীনতা নেয়া যায়, ঠিক ততটুকু নিয়েছি। এর বেশি নেই নি।
রাজু আলাউদ্দিন : বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, দেশের বাইরের ছবির মধ্যে আপনার কার কার ছবি ভাল লাগে বেশি?
মুর্তজা বশীর : ব্যাপার হল, আমার কখনো একধরনের শিল্পীকে ভাল লাগেনি। কারণ প্রতিনিয়ত আমার চেইঞ্জ হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে, চিন্তার পরিবর্তন হচ্ছে এবং চিন্তার যেহেতু পরিবর্তন হচ্ছে সেহেতু আজকে যাকে আমার ভাল লাগে, কালকে তাকে আমার ভালো লাগেনি। যেমন ধর ইমপ্রেশনিস্টদের মধ্যে রেনোঁয়া। রেনোঁয়াকে আমার কখনোই ভালো লাগেনি। আমি ইটালিতে যখন পড়েছি তখন রেনোঁয়া দেখেছি, ফ্রান্সে যখন ছিলাম তখন রেনোয়াঁ দেখেছি, কিন্তু রেনোঁয়া কখনই আকর্ষণ করেনি আমাকে। কিন্তু আমি যখন ‘এপিটাফ ফর দ্যা মার্টারস’ আঁকছি, সেই সময় আমি আমেরিকাতে গেলাম স্টেট ডিপার্টমেন্টের গেস্ট হিসাবে ’৭৮-এ, তখন আমি রেনোঁয়া খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেছিলাম।
রেনোঁয়ার কাজের বৈশিষ্ট্যটা কী? যে, রংয়ের ভেতর দিয়ে রংয়ের ভাইব্রেশন। আমার ‘এপিটাফ…’ তো ওই রকম ছিল। যেমন ধর সবসময় আমাকে যারা অনুপ্রাণিত করে এখনো, সেটা আমার ২৪ বছর বয়সে যে করেছিল আজকে ৮১ বছর বয়সেও সে করে। সেটা হল—আর্লি রেনেসাঁস। মাইকেল এঞ্জেলো, দ্য ভিঞ্চি, রাফায়েল, টিসিয়ান; বত্তিচেল্লির কাজ দেখেছি, পরবর্তী কালে রেমব্রান্ট—এরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেনি। এঁদের কাছ থেকে আমি কোনো কিছু শিখতে পারিনি। কিন্তু আমি যখন ইতালিতে গেছি, সশরীরে তাদের কাজ দেখেছি, এদের নাম এতো শুনেছি-দেখেছি, এদের সব কাজ দেখার পরে আমি দেখলাম আর্লি রেনেসাঁস পেইন্টার জত্তো, সীমাবু ফ্রা আঞ্জেলিকো, দুচ্চো, সিমন মার্টিনি কিংবা তাদের আগে বাইজেন্টাইন—এরা আমাকে অনেক উদ্বুদ্ধ করে। কারণ আমি যা করতে চাই, একটা ফ্ল্যাট জমিন সেখানে খুব সীমিত রং, মিনিমাইজেশন অফ ড্রয়িং, এদের কাজের মধ্যে সেটা আছে। ফলে এদের থেকে আমি যতটা শিখতে পারি তা অন্যদের কাছ থেকে পারিনা। কারণ মাইকেল এঞ্জেলো, রাফায়েল, দ্য ভিঞ্চি, রেমব্রান্ট এদের পেইন্টিংয়ে অন্য জিনিস। এদের তুলনায় আমার সমস্যা তো অন্য। এদের কাজ অনেকটা আর্কাইক।
Basheer-bhaiযেমন লিটারেচারে, আমাকে যদি তুমি বল, আপনি শেক্সপিয়র পছন্দ করেন? আমার কাছে শেক্সপিয়রের কোনো বই পাবে না। আমার লেখার চয়েস খুব অন্য রকম। মানে যতই সে বিখ্যাত হক না কেন আমি তার বই পড়ব না। আমি পড়ি না। কারন এরা আমাকে কিছু দিতে পারবে না। আমার যেমন ধর বিদেশি সাহিত্যে একজিস্টেনসিয়ালিস্ট—যেমন ধর, জঁ পল সার্ত্র, আলবেয়ার কামু–এদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পারি। তারপর ধর মিড ফিফটিজ-এর বিলেতে যে জেনারেশন ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ যাদের মধে জন অসবর্ন, জন ব্রেইন, লিল্ডা লিন ব্যাঙ্গস, স্যান বাটলো–এদের সব বই আমার কাছে আছে। আবার আমেরিকানদের মধ্যে ‘বিট জেনারেশন’ যারা—যেমন কেরুওয়াক, গিন্সবার্গ, এদের বই আমার ভাল লাগে। এদের থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পারি। তবে আরেকজন লেখক আছে যার কাছ থেকে আমি কিছুই শিখতে পারি না কিন্তু তার লেখা আমার ভাল লাগে সে হল আলবের্তো মোরাভিয়া। আমার তার লেখা পড়তে ভাল লাগে। এটা আমি নিজে তৃপ্তি পাই, কিন্তু তার কাছ থেকে আমি কিছু নিতে পারি না। (এইটা পড়ার আনন্দ শুধু—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, পড়ে আমি খুব আনন্দ পাই।
রাজু আলাউদ্দিন : মোরাভিয়া কি আপনি ইতালি গিয়ে পড়া শুরু করলেন, নাকি পরে শুরু করলেন?
মুর্তজা বশীর : এটা ইটালি থাকাকালে পড়া শুরু করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন : ইটালিয়ান ভাষায় পড়লেন, মোরাবিয়া, না ইংরেজিতে?
মুর্তজা বশীর : না, ইংরেজীতে। তারপর ধর নাট্যকার টেনেসি উইলিয়াম আমার খুব প্রিয়, আর্থার মিলার আমার খুব প্রিয়। এদের বই আমার আছে, জঁ জেনের বই আছে। কিন্তু এর বাইরের কোন বই আমার কাছে নাই। ব্যাপার হল কি শোন, প্রথম প্রশ্ন হল আমি কেন পড়ব? সময় কোথায় তোমার জীবনে? জীবন তো খুব ছোট। আমি ৩০ বছর বাঁচতে পারি, ৫০ বছর বাঁচতে পারি, ৮০ বছর বাঁচতে পারি, ৯০ বছরও বাঁচতে পারি; জীবন তো শর্ট, অফুরন্ত না।
এই জীবনের মধ্যে প্রথম প্রশ্ন হল—তুমি কি করতে চাও? তোমাকে প্রথমে ঠিক করতে হবে যে, আমি এই করতে চাই। তো এই করতে চাইলে কে এই ধরনের চিন্তা ভাবনা করেছিল তাদের কাছে আমাকে যেতে হবে তাদের কাছে এবং তাদের কাছ থেকে আমাকে গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে। আমার মিলটন পড়ে কোন লাভ নাই, শেক্সপিয়র পড়ে কোন লাভ নাই। যেমন বাংলা সাহিত্যে তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি। একটাও বই পড়িনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দু একটা ছাড়া অন্য কিছু পড়িনি। এরা তো বিরাট বড় মাপের। কিন্তু আমি দেখেছি বাংলা সাহিত্যে, আমি যেহেতু এককালে ছোটগল্প-টল্প লিখেছি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করেছে। এবং আমার মতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখক বাংলা সাহিত্যে কম তৈরি হয়েছে। আমার কথা হল, আমাকে সমৃদ্ধ করার জন্য যে লেখক দরকার আমি তাকে পড়বো, তা ছাড়া পড়বো না। আমি তো সব হতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : এমনিতে আপনার পরাবাস্তববাদী শিল্পীদের শিল্পকর্ম ভাল লাগে, তাই না?
মুর্তজা বশীর : ছবি ভালো লাগে কিন্তু কখনো আমি ওই ধরনের ছবি আঁকা চিন্তা-ভাবনাই করি নি।
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, ওদের মধ্যে কাকে আপনার কাছে বেশি আকর্ষণীয়, বেশি ভাল লেগেছে?
মুর্তজা বশীর : আমার সালভাদর দালির চেয়ে চিরিকো ভালো লাগে বেশি। (জর্জিও চিরিকো—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ। ওকে আমার খুব ভাল লাগে।
রাজু আলাউদ্দিন :চিরিকোকে ভাল লাগে, রেনে ম্যাগ্রিৎকে আপনার কেমন লাগে?
মুর্তজা বশীর : না, ওদের আমার তেমন ভালো লাগে না। দালি ভালো লাগে তার কাজের করণকৌশলের জন্য। যেভাবে কাজের ট্রিটমেন্ট। বিষয়বস্তুগুলো আমাকে তেমন আকর্ষণ করে না।(তার হিউজ ইমাজিনেশন—রাজু আলাউদ্দিন)। না, এগুলো কখনো আমাকে আকর্ষণ করে নি, আমি কখনো পরবাস্তব কাজও করি নি।
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, পিকাসোর তো অনেক রকমের ব্যাপার আছে, তার অনেক পিরিয়ড আছে, শিল্প কৌশলের একটা ব্যাপার আছে?
মুর্তজা বশীর : পিকাসোকে আমার সব সময় ভালো লাগে। কিন্তু তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞসা কর যে, পিকাসো এবং ব্রাক–এই দুজনের মধ্যে কে গ্রেট আর্টিস্ট? আমি একেবারে নিঃসন্দেহে বলব, Georges Braque is a greatest Artist than Picasso. But still I am fan of Picasso. কারন এই যে বৈচিত্র্যময়, এই যে সে বেঁচে আছে, নানাভাবে কাজ করছে, সব কাজ যে তার ভাল হচ্ছে কি মন্দ হচ্ছে তা না। যেমন জর্জ বার্জারের একটা বই আছে, Success and failure of Pablo Picasso. কিন্তু এই যে সে জীবন্ত, প্রতি মুহূর্তে সে কাজ করছে, সে নতুন কিছু উদ্ভাভাবন করছে He is seeking something, এই যে বৃত্তাবদ্ধ হয়নি, আমি যেটা আমার জীবনে নানাভাবে কাজ করেছি। অনেক শিল্পী মনে করে নিজস্ব একটা স্টাইল ডেভেলপ করে ওটাকে রাখাই তার সাইন– আমি এটা বিশ্বাস করি না। আমার কথা হল কাজ দেখলে বুঝা যাবে, ধর আমার ‘এপিটাফ ফর দ্যা মার্টার’-এর সাথে আমার ‘প্রজাপতি’র কোন মিল নাই বিষয়বস্তুর দিক থেকে। কিন্তু আমার মন-মানসিকতার তো মিল আছে, ট্রিটমেন্টে তো মিল আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি বৈচিত্র্যের জন্য পিকাসোকে ভালবাসেন।
মুর্তজা বশীর : পিকাসোকে আদর্শ মনে করি আমি।
রাজু আলাউদ্দিন : তাহলে ব্রাককে কী কারণে মহৎ মনে করছেন?
মুর্তজা বশীর : ব্রাক ইন্টেলেকচুয়্যালি অনেক সলিড একেবারে, কিন্তু বৈচিত্র্য নাই।
রাজু আলাউদ্দিন : সেই অর্থে কী বৈচিত্র্য হুয়ান মিরোর মধ্যে খুঁজে পান?
মুর্তজা বশীর : কোথায় মিরোর মধ্যে বৈচিত্র্য? শেষের কাজ তো একই রকম।
রাজু আলাউদ্দিন : মানে একই স্টাইলের, কিন্তু একই বিষয়বস্তুর কি?
মুর্তজা বশীর : সবগুলো এক, তাই না?
রাজু আলাউদ্দিন : পরের দিকের এক শিল্পী, অনেক সময় বলা হয়ে থাকে সু্রিয়ালিস্ট, যদিও তিনি নিজেকে কখনো সুরিয়ালিস্ট দাবি করতেন না, মনেও করতেন না, যেমন ফ্রিদা কালো; ফ্রিদা কালোর ছবি আপনার কেমন মনে হয়?
মুর্তজা বশীর : আমি খুব বেশি দেখিনি। আমি দিয়েগো রিবেরার কাজ দেখেছি প্রচুর, আমি অরোসকোর কাজ দেখেছি, আমি তামাইওর কাজ দেখেছি, (হুম, রুফিনো তামাইও—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, রুফিনো তামাইওকে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে, তার তো সবচেয়ে বিখ্যাত হল ‘তামাইও’স পিংক’, ওই যে একটা পিংক একটা রেডিস কালার লাগাত। তবে তামাইও, অরোসকো আর রিবেরা–এই তিনজনকে যদি আমি বিবেচনা করি, আমার কাছে তামাইওর কাজ একটু অন্য রকম, অরোসকোর কাজ অন্য রকম আবার রিবেরার কাজ অন্য রকম, তিনজন তিন রকম কিন্তু। তবে তামাইও’র কাজটা অনেক বেশি কনটেম্পরারি । তামাইওর কাজ আমাদের দেশে এত দেখা যায় না। যেমন তামাইও’র কাজ বইতে খুব কম দেখা যায়। আমি তামাইও’র কাজ প্রথম দেখলাম আমেরিকায় ১৯৭৮-এ, সান ফ্রান্সিস্কোতে। তার আগে নাম শুনেছি, তার আগে আমি তামাইওর কাজ একটা-দুইটা দেখেছি। কিন্তু অনেকগুলো কাজ আমেরিকায় সান ফ্রান্সিস্কোতে দেখলাম।
রাজু আলাউদ্দিন : আঁদ্রে ব্রেতোঁ মেক্সিকোতে গিয়েছিলেন, আপনি জানেন। (হ্যাঁ, আঁদ্রে ব্রেতোঁ, ওর কবিতা আমার খুব ভাল লাগে—মুর্তজা বশীর)। উনি কিন্তু ওই সময়ই রুফিনো তামাইওর কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, এবং পছন্দ করেছিলেন।
murtaza-3
মুর্তজা বশীর : ব্রেতোঁ’র কবিতা আমার ভাল লাগে, ব্রেতোঁ’র কবিতার বই আমার কাছে আছে। এ্যাপোলিনিওর আমার ভাল লাগে। কিন্তু লুই আরাগঁ আমার ভাল লাগে না। আমি জানি না কেন। পল এলুয়ার আমার ভাল লাগে না। যার জন্য পল এলুয়ারের কোন বই নাই। আমার যাদের ভাল লাগে তাদের বই আছে। এপোলিনিওর-এর বই আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : লোরকাতো আপনার খুব প্রিয় কবি।
মুর্তজা বশীর : হ্যাঁ, লোরকা আমার খুব প্রিয় কবি। লোরকাকে অনুবাদও করেছি। লোরকা হল শোনার জন্য। লোরকা পড়ে যতটা না তৃপ্তি পাওয়া যায়, ওর সাউন্ডটা অনেক বেশি ভালো লাগে।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা ঠিক। তবে ছবিও কিন্তু এঁকেছেন, অসম্ভব রকমের সুরিয়ালিস্টিক ছবি কিন্তু আছে তাঁর কবিতার মধ্যে। আমার তো মনে হয় যে, সুরিয়ালিজমের সূচনা ফ্রান্সে হলেও সত্যিকারের সফল সুরিয়ালিস্ট কবিতাগুলোর রচনা হয়েছে ফ্রান্সের বাইরে। বিশেষ করে স্প্যানিস কবিতায় অনেক বেশি। যেমন আপনার লোরকা। তারপর চিলির আরেকজন কবি আছেন বিসেন্তে উইদোব্রো অসম্ভব রকমের সুরিয়ালিস্ট।
মুর্তজা বশীর : আচ্ছা, আমি তোমাকে আমার কিছু কবিতা দেখাই। (উঠে গিয়ে তিনি সেলফ থেকে একটা বই নিয়ে এলেন—সাক্ষাৎকার গ্রহীতা)। আমার একটা সবচেয়ে প্রিয় কবিতা, এটা চিটাগং থেকে বেরিয়েছে, আমি পয়েমসের ওপর আর্টিকেল লিখেছি, ‘নদী ও নারী’র (সিনেমা) স্ক্রিপ্ট কিন্তু আমার। উপন্যাস আছে, ছোটগল্প আছে। এটা (একটা কবিতাকে চিহ্নিত করে) আমার খুব ভাল লাগে। এটা সুররিয়ালিস্টিক কিনা দেখ। আমি পড়ি—
সহস্র বছরের নদী কোন মাঝরাতে সাপ হয়
পূর্নিমার গোল চাঁদ ওঠে প্রজাপতির পাখায়।
জোছনা মেখে শঙ্খিনী কাজলতায় দেখে মুখ
জোনাকির দীপ দুনয়নের সবুজ রথ
রতিমগ্না নারী এলোমেলো কেশে নদী হয়
খরগোসের পায়ে নূপুর, কাল কোকিল পালকে
প্রজাপতির সব রং কুমারি মনের ছায়াপথে
দেয়ালীর বাতি জ্বেলে হাজারো ঢেউ সে চাঁদ।

রাজু আলাউদ্দিন : হুম, সুন্দর।
মুর্তজা বশীর : আরেকটা ছোট্ট কবিতা। কবিতার নাম ‘অবশেষে’—
প্রথমবার কথাগুলি বললে তুমি
অমি বেদনার দীঘিতে ভেসে গেলাম,
দ্বিতীয়বার কথাগুলি বললে তুমি
আমি আনন্দের সাগরে ডুব দিলাম,
তৃতীয়বার কথাগুলি বললে তুমি
আমি অমাবশ্যার রাতে ক্ষয় হলাম।

রাজু আলাউদ্দিন : বাহ্, তোফা, ভাল। আপনার মনে আছে, আপনি ১৯৫২ সালে একটা কবিতা পাঠিয়ে ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়েকে?
মুর্তজা বশীর : হ্যাঁ, ওইটা ছাপা হয়েছিল ‘পরিচয়’ পত্রিকায়, শিরোনাম ছিল ‘পারবেন না’। ওইটাই প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের কারো লেখা পশ্চিমবঙ্গে ছাপা হয়।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, এবং ’৫২-র ঘটনা দ্বারা আপনি এতটাই আলোড়িত হয়েছিলেন যে…
মুর্তজা বশীর : আমি তো আবুল বরকতকে দুহাতে আর অন্যদের সাথে বহন করেছিলাম। আমার সারা শরীর লাল হয়ে গিয়েছিল রক্তে।
রাজু আলাউদ্দিন : ওই কবিতাটা কি আছে আপনার?
মুর্তজা বশীর : না, এটার (হাতের বইটিকে ইঙ্গিত করে) মধ্যে নাই। আমি তোমাকেই শুধু বলে দেই যে গ্রন্থটি ছিল, সেটার মধ্যে কোনো পেজ মার্ক ছিল না। ওইটা ডাইরির মতো। এ্যাকচুয়ালি আমার সব কবিতা প্রেমের কবিতা, সেই দিনের যে ঘটনায় (কোনো এক প্রিয়তমাকে দেখার প্রথম দিনের ঘটনাকে স্মরণ করে—সাক্ষাৎকার গ্রহীতা) আমার মনের অবস্থা কি প্রেমিকার সাথে, ওটা ইন্সট্যান্ট প্রোজ আমি পয়েট্রিতে লিখছি। মনে কর, আমি তার বাসায় গেলাম। সেই দিন ছিল পহেলা জানুয়ারি ১৯৭৮, ১৭ পৌষ ১৩৪৮, ২২ মহরম ১৩৯৮। আমি যখন দেখলাম সে স্নান করে আসছে তখন আমি লিখছি—
উঠোনে বিছানো রোদে দু’পায়ে মারিয়ে ধান
আমার সমুখে এলে, পেছনে একটা চিনে হাঁস
ভেজা শালুকের রেশ অঙ্গরাগে ছড়িয়ে তোমার
ফড়িংয়ের চঞ্চলতা জানালার পর্দা জুড়ে
দেগাঁর ছবি কেসপ-সাধন আমি দেখলাম, আর দেখলাম
পৌষের ধান ক্ষেত হৃদয়ের সবখানে, শুধুই আকাল
তোমার বাড়ির সীমানায় রক্তজবা ফুল

রাজু আলাউদ্দিন : হুম, সুন্দর। ওই প্রেমিকার সঙ্গেই কি পরে আপনার বিবাহ হয়েছে, নাকি?
মুর্তজা বশীর : না। আরেকটা ছোট কবিতা ‘১০ জানুয়ারি’—
বাইরে থেকে এলাম
মেঘলা আকাশ হিমেল হাওয়া রোদ পলাতক
তবু কি আশ্চর্য, জোনাকি আমার ঘরে।

‘তার’ বার্থ ডে-তে আমি গিয়েছি। সব তো ইয়াং ছেলে, আমার বয়স তখন ষাটের মতো, ‘তার’ বয়স ২৩/২৪।
যখনি আমি আসি হলুদ পাখিরা দেয় শিস
তুমি বলো আর হাসো
একদিন ক্ষয়ে যাবো যৌবনের ভিড়ে
বাজাবে হলুদ পাখি শিস পৌষের দুপুরে
তখনও কি পরবে মনে—
জন্মদিনে ছিল এক আপন অতিথি?

রাজু আলাউদ্দিন : বাহ্, সুন্দর।
মুর্তজা বশীর : অতিথি, আবার ‘আপন অতিথি’, এই রকম কিছু কবিতা।

রাজু আলাউদ্দিন : আপনার একটা কবিতার বই হল ‘ত্রসরেণু’…
মুর্তজা বশীর : কবিতার বই হল আমার তিনটা—ত্রসরেণু, তোমাকে শুধু, এসো ফিরে অনুসুয়া। আরেকটা অগ্রন্থিত, ওটার নাম হল ‘সাদা এলিজি’। বেশিরভাগ হসপিটালে, আমার নিজের সম্পর্কে, আমার যখন ষাট বছর হল সেই সম্পর্কে আমি আমার কবিতা লিখেছি। পহেলা ভাদ্রতে আমার জন্ম—
আগামী পহেলা ভাদ্র পা দেব ষাটের ঘরে আমি
অষ্টপ্রহর হেঁটেছি জীবনের সাজি মাটি সিঁড়ি
অস্তাচলে অস্তমিত চাঁদ, হাওরে বিলাপধ্বনি
শৈশবের কথা মনে নেই,
শুনেছি দুচোখ ভরে পৃথিবীর আলো দেখবার আগেই
আমার হাত এসেছিল গর্ভবাস থেকে
অন্ধকারের কাজল মুছে দিয়ে
স্পর্শমনির খোঁজে বাইরে বেরিয়ে..
.
আমার মা পড়ে গিয়েছিলেন। আমার হাত বেরিয়ে এসেছিল। দুইরাত-দুইদিন আমার মা শুতেন না, বসতেও পারতেন না, দাঁড়িয়ে থাকতেন। রিয়েল ফ্যাক্ট একেবারে।
এ্যালবামের পাতায় রুপালি ত্রিভুজে অবরোধ্য স্মৃতির স্মারক
কৈশোরের জলছবি, কালের সাক্ষর পোকা কাটা পাংসুটে হলুদ
যৌবনের পালা গান, মরিচিকাময় মরুদ্যান
অন্বেষী হৃদয় যেন শতাব্দির জীর্ণ ইমারত
উড়ছে যেখানে শুধু জালালী কবুতরের ঝাক।

রাজু আলাউদ্দিন : সিনেমার দিকে আপনি কিভাবে গেলেন, আকৃষ্ট হলেন কিভাবে?
মুর্তজা বশীর : সিনেমার প্রতি আমার একটা দূর্বলতা আছে, আমি দেখলাম সিনেমা এমন একটা মিডিয়াম যেখানে সবকিছু আছে।
রাজু আলাউদ্দিন : সেখানে ছবি, পেইন্টিং…
মুর্তজা বশীর : হ্যাঁ, ছবি আছে, পেইন্টিং আছে, কমপোজিসন আছে, ম্যুরালের মতো-স্কাপলচারের ফ্রিজের মতো আছে, কালারের নানা রকম খেলা আছে ইত্যাদি। পেইন্টিংয়ের একটা লিমিটেশন আছে, আমি তো ছবি আঁকি, একটা জায়গায় গিয়ে কিন্তু আর যাওয়া যায় না। এই যে আজকের ইন্সটলেশন, এসবের কারণ কিন্তু ওই সীমাবদ্ধতার জায়গা থেকে। পিকাসো যে কিউবিজম করল, সেটার পেছনেও কিন্তু পেপার কেটে লাগিয়ে দিল। একটা জায়গায় লিমিটেশন আছে। যেহেতু তার সারফেস একটা লিমিটেশন, তার বেশি যাওয়া যাবে না। কিন্তু ইন্সটলেসন, এইগুলো কিন্তু চিরস্থায়ী না; যার জন্য পিকাসোর মত শিল্পী যে প্রথম চিন্তা করেছে, যেমন ধর একটা সাইকেলের সিট তারপর একটা হ্যান্ডেল দিয়ে বুলের মাথা, এই যে তাঁর ইরোস, কিন্তু সে তো করল না ইন্সটলেসন। কারণ তার স্থায়িত্ব নাই। আর্টের সাথে যদি হৃদয়ের সংযোগ না থাকে, যেটা আমিনুল ইসলাম বলেছিল—আজকালকার আর্টিস্টরা ক্রাফটসম্যান হয়ে গেছে, কারুশিল্পী, নিখুঁত, কিন্তু ইমোশন থাকতে হবে। শুধু গ্রামার থাকলে যেমন সাহিত্য হয় না আবার শুধু উচ্ছ্বাস থাকলেও সাহিত্য হয় না, গ্রামার আর উচ্ছ্বাসের সংমিশ্রণ করতে হবে। অবশ্য মাও সে তুঙ বলেছেন অন্যভাবে, ‘ফর্ম ও কনটেন্টের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।’
রাজু আলাউদ্দিন : গ্রামারটা হলো এখানে ক্র্যাফটম্যান অর্থে আর ইমোশন হল সৃষ্টি, এমন এক ধরনের সৃষ্টিশীলতা তৈরি করবে যা আপনাকে বিমোহিত করবে। আপনি তো সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। (‘নদী ও নারী’, যেটাকে এখন ক্লাসিক বলা হয়—মুর্তজা বশীর)। এই স্ক্রিপ্টের পরে আর নতুন কিছু কি লিখেন নি?
মুর্তজা বশীর : না। এরপর আরেকটা লেখার কথা ছিল, ‘আকাশের নীল রঙ’ বলে, পরে আর হয়নি। আমার তো ব্যাপার হল কি জানো, (আমার একটা কবিতা আছে, কবিতাটা এখানে নাই) আমর জীবনটা হল একটা ওয়েস্টপেপার বক্সের মত।
রাজু আলাউদ্দিন : কেন?
মুর্তজা বশীর : তাই মনে হয়েছে কিন্তু আমার। সবকিছু করতে চেয়েছি, আসলে কিছুই করতে পারি নি। জাস্ট ওয়েস্টেড মাই টাইম। (এখানে নাই ঐ কবিতাটা, তাহলে) তুমি দেখতে পেতে, ‘বাজে কাগজের ঝুড়ি’। আমার জীবনটা তাই আমার মনে হয়েছে। তবে আমার কোন দুঃখ নাই। দুঃখ নাই এই জন্য যে, অনেক কিছু করতে চেয়েছি। করতে চেয়েছি তো অসুবিধা কি! ব্যাপার হল, যেটা ভাল লেগেছে সেটা করছি। প্রেম করতে ইচ্ছে হয়েছে, করেছি। বউ ছিল বাচ্চা ছিল, সবই ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : প্রেম করতে গিয়ে পারিবারিক কোন ঝামেলা হয়নি?
মুর্তজা বশীর : হ্যাঁ, নানা রকম বাঁধা, অবশ্যই হওয়ার কথা। (সেই ঝঞ্ঝাগুলো আপনি পার হয়েছেন?—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, তার মধ্যে অসুবিধা কি! যেমন ধর, আমি তোমাকে বলি, ইতালিতে যখন পড়তাম। আমার সাথে একটা ইতালিয় মেয়ে She was a ‘Miss’ academy. একাডেমির সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। আমার বয়স তখন ২৫, ওর বয়স ১৯। সে আমার প্রেমে পড়ল এবং ও বাংলা শিখে ফেলল। ও যখন আমার সাথে কথা বলত বাংলায়, ইতালিয়ানরা বলত তুমি কি? ‘আমি বেঙ্গালা’—ও বলতো। ইতালিতে নর্থে হল সোনালী আর সাউথ হল কালো চুল। যেহেতু ওর চুল সোনালী, ও বলত—আমি নর্থ বেঙ্গালা। ওরা বুঝত না, কারণ বাংলা সে ভাল বলত।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার কাছ থেকেই শিখলো বাংলা?
মুর্তজা বশীর : হ্যাঁ, আমার কাছ থেকে শিখেছে। বাংলা শিখলো একমাসে এবং আমার মাকে চিঠি লিখত সে বাংলায়। (তাই নাকি!—রাজু আলাউদ্দিন)। রোমান ভাষী সে, আর টুকটাক লিখতে পারত বাংলায়। এর ছবি এখনো আছে আমার কাছে। আমার বিয়ের রাতে আমি বউকে সব ছবি দেখিয়েছিলাম। কোন লোক পারবে না এটা। আমার বউকে, তার বয়স তখন কুড়ি, আমার বয়স ত্রিশ। আমি বললাম, এটা আমার অতীত, আজ থেকে অফ্। আমার বউ আমাকে পরে বলল—এগুলো কি বিয়ের রাতে কেউ দেখায়! কারণ আমার অতীতটাকে বললাম যে, এইটা আমি। আমি এও বলেছিলাম যে, আমি ইচ্ছা করলে নষ্ট করতে পারতাম। দুটো কারণে করি নি। একটি হল আমার হৃদয় থেকে তুমি মুছতে পারবে না, আর দ্বিতীয় হল এগুলো ইতিহাসের অঙ্গ। এগুলো ছাপা হবে। এখন ছাপা হয় তো, মুর্তজা বশীরের সাথে মেয়ে। পেপারে আছে তো, ছাপা হচ্ছে। এবং আমি এগুলো ‘আমার জীবন’ বলে যে বইটা ওখানে আছে, আমি এর কথা বলেছি। শোনো, সত্য বলতে অসুবিধাটা কি? আমি খুব ভ্যাগবান, আমার সন্তানরা—আমার দুই মেয়ে, বড় মেয়ে যুঁইর বয়স ৪৪/৪৫, ছোট মেয়ে যূথী ৪০, ছেলে যাসী ৩২, এই ইন্টারভিউ বই লেখার আগে আমি এদের জিগ্যাস করেছি তাদের কোন আপত্তি আছে কিনা। আমার বড় মেয়ে সুন্দর কথা বলেছে আর ছোট মেয়ে তো হাসতে হাসতে মরে গেল।
রাজু আলাউদ্দিন : কী বলল?
মুর্তজা বশীর : আরে আব্বু আপনি এইগুলো সব… ব্যাস, এই। ছোট মেয়ে, বড় ছেলে কোন কথাই বলল না, জাস্ট শুনল। বড় মেয়ে খুব সুন্দর কথা বলল। আমি তাকে একটা ইউরোপীয়ান মেয়ের মত বড় করেছি। ওর মধ্যে কোন রকম বাঙালিত্ব নাই। বলল, ‘বাবা, you are a public figure. অতএব public figure-এর কোন Privacy নাই। সব জানার অধিকার মানুষের আছে। পারিবারিক অবস্থার মধ্যে কিছু অসুবিধা হয়। ‘দেশ টিভি’তে ৫-৬ মাস আগে আমার একটা ইন্টারভিউয়ে আমি খোলামেলা কথা বলেছি। যেটা আমাকে আসাদুজ্জামান নূর বললেন, এটা সবাই বলতে পারত না। আমার মূল হল আমার সন্তান, আমার স্ত্রী; ওরা যদি মাইন্ড না করে I don’t care. কে কী ভাবলো, আমার মেয়ের শশুর বাড়ি কি ভাবলো, ছেলের শশুর বাড়ি কি ভাবলো, ওরা তো আমায় খাওয়ায়-পড়ায় না। আসলে এরা যদি কিছু না মাইন্ড করে আমার তো কিছু যায় আসে না। But I’m very lucky যে, আমার দুই মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোক, আমার ছেলের শ্বশুর বাড়ির লোক, এরা এইসব নিয়ে ভাবে না। আমাদের সমাজের লোকে করে, আরে তোমার বাবা এই বয়সে প্রেম করে! কত রকম ভাবেই তো বলে।
রাজু আলাউদ্দিন : আমাদের এখানে যারা শিল্পচর্চার সাথে জরিত এদের ছবির ব্যাপারে আপনার কি মত?
মুর্তজা বশীর : সত্য কথা বলতে কি, আমি বাংলাদেশের শিল্পকলা নিয়ে খুব আশাবাদী। এখানে যে শিল্প চর্চা হচ্ছে, যে ধরনের শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে—আমাদের ঐতিহ্য কত দিনের, চল্লিশ বছর? পাকিস্তান আমলে আমার ঐতিহ্য কিছুই ছিল না। বলা হতো অজন্তা-ইলোরা হিন্দু ঐতিহ্যের অংশ। ময়নামতি, পাহাড়পুর এইগুলো বৌদ্ধদের, মুসলমানদের কিছু গর্ব করার মত ছিল না। ‘কালিঘাট’ হিন্দু আর্ট। আজকে বাংলাদেশে যে পর্যায়ে আর্ট চলে গেছে সেখানে ভারতের থেকে অনেক ডেভলপড আমাদের কাজ। কিন্তু Problem হচ্ছে প্রজেকশানটা হচ্ছে না। ইন্ডিয়ান আর্টে ইন্ডিয়ান গর্ভমেন্ট যে ভাবে ওদের প্রজেকশন করে, (মকবুল ফিদা) হুসেন-টোসেনকে যেরকম আন্তর্জাতিকভাবে প্রজেকশন করে, আমাদের কিন্তু ঐ প্রজেকশনটা নাই। ফলে হল কি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই সমস্ত ইন্টারনেশনাল শো-গুলোতে বাংলাদেশকে পার্টিসিপেট করতে হবে। দুটো জিনিস, একটি হল বাইরের লোক জানবে আর একটা পতাকা উড়ছে। বাংলাদেশের নাম জানবে। আমি যখন ইতালিতে পড়ি সারা ফ্লোরেন্সে দেখলাম একমাত্র বাঙালি আমি আর রোমে রবিউদ্দিন আহমেদ। এখন ১৯৯৯-এ গেলাম, ভুড়ি ভুড়ি বাঙালি। ২০০৬ এ গেলাম যেখানে-সেখানে বাঙালি দেখছি, ভেনিসে দেখছি ছাতা বিক্রয় করছে। বেঙ্গল বলতে তারা ভাবত বাঘ। আমাকে বলত, বেঙ্গালা! যেখানে টিগরে! (টিগরে দ্য বেঙ্গালা—রাজু আলাউদ্দিন)। ইস্ট পাকিস্তান চিনত না, বেঙ্গল চিনত। আমাকে বলতো এই বাঘের মধ্যে থাকো কেমনে, আমরা তো বিড়াল দেখলে ভয় পাই।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

শিল্পী মুর্তজা বশীরকে নিয়ে রাজু আলাউদ্দিনের প্রবন্ধ:

শিল্পী মুর্তজা বশীরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

Flag Counter


4 Responses

  1. Saif Barkatullah says:

    ভাল সাক্ষাৎকার

  2. Austrik Aarzu says:

    বেশ লাগল। তার সমকাল এবং তার অনেক না-জানা কথা জানলাম।

  3. L Gani says:

    সবাইকে হুমায়ুন আহমেদের বই পড়তে হবে কেন বুঝলাম না রাজু ভাই।

  4. prokash says:

    important and rich interview. thanks razu alauddin.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.