নির্ভুল না হবার পরও যখন স্মৃতিরা সত্য

সোহরাব সুমন | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১১:৪৯ অপরাহ্ন

Stroutসম্প্রতি পুলিৎজার পুরস্কার বিজেতা ঔপন্যাসিক এলিজাবেথ স্ট্রাউট কবি লুইস গ্লুক-এর “নস্টোস” কবিতা এবং স্মৃতিকে আশ্রয় করা সম্ভব–সাহিত্যের এমন শক্তিশালী উপায় নিয়ে আলোচনা করেন দ্য আটলান্টিক ডেইলি’র প্রতিবেদক জো ফাসলা-এর সঙ্গে।
গত বছর প্রকাশিত এলিজাবেথ স্ট্রাউট-এর সর্বাধিক বিক্রিত উপন্যাস ইন মাই নেম-এ, অসুস্থ এক বর্ণনাকারী তার মায়ের গল্পের সাহায্যে তার শিশুবেলাকে স্মরণ করেন। এবছর প্রকাশিত, এনিথিং ইজ পসিবল, নতুন উপন্যাসে স্ট্রাউট আমাদেরকে সেই বর্ণনাকারী লুসির নিজ শহরে নিয়ে যান এবং আমরা সেখানকার আরো অনেক গল্প জানতে পারি। এমন নয় যে ছেলে বেলার সেই অবিস্মরণীয় দুঃখজনক বেড়ে ওঠার ব্যাপারে লুসি অপরিহার্যতই অতি বিনয়ী, আদতে সে যা উপস্থাপন করেছে বাস্তব পরিস্থিতি যে তার চেয়ে সঙ্গীন ছিল, তা খুব সহজেই আঁচ করতে পারা যায়। বরং উপন্যাসটি পড়লে মনে হবে এর কোনো কোনো খুঁটিনাটি তার জন্য এতটাই যন্ত্রণা দায়ক ছিল যে সচেতনভাবে সেখানে প্রবেশ তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নতুন এই বইটির একটি দৃশ্যে, তার ভাই-বোনদের পারিবারিক অশান্তির স্মৃতি নিয়ে আলাপচারিতা থেকে লুসির মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া সন্ত্রস্ত অতীত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
অতীত এবং স্মৃতি এই দুয়ের মাঝখানের ঘোলাটে চৌহদ্দিই একজন লেখক হিসেবে স্ট্রাউটের অন্যতম একটি মূল বিষয়, এবং এ প্রসঙ্গেই তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। কীভাবে ফিকশনে স্মৃতি কাজ করে থাকে এবং কীভাবে স্ট্রাউট তার বিষয়কেন্দ্রীক ও কখনো কখনো অনেক বেশী স্মরণশক্তির ব্যঞ্জনাময় চরিত্র সমূহের সঙ্গে তার উদ্দেশ্য এবং বাস্তব ইতিহাসের ভারসাম্য প্রতিপাদন করতে, কবি লুইস গ্লুক-এর একটি কবিতার আলোকে তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপ করেন। তার লেখনীর উপরিতলে ভাসমান তার নিজের দীর্ঘকালীন স্মৃতিকে যুক্ত করবার বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার উপলব্ধিটিও স্ট্রাউট এখানে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন : পাঠকের মনের গহীনে নিমজ্জিত অনুভূতিকে উন্মুক্ত করতেও এই অভিজ্ঞতা সাহিত্যের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ইলিনয়ের এমগাশ গ্রামের বাসিন্দাদের আনন্দ আর বেদনার গল্প নিয়ে সদ্য ছাপা হওয়া, লুসি’র উপন্যাস, মাই নেম ইজ লুসি বার্টন। এই সব গল্পের একটি মেটাফিকশনাল বাঁক ধারণ করে আছে তার পূর্বেকার উপন্যাস, এনিথিং ইজ পসেবল। স্থানীয়দের কাছে এক সময়কার পরিচিত গোসলহীন, রোগা মতন ছোট্ট মেয়েটি এখন নিউইয়র্কের বাসিন্দা। সেই বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে পুনরায় বন্ধুত্ব স্থাপন করতে তাদের যথেষ্ট বেগ পোহাতে হবে। কিন্তু মনে হয় লুসির এই বই তাদেরও এক অগ্নিকান্ড, এক মায়ের সম্পর্ক, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, এক মহিলা দর্জির কাচি দিয়ে সংগঠিত নৃশংসতার মতোÑ ভয়াবহসব স্মৃতিগুলোকে উত্তোলন করে ছাড়বে। উপন্যাসটির শিরোনাম এর চরিত্রগুলোর সব সামর্থ্য পূরণ না করলেও, এর কোনো একটি চরিত্রকে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে পথ করে নিতে দেখা যায়। এটি এমনই একটি স্মারণিক, এমনকি বিতর্কের খাতিরে আমাদের জীবনের নিশ্চিত নানান ঘটনাগুলোকে বোধগম্য করে তুলতে যে গল্পগুলো আমরা বলে বেড়াই তার সবই কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়।
তার অলিভ কিটরেজ উপন্যাসটি ২০০৯ সালে পুলিৎজার পুরস্কার জিতে। এর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এইচবিও মিনি সিরিজ ম্যাকডরমেন্ড-এর জন্য তিনি এমি জিতেন। এটিসহ ফিকশনের ওপর লেখকের মোট ছয়টি বই রয়েছে।
আটলান্টিক ডেইলির প্রতিবেদক জো ফাসলা-এর সঙ্গে এই ফোনালাপে এলিজাবেথ স্ট্রাউট বলেন : স্মৃতি সম্পর্কে লেখা লুইস গ্লুক-এর কবিতা “নস্টোস” কবে প্রথম পড়েছি আমার মনে নেই। কবিতাটি কেটে আমি আমার কবিতার খেরো খাতায় এঁটে রাখি। কিন্তু কাজটি কখন করেছি তা এখন আর মনে নেই। কেবল মনে পড়ে কবিতাটি আমার ভীষণ পছন্দের ছিল। আর এর শেষ পঙতিটি ভয়ানকভাবে আমাকে আঘাত করে। এর গ্রিক শিরোনামের মানে “বাড়িফেরা” এবং এই শব্দটি এক অতি নায়কের কথা জানান দেয় যিনি দূর সমুদ্র থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। এর শিশুবেলায় ফিরে যাবার আকুতির কারণে কবিতাটি ছিল খুবই কৌতুহলোদ্দীপক। এক সময় উঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি আপেল গাছ, কাটা ঘাসের ঘ্রাণ তার কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই কথকের শিশু বেলায় দেখা অনুপুঙ্খ সেই স্মৃতি আমাদের বিমোহিত করে। কল্পনায় আমরা সেই কবিতার ভেতর প্রবেশ করি। তারপর, নীরবে কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে এর চূড়ান্ত বক্তব্যের শেষটুকু আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে :
বিশ্বটাকে আমরা একবারই তাকিয়ে দেখেছি সেই ছেলেবেলায়। বাকী সবটাই স্মৃতি।
এই লাইনটি আমাকে ভীষণ তাড়িত করে কারণ আমার কাছে একে সত্য বলে মনে হয়েছে। দেশ জুড়ে বিভিন্ন ভাষণে যখনই আমি পঙতিটি ব্যবহার করেছি শ্রোতাদের মাঝ থেকে শ্রবণযোগ্য শব্দ ভেসে আসতে শুনেছিÑ যেন এই ধারণাটির সত্যে তারা আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে, কেননা এর আগে কথাটি তাদের মাথায় আসেনি।
আমরা সাধারণত স্মৃতির কল্পলোক হিসেবেই ছেলেবেলার কথা ভেবে থাকি। নির্ভুল হোক বা না হোক, এই যুগটির কথা আমাদের বার বার কেবলই মনে পড়ে যায়। কিন্তু এই লাইনটি মাথার ভেতরকার সেই চিন্তায় টোকা মারে। কবিতাটির এই পর্যায়ে এসে মনে হবে গ্লুক যেন বলছেন শিশুবেলা কেবলই স্থির, নিত্য একটি বিষয়। বাদবাকী সব স্মৃতি একে অনুসরণ করে একের পর এক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, আমাদের পুরো পূর্ণবয়ষ্ক জীবনÑ স্মৃতির চলমান ক্ষেত্রের মাঝে ঘটে যায়। আমাদের সম্পূর্ণ বর্তমান কাল শিশুবেলার নিখাদ আভাসের ছায়া তলে সংগঠিত হয়। আমরা হয়তো ভাবি আমরা বেড়ে উঠছি, আমাদের বয়স বাড়ছে, কিন্তু আমরা কেবল সেই শরণ বিন্দুতেই ফিরে যাবার চেষ্টা করতে থাকি।
আমি মনে করি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতার কিনারাগুলো দ্রুত আমাদের ত্যাগ করে কারণ সভ্য সমাজে যে ভাষা আমরা ব্যবহার করছি তা খুবই মেকী। উদাহরণ হিসেবে, বিজ্ঞাপণের কথাই ধরা যেতে পারে। প্রায় সব সময়ই লোকেরা টিভি বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বিজ্ঞাপণ দেখছে। কোথায় নেই এই বিজ্ঞাপণ। আর এই বিজ্ঞাপণগুলোতে আমরা মহিলাদের ঘর মুছবার সময় হাসতে দেখি। অবশ্য এরা এখন এই বিজ্ঞাপণগুলোতে পুরুষদেরও নিয়ে এসেছে রান্নাঘর পরিষ্কারের সময় তারা হাসে। কয়েক জনকে আবার কুকুরের দড়ি ধরে হাসতে হাসতে হাঁটতে দেখা যায়।
সব সময় আমরা এধরনের চিত্র দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছি। এবং আমাদের জীবন সেই সব জীবনের মতো মনে না হওয়ায়, সচেতনভাবে না হলেও, আমরা বিচ্ছিন্ন বোধ করছি। অবচেতনভাবে, এই সব গল্পকথন আমাদের জীবনের সত্যিকার হাল সম্পর্কে সৎ থাকা আমাদের জন্য কষ্টকর করে তোলে। বেড়ে ওঠা এবং পরিপূর্ণতা লাভের সময়, পথ চলতে গিয়ে, আমরা নিজেদের এবং নিজস্ব অনুভূতি নিয়ে, সত্য না বলার ব্যাপারে শিখি।
সাহিত্য সরাসরি এর বিপরীত হওয়া উচিত। একে আমাদের উপলব্ধিগুলোকে শানিত করতে হয়, ভোঁতা নয়। একে সবার আবেগের মাঝে অবস্থান নিয়ে সেটাকে উৎড়ে দিতে হয়। একজন ফিকশন লেখক হিসেবে আমার কাজ হলো পাঠকের নাগাল পাওয়া। যাতে দীর্ঘ দিন ভুলে থাকা তাদের শিশু বেলার সেই সব স্মৃতিগুলোকে আলিঙ্গন করা যায়। তখনও পর্যন্ত আমাদের উপলব্ধিগুলো ছিল একেবারেই নিখাদ। যখন আমরা মেকী ভাষার দ্বারা একেবারেই কলূষিত হইনি। যে জগতের সবাই হেসে হেসে কুকুর নিয়ে হেঁটে বেড়ান। সাহিত্য আমাদেরকে তার চেয়ে ভিন্নভাবে নিশ্চিত সব যথাযথ প্রগাঢ় অনুভূতিগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যেন প্রচ্ছন্ন থাকার পরও, তা খুব স্বাভাবিকভাবে এখানেই রয়েছে। যখনই আমরা নিজেদের সেই সব অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হতে দেই, বিশে^র সঙ্গে নিজেদেরকে অনেক বেশী সংযুক্ত বলে অনুভব করি।
একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে, স্মৃতি এবং তারা যেখান থেকে উঠে আসে সে সম্পর্কে আমার যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। সোজা কথায় বলতে গেলে, আমাদের স্মৃতিগুলো আদৌ নির্ভরযোগ্য নয়। এবং তারপরও বাস্তব না হলেও এরা আমদের এমন কিছু বলবার প্রবণতা দেখায় যা আসলে আবেগীভাবে সত্য।
মাই নেম ইজ লুসি বার্টন এমন একটি বই যা স্মৃতির দ্বারা ভরপুর। এবং এর প্রথম পুরুষের বর্ণনায় লুসির স্মৃতি চারণ বইটির বড় একটি অংশের ভূমিকা রাখে। যতটা সম্ভব হয়েছে আমি তাকে একজন নির্ভরযোগ্য বয়ানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্ঠা করেছি। একরণেই সব সময় সে তার স্মৃতিকে যথাযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। যেমন : নিশ্চিত না হলেও আমি মনে করি কথাগুলো আমার মায়েরই বলা। আমি শুনেছি লোকেরা বলে বেড়াতো এটি তাকে অনির্ভরযোগ্য একজন বর্ণনাকারীতে পরিণত করেছিল। না। তিনি ছিলেন একজন সৎ বর্ণনাকারী। স্মৃতির পিচ্ছিলতা সম্পর্কে তিনি ছিলেন খুবই অকপট। সত্যি বলতে কি, কী-করে সব কিছু ঘটে চলেছে সে সম্পর্কে প্রায় সময়ই কিন্তু আামদের সবাই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেন না।
চরিত্রগুলোর মাঝে যারা খানিকটা কম বিশ্বস্ত তাদের নিজেদের অতীত নিয়ে সোজাসাপ্টা কথা বলার প্রবণতা দেখা যায়। তারা এমনভাবে সে সব গল্প বলে বেড়ান যেন ঘটনাগুলো নিশ্চিতভাবেই ঘটেছে। এটি আপনি এনিথিং ইজ পসেবল-এর প্রথম পাতাতেই দেখতে পাবেন:
যে রাতে টমি’র ডেইরি ফার্ম আগুনে পুড়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়, সে রাতে যেমন অনুভূত হয়েছিল, এখনও মাঝে মধ্যে সে অমন একটা ভয় নিয়ে কাজ করে। একইভাবে তার ঘরটাও আগুনে পুড়ে পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে যায়; বাতাসের তোড়ে ঘরের দিকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ভেসে আসে, যার অবস্থান অগ্নিকাণ্ড থেকে খুব বেশী দূরে ছিল না। ভুলটা ছিল তারই– সব সময়ই সে একে নিজের ভুল বলে মনে করে এসেছে– কারণ মিল্কিং মেশিনগুলো ঠিকঠাক বন্ধ হয়েছে কী-না সে রাতে সে তা খতিয়ে দেখেনি আর সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত।
একদিক দিয়ে, এটি একটি সোজাসাপ্টা স্মৃতি : একজন লোকের বসতবাড়ি ও গোলাবাড়ি পুড়ে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ছোট্ট দমক, “সব সময়ই সে একে নিজের ভুল বলে মনে করে এসেছে,” আমাদের জানান দেয় এর মাঝে আরো অনেক গল্প রয়ে গেছে। টমি একজন বিরতিহীন স্ব-নিন্দুক। বাস্তবে যা ঘটে গেছে তার দায়ভার হয়তো সে দাবী করছে না। এভাবে, স্মৃতি বাস্তবে যা ঘটেছে তার চেয়ে বেশী কিছু প্রকাশ করতে পারে। আমরা সবাই স্মৃতির সবচেয়ে পিচ্ছিল একটি অংশের ওপর বসে রয়েছি। এবং তা কতটা সত্য সেটা কোন বিষয় নয়, কোন না কোন কারণে তারা ওখানে স্মৃতি হিসেবে মজুদ আছে, এদিক দিয়ে তারা সত্য। তার চেয়ে বড় কথা হলো, হয় তো, আমরা কে এরা আমাদেরকে সে সম্পর্কে বলে দেয়।
আমরা সবাই দেখছি লোকেরা তাদের নিজেদের জীবনের গল্প বলে বেড়াচ্ছে। কখনও কখনও, আমরা সেই সব বয়ানের ব্যাখ্যা আর যুক্তিবিন্যাসের মাঝে ফাঁটল আঁচ করতে পারি। এধরনের কোন গল্প আমি আপনাদের জন্য লিখিনি। কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে লেখার সবচেয়ে কৌশলের বিষয়টি হলো কোন গল্পটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তা বাছাই করতে পারা : কী ঘটেছে তার বস্তুনিষ্ঠতা, বা একটি চরিত্রের স্মৃতিতে মজুদ আবেগী সত্য তুলে ধরা। আমি মনে করি না লোকেরা নিজেদের জন্য যে গাল-গল্পগুলো দাঁড় করায় তা তুলে ধরা সাহিত্যের কাজ। তাতে কেবল আমরা কতটা বিষয় প্রবণ সেটাই প্রকাশ পায়। তারপরও, অভিজ্ঞতা কতটা বিশাল এবং জটিল হতে পারে এর বড় ধরনের একটি মূল্যায়ন ফিকশন লোকেদের সাহায্য করতে পারে। যে বিশাল সংখ্যক বিশৃঙ্খলা যার সঙ্গে এবং যার মাঝে আর সবাই বসবাস করছি আমি কেবল তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বজায় রাখতে চাই। আমি মনে করি, এটাই আমার লক্ষ্য।

দুর্বলভাবে না লিখলে আমার হারাবার কিছু থাকে না।
চাপা পড়ে থাকা আমার নিজস্ব স্মৃতিগুলোকে উপরিতলে টেনে তোলার লিখন প্রক্রিয়ার একটি নিজস্ব উপায় রয়েছে। এবং এভাবে আমার কাছে যা ফিরে আসে তা সত্যিই বিস্ময়কর। আমার প্রথম বই, এমি এন্ড ইসাবেলে, বেরোবার বছর খানেক আগে, আমি একটি মেয়ের কথা জানতে পারি, যে কী-না শহরের কোন এক ব্যক্তির দ্বারা অপহৃত হয়। আমার নিউ হ্যাম্পশায়ার এবং মেইন-এ বেড়ে ওঠার সময়, স্থানীয় এক মেয়ে বছর খানেক ধরে হারিয়ে গিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, উপন্যাসটি আসলে এর ওপর ভিত্তি করে লেখা। সত্যিকারে সেই হারিয়ে যাবার ঘটনাটি ব্যবহার করে শরণ বিন্দু হিসেবে, আমি সোনালী রঙের মুজা পড়া একটি চরিত্র দাঁড় করাই। আমার শিশুবেলার সেই মেয়েটি হারাবার বছর খানেক পর, আমার বাবা-মা তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা-নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। এবং জানতে পারেন হারিয়ে যাবার সময় মেয়েটি হাঁটু সমান সোনালী এক জোড়া মুজা পড়া ছিল। কোন না কোনভাবে আমিও তা জানতাম এবং এক সময় ভুলেও গিয়ে ছিলাম। আমার বিশ^াস হয় না আজ পঁচিশ বছর পর আমার স্মৃতি কাজটা করতে পারছে। এটি একটি চূড়ান্ত উদাহরণ, তবে আমার কাজের সময় আমার যুবাকাল থেকে মজবুত স্মৃতিগুলো সব সময়ই সামনে এসে ধরা দেয়।
যে দিন খুব খারাপ লিখি সে দিনটি আমার জন্য খারাপ একটি দিন। তবে এধরনের ঘটনা খুব বিরল না হলেও, রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত হয়ে আমি কখনই বানে-বাদারে মাথা ঠুকে বেড়াই না। আমি সব সময়ই লিখতে সক্ষম; আমার রাইটার্স ব্লকের ধরনটি হলো দুর্বলভাবে লিখা। একেবারে কোন শব্দ নেমে না আসার চেয়ে বরং একে আমি ভালো বলেই মনে করি। দুর্বলভাবে লিখছি বুঝতে পারার পর আমি ভীষণ হতাশ হই। এটি আমাকে বিপর্যস্ত করলেও আমি জানি যে পরে আমি এসব ঠিকঠাক করে নেবার যথেষ্ট সুযোগ পাবো। আমি একে সেরায় রূপান্তরিত করতে পারবো, এটাই আসলে শেষ কথা।
যে কোন কাজের সঙ্গে এর মিল রয়েছে : যে দিন কাজে-কর্মে খুব খারাপ একটি দিন অতিবাহিত হয়, কটু কথা সেদিন শুনতেই হয়। আমার জীবনে এমন সময় এসেছে যখন আমি ভালোভাবে লিখতে পারিনি। এবং তখন নিজেকে আমার খুব ভয়ানক একজন লোক বলে মনে হয়েছে। পাগলের মতো বারা বার আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি : কেন আমি তা পারছি না? কেন? কিন্তু আমি নিজেকে শান্ত রেখে তা টুকে রাখতে শিখেছি। বাস্তবে লেগে থাকাটাই কিন্তু সব। দুর্বল বাক্য রচনা বাস্তবে খুব ভালো একটি বিষয়। কারণ এরপর আমি ওর ওপর নজর বুলাতে পারি এবং বুঝতে পারি ওরা কতটা দুর্বল। এবং আমি ওদের কে ছুড়ে ফেলতে পারি, যা সব সময় আমাকে কর্মসিদ্ধির একটি বোধ এনে দেয়। বাস্তবে এভাবে কোন কিছু ছুড়ে ফেলা আমি উপভোগ করি। এবং খারাপভাবে না লিখলে আমার হারাবার কিছু থাকে না।
লেখার কাজের জন্য আমার প্রিয় সময় হলো সকাল। এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। দিনের যতটা দীর্ঘ সময় জুড়ে আমরা বাস্তব পৃথিবীতে অতিবাহিত করি, কল্পনাবিশ্ব আমাদের থেকে ততটাই দূরে সরে যায়। আমার ক্ষেত্রে, বাস্তব জগতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় খুব বেশী জড়িয়ে যাবার আগে কল্পনাবিশ্ব আমার জন্য অনেক বেশী অভিগম্য থাকে। বিকেল বেলাতে তা অনেকটাই কঠিন, কেননা তখন আপনি অনেকটা সময় বাস্তব জগতে অতিবাহিত করে ফেলেছেন।
দুপুরের খাবারের আগ পর্যন্ত সেই সকাল থেকে আমি লেখালেখি এবং এই চেষ্টা অব্যহত রাখি। তারপর ১:৩০ বা ২টার দিকে ক্ষুধা লাগার পর, খুব সাধারণ কোন ভোজ হলেও সেই বিরতী আমার জন্য বিশেষ এক প্যাটার্ন। আমি এমনটাই জেনে এসেছি। তাই যতটা পারা যায় এই সময়টুকুকে দীর্ঘায়িত করে নেই।
আমার জন্য, ফিকশন লেখা সব সময়ই লোকেদের প্রতি আমার আগ্রহ নিয়ে কাজ করা। লোকেদের মাঝে আমি অশেষ আকর্ষণীয় সব আগ্রহী বিষয় খুঁজে পাই। এবং আমার সমস্ত জীবনের মাঝেও আমি এমন আকর্ষণীয় কিছুর সন্ধান পাইনি। আর তাই আমি লিখে চলেছি। মাঝে মাঝে খুব বিস্মিত হই কেন একাজ করছি, যখন দেখি অনেকে বড় বড় ফান্ডের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে আর অন্য সব কাজ-কারবার করে বেড়াচ্ছে। হতে পারে তা কেবল এই ধারণার কাছে ফিরে যাবার জন্যে : বিশ^টাকে আমরা একবারই তাকিয়ে দেখেছি সেই ছেলেবেলায়। আমি মনে করি শুরু থেকেই আমরা কোন এক ধরনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি, যা একজন ব্যক্তিকে একজন শিল্পী হয়ে উঠতে সিদ্ধান্ত নিতে প্রনোদিত করে থাকে। অপরিহার্যভাবেই, এটি বড় কিছু বা নাটকীয় কিছু পেতে পারে না। অথবা হতে পারে, আমরা ভিন্ন কোন স্বভাব নিয়ে জন্মেছি, এবং সেই ক্ষতকে সহজে মেনে নিচ্ছি। যাই হোক না কেন, সেই জায়গাতে ফিরে যাবার জন্য লেখা হচ্ছে একটি উপায় মাত্র।
হতে পারে, বাস্তবে লেখকরা খুব আলাদা কিছু নয়। ফিকশনের মাঝে একটি সত্যবাদিতা রয়েছে, এমন কি তা সত্য না হলেওÑ ঠিক যেমন করে স্মৃতিরা এক প্রকারের সত্যবাদিতা নিয়ে ভাসমান থেকে যায়, যদিও তা কখনই হুবহু সংগঠিত হয়নি। এভাবেই আমাদের সব গল্প ছায়াদের পুরোভাগে দাঁড়িয়ে থাকে।

বাই হার্ট এমন একটি সিরিজ যেখানে লেখকেরা সাহিত্যে তাদের সব সমকার প্রিয় উদ্ধৃতিগুলো তুলে ধরেন এবং সেটি নিয়ে আলোচনা করে থাকেন।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com