সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

রাজু আলাউদ্দিন | ১১ জানুয়ারি ২০১৮ ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

জীবদ্দশায় দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংক্ষিপ্ত অভিমত ও মন্তব্য জানালেও মুহম্মদ হাবিবুর রহমান সাক্ষাৎকার দানে ছিলেন পুরোপুরি অনীহ। ইতোপূর্বে তার একমাত্র যে-সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল সেটি গ্রহণ করেছিলেন ইতিহাসবিদ গবেষক জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দীন আহমদ যা একটি দৈনিক পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তার জীবদ্দশায়। কবি ব্রাত্য রাইসু ও আমি তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রস্তাব করায় তিনি এক কথায় আমাদেরকে নিরুৎসাহিত করেন। পরে রাইসুর কথার কুহকী জালে আবদ্ধ হয়ে সাক্ষাৎকার দিতে সম্মতি জানিয়ে আমাদেরকে সময় দিলেন এক সকালে তার সাথে দেখা করার জন্য। ২০১১ সালের মাঝামাঝি নির্ধারিত সময়ে এক সকালে তার বাসায় হাজির হয়েছিলাম। তিনি তখন গুলশান-১-এ থাকতেন। রাইসু, আমি আর রাইসুর তৎকালীন এক সহকারীসহ যথাসময়ে উপস্থিত হই। রাইসুকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। আমাকে তিনি অনেক আগে থেকে চিনলেও তার সাথে ঘনিষ্ঠতা রাইসুর পর্যায়ে ছিল না। কিন্তু ২০১০ সালে দেশে ফেরার পর থেকে রাইসুসহ তার সাথে আমার যোগযোগ শুরু হলে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এই ঘনিষ্ঠতার ফলে বহুমুখী বিদ্যায় ঋদ্ধ এক পরিশ্রমী ও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বকে জানার সুযোগ হয়েছিল আরও কাছ থেকে। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সৎ ও সজ্জন, কর্তব্য ও স্নেহপরায়ন। নানান বিষয়ে আমাদের লেখার আবদার তিনি রক্ষা করতেন আন্তরিকতার সাথে। সাক্ষাৎকারটি আয়োজন করার পেছনে রাইসুর উদ্যোগ ও উৎসাহ প্রধান হলেও প্রশ্নপর্বে তিনি উপস্থিত থাকেননি, তবে নেপথ্যে থেকে তিনি পুরো সাক্ষাৎকারটি ভিডিওতে ধারন করেছেন। আজ ১১ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিবসে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাক্ষাৎকারটি ভিডিওসহ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহসান। — রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন : আপনি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসেছিলেন মোটামুটি পরিণত বয়সে। আপনার তো জন্ম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। (জ্বী—মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান)। ওই সময়ে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পরে এলেন এখানে। ওই সময়ের স্মৃতি বা ওই সময় সম্পর্কে আপনার কী কী মনে আছে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি যখন মেট্রিক পাস করলাম তখন প্রশ্ন হলো আমি কোথায় আইএ (ইন্টারমিডিয়েট ইন আর্টস) পড়ব। একটা প্রশ্ন হল, তখনকার দিনে মুসলমান ফ্যামিলিতে, তাদের অনেকে আলিগড় (মাদ্রাসা) পড়তে যেতেন। এখন আমি আলিগড়ে যাবো নাকি অন্য কোথাও যাবো তা বুঝতে পারছিলাম না, কেউ কেউ বললো স্কটিশ চার্চ কলেজে যান, কেউ কেউ বললো প্রেসিডেন্সি কলেজে যান। আমার তখন হালকা পাতলা চেহারা আর বয়স খুব কম। সবাই বললেন যে—না, আলিগর যাওয়ার দরকার নাই, স্কটিশ চার্চ বা প্রেসিডেন্সি কলেজে– যে কোনো একটায় গেলেই হবে। স্কটিশ চার্চ কলেজে গেলে পরে বাইবেল পড়তে-টরতে হবে, বাইবেল টাচ করতে হবে এই সব কথা তখন হতো। শেষ পর্যন্ত আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে গেলাম। আমি অংকে ৬৪ পেয়ে ছিলাম। আমি ভাবলাম, অংকে ৬৪ পেয়ে আইএসসি পড়া যাবে না। আমি আইএসসি পড়তে চাইনি। আমার আব্বা তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল কুদরত-ই-খুদার সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন। উঁনি বললেন যে, তুমি সাইন্স পড়তে চাও না কেন? আমি বললাম, সাইন্স পড়তে আমার ভাল লাগে না। তখন খুদা সাহেব বললেন, ওর যা পড়তে ভালো লাগে সেটাই পড়ুক। তখন আইএ ক্লাসে ভর্তি হলাম আরকি। কলকাতায় আইএ পড়লাম, কলকাতায় যত রাজ্যের মিটিং হতো সব মিটিংয়ে যেতাম, যেমন—সদ্যানন্দ পার্কে, ইউনিভার্সিটি স্ট্রিটে যাওয়ার মিটিং। আমি বড় বড় বক্তাদের বক্তৃতা শুনেছি। মানে তৎকালীন যারা বাগ্মী ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন : নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তখন তিনি হয়তো মারাই গেছেন। তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মারা গেলেন আর আমি ’৪৫-৪৭ সালের কথা বলছি।
রাজু আলাউদ্দিন : আর কার কার বক্তৃতা শুনলেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : যেমন বীরেন মুখার্জি, নীহার রঞ্জন রায়, সত্যেন মজুমদার।
রাজু আলাউদ্দিন : এই নীহাররঞ্জন রায় কি রবীন্দ্রনাথ…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ লিখেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, এবং ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের ভূমিকা’ নামক একটা বইও লিখেছেন। একই লোক উনি, তাই তে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, হ্যাঁ, একই। নীহার রঞ্জন রায়ের ধুতি, পাঞ্জাবি, জুতা– সব ধপধপে সাদা। এবং বক্তৃতায় তাঁর শব্দগুলো যেন আগে থেকে বানানো থাকে, ঝর্ণার মতো শব্দ আসতো। মানে খুব পলিশ করা সব শব্দ।
রাজু আলাউদ্দিন : ওই সময় কবি হুমায়ূন কবীর তো বেঁচে ছিলেন, তাই না?

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হুমায়ূন কবীর সাহেবকে হয়তো আমি দেখে থাকতে পারি, কিন্তু বলতে পারি না কোথায় দেখেছি। (শেরে-এ-বাংলা এ কে) ফজলুল হক সাহেবকে দেখেছি, তখন তো তিনি মুসলিম লীগের বিরোধিতা করছিলেন, সুতরাং মুসলিম লীগের যারা সমর্থক তারা ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটে তাকে প্রায় তাড়িয়ে দিলেন এবং উনি বাধ্য হয়ে মিটিং ছেড়ে চলে গেলেন। সেখানে বোধ হয় হুমায়ূন কবীর থাকলেও থাকতে পারেন, আমার মনে নেই।
রাজু আলাউদ্দিন : ওই সময় বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবী বা লেখকদের মধ্যে কে ছিলেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আবুল হাশিম সাহেবের নাম ছিল ওই সময় রাজনীতিক হিসেবে। লেখকদের মধ্যে তখন আমার তেমন জানাশোনা হয়ে ওঠেনি।
রাজু আলাউদ্দিন : বা আবুল হোসেন, শিখাগোষ্ঠী–এদের কারো সঙ্গে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, এদের কারো সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন : ওই সময় নজরুল সম্পর্কে কি জানতেন বা শুনছিলেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : নজরুল সম্পর্কে ওই সময় সাধারণ তরুণরা যা জানে তা-ই জানতাম। বিশেষভাবে কোনো জ্ঞান বা জানা ছিল না। এবং আমি এখনো মনে করতে পারছি না, নজরুল ইসলাম সম্পর্কে আমার তখন জ্ঞান হয়েছিল কিনা।

20171111_092750
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি যে পরবর্তীতে লেখক হবেন, লেখালেখির জগতে প্রবেশ করবেন তার কোনো ইঙ্গিত ওই সময় থেকে ছিল কি না? ওই যে পত্রিকা করেছিলেন বললেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: আমি তো বললাম যে, পত্রিকা করেছিলাম। আমি একটা কবিতা লিখলাম, লিখে কোন পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম এখন জানি না, দেখি ছাপিয়ে দিয়েছে। ওটায় আমার নিজের নাম দেই নি। ‘মাসামৈসা’ মানবতা-সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা নাম দিয়ে সই করে, চার লাইনের কবিতা পাঠিয়েছিলাম। ওটা আমি ভুলেও গেছি। আরেকবার হল কি যে, কোনো এক পত্রিকায় দেখলাম আমাদের সিরাজ উদদৌলার পত্নি লুৎফুন্নেছার উপরে প্রবন্ধ লিখার আহ্বান। ভাবলাম লিখে ফেলি। লিখে প্রাইস পেয়ে গেলাম, প্রথম হয়ে গেলাম আরকি। আমার এখনো মনে আছে, যত রাজ্যের অসম্ভব কথা ওই প্রবন্ধে লেখা ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : ওই সময়টায় আপনার মধ্যে লেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, খুব বেশি না। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, আমার নামে একজন লেখকের নাম ছিল ওখানে, আমার চেয়ে বয়সে বড়। আমি একটা কবিতা লিখলাম, সরি, আমি একটা ছোটগল্প লিখলাম। ছোটগল্প লিখে একেবারে ‘চতুরঙ্গ’-এ পাঠালাম। (কবি হুমায়ূন কবীরের সম্পাদনায় বের হতো—রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, চতুরঙ্গ-এ পঠানোর পরে ওঁরা আমার লেখাটা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছে, তো আমার নামে যে নাম আরেক জনের, তিনি খাম খুলে দেখেছেন। এটা আমার খুব খারাপ লেগেছে—এটা আমি দেখলে ঠিক ছিল আমার লেখাটা ফেরত এসেছে। তারপরে আমি একই লেখা কবি গোলাম মোস্তফা সাহেবের কাছে নিয়ে গেলাম, ‘মাহে নও’ পত্রিকায়। ইতিমধ্যে ছয়-সাত বছর পার হয়ে গেছে। উঁনি বললেন যে, লেখার ভেতরে তো একটু সাম্প্রদায়িকতা আছে, এটা তো আমি ছাপাতে পারব না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওটা ছিল সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখা। কিন্তু উঁনি কেন বললেন! আমরা একটা পত্রিকা বের করেছিলাম রাজশাহী থেকে ‘দিশারী’ বলে, দিশারীর সেই কপিগুলো নাই আমার কাছে। বহুদিন পরে সেই লেখা দিশারী পত্রিকায় আরেকজনের নামে ছাপানো হয়েছিল। আমাদের পত্রিকার জন্য লেখক আর কোথায় পাওয়া যায়; সুতরাং আমরাই লিখে দু-তিনটা নামে সব লেখা ছাপাতাম। আমি একটা সংখ্যায় লিখেছিলাম, পরে তো আমি ঢাকায় চলে আসি। আমার পক্ষে ঢাকা থেকে রাজশাহীর পত্রিকা সম্পাদনা করা সম্ভব না। ওখানে আরেকজন দু-তিনটা সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন : আরেকটা জিনিস যেটা, আপনার আব্বা উঁনিও তো আইন পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যেটা খুব কৌতুহলজনক তথ্য, বাংলা উঁনি তো জানতেনই, ইংরেজিও জানতেন এবং সংস্কৃত ভাষাও শিখেছিলেন উনি
20171111_092817
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, বিএ-তে তাঁর বিষয় ছিল সংস্কৃত। এই সংস্কৃত বই আমাদের গ্রামের বাড়িতে—ব্যাকরণ কৌমুদী থেকে আরম্ভ করে কাসিদাসিসহ সব সংস্কৃত বই ছিল। উঁনি পড়তেন না, মূলত বিএ পরিক্ষার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। নোটবই ওই সময় বিক্রি হতো কলকাতায়। তবে উঁনি বাংলা বই পড়তেন।
রাজু আলাউদ্দিন : নোটবই তখনও বিক্রি হতো?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : নোটবই মানে সাহায্যকারী বই আরকি। মানে সংস্কৃতটা আবার বাংলা করে দেওয়া হয়েছে যাতে সহজে বুঝতে পারে আরকি। তো আমি ওই বাংলা অংশটুকু পড়তাম।
রাজু আলাউদ্দিন : সংস্কৃত জানার আগ্রহ আপনার তৈরি হয়নি কখনো?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি তো আরবি পড়েছি, মেট্রিকে আরবি পড়েছি, আইএ-তেও আরবি পড়েছি। সুতরাং (আরবি) ফোর্থ ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে নিতে হতো, দুটো ফোর্থ ল্যাঙ্গুয়েজ তো নেয়া যায় না। এবং আরবি পরীক্ষায় এতই খারাপ করেছিলাম, আমার খুব সন্দেহ হয় এই ফোর্থ ল্যাঙ্গুয়েজের কোনো নম্বর আমার আইএ পরীক্ষায় চূড়ান্ত ফলে যোগ হয়ে ছিল কিনা। মনে হয় না। ফোর্থ ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল তো, অনাদর-অবহেলায় এই রকম হয়েছে।
আমি এবং জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী– আমাদের দুজনের একই ফোর্থ ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল। কলকাতায় সিনেট হলে আমরা একজন আরেকজনের খুব কাছাকাছি পরীক্ষা দিচ্ছি আর উপরে দেখি পায়রা উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি বললাম, পায়রার সাথে আরবি ভাষার কিছু একটা মিল আছে নিশ্চয়। তারপর সব বড় লেখকদের সমালোচনা কিছুই বুঝি না, শুধু বলেই যাচ্ছি: তিনি অসম্ভব ভাল লেখক, তাঁর ছন্দ খুব ভাল–এইভাবে যত Vague হতে পারে সেইভাবে তাদের বর্ণনা দিলে যা হয় আরকি। তাতে নম্বর আসবে কি করে!
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার তো আগ্রহ নানা দিকে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমার হয়েছে কি, আমি তো কলকাতায় I was drawn to the meetings and particularly the meetings of the left politics. আমার বন্ধুবান্ধব তারা বললো, তুমি কি আর লেখাপড়া করবা না? আমি বললাম, লেখাপড়া করবো না মানে! ‘মানে তুমি যেভাবে চলছ তাতে তুমি আইএ পাস করতে পারবে কি না সন্দেহ।’
সবচেয়ে ভালো হয়েছে আমি আইএ পরীক্ষায় প্রথম বছরে নম্বর পেয়েছি লজিকে ৪০, ফাইনাল পরীক্ষার টেস্টের সময় আমি পেয়েছি ৪০। লজিকে যে প্রফেসর উঁনি বললেন, তুমি খুব consistent. আমি তা বুঝতে পারলাম না, মনটা একটু খারাপ হল আরকি। তো হলের ছেলেদের বললাম, কিরে, কী পড়তে-টড়তে হবে। বলল, ছিলজিজম ঠিক করতে পারলে অংকের মত নাম্বার। ছিলজিজম (লজিকের কত গুলো ধাঁধা)। তো যে ছেলে ৪০ পেয়েছে দুইবছর ধরে, ফাইনাল পরীক্ষায় সে ৭০+৭০, ১৪০ (৭০+৭০=১৪০) পেয়েছে। সুতরাং ওই পরীক্ষাতেই আমি ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে গেছি।
20171111_092842
রাজু আলাউদ্দিন : এরপরে আপনারা বাংলাদেশে চলে এলেন, বাংলাদেশে আসার পরে পড়াশুনা কন্টিনিউ করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি এলাম রাজশাহীতে, রাজশাহীতে অনার্স পড়লাম। অনার্স পাস করে আমি ঢাকাতে এলাম।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি ঢাকা আসলেন এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে পাস করলেন। তারপর আপনি ওইখানে পান বিক্রয় করলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি পান বিক্রয় করি নি, ওটা অতিরঞ্জন কথা। আমি পান কোনো দিন বিক্রয় করিনি, এটা অতিরঞ্জন কথা আর লোকে অনেক সময় আজে-বাজে কথা বলে, যেমন মিথ্যে কথাও বলে। লোকে বলে যে, আমি সিএসপি পরীক্ষা দিয়েছি। আমি সিএসপি পরীক্ষা দেইনি। সাংবাদিকরা মনের মাধুরী মিশিয়ে যা ইচ্ছা তাই বলেন অনেক সময়, এটা ঠিক না।
রাজু আলাউদ্দিন : এগুলোর আপনি প্রতিবাদ করেছিলেন কখনো?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি প্রতিবাদ করতে যাবো কেন! আমার কি পিআরও রয়েছে যে এইসব প্রতিবাদ করবে? আর আমার কি আছে যে একজন লোক কী বলল না বলল তার প্রতিবাদ করব! প্রতিবাদ আমি শুধু করেছিলাম বোধহয় মুকুল, আমাদের আকতার মুকুল (এম আর আকতার মুকুল) আমার সম্পর্কে লিখেছিল, সেটার আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। সেখানে আমাকে একটু চিমটি কেটে কিছু কথাবার্তা ছিল সেটার উত্তর দিয়েছিলাম। এবং আমি ওর জন্মদিনে প্রধান অতিথি হিসেবে ওকে প্রশংসা করে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম, তুমি আমার সম্পর্কে এই লিখেছিলে। এই একমাত্র প্রতিবাদ, আর প্রতিবাদ করি নি। প্রতিবাদ করার তো আমার লজেসটিকস নাই। আমি এত প্রতিবাদ করবো কিভাবে, কোন কবি লিখছে আমি মিথ্যাচার করেছি, আমি অমুক কথা বলেছি। এই সমস্ত প্রশস্তিকার কবিদের সমালোচনা আমি করতে যাব কী জন্যে।
20171111_092901
আমার দায়িত্ব নাই, আমার কোনো জবাবদিহি নাই কারো কাছে। আমি কারো কাছ থেকে উপকৃত হইনি, কারো ধার ধারি না। সুতরাং আমাকে সবসময় জবাবদিহি করতে হবে কেন? জবাবদিহি করতে হবে যেখানে জবাবদিহি করা দরকার। লোকের opinions-এর against-এ জবাবদিহি করা যায় না, ফ্যাক্টের তথ্যের উপরে জবাবদিহি করা যায়। কিন্তু কেউ একটা কোন opinion hold করল তার against-এ বিস্তারিত বলার অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার প্রথম বই সম্ভবত, যদি ভুল না করে থাকি বা আমার দেখা প্রথম আরকি, ‘যথাশব্দ’।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, তার আগে প্রথম একটা বই লিখেছি। কেমন করে আমি লিখতে শিখলাম সেটা আমি একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম বরিশালে, একটা book exhibition হয়েছিল, সেই book exhibition-এ বলে ছিলাম আমি কীভাবে বই লেখা শুরু করলাম। আমি তখন প্র্যাকটিস করা শুরু করেছি। সেখানে একজন বিহারি আরদালি আমাকে বলল, স্যার একটা ল রিকিউজিসান মে কিতাব লিখিয়ে। আমি বললাম, কেয়া কিতাব লেখে গা! ‘লিথিয়ে না, হাম উসকো সেল কারেগা। I read a book called `learning the Law .’ সেটা ছিল Glanville Williams -এর বই। সেখানে একটা লেখা ছিল যে, আইন প্র্যাকটিস করার সময় সম্ভব হলে ছোট-খাট একটা বই লিখবে `to introduce yourself’. আমি ভাবলাম, এই আরদালি কি Glanville Williams নাকি যে বারবার আমাকে বলছে একটা বই লিখতে। তারপর আমি বোধ হয় ২৯ দিনে Law requisition লিখলাম এবং এটা ছাপানো হল। (এটা ইংরেজিতে, না বাংলায়?—রাজু আলাউদ্দিন)। ইংরেজিতে এবং সেই বইটা ওই ভদ্রলোক নিজেই বিক্রি করেছে, অনেক বিক্রি করেছে বাংলাদেশে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে। আমি ওর কাছ থেকে টাকা নেই নি। কিন্তু ও-ই বই বিক্রি করা টাকা দিয়ে আমাকে Law Journal সরবরাহ করত এবং ওই একটি বই থেকে আমার তিন-চার তাক বই হয়েছিল। এটা হচ্ছে আমার প্রথম বই। এটার প্রকাশক দুনিয়ার আর কেউ না, আমার সহধর্মিনী তার প্রকাশক।

20171111_092950
রাজু আলাউদ্দিন : স্বনামে ছিল বইটা?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, স্বনামে ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : এর পরেই কি আপনার ‘যথাশব্দ’?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি বেনামে কোন বই লিখি নি।
রাজু আলাউদ্দিন : তো, এরপরে আপনার ‘যথাশব্দ’ বইটি বের হয়।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হুম, জ্বী।
রাজু আলাউদ্দিন : ‘যথাশব্দ’ তো বাংলা ভাষায় প্রথম থিসরাস ।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, ছোট-খাট আরো থিসরাস আগেও বেরিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : বাংলা ভাষাতেই?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, থাকতে পারে, থাকা স্বাভাবিক। ‘যথাশব্দ’ শ্রেণি-বিভাগ করে যেভাবে করা হয়েছে সেদিক থেকে আমার বইটা প্রথমই।
রাজু আলাউদ্দিন : এরপরে আপনার আরেকটা বই ছিল ইউনিভার্সিটিতে আপনার পঠিত যে বিষয়—ইতিহাস, সেই বিষয়ে যেমন ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না না, এটা অনেক পরের বই। আরো পাঁচ-ছয় বছর পরের বই। এটা হল কি, একশ বই ওরা (বাঙলা একাডেমি) ছাপাচ্ছিল বোধ হয় শহীদস্মৃতি দিবসে, তখন ডিরেক্টর মনজুরে মওলা আমাকে বলল, স্যার, আমাকে একটা বই লিখে দেন। তখন আমি তো থাকি বরিশালে। আমি বললাম একটা ইতিহাস বিষয়ক শর্ট ইন্ট্রোডাকশন আমি লিখে দেব। ‘তাই লিখে দেন।’ লিখে দিলাম। আমি তো আর প্রুফ-ট্রুফ দেখতে পারি নি। কিন্তু বইটা বেশ চালু হয়, তিন-তিনটা সংস্করণ বেরিয়েছিল। তারপর এটা আউট অফ প্রিন্ট ছিল বহু দিন ধরে। তারপরে ওই ফাউন্ডেশনের উপর আমি একটা বড় বই লিখলাম, নাম একই। কিন্তু ওই ছোট্ট বইটা ১৯৭২ সালে মার্চ মাসে শেষ হয়েছিল আর গতবছর (২০০৯) যেটা বেরিয়েছে, এটা ২০০৭ সাল পর্যন্ত হয়েছে আরকি।
20171111_092955
রাজু আলাউদ্দিন : তার মানে অনেকটা নতুন তথ্য, নতুন করে লেখা।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : যা কিছু নতুন ঘটেছে, যতটুকু আমার জ্ঞানের ভেতরে ধরতে পেরেছি ততটুকু দিয়েছি আরকি। আমি ভাবিনি এটা সম্ভব হবে, তো যাই হোক হয়েছে আরকি। কোনো কাজে, আমি বলতে গেলে ফাঁকি দেইনি, আবার কোনো কাজ ঠিক পরিকল্পনামাফিকও করি নি। যখন হাতে নিই তখন আমি ফাঁকি দেই না।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, তবে কাজগুলো তো দেখলে মনে হয় সুপরিকল্পিত, যেমন—‘কোরানসূত্র’ কিংবা ‘বাংলাদেশের তারিখ’; এগুলো প্রচুর পরিশ্রমী গবেষণা ও পরিকল্পিতভাবে তৈরি করার বিষয় আরকি।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, হয়ে যায় আরকি।
রাজু আলাউদ্দিন : একটা জিনিস স্যার জানতে চাই সেটা হল যে, বাংলা ভাষায় আপনি কোরআন শরিফ অনুবাদ করলেন, কোরআন শরিফের প্রচুর অনুবাদ ছিল এর আগে। এই অনুবাদের পেছনে আপনার তাগিদটা কী ছিল?

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এর পেছনে তাগিদটা হচ্ছে, আমি কোরআন শরিফ অনুবাদের আগে আগে ‘কোরানসূত্র’ নামে একটা বই লিখেছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন : আমি পড়েছি সেটা।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : যেখানে বিষয়ভিত্তিক বর্ণানুক্রমিক একটা রচনা, সেই রচনাটা করার সময় দেখলাম আমার ভাষার হেরফের হয়েছে এক এক জায়গায়। আমি দেখলাম এত হেরফের হলে চলবে না। আর একই জিনিস চার-পাঁচ বিষয়ে উল্লেখিত হয়েছে, এই চার-পাঁচটা বিষয় হুবুহু এক করতে গেলে আমার উচিত হবে একটা মাস্টার কপি করা, একটা কপি করা। তখন আমি ভাবলাম যে, কোরআনের অনুবাদটা করে ফেলি। তখন ভাবলাম আমি বিষয় অনুযায়ি একই ভাষায় ব্যবহার করব। এইভাবে কোরআন শরিফের অনুবাদ শুরু হল। এটা প্রথমে অনুবাদ হিসাবে শুরু হয়নি।
রাজু আলাউদ্দিন : প্রথমে উদ্ধৃতি কোষ হিসেবে …
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : প্রথমে কোরআনসূত্র যেটা করেছিলাম সেটাতে যেন মোটামুটি নির্ভুল থাকে এবং ভাষার হেরফের না হয় সেই জন্য সমগ্র কোরআনটা একখণ্ডে অনুবাদ করা হল।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা তো আপনি আরবি থেকেই অনুবাদ করেছিলেন বা ইংরেজি বা অন্যান অনুবাদগুলোর সহায়তা ছিল।
20171111_093010
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি আরবি, বাংলা, ইংরেজি, অ-ইংরেজি নানা ধরনের বই দেখেছি। দেখে যেটা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছে সেটা আমি নিয়েছি আরকি এবং আমি পারতপক্ষে বিতর্কমূলক জিনিসের অবতারণা করি নি, আমি কোনো ব্যাখ্যাও দেইনি। আর প্রচুর আরবি শব্দ ব্যবহার করেছি, যে শব্দগুলো ওই সময়ের সমাজে মোটামুটি সকলেরই জানা, সুতরাং তার আর বাংলা অনুবাদ করার প্রয়োজন নেই। বাংলাটা সোজা হয়েছে এই আরকি।
রাজু আলাউদ্দিন : অনুবাদ করতে গিয়ে আপনি কী কী সমস্যা বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি ওই চ্যালেঞ্জের কথা চিন্তা করি না। আমি অনুবাদ করতে বসি, অনুবাদ করি আবার কোনো এক সময় বসে পড়ে দেখি—না ঠিক হয়নি, চেঞ্জ করি। কিন্তু চ্যালেঞ্জ আসলে আমি বোধ করি না। যখন আমি অনুবাদ করি, তখন আমি সহজভাবে অনুবাদ করি, সামনে ডিকশনারি থাকে—আরবি, ইংরেজি অথবা যে বিদেশি ভাষা হয় তার ডিকশনারি। আমার বাসায় গোটা পঁচিশেক ডিকশনারি আছে। সুতরাং যখন প্রয়োজন হয় তখন দেখি, সব সময় দেখি না আর দেখা সম্ভবও না। Life will be…
রাজু আলাউদ্দিন : misarable.
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: Right you are.
রাজু আলাউদ্দিন : এর আগে যে অনুবাদগুলো ছিল, যেমন (মওলানা) আকরাম হোসেন…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আকরাম হোসেন খুব নাম করা। তিনি কিছুটা যুক্তি প্রদর্শন করেছিলেন এবং যারা বিশ্বাসী তাদের অনেকেই তার অনুবাদ পছন্দ করেন না। আমাকেও অনেকে আমার অনুবাদ নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করে যার উত্তর দেই না। আমি মনে করি যে, উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সহজ না, আর আমি চাই না কাউকে বিপথগামী করতে।
রাজু আলাউদ্দিন : পশ্চিমের কোনো কোনো ভাষায়, যেমন একটু আগে আমি বলেছিলাম স্প্যানিশ ভাষায় কোরআন শরিফের অনুবাদ আছে এবং সেটা অনুবাদ করেছিলেন স্পেনের এক লেখক। উনি কোরআন শরিফের লেখক হিসেবে নাম দিয়েছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নাম। এগুলোর পেছনে কী আছে বলে আপনার মনে হয় বা যারা এ রকম নাম ব্যবহার করেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : দেখুন এটা নিয়ে কথা বললে পরে… এটা নিয়ে কথা না বলাই ভাল। পরিস্কার কথা হচ্ছে একটা থিওরী আছে যে, `It was created by Him and He was the author.’ কিন্তু মুসলমানরা যেটা বলে তাহলো It is revealed to him, he is not the author.
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু পশ্চিমে যারা এইভাবে বলে ওদের কি আসলে কোনো উৎস আছে?
20171111_093030
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ওদের উৎস ওরা ভাল জানে, আমি জানি না ওদের উৎস কী। ওরা জানে It was outtered by Muhamod, Muhamod is the author of this. এ ছাড়া আমি আর জানি না। ওরা তো আর publishing house-এর ঠিকানা দিতে পরবে না।
রাজু আলাউদ্দিন : আরেকটা জিনিস, কোরআন শরিফের ব্যাপারে আমার কৌতুহল হচ্ছে যে, বলা হয়েছে কোরআনের যে ভাষা—ওই ভাষায় এখন আর কেউ কথা বলে না, অনেক বদলে গেছে—যখন মূলভাষা থেকে অনুবাদ করতে যায় কেউ তখন তো একরকম creation হয় আরকি। মানে Translation is a creation কোন না কোনভাবে। যদি creation হয়ে যায় আর কোরআন শরিফ যদি ঈশ্বরের বাণী হয়, তাহলে এই বাণী থেকে আমাদের কতটুকু সরে যাওয়ার আশংকা থাকে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সরে যেতে পারে না কেবল, সরে গেছে এবং তার জন্যে সারা পৃথিবীতে মুসলমানদের মধ্যে অনেক খুনোখুনি হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : মানে এই কোরআন শরিফের অনুবাদকে কেন্দ্র করে!
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ। ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক মারধর হয়েছে আরকি। বড় বড় যারা আমাদের দেশে ঋষি হিসেবে পরিচিত তাঁরাও অনেক জায়গায় নানা রকম প্রশ্ন করেছে। এই নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন কিন্তু উত্তর শুনে অনেকেই স্থির থাকতে পারবেন না। এবং আমি অস্থিরতা বৃদ্ধি করতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : যেটুকু সহনীয় হতে পারে সেটুকু তথ্য কি আমরা জানতে পারি আপনার কাছ থেকে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কী সহনীয়! For example, আপনি বলেন যে, রোজ কিয়ামতের দিন সশরীরে উত্থান হবেন, না আপনার Spirit-এর উত্থান হবে? জান্নাতে পরী পাবেন, এই পরীটা কি লিটারাল, নাকি এটা ফিগারেটিভ? এই সমস্ত প্রশ্ন মুসলমান সমাজে মুসলমান যারা জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি ছিলেন তারা অনেকে আলোচনা করেছেন, আমরা অনেকের নামও শুনি নি। আমাদের জ্ঞান আর কতটুকু! আমাদের ধর্মের জ্ঞান খুবই সামান্য।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার তো স্যার এই পর্যন্ত অনেকগুলো কবিতার বই বেরিয়েছে। বেশকিছু কবিতা অনুবাদ করেছেন, যেমন—তাওতে চীন, চীনা কবিতা। প্রথমে আপনার কবিতাগুলো সম্পর্কে বলেন। আপনি প্রথমে গদ্য, ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে লিখেছেন, পরবর্তীতে আপনি কবিতা লিখতে আগ্রহী হলেন কীভাবে?
20171111_093045
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, কিছুই না, আমার মেয়ে BUET (Bangladesh University of Enginiaring and Tecnology)-এ পড়ত, আমি চট্রগ্রাম থেকে আসছি। ভাবলাম যে এই সময় গাড়িতে বাড়ি না গিয়ে সোজা বুয়েট-এ যাই আর আমার মেয়েটাকে তুলে নিয়ে আসি। তো গেলাম। আমার মেয়েকে বললাম, কিরে তোদের সন্ত্রাসীরা কই, অস্ত্র-শস্ত্র দেখছি না যে? আমি বললাম, বল তো অস্ত্র ও সন্ত্রাস এই দুটো সন্ধি করলে অস্ত্রাস শব্দ তৈরি করা যায় না? তো হাসল, আমার মেয়ে খুব বুদ্ধিমতী। বাংলা ইংরেজী ফ্রেঞ্চ জানে, আমার কথা শুনে সে চুপ করে থাকলো। আমি তখন এসব বিষয় নিয়ে লিখলাম, লেখাটা দিলাম আমাদের সাজ্জাদ শরীফকে, তখন উনি ভোরের কাগজ-এ। উনি আমাকে সাহায্য করতেন। পরে ব্রাত্য রাইসু আমার দেখাশুনা করেন। এখনও মাঝে মাঝে আসেন, দেখাশুনা করেন। তো সাজ্জাদ শরীফ বললেন, এটা আমরা কাগজে ছাপতে দেব। আমি বললাম, What is the fun in it? এটার ভেতর মজাটা কি? উনি বললেন, না, আমরা ছাপাচ্ছি। ওই যে ছাপানো শুরু করলো। এখন আমার বিরুদ্ধে বলা হয় যে, কবিতা লিখতে পারে না, ওনার বন্ধুবান্ধব মিলে ওনাকে কবি বানানোর চেষ্টা করছে। আর আমি লিখতে পারি না সেটা পরিষ্কার, ছন্দ জ্ঞান আমার নেই, পাঠকরা আমাকে ছন্দের বই পাঠিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : ওরা আপনাকে ভালোবাসে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: এবং পাঠকের উদ্দেশ্যে আমি একটা কবিতাও লিখেছি—‘সহৃদয় পাঠকের প্রতি’। তার ছন্দের বই নিয়ে আমি কী করেছি না করেছি সে বিষয়ে! কোথাও আছে এমন একটা কবিতা।
রাজু আলাউদ্দিন : আর অনুবাদ করার আগ্রহটা জন্মাল কিভাবে, বিশেষ করে চীনা কবিতার? আমি দেখলাম, অনুবাদের যে দুটো বই, দুটোই হচ্ছে চীনা কবিতার বই। কেন অন্য কবি নয় বা কেন চীনা কবিতা?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি ‘চীনের ইতিহাস নিয়ে একটা বই লিখেছি, এখনো ছাপানো হয়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: ‘হেকমতে চীন’?

20171111_093113
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, সেটা তো আমি ছাপিয়েছে প্রথম আলো-তে। আমি চীনে বেড়াতে গিয়েছিলাম পাঁচদিনের জন্যে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। কিন্তু চীনের উপর ছোট্ট ইতিহাস উপক্রমনিকা আমি লিখেছি, এখনো ছাপানো হয়নি। তখন ভাবলাম, ওদের সংস্কারটা একটু দেখি, কবিতা নিয়ে ওরা কোথাও কী বলে সেটা একটু দেখি। আমেরিকাতে এক ভদ্রলোক আমাকে ‘তাওতে সিন’ প্রেজেন্ট করল, ভাবলাম আমি এটা একটু দেখি। তারপর আমার মেয়েকে বললাম, ও ডেলাওয়ার-এ ছিল, ও আবার জন্য ট্রান্সলেটরের ‘তাওতে চীন’ পাঠাল। এরকম করে বিভিন্ন ট্রান্সলেশন দেখার পর, যেটা আমার কাছে মনে হল সহজ সেটার ভিত্তিতে অনুবাদ করলাম। এটা করার পর ভাবলাম যে কিছু কবিতা ট্রান্সলেট করা যাক। আমি চীনা ভাষা জানি না, মানে যা জানি তা খুবই সামান্য, জানিই না বলতে হবে। সুতরাং চীনা কবিতা ইংরেজী অনুবাদের ভিত্তিতে বাংলা করা।
রাজু আলাউদ্দিন : এরপর আপনার কি আর অন্য কিছু অনুবাদ করার আগ্রহ আছে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না। আমি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বেড়াতে যাই, কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ বই-টই দেখি। হঠাৎ করে হয়তো I get drowned, কিছু করার নেই তাই কিছুক্ষণ বসে একটা কবিতা ট্রান্সলেট করে ফেলি। আমি রাশিয়ান কবিতা প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটা ট্রান্সলেট করেছি। তারপরে ল্যাটিন আমেরিকার কিছু কবিতা করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, আমি দেখলাম আপনি লাতিন আমেরিকান কিছু গল্পও অনুবাদ করছেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, না, ল্যাটিন আমেরিকার এটা গল্প না, বা বলতে পারেন–এটাও আমার অবসর সময়ের কাজ। আমি যখন আমার মেয়ের কাছে যাই আমেরিকায়, আমায় তো একটা কিছু করতে হবে। আমি একবার করলাম কি কিছু বিদেশি কবিতা অনুবাদ করলাম। একবার করলাম কিছু এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও আফ্রিকান কিছু সাহিত্য। আরেকবার একটা, যেটা এখনো শেষ হয়নি, সেটা হচ্ছে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় মাতৃভাষার উপর যে কবিতা তার একটা কালেকশন করা। সেটা এখনো in the process, কিন্তু এটা শেষ হওয়ার জিনিস না। তারপরও বাধ্য হয়েই এটা আমি প্রকাশ করতে যাচ্ছি এবং বাংলা একাডেমি উৎসাহ দেখিয়েছে। হয়তো এই ফেব্রুয়ারিতে বের হতে পারে বইটা।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা একটা ভাল আইডিয়া, ইউনিক। বাংলা ভাষায় বা ইংরেজি ভাষাতেও নাই এমন বিষয় নিয়ে এন্থলজি।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তা না, আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমি খুব কমই অন্য লোকের হাঁটা পথে হাঁটি, আমি হাঁটি না। আমার পথটা যে খুব বিরাট তা না। কিন্তু আমি নিজের মত করে হাঁটি।
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু সেই রাস্তাটা কুমারি।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হা হা হা, তা বলতে পারেন। তাতে একটা রেজাল্ট হয় যে আপনি নিজের প্রতি ক্লান্ত হয়ে যাবেন না।
রাজু আলাউদ্দিন : নতুনত্ব আপনাকে সবসময় উষ্ণ ও সজীব রাখবে। সেটা একটা ভালো দিক। আপনার আত্মজীবনী লেখেন নি কেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আত্মজীবনী লিখি নি, লেখার ইচ্ছা নেই আপাত। আপাতত এই যেটা হাতের কাজ সেটা শেষ করতে চাই।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার আত্মজীবনী লেখা শুরু করে দেয়া উচিত, কারণ হলো..
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি আত্মজীবনী এত তাড়াতাড়ি…এত তাড়াতাড়ি কি, ৮২ বছর বয়স, লিখে ফেলা উচিত যদিও। খুব উৎসাহ বোধ করি। কিন্তু আমার আরো কাজ বাকি আছে। সেই কাজগুলোর আগে কথা বলতে পারছি না। সেই কাজগুলো শেষ হলে, শেষ তো কোনদিনই হবে না, তারপর দেখা যাক।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার তত্ত্বাবধায়ক সরকার…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ওটা তো শেষই হয়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন : এটার একটা অংশ আমি পড়েছিলাম প্রথম আলোতে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, না। ‘তত্তাবধায়ক সরকারের দায়ভার’, ওইটা বই হয়ে বেরিয়েছে। ওই ৮২ দিনের ব্যাপারটা আছে ওখানে। ওখানে হয়তো অতীত দিনের কিছু কথা সামান্য কিছু থাকতে পারে। ওটা, বিশেষ করে ৮২ দিনের ব্যাপার। আর আত্মজীবনী! যখন সব কাজ শেষ হয়ে যাবে, এখনো আমার কাজ কিছু কিছু বাকি আছে, কী বাকি আছে তা বলতে পারবো না।
রাজু আলাউদ্দিন : এবং ওই সবগুলোর নাম না বললেই ভাল!
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, বলতেই পারবো না। এখনো মনের ভেতরে আকুপাকু করে কিন্তু আমি ঠিক জানি না। অনেক জিনিস আছে, ভাবছি লিখব, ‘কবি তুমি নহে গুরুদেব, রবীন্দ্রনাথ’। তখন আমি হাইকোটে বিচারপতি। ভাবলাম, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এত রকমের বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়, আমি আর বিতণ্ডায় যোগ না দেই। আমি লিখি নি, কিচ্ছু লিখি নি; কিন্তু কাগজপত্রে যা পড়তাম তা লিখে রাখতাম। তো, প্রথম যখন চিন্তা করেছি তার বিশ বছর পর এই বই লিখেছি। এমন কিছু না, বিপ্লবী বই না; রবীন্দ্রনাথের থেকেই, তাঁর মন্তব্য থেকেই আমি আমার মত করে লিখেছি।
রাজু আলাউদ্দিন : আরেকটা জিনিস সেটা হলো যে–আমি আপনার কুরআন অনুবাদের সূত্রে বলছি–আমাদের এখানে যেটা হয় যে, ধর্মবোধ এক জিনিস আর ধর্ম নিয়ে উন্মাদনা আরেক জিনিস। আমার মনে হচ্ছে মানুষ আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি আচারমুখী। আপনার কি মনে হয় যে, ধর্মের দিকে বেশি ঝুঁকে যাওয়ার কারণে মানুষ ধর্মের ব্যাপারে ফ্যানাটিক হয়ে গেছে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি জানি না। আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করে দেখেছি এই ব্যাপারে কিছু বক্তব্য দেয়া ঠিক হবে না।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি তো এই সমাজের মধ্যে আছেন এবং বসবাস করেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তা হোক, তা হোক। যে যা পড়ছে পড়ুক। ‘যার যার ধর্ম’ বলে আমার একটা বই আছে। আপনি বলতে চাইছেন হয়তো মৌলবাদ, সব ধর্মে মৌলবাদ আছে এবং ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি। ওই যে ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর কথা বলে, আমার মনে হয় এটা সেমিনারের কথা, জীবনে হবে না। আমরা মাঝে মাঝে বলি লালন, তারপরে আমাদের মধ্যযুগের সর্ব ধর্ম সমন্বয় করতে বলেছেন বা চেষ্টা করেছে। এমনকি টার্কি (তুর্কি), ইরানি সে সব সুফি কবি বলেছেন। যারা ধর্ম পালন করে, সর্ব ধর্মের সমন্বয়ে তাদের উৎসাহ বেশি নেই। এরা মানুষের দুর্গতি, দুর্ভোগ, দুর্দশা দেখে অনেক সময় সর্বধর্মের সমন্বয়ের কথা বলেন। মানুষ সবসময় যারা নিপীড়িত, পতিত, দলিত তারা হয়তো অনেক সময় এ্যাট্রাকটিভ ফিল করে; কিন্তু আমার মনে হয় সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রভাব স্থায়ী নয়। কিন্তু এর একটা চাহিদা আছে। এর মধে একটা হ্যাংকারিং আছে for economical afford.
রাজু আলাউদ্দিন : ওইটারই কি একটা প্রাথমিক রূপ ছিল সম্রাট আকবরের সময়ে…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সবই সমান। সম্রাট আকবরের ওটা টোটাল ফেইলর। ওর প্রধান বন্ধু, মন্ত্রী আবুল ফজলকে তো মারা হল এই জন্যে। (সম্রাট) জাহাঙ্গীর আততায়ী দিয়ে আবুল ফজলকে মেরেছে। তারপর ওর কথা কেউ বলে না, ওর কথা আসলে প্রপাগাণ্ডা হিসেবে বলে। সর্বধর্ম সমন্বয় সম্ভব তো না। প্রতিটা ধর্ম এত পরস্পরবিরোধী যে তার সমন্বয় সাধন করার মতো ক্ষমতা কারো নাই। দুই বার চেষ্টা হয়েছে। ইজিপ্টে একবার চেষ্টা হয়েছিল, ইকনাটন করেছে, আমাদের দেশে আকবর করেছে। এই রকম ছোটখাট আকবর বিভিন্ন দেশেই চেষ্টা করেছে। এটা শেষ পর্যন্ত কোনো বাস্তব রূপ ধারণ করেনি। কারণ এখন মানুষ বৈচিত্র্য, বিশিষ্টতা ভালোবাসে; নিজেকে অপরের কাছ থেকে তফাত রাখতে ভালোবাসে, ফারাক দিতে ভালোবাসে। সুতরাং সব সময় তা হয় না, অনেক সময় এক হতে ভালোবাসে। কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে মনে হয় না এরকম কিছু হবে। এই জন্যে আমি বললাম যে—যার যার ধর্ম তার তার ধর্ম।
রাজু আলাউদ্দিন : তাহলে স্যার, এই সংঘাত চিরকাল চলতে থাকবে বলে মনে হয়?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আপনারা এমন কী লোক কবীর, নানক, সুফিদের চেয়ে? আপনারা এমন কী বড় লোক, এমন কী মহান ব্যক্তি যে আপনারা নতুন কিছু করবেন? আপনারা এমন কী বিরাট ব্যক্তি যে আগে যা পারেনি তা আপনারা সমাধান করতে পারবেন? এতো বিজ্ঞান না। বিজ্ঞানে নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার হয়। আজকেই তো রেডিওতে শুনলাম যে, অপদার্থ মানে নন-মেটার, ছয় সেকেন্ডের এক-ছয় অংশ ধরে রাখতে পারছে। ইউরোপের Cern যে গবেষণা কেন্দ্র, তারা বলছে– এ তো নতুন জিনিস। কিন্তু আপনার নন-রিলিজিয়নের এলিমেন্ট বা ধারণা আপনি ছয় সেকেন্ডে একবার ধরে রাখতে পারবেন কিনা আমি জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা ভাল বলছেন, চমৎকার উপমা!
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তা জানি না, আপনি আমাকে খোঁচাচ্ছেন বলে আমি বললাম।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি তো মাঝে মধ্যে বলেন খুবই সঠিক কথা, কিন্তু কখনো কখনো ক্ষেপে যায় কেউ কেউ।
মুহম্মদ হাবিবুর রহমান: কী আর করা যাবে!
রাজু আলাউদ্দিন : যেমন ‘দেশ আজ বাজিকরদের হাতে’, এই বাজিকর শব্দটার ব্যবহার দ্যার্থক, মানে দুইটা অর্থই আরকি। একই সঙ্গে ফান মানে মজাও থাকে, আবার এর পেছনে সত্যও থাকে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : শব্দের সীমানা পেরিয়ে যদি আপনি দু-চারটা শব্দ ব্যবহার করতে পারেন তার জন্যে আপনাকে আমরা বাহবা দিতে পারি। যদি সেই ব্যবহার যথার্থ হয় আরকি। শব্দর সীমানা পার হতেই হবে, সারাক্ষণ শব্দর সীমানার মধ্যে থাকলে একটা বদ্ধ ভাব থেকে যাবে। খোলা জানালা থাকলে পরে অনেক কিছু মনে আসতে পারে। আমি বাংলা ভাষায় অনেক নতুন শব্দ সৃষ্টি করেছি। যেমন আমি মনে হয় প্রথম ‘পার্থক্যবিচার’ শব্দটা ব্যবহার করি।
রাজু আলাউদ্দিন : মানে এই শব্দবন্ধটা, মানে—‘পার্থক্যবিচার’।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ‘রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞা ও পার্থক্যবিচার’ নামে আমার যে বইটা আছে। ‘পার্থক্যবিচার’ শব্দটা আগে কেউ এমনভাবে ব্যবহার করেনি। তারপরে—‘সামরিক আইন’, ‘ফৌজি আইন’; মিলিটারি ল, মার্সল ল’র পার্থক্য বোঝাতে, ইত্যাদি।
রাজু আলাউদ্দিন :‘ফৌজি আইন’ এটা আপনার সৃষ্টি?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, আমি এভাবে করেছি। আর ওইভাবে দাবি করতে চাই না যে, ইট ওয়াজ প্রিন্টেড ইন মাই মিন্ট; সেটা আমি করতে চাই না। যেমন আরেকটা হচ্ছে, লিগ্যাল ফিকশন বলে একটা শব্দ আছে ইংরেজিতে, তার বাংলা আমি করেছি যে ‘কানুনি কল্পনা’; মানে যা নাই তা কল্পনা করা। যেমন একজন সাবালক, কিন্তু তার শরীর খারাপ, মন খারাপ, তাকে শিশু হিসেবে কল্পনা করা। সাবালককে শিশু হিসেবে কল্পনা করাটাই হচ্ছে কানুনি কল্পনা। কানুনি কল্পনা করা হয়েছে এই কারণে যে, মানসিক দিক থেকে প্রতিবন্দী মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, শিশুর যে অধিকার, শিশু যে সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারে, সে-ও যেন সেই সুবিধা ভোগ করতে পারে। সুতরাং কানুনি কল্পনায় তার উপর শৈশবাবস্থা আরোপ করা হয়। এই রকমভাবে যারা নির্যাতিত, যাদের ক্ষমতায়ন হয়নি, যেমন নারী, এদের সম্পর্কে কানুনি কল্পনা ব্যবহার করা হয়। ব্যবহার করে একধরনের ইনসাফ, একধরনের ন্যায় করার চেষ্টা হয়।
রাজু আলাউদ্দিন : তার মানে আইনের মত এমন করা-বাস্তবতার পেছনে এ রকম কল্পনা ব্যবহার করা যায় বা করা হয়?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : করা হয়, ইংল্যান্ডে এটাকে বলে ইকুইটি কোট। এখন অবশ্য ইকুইটি কোড এবং কমলা কোট এক। কিন্তু আইনের বিস্তারের পেছনে লিগাল ফিকশনের বিশাল একটা ভূমিকা আছে।

(হলো হলো, অনেক হলো। হল হল হল, খোল খোল খোল, গেল গেল গেল, হা হা হা। খানিক হাস্য-রঙ্গ করলেন তিনি—সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী।)

রাজু আলাউদ্দিন : অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, উনি আইন ব্যবসার সাথে জরিত ছিলেন যতদূর মনে পরে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমার মনে হয় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত মুনসেফ ছিলেন, পরে বিচারপতি হয়ে থাকতে পারেন– আমার ঠিক মনে নাই। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তো উপন্যাস লিখেছেন, ভাল উপন্যাস লিখেছেন। শেষ জীবনে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের জীবনী শুধু লেখেননি, তাঁকে অনুসরণ করেছেন, তাঁকে গুরু মেনে চলেছেন আরকি। সুতরাং ধর্মের যে কত রকমের প্রভাব থাকতে পারে, মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে তা ভাবনার বিষয়।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি কি স্যার ধর্মাচার পালন করেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি আপনাদের মাজার-টাজার বিশ্বাস করি না।
রাজু আলাউদ্দিন : মাজারে বিশ্বাস করেন না? কিন্তু ঢাকা শহর, গ্রাম-গঞ্জ মাজারে ভরে গেছে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কিন্তু কী করা যাবে! আপনারা তো আবার এই নিয়ে অনেকে অহংকার করেন। হ্যাঁ, আমি দেখি এখানে অহংকার করে বলা হয় বাঙ্গালি মুসলমানের ইসলাম ধর্ম হচ্ছে সুফি বেইজড। সুফি বেইজ মানে যদি মাজার পুজা হয়, তাহলে God will help them.
রাজু আলাউদ্দিন : সুফিরা তো মাজারে বিশ্বাস করে না।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সুফিদের ঘিরেই তো মাজার। যত মাজার এখানে আছে সব সুফিদেরকে ঘিরে। আমার… (যার যার ধর্ম তার তার’?—রাজু আলাউদ্দিন)। না না, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার বইটির ভেতরে কথা আছে মাজারের ব্যবহার নিয়ে। একটা কার্টুন আছে খুব সুন্দর, আমাদের দুই প্রধান নেত্রী একটা ছোট্ট বাচ্চাকে জিগ্যেস করছে—আর কোথায় মাজার আছেরে? হা হা হা। এই মাজারের পক্ষে আমার সাথে দেখা করতে আসছিল, সে ব্যাপারে বইয়ে আছে, আমি আর নতুন করে বলতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি বলছিলেন যে, ধর্ম বিষয়ে আমরা এখন খোলামেলা কথা বলতে পারি না, আমাদের নিজেদের মধ্যে নিজেরা একটা সেন্সরশিপ আরোপ করি। যেহেতু অনেক বেশি স্পর্শকাতরতা চলে আসছে ধর্ম বিষয় নিয়ে কথা বলায়। আপনার কি মনে হয় না, মানুষ অনেক বেশি মৌলবাদী হয়ে যাচ্ছে? ঠিক মৌলবাদী না, অনেক বেশি ধর্মীয় আচার-নিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পরছে? তাতে করে ধর্মের মূল যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাস থেকে সরে যাওয়ার যে বিষয়টা সেটা আছে কি না? আপনি কী মনে করেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি এ ব্যাপারে কোনো দেখি না কিছু।
রাজু আলাউদ্দিন : এই যে আপনি কিছুক্ষণ আগে বললেন যে মাজার, মানুষ মাজারের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : বাংলাদেশে তো মাজার আজ থেকে না, মুসলমানা আসার আগে থেকে মাজার পুজা করা, স্তুপ পুজা করার চল ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা কি হিন্দুরা শুরু করেছে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, স্তুপ পুজা, হিন্দুদের স্তুপ পুজা।
রাজু আলাউদ্দিন : ওইটারই আরেকটা সংস্করণ বাঙ্গালি মুসলমানদের…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তা জানি না। না, I don’t want to say that. আমি যেটা বলতে চাই না সেটা আমার মুখ দিয়ে বলাবেন না।
রাজু আলাউদ্দিন : না, আমি কতগুলো বিষয় জানতে চাই।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আপনাকে আমার জানানোর কোন কারণ নেই। আপনি জানেন না তো জানেন না; এত বেশি জানতে চেয়ে লাভ কী?
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, যেমন ধরুন আমাদের দেশে মিলাদ, এটা তো স্যার আমাদের…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এই মিলাদ নিয়ে তর্ক করে কী লাভ?
রাজু আলাউদ্দিন : না, আমি এটার ঐতিহাসিক বিষয় জানতে চাচ্ছি।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি জানি না ঐতিহাসিক কিছু। আমাদের দেশে মিলাদ পড়ে, মিডলইস্টে অনেক জায়গায় মিলাদ পড়ে না। আমাদের মিলাদের যে সমস্ত টুকিটাকি জিনিস কর্তব্য বলে বলা হয়, তা অন্য দেশে বল হয় না।
রাজু আলাউদ্দিন : এখন তো ধরেন বাঙ্গালি মুসলমান আমরা যারা আছি আরকি, আমরা আরবের সংস্কৃতির দিকে ক্রমশ ঝুঁকে পরছি। আবার একই সঙ্গে মিলাদ-টিলাদ এগুলো, যেগুলো ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পর্কই নাই, সেই গুলোর চর্চা করছে। আমি সেটাই বলতে চাইছিলাম, আমি যেহেতু এই বিষয়ে…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি এই বিষয়ে কিছু লিখি নি।
রাজু আলাউদ্দিন : না, আপনি লেখেননি কিন্তু আপনার পড়াশুনা, আপনার কোরআন শরিফ সম্পর্কে জানা…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমার পড়াশুনাও নাই, ধর্মের ব্যাপারে আমার পড়াশুনা নাই। যতটুকু লিখেছি ততটুকুই, আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না।
রাজু আলাউদ্দিন : তাহলে স্যার, ধর্ম থেকে অন্য বিষয় গেলে ভাল হয়, না?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ধর্ম বিষয়ে আমি বেশি বক্তব্য রাখতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : কোনো কোনো অস্বচ্ছ বিষয় আপনি স্বচ্ছ করতে পারেন তো, ধর্ম বিষয়ে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, অনেক জিনিস আছে অস্পষ্ট থাকাই ভাল।
রাজু আলাউদ্দিন : তাই? এই বিষয়গুলো স্বচ্ছ করলে ভাল হয় না, জাতির উপকার হয় না?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : জাতির উপকার করার জন্য নিজের কাছে দায়বদ্ধতা নেই নি, কোনদিন না।
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু আপনি কোনদিন দায়বদ্ধতা নিয়ে কোন কিছু করেন নি বটে, তবে দায়বদ্ধতা ছাড়াই এমন কিছু কাজ করেছেন যেটা আমাদের কোন না কোনভাবে উপকার করেছে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না না, সেটা তো আমার না, আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে আমি করেছি। আমার নিজস্ব কোনো… মানে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে আমি এত বড় দায়িত্ব কোনদিন নিতেই চাইব না।
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, একটা প্রশ্ন আপনাকে করতে পারি কি না, যদি আপনি কিছু মনে না করেন। আপনি একটা সময় (আবু আলা) মওদুদীর একটা বই অনুবাদ করেছিলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি মওদুদীর কোন বই অনুবাদ করি নি। আপনি কোথা থেকে এইসব প্রশ্ন পান!
রাজু আলাউদ্দিন : না না, আমি নিজে বইটা দেখেছি। সেজন্য বললাম।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি তো মওদুদীর বই অনুবাদ করিনি, আপনি কেন বলবেন এই কথা?
রাজু আলাউদ্দিন : তাহলে একই নামে হয়তো অন্য কেউ করেছে, ওখানে লেখা আছে…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমার নামে নাম বাংলাদেশে অন্তত দু-এক কোটি হবে। সুতরাং কে কী করেছে না-করেছে আমি জানি না।
রাজু আলাউদ্দিন : না, আমি জানতে চাচ্ছিলাম, আমি নিজে দেখেছি বইটা কয়েক দিন আগে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমি তো বললাম প্রায় দেড় কোটি দুই কোটি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান আছে, কে করেছে আমি জানি না, আমি করিনি।
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, অতুল প্রসাদ সেনের গান তো আপনি শোনেন। (হুম—মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান)। উনি তো বোধহয় আইন ব্যবসার সাথে ছিলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন : আমার অদ্ভুত লাগে যে ওনার গান যখন শুনি; আমি কল্পনা করতে পারি না যে এর পেছনে আইন পেশার সাথে জরিত একজন মানুষ ছিলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আইন পেশা সম্পর্কে আপনার এমন ধারণা কেন, যে আইন পেশা করেছে সে গান গাইতে পারবে না? গানের সমঝদার হতে পারবে না?
রাজু আলাউদ্দিন : নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু তার গানগুলো বেশির ভাগই বেদনামথিত। কেন এরকম সেটাই জানতে চাচিছ।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : অতুল প্রসাদ সেনের অনেক রকমের বেদনা ছিল আপনারা জানেন নিশ্চয়।
রাজু আলাউদ্দিন : না, আমি জানি না স্যার।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তাহলে এসব কথা আমি আলোচনা করতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : না, বলেন, কিছু কিছু জানি, যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কিছু না সেটা বলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমি তা বলতে চাই না। কারণ, বলে কী লাভ?
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, ঠিক আছে, আমাদের জন্য বলেন অন্তত।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, এটা কেটে দিন, অযথা। ওঁর বৌ পালিয়ে গিয়েছিল না, গান কি এমনিতে বের হয় নাকি!
রাজু আলাউদ্দিন :আচ্ছা, আপনার লেখকদের কথা বলেন; যাদের লেখা পড়ে আপনার ভাল লাগছে, যাদের প্রভাব আপনি মনে করেন আপনার ওপর আছে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না না, আমার উপরে কোন লেখকের প্রভাব নাই। আমার যখন লেখা ভালো লাগে, কোনো লেখকের একটা লেখা ভালো লাগে, কোনো লেখকের একটা বই ভালো লাগে, কিন্তু এই ভালো লাগালাগির ব্যাপার নিয়ে বক্তব্য দেয়ার কোনো অবকাশ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি পড়েন এখন অন্যদের লেখা, যারা উপন্যাস-গল্প লেখে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : পড়ি, এখনো পড়ি।
রাজু আলাউদ্দিন : ভালো লাগে বাংলাদেশের কারো লেখা?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এ আমি বলতে পারবো না—কার লেখা ভাল লাগে। বাংলাদেশ অনেক কঠিন জায়গা, কার লেখা ভালো লাগে কার লেখা ভালো লাগে না বলা।
রাজু আলাউদ্দিন): (মন্তব্য করা যাবে কি?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, দরকার কী? আমি বিশেষভাবে কোনো লেখককে ভালো বলতে চাই না। কার লেখা ভালো লাগে এখানে বলতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : বা ভালো লাগে না, সেটাও কি বলতে চান না?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, তাও না।
রাজু আলাউদ্দিন : ইদানিং ছবি আঁকছেন শুনলাম। একটা বইয়ের কভারও করেছেন নাকি। এই বিষয়ে, ছবি আঁকা বিষয়ে কিছু বলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না না, আমি ছবি আঁকিনি। আমাকে একজন বললেন যে, এই রকম একটা বই করলে কেমন হয় আর আপনাকেই ছবি আঁকতে হবে। শেষে আমি ছবি একে দিলাম আরকি। কিন্তু আমি ছবি আঁকতে পারি না।
রাজু আলাউদ্দিন : বাংলাদেশের মৃত লেখকদের কথা তো বলতে পারবেন, বাংলাদেশের না, বাংলা ভাষার?

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না না না, আপনারা একটা ভুল ধারণা করছেন যে, আমি সাহিত্য সম্পর্কে খুব ভালো জানি। আমি নিজের ইচ্ছা মত পড়ি, পড়ি না; প্রশংসা করি, গালাগাল করি না।
রাজু আলাউদ্দিন : কী ধরনের বই এখন পড়েন বেশি?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এখন সবসময় কাজের বই পড়ি বেশি।
রাজু আলাউদ্দিন : যেগুলো আপনার রেফারেন্স হিসেবে লাগে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : যখন আমার ইমিডিয়েটলি দরকার, যেমন এখন কাজ হচ্ছে বিদেশী ভাষায় লেখা মাতৃভাষার উপর কবিতা সংকলন করা। এবং আজকে আমার একজন জানাশুনা লোক ভিয়েতনাম থেকে এসেছেন, ওনাকে বললাম যে, আমার কবিতা নিয়ে আসবেন? উনি বললেন, হ্যাঁ, নিয়ে আসবো। আজকে এখনই আসার কথা ছিল প্রফেসর ইসরাফিল শাহিন, উনি উরিষ্যা ভাষায় আমার জন্য কবিতা এনেছেন। এখন আমার বর্তমান সমস্যা হচ্ছে এটা শেষ করা। মানে শেষ হবে না কোন দিন, কিন্তু যাই হোক।
রাজু আলাউদ্দিন : একটা জিনিস তো স্যার জানা যেতেই পারে। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে, বলা যায় এই বছর থেকে শুরু হইছে আগামী বছর গিয়ে শেষ হবে। আপনার কাজ আছে এই বিষয়ে, আপনার দুইটা বই আছে রবীন্দ্রনাথের উপর, যতদূর মনে পড়ে আমার বা এর থেকে বেশিও থাকতে পারে। বইয়ের বাইরেও আপনার লেখা আছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এত বিস্তর আলোচনা লেখালেখি হয়েছে, এর মধ্যে আপনার মনে হয় কি রবীন্দ্রনাথের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনো পর্যন্ত আলোচনাই হয়নি? এই বিষয়ে কিছু বলেন স্যার।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কোন কোন বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে আমার কাছে কোন খতিয়ান নাই, আমি বলতে পারব না।
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু যে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়–এটা আপনি বলেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমার যখন খেয়াল হয় আমি করি। আমি ‘রবীন্দ্রনাথের আইনি ভাবনা’ করেছি, কেউ আগে লিখেনি। ‘রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞা ও পার্থক্যবিচার’ কেউ আগে লিখেনি। ‘একজন বাঙ্গালির আত্মসমালোচনা’—রবীন্দ্রনাথ কিভাবে আত্মসমালোচনা করেছেন এটা কেউ আগে লেখেনি। আমি এখন চিন্তা করছি আরেকটি লেখা, এটা এখনো বুনা অবস্থায় আছে; সুতরাং এটা নিয়ে আলোচনা না করাই ভাল। একটা বই আমি তৈরি করবো আর একটা বই বেরুচ্ছে ‘গগণে গরজে মেঘ ঘন বরষা’ নামে। এটা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা-গল্প-চিঠিপত্র যেখানে বর্ষার উল্লেখ আছে তার একটা সংকলন।
রাজু আলাউদ্দিন : রবীন্দ্রনাথকে—আপনি ধরেন—এখন যেভাবে নেবেন আরকি, রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার জায়গাগুলো কী কী বলে মনে হয় আপনার? রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক বিষয়ে অনেক অংশগ্রহণ আছে, মানে মন্তব্য আছে, তাই না? এরকম কোনো দিক আছে কিনা যেগুলো আপনার মনে হয়েছে ঠিক নয়।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : রবীন্দ্রনাথ এক দিক থেকে সত্যদ্রষ্টা। উঁনি বলছিলেন যে, ‘তোমরা যেভাবে হিংসা কর, তোমরা যখন স্বাধীনতা পাবে তখন খেওখেউই করবে।’ সেটা তো ঠিকই দেখা গেছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই তো তিনি মারা গেছেন, লেখা শেষ করেছেন। এটা এক নম্বর। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, যে সমস্ত আত্মম্ভরিতার কথা আছে রবীন্দ্রনাথের ভেতরে সেগুলো সত্য নয়। ভারবর্ষে গোলমাল সব বিদেশীরা করেছে, তা তো না। ভাল এবং মন্দ—উভয়ের মধ্যে আমাদের কী অবদান রয়েছে তা তো নতুন করে দেখা যাচ্ছে, সব কি বৃটিশরা করে দিয়ে গেছে? উনি অনেক জিনিস ঠিকই বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের ভেতর যে তফাত তা আগে থেকেই ছিল। আর পৃথিবীতে কোন শাসক আছে যে তার প্রজাদের ভেতর ধর্মের ভিত্তিতে বা অন্য কোনো ভিত্তিতে যদি পার্থক্য থাকে তার সুযোগ নেবে না? এখনো ইন্ডিয়াতে যেখানে মুসলমান বেশি সেখানে পার্লামেন্ট ইলেকশনের সময় মুসলমান কেনডিডেট দেয়ার চেষ্টা করা হয়। সুতরাং বৃটিশদের সম্পর্কে যে একটা কথা বলা হয় যে তারা ‘ডিভাইড এন্ড রোল পলিসি’ করেছে, বিশেষ করে ভারতবর্ষে যখন এত ডিভিশন সেখানে কোনো শাসকের পক্ষ সেই লোভ সংবরণ করা কঠিন যে, আমি ‘ডিভাইড এন্ড রোল’ করবো না? প্রত্যেক শাসকই ‘ডিভাইড এন্ড রোল’ করে। এই সমস্ত কতগুলো চার্ম শব্দ আমাদের দেশে আছে, যার কোন অর্থ নেই। শাসক মানেই তো ‘ডিভাইড এন্ড রোল’ করবে। আমাদের দেশে শাসকরা ‘ডিভাইড এন্ড রোল’ করছে না? কত রকমের ‘ডিভাইড এন্ড রোল’ করছে। আমরা দ্বিধা বিভক্ত না, আমরা শতধা বিভক্ত হয়ে গেছি।
রাজু আলাউদ্দিন : এটা তাহলে ভুল যে, কেবল বৃটিশদের মধ্যেই ‘ডিভাইড এন্ড রোল’ পলিসি রয়েছে; আসলে এটা সব জাতির মধ্যে আছে কমবেশি।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : যে কোনো শাসকের মধ্যেই আছে; সব জাতি না, যে কোনো শাসক।
রাজু আলাউদ্দিন : আর দেশ বিভাগটা কি আমাদের জন্য ভাল হইছে? আপনার কি মনে হয়—এটা অনিবার্য ছিল এবং এটাই ভাল?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : দেশ বিভাগ হয়েছে কারণ আমাদের বরেণ্য প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেছিলেন। অস্থির হয়েই তারা দেশ বিভাগ করেছিলেন এবং দেশ বিভাগ তৎকালিন অবস্থায় অবশ্যসম্ভাবি তো বটেই। এই যে একটা কথা বলা হয়, দ্বি-জাতিত্ব ভেঙে গেছে। দ্বি-জাতিত্ব ভেঙে গিয়ে কি এক জাতিত্ব হয়েছে? দ্বি-জাতিত্ব তত্ত্ব ভেঙে কি এক-জাতিত্ব তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? বিশেষ করে যখন বহুজাতি আছে, Submerged Nationality আছে, তারা যখন নিজেদের স্বাধীনতার কথা বলছে। এইগুলি হচ্ছে বৈঠকী মামুলী সব কথাবার্তা, যার কোনো অর্থ নেই।
রাজু আলাউদ্দিন : আমাদের এই বাংলাদেশ যে আরো ছোট হয়ে গেল স্যার, এই বিভঙ্গের পরে, আমরা বাঙালি মুসলমানরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হলাম অনেক।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : বাঙালি মুসলমান ক্ষতিগ্রস্ত! বাঙ্গালি মুসলমানরা এর চেয়ে বড় সুযোগ পায়নি জীবনে। আমি বলি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিস্ময়কর জিনিস হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের অভ্যুদয়। This is one of the very important events in 20 century : the rise of the Bengali Muslim.
রাজু আলাউদ্দিন : গোট মানবজাতির ইতিহাসের বিশাল প্রেক্ষাপটে বলবেন স্যার?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : মানবজাতির ইতিহাসে হাজার হাজার ঘটনা রয়েছে। কিন্তু এটা হচ্ছে যে আমাদের চতুর্পাশের অঞ্চল বিবেচনা করে।
রাজু আলাউদ্দিন : বাঙ্গালি মুসলমানদের জন্য তো তাহলে এখন বেশ উদ্দীপক একটা ব্যাপার এটা।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কোনটা উদ্দীপক?
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি যেটা বলেন যে বিংশ শতাব্দীতে এটা একটা বড় ঘটনা। কিন্তু এর কারণটা আমি বুঝতে পারছি না, কেন আপনি বড় ঘটনা বলছেন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : বাঙ্গালি মুসলমান যেভাবে অনুন্নত ছিল, তারপর এখন তাদের যে অগ্রসরতা–এটা বিস্ময়কর ব্যাপার। এবং এটা কেবল মাত্র ভোটাধিকারের জন্যই সম্ভব হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : ভোটাধিকারের জন্যই কি শুধু সম্ভব? তাহলে কি স্যার পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের…
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : মাথা পিছুর জন্য আপনাদের এত চিৎকার যে, আপনারা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে সংখ্যায় বেশি, এই জন্য আপনাদের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত, এই জন্য আপনাদের ভোটাধিকার দেওয়া উচিত, গণতন্ত্র দেয়া উচিত। কিন্তু এখন তো আপনাদের চেয়ে ওদের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন : পাকিস্তানিদের! (জনসংখ্যা) আমাদের চেয়ে বেশি নাকি পাকিস্তানে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ, এখন বেশি। সুতরাং কত ইমপার্মানেন্ট জিনিস নিয়ে আপনারা ঝগড়াটা করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সবচেয়ে মজার জিনিস হচ্ছে যে, আমরা খুব ডিফেনসিভ ছিলাম, আমরা সকল ভাষার মর্যাদার কথা বলেছি। যেটা আজকে আমরা বলি, যেটা আমি আমার কবিতায় বলেছি যে, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষায় কথা বলে’– এইটাই ছিল সবচেয়ে অগ্রবর্তী চিন্তা এবং এটার পেছনে আমার মনে হয় বাম-চিন্তাধারা কাজ করেছিল এক সময়।
রাজু আলাউদ্দিন : তাই কি মনে হয় স্যার?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : জাতীয়তাবাদের চিন্তায় এটা আসে না। জাতীয়তাবাদের চিন্তায় অনেক কিছু আসে। ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমর ঠিকানা’ এই যে স্লোগান, এই স্লোগান তো সাম্যবাদীদের ঠেকাবার জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই স্লোগান এতই সুন্দর এবং এতই প্রাণস্পর্শি যে সাম্যবাদীসহ সকলেই এটা গ্রহণ করেছে। তাই প্রাণ দিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনি বিরোধিতা করছেন কেন স্যার? একজন সাম্যবাদী কি এটা বলতে পারে না? এটা তো দেশপ্রেম।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সাম্যবাদীদের ঠেকানোর জন্য বলা হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : কথা হল যে, ওইটা কেন ঘটতে পারে স্যার?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সেটা আমি জানি না। যারা করেছে তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আমি তো তৈরি করি নি। যারা করেছে ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা…’ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, তারাই তো বলে দেবে। আমি তো করি নি।
রাজু আলাউদ্দিন : ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ কার এটা, আমার খেয়াল নেই।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এটা আওয়ামী লীগের, এটা মার্কিনপন্থী আওয়ামী লীগের তৈরি আমার ধারণা।
রাজু আলাউদ্দিন : আওয়ামী লীগে তো সাম্যবাদীরাও ঢুকে গেছে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এখন তো অনেককটা রয়েছে। এখন এডুকেশন মিনিস্টার হয়েছে, এগরিকালচার মিনিস্টার হয়েছে, অনেকে রয়েছে সাম্যবাদের।
রাজু আলাউদ্দিন : এরা সব তো সাম্যবাদী। ফলে সাম্যবাদের সঙ্গে তো বিরোধ নাই স্যার।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কে বললো বিরোধ নাই! সারা পৃথিবীতে সাম্যবাদের সঙ্গে বিরোধ।
রাজু আলাউদ্দিন : তাই কি?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন :জাতীয়তাবাদের বিরোধ আছে কি? সাম্যবাদের সঙ্গে ওই বক্তব্যটির যে একটা বিরোধ থাকতে পারে এবং ছিল—সেটা নিয়েই প্রশ্নটা। আমার যেটা মনে হচ্ছে বিরোধটা একটা সময় ছিল স্যার, এখন আবার সব একটা জায়গায় চলে আসছে। যেমন সাম্যবাদে বিশ্বাসী বহু লোকজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। যেটা আপনি একটু বলবেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : একাত্ম হয়েছে—কে বলল একাত্ম হয়েছে? এই যে উল্টাপাল্টা কথা বলেন। এই যে মহাজোট ইজ নো জোট। সারাদিন মেননরা চেচাচ্ছে, দুঃখ করছে—আমাদের ডাকে না, কথা বলে না। দু’বছরে দু’বার ডেকেছে চা খাওয়ার জন্য। কিসের আওয়ামী লীগ জোট। আপনাদের কল্পনাশক্তি অসম্ভব।
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু এক জায়গাতে বসেছে স্যার।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কিসের! দুই বছরে দুই দিন বসেছে। কিসের মহাজোট! আর ওদের সুবিধা হয়েছে যাদের কেউ নিজেদের ভোটে কোনো এম.পি হতে পারতো না, তারা ওই সুবিধাটুকু পেয়েই—They should thank their luck যে, আমি একটা এম.পি হয়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন : এন্ডিং প্রশ্ন। সেটা হচ্ছে যে, আপনি যেহেতু বিচার কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলেন, এখন যে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে সেই প্রসঙ্গে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি কি আপনাকে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : করেন।
রাজু আলাউদ্দিন : সেটা হচ্ছে যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এটা কি আপনার কাছে সঠিক মনে হয়েছে?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : এই উদ্যোগ অনেক আগেই নেয়ার কথা ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : নেয়ার কথা ছিল, নাকি উচিত ছিল স্যার?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : উচিত ছিল আরকি।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার কি মনে হয়েছে খুব স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে এগুচ্ছে বিষয়টা এখন?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : তা আমি কী করে বলব, আমি তো এটার ভিতরে নাই। খবরের কাগজের ভেতর থেকে আমি আমার মত দিতে চাই না।
রাজু আলাউদ্দিন : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে আপনার কোনো সাজেশন বা কোনো কিছু বলার আছে স্যার?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : আমার কোন সাজেশন নাই। সমস্ত দক্ষ মানুষ কাজ করছেন, তাদেরকে আমি কোনো পরামর্শ দিতে চাই না। আমি কেন পরামর্শ দিতে যাব? গায়ে পরে পরামর্শ দেয়ার অভ্যাস আমার নেই।
রাজু আলাউদ্দিন : না, গায়ে পরে না তো, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি তো আর বলছেন না।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : না, আমার পরামর্শ দেয়ার কিছু নেই। পরামর্শ যা দেয়ার ওদের সেক্টর কমান্ডার মিটিংয়ে আমি বলেছিলাম। যেটা আমি গত ৪ঠা নভেম্বরের লেখার ভেতর আবার বলেছি। ‘যা চেয়েছি যা পেয়েছি’ ওই লেখায় আমি বলেছি কি চাই এবং শেষ কথা কিন্তু ওই যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে।
রাজু আলাউদ্দিন : আপনাকে স্যার অনেক ধন্যবাদ।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : থ্যাঙ্ক ইউ, আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ অনেক জ্বালানোর জন্য। এটাও লিখবেন।
রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা। হা হা হা (সবাই)।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন L Gani — জানুয়ারি ১১, ২০১৮ @ ৭:৫৩ অপরাহ্ন

      Liked it! Shared on my Facebook wall. Thank you Razu bhai.
      ML Gani

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আকেল হায়দার — জানুয়ারি ১৪, ২০১৮ @ ১:০৭ অপরাহ্ন

      রাজনীতি, সাহিত্য ও সমাজমুখী আলোচনায় তথ্যবহুল সমৃদ্ধ একটি সাক্ষাতকার এটি। অনেক কিছু জানার ও শেখার আছে এই কথোপকথন থেকে। ধন্যবাদ- কবি রাজু আলাউদ্দিন ভাইকে, আর্টস.বিডিনিউজ পাঠকদের এতো সুন্দর একটি সাক্ষাৎকার উপহার দেয়ার জন্য।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com