দক্ষিণে সূর্যোদয় : রাজু আলাউদ্দিনের ব্যতিক্রমী রবীন্দ্রানুশীলন

সনৎকুমার সাহা | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১২:৫০ অপরাহ্ন

Dokkhine Razuবইটির কথা আমি আগেই শুনেছি। অনেকে এর সপ্রশংস উল্লেখ করেছেন। আমারও কৌতূহল ছিল। কিন্তু পড়া হয়নি। আমার দুরারোগ্য আলসেমি বাদ সেধেছে। এতদিনে, ঢাকার ‘অবসর প্রকাশনা সংস্থা’ থেকে ২০১৫-য় ছেপে বেরোবার দু’বছর পরে, পড়তে পারলাম। পেরে খুশি হয়েছি। বইটি আমায় হতাশ করেনি। চমৎকার নির্ভার গদ্য। সেইসঙ্গে অনেক অজানা তথ্য ভিন্ন প্রেক্ষাপটে মেলে ধরা। তাতে ফাঁকির কারবার নেই। বিষয়নিষ্ঠা অনুকরণীয়। নিরাসক্ত শ্রদ্ধা এতে বিপর্যস্ত হয় না। ভিন্ন সংস্কৃতির সাড়া পাবার সাড়া দেবার প্রতিক্রিয়ায়, যাকে ঘিরে কথা বলা, সেই রবীন্দ্রনাথও খাটো হন না। যদিও পুরোপুরি মুখোমুখি হই না, এ আক্ষেপ থাকে। অবশ্য সেজন্য এই বইয়ের লেখক দায়ী নন। স্থান-কাল-পাত্রের বস্তুগত ও মনোজাগতিক ব্যবধান পেরিয়ে, ভাষান্তরনে অনুভবের প্রকৃত উপলব্ধি ফুটিয়ে তোলার সমস্যা মোকাবেলা করে এবং ওই সময়ে দুই ভূখন্ডের দুই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দূরত্ব অতিক্রম করে রবীন্দ্রনাথ যতটা ও যেমন উদিত ও উদ্ভাসিত হয়েছিলেন তা স্বয়ং একটা সীমা বেঁধে দেয়। লেখক তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মান্য করেন, এবং এইটিই কাম্য। আমরা পরস্পর যোগাযোগের নির্মোহ ও যথাযথ রূপটি এখানে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ করি। তাতে কোথাও কোন অসংযম নেই। এতে বইটির গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব আরো বেড়েছে। দূরত্ব ও বিস্তার বিষয়ের আকর্ষণ বাড়ায়। পড়ে ঋদ্ধ হই।

বইটি দক্ষিণে সূর্যোদয়। লেখক, রাজু আলাউদ্দিন। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে ও পানামা খাল পেরিয়ে মেক্সিকোতে, পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের নাম ছড়িয়ে পড়ার পর সুধীমহলে কেমন ঔৎসুক্য জাগে, নিজে সশরীরে আজেন্টিনায় ১৯২৪-২৫ এ প্রায় দু মাস কাটাবার প্রভাব ওই ভূখন্ডে কতটা পড়ে, শত বছরের যোগাযোগে ঘনিষ্ঠতা ও বিচ্ছিন্নতা, আকর্ষণ ও বিরাগ কেমন বহমান থাকে, সময় সবের ওপর দিয়ে কেমন বয়ে যায় আর নিঃশব্দে বিস্মৃতির চাদর বিছিয়ে চলে, এই সবের এক নিরপেক্ষ-তথ্যনিষ্ঠ, কিন্তু সংবেদনশীল বিবরণ তিনি আমাদের সামনে হাজির করেন। তাঁর অনুসন্ধিৎসার ও মেধার উৎকৃষ্ট চর্চার ছাপ পড়ে ছত্রে-ছত্রে। বৈদগ্ধ্যের প্রকাশ অনায়াস। যেন বিষয়ের ওপর দখল এমন সুসম্পূর্ণ যে তেমনাটাই ঘটে সহজ সাবলীলতায়। আরো যা একে বৈশিষ্ট্য দেয়– বোধহয় তা অনন্যই, অন্তত আমি এমনটি এক গোটা কাজে আর কোথাও পাইনি, তা হলো, তাঁর স্প্যানিশভাষা ভালো জানা থাকার কারণে মূল সূত্র থেকে– যা এখানে অপরিচিত বা সবার অগোচরে– তথ্য উদ্ধার করে তার গুরুত্ব বুঝে তাকে যথাস্থানে যথাযথ উপস্থিত করা; এবং তা এমন দক্ষতায় যে পড়ার সময় তা জটিল বা গুরুগম্ভীর কিছু মনে হয় না, বরং যেন এক রোমাঞ্চঘেরা আকর্ষণীয় সত্য কাহিনির উম্মোচন ঘটছে– যার শিহরনের রেশ থেকে যায় শুরু থেকে শেষ সবটায়– এমন অভিজ্ঞতার উপলব্ধিই চেতনায় স্থায়ী হয়। নিজের বেলায় আমার এই রকম ঘটেছে বলে অনুমান করি, আর সবার বেলাতেও তা থেকে ভিন্ন তেমন কিছু ঘটবে না। কারণ আমি কোনো ব্যতিক্রমী পড়ুয়া নই, নিতান্তই সাধারণ মানের। অবশ্য কৃতিত্ব এখানে শুধু লেখকের নয়, তাঁর সহধর্মিনী মারিসোলেরও– তিনি স্বয়ং মেক্সিকান কন্যা, সূত্রের মূলানুগ হতে পারার সাহস ও সক্ষমতার অনেকটাই জুগিয়েছেন তিনি। তাঁর কৃতজ্ঞ ও পরিতৃপ্ত উল্লেখে লেখক ভুল করেননি। তবে তাঁদের অনুসরণে আমি ব্যর্থ। স্প্যানিশ কিছুই জানি না। নাম-ধাম যা একটু আধটু বোঝার তা ইংরেজিতে। তা বাদ দিয়ে স্প্যানিশ আবহ ফুটিয়ে তুলতে চাইলে অবস্থা হবে ময়ূরপুচ্ছধারী দাঁড়কাকের মতো। আমি দাঁড়কাকই থেকে যাই। রাজু আলাউদ্দিনের সৌভাগ্য, তিনি দক্ষ ত্রিভাষিক (ইংরেজি নিয়ে) হতে পেরেছেন। এই বইতে তা খুব কাজে লেগেছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের স্প্যানিশ অনুবাদ সবই ইংরেজি থেকে। রাজু রবীন্দ্র রচনার বাংলা, ইংরেজি ও স্প্যানিশ তিনটি টেক্সটই পাশাপাশি রেখে খুঁটিয়ে পড়েছেন। কোথায় কী তফাৎ হয়েছে, ইংরেজি অনুবাদ রবীন্দ্রনাথের করা হলেও, তা চিহ্নিত করেছেন। রূপান্তর-প্রক্রিয়ায় কবিতাও যে নতুন হয়ে ওঠে, তাঁর কাজ থেকে তা অনুধাবন করতে পাওয়া এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা। তবে গুণের বিচারে, মাত্রা বিচারে আমার মনে হয় না চাইলেও আত্মকেন্দ্রিকতা ঢুকে পড়ে। অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপট ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রত্যেকের আলাদা। নিজ নিজ ভাষার নির্মাণে তার অনিবার্য ছাপ। ভাষাই আবার উল্টো দিক থেকে ভাবনার ও কাজের প্রচ্ছন্ন হাতিয়ার। এই প্রক্রিয়া বিভিন্ন পরিবেশে আবেগে ও কল্পনায় বিভিন্নতা আনে। অনুবাদে তাদের সমন্বয় ও সামঞ্জস্য নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে উপায় থাকে না। তারপরেও তাল মেলে কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়। সদুত্তর মেলে না। সর্বসম্মত মূল্যবিচার বোধহয় সংজ্ঞার্থেই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদিও পারস্পারিক ভাব-বিনিময়ের কল্যাণকরতা, এমনকি পরনির্ভরতার বাস্তব পরিমণ্ডলেও, উপেক্ষা করা যায় না। সব জায়গাতেই মানবচেতনায় বৈচিত্র্যের ছাপ পড়ে। সমৃদ্ধিও অসম্ভব নয়।

রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি অনুবাদ কোন পূর্বপরিকল্পিত ব্যাপার ছিল না। পারিবারিক বন্ধুত্বের সূত্রে চিত্রকর রোদেনস্টাইন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে আসেন। বোধহয় অবনীন্দ্রনাথের ছবির দিকেই ছিল বেশি আগ্রহ। কারণ তখন বাংলায় চিত্রকলার বাঁক বদলে এই নিয়ে বিতর্ক তুমুল। রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে বাংলা কবিতার আবৃত্তিও তিনি শোনেন। ধ্বনিমাধুর্য তাঁকে আকৃষ্ট করে। ইংরেজি অনুবাদে উৎসাহ জোগান তিনিই। অবসরের কাজ হিসেবেই কবি একে নেন। কদিন পরেই তাঁর বিলেত যাবার কথা। আশা করেন, তখন রোদেনস্টাইনের সঙ্গে দেখা হলে তাঁকে শোনাবেন। অসুস্থতার জন্যে এই বিলেত যাওয়া ক’মাস পিছিয়ে যায়। এর ভেতরে কিছু সময় তাঁর পূর্ববঙ্গে কাটে। অনুবাদের কাজ তখন কিছু এগোয়। বাকিটা বিলেতের পথে জাহাজে। লন্ডনে পৌছবার পর টিউব ট্রেনে ওঠার সময় তাঁর একটা ব্যাগ খোয়া যায়। তাতেই ছিল অনুবাদের পান্ডুলিপি। কিন্তু ভাগ্য আবার ওই ব্যাগ তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। পরদিনই হারানো-প্রাপ্তি অফিস থেকে খবর আসে, খোয়া যাওয়া ব্যাগ পাওয়া গেছে। তা হাতে পেয়ে রোদেনস্টাইনকে তিনি গীতাঞ্জলির অনুবাদ পড়তে দেন। হাত ঘুরে তা যায় কবি ইয়েটসের কাছে। এরপর থেকে তাঁর নোবেল প্রাইজ পাওয়া পর্যন্ত যা ঘটে তা তো সাহিত্যের ইতিহাসে বার-বার বলা, বার-বার শোনা এক চমকপ্রদ কাহিনি। কোথায় প্রায় অচেনা এক বাংলাদেশ, তার কোন অখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ– তিনি পেয়েছেন ওই সময়ে বিশ্বসাহিত্যের সেরা পুরস্কার! সেই সময়ের প্রেক্ষিতে শুধু অভাবনীয় নয়, অকল্পনীয়ও।

মনে রাখতে হবে, ১৯১৩ সালের বিশ্ব ছিল ইউরোপ-কেন্দ্রিক। রবীন্দ্রনাথের আগে ওই অঞ্চলের বাইরে থেকে কেউ সাহিত্যে নোবেল পাননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেখকরাও নোবেল পেয়েছেন অনেক পরে, এক ভিন্ন বিশ্ব প্রেক্ষাপটে। কিন্তু ওই সময়ে ইউরোপের বাইরে থেকে কারো নাম বিবেচিত হবে, এমনটি ছিল ভাবনার অতীত। সত্য কথা, ইউরোপে সাহিত্য সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমিগুলোয় এই পুরস্কার ঘোরাফেরা করতো। কিন্তু তার বাইরে তখনও চোখ পড়েনি। রবীন্দ্রনাথ নোবেল না পেলে কোথাও কোনো প্রত্যাশার অপমৃত্যু ঘটতো না। তিনি নিজে তা পেয়ে যতটা উৎফুল্ল হয়েছেন, হতভম্ব হয়েছেন তার চেয়ে বেশি। সং অফারিংস (গীতাঞ্জলি) ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রথম বই। একটা কাব্যগ্রন্থ দিয়েই বিশ্বজয়, এটা ইউরোপ ভূখণ্ডেও আগে ঘটেনি। তাঁকে নিয়ে যে বিস্ময়, তা যে বিশ্বময় ছড়াবে, তা মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না।

তবে বিলেতে তা হৈ-চৈ ফেলেছে প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গেই। প্রথমে ‘ইন্ডিয়া লিগ’ ছাপে অতি সীমিত সংখ্যায়। বোঝা যায়, তাঁদের বিপুল কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু বনেদি সব কাগজে এমন উচ্ছ্বসিত প্রশংসার বান ডাকলো যে অন্যতম প্রধান প্রকাশনা সংস্থা ‘ম্যাকমিলান’ তা হাজার হাজার কপি ছেপে বাজারে ছাড়তে শুরু করলো। মানুষ যত পড়ে, তত অবাক হয়। তত তাদের আগ্রহ বাড়ে। এমন সংহত-গভীর আত্মার আকুতি সরাসরি হৃদয় স্পর্শ করে। উবে যায় না। স্থায়ী আসন পাতে। যদিও শুদ্ধ-সংহত আবেগের দোলা থামে না। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। স্বীকৃত প্রতিভাবান যাঁরা, এবং প্রতিশ্রুতিশীল যাঁরা, তাঁরাও মোহিত হন। শুধু ইয়েটস নন, তখনই এজরা পউন্ড, উঠতি ফরাসি কবি সঁ জে পর্স এবং এই রকম আরো অনেকে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে এসে অভিভূত হন। তাঁদের মনে হয়, প্রাচ্যের সংবেদনশীল জ্ঞানী মানুষটি পাশ্চাত্যজীবনে দ্বন্দ্ব-বিক্ষোভ-ঝঞ্ঝার সব সন্তাপ মেটাবেন। এবং এটা কোনো হুজুগ ছিল না। প্রতিভাবান যাঁরা আকৃষ্ট হন, তাঁদের বেশ ক’জন পরে নোবেল পান। এবং তাঁদের অবাক হবার পালা শুরু রবীন্দ্রনাথ নিজে নোবেল পাবার আগেই। রাজু এমন বিশ্বখ্যাত ক’জনের নাম উল্লেখ করেছেন। পরে কবির কীর্তি আরো যাঁদের অভিভূত করেছে তাঁদের একজন প্রত্যক্ষবাদী ভাষা-দর্শনের জর্মন দিকপাল ভিটগেনস্টাইন। রাজা নাটকের ইংরেজি অনুবাদ বার বার পড়েও তিনি তৃপ্ত হতে পারেন নি। পরে নিজে জর্মন ভাষায় অনুবাদ করে সামনে রেখে দেখতে চেয়েছেন, ভাষা অনুভাবের সীমা কতদূর অতিক্রম করতে পারে এবং তা তিনি করেন নিজে প্রত্যক্ষবাদী হওয়া সত্ত্বেও। আমরা অকালপ্রয়াত ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনকেও স্মরণ করি, যিনি মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণার মাত্র একদিন আগে সমরাঙ্গণে নিহত হন। তাঁর পকেটে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা সংকলন। এ তাঁকে প্রেরণা জোগায়। সংগ্রামে উৎসাহ জোগাবার জন্যে নয়, জীবনকে ভালবেসে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হবার শান্ত সাহসে সুস্থির থাকার জন্য। তিনি জানান, ওই সময়ে তাঁর কবিতার বিষয় যুদ্ধ, এবং যুদ্ধের অকিঞ্চিৎকরতা (‘The pity of war…’)। আরো মনে পড়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পোল্যান্ডে বন্দীশিবিরের সেই মহাপ্রাণ শিক্ষাবিদ ইয়ানুশ কোরচাককে, যিনি মৃত্যু আসন্ন জেনেও বন্দীশিবিরের বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকটি মঞ্চস্থ করেন। গ্যাস চেম্বারের দিকে যখন পরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দেখা যায়, তিনি ওইসব ছেলে মেয়েদের নিয়ে নির্ভয়ে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলেছেন।

কথাগুলো একটু বিস্তারিত লিখলাম, কারণ আলোচ্য বইতে, ১৯৬৬ সালে বুদ্ধদেব বসুর করা মন্তব্য– রবীন্দ্রনাথ যে ইংরেজি অনুবাদে নিতান্তই দুর্বল, এবং সে কারণে বর্তমান সময়ে পাশ্চাত্যে তাঁর রচনা বিস্মৃত– এই অভিমতে কিছুটা সমর্থন রয়েছে। অবশ্য লেখক পাশাপাশি এও বলেছেন, স্প্যানিশভাষী ল্যাটিন আমেরিকায় এখনও রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট সজীব। অনুবাদে অদক্ষতা যদি পাশ্চাত্যে তাঁকে অপাঙক্তেয় করে থাকে, তবে সেখানে প্রায় অজ্ঞাতকুলশীল রবীন্দ্রনাথ যে ১৯১৩ সালে নোবেল পান, সে ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা মেলে না। গীতাঞ্জলির অনুবাদ তাঁরই করা। পড়ে ইয়েটস বা স্টার্জ মুরের যে অভিভূত বিস্ময়, এটাও অজানা কিছু নয়। ইয়েট্স ইংরেজ পাঠকদের কথা মনে রেখে টুকটাক দু-চারটা শব্দ পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। হীনম্মন্য কিছু বাঙালি বাবু একেই ইয়েটসের সার্বিক পরিমার্জনা বলে প্রচার করে আত্মপ্রসাদ খোঁজেন। স্পর্শকাতর ও বিরক্ত রবীন্দ্রনাথ তখনই মনস্থির করেন, ভবিষ্যতে আর কখনো নিজের লেখার ওপর কাউকে খবরদারি করতে দেবেন না। আরো একটা মনোভাব তাঁর ভেতর জাঁকিয়ে বসে। তা হলো, কোনো সৃষ্টিশীল কাজ কেবল মাতৃভাষাতেই সার্থকতা পায়। বিদেশি ভাষায় কেউ অনুবাদ করতে চাইলে মূল ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার যথার্থ পরিচয় থাকা দরকার।

এটাও অবশ্য অস্বীকার করা যায় না, রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি শিখেছেন ঘরে বসে। স্বশিক্ষিত বলা চলে। পশ্চাৎপট উনিশ শতকের ভাষা ও সাহিত্য। এবং সেখানেও ভিক্টোরিয় কবি ম্যাথু আর্নল্ড বা আলফ্রেড টেনিসনের চেয়ে রোমান্টিক কবি শেলি বা কিটস্-এর সঙ্গে তাঁর নৈকট্য ছিল বেশি। ভাবে ও শৈলীতেও তার প্রতিফলন ঘটে। ‘The Thon’, এমন শব্দ ও আনুষঙ্গিক ক্রিয়াপদ তিনিও ব্যবহার করেন। বিশ শতকের গোড়ায় এতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু পরে দূরত্ব তৈরি হয়। পুরোনো (archaic) মনে হয়। বাস্তব যে একেবারে শিকড়সমেত পাল্টে যায়, এও একটা কারণ। সার্বিকভাবে পাঠকরুচি ভিন্ন খাতে বয়, শিল্প সাহিত্যের ভাবনাপুঞ্জেও আমূল পরিবর্তন ঘটে। তাতে প্রাক-বিশ্বযুদ্ধ পর্বের রবীন্দ্রসাহিত্যে আগ্রহ শিথিল হয়ে পড়ে। তাঁর নিজের ‘আত্মঘাতী’ হবার কোন প্রশ্ন ওঠে না।

অবশ্য, অনুমান করি, রবীন্দ্রনাথ নিজেও কিছুটা বিভ্রান্তিতে ভোগেন। গীতাঞ্জলি কেন এভাবে বিশ্ব মাতালো, তা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয় না। সম্ভবত ভাবেন, প্রাচ্যের চিরন্তন বাণী তিনি শুনিয়েছেন, এই জন্যেই তাঁর কদর। তিনিও সেই অনুযায়ী সাড়া দেন। তা নইলে গীতাঞ্জলির পর পরই তাঁর কবীরের দোহা-অনুবাদ সম্পাদনে কোনো কান্ডজ্ঞান খুঁজে পাওয়া যায় না। এই কাজের সাহিত্য-মূল্য প্রায় কিছুই নেই। পরে সচেতনভাবে তিনি নিজের সেইসব লেখা অনুবাদ করেন, যেখানে তাঁর প্রাচ্যের ভাববাদী রূপটিই অপরিবর্তিত থাকে। এতে শিল্পী রবীন্দ্রনাথ অনেকখানি আড়ালে পড়ে যান। অবশ্য দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ পাশ্চাত্যবিশ্বও তাঁকে ওই ভাবরূপে দেখতে চাইছিল। এই খোলসই তাঁকে বন্দী করে ফেলে।

এটাও খেয়াল করবার, উনিশ ও বিশ শতকে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা যেভাবে এগোচ্ছিল তাতে দ্বন্দ্বের উৎসমুখ কোথাও না কোথাও প্রকটভাবে চোখে পড়তে শুরু করেছিল। রবীন্দ্রনাথের ভাবনার জগৎ প্রবলভাবে প্রকৃতি-নির্ভর। তার প্রাচুর্যের ওপর নির্ভর করে জীব-সমুদয়ের কর্ম ও জীবনপ্রবাহ। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে সব মানুষের বৈষয়িক চাহিদা মেটানো সম্ভব; তাতে দ্বন্দ্ব এক আরোপিত বিভ্রাট। এর পরে মানুষের যে চাহিদা-‘তবু প্রাণ কেন কাঁদে রে’–তা আত্মিক। এই ‘অতিরিক্ত’-র তৃষ্ণা মেটায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা। এদের উৎকর্ষেই মানুষের সত্যিকারের প্রাণের উৎসাহ। সেখানে অপ্রয়োজনের সৃষ্টিশীলতাই নিয়ন্তা। কিন্তু বাস্তব এমন একদিকে অগ্রসর হয়, যেখানে প্রকৃতির দাক্ষিণ্য আর সার্বভৌম থাকে না। মানুষের আপন উৎপাদিকা শক্তির সংযোজন ক্রমাগত বেড়ে চলে। তখনই আসে উন্নত থেকে উন্নততর জ্ঞান ও প্রযুক্তি-নির্ভরতা। আসে বন্টনের সমস্যা। প্রক্রিয়াগতভাবে সমাজ আর নির্দ্বান্দ্বিক থাকে না। রবীন্দ্রনাথের বিরাট সুষমার যে স্বপ্ন কল্পনা, তা আপনা থেকে আসে না। নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং তা ছোট-বড়, প্রতিটি মানব-সংগঠনে দেখা দেয়। সমূহ সদিচ্ছা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঋষিত্ব অশেষ শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। তাঁর সজ্ঞার গভীরতা ও বিস্তার বিপুল বিস্ময় জাগায়। কিন্তু বাস্তবের তাগিদে মনোযোগ ভিন্ন দিকে ধায়। প্রযুক্তির রূপান্তর যত দ্রুত ঘটে, যত তা উন্নত থেকে উন্নতর পর্যায়ে যায়, যত জনসংখ্যা বৃদ্ধি তার কারণ ও পরিণাম হয়ে প্রকট হতে থাকে, যত শ্রমবিভাজন মানুষে-মানুষে বিছিন্নতা আরোগ্যাতীত করে চলে তত প্রকৃতিতে, ‘আলোয় আলোয় এই আকাশে ধূলায়-ধূলায় ঘাসে ঘাসে’ উদার মুক্তি দূরে সরে। রবীন্দ্রনাথের তখন কি শুধু ‘ব্যর্থ-নমস্কার’-ই প্রাপ্য হয়ে দাঁড়ায় ? এর সঙ্গে তাঁর অনুবাদ-দক্ষতার কোনো যোগ খুঁজে পাই না।
আরো চোখে পড়ে তাঁর অনেক মননশীল গদ্য রচনা মূলে ইংরেজি ভাষায়। যেমন, The Religion of Man, Nationalism, Personality ইত্যাদি। শুভবুদ্ধির প্রশংসা এরা পায়, কিন্তু উল্লেযোগ্য কোনো প্রভাব এদের কোথাও পড়ে না। সৎ চিন্তা ও সৎকর্ম সমলয়ে থাকে না। বাস্তব ‘তপোবন’কে নিত্য মুখ ভেংচায়। তপোবনও হয়ে ওঠে এক মূর্তিমান অসংগতি।

এই বইতে রাজু আলাউদ্দিনের প্রস্তাব “রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি সুনির্বাচিত সংকলন এবং অনুবাদের প্রকল্প তৈরি করা যাতে অন্তর্ভুক্ত হবেন উইলিয়াম র‌্যাদিচের মতো বাংলা জানা বিদেশি অনুবাদক…।” একে অবশ্যই গুরুত্ব দিই। তবে এটাও যোগ করি, র‌্যাদিচে স্বয়ং রবীন্দ্রসাহিত্যের সাম্প্রতিক কালের সব চেয়ে সফল অনুবাদক। তাঁর কাজ সুধী মহলে প্রশংসাধন্য। কিন্তু তাতে কি মূলধারায় রবীন্দ্রনাথে আগ্রহ বেড়েছে? এ ছাড়া, যতদূর জানতে পাই, র‌্যাদিচে এখন গুরুতর অসুস্থ। কিছু করার থাকলে নিজেদেরই সংগতি তেমন আছে কি না ভেবে দেখা দরকার। তবে আমি যা পড়েছি, অবশ্যই নিতান্ত অল্প, তা র‌্যাদিচেকে বাদ দিলে সবই খুব ভানসর্বস্ব মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠিক আসেন না। এটাও চোখে পড়ে, নিজের করা অনুবাদে তিনি যথোচিত মনে করলে কোথাও কোথাও মূল কবিতার বিস্তার কাট-ছাঁট করেছেন। আর বাংলার ছন্দ ও অন্ত্যমিলও বাদ দিয়েছেন প্রথমেই। এমনটি করার অধিকার আর কারো অনুবাদে কতটুকু গ্রাহ্য হবে? এও সত্য, বাংলায় রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা পল্লবিত। কবিতা রচনায় কবিকে যে পাঠকের গ্রহণক্ষমতার কথাও ভাবতে হয়, এবং তা আপনা থেকে চলে আসে, এ তারই ইঙ্গিত। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের গানে অতি বিস্তৃতির কোন সুযোগ নেই। গানের ছকই তা হতে দেয় না। কিন্তু এই সীমার শৃঙ্খলার কারণে তাঁর অনেক শ্রেষ্ঠ কবিতা গানের বাণীতে পূর্ণতা পায়। আমার মনে হয়, গীতাঞ্জলি ছাড়া তখন পর্যন্ত লেখা তাঁর অন্য কোনো কবিতার বই যদি তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন, তবে তা পাশ্চাত্যে তেমন সাড়া জাগাতো না। উনিশ শতকের রোমান্টিক কবিতা অমন স্বাদ তাঁদের আগেই দিয়েছে। সেসবেও কোথাও কোথাও বাঁধভাঙা বিস্তার সামান্য লক্ষণ।

রবীন্দ্রনাথের স্প্যানিশ অনুবাদে নেতৃত্ব দিতে পারেন রাজু আলাউদ্দিন স্বয়ং। গভীরভাবে তিনি এই ভাষা জানেন। বলা যায়, এ তাঁর দ্বিতীয় মাতৃভাষা। এবং তিনি কবি। বাংলায় সূক্ষ ভাবানুভূতির প্রকাশকে তিনি যে স্প্যানিশে ফুটিয়ে তোলায় সক্ষম, তা তাঁর এই বইয়ের উপযুক্ত উদ্ধৃতিতে ও সেসবের বাংলা রূপান্তরে বেশ ভালোভাবেই আমরা ধরতে পারি। সাথে প্রয়োজন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ও তাঁর মতো যোগ্য সমমনা অনুরূপ এক লেখকগোষ্ঠীর। কীভাবে অগ্রসর হওয়া যায়, তার হদিস অবশ্য আমার জানা নেই। উচ্চমহলে জনসংযোগ প্রয়োজন এটা বুঝি। কিন্তু কী করে তা ঘটানো যায়, জানি না।

তবে আমাদের প্রত্যাশাকে খুব উঁচু তারে যেন আমরা না বাঁধি। রবীন্দ্রনাথ, অথবা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির যে কোনো প্রাণশক্তি দূরের বাস্তবতায় কি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিতান্তই আগন্তুক। তিনি সেখানে গণমানুষের চেতনায় মিশে যাবেন, এটা ভাবাও বাতুলতা। আগ্রহী মানব-মানবীদের কাছে তাঁকে পৌছে দিতে পারলে, অথবা, নতুন আগ্রহ তাঁদের ভেতর ঠিক-ঠিক জাগাতে পারলে তবেই মনে করা যেতে পারে, প্রয়াস সার্থক। এমন মানব-মানবীর সংখ্যা সব সময়েই সমগ্রের অতি ক্ষুদ্র এক অংশ। তবে সৃষ্টিশীল হয়ে বৃহৎ জনসমুদয়ের মনোজগতে আসন পাততে পারলে ওই সামান্য ভগ্নাংশই বিপুল প্রভাববিস্তারী হতে পারে। নিজেদের দিকে তাকালেও এটা আমরা অনুমান করতে পারি।

২.

DCF11121128TAGOREদক্ষিণে ল্যাটিন আমেরিকার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ-সম্পর্কের কথা বলতে গেলে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কথা অনিবার্যভাবে চলে আসে। এ নিয়ে বঙ্গসমাজে বাবু-সম্পদায়ে (মত-পথ নির্বিশেষে) অশেষ কৌতূহল। এই গুণবতী নারী কিভাবে কতটা কবিকে আকৃষ্ট করেছিলেন, অথবা নিজে কতটা রবীন্দ্রনাথে সমর্পিত হয়েছিলেন, এসব অনেকের কাছে রসালো-চটকদার মনোজাগতিক রতিসুখ আস্বাদনের ও বিতরণের বিষয়। তবে রাজু এ প্রসঙ্গ এনেছেন সংযম ও বিশস্ততার সঙ্গে। স্বীকৃত বাঙালি পূর্বসূরিদের বরাত দিয়ে যেটুকু বলার বলেছেন। অসার কৌতূহলে অনেকে বিষয়টিতে নিষিদ্ধ বার্তা খোঁজেন। ভিক্টোরিয়ার সামগ্রিক ব্যক্তি-সত্তার ও যাপিত জীবনের খবরাখবরও যে আমলে নেবার প্রয়োজন পড়ে, এ কথাটা মনে করার ধৈর্য কেউ দেখান না। এই নারী যে আর্জেন্টিনার অভিজাত মহলে আপন বিত্তে, ব্যক্তিত্বে ও মননপ্রভায় অতিপ্রসিদ্ধ ছিলেন, এ কথাটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার। তলস্তয় বা ফ্লবের-এর উপন্যাসের প্রেক্ষাপট যেমন, প্রায় একশ বছর আগের আর্জেন্টিনাও অনেকটা তেমনি। ফরাসি সালোঁতে গুনবতী মহিলারা যেভাবে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির-জগতের প্রতিভাবানদের আকর্ষণ করতেন, ভিক্টোরিয়ার ভূমিকাও ছিল সে রকম। নিজে Sur (দক্ষিণ) নামে এক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। তাতে শিল্প জগতে তাঁর যোগাযোগের ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত হয়। এই বাস্তব পটভূমিতেই আকস্মিক কার্যকারণে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন তেষট্টি। ভিক্টোরিয়ার তেত্রিশ। এসব কমবেশি আগ্রহী সবারই জানা। যদ্দূর মনে পড়ে, প্রায় তিরিশ বছর আগে এক বিলেতি সাহিত্য-পত্রিকায় পড়েছিলাম (লন্ডনের এক সাধারণ পাঠাগারে, পত্রিকার নাম-ধাম মনে নেই) ভিক্টোরিয়ার প্রথম বিয়ে তখন ভাঙনের মুখে; অন্য পুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে তাঁর জীবনে। রবীন্দ্রনাথের কারণে ওই ঘটনার গতি-প্রকৃতি বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হয়নি। তারপরেও ভিক্টোরিয়ার নাম বিপুল শ্রদ্ধায় স্মরণীয়, কারণ রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর সত্তাকে তিনিই প্রথম সনাক্ত করেন; এবং ১৯৩০-এর কবির যে চিত্রকলা প্রদর্শনী হয়, যা তাঁকে নতুন করে ভিন্ন খাতে বিশ্বখ্যাতি এনে দেয়, তার আয়োজন সম্ভব হয়েছিল ভিক্টোরিয়ারই উদ্যোগে। পরে পাশ্চাত্যে সংগীতের এক দিকপাল স্ট্রাভিনস্কিকেও পাদপ্রদীপের সামনে আনায় বিশেষ ভূমিকা ছিল তাঁর। সমগ্র দৃষ্টিতে না দেখে বিছিন্ন ঘটনার বিকৃত পরিবেশনা শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ায়। রাজু সে পথে হাঁটেননি। সত্য কথা, ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথে তাঁর মুগ্ধ ভালোবাসার কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথও ভিক্টোরিয়ার প্রেরণার কথা শুধু স্বীকারই করেননি, তাঁর উদ্দেশ্যে কবিতা লিখেছেন; পূরবী কাব্যগ্রন্থটি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন। এর কোনোখানেই ‘ভালোবাসা’ ফ্রয়েডিয় নয়। ১৯২৬ সালে একবার মাত্র ভিয়েনায় ফ্রয়েডের সঙ্গে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎ ও আলাপ হয়। সে আলাপের বর্ণনালিপি দু’জনের কেউই রাখেননি। কারো সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথাও বলেননি। অনুমান এটি ছিল দুই-বধিরের সাক্ষাৎকারের মতো। রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘ভালোবাসা’র প্রকাশ বিচিত্র, বহু বর্ণ বহু ছন্দোময়। উৎস অনেকান্তিক। যা আহরণ করে স্থান ও কালের যাত্রায় বহুমাত্রিক রসের উপাদান। যখন তিনি বলেন, ‘ভালোবাসার অমৃত’(‘ওরা অন্ত্যজ ওরা মন্ত্রবর্জিত ১৩৪৩), তখন তা উৎসারিত হয় দিক-দিগন্তে প্রসারিত অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে। ফ্রয়েডের কাছে তার একটিই মাত্র উৎস। তার ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁর মনোজগতের সাধারণ তত্ত্ব। দুই মনীষীর ভাবনা-চিন্তার এক বিন্দুতে মেলার কোনো সম্ভাবনার কথা ভাবা যায় না। অনুমান, ভিক্টোরিয়ার মনের গড়ন ছিল রবীন্দ্রনাথের ধাঁচে। তাঁরা দুজন যখন ভালোবাসার কথা বলেন, তখন তাকে ফ্রয়েডের ছাঁচে ফেললে বিপত্তিই শুধু বাড়ে। রাজু আলাউদ্দিন রবীন্দ্রনাথের নয়, স্প্যানিশ সূত্রে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-র একটি প্রামাণ্য জীবনী যদি বাংলায় আমাদের উপহার দেন, তবে আমরা বিশেষ উপকৃত হই।

৩.

রবীন্দ্রনাথের কারণে স্প্যানিশ আমেরিকার দুই খ্যাতিমান কবি উইদোব্রো ও নেরুদার বিরোধের ঘটনাক্রমের কথা এই বইতে আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘তুমি সন্ধার মেঘমালা’ কবিতাটি সেনোবিয়া হিমেনেসের করা তাঁর কবিতার এক স্প্যানিশ অনুবাদ সংকলনে স্থান পেয়েছিল, যা কিনা প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে মাদ্রিদ থেকে। ১৯২৪-এ বিশ বছরের নেরুদা কবিখ্যাতি পাবার আশায় যে কবিতার বই প্রকাশ করেন, তা সর্বস্তরে সমাদৃত হলেও, তাতে একটি কবিতা ছিল যাতে ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’-র ছাপ বেশ স্পষ্টই ফুটে উঠেছিল। বিরোধের উৎসে এই কবিতাটিই। ১৯৩৫-এ উইদোব্রোর প্রকাশনায় এক সাহিত্য পত্রিকায় সেনোবিয়া হিমেনেসের অনুবাদ ও পাবলো নেরুদার কবিতাটি পাশাপাশি ছেপে নেরুদার বিরুদ্ধে নকলবাজির অভিযোগ বেশ ঝাঁঝালো গলায় তোলা হয়। কবি হিসেবে নেরুদাও তখন প্রতিষ্ঠিতই। আর উইদোব্রোও (১৮৯৩-১৯৪৮) প্রথম সারির কবি, তার ওপর বয়সে বড় । ঝগড়া তাঁদের অমীমাংসিত থেকে যায়।

বিষয়টি আমার কছে চায়ের পেয়ালায় তুফান তোলার মত মনে হয়। অসামান্য সৃষ্টিশীল কবিও জেনে, বা না-জেনে সজাগ ইন্দ্রিয়ে অনবরত কতো কি গ্রহণ করেন, একই প্রক্রিয়ায় আত্মস্থও করেন। ক্ষমতা থাকলে এসবই চোলাই করে নেন তিনি তাঁর সৃষ্টিতে। তা তাঁরই। জীবনানন্দ বিষয়টি এভাবে দেখেন। রবীন্দ্রনাথও বলেন, “অনুকরণ চুরি, স্বীকরণ চুরি নয়”। প্রচুর বেদ-বাণী বা উপনিষদের মন্ত্র প্রায় হুবহু ভাষান্তরিত হয়ে তাঁর কবিতায় আছে। তাঁর ‘বর্ষশেষ’ কবিতায় কি শেলি-র ‘Ode to the west wind’-এর ছায়া ধরা পড়ে না ? প্রতিভা থাকলে কোন কবিই এতে খাটো হন না। বরং সমৃদ্ধই হন। নেরুদা এখন এক কিংবদন্তির নাম। উইদোব্রোও ছিলেন বড় মাপের কবি। স্প্যানিশ আমেরিকায় এমন সাহিত্যিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে যে বর্তমানে ওই ভাষার সৃষ্টিকলায় মূল ভূখন্ড থকে নেতৃত্ব চলে এসেছে তাঁদেরই হাতে। তবে জীবনযাপন যে সেখানে বেশ নিরুদ্বিগ্ন হয়েছে, তা কিন্তু নয়। দক্ষিণ আমেরিকায় রোমান-ক্যাথলিক জীবন ধারায় বর্ণময় পালাপার্বন, উচ্ছ্বাস-প্রবণতা, সংস্কারাচ্ছনতা, আবার টগবগে প্রতিবাদমুখরতা, এসবই সেখানে সাহিত্যে ও শিল্পকলায় ছাপ রেখে চলেছে। আমরাও সে-সবে আকৃষ্ট হই। বোধহয় কোথাও কোথাও একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে চলে আসি। তাঁদের রবীন্দ্রনাথে আগ্রহ-অনাগ্রহ তাই আমাদের কৌতূহলী করে। যদিও ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক।

রবীন্দ্রনাথ নিজে কিন্তু পাশ্চাত্যের সঙ্গে যোগাযোগে ক্ষেত্রে ইংরেজি-মাধ্যমের বাইরে খুব একটা পা বাড়াননি। হয়ত তাঁর সময়ে গোটা বিশ্বে ব্রিটিশ প্রভুত্ব এর একটা কারণ। হয়তো সচেতনভাবে না হলেও সময়ের পূর্ণ সদ্ব্যবহারে তিনি নিজেকে ছড়াতে চান নি। মনে মনে ভেবে থাকতে পারেন, ইংরেজিতে লেখা-বা-বলা তাৎক্ষনিকভাবে পাশ্চাত্যে অন্যত্র অনুরণন জাগাবে। তিনিও ইংরেজির মাধ্যমে বিশ্ব-প্রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি পেয়ে যাবেন। বাস্তবে অনেকটাই তেমন মিলেছে। হয়তো তিনি সন্তুষ্ট থেকেছেন ওতেই। কিন্তু ইংরেজির বাইরে অন্যান্য ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব স্বরূপ নিয়ে তিনি আশ্চর্যরকম উদাসীন ছিলেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোও কিন্তু তাঁকে ফরাসি ও স্প্যানিশ সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণবান ঐশ্বর্যে আগ্রহ জাগাতে পারেননি। বর্তমানে বাস্তবও অনেকটা তারই অনুসরণ করে চলেছে। রাজু আলাউদ্দিন ও মুষ্টিমেয় তাঁর মতো যাঁরা– আমি সবার কথা জানি না–যদি স্প্যানিশ জগৎটি আমাদের সামনে সরাসরি খুলে দেওয়ায় অগ্রণী ভূমিকা নেন, তবে আমাদের মনের আবদ্ধতা হয়ত অনেকটা ঘোচার সম্ভাবনা জাগে। তাঁদের কাছে রবীন্দ্রনাথ কতটা ও কেমন, এটা জানার ও বোঝার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের জীবন-সাহিত্য ও সংস্কৃতির সত্য স্বরূপ খোঁজার ব্যাপারে যদি বিন্দুমাত্র উৎসাহিত না হই– তাহলে আমাদের ক্ষুদ্র অহংকারের ঘেরাটোপেই আমরা বন্দী হয়ে থাকবো। আর, রবীন্দ্রনাথই শেষ কথা, এটাও যেন আমরা মনে না করি। তেমনটি মনে করা অরাবীন্দ্রিক স্ববিরোধ।

রাজু আলাউদ্দিনের এই বইটা স্প্যানিশ আমেরিকার অনেক ছোট-বড় সাহিত্য-কর্মের সঙ্গে আমাদের তথ্যনিষ্ঠ পরিচয় ঘটায়, যেগুলো প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে রবীন্দ্রনাথের কোনো-কোনো রচনার অথবা তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রেরণায় কিংবা প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেয়। বেশিরভাগই গত শতকে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ দশকের ভেতর। ওই পর্বে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সেখানে সবচেয়ে প্রাণবান, ছিলেন ভাবনা-চিন্তায় প্রাসঙ্গিক। রাজু গভীর অভিনিবেশে খুঁটিনাটি সব তথ্য আহরণ করেছেন। তাঁর সদিচ্ছা ও সততা তুলনাহীন। এটি সত্যিই একটি আকরগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। পরিবেশনাও চমৎকার। পড়ায় কোন ক্লান্তি আসে না। কোনো মনভোলানো কথা বা গুরুবাদের ভেজালও তিনি মেশাননি। পড়তে পেলাম, আমি কৃতজ্ঞ। পরিশিষ্টে শিশিরকুমার দাশ ও শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা শাশ্বত মৌচাক গ্রন্থটি প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন, এখানে স্প্যানিশ আমেরিকার প্রেক্ষাপটে তাঁর কাজের বেলাতেও তা খাটে।

৪.

বইটির আলাদা আকর্ষণ দুষ্প্রাপ্য সব ছবি। রবীন্দ্রানাথ যে ওই ভূখণ্ডে–পর্তুগিজ ব্রাজিল বাদ দিয়ে গোটা ল্যাটিন আমেরিকায়–সাড়া জাগিয়েছিলেন, দৃশ্যরূপে এগুলো তার চিরকালের সাক্ষী হয়ে থাকে। এখানে দিয়েগো রিবেরার আঁকা ছবিটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যাখ্যা রাজু যা দিয়েছেন, তা যথেষ্ট। তবে তাঁর সম্পর্কে, যদিও এখানে প্রাসঙ্গিক নয়, আর একটু যোগ করি। একালের মেক্সিকোর সব চেয়ে নামী চিত্রকর ফ্রিডা কাহলো। নারী ব্যক্তিত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা, দুর্বার শক্তি, অকল্পনীয় সহনশীলতা ও ধ্বস্ত-দুরন্ত কল্পনা তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে আঁকা ছবিগুলোতে যেভাবে ফুটে উঠেছে, এমনটি আর কোথাও দেখিনি। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে প্রতারিত করেছে। রিবেরার সঙ্গে তাঁর যখন প্রথম পরিচয়, তখনও তিনি ছাত্রী, রিবেরা পরিচিত সম্ভাবনাময় ম্যুরাল শিল্পী। কিছু পরে তাঁদের পরিণয়। কিন্তু ফ্রিডা যখন নাম করতে শুরু করেছেন, তখনই এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনায় তিনি প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েন। তাঁর মা হবার সম্ভাবনা লোপ পায়। এই অভিজ্ঞতার যন্ত্রণা তিনি ঢেলে দেন তাঁর চিত্রকলায়। অচিরেই পান বিশ্বখ্যাতি। অন্য দিকে রিবেরা যেন ফুরিয়ে যেতে থাকেন। এ থেকে সম্পর্কে টানাপড়েন। এমন পরিস্থিতিতেই স্ট্যালিনের তাড়া খেয়ে মেক্সিকোয় আসেন ট্রটস্কি। রিবেরা দম্পতি তাঁকে আশ্রয় দেন। ফ্রিডা ট্রটস্কিকে মুগ্ধ করেন। রিবেরা তা ভালভাবে নেন না। তবে ঘটনায় যবনিকা পড়ে আকস্মিকভাবে। স্ট্যালিনের গুপ্তঘাতকেরা মেক্সিকোয় ধাওয়া করে ট্রটস্কিকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ফ্রিডা-রিবেরা সম্পর্কে শীতলতা বাড়ে। তবে অভিজ্ঞতার হলাহল পান করে ফ্রিডা হয়ে ওঠেন চিত্রকলায় অবিস্মরণীয় অনন্য এক নাম।

পরে বয়স মধ্য-চল্লিশ পেরিয়ে মৃত্যু। প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা নিয়ে বেঁচে থাকেন রিবেরা। কিউবা থেকে মেক্সিকো হয়ে আর্জেন্টিনা-চিলি পর্যন্ত স্প্যানিশ আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের আপেক্ষিক গুরুত্ব বোঝার জন্যে ফ্রিডা কাহলো-দিয়েগো রিবেরা কাহিনি বোধহয় জমির পরিবেশ কিছুটা চিনিয়ে দেয়। চে গ্যেভারা, ফিডেল কাস্ত্রো, এডুয়ার্ডো গ্যালিয়ানো, সালভাদর আয়েন্দে– এই নামগুলোও আমাদের সংকেত জোগায়।

৫.

ভবিষ্যতে রাজু আলাউদ্দিন বা আর কেউ যদি স্প্যানিশ আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথকে পরিবেশন করার উদ্যোগ নেন, তবে তাঁদের বিষয় নির্বাচনে বাস্তবতার এই দিকটিও তাঁরা মাথায় রাখলে বোধহয় ভালো হয়। একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথের ভাববাদী রূপে পশ্চিম বিশ্ব আকৃষ্ট হয়েছিল। তিনিও কেনা-বেচার, বা দেওয়া-নেওয়ার এক অদ্ভুত সমীকরণে তাকে যৌক্তিক মনে করেছিলেন। পাশ্চাত্য থেকে আমরা বস্তগত জ্ঞান ও প্রযুক্তি নেব, এবং নিজেরা অধ্যাত্মবাদের শিক্ষা দেবো, এইভাবে উভয়ের আত্মমর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে, এমনটাই তাঁর ধারণা ছিল। আজ এটুকু অন্তত বলা চলে, এই সরল ভাবনা যথার্থ নয়। আধ্যাত্মিকতাও মানুষের পার্থিব আকুতির পরিণাম। এবং তার পেছনেও বিবিধ স্বার্থের ক্লেদ জমে, যার বাধা মানুষের চিন্তা ও কাজের অগ্রগতিকে বার বার রুদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বহু লেখায় আপন দেশবাসীকে এসব বিষয়ে সচেতন করেছেন। বলেছেন, “আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন।” নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেছেন, “সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করেনা বঞ্চনা।” চিত্রকলায় তাঁর আপন প্রতিকৃতিতে কোনো সৌম্য শান্ত ব্যক্তিত্বের বিভা দেখি না। দেখি, যন্ত্রণাদীর্ণ, কিন্তু অপরাজিত, চৈতন্যলালিত এক মানুষের মুখ। তাঁর সৃষ্টিতে এই স্বরূপের প্রকাশটিও যেন বিবেচনা করা হয়।

দক্ষিণে সূর্যোদয়: ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্রচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
লেখক: রাজু অালাউদ্দিন
প্রকাশক: অবসর
দাম: ৫০০ টাকা
প্রামাণ্য ছবিসহ পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৫০-এর বেশি
প্রচ্ছদ: শিল্পী মনিরুল ইসলাম।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সূর্য — সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ @ ৫:৪০ অপরাহ্ন

      রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির পর পাশ্চাত্যে তাকে নিয়ে হিস্টেরিক আলোড়ন এবং মাত্র দশক না ঘুরতেই চরম অনাগ্রহের পেছনের কারণ হয়তো আজও আমরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। বর্তমান প্রবন্ধটিতে এই কারণের অবশ্য কিছুটা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছেঃ

      //পাশ্চাত্য থেকে আমরা বস্তগত জ্ঞান ও প্রযুক্তি নেব, এবং নিজেরা অধ্যাত্মবাদের শিক্ষা দেবো, এইভাবে উভয়ের আত্মমর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে, এমনটাই তাঁর ধারণা ছিল।//

      শুধু অধ্যাত্মবাদের মোড়কে রবীন্দ্রনাথকে আটকে ফেললে খুব দ্রুত তার অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। যেকোন মনোযোগী বাঙ্গালি রবীন্দ্র-পাঠকেরই জানা আছে, অধ্যাত্মবাদ রবীন্দ্রসাহিত্যের অনেক দিকের মধ্যে একটি; গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র নয় মোটেই। অথচ একজন ইউরোপিয়ান ভাষার পাঠক দৈবচয়নের ভিত্তিতে রবীন্দ্রনাথের দুই/তিনটি বই পড়ে এই বহু দিকমুখিন রবীন্দ্রনাথের কয়টি দিকই বা ধরতে পারবেন? আদৌ রবীন্দ্রনাথকে কি সীমিতসংখ্যক বইয়ের মধ্যে ধরা সম্ভব?

      ইউরোপিয়ান বা আধুনিক অনেক মহৎ লেখকদের একটিমাত্র সৃষ্টিতেই যেভাবে তাদের মাহাত্ম্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়, রবীন্দ্রনাথের সেরকম কোন একক সৃষ্টি কি আদৌ আছে? মনে তো হয় না। প্রতিভার প্রকাশ অনেক ধরনের হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার যথার্থ
      মাহাত্ম্য শুধুমাত্র দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় তখনই যখন আমরা তার সামগ্রিকতাকে আবিষ্কার করতে পারি; সাহিত্যের বিভিন্ন প্রকাশভঙ্গিতে বিচিত্রগামী রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচিত হবার পরই কেবল আমরা বুঝতে পারি, ঠিক কোন জায়গায় আজও তিনি আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক থেকে যান।

      আমরা বাঙ্গালি, তাই আমাদের ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককে পড়তে আমাদের আলস্য থাকার কথা না। কিন্তু ভিনভাষীদের এতো অবসর কোথায়? তাও এই টেকনো-নির্ভর যুগে?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com