অনুবাদ, বিশ্বসাহিত্য

গার্সিয়া মার্কেসের প্রবন্ধ: ফিরে এলাম মেহিকো শহরে

যুবায়ের মাহবুব | 21 Sep , 2017  

M-1
আলোকচিত্র: মেহিকোতে সপরিবারে মার্কেস
সম্প্রতি ভূমিকম্পের শক্তিশালী আঘাতে মেহিকো শহরে প্রায় তিনশ’র মতো লোক প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্ববিখ্যাত কথাসাহিত্যিক গার্সিয়া মার্কেস জীবনের একটা বিরাট অংশ কাটিয়েছেন এই শহরে । মেহিকোর সাথে গার্সিয়া মার্কেসের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। লেখালেখির সূচনা এখানে না হলেও কিংবদন্তীতুল্য উপন্যাস একশ বছরের নিঃসঙ্গতা থেকে শুরু করে তার প্রধান সব সাহিত্যকর্মের জন্মভূমি এই মেহিকো। এই লেখাটির শেষের দিকে তিনি নিজেই বলেছেন: “এখানে লিখেছি আমার সমস্ত বই, এখানে লালনপালন করেছি আমার সন্তানদের, আমার জীবনবৃক্ষ রোপন করেছি ঠিক এখানেই।” মেহিকো হয়ে উঠেছিলো তার দ্বিতীয় মাতৃভূমি। সিআইএ’র হুমকি এড়াতে এই মাতৃভূমিতে তিনি এসেছিলেন ১৯৬১ সনের ২ জুলাই। এই সময় থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মেহিকো এবং কলম্বিয়ায় তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন, থাকতেন দুই দেশেই। পরে অবশ্য তিনি একেবারে স্থায়ীভাবেই আমৃত্যু মেহিকোতেই থেকে যান। স্প্যানিশ থেকে অনুবাদক যুবায়ের মাহবুব কর্তৃক অনূদিত মার্কেসের এই লেখাটিতে রয়েছে মেহিকোর প্রতি তার ভালো লাগার অনবদ্য স্মৃতিচিত্র। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল El Pais পত্রিকায় ১৯৮৩ সালের ২৬শে জানুয়ারি।

m
আলোকচিত্র: মেহিকোর কথাসাহিত্যিক হুয়ান রুলফোর সাথে মার্কেস
একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলাম – “মেহিকো শহরে আমার এত জিগরি দোস্ত আছে, কিন্তু তবুও ওদের সবার কথা বাদ দিয়ে একটি স্মৃতিই সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে আমার। অদ্ভুত সেই বিকেলে চাপুল্তেপেক বনে বেড়াতে গিয়েছিলাম, গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে হঠাৎ করে একই সঙ্গে রোদ আর বৃষ্টি হতে আরম্ভ করলো, সেই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে আমি এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম যে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, এলোমেলো চক্কর খেতে থাকি বৃষ্টির ভেতর, ওখান থেকে বেরুবার পথ সহসা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”

সেই সাক্ষাৎকারের এক যুগ পরে মায়াবী অরণ্যের সন্ধানে আবার ফিরে এসেছি মেহিকোয়, কিন্তু যা দেখলাম এবার – দূষিত বাতাসে পঁচে গেছে বন, গাছগুলো সব শুকিয়ে কাঠ, মনে হলো সেদিনের পর আর বুঝি বৃষ্টি নামেনি এই জঙ্গলে। এসব কিছু দেখে হঠাৎ উপলব্ধি হলো, আমার জীবনের, আমাদের সবার জীবনের কত বড়ো একটা অংশই না রেখে গেছি এই শয়তানের শহরে, আজকের পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম জনবসতি মেহিকো শহর কতটা বদলে গেছে। একষট্টি সনের ২রা জুলাই সপরিবারে চলে এসেছিলাম এখানে, নেমেছিলাম ধূলিমাখা সেন্ট্রাল রেল স্টেশনে, নাম-ঠিকানা ছিল না কোন, পকেটে একটা ফুটো পয়সা পর্যন্ত ছিল না আমাদের – শহরটি যেমন বদলেছে সেদিন থেকে, বদলে গেছি আমরাও, দুজনই বদলেছি একসাথে।

M-3
আলোকচিত্র:মেহিকোতে লুইস বুনুয়েলের সাথে চশমাপড়া মার্কেস
তারিখটি আমার পক্ষে কোনদিনই ভোলা সম্ভব নয়, তামাদি পাসপোর্টে যদি ছাপ্পড় মারা নাও থাকতো, তাও নয়, কারণ পরদিনই খুব ভোরে এক বন্ধু আমাকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে জানালো যে হেমিংওয়ে মারা গেছেন। আসলে তো আত্মহত্যা – মুখের তালুতে বন্দুক ঠেকিয়ে নিজের খুলি উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি, আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে সেই নৃশংসতা চিরদিনের জন্যে আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে। মের্সেদেস আর আমি বিয়ে করেছি মাত্র বছর দুই হয়েছে, বড়ো ছেলে রোদ্রিগোর বয়স তখনও এক পেরোয়নি, এর ঠিক আগে আমরা নিউ ইয়র্কে ছিলাম কয়েক মাস, ঠিকানা ছিল ম্যানহাটানের একটি হোটেল রুম। কিউবান বার্তাসংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলাম ওদের নিউ ইয়র্ক দপ্তরে – সত্যি বলতে কি, খুন হবার মত এত উপযুক্ত জায়গা এর আগে আমি কোথাও আর দেখিনি। রকফেলার সেন্টারের পুরোনো একটি দালানে ঘিনঘিনে নোংরা নির্জন অফিস, টেলেক্স রুম একদিকে, আরেকদিকে নিউজরুম, তার একটিমাত্র জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে বিষণ্ণ জরাজীর্ণ উঠোন, ঠান্ডাজমাট কালিঝুলির গন্ধ ভুরভুর ছুটতো সবসময়, আর দিনে-রাতে যে কোন প্রহরে শোনা যেতো উঠোনের গভীর থেকে উঠে আসা ইঁদুরের চেঁচামেচি, ডাস্টবিনের ময়লা বাসি খাবার নিয়ে ওদের কামড়াকামড়ি।

একদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, রোদ্রিগোকে একটা দোলনায় করে আমি আর মের্সেদেস চলে গেলাম সোজা বাস স্টেশনে, প্রথম যে বাস দক্ষিণের পথে যাত্রা করবে সেটাতে চড়ে বসলাম। জগৎসংসারে আমাদের সহায়সম্বল বলতে ছিল মোট তিনশো ডলার, তার উপর দেশ থেকে আরো একশো ডলার পাঠিয়েছে বন্ধু প্লিনিও আপুলেয়ো মেন্দোসা, বোগোটা থেকে মানি ট্রান্সফার করে দিয়েছে নিউ অর্লিন্সে অবস্থিত কলোম্বিয়ান কন্সুলেটে। সে ছিল এক অপরূপ উন্মাদনা – আমাদের প্ল্যান ছিল গাড়ি চেপেই চলে যাবো ফের কলোম্বিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের তুলাখামার আর কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত গ্রামাঞ্চল মাড়িয়ে, উইলিয়াম ফকনারের উপন্যাসগুলো পড়ে সেরেছি মাত্র, গাইড বলতে সেই পাঠস্মৃতিই ছিল সম্বল।

M-4
আলোকচিত্র:মেহিকোর লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সর্ব ডানে মার্কেস
সাহিত্যের দৃষ্টি দিয়ে দেখলে ভ্রমণটি খুব আকর্ষণীয় ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু ঐ অল্প বয়সেও আমরা বুঝতে পারছিলাম যে ট্রিপে আসা আসলে বিরাট বোকামি হয়েছে। রোদপোড়া মনমরা মহাসড়কে টানা চোদ্দ দিন ঘুরেছিলাম বাসে বাসে, রাস্তার ধারে জঘন্য সব রেস্তোরায় খানা-খাদ্য খেতাম, রাতে ঘুমাতাম নিকৃষ্টতম হোটেলে। দক্ষিণের নানান শহরের জমকালো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে প্রথমবারের মতো বর্ণবৈষম্যের লজ্জা আর অপমানের মুখোমুখি হয়েছিলাম – পানি খাওয়ার জন্যে দুটো পৃথক কল থাকতো, একটি সাদাদের, অপরটি কালোদের, পরিষ্কার সাইন দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হতো। সারারাত ঘুরে ঘুরে একটি হোটেল রুম খুঁজেছি আলাবামায়, সবাই মুখের উপর বলে দিয়েছে রুম হবে না, শেষমেষ এক নাইট পোর্টার কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলো যে আমরা আসলে মেহিকানো নই।

তবে যে কথাটি বলতেই হয়, জুন মাসের গনগনে সূর্যের নীচে অন্তহীন পথচলা অথবা রাস্তার হোটেলে নিদ্রাহীন রাত্রিযাপনও আমাদের ততটা অতিষ্ঠ করেনি – যতটা করেছে অখাদ্য আর কুখাদ্য। কার্ডবোর্ড বাক্সে হ্যামবার্গার আর বার্লি দুধ খেতে খেতে নিতান্ত হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম, শেষে ছোট্ট রোদ্রিগোর জ্যাম-জেলিতে ভাগ বসাতে বাধ্য হয়েছিলাম আমরা।

M-5
আলোকচিত্র: মার্কেসের ডান পাশে বসে আছেন মেহিকোর সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোস সালিনাস দে গোর্তারি
দুঃসাহসিক অভিযাত্রার চূড়ান্ত পর্যায়ে আবারও জীবন আর সাহিত্যের সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি হয়েছিলাম। দেখেছি তুলাক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গ্রীক মন্দিরের অবিকল অনুকরণে অট্টালিকা, ভরদুপুরে রাস্তার ধারে মুদির দোকানের ছায়ায় ঘুমন্ত কৃষক, প্রবল দুর্দশায় টিকে থাকা কালোদের খুপরি-বস্তি। দেখেছি ফকনার-চরিত্র আংকেল গ্যাভিন স্টিভেন্সের শ্বেতাঙ্গ বংশধর আর তাদের মসলিনাবৃতা স্ত্রীলোকদের রবিবার সকালে গীর্জার পথে মন্থর হেঁটে যাওয়া। চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে দেখেছি ফকনারের ইয়োক্নাপাটোফা কাউন্টির ক্ষমাহীন জীবনযাত্রার প্রদর্শনী, বুড়ো ওস্তাদ তার গল্প-উপন্যাসে যেমনটা লিখে গিয়েছিলেন, তেমনই অকৃত্রিম ও মানবিক।

M y P
আলোকচিত্র: বাদিক থেকে মার্কেস, হোসে লুইস কুয়েবা এবং অক্তাবিও পাস
তবে মেহিকোর সীমান্তে পৌঁছানো মাত্র ভ্রমণের সমস্ত আবেগ-অনুভূতি যেন নিমেষে উবে গেল – বর্ডার স্মাগলারদের নিয়ে বানানো অসংখ্য ছায়াছবির কল্যাণে লারেদো শহরের এই নোংরা ধুলোমাখা চেহারা আমাদের অতিপরিচিত। সবার আগে ঢুকে পড়লাম খাবার হোটেলে, একটু গরম-ঝাল যে না খেলেই নয়! স্টার্টার হিসেবে বেয়ারা নিয়ে এলো হলদে রঙের নরম ভাত, ক্যারিবীয় উপকূলে আমরা যেভাবে রাঁধি তার থেকে একটু ভিন্ন কায়দায় প্রস্তুত। একটু মুখে দিয়েই মের্সেদেসের উল্লসিত কণ্ঠ – “খোদা তুমি মেহেরবান! কেবল এই ভাতের জন্যে বাকি জীবনটা এখানে কাটিয়ে দিতে পারবো।” ওর এই বাসনা কেমন অক্ষরে অক্ষরে পূরণ হয়ে যাবে, মের্সেদেস বোধহয় কল্পনাও করতে পারেনি। ঐ ফ্রাইড রাইসের কথা বলছি না অবশ্য – ভাত নিয়েও নিয়তি আমাদের সঙ্গে দারুণ পরিহাস করেছিল। বাড়িতে যে ভাত খাই এখন, ওটা আমরা কলম্বিয়া থেকে আনাই, বেড়াতে আসা বন্ধুদের ব্যাগের ভেতরে করে প্রায় নিষিদ্ধ বস্তুর মত! ছোটবেলার প্রিয় খাবারগুলো না খেয়ে কিভাবে বেঁচে থাকতে হয়, সেই বিদ্যা না হয় শিখে গেছি, কিন্তু স্বদেশী ভাতের স্বাদ ছাড়াতে পারিনি – আর তাই প্লেটে রাখা সফেদ দানাগুলো এক এক করে গুণে গুণে খাই!

হালকা বেগুনী আভায় রঞ্জিত এক সন্ধ্যায় আমরা অবশেষে মেহিকো শহরে এসে পৌঁছাই – পকেটে শেষ কুড়িটি ডলার, আর ভবিষ্যৎ একদম ফকফকা। এই শহরে সাকুল্যে চারজনকে চিনতাম। একজন কবি আলভারো মুতিস – বেশ আরাম-আয়েশেই ছিল ও মেহিকোতে, তেমন কোন দুঃখ-কষ্ট সইতে হয়নি তখন পর্যন্ত। দ্বিতীয়জন লুইস ভিসেন্স, মহান এই কাতালান ব্যক্তিত্ব অল্প কয়েকদিন আগেই কলোম্বিয়া ছেড়ে চলে এসেছেন মেহিকোর সাংস্কৃতিক বলয়ের প্রবল আকর্ষণে। তৃতীয়জন ছিলেন ভাস্কর রোদ্রিগো আরেনাস – মেহিকানো বিপ্লবের নায়কদের বৃহদাকার কংক্রিট মস্তক তিনি বীজের মতো বপন করে যাচ্ছিলেন বিশাল এই জনপদের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। আর আমার চতুর্থ বন্ধু লেখক হুয়ান গার্সিয়া পোন্সে – কলোম্বিয়ায় এক চিত্রকলা প্রতিযোগিতার বিচারক বোর্ডের সদস্য ছিলাম আমরা, তবে পরিচয়ের প্রথম সন্ধ্যায় দুজনেই এত মদ গিলেছিলাম যে একে অপরকে তৎক্ষণাৎ চিনতে পারিনি। খুব রসিয়ে কথা বলতো, আমি মেহিকো এসে পড়েছি জানতে পেরে ওই আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলো, ভেসে এলো উচ্চকণ্ঠ – “হারামির বাচ্চা হেমিংওয়ে তো শটগান দিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলো রে!”

M-6
আলোকচিত্র: লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসের সাথে মার্কেস
ঠিক সেই মুহূর্তে – আগের দিন সন্ধ্যা ছয়টায় নয় – আমার মেহিকোর জীবনের প্রকৃত সূচনা হলো, কেন এসেছি, কিভাবে এসেছি, কদ্দিন এখানে থাকবো, কোন প্রশ্নেরই সদুত্তর জানতাম না যদিও। দেখতে দেখতে একুশটি বছর পেরিয়ে গেছে, এখনও প্রশ্নগুলোর জবাব পাইনি – কিন্তু এই যে এখানেই তো আছি। কয়েকদিন আগে এক স্মরণীয় অনুষ্ঠানে যেমনটা বলছিলাম – এখানে লিখেছি আমার সমস্ত বই, এখানে লালনপালন করেছি আমার সন্তানদের, আমার জীবনবৃক্ষ রোপন করেছি ঠিক এখানেই।

প্রতিবারের মতো এইবারও মেহিকো ফিরে এসে পুরোনো স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো -স্কৃতিকাতরতার ছাকনিতে পরিশ্রুত তো নিশ্চয়ই – কিন্তু এই প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছে যেন ভিন্ন এক শহরে এসে পড়েছি আমি। চাপুল্তেপেকের অরণ্যে প্রেমিক-প্রেমিকারা আর ভীড় করে না আগের মতো, জানুয়ারী মাসের ঝকঝকে সূর্যালোকেও মনে হলো কারো যেন কোন বিশ্বাস নেই, অবশ্য থাকবেই বা কেন, সত্যি বলতে এমন সূর্যও তো এই যুগে বিরল। আমার বন্ধুদের হৃদয়েও এতো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব অনিশ্চয়তা কক্ষনো কোনদিন দেখিনি। বলুন, এও কি সম্ভব?
Flag Counter


2 Responses

  1. মৃন্ময় দাশ says:

    এই পাঠ মোজাফফর হোসেনের ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ মনে পড়ায়।

  2. zahirul says:

    lovely translation.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.