মুর্তজা বশীরের ৮৫তম জন্মদিন: তাঁর তুলনা তিনি নিজেই

আশফাকুর রহমান | ১৭ আগস্ট ২০১৭ ৯:৫৭ অপরাহ্ন

Murtaja Baseerযদি তিনি শুধু মুদ্রাবিশারদ হতেন তাহলেও তিনি মুদ্রাবিশারদদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য নিয়ে অবস্থান করতেন। তাঁর বাংলার হাবশি সুলতানের মুদ্রা নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ এককথায় অতুলনীয়। তিনি তো শুধু মুদ্রা, টাকা কিংবা ডাকটিকেটের সংগ্রাহক নন, তিনি তাতে পাঠ করেন একটি রাষ্ট্রের সমাজের আর মানুষের ইতিহাস। তিনি খোঁজেন মুদ্রার নকশায় শিল্পী ও শিল্পের স্থানীয় শক্তি। শুধু তাই নয়। তিনি যদি শুধু কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখতেন, সেগুলোও পাঠক সমাজে নন্দিত হতো।
এভাবেই তিনি পাঠ করেন মানুষের মুখ, মানুষের শরীর। আবার দেখেন দেয়ালের দাগ কিংবা পাথরের তল। চিকন রেখায়, স্পষ্ট রেখায় আঁকেন মানুষের অনন্য অভিব্যক্তি। সেই মানুষটি তাঁর আঁকা রেখায় হয়ে ওঠে সবার থেকে আলাদা। রেখায় রেখায় আঁকা সেই স্বাতন্ত্রমণ্ডিত মানুষরা যেন হয়ে ওঠে আরও জীবন্ত।

Murtja Basser-1বাবা বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীর। তাঁর বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্ব-দূরত্ব-ভালোবাসার কথা তিনি অকপটে লিখেছেন। মুর্তজা বশীর লাহোরে থাকার সময় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গিয়েছিলেন। সেখানে তার সন্তান শিল্পী মুর্তজা বশীরের স্টুডিওতে যান। তাদের কথোপকথনের এক পর্যায়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার সন্তান মুর্তজা বশীরকে বলেন, ‘After all our relation is that of father and son’। ১৯৬৯ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর লিখেছেন, ‘তিনি আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে হয়ত তাঁর পরিচয় ক্ষুন্ন করতো আমাকে। কিন্তু আজ আমার বলতে মোটেই দ্বিধা নেই আমি মুর্তজা বশীর, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পুত্র। কোন কুণ্ঠা আজ এতে নেই’।
সংগ্রাম ও কঠোর সাধনা পূর্ণ ছিল মুর্তজা বশীরের শুরুর পর্বের শিল্পী জীবন। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘পাথরের উপর হেঁটে রক্তাক্ত হয়েছি’। কী আঁকবেন, কীভাবে শিল্পের নতুন ভাষা রচনা করবেন, কীভাবে সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে নিজেকে স্পষ্টভাবে আলাদা করবেন, স্বতন্ত্র হবেন আর তাঁর আঁকা ছবিতে তিনি কীভাবে সময়কে অতিক্রম করবেন– এসব নিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে নদীর মতো। আবার তিনি ফিরেছেন তাঁর প্রয়োজনেই।
পশ্চিমা ধ্রুপদী শিল্পের অনুপ্রেরণায় শিল্পী মুর্তজা বশীর আজও সময়কে অতিক্রম করার আকাঙক্ষার সাধনা করে যাচ্ছেন। কীভাবে তিনি নিজেকে আলাদা করলেন? বিমূর্ত শিল্পের ইতিহাসে তিনি যোগ করেন ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’র ধারণা। একে একে আঁকলেন ‘দেয়াল’, ‘শহীদ শিরোনাম’ ও ‘পাখা’ চিত্রমালা। কী বিষয়ে, কী অঙ্কন শৈলীতে তিনি নিজেকে নিজেই অতিক্রম করলেন। নিজের তুলনা হয়ে উঠলেন নিজেই। তাঁর আঁকা দেয়ালে সেই গত শতকের ষাটের দশকের দমবন্ধ সময়ের কথা আছে, আবার নব্বইয়ের দশকে তিনি প্রজাপতির পাখায় তিনি প্রাণের উদযাপন মেলে ধরলেন। পাখায় বর্ণিল রঙের ছোপে সৌন্দর্যের এ বিস্তারে নতুন জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়।
শুধু শিল্পের জন্য শিল্প নয়, তাঁর দায়বদ্ধতা, তাঁর রাজনৈতিক চেতনা, তাঁর অঙ্গীকারের ছাপ আমরা দেখি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইট কেটে করা মুর‌্যালে। এই মুর‌্যালে তিনি উৎকীর্ণ করেছেন এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি ও যাপিত জীবনের সম্পর্ক আর বলেছেন মায়া-মমতার কথা। সেই সঙ্গে আছে শিল্প সৃষ্টির মাধ্যম ও উপকরণের প্রতি নিষ্ঠার ছাপ। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বে এমন ধরনের মূর‌্যালের দৃষ্টান্ত বিরল। তিনি বলেন, ‘কোন দেশের শিল্পী সত্যিকার অর্থে মহৎ হতে পারেন না যতক্ষণ না তিনি সমাজ-সচেতন হন। তাই বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত’।
এভাবেই তিনি মানুষের কাছে ফিরেছেন। ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী হয়েছেন। মাটির গন্ধ পেতে চেয়েছেন। এই উপলব্ধি থেকে তিনি বলেছেন, ‘১৯৮০ সালে যখন আমি জাপানে গেলাম একটা সেমিনারে, এই প্রথম আমি উপলব্ধি করলাম যে আমি কে? আমি যতই পাশ্চাত্য ঢঙ্গে ছবি আঁকি না কেন আমিতো ফরাসি, ইংরেজ কিংবা আমেরিকান নই। আমার ছবিতে আমার মাটির গন্ধ থাকতে হবে। ১৯৮০ সালে এটা আমি প্রথম উপলব্ধি করলাম’। এই উপলব্ধি থেকে নব্বইয়ের দশকে বাংলার লোকশিল্পের অভিজ্ঞতায় ও পশ্চিমের শিক্ষায় আঁকলেন। সবকিছু মিলেমিশে তাঁর আঁকা এ পর্বের নারীরা অনেক সাবলীল ও বাঙালিয়ানায় অনুপ্রাণিত।
রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণে ১৯৫০ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। আবার বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত তৈরির দায়িত্ব থেকে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আরো অনেকের সাথে রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছেন। সেই দিনে তিনি গুলিবিদ্ধ মৃত্যু পথযাত্রী ভাষা শহীদ আবুল বরকতকে রুমাল দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি পান করিয়েছিলেন। সেই দিনের কারণে বাঙালিরা পেল স্বাধিকারের নতুন জমিন। সেই দিনের কথা স্মরণ করে ‘কালো টিনের বাক্সে একটা রুমাল’ শিরোনামে লিখেছেন এক হৃদয়গ্রাহী লেখা। তাই তো তিনিই ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে রাস্তা হওয়ার কথা বলতে পারেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘একুশের চেতনা মানে আমরা কি বুঝি, একুশের চেতনার সাথে শুধু ভাষা আন্দোলন নয়। একুশের চেতনা মানে এদেশের আপামর জনসাধারণের সার্বিক অর্থনৈতিক সামাজিক মুক্তি’। ভাষা আন্দোলনের অবদান বাস্তবায়ন না হওয়ার আক্ষেপ তাঁর এখনো রয়ে গেছে। এভাবেই কত না ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে একটি জীবন তিনি কাটাচ্ছেন।
Amina Bashir And Murtaja Baseer১৯৬২ সালে তিনি আমিনা বশীরকে জীবনসঙ্গী করেছিলেন। তার বোহেমিয়ান জীবনে তিনি পেয়েছিলেন এক বিশাল আশ্রয়। তার বিবাহিত জীবন সম্পর্কে বলেন, ‘আমার জীবনটা ছিল ছন্নছাড়া। ১৯৬২ সালে যখন বিয়ে করি তখন একটা planned life হয়ে গেল। জীবনটা কেমন যেন ছকে বাধা সবকিছু’। তাঁর জীবনসঙ্গী আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন এ বছরের ১৩ মে। শিল্পী মুর্তজা বশীর তার জীবনসঙ্গী সম্পর্কে বলেন, ‘তুলু (আমিনা বশীরের পারিবারিক নাম) আমার শরীরের অংশ’। ২০১১ সালে তাঁদের বিবাহিত জীবনের ৫০ বছর পূর্তি হয়। সেই বছর তিনি তাঁর জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে যাওয়া এনগেজমেন্ট রিংটি হুবহু বানিয়ে আবার পড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমন রোমান্টিকতা শুধু মুর্তজা বশীরের পক্ষেই সম্ভব। অতীতকে তিনি পুরানো করে তোলেননি। অস্বীকার করেননি। অতীতকে নিয়ে তিনি বর্তমান আর ভবিষ্যতের ভিত রচনা করেছেন। উজাড় করে ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছেন।
গত কয়েক বছর ধরে তাঁর জীবনসঙ্গী যখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, কী ভালোবাসা শ্রদ্ধা আর দায়িত্ব নিয়ে তিনি সেবা করেছেন। যারা দেখছেন সেই সময়ের দিনগুলো এ কোনভাবেই ভুলে যাওয়ার নয়, ভুলে যাওয়াও যায় না। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন তুলু তাঁর সঙ্গে আছেন। থাকবেনও আমৃত্যু।
এ বছরই শিল্পী মুর্তজা বশীর তাঁর জীবনসঙ্গী আমিনা বশীরের নামে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে একটি ট্রাস্ট ফান্ড চালু করেছেন। তার স্ত্রীর স্মরণে মুর্তজা বশীরর আগ্রহের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবছর ১৩ মে বিশেষজ্ঞরা বক্তৃতা দেবেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের আশেপাশের দেশগুলোর শিল্পচর্চা সম্পর্কে জানার সুযোগ হবে আমাদের। একইভাবে জানা যাবে কীভাবে সাহিত্য একটি সমাজকে বদলে দিয়েছিল। আর বাংলাদেশের শিল্প ও সমাজ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাওয়া যাবে। এছাড়া বিশেষভাবে সুযোগ হবে সমকালীন চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানার। এভাবে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের চর্চা এবং জ্ঞানের নতুন নতুন দিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আমিনা বশীর আমাদের মাঝে থাকবেন। শিল্পী মুর্তজা বশীরের এমন উদ্যোগ আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
আমিনা বশীর মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ডের উদ্বোধনী বক্তৃতা ১৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার শিল্পী মুর্তজা বশীরের ৮৫তম জন্মদিনে অনুষ্ঠিত হয়। বক্তৃতা করবেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ এমিরেটাস প্রফেসর আনিসুজ্জামান। বক্তৃতার শিরোনাম ‘মুর্তজা বশীর:মানুষ ও শিল্পী’।
প্রায়ই তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘একজন শিল্পীর কাজ হলো, নতুন নতুন উদ্ভাবন করা। আমি যখনই কিছু আঁকার চেষ্টা করেছি, কিছু পাওয়ার চেষ্টা করেছি, আমার মতো করে বলতে চেষ্টা করেছি’। শিল্পী মুর্তজা বশীরের জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘায়ু কামনাই আমাদের চাওয়া। তিনি যেন তাঁর অসমাপ্ত ছবি এঁকে ও গবেষণার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে সময় থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। শিল্পীকে ৮৫তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com