চিরদিন বিকল্পবিহীন

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ১৫ আগস্ট ২০১৭ ১:৫৪ পূর্বাহ্ন

Mujib-2বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্যে বঙ্গবন্ধু চিরদিন বিকল্পবিহীন। কথাটি গতানুগতিক বা প্রথাসিদ্ধ শোনালেও আজ এই সত্যটিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। কারণ সময় ও পরিপ্রেক্ষিত দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। বাস্তব ঘটনা বা তথ্যকে বিকৃত করে ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার  চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন। এখন তা আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের যাঁরা ঘোষিত বিরোধিতাকারী কেবল তাঁরাই নয়, যাঁরা তাঁকে জাতির পিতা হিসাবে স্বীকিৃতি দিয়ে থাকেন, সম্প্রতি তাদেরও কেউ কেউ কৌশলে বঙ্গবন্ধুর মৌলিক অবদানকে খাটো করে দেখতে ও দেখাতে  শুরু করেছেন। হয়তো এভাবেই তাঁরা নিজেদেরকে সমাজের নব্যবিবেক হিসেবে চিহ্নিত করে আত্মপ্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষী সিঁড়িটাকে মজবুত করতে প্রস্তুত। এটি সামষ্টিক স্বার্থ-প্রসূত বিবেচনা বলে মনে হয় না। বঙ্গবন্ধু বা অন্য কেউ একা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেনি, এটা কোনো নতুন তথ্য বা যুক্তি নয়। এই আটপৌরে যুক্তি তুলে বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
বরং যে যুক্তি, তথ্য ও সত্য সর্বাধিক বাস্তবতাসম্মত সেটি হচ্ছে, একমাত্র বঙ্গবন্ধুর নিখুঁত ও নির্বিকল্প উপলব্ধি, তাঁর দ্বিধাহীন ঘোষণা, তৎপ্রণীত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকলপনা, রাজনৈতিক কর্মসূচী, তার ধাপানুক্রমিক বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি, সর্বোপরি দেশ ও জাতির জন্যে তার চূড়ান্ত আত্মদানের মাধ্যমেই বাঙালি জাতির নব-উত্থান-বাহিত একটি সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবপর হয়েছে। রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর গুরু, পূর্বসূরী ও সহযাত্রী আছেন অনেক শ্রদ্ধেয় নেতা। কিন্তু  দ্বিতীয় কারো ভূমিকা বঙ্গবন্ধুর এই আনুপূর্বিক ভূমিকার সঙ্গে তুলনীয় নয়।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, রাজনৈতিকভাবে তিনি এই উপমহাদেশের প্রতিটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠির জন্যে আলাদা আলাদা স্বায়ত্তশাসিত শাসন-ব্যবস্থার সমর্থক। অর্থাৎ বাংলা ও বাঙালি সহ উপমহাদেশের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠির জন্যে তিনি স্বায়ত্ত-শাসন কামনা করেছেন। এমনকি উপমহাদেশীয় স্তরেই সব স্বায়ত্ত-শাসিত অঞ্চল বা রাজ্য মিলে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র-কাঠামো তার প্রত্যাশিত ছিল। দেশভাগের আগে থেকেই বাঙালি তথা প্রতিটি পৃথক জাতিগোষ্ঠির আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক এই বাস্তবাশ্রয়ী রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্র্রায়োগিক প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর তাবৎকর্মকাণ্ডে।
দেশভাগের পর তার প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৮ সালে, ভাষা-আন্দোলনের স্ফূরণ-মুহূর্তে।
এরপরের ঘটনা আরো সুপ্রত্যক্ষ। ১৯৫৫ সনের ৫ জুন তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৭ জুন ঢাকার পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়। আরো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই দাবি মানা না হলে আওয়ামী লীগের দলীয় সদস্যরা আইনসভা থেকে পদত্যাগ করবেন। ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু এই দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন। তিনি তাঁর ভাষণে বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যের কথা উচ্চারণ করেন। সেই সঙ্গে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর স্থলে ‘পূর্ব বাংলা’ (ইস্ট বেঙ্গল) নামটি চালু রাখার দাবি তোলেন। তিনি বলেন, “We have demanded so many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word ‘Bengal’ has a history, has a tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted. If you want to change it then you have to go back to Bengal and ask them whether they accept it.  … What about the state language, Bengali? What about joint electorate? What about autonomy? … So I appeal to my friends on that side to allow the people to give their verdict in any way, in the form of referendum or in the form of plebiscite.”
বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত বক্তব্য থেকেই বাঙালিত্ব, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার সম্পর্কে তাঁর সচেতন উপলব্ধি ও তা বাস্তবায়ন করার জন্যে রাজনৈতিক কর্মসূচীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়া যায়। বলা বাহুল্য, সেই থেকে শুরু করে একুশ দফা, এগারো দফা, ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র, গণ-বিস্ফোরণ, গণভোট, স্বাধীনতা ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব থেকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বঙ্গবন্ধুর আপসহীন ও আদর্শবাদী নেতৃত্বই বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার জন্যে সর্বাপেক্ষা নির্ণায়ক সত্য হয়ে উঠেছে। এই দীর্ঘ পথযাত্রার যে কোনো পর্যায়ে তার আদর্শ-চ্যুতি বা স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সুদূরপরাহত করে রাখত পারতো। এই একটি কারণেই তিনি অনন্য ও বিকল্পরহিত। আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অচ্ছেদ্য সূত্রে গাথা। তাই কথায় কথায় আমরা বলি, বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ, বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধু। এই উচ্চারণে কাব্যিক আতিশয্য থাকতে পারে, কিন্তু অসত্য নেই।
ইতিহাসপূর্ব কাল থেকে গঙ্গা-পদ্মার এই পলিবাহিত অববাহিকায় মনোদৈহিক মিশ্রবিবর্তনের পথ ধরে ঋদ্ধিমান যে জাতিসত্তা, বিশশতকে এসে আমরা তার প্রামাণ্য নাম দিয়েছি বাঙালি। এই জাতিসত্তাকে কাম্য  প্রক্রিয়ায় ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুবর্তনের চূড়ান্ত মুহূর্তে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রিক কাঠামোতে উন্নীত করার জন্যে বাঙালিকে করতে হয়েছে দৃষ্টান্তরহিত ত্যাগ-স্বীকার আর অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। এতে নানাভাবে অংশ নিয়েছে প্রতিটি বাঙালি। তবে এই বিবর্তন-অনুবর্তন, সংগ্রাম-আন্দোলন ও সম্মুখ-সমরের প্রতিটি যৌক্তিক বাঁকে যিনি নেতৃ্ত্ব দিয়েছেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে এই জাতিগঠনের চূড়ান্ত-পর্বে তিনিই কারুকৃৎ, তিনিই সঞ্চালক। অতীত ও সমকালের সবকিছু তার অনুঘটক ও নিয়ামক।
বরাবর তিনি নিজেকে ঘোষণা করেছেন আপাদমস্তক এক অবিসম্বাদিত বাঙালি হিসেবে।  তাই বাঙালিও তাকে স্বতঃস্ফূর্ত অভিধায় গ্রহণ করেছে জাতির জনক রূপে। বাংলা, বাংলাদেশ ও বাঙালিত্বে যার সংশয় নেই, বঙ্গবন্ধুর সামষ্টিক সুকৃতি সম্পর্কেও তিনি নিঃসংশয়। কিন্তু প্রতিটি প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে একটি প্রতি-প্রস্তাবনা থাকে। এটিই মানবিক অগ্রগমনের দ্বান্দ্বিক দর্শন। এই দর্শনের বাস্তবায়ন-শর্ত প্রধানত গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা ও সদাচার-বাহিত সহমর্মিতা। যে সমাজে এটি অনুপস্থিত সেই সমাজ শক্তিমদমত্ত ও অন্ধ। তারা ভিন্নমতাবলম্বীকে শারীরিকভাবে হত্যা করে উৎখাত করার মতো অসার ও যুক্তিহীন অজাচারে লিপ্ত হয়। এরই এক বিকটতম অভিব্যক্তি বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ। আধুনিক পর্বে বাঙালি জাতিসত্তার রূপকার শেখ মুজিব এই যুক্তবিবর্জিত অমানবিকতার শিকার হয়েই সপরিবারে শহীদ হয়েছিলেন ভিন্নমতাবলম্বী অস্ত্রধারীদের হাতে। এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক নিকৃষ্টতম অপরাধ।
দেরীতে হলেও তার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, এবং বাঙালি পিতৃহন্তার বিরুদ্ধে প্রতিকার পেয়েছে। তাই আগস্ট শোকের মাস হয়েও বাঙালিত্ব ও মানবিকত্বের বিজয়ের মাস। পথভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট ও পেশাভ্রষ্ট অস্ত্রধারীদের হাতে শারীরিকভাবে নিহত হয়েও আজ তিনি চিরবিজয়ী বাঙালি ও চিরায়ত মানবসত্তার অগ্রযোদ্ধা। বাংলাদেশ এখন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে লালিত, শাসিত ও অগ্রসারমান। বিজয়ী বাঙালি আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে চিরজাগ্রত বাঙালি। মানবিক সহমর্মিতাই তার চালিকাশক্তি। এক মুজিবের রক্তকণিকা জন্ম দিচ্ছে কোটি কোটি মুজিব। চক্রাকারে বেড়ে যাচ্ছে বাঙালির ভূমিপুত্র ও ভূমিকন্যাদের এই সম্মিলিত গণশক্তি।
এই গণশক্তিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ও তাঁর প্রদর্শিত পথে অব্যাহত রাখতে হবে যে কোনো মূল্যে। এ পথ নতুন এক যুক্তিযুদ্ধের পথ। এটি অন্য এক রণক্ষেত্র, অন্যরকম এক যুদ্ধ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন থাকবে বাঙালির এই মুক্তিযুদ্ধ ও যুক্তিযুদ্ধের মিলিত প্রবাহ। সেই যুদ্ধের চিরায়ত অগ্রযোদ্ধা ও সেনাপতির নাম শেখ মুজিব। তিনি এক স্বাধীন জাতির স্বাধীন পিতা। তিনিই আমাদের আদর্শিক ত্রাতা। আগত অনাগত প্রতিটি ব্যক্তিবাঙালির অস্তিত্বে এই আদর্শিক চেতনাস্রোতের চলমানতা চাই।
বাঙালির সেই আদর্শিক চেতনা-যুদ্ধে নেই কোনো পরাজয়। বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ চিরকাল মুজিবময়। জয় হোক, জয়। আত্মশক্তিতে প্রবুদ্ধ বাংলা ও বাঙালির আলোক-চেতনার জয়।

 
০৩-১২.৮.২০১৭
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com