“মৃত্যু: নিঃসঙ্গ ভেড়ার চেহারা”

সুমন রহমান | ১৪ এপ্রিল ২০০৮ ১০:০৫ অপরাহ্ন

মান্দাই ক্রিমাটোরিয়ামে পৌঁছালাম সাড়ে চারটায়, দুপুরশেষের ঝা ঝা রোদের মধ্যে। বুকিত্তিমা রিজার্ভ ফরেস্টের বেশ অনেকটা ভিতরে সুনসান একটা ভবন। গাড়ি ঢুকতেই রাস্তা দুইভাগ হয়ে গেছে। একটা মড়ার গাড়ি যাওয়ার জন্য, অন্যটা দর্শনার্থীদের। আমাদের গাড়ি দর্শনার্থীদের রাস্তা ধরে আরো একটু আগাল। তারপর নেমে গেলাম।

sumon-1.jpg

ফটক পার হলেই মাঝারি সাইজের একটা ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড। সেখানে আমাদের অকালপ্রয়াত বন্ধু সাথিয়াবতী-র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় দেয়া আছে, পাঁচটা পয়তাল্লিশ। সাতটায় আরেকটা দাহ, একটা চীনা নাম ডিসপ্লেতে। একই আগুনে!

সাথিয়া মারা গেছে গতকাল রাতে। আরো দুইদিন আগে আমরা জেনেছিলাম সাথিয়া মারা যাচ্ছে। কিন্তু সাথিয়া সেটা জেনেছিল আরো একবছর আগেই। যখন ধরা পড়ল অসুখ, তখন তার ক্যান্সার-এর ফেজ থ্রি। এক অবধারিত মৃত্যুকে বুকে চেপে তামিল সিনেমার ওপর পিএইচডি থিসিস লিখত সে, দুর্দান্ত নাচত ভরতনাট্যম, আর স্থানীয় বাসান্তম টেলিভিশনে বাচ্চাদের জন্য একটা পাপেট শো করার প্ল্যান করতাম আমরা।

শবগাড়ি এল সোয়া পাঁচটায়। দেখলাম কী সুন্দরভাবে সাজানো ফুলে ফুলে উপচানো একটা কাসকেট। গাড়ি আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে, আর সেই সাথে এগিয়ে আসছে স্তোত্রপাঠের ধ্বনি। শোক উথলানোর আগে চোখ জুড়িয়ে গেল যে!

গত চারমাস একেবারে লাপাত্তা ছিল সাথিয়া। আমরা ভাবতাম টিপিক্যাল সিঙ্গাপুরিয়ান, নিশ্চয়ই দরজায় খিল লাগিয়ে থিসিস লেখা শেষ করছে! এটা ওর শেষ সেমিস্টার ছিল, তার ওপর বৃত্তিও ফুরিয়ে গেছিল। সেমিস্টারের শুরুতে একটা টিউটরশিপের জন্য ধর্না দিয়েছিল স্কুলে, মেলে নাই সেটা।

স্পিকারে জানানো হল, সাথিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথম অংশটা ঘটবে অডিটরিয়ান ওয়ান-এ। ছুটলাম সেদিকে। গিয়ে দেখি ছোট চার্চের আদলে গড়া চমৎকার একটা থিয়েটার। সামনে বেদীমঞ্চে সাথিয়াকে শোয়ানো হয়েছে ফুলে ফুলে। বেদীমঞ্চের সামনে সমাবর্তনের পোশাক-পরা হাস্যোজ্জ্বল ছবি ওর। সামনে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা। স্পিকারে মন্ত্রধ্বনি বেজেই চলেছে। মাইকে একজন তামিল ভাষায় কিছু বললেন, তারপর সেটা আরেকজন ইংরেজিতে বললে বুঝলাম সাথিয়ার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বলা হচ্ছে। “গ্লোবাল সিটি”র শ্মশান, বাই-লিঙ্গুয়ালই তো হবার কথা!

sumon-2.jpg

স্তোত্রপাঠ শেষে আমরা সারি বেঁধে শেষ দেখা দেখতে গেলাম সাথিয়াকে। দেখা শেষ হলে বেদীমঞ্চ থেকে সাথিয়ার শবট্রলি ভিতরে কোথায় চলে গেল। আমরাও ছুটলাম ই-৭ ভিউয়িং হলের দিকে। সরু একটা অ্যাকসেলেটর কোনাকুনি উঠে গেছে ওপর দিকে। সেখান দিয়ে উঠে হাতের ডানে সারি সারি ভিউয়িং হলের দরজা। ই-৭ খুঁজে পাওয়া গেল সহজেই। কাচঘেরা মাঝারি সাইজের ঘর। সেখান থেকে কাচের ওপাশে বিশাল একটা দক্ষযজ্ঞ দেখার ব্যবস্থা। একটু পরই দেখলাম কাচের ওপাশে নিচে সরু ট্রামলাইনের মত লাইন ধরে সাথিয়ার শবট্রলিখানি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। গন্তব্য মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরের বার্ন চেম্বার। কোথাও কেউ নেই। পুরোটাই ঘটছে রিমোট কন্ট্রোলে। এই একটা জায়গায় কিছুক্ষণের জন্য একটু মাতম হল, গলা কিছু ছেড়ে কিছু চেপে কাঁদল সাথিয়ার বোনেরা। ট্রামলাইন ধরে শবট্রলি বার্নচেম্বার পর্যন্ত পৌঁছাতে দেড় মিনিটের মত লাগল। কাঁদবার এটুকুই অবসর। তারপরই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল বার্ন চেম্বারের দরজা। শোকের দরজাও যেন সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেল।

বার্ন চেম্বারের দরজা বন্ধ হতেই সবাই বেরিয়ে এল ভিউয়িং হল থেকে। এরপর কী? ওমা, সবাই দেখি বইয়ের পাতা বন্ধ করে বাড়ি ফেরার রাস্তা খুঁজছে! অবাক হলাম, একাই পুড়বে সাথিয়া? প্রযুক্তি কি এই দৃশ্যটিও দেখার সুযোগ কেড়ে নিল? ভ্যাবাচ্যাকা লাগে, হাঁটি অন্যদের ছন্দে। ডিসপ্লে বোর্ডের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকাই, সাথিয়ার নামের শেষে সময় যেখানে দেয়া ছিল, সেখানে লেখা ‘একোমপ্লিশড’। হঠাৎ বিষাদ এল কোত্থেকে যেন। যেন থেকে-থেকে গায়ে এসে লাগছে বহুদূরের তিতাসপারের শ্মশানঘাটের হাওয়া।

ফেরার পথে সবাই নিশ্চুপ, আমি বাইরের পড়ন্ত সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলাম, সেই কখনই তো নিশ্চয়ই ভস্ম হয়ে গেছে সাথিয়া, হয়তো ধুলা হয়ে ছড়িয়েও গেছে এই পৃথিবীর আনাচে কানাচে। এই অনুভবেও শান্তি পেল না মন, দূরের বিলবোর্ডের আলোকচ্ছটায় নিজের মনকে পড়ার চেষ্টা করি। সাথিয়ার মৃত্যুতে যতটুকু শোক, মন যেন এরচে একটু বেশি ভার-ভার। মান্দাই ক্রিমাটোরিয়ামের অটোম্যাটেড দাহ ব্যবস্থার কথাই ভাবছিলাম: মৃত্যু সাথিয়াকে কেড়ে নিয়ে গেছে, আর প্রযুক্তি কেড়ে নিয়ে গেছে ওর মৃত্যুশোক! বুক তো একটু বেশি খালি-খালিই লাগবার কথা? মনে পড়ল কফিল আহমেদ-এর কবিতা:
মৃত্যু নিঃসঙ্গ ভেড়ার চেহারা
হয়ত বা কিছুই না, শিশুর জন্মের পর
ওর জন্য রেখে যাওয়া একমুষ্টি ধূলা…

sumanrahman@hotmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন একনিষ্ঠ পাঠক — এপ্রিল ১৬, ২০০৮ @ ৭:৩৫ অপরাহ্ন

      শোক ছুয়ে গেল মন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুজিব মেহদী — এপ্রিল ১৭, ২০০৮ @ ১:১১ পূর্বাহ্ন

      সাথিয়াবতী

      তামিল সিনেমা রয়ে গেল
      ভরতনাট্যম
      আধালেখা থিসিসটাও

      শবট্রলি ঢুকে গেল বার্নচেম্বারে

      মান্দাই ক্রিমাটোরিয়ামে
      জন্মমাত্রই একটা শোকফুল
      ঝরে যেতে দেখলাম

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com