সাংস্কৃতিক পরিবেশন, অধিপতি মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন এবং ‘অন্য’ নিম্নবিত্তের ‘নির্মাণ’

নাদিমূল হক মণ্ডল | ৮ এপ্রিল ২০০৮ ১:৩০ পূর্বাহ্ন

আপনি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখুন। দাঁড়কাকেরা পাতিকাকদের কিভাবে মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে’। ‘আমি তাকিয়ে দেখলাম, আট দশটা দাঁড়কাক একজোট হয়ে যেখানেই পাতিকাক দেখছে খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরদিন থেকে দেখতে থাকলাম দাঁড়কাকেরা দলবেঁধে জঙ্গিবিমানের মতো বেগে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানেই পাতিকাক দেখছে হামলা করছে। কাকের জগতেও হিংস্রতা ও মাস্তানি প্রবেশ করেছে। একসময় হয়ত এমনও হতে পারে দাঁড়কাকেরা এই শহর থেকে পাতিকাকদের তাড়িয়ে দেবে।

(পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরাণ, আহমদ ছফা, ১৯৯৬)

আমি মধ্যবিত্ত; জন্ম, অর্জন দু সূত্রেই এবং ‘শিক্ষিত’। পরিবার থেকে চেনানো জীবনপরিজন ও জ্ঞাতিদের প্রবল অংশই মধ্যবিত্ত, ‘শিক্ষিত’। বিষয় এ নয় যে নিম্নবিত্ত, ‘অশিক্ষিত’ আত্মীয় নেই। যা বিষয় তা হলো : বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিম্নবিত্ত, ‘অশিক্ষিত’দের নয় বরং আগ্রহ নিয়ে চেনানো হয়েছে ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তদের, মিশতেও উৎসাহিত করা হয়েছে এদের সাথেই। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, এ শ্রেণীর অধিপতির ভূমিকা টের পেতে সাহায্য করেছে নানানভাবে, নানান সময়, বিভিন্ন ঘটনায়।

সে থেকেই নিজের মধ্যেই জিজ্ঞাসার দানা বাঁধা। আমি কি সেই দাঁড়কাকরূপী মধ্যবিত্ত, যে কিনা পাতিকাকরূপী নিম্নবিত্তের উপর অধিপতি? মধ্যবিত্তের অধিপতি ভূমিকা নিজের কাছে মানতে না পারা অস্বস্তিকর, সে কারণেই এ শ্রেণীর (ক্ষমতা) অনুশীলনের উন্মোচন গুরুত্বপূণ–বিদ্যাজাগতিক ও রাজনৈতিক উভয় বিবেচনাতেই। উত্তর আধুনিক জ্ঞানচর্চার বৈশিষ্ট্য, জ্ঞানকে রাজনীতি হতে বিযুক্ত করে না দেখা বরং জ্ঞান কীভাবে ক্ষমতার সাথে যুক্ত তার তালাশ করা, আমাকে প্রভাবিত করে। নিজ শ্রেণীর অধিপতি ভূমিকা উল্টে পাল্টে দেখবার চেষ্টা এসব কিছুরই ফলাফল।

১.
ঔপনিবেশিক রূপান্তরের ফলে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত একটা বড় সময় ধরে অধিপতি শ্রেণী, বাংলাদেশের অসম ধনতান্ত্রিক কাঠামোয় সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী। এ মধ্যবিত্ত স্রেফ আর্থ-রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশের বিষয় নয়, এ শ্রেণীসত্তার ওতপ্রোত বিষয় বুদ্ধিবৃত্তিক, মতাদর্শগত। তাই ঔপনিবেশিক অভিঘাতসৃষ্ট মধ্যবিত্তের কেন্দ্রীয় নির্ধারকসূচক ‘শিক্ষা’, ‘চাকুরী’ ‘নৈতিকতা’র মতাদর্শ। মধ্যবিত্তের মতাদর্শ নৈতিকতার মানদণ্ডে পরিণত, মতাদর্শের ক্ষমতাশালী নির্মাতা ও রক্ষক। বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম, শিক্ষা, মতাদর্শ, প্রগতি’র ধারণা এ শ্রেণীর আধিপত্যের বৈধতাযন্ত্র।

কীভাবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মতাদর্শিক হুকুমাত বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্বে’র দখল তৈরি করে, কীভাবে অপরাপর মানুষজন হতে মধ্যবিত্ত ‘নিজ’ স্বাতন্ত্র্যের কথা বলে অথবা কীভাবে বাদবাকি মানুষজনকে ‘অপর’ হিসাবে গঠন করে এসব কিছুই কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসা। মধ্যবিত্তের অধিপতি ডিসকোর্সকে বুঝতে চেষ্টা করা, সে ডিসকোর্সে অপরাপর মানুষজনদের সম্পর্কে জ্ঞান ও অর্থ’র উৎপাদন প্রক্রিয়া উপলব্ধি এবং অন্তর্নিহিত ক্ষমতা সম্পর্ক উন্মোচন তথা ‘নিজ’, ‘আত্ম’ হতে ভিন্ন অপর ‘বর্গ’/‘শ্রেণী’র প্রতি মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গি এই পাঠের কেন্দ্র। কোন প্রক্রিয়ায় মধ্যবিত্ত অবস্থান নেয়, কীভাবে নিম্নবিত্ত পরিবেশিত হয়–এই অবস্থান ও পরিবেশনের সামাজিক ভিত্তি, রাজনীতি ও প্রক্রিয়া কী? এসকল বিষয়ের উদ্ঘাটন এবং বিশ্লেষণ এ প্রবন্ধে আমার কাজ। আমার মূল প্রয়াস (ক) নিম্নবিত্ত সম্পর্কিত–মধ্যবিত্ত ধ্যানধারণাকে আলাদা করার (খ) সেগুলির ডিসকোর্সকে শনাক্ত করার (গ) ডিসকোর্স এর মধ্যে দিয়ে ব্যবস্থা ও ক্ষমতাকে চেনার চেষ্টা করার।

২.
বিশ্লেষনের কেন্দ্র ‘মধ্যবিত্ত’, তাই জরুরী মধ্যবিত্ত বর্গের সজ্ঞায়ন। এটি সমস্যাবিযুক্ত তর্কাতীত প্রসঙ্গ নয়। তাই মধ্যবিত্ত বলতে কী বোঝাচ্ছি এই বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবেলাটি গুরুত্বপূর্ণ। আর এই কসরতটি করার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন চিন্তুকদের শ্রেণী ও শ্রেণীগঠন সম্পর্কিত আলাপকে কেন্দ্রে রেখে এগিয়েছি: সেসবের বিচার বিশ্লেষণ হয়েছে, প্রাসঙ্গিক নির্যাস বাছাই করেছি, অনেক কিছু হতে সরেছিও এবং এভাবেই নিজের উপলব্ধি দানা বাঁধে।

সমাজ সমূহের ইতিহাসকে শ্রেণিসংগ্রামের অন্বিষ্ট হিসাবে দেখা মার্ক্স-চৈতন্য উৎসরিত প্রক্রিয়া। শ্রেণী বুঝবার ক্ষেত্রে বিশ্লেষণী পদ্ধতি হিসাবে কার্ল মার্ক্স এর চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী। মার্ক্স এর চিন্তার পাঠ তাগিদ দেয় এইভাবে বুঝতে যে উৎপাদন শক্তি (যেমন, যন্ত্রপাতি, দক্ষতা, কৌশল ইত্যাদি যা দ্বারা মানুষ কাজ করে), উৎপাদন সম্পর্ক (যেখানে উৎপাদকরা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে) সম্মীলনে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো গঠিত হয় এবং এই অর্থনৈতিক কাঠামো সমাজের চিন্তা, ভাবনা, অভ্যাস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। মার্ক্স দেখান যে উৎপাদন সম্পর্ক দ্বারাই মানুষ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এই সম্পর্কই উপরিকাঠামো হিসাবে ধর্ম, রাজনীতি, আইন মতাদর্শ বা বিশেষ ধরনের সামাজিক সচেতনতা গঠন করে। মার্ক্স অনুসারে শ্রেণী সম্পদের সাথে ও সম্পদের মালিকানার সাথে যুক্ত, সম্পদের নিয়ন্ত্রণের সাথে যুক্ত এবং (প্রধানত) ক্ষমতা ও প্রভাব তাদেরই যাদের মালিকানা ও দখলে থাকে সমাজের (প্রধান ধরনের) সম্পদ। সমাজের ক্ষমতার দিক থেকে অধিপতিরা এমন ব্যবস্থা তৈরি করে ও জিইয়ে রাখে যা অন্য জনমানুষের নয় বরং নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধা নিশ্চিত করে। যারা উৎপাদন উপকরণের দখল নিতে পারে তারাই রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক অধিপতি/শাসক শ্রেণী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক পূঁজিবাদী দেশে শ্রেণীর গঠন বুঝতে কী ধরনের তাত্ত্বিক পরিকাঠামো কাজের? শ্রেণী কী স্রেফ আর্থ-রাজনৈতিক হিসেব নিকেশের বিষয়? আদতে কেবল পূজিপ্রবাহ, আদান প্রদান কিংবা আর্ন্তজাতিকীকরণের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্্েরণীকে বোঝা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুসলমান মধ্যবিত্ত হচ্ছে অধিপতি শ্রেণী। কিন্তু যখন মধ্যবিত্তকে স্রেফ আর্থ-রাজনৈতিক বিষয় হিসাবে দেখা হয় তখন শ্রেণী ‘সামগ্রিক সামজিক গঠন’ হিসাবে ধরা পড়ে না। মানস চৌধুরী ও রেহনুমা আহমেদ, এ দুজন নৃবিজ্ঞানীর গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি: “শ্রেণী সত্তার ওতপ্রোত বিষয় যেমন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক, মতাদর্শগত।” তাদের মতে, “শক্তিশালী শ্রেণী বলতে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক বুর্জোয়া বোঝানোর যে চেষ্টা–বাস্তবে শিল্প বিপ্লব না হওয়ার কারণে এবং ঔপনিবেশিক প্রভাবের কারণে ইউরোপীয় আদলের বুর্জোয়া নেই–এখানে বরং দাপুটে শ্রেণী হল মধ্যবিত্ত।” (মানস চৌধুরী ও রেহনুমা আহমেদ, “লিঙ্গ, শ্রেণী এবং অনুবাদের ক্ষমতা: বাঙ্গালী মুসলমান মধ্যবিত্ত পরিবার ও বিয়ে”, কর্তার সংসার, রূপান্তর, ঢাকা, ২০০০।)

মধ্যবিত্ত কে? এই জিজ্ঞাসার উত্তরে গ্রামসীর চিন্তাও কাজের রাস্তা বাৎলায়। তার বিশ্লেষণে শ্রেণী গঠন পুজিবাদী বিকাশের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না, এমনকি সম্পদ, অর্থ, শুধুমাত্র এসবের হিসাবে শক্তিশালী অধিপতি শ্রেণীকে চিহ্নিত করা অসম্ভব, সেটাই গ্রামসীর যুক্তি। গ্রামসীর এই বিশ্লেষণকেই সমাজ ও ইতিহাসের গবেষক ডেভিডফ ও হল আঠারো ও উনিশ শতকের বৃটিশ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গঠন বুঝতে ব্যবহার করেছেন। রেহনুমা আহমেদ ও মানস চৌধুরী বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী বুঝতে এর ব্যবহার করছেন।

অন্য অনেকেও মধ্যবিত্ত সংজ্ঞায়নে ‘আয়’কে একমাত্র নির্ধারক ভাবার বিপক্ষে মত দিয়েছেন। এদের মধ্যে মার্ক্রবাদী চিন্তুক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও আছেন, যিনি মন্তব্য করেন, “তারা আসলে বিত্তের দিক থেকে মধ্য না হলেও চিত্তের দিকে থেকে মধ্য। সে কারণে এদেরকে মধ্যবিত্ত না বলে মধ্যচিত্তই বলা উচিত।” (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, “বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত”, বিচিত্রা, আগষ্ট ১৯৭৮।) শহুরে মধ্যবিত্তের বড় অংশ (শিক্ষক ও সাংবাদিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ, নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা) অর্থনৈতিক দিক থেকে নিম্নবিত্তের খুব কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও যেদিকগুলো তাদেরকে মধ্যবিত্তের গোত্রভূক্ত করে তা নিছক তাদের আয় নয়, সেগুলো হচ্ছে, শিক্ষা ও মানসিক জগত, সাংস্কৃতিক জগত, জীবনশৈলী। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সাথে ইংল্যান্ডের মধ্যশ্রেণী অথবা ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্নদেশের বুর্জোয়ার উৎপত্তি’র দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।

অর্থনীতিবিদ এবং (নয়া)ঔপনিবেশিক ও অপরাপর বিবিধ আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অন্যতম সোচ্চারকন্ঠ আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সুনির্দিষ্ট কতক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করেছেন:
(১) এরা উৎপাদনযন্ত্রের মালিক নন, যদিও কিছু স্থাবর/অস্থাবর সম্পদের মালিক হতে পারেন।
(২) কায়িক নয় বরং মানসিক শ্রম এদের জীবিকা নির্বাহের কেন্দ্রে।
(৩) শিক্ষা পরিবারে এবং সামাজিক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ।
(৪) আয়সীমা (সাধারণভাবে) সীমিত ও নির্দিষ্ট।
(৫) প্রাচুর্য্যময় নয় কিন্তু স্বচ্ছল।
(৬) বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্যের চর্চা বেশি, বুর্জোয়া ভাবাদর্শ নির্মাণ ও বিকাশে ভূমিকা রাখে।
(৭) জনমতের মুখ্য সংগঠক, বুদ্ধিজীবি প্রধানত এদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত।
(৮) পুঁজিবাদী উৎপাদন নয় বরং মূখ্য ভূমিকা বিতরণ, ব্যবস্থাপনা ও ভাবাদর্শ নির্মাণে। ইউরোপে মধ্যবিত্তশ্রেণী শিল্প মালিক ও পুঁজিবাদী সম্পত্তির মালিক শ্রেণীর তুলনায় আধিপত্য জোরদার করতে পারেনি। কিন্তু ভারতবর্ষে মধ্যবিত্ত অধিপতি শ্রেণী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।
(আনু মুহাম্মদ-এর এই বিশ্লেষণের জন্য দেখুন বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, বাংলাদেশ লেখক শিবির, ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৫)

গত কয়েক শতকের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ হল ঔপনিবেশিকতা যার ফলে উপনিবেশিত মানুষজনের জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ভাঙন আসে, বদল ঘটে এবং ঔপনিবেশিকতার প্রভাব নিয়ে পুনর্গঠিত হয়। উপনিবেশিত মানুষজনদের জীবন আগে কেমন ছিল, তারা (ইংরেজ) আসার পর কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, বোঝা জরুরী। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীও এই ঔপনিবেশিক রূপান্তরের ফসল: উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথম ভাগে ঔপনিবেশিক পুঁজির চাহিদানুযায়ী গড়ে উঠে মুসলমান মধ্যবিত্ত, হিন্দুদের তুলনায় কিছুটা দেরীতে হলেও ‘শিক্ষিত সমাজ’ হিসাবে শ্রেণী-পরিচিতি তৈরী হলো, আর এই শ্রেণীর মর্যাদার স্মারক ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের শাসন সহায়ক ‘চাকরী’।

ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক আধিপত্যকে অবশ্যই নিছক দমন-পীড়ন দিয়ে বোঝা যাবে না বরং এমন রূপান্তর প্রক্রিয়া হিসাবে দেখতে হবে যেখানে পুরনো কামনা এবং জীবনানুশীলন, চর্চা, সংস্কৃতি ধ্বংস প্রাপ্ত হয় ও নতুন ধরন ঐ স্থান দখল করে নেয়। নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদ মনে করেন, সভ্যতা ও পশ্চিমাকরণের ভূমিকা একটি অখণ্ড সংস্কৃতি তৈরি না করলেও কিছু নীতিনৈতিকতা ও মডেল উৎপাদন করে। তালাল আসাদ মনে করেন ‘পশ্চিমাকরণ’ প্রক্রিয়া অপশ্চিমকে আমন্ত্রণ জানায় পাশ্চাত্যকে ‘আদর্শ’ ও শ্বাশ্বত বিবেচনা করে সে নিরিখে নিজ সংস্কৃতি ও সমাজের বিচার বিশ্লেষনে। ( তালাশ মিলবে Asad, Talal, “The concept of cultural translation in British Social Anthropology” Genealogies of religion: Discipline and reasons of power in Christianity and Islam, 1993.) আসাদের তত্ত্বায়ন ব্যবহার করেই আমরা বুঝতে পারি যে, ঔপনিবেশিকতার ফল মধ্যবিত্ত চিন্তা-ভাবনাতেও অনুবাদিত। বৃটিশ শাসক এমন একটি শ্রেণী সৃষ্টি করতে চেয়েছিল যারা হবে রক্ত ও গাত্রবর্ণে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিতে ইংরেজ। ফলে পাশ্চাত্যের সামাজিক ধারণা আমদানী করে নবগঠিত মধ্যবিত্তের মধ্যে তা সম্প্রসারিত করা হয়।

ফলে বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্তের গঠনে পশ্চিমা ধ্যানধারণা খুবই মৌলিক, মুসলমান মধ্যবিত্তের আধিপত্যের নির্মাণে সহায়ক শিক্ষাটা কেবল প্রথাগত শিক্ষা নয় বরং নৈতিক শিক্ষা, সে ‘নৈতিক শিক্ষা’ যুক্ত পশ্চিমা ধ্যানধারণা ও প্রগতিবাদীতার সাথে। ফলে যৌনতা, সম্পর্ক, বিয়ে-ব্যবস্থা, দাম্পত্য, শুচিতার রূপান্তরিত ধারণা অধিপতি শ্রেণী হিসাবে মধ্যবিত্তের স্বাতন্ত্রসূচক বৈশিষ্ট্যে রূপান্তরিত হয়। বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্তের গঠন এবং এই সমাজের রূপান্তর বুঝবার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের প্রবল উপস্থিতি, পাশ্চাত্য-অপাশ্চাত্যের ক্ষমতা সম্পর্ক এবং সেই ক্ষমতা সম্পর্কে স্থানীয় কার্যকারীতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যে বাঙালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ হয় তার অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন মাসোহারাভোগী শিক্ষিত ভদ্রলোক, যারা প্রশাসন, আইন কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। এই ভদ্রলোক শ্রেণী নিজেদেরকে গ্রামীণ কৃষক, শহুরে দরিদ্র এবং ইংরেজ প্রশাসক বর্গের থেকে স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসাবে তুলে ধরতেন। পত্রপত্রিকায় এই শ্রেণী নিজেদের ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণী’ হিসাবে তুলে ধরতেন এবং জনগণ ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে উপস্থাপন করতেন। শ্রেণীর মাঝেই শিক্ষা আবদ্ধ ছিল এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে তারা শ্রেণীর উপযোগী পেশায় প্রবেশাধিকার লাভ করতেন।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী বুঝতে ইতিহাসে পূন:পৌনিক না ফিরে উপায় নেই। ঔপনিবেশিক পর্বের একটা বিশাল সময় ধরে ভারতীয় মুসলমান সমাজ ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা ও বৈরীভাব পোষণ করতো। কিন্তু ১৮৭০ থেকে ১৮৭১ খৃষ্টাব্দ নাগাদ একদিকে নেতৃত্বের অভাব এবং অন্যদিকে ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর ভয়াবহ দমননীতি ইত্যাদি কারনে ওহাবী আন্দোলনসহ ভারতীয় মুসলমানদের ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে। তখন নতুন চিন্তাভাবনার উদ্রেক হতে শুরু করে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে ইংরেজ শাসন মেনে নেয়া সমীচীন হবে বিবেচনা করে প্রথমবারের মতো মুসলমান সম্প্রদায় ইংরেজ বিরোধীতার পথ পরিহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইংরেজী শিক্ষার প্রতি মুসলমানরা আগ্রহী হয়ে উঠলো, ছোটখাট চাকুরীও তারা পেতে শুরু করলো। এভাবেই শিক্ষিত বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গোড়াপত্তন হলো। মুসলমান জাতির নেতৃত্বের দাবিদার হয়ে উঠলেন এই নবগঠমান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, পুরাতন জমিদার নবাবরা চিহ্নিত হলেন ‘নীতিহীন’ এবং ‘অধঃপতিত’ গোষ্ঠী হিসাবে। ‘দাম্পত্যপনা’র মতাদর্শে পরিবর্তন আসে, বিশাল জায়গা জুড়ে আসন গাড়ে যৌনশুচিতা। পরিবর্তন আসে নানা ক্ষেত্রে। অন্যসব কিছুর মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চৈতন্যও নির্মিত হয়।

৩.
মধ্যবিত্ত মিডিয়া দ্বারা আকৃষ্ট, বিনোদন তাদের টানে, তারা বিনোদনের ভোক্তা। কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক উৎপাদের স্পর্শে আসবার সুযোগ তাদের রয়েছে। মধ্যবিত্তের ভিজ্যুয়াল দুনিয়ায় কী কী অন্তর্ভুক্ত তা বুঝতে গিয়ে মনে হয়েছে কী কী অন্তর্ভুক্ত নয় এ প্রশ্নটাই গুরুত্বপূর্ণ! টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, যাত্রা, মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়, ইন্টারনেটও বিনোদন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। মধ্যবিত্তের ভিজ্যুয়াল দুনিয়া পুনঃসংগঠিত, কারো কাছে কম্পিউটার প্রাসঙ্গিক, ‘টানে কারণ সৃষ্টিশীল কিছু করার জন্য সবচেয়ে ভাল মাধ্যম’, এক চ্যানেলের টিভি থেকে একাধিক চ্যানেল, ভিসিডি মারফত পিসিতে বিনোদন এবং ইন্টারনেট পর্যন্ত সম্প্রসারিত। ড্রইংরুম বা লিভিংরুমের চার দেয়ালের মাঝে গড়ে উঠেছে নিরাপদ ভিজ্যুয়াল দুনিয়া, পিসির সামনে।

তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় টেলিভিশন। টেলিভিশনকে বাছাই করবার কারণ মোটামুটি একজন শিক্ষার্থীর এই বক্তব্যের মতোই, “কারণ বর্তমান টেলিভিশন বা মঞ্চের নাটকগুলিতে অনেক শিক্ষণীয় ব্যাপার থাকে এবং পরিবারের যেকোনো সদস্যের সাথে বসে দেখা যায়।” টেলিভিশনের সাথে সাথে মঞ্চের কথা, চলচ্চিত্রের কথাও বলছেন। গুরুত্বপূর্ণ সত্য: ‘যাত্রা’ নিয়ে কথা বলতে মধ্যবিত্ত অস্বস্তিবোধ করে। মঞ্চ আর যাত্রার মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য টানা হয়, মধ্যবিত্ত বিবেচনায় মঞ্চ হলো ‘জ্ঞান পাওয়ার মাধ্যম’ ‘দর্শকদের অভিব্যক্তি’র উৎস, ‘তাৎক্ষণিক অভিনয়’ ক্ষেত্র। প্যারাডক্সটি হল যাত্রাতেও এক ধরনের জ্ঞান তৈরি হয়, দর্শকদের সামনাসামনি ঘটে বলে দর্শকদের অভিব্যক্তি, তাৎক্ষণিক অভিনয়ের সুযোগ ঘটে, কিন্তু মধ্যবিত্ত যাত্রা সম্পর্কিত আলাপে যেসব বৈশিষ্ট্য তারা উল্লেখ করেছিলেন মঞ্চ নাটক দেখার কারণ হিসেবে, সেগুলি যে যাত্রারও বৈশিষ্ট্য তা উল্লেখ না করে বরং যাত্রাকে বৈশিষ্ট্যায়িত করা হয় এই শব্দ/বাক্যগুলোর দ্বারা : ‘খুব খারাপ’ ‘যাওয়া যায় না’ ‘লোয়ার ক্লাস’ ‘অইলো কিছ!ু’ ‘ক্ষীণ’ ‘অশ্লীল’। অর্থাৎ মঞ্চকে (এবং টেলিভিশনকে) যুক্ত করা হয় নিজেদের মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির সাথে, ইতিবাচকভাবে। অন্যদিকে, ‘যাত্রাকে ‘খারাপ’ ‘যাওয়া যায় না’ ‘অইলো কিছু’ ‘ক্ষীণ’ ‘অশ্লীল’ ‘লোয়ার ক্লাস’ -এর সাথে। আরো আশঙ্কার কথা মধ্যবিত্তজনদের অনেকে যারা যাত্রা দেখেনি কখনো, (তারা নিজেরাই বলছে সেটা) অথচ না দেখেই ‘নেতিবাচক’ বৈশিষ্ট্য জুড়ে দিচ্ছে এবং অপর নিম্নবিত্তের সাথেই এই ‘নেতিবাচক’ বৈশিষ্ট্যের অনিবার্য যোগসূত্র দেখাচ্ছে। ঢাকা সিনেমার সাথে যুক্ত মানুষেরা ‘অশ্লীল’ ‘অশিক্ষিত’, বিকৃতরুচি’র ধারক এবং তারা তৈরি করে ‘রিকশাওয়ালার সিনেমা’, নিম্নবিত্তের সিনেমা’ ‘উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্যিক’ ইত্যাদি। নিম্নবিত্ত মানুষজনদের যৌনানুশীলন, প্রেম পিরিতি নিয়ে মধ্যবিত্ত উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা আমরা নাট্যকারের চোখে দিয়ে একান্নবর্তীতে (মধ্যবিত্ত পরিসরে ব্যাপক সমাদৃত ও জনপ্রিয় এক টিভি মেগাসিরিয়াল) পাই। আবার এই কালে যখন কিনা গার্মেন্টস ব্যবসা দাপটে, গার্মেন্টসের মেয়েরা নগরীতে বস্তির পাশাপাশি গজায়মান মেসগুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে, একটি ছোট রুমেই বেশ কয়েকজন মিলে থাকছে তখন এলাকার মধ্যবিত্তের এ নিয়ে ব্যপক অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। মধবিত্ত চোখে বস্তিবাসীর এবং গার্মেন্টস কর্মীদের নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে লাজ-শরমের বালাই নেই, মধ্যবিত্ত চোখে গার্মেন্টসের একটি অর্থ বাছবিচারহীণ যৌনতা, আমাকে এক মধ্যবিত্ত সদস্য জানায় ‘কাজের জায়গা আলাদা না থাকায় এবং সন্ধ্যার পরেও ওভারটাইম থাকায় অবিবাহিত মেয়েরা তো বটেই এমনকি বিবাহিত মেয়েরাও খারাপ প্রভাবে পড়ে’ এবং সে কারণেই ‘এদের চরিত্র ভাল নেই’। যে এই মন্তব্যটি করেছিল সে নিজেই বলছে সে গার্মেন্টসে যায়নি, ব্যক্তিগতভাবে কোন গার্মেন্টস কর্মীকে সে চেনেওনা অথচ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের ‘সতীত্ব’ নিয়ে অনায়াস প্রশ্ন তোলে। উপন্যাসে, নাটকে, চলচ্চিত্রে বস্তির মানুষজনের জীবনের ধ্বংসাত্মক চিত্র কেন্দ্রীয়। চলচ্চিত্র অথবা অপরাপর মিডিয়ার বস্তি চিত্রণের আকর বৈশিষ্ট্য: একজন বস্তিবাসী হাজির করা যে কিনা বেপরোয়া ক্ষুধার্ত, মাতাল, কামুক, মাতাপিতা নিষ্ঠুর এবং সন্তানের ব্যাপারে খোজখবর নেয় না। কেস হিসাবে জনপ্রিয় একান্নবর্তী সাক্ষাৎ প্রমাণ, বলা হয় “বস্তি/টস্তি খুবই ডেঞ্জারাস জায়গা সাবধানে যেও।” বস্তি থেকে যে ছেলেটি ৫১বর্তী বাড়িতে আশ্রয় পায় তার সম্পর্কে মন্তব্য: “এই ছেলেকে বাড়িতে রাখবি, এ তো তালা ভাঙতো, চুরি করতো?”

অর্থাৎ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে নিজ শ্রেণীর অনুশীলন, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, নৈতিকতা ছাড়া অন্যান্য সবকিছু, যেমন অন্য শ্রেণীর রুচি–‘বিকৃত’। ‘অশ্লীলতা’ বিতর্কে যেমন আমরা দেখতে পাই ‘সুস্থ সংস্কৃতি’ বনাম ‘অপসংস্কৃতি’র বৈপরীত্য তেমনি ‘রিকশাওয়ালার ছবি’ হিসাবে এফ.ডি.সির ছবিকে আখ্যায়িত করার পিছনে মধ্যবিত্ত নিজ মূল্যবোধ, অনুশীলনকে আদর্শ ধরে তার নিরিখেই মূল্যায়ন করছে। ‘অশ্লীলতা’ নিয়ে মধ্যবিত্ত উৎকন্ঠার বিপদজনক দিকটি হলো সচেতন ও প্রগতিশীল হিসাবে নিজেদের যারা দাবী করেন তাদের কাছে নিম্নবিত্তের প্রতিক্রিয়া কিংবা ভালো লাগার কোনো অর্থ নেই। নিজ শ্রেণীচৈতন্য দ্বারা মধ্যবিত্ত কর্তৃক নিম্নবিত্ত সংস্কৃতির এই ঋণাত্মক ধারণায়ন নিম্নবিত্তকে প্রান্তিক করে, নিম্নবর্গকে ‘নৈতিকভাবে অক্ষম’ প্রতিপন্ন করে, নিম্নবিত্তের সক্রিয় সত্তাকে অদৃশ্য করে এবং মধ্যবিত্তের নৈতিক দাপটকেই আরো প্রবল করে। নিম্নবিত্ত সংস্কৃতি ও মানুষের বালখিল্যকরণ যা আমরা দেখি মধ্যবিত্ত মিডিয়া, সাংস্কৃতিক পরিবেশন ও মধ্যবিত্তের চর্চায় তা মধ্যবিত্ত সত্তাকে সুগঠিত করে। চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা নিয়ে মধ্যবিত্তের সোচ্চার হওয়া তাই “একই সাথে নৈতিকতার জোরে মধ্যবিত্ত কতৃক অন্য শ্রেণীর ভিজ্যুয়াল দুনিয়া শাসন”। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি রাজনীতি বিযুক্ত নয়, স্রেফ ‘নির্দোষ’ বিনোদন, মানুষজনকে ‘নির্মল’ আনন্দ দেয়ার উপাদান নয়, রাজনীতি আছে। শ্রেণী মূল্যবোধই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কী ‘অশ্লীল’, কী অশ্লীল নয়। সাংস্কৃতিক উৎপাদ ও মধ্যবিত্ত আলাপচারিতাতে আমরা দেখি কিছু মৌলিক ধারণা, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, কাজ করেছে। এই মৌলিক ধারণা / দৃষ্টিভঙ্গির “রাজনৈতিক অর্থ” আছে: উৎপাদগুলো বক্তব্য ধারণ করে, বাস্তবতাকে বিশেষভাবে নির্মাণ করে এবং মধ্যবিত্তের তৈরী করা নির্মাণে নিম্নবগের্র প্রান্তিকীকরণ ঘটে। বাস্তবতা পুনঃনির্মাণের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব আলাপ মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গির বৈধতা তৈরি করে এবং অন্য শ্রেণীর পছন্দ, বাছাই, ইচ্ছা, কামনা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং অনুশীলনকে খারিজ করে, নস্যাৎ করে, অধঃস্তন করে। সেই সাথে মধ্যবিত্ত আতœপরিচয়ও গঠিত হয়।

৪.
নিম্নবিত্তের নির্মাণ এবং পরিবেশন একই সাথে মধ্যবিত্ত ক্ষমতার প্রকাশ ও উৎস, দুটিই। মধ্যবিত্ত ক্ষমতাকাঠামো নিম্নবিত্তের নির্মাণ করে ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায়। আবার একই সাথে নিম্নবিত্তের এই নির্মাণ দ্বারা মধ্যবিত্তের নিজের আত্মগঠনও সম্পন্ন হয়। এ আত্মগঠনে শ্লীল/অশ্লীল, এক স্বামী-স্ত্রী বিয়ে/বহু বিয়ে, অবিশ্বস্ত/বিশ্বস্ত, রুচিশীল/কুরচি বিরুদ্ধতাগুলোতে নিম্নবিত্তকে ‘অশ্লীল’ ছবির ভোক্তা/বহু বিয়েকারী অবিশ্বস্ত অবস্থানে স্থাপন নিজের ‘শ্লীল’ এক স্বামী-স্ত্রী বিয়ে, রুচিশীল, বিশ্বস্ততার নৈতিক আত্মপরিচয় গঠন করে। এই নীতি-নৈতিকতা মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয় ও শ্রেণী-আধিপত্য গঠন করে।

অধিপতি শ্রেণী হিসাবে মধ্যবিত্তের শ্রেণিসত্তার ওতোপ্রোত বিষয় রাজনীতি, অর্থনীতি ছাড়াও বুদ্ধিবৃত্তিক, মতাদর্শগত। এবং এক্ষেত্রে নিম্নবিত্তের যে ইমেজগুলো দৃষ্ট সেগুলো মধ্যবিত্ত নীতিনৈতিকতা ও শ্রেণিস্বার্থের কৌশলগত প্রতিরক্ষার কাজ করে। ‘স্টেরিওটাইপ’ নিম্নবিত্তের অধঃস্তনতার বিরুদ্ধে মূলত মধ্যবিত্ত নীতি-নৈতিকতার মডেলকেই শক্তিশালী করে।

গুরুত্বপূর্ণ: কীভাবে নিম্নবিত্তকে ভিত্তি করে মধ্যবিত্ত নৈতিকতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমরা দেখি পরিবেশনের চতুরতা, স্ট্র্যাটেজি: একটি পরিসর তৈরি করা হয় যা জটিল। শুধু মধ্যবিত্তকে মিডিয়ায় আনা হয়নি, দরিদ্র মানুষজনও আসে। তবে সে দরিদ্ররা কেন্দ্র নয়, পরিসরে মধ্যবিত্তের পাশে দরিদ্র মানুষজনের উপস্থাপন ও শ্রেণিদ্বয়ের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, সংযুক্তি সুযোগ করে দেয় মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতা পরিবেশনের (যেমন, একান্নবর্তী নাটকে মধ্যবিত্ত নাট্যকারের এক-স্বামী-স্ত্রী বিয়ের শ্রেষ্ঠতা প্রচারের খায়েশটি পূর্ণ হয় নিম্নবিত্ত চরিত্রের দ্বিতীয় বিয়ে দেখানোর মাধ্যমে)। নিম্নবিত্ত নিয়ে মধ্যবিত্ত চরিত্রের আক্ষেপ ব্যক্তি ছাপিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকণ্ঠ হয়ে ওঠে, এবং একই সাথে মধ্যবিত্তের সত্তাশ্রেষ্ঠত্ব, অনুশীলন-শ্রেষ্ঠত্ব, মূল্যবোধ-শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান পুনরুৎপাদন করে। যেমনটা আমরা দেখতে পাই সংস্কৃতি বিষয়ে সুশীল মধ্যবিত্তের আলাপে। নিম্নবিত্তকে ‘কুরুচিকর’ সংস্কৃতির গ্রাহক হিসেবে বৈশিষ্ট্যায়িত করা হয়। এই বৈশিষ্ট্যায়ন যা প্রতিষ্ঠার বাসনা উন্মোচিত করে তাহলো: মধ্যবিত্ত হল ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘রুচি’সমৃদ্ধ ‘কালচার’ বা ‘সংস্কৃতি’র রক্ষক। সবকমূলক লেকচার মধ্যবিত্তের একটি অভিভাবক সূলভ ইমেজ তৈরি করে যেন বা মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের ত্রাতা।

তাই আমার উপসংহার বক্তব্য স্পষ্ট: মিডিয়া পরিবেশনের গতানুগতিক প্রবণতা ও অন্যশ্রেণীর চর্চা ও রুচি নিয়ে মধ্যবিত্তের আলাপ শ্রেণী হিসেবে মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক, যা দেখায় মধ্যবিত্ত স্রেফ আর্থ-রাজনৈতিক বর্গ নয় বরং মধ্যবিত্ত আত্মশ্রেণিগঠনে নীতিনৈতিকতা, নির্দিষ্ট ধরনের মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নবিত্ত রিকশাওয়ালা, বস্তিবাসী মানুষজনের স্থাপিত অবস্থান একদিকে অধঃস্তনতা প্রকাশ করে এবং সেই সাথে মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক আধিপত্যও প্রকাশ করে। ‘রুচি’/‘কুরুচি’, ‘অশ্লীল’/শ্লীল’, এক বিয়ে/বহু বিয়ে, ‘নৈতিক’/‘অনৈতিক’ বিভাজন তৈরি এবং জিইয়ে রাখা আধিপত্যশীল মধ্যবিত্তের আত্মনির্মাণ প্রকল্পেরই প্রবণতা।

nadim.mandal@gmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rajeev ahmed — এপ্রিল ১০, ২০০৮ @ ১১:২২ অপরাহ্ন

      লেখাটি ভাল লেগেছে, লেখককে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com