কবিতা

শিমুল সালাহ্উদ্দিনের ১৭টি কবিতা

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | 14 Jul , 2017  

Aminul Islam

কবি

আমি সেই অন্ধ পাঠক
চোখ রেখে খুলে, ঠক ঠক
তীব্র শীতে, কাঁপছি ভেতরে–

কবিতা নিয়ে যাচ্ছি সাথে,
কবিকে বধ করে।

পরিত্রাণ

বিষণ্ণ মাল্লার গান
বুক ভরে কুয়াশায়
চুইয়ে পড়ছে জল
চোখ জ্বালা করে আর
বাতাসে তুলোর বীজ
এবং অস্থির গাছ
অস্থির অস্থির গাছ

পরিত্রাণ ভালোবাসি

আহ্বান

অলস মদির চোখে
কাঁটা মেহেদির
রঙ জমে উঠলে
তখনো মোমের হাতে

তোমরা আমায় ডাকো

বোবা বাবার গোঙানি শুনে লেখা

(সংবাদে প্রকাশ, সাত বছরের কন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে
তাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের তলায় লাফ দিয়েছেন বাবা
)

সাত বছরের ধর্ষিতা
কোথায় রাখবে বাবা!

রেললাইনে ট্রেনের তলায়
আয়, আয় শুয়ে থাকি রে, মা

বিচারবিহীন দেশের চাইতে
মরণের দেশ ভালো।

অন্ধকারের ঠাণ্ডা ঘুমে,
নেই শঠতা—বিভ্রান্তি— আলো

পালাসনে মা পৃথিবীর দিকে
গ্রহখানি আজ, ধর্ষকামীতে ভরা
মানুষেরা সব পাশবিক,
বিচারহীনতার জরা— এই দেশে
তাই ঝাপ্ দেই চল জীবন ওপাড়ে,
মেয়েকে ঠেললো বাবা
সভ্যতামুখে ঝামা ঘষে দিলে—
তুমিও কী আজ একটু চমকাবা?

সাত বছরের ধর্ষিতা মেয়ে,
কোথায় রাখবো তোকে মা!

তিস্তা এক্সপ্রেস দিলো সমাধান,
কন্যাসমেত ট্রেনের তলায় বাবা।

ডাকবাক্স

যে বাসায় থাকি, তার প্রবেশদ্বারেই
ঝুলন্ত তাকিয়ে আছে
একসারি ডাকবাক্স

অব্যবহৃত

প্রতিদিন আমাদের বাসার
বর্ষিয়ান কেয়ারটেকার
বাক্সগুলি মোছে

রুটিন ওয়ার্ক

তবে কখনোই খোলা না হবার কারণে
মরচে ধরে গেছে তালাগুলির ছিদ্রে
চাবি ঢুকবে কী-না হয়, এই

সংশয়

বাসার চাবির গোছার সাথে ডাকবাক্সের একটি চাবি আছে
হাতের আঙুলসমূহের প্রান্তে কনিষ্ঠার মতো
মনেই পড়ে না যার কথা

প্রতিদিন ভাবি, খুলে দেখি কেউ চিঠি লেখে কী না আমাকে,
তাড়াহুড়োয়, প্রতিদিন, ভুলে যাই

গভীর রাতে ঘরে পৌঁছে মনে পড়ে
কর্নেলের বেদনা
(যাকে কেউ কখনো চিঠি লেখে না)

অনেক আয়োজন করে আজ,
অফিস কামাই করে,
‘এইই তালাচাবিইই’ ধরে এনে
বাক্সটি খুলে দেখি,

চিঠি

প্রেরকের ঠিকানার ঘরে, প্রাপকের নাম।

পাগলজনম

জন্ম থেকেই পাগল ছিলাম
পাগল আছি, থাকবো
ক্যানভাসের এক আঁকা ছবি
শিল্পীটাকে আঁকবো।।

জন্ম থেকেই পাগল ছিলাম
পাগল আছি, থাকবো
তোমার ভেতর ডুবে থেকেও
তোমার কথা ভাববো।।

জন্ম থেকেই পাগল ছিলাম
পাগল আছি, থাকবো
আমার ভেতর ডুবে থেকেই
আমার ছবি আঁকবো।।

তোমার ছবি আমার ছবি
বলতো কোথায় রাখবো?
জন্ম থেকেই পাগল ছিলাম
পাগল আছি থাকবো।।

জাগরণ

আমায় স্বপ্নে দেখা নারী
তুমি অনেক সুখী হও
আলোর ভেতর খরস্রোতা
অন্ধ এক নদীর মতো বও।

আততায়ীর মুখোমুখি

অশ্রুঝরা গানের কাছে
বুক রেখেছি পেতে
এসো তুমি, খুন করে যাও
রক্তখেলায় মেতে।।

একটি সহজলভ্য স্বপ্ন

আসুন গাছ লাগানোর বদলে আরো কাটি
আমাদের দেশ হবে পূণ্যমরুভূমি, খাঁটি

সেই দেশে আমরা, করবো করবো সুরাপান
বেলিড্যান্স দেখবো আর ঊটেদের গান

শুনতে শুনতে যাবো রাজশাহী বরিশাল
থাকবে না পাহাড় কোন, মানুষের আকাল

হবে সেই দেশে, শান্তি থাকবে তবু মানুষে
মানুষে, প্রীতিহীন দুঃখের সাথে মিলেমিশে

ভরসার নৌকাই হবে প্রতীক, পাহাড় নদীহীন
আমাদের সেই মরুসাফল্যের বঙ্গদেশে।

রঙভূত ভূতরঙ

রঙ দেখেছো মনের মানুষ রঙ মেখেছো মনে
কোন ভাঁড়ার হতে এলো যে রঙ জানলে কী যতনে?

আমার মনের রঙের খবর তোমায় দিলো কে?
কেইবা এসে মনটা আমার রাঙিয়ে দিয়েছে?

যার আধেক বিকেল সন্ধ্যাসকাল আমার ছিলো কাল
আজকে তারই স্মৃতির ধূলোয় হচ্ছো নাজেহাল!

আমি কিন্তু আমার সকল ভূতেরই যোগফল
তাদের মধ্যে মামদো আছো আছে, কানাভোলার দল

মামদো নিলেও, কানাভোলা নিতেই তোমার হবে
স্কন্ধকাটা ব্রহ্মদৈত্য নিশিরা পুষে থাকে।

নিশি পাওয়া মানুষ যত পৃথ্বি জুড়ে আছে
তাদের বুকের কাছে সিঁদ কেটেছে সকল বোয়াল মাছে।

সে সিঁদপথে ঢুঁ মেরে আজ রঙ করেছো চুরি
রঙের বহর বাড়িয়ে দিলো তোমার হাতের চুড়ি

রঙ বাড়ে আজ রঙ বেড়ে যায় বাড়াই রঙের কাজ
ভূতের সাথে মাথায় রেখো নিজের মাথার বাজ।

রঙ দেখেছো মনের মানুষ রঙ মেখেছো মনে
কোন ভাঁড়ার হতে এলো যে রঙ জানলে কী যতনে?

চিঠি

চরাচরময় ঘাতক পাখির ডাক
তোমাযাতনারা আমাকে ডোবাক—
ভাবনার
সড়কে সড়কে পাতা মগ্ন সরোবরে—

টের পাও?
আমার লাশের চুমু তোমার অধরে, স্বরে!

শরীর পাতার আগে

আদরের ধারণার কাছে
যারা নতজানু হয়ে আছে
হয়ে আছে বিষাদ হলুদ
বুক ভরা সমূহ বুদবুদ
হাহাকার বেদনার ভার
নিয়ে তারা অবেলায় আর
যাবে কোথা, কোন অস্তাচলে!

এমনও শুষ্করুখু নিদানের কালে
মরার কবির কথা, কে আর বলে!

পাহাড়ের প্রতিশোধ

আঘাতে আঘাতে যারা জমিয়েছো ক্রোধ
ভেতরে আমার
কোদালে শাবলে যারা, করেছো ভঙ্গুর স্থিতি
আনখশির ত্রিকোণমিতির
ভীতির ভেতরে ভীতের ভেতরে ধসে পড়বার আগে
ভুলে গিয়ে শত্রু-ভালোবাসা, মানুষ মানুষ বোধ

পাহাড়, পাহাড়, এ আমার নগণ্য প্রতিশোধ।

বিশ্বাসের বন্দিনী

দাঁড়ানোর জায়গা কমতে কমতে
পদতলও নিচ্ছে না জায়গা আর।
ঘাড় সোজা করে দুই বুড়ো আঙুলের
ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছি,
একঘরের সবাই।

আরো
নাই, যাওয়ার যায়গা নাই, কারো।

একটু পরই আমরা প্রার্থণা
শুরু করবো, এসো ভুবনদেয়াল
পাহাড়ী ঢলের মতো এসো
আমাদের গায়ে নেমে
নইলে, পায়ে পারা দিয়ে দিয়ে
শুরু করবো অস্তিত্বের লড়াই।

ঋণবক্স

মুগ্ধ হলাম আমরা দুজন খুব
বসলাম এসে বনানীর এক ছায়
হৃদয় খুলে চললো কথা যত
যার যা আছে কুলুঙ্গিতে বাঁধা

হাত ধরলাম পা ধরলাম মুখ
চোখের ভেতর ঠেসে দিলাম চাওয়া
মুগ্ধ মোদের কন্ঠস্বরে আরও
বসলো এসে কপোত পাখির গাওয়া

কথায় কথায় উধাও হলো সুর
চুপের ওপর চাপলো নিরবতা

এখন আমরা কেউ বলিনা কথা
ঘাসের দিকে পাতার দিকে চেয়ে
আকাশ ভরি দীর্ঘশ্বাসের হাওয়ায়
যায় আসে না কিচ্ছুটি না চাওয়ায়

পরস্পরের মুখের সামনে মুখ
বুকের ভেতর স্তব্ধ নিরবতা

পরস্পরের
বুকের ভেতর, স্তব্ধ গভীর
নিঃস্ব সরোবরের নিরবতা।।

কবিহীন ভেঁড়ার অঞ্চলে

আমি প্রথম আলো, আমি আনন্দবাজার
আমি সুনীল, জয়, সাজ্জাদ, সুবোধ সরকার
অনুগত ক্রীতদাস দেখতে দেখতে, ক্রোধে
ভুলে গেছি, কবিতা যে লেখে তার থাকে
আত্মসম্মানবোধ

আর চকচকে চোখের স্পষ্ট দীপ্তির সাথে
‘না’ বলবার প্রগাঢ় ঔজ্জ্বল্য

গণমাধ্যমের ভবিষ্যত

এগিয়ে আসছে ধস
ক্রমশ ধাপে ধাপে

নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে
নিশ্চিত পতনের মুখে

নির্বিকার দাঁড়িয়ে
হিঁশুপরবর্তী জিপার

টানছে ওপরের দিকে
আমাদের গণমাধ্যম।

Flag Counter


18 Responses

  1. সাহিদ সুমন says:

    কবি খুবই সমাজসচেতন। স্পষ্ট হৃদয়ের মানুষ। অকপটে মনের কথা বলেছেন কবিতায়, দারুন মুন্সিয়ানায়। ভাল লাগলো কবিতাগুলো। অভিনন্দন কবি।

  2. বিদিত কৈরী says:

    এধরণের কবিতা অন্তত কয়েক হাজার লেখা হইসে বাংলা ভাষায়।
    দুর্বল, নতুনত্বশূন্য এসব বাক্যপূর্ণ ‘১৭টি কবিতা’ বা ‘৭০০ টি কবিতা’য় বাংলা সাহিত্যের কোনো লাভক্ষতি কিছু হয় না।

    • আফজাল আহমেদ হৃদয় says:

      আপনি কেমন কবিতা পড়তে চান? সেরকমই লিখতে হবে কেন? এমন কবিতা কে লিখেছে এর আগে?

  3. অরিন্দম শীল says:

    এক সংবেদী কবির পরিচয় আছে কবিতাগুলিতে। অভিনন্দন কবিকে।

  4. আহমেদ কামাল says:

    ঋণবক্স সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে। কবির সাহস মুগ্ধকর। এভাবে বলতে পারার মত আর কাউকে দেখি না এখন আর।

  5. Asmit Jana says:

    Tremendously New Poetry, love for poet.

  6. চন্দন রেজা says:

    বিদিত কৈরী, আপনি কে? আপনার বক্তব্য খুবই অসূয়াপ্রসূত। শত্রুতামূলক। কবিতাগুলি আমার ভালো লেগেছে।

  7. খালেদ হুমায়ূন says:

    উপভোগ করলাম কবিতাগুলো। কবিহীন ভেঁড়ার অঞ্চলে বা গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ আলোচিত হবার মত কবিতা। কবির সাহসের প্রশংসা করি।

  8. বীরেন মুখার্জী says:

    শিমুল সালাহ্উদ্দিন- এর কবিতা আগেও পাঠ করেছি। শিমুলের কবিতা ভালো লাগে, কিন্তু এবারের কবিতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছি না। যা হোক, হতে পারে এটা আমার সমস্যা।

    এ ধরনের কবিতা তো হামেশায় লিখিত হচ্ছে। নতুন করে বলার কিছুই পাচ্ছি না।

  9. তনিমা আহমেদ says:

    কবির দূরদৃষ্টি অসাধারণ। খুব ভাল লাগল চোখের ভেতর ঠেসে দিলাম চাওয়া।

  10. পড়তে গিয়ে কোথাও আটকালো না… বেশ সুন্দর, স্পষ্ট আর কাব্যিক।

  11. জুননু রাইন says:

    বাহ! এক সাথে অনেকগুলো পড়লাম। ভাল লেগেছে।

  12. কমলরাজ চক্রবর্তী says:

    আধুনিক ও নতুন কবিতার নামে অজস্র ঢপের কীর্তনের চেয়ে চিরায়ত কবিতার দিকে চেয়ে থাকা এ কবিতাগুলি অনেক শ্রেয়। ভাল। এসময়ের বাংলাদেশের একটা চেহারা পাওয়া যায় অন্তত কবিতাগুলো দিয়ে। গণমাধ্যম নিয়ে ফেইসবুকে যেসব আহাজারি দেখি সর্বশেষ কবিতাটি আমার খুব মোক্ষম ভবিষ্যৎবাণী মনে হয়েছে।

    সুরের দিকে ধাবিত কবিতাগুলোর জন্য কবিকে অভিনন্দন। ধন্যবাদ আর্টসকে একসাথে অনেকগুলো কবিতা পড়ার সুযোগ দেবার জন্য।

    কমলরাজ চক্রবর্তী
    মঙ্গলকোট, বর্ধমান

  13. প্রান্তিক সন্ন্যাস says:

    অনেকদিন পর তোমার কবিতা পড়লাম শিমুল। মন ছুঁয়ে গেল। জাহাঙ্গীরনগরে একটা কবিতার জন্য কী অত্যাচার তুমি করতা আমাদের! সেইসব পাগলামিভরা দিনগুলি খুব মিস করি।

    এগিয়ে যাও ভাই।

  14. আবু সাঈদ আহমেদ says:

    অকপটে স্বীকার করছি যে শিমুল সালাহ্উদ্দিনের কবিতা আগে পড়া হয়নি। কিন্তু এই কবিতাগুলো পড়ে লজ্জিত হলাম, কেনো আগে পড়িনি। সরল ভাষায় আর সহজ কাঠামোতে গভীর ঝংকার তোলা খুব সহজ কাজ নয়, অথচ শিমুল তাই করেছেন। আমি এই কবির ভক্ত হয়ে গেছি।

  15. রুবাইয়াৎ আহমেদ says:

    কবি সময়ের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। ভালোবাসা তার জন্য।

  16. এস,এম, খায়রুল ইসলাম says:

    সব ধরনের কবিতাই আমার ভালো লাগে বলতে পারেন, আমি একজন কবিতাপ্রেমী। তা যাই হোক সবগুলো কবিতাই ভালো, তবে ডাকবাক্স আমাকে স্পর্শ করেছে একটু বেশীই। কবিকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে অনাগ্রহী।

  17. আশরাফ জুয়েল says:

    পড়লাম ভাই। ভালো লেগেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.